চূর্ণচূড়ায়_চাঁদের_পাহাড় লেখনিতে— #সৈয়দ_মারিয়াহ্_হামিদ ৮.

0
23

#চূর্ণচূড়ায়_চাঁদের_পাহাড়
লেখনিতে— #সৈয়দ_মারিয়াহ্_হামিদ

৮.
মিনিট ত্রিশেক তাদের মাঝে প্রাণপন যুদ্ধ হলো। গাছটি কোনো মতেই তার গাছের ছাল দিতে রাজি না। সাইরও গাছের ছাল না নিয়ে এখান থেকে ফিরবে না বলে মনস্থ করলো। সাইর দুই হাত বুক বরাবর এনে গোল গোল ঘুরতে লাগলো। মুহুর্তেই ঝড় তৈরি হলো সেখানে। সব গাছগুলো এদিক-ওদিক পরে যেতে লাগলো। মায়াবী গাছের শেকড়গুলো তড়তড় করে এগিয়ে এলো সাইরের ঝড় থামানোর জন্য। কিন্তু বিপত্তি ঘটলো সেখানেই। গাছের শেকড়গুলো সাইরকে ধরতে যেতেই ঈগল এসে খপ করে পায়ের আঁচড়ে গাছের ছাল তুলে নিয়ে উড়াল দিলো আকাশে। মায়াবী গাছটি ব্যথায় চিৎকার করলো। তার চিৎকার শুনে বনের সব পশু-পাখি উড়াল দিয়ে বন ত্যাগ করলো। কিছুক্ষণ পরেই সবকিছু স্বাভাবিক হলো। ঝড়ও থেমে গেলো কিন্তু সাইর সেখানে ছিলো না। মায়াবী সেই গাছের ক্ষত থেকে নীল রঙের আঁঠা পরতে লাগলো।

ঈগলটা উড়ে উড়ে চূড়ায় গিয়ে থামলো। চূর্ণচূড়ার একবারে উঁচু প্রান্তে গেলো ঈগলটা। কিছুক্ষণ পরেই নিজের আসল রূপে আসলো সাইর। মধু তুলিকে পাহারা দিতে দিতে ঘুমিয়ে পরেছিল নয়তো সাইরের ঈগল-মানুষের প্রবন্ধ নিশ্চয়ই শুনাতে তাকে। সাইর গাছের ছালটা দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। বাম হাতে ছালটা রেখে ডান হাত মেলে চোখ বন্ধ করলো। মায়াবী শক্তিতে একটা কাঁচের বয়াম আনলো সাইর। বয়ামের ভিতরে পানি ঝলমল করছে। সেই পানিতে মায়াবী গাছের ছালটা ভিজিয়ে দিলো সে। তারপর বয়ামটা হাতে নিয়ে খুপরির দিকে গেলো।

মধুকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকলো সাইর। তুলি তখনও বেহুঁশ হয়ে পরে আছে। সাইর তুলির মাথাটা তার উঁরুর উপরে রাখলো। তারপর আবার জাদু শক্তিতে ছাল মেশানো বয়ামটা হাজির করলো। বয়ামের মুখ খুলে সেই ছাল ভেজানো রসের পানি খাইয়ে দিলো তুলিকে।

রাগান্বিত হয়ে বাড়িতে ফিরে জমিদার মুমিনুর। রাগে তার সারা শরীর রি-রি করছে। মনে হচ্ছে সাইরকে পেলে এক্ষুনি গলা চেপে মেরে ফেলবে। রাগ নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য পায়চারি করছেন তিনি। জমিদার গিন্নী বার কয়েক ডেকেছে খেতে আসতে কিন্তু তিনি নিচে যায় নি। বাধ্য হয়ে নতুন বউয়ের সকল রীতিনীতি পালন করলেন জমিদার গিন্নী একা। জমিদারের ওপরে ক্ষিপ্ত মেজাজে হলেও ছেলে-বউয়ের সম্মুখে স্বাভাবিক আচরণই করলেন জমিদার গিন্নী।

নতুন বউয়ের সাজে সহিনী জমিদার বাড়িতে প্রবেশ করেছে। মুন্নি সেই কখন থেকে সাজাদের ঘর সাজাচ্ছে তবুও মন মতো সাজানো হচ্ছে না তার। খালাতো বোনদের নিয়ে দীর্ঘ ঘন্টা তিনেকের মাঝেই সাজাদের বাসর ঘর সাজিয়ে দিলো মুন্নি। অন্য ঘর থেকে সহিনী সাজাদের ঘরে আনা হয়। মুন্নি আর প্রিয়া দুইজন বসে আছে সহিনীর দুই পাশে। মুন্নি সেই কখন থেকে কত কথা বলেই যাচ্ছে। প্রিয়াও বলছে তবে কম। প্রিয়া মুন্নির চাচাতো বোন। কালই এসেছে এই বাড়িতে।

সাজাদ এসে বাইরে থেকে দরজায় টোকা দিলো। ভেতর থেকে মুন্নির আওয়াজ শুনে বলল„ —“মুন্নি দরজা খুলো।”

মুন্নি উঠে গেলো। শাল কাঠের কপাট দুটো খিল দিয়ে আটকে রেখেছিলো সে। সাজাদ আসতেই কপাট খুলে বাইরে বেরিয়ে এলো মুন্নি। তার পেছন পেছন প্রিয়াও বেরিয়ে এলো। দরজার সামনে দাড়িয়ে কোমড়ে দুই হাত রেখে বলল„ —“কি চাই।”

সাজাদ আশ্চর্য হলো। ঘরটা তার নিজেরই তবুও বোন বলেছে কি চাই। সাজাদ মাথার পাগড়ী খুললো। বাড়িতে ফিরেই বর বসেই সে তার বাবার সাথে গিয়েছিল সাইরকে খুঁজতে। পোশাক পরিবর্তন করার কথা ভুলেও তার মাথায় আসেনি। পাগড়ীটা হাতে নিয়ে বলল„ —“কি আশ্চর্য! ঘর আমার‚ বউও আমার। তাহলে তুই কেন মাঝখানে আসছিস?”

মুন্নি ভ্রু-জোড়া কুঁচকে বলল„ —“ঘরও তোমার‚ বউও তোমার কিন্তু ট্যাক্স আমাদের।”

সাজাদ কটমটিয়ে তাকালে„ —“ট্যাক্স মানে?”

মুন্নি হাসলো„ —“এই যে তিন ঘন্টা যাবৎ এত খাটাখাটুনি করলাম তার পারিশ্রমিক চাই।”

সাজাদ মাথা নাড়াল„ —“বল কত চাই?”

মুন্নি দুই হাতের নখ গুনলো„ —“মোট একশ কড়ি চাই।”

সাজাদ হকচকিয়ে গেল„ —“কিহ একশ কড়ি!”

মুন্নি আবারও বলল„ —“কম বললাম? আচ্ছা দুইশ কড়ি।”

সাজাদ রাগ দেখিয়ে বলল„ —“আমি কি অ্যারোপ্লেন চালাই যে চাওয়া মাত্র তোকে একশ কড়ি দেবো আমি।”

মুন্নি দুই হাত সামনে এসে ঘষতে লাগলো„ —“সে তুমি অ্যারোপ্লেন চালাও আর গরুর গাড়ি। কড়ি লাগবে মানে লাগবে নয়তো ছাড়ছি না ঘর হুম।”

সাজাদ পাঞ্জাবির পকেটে হাত রেখে কড়ি বের করলো। হাতের তালুতে রেখে গুনলো। তার কাছে কোট বিশটা কড়ি আছে। সে ভিজ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলল„ —“বিশটা কড়ি আছে নিবি?”

মুন্নি রেগেমেগে কোমড়ে হাত রাখলো„ —“আমি ফক্কিনি নই। সুতরাং আমাকে আমার সঠিক মূল্য দাও ভাইয়া।”

সাজাদ জোড় করে মুন্নির হাতে বিশটা করি ধরিয়ে দিয়ে দরজার সামনে থেকে মুন্নিকে সড়ালো। দ্রুত ভেতরে গিয়ে কপাট লাগিয়ে দিলো। মুন্নি বার কয়েক দরজা ধাক্কালো কিন্তু কোনো লাভ হলো না। ভেতর থেকে দরজা লাগিয়ে দিলে খোলার আর কোনো উপায় নেই।

ফুটন্ত ফুলের ঘ্রাণে বিছানার চার কোণ মুখরিত। মাঝখানে লাল বেনারসিতে বউ সেজে ঘোমটা টেনে বিছানায় বসে আছে সহিনী। সাজাদ গিয়ে সহিনী পাশে বসলো। সাজাদ নিজ হাতে সহিনীর ঘোমটা তুলে থুতনিতে হাত রেখে নিজের দিকে ফেরালো সহিনীকে। অপূর্ব সুন্দরী রমনী বুঝি একটাই ছিলো এ ধরাতে। কি সৌভাগ্য সাজাদের।

চোখ নামিয়ে ডাকলো সহিনীকে„ —“সহিনী।”

সহিনী অকপটে উত্তর দিলো„ —“হ্যাঁ।”

—“তোমার কি কোনো অসুবিধা হচ্ছে।”

সহিনী দুই পাশে মাথা ঘুরালো যার অর্থ না। সাজাদ মুচকি হাসলো„ —“তুমি মনে হয় এ ধরাতে এক অপূর্ব সুন্দরী নারী। যে আমার জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিলো অতল সাগরে।”

সহিনী লজ্জায় মাথা নোয়ালো। সাজাদ তুলির থুতনিতে হাত রেখে মুখ উঁচিয়ে সহিনীর উজ্জ্বল মুখখানা দেখলো। মুখ ফস্কে বেরিয়ে এলো„ —“তুলির চেয়েও অপূর্ব সুন্দরী তুমি।”

সদ্য বিবাহিত স্বামীর মুখে মাহরাম নারীর কথা শুনে ছিটকে সরে গেলো সহিনী। আমতা আমতা করে বলল„ —“আপনি কি আগে কোনো নারীতে আকৃষ্ট ছিলেন।”

সাজাদ চোখ নামালো„ —“আমি কোনো নারীতে আকৃষ্ট ছিলাম না। সেদিন ছোট ভাইয়ার পছন্দের নারীকে দেখে তার চেহারা মস্তিষ্কে গেঁথে গিয়েছিল। বিশ্বাস করো সহিনী তুমি ব্যতীত অন্য কোনো নারী আমার হয়নি‚ হতেও চায় নি‚ আর হতেও পারেনি। তুমিই প্রথম‚ তুমিই শেষ।”

সহিনী কিছুটা কাছে এলো সাজাদের„ —“আমার জীবনে আপনিই প্রথম প্রেম‚ আর আপনার প্রেমকেই শেষ অব্দি ধরে রাখবো ইন-শা-আল্লাহ।”

সাজাদ সহিনীর সম্মুখে ফিরলো। দুই গাল চেপে ধরে কপালে চুম্বন করলো। মুখ ফিরিয়ে বলল„ —“আমি জানি আমাদের শহরেই যেতে হবে। তবে কথা দাও গ্রামে এলে কখনো বাবা-মায়ের সাথে খারাপ ব্যবহার করবে না‚ তাদের মনে কখনো কষ্ট দেবে না‚ এমন কোনো কটু কথা বলবে না যাতে তারা খুব কষ্ট পায়‚ এমন কোনো ভুল করবে না যাতে আমাকে তাদের কাছে ছোট হতে হয়? বলো সহিনী?”

সাজাদ হাত বারিয়ে দিলো। সহিনী সাজাদের হাতে হাত রেখে বলল„ —“কথা দিলাম কখনো তাদেরকে কষ্ট দেবো না। কখনো তোমাকে তাদের কাছে ছোট হতে দেবো না।”

দুইজন নতুন দম্পতি তাদের ভালোবাসা বিনিময়ে ব্যাকুল হয়ে পরলো। আজ থেকে তাদের নতুন যাত্রা শুরু হলো। সহিনী আর এখন রঞ্জু মোল্লার মেয়ে নয় বরং জমিদার বাড়ির বড় বউ হয়ে স্বীকৃতি পেলো আজ। কাল থেকে সে নিজেকে অন্য রূপে প্রকাশ করতে ব্যস্ত হবে। সাজাদও নিজের একাকি জীবনের সমাপ্তি দিলো আজ রাতেই। তার এখন স্ত্রী রয়েছে। সংসারে নতুন সদস্য বেরেছে। বেরেছে কতশত দায়িত্ব।

জ্ঞান ফিরেছে তুলির। পিটপিট চোখে চারপাশ তাকালো। নাহ কেউ নেই এখানে উঠতে নিলেই পুরো শরীরে ব্যথায় ভরে উঠলে। হাতের উল্টো পিঠে চাবুকের দৃঢ় দাগ চোখে পরতেই কান্নারা দলাপাকিয়ে গলায় এসে দাড়ালো। পেটের পাশে চাবুকের দাগটা দেখতেই কাঁদতে শুরু করলো তুলি। হাটু মুড়ে দুই হাত হাটুর উপরে রেখে মাথা ঠেকিয়ে কাঁদতে লাগলো তুলি। কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি তুলে ফেলেছে সে। কান্নার শব্দ শুনতে পেয়ে মধু এগিয়ে এলো। ম্যাঁ ম্যাঁ করে বলল„ —“কাঁদছিস কেন তুলি?”

তুলি মাথা তুলে তাকালো। দরজায় মধু ছাড়া আর কেউ নেই। কিন্তু সে স্পষ্ট কারও গলা শুনতে পেলো। কাউকে দেখতে না পেয়ে আবারও কাঁদতে লাগলো তুলি। মধু লাফ দিয়ে চৌকিতে উঠলো। তুলির কাছে গিয়ে বলল„ —“আমি কথা বলছি। মধু। মধু বলছি তুলি।”

তুলি মধুর গলা জড়িয়ে ধরলো। কান্নার হেঁচকি থামাতে পারছেনা সে। হেঁচকি তুলতে তুলতে বলল„ —“আমি কতটা অসুস্থ হলে তোর কন্ঠ অনুভব করতে পারি ভেবে দেখ মধু? আমি পাগল হয়ে যাবো কোনো একদিন।”

আবারও কাঁদতে লাগলো তুলি। মধু বিরক্ত হলো। সে যে কথা বলতে পারছে তাতে তুলির খুশি হবার কথা কিন্তু তুলি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না যে মধুই মানুষের মতো কথা বলছে। মধু দৌড়ে বাইরে গেলো। সাইর বটগাছের নিচে গাছে হেলান দিয়ে চোখ বুঁজে বসে ছিলো। মধু কাছে গিয়ে ম্যাঁ ম্যাঁ করে ডাকলো„ —“তুলি কাঁদছে!”

সাইর চোখ খুলল। ঘন্টা দুয়েক আগে মায়াবী গাছের পাঁচন খাইয়েছিল তুলিকে যাতে সে সুস্থ হয়। কিন্তু তুলির জ্ঞান ফিরে নি। বেশ আঘাত পেয়েছে শরীরে তাই জ্ঞান ফিরতে দেরি হচ্ছে। সাইর মধুর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল„ —“তুই থাক আমি আসছি।”

সাইর উঠে খুপরিতে গেলো। তুলি হাটু মুড়ে বসে বসে কাঁদছে। ঘরে কারও উপস্থিতি পেয়ে তাকালো তুলি। সামনে সাইরকে দেখে ভরকে গেলো। শাড়িটা দিয়ে ভালোভাবে ঢেকে নিলো নিজেকে। সাইর তুলির সামনে গিয়ে দুরুত্ব রেখে চৌকিতে বসলো। তুলি কাঁন্নারা থেমে গেছে সাইরকে দেখে। শত্রুর সামনে কখনো দূর্বল হতে নেই। এ কথা ভালো করেই বুঝিয়ে দিয়েছে মাধুরী। তাই কোনো মতেই নিজেকে দূর্বল প্রমাণ করতে চায় না তুলি।

—“তুমি ঠিক আছো?”

তুলি মাথা কাত করে উত্তর দিলো„ —“হ্যাঁ।”

সাইর তুলির দিকে তাকালো। গাল বেয়ে নিঃশব্দে নোনাপানি পরছে এখনও। চোখ ফিরিয়ে প্রশ্ন করলো„ —“খিদে পেয়েছে তোমার? কিছুই তো খাও নি সেই সকাল থেকে?”

তুলি চাবুকের দাগগুলো ভালো করে দেখলো। অতঃপর বলল„ —“যা খেয়ে এতেই পেট এখনো ভরাই আছে।”

সাইর মাথা নোয়াল„ —“তুলি আমি জানি না বাবা হঠাৎই কেন তোমাকে এভাবে আঘাত করলো। ভুলটা আমারই হয়েছে তোমাকে নিয়ে এভাবে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পরেছিলাম। যদি একটা বন্দবস্ত করে তোমাকে আনতাম তাহলে ভালো হতো।”

তুলি চকিতে তাকালো„ —“যা উপকার করেছেন এতেই হবে। আমি বাড়ি যাবো। আপনি আপনার রাস্তা মতো চলুন। ভুলেও আমার কাছে আসবেন না।”

সাইর হাসলো„ —“তোমার ওপরে যখন একবার আমার দৃষ্টি পরেছে তাহলে পুরো বিশ্ব এক করে হলেও তোমাকে আমার চাই’ই চাই।”

তুলি আঙুল উঁচিয়ে ধমকের সুরে বলল„ —“এসব আপনার ছলনা। দূরে থাকবেন আমার থেকে। নয়তো আপনাকে আমি?”

কথা শেষ না করে তুলিকে এদিকে ওদিকে তাকাতে দেখে সাইর বলল„ —“নয়তো তুমি আমাকে কি হ্যাঁ?”

তুলি বলার মতো আর কিছুই পেলো না মাথা নিচু করলো সে। সাইর উঠে বাইরে গিয়ে কয়েটা রঙ বেরঙের শাড়ি এনে দিলো তুলির কাছে। বলল„ —“যেটা পছন্দ পরে নাও। এখন থেকে তোমাকে আমার কাছেই থাকতে হবে। কোথাও যেতে পারবে না এখান থেকে।”

তুলি কোনো কথা বললো না। চুপচাপ শাড়ির থেকে কালো রঙের একটা শাড়ি পরে নিলো। সাইর বাইরে ছিলো এতক্ষণ। কোথা থেকে ভাত এনেছে সাইর। তুলি না জানলেও বুঝতে পেরেছে জাদু-শক্তির বিনিময়ে খাবার এনেছে হয়তো। পেটে খিদে থাকায় সাইরের আনা খাবার খেয়ে নিলো সে। সাইর এসে পাঁচন দিয়ে গিয়েছে। কড়া গলায় বলে গেছে„ —“সব টুকু খেয়ে নেবে নয়তো সুস্থ হবে না।”

তুলি পাঁচনের গন্ধ শুঁকে বমি করতে থাকে। সাইর দ্রুত গিয়ে তুলিকে সামনে নিলো। চৌকিতে বসিয়ে এক গ্লাস পানি গিয়ে দিলো। পানি৷ গ্লাসটা ছুরে ফেলে দিলো তুলি। মুখ চেপে ধরে বলল„ —“মেরে ফেলার ধান্দা করেছেন আমাকে? এসব ভুজুংভাজুং খাইয়ে মারতে চান আমাকে?”

সাইরের রাগ চওড়া হলো। এক হাতে তুলির মুখ চেপে ধরলো। ব্যথায় হা করলো মুখ। ওমনি সাইর পাঁচনটা ঢেলে দিলো তুলির মুখে। ঢক করে গিলে ফেললো পাঁচনটা। শরীর গুলিয়ে এলো তার। সাইর উঠে বাইরে গেলো। তুলি চৌকিতে বসে থাকলো কিছুক্ষণ। তারপর হাত-পা নড়াতেই বুঝলো শরীর তার প্রায় সুস্থ। কিন্তু কিসের পাঁচন খাওয়া সাইর এটাই বুঝলো না সে। সব ভাবনা পাশে রেখে বাইরে বের হলো তুলি। সোনালি আলোয় চূড়ায় মাকড়সার জালের মতো ঘেড়াও করে আছে। সেদিন ন্যায় তুলিকে আবার বন্দি করেছে সাইর। চোখ বন্ধ করে সুরাতুল আদিয়া ২১ বার পাঠ করলো তুলি। কিন্তু কোনো ফল পেলো না। চিন্তিত হলো তুলি। সে তো ব্যর্থ হবার কথা নয়। তাহলে ব্যর্থ হলো কেন।

সাইর দূর থেকে বলল„ —“কেন ব্যর্থ হলে তাই তো?”

তুলি মুখ বাকিয়ে অন্য দিকে ফিরলো। সাইর হাসলো„ —“তুমি কি জানো তোমার জন্ম চিহ্ন আমি দেখে ফেলেছি?”

তুলি হকচকিয়ে গেল। সাইর কি সত্যি তার জন্ম চিহ্ন দেখেছে। মলিন মুখ নিয়ে সামনে তাকালো তুলি। সাইর হাসলো„ —“তুমি যা ভাবছো ঠিক তাই। তোমার জন্ম চিহ্ন আমি দেখেছি। তোমাকে আটকাবার প্রতিটি পদক্ষেপ আমার জানা আছে এখন।”

তুলি কিছু বললো না। চুপচাপ খুপরিতে গিয়ে চৌকিতে বসলো। চাঁদ ঠিক মাথায় উঠেছে রাত অনেক গভীর। সাইর খুপরিতে গেলো। তুলি চৌকিতে শুয়ে আছে। এতক্ষণে ঘুমিয়েই পরেছে। তুলিকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখে সাইর বিছানা পেতে মাটিতে শুয়ে পরলো৷ পাশেই মধু শুয়ে আছে হাত-পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেও ঘুমের দেশে পারি দিলো।

সাইরকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখে পা টিপে টিপে খুপরি ছেড়ে বাইরে গেলো তুলি। চূড়ার শেষে গিয়ে জোড়ে জোড়ে সূরা ইয়া-সি-ন পড়তে লাগলো। বার কয়েক চেষ্টা করেও যখন ব্যর্থ হলো তখন পেছন থেকে কেউ বলল„ —“সূরা ইমরান দিয়েও একবার চেষ্টা করো। আল্লাহ বান্দা তুমি। তোমার বিপদে নিশ্চয়ই তোমাকে সাহায্য করবেন?”

তুলি পেছনে তাকালো। বটগাছে হেলান দিয়ে কথাগুলো বললো সাইর। তুলি রেগে হাঁটা শুরু করলো। সাইর দ্রুত গিয়ে তুলিকে পাঁজা কোলে তুলে নিলো। দাঁতে দাঁত চেপে বলল„ —“খুব শখ তোমার আমার থেকে পালানোর তাই না? চলো তোমার শখ আমি পূর্ণ করবো।”

তুলি নিচে নামার জন্য হাত-পা ছোটাছুটি শুরু করলো। কিন্তু সাইরের শক্তির কাছে তা খুব নগন্য। খুপরিতে গিয়ে শুয়েই দিলো তুলি তার পাশে সেও শুয়ে পরলো নিমিষেই। তুলির শাড়ি ভেদ করে পেটে হাত রাখলো সাইর। তুলির নিজের সাথে আড়ষ্ট করে মুখ গুঁজে দিলো তুলির এলোমেলো চুলে। তুলি নিজেকে ছাড়ানোর অনেক চেষ্টা করলো। শেষে ব্যর্থ হয়ে সাইরের বুকে লেপ্টে গেলো। ঘুমের দেশে পারি দিলো রজনী ফুরবার আগেই।

সৈয়দ মারিয়াহ্ হামিদ 🕊️

[ ভুল-ভ্রান্তির সম্ভাবনা আছে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। পর্বটি কেমন হয়েছে অবশ্যই জানাবেন কিন্তু। আর আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে পর্ব পরো দিবো। এর থেকেও বড়ো কিন্তু একদিন পরপর গল্প দিবো। এখন আপনারাই বলেন নিয়মিত গল্প নিবেন নাকি বড় পর্বের আশায় একদিন পরপর গল্প নিবেন? আমি যেহেতু কাজের মানুষ তাই একদিন পর গল্প দিলে আমার নিজেই ভালো হবে। এখন সিদ্ধান্ত আপনাদের। হ্যাপি রিডিং। ভালো থাকবেন‚ সুস্থ থাকবেন‚ ধন্যবাদ ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here