#চূর্ণচূড়ায়_চাঁদের_পাহাড়
লেখনিতে— #সৈয়দ_মারিয়াহ্_হামিদ
৭.
জঙ্গলের পথ ছেরে চিকন সরু ধানের জমির আল দিয়ে হাঁটতে লাগলো তুলি আর সাইর। তুলির কোলে চুপটি করে বসে রয়েছে মধু। সরু আল দিয়ে আসতে পারছে না সে। কখনো এপাশ‚ নয়তো ওপাশ পরে যাচ্ছে। তাই তুলি মধুকে কোলে নিয়েছে। সাইর তুলির পেছনে পেছনে তাকে অনুসরণ করছে।
একটা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালো তুলি। ফোঁস করে নিশ্বাস ছেড়ে হাত দিয়ে ইশারা করে বলল„ —“এই যে আমার বাবার ছোট্ট সংসার।”
সাইর তাকালো সামনে। কলার ছোতরে ঘেরা বেড়ার মতো বাড়িটা। তুলি সামনে গিয়ে বেড়া ঠেলে ভেতরে ঠুকলো। সাইর এদিকে সেদিকে তাকালো। তুলি ডাকলো„ —“আসুন।”
সাইর ভেতরে গেলো। মধু দৌড়ে গিয়ে রান্নাঘরে থাঁক থেকে একটা নেকড়া টেনে বের করলো। মুখে নিয়ে তুলির সামনে গেলো। তুলি নেকড়াটা হাতে নিয়ে ঝারা দিতেই চাবি বেরিয়ে এলো। সাইর মধুর কাজগুলো অবাক হয়ে দেখছে। ঘরে তালা দেওয়া আছে আর চাবিটা কোথায় আছে সেটাও সে জানতো। আবার তুলি বাড়িতে আসা মাত্র কত সুন্দর করে না বলার আগেই চাবিটা বের করে এনে দিলো। সাইর সামনে তাকালো তুলি ততক্ষণে দরজার তালা খুলেছে। ঘরে ঢুকতেই কয়েকটা মাকড়সা এদিক থেকে সেদিকে দ্রুত পালিয়ে গেলো। তুলি পেছনে ফিরে বলল„ —“আপনি এখানে থাকুন। অনেক দিন হলো মা বাড়িতে নেই তাই একটু পরিষ্কার করতে হবে।”
সাইর ছোট করে উত্তর দিলো„ —“আচ্ছা।”
সাইর বারান্দার চৌকিতে বসলো। তুলি ঘরের ভেতরে গিয়ে ঝাড়ু দিয়ে পুরো ঘরটা ঝাড়লো। শাড়ির আঁচলটা কোমড়ে গুঁজে নাকে-মুখে কাপড় চেপে ঘর ঝাড়লো তুলি। ঘর পরিষ্কার করার পরে মাথা ভর্তি মাকড়সার জাল নিয়ে বেরিয়ে এলো তুলি। মধু সাইরের সাথে চৌকিতে বসে আছে। তুলিকে এমন অবস্থায় দেখে সাইর হাসলো। মধু লাফ দিয়ে তুলির পাশে গিয়ে গা ঘিষলো। তুলি বুঝতে না পেরে নিচে ঝুকলো মধুর সম্মুখে। মধু তার মুখ দিয়ে তুলির মাথায় মাকড়সার জাল টানতে লাগলো। সাইর মধুর এমন কান্ড দেখে উঠে তুলির কাছে গেলো। হাত বাড়িয়ে দিতেই তুলি সরে গেলো। সাইর অকপটে জিজ্ঞেস করল„ —“আমাকে যখন সহ্য করতেই পারো না তাহলে এভাবে আশ্রয় দিলে কেন?”
তুলি চাপা স্বরে বলল„ —“আপনি আমার জন্যই বাড়ি ছেড়েছেন। নূন খেলে গুনগান গাইতেই হয়।”
সাইর জিজ্ঞেস করল„ —“তোমার কি মায়া হয় না নিজের জীবনের প্রতি?”
তুলি সাহস জুগিয়ে বলল„ —“আমার কাছে ১৭টা দিন সময় আছে। এর আগে তো আপনি আমার কিছু করবে না।”
সাইর সম্মতি দিলো„ —“তা ঠিক বলেছো।”
তুলি সাইরের দিকে তাকালো„ —“ডাঙায় বসে কোনো দিন কুমিরের সাথে শত্রুতা হয় না। শত্রুতা করতে হলে পানিতে নেমে সমানে সমানে করতে হয়।”
সাইর হাসলো„ —“তুমি আমার সাথে লড়বে?”
তুলি চুপ রইল। সাইর তুলির মাথার দিকে তাকিয়ে বলল„ —“তোমার মাথায় মাকড়সার জাল। মধু সেটাকে সরিয়ে দিতে চেয়ে পারছে না। তখন আমি সরিয়ে দিলে কি কোনো সমস্যা হবে?”
তুলি হাত দিয়ে নিজের মাথার আবর্জনা পরিষ্কার করলো। সাইর কিছুই বললো না দূরে গিয়ে আবারও চৌকিতে বসলো। তুলি উঠে কলপারে গেলো সাথে মধুও। কল ঠেসে পানি দিয়ে হাত-মুখ ধুলো তুলি। বেরিয়ে এসে সাইরকে বলল„ —“হাত-মুখ ধুয়ে আসুন। গরিবের ঘরে এক মুঠো মুড়ি আছে। সেটাই খাবেন না হয়?”
সাইর উঠে কলপারে গেলো। কিন্তু কল না ঠেসে সে ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলো। তুলি মাটির পাতিলের ঢাকনা সরিয়ে মুড়ি নিয়ে এলো। একটা থালায় মুড়িটুকু ঢেলে নিলো। বাড়ির পেছনের ঝালের গাছ থেকে দু’টো ঝাল নিয়ে এলো। মুড়িতে ঝাল‚ পেঁয়াজ আর সরিষার তেল মিশিয়ে মেখে নিলো। সাইরকে কলপারে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হাত দিয়ে ইশারা করলো„ —“কি হয়েছে?”
সাইর আদেশ করলো„ —“তুলি তুমি জানো আমি কল ঠেসতে পারি না। তুমি একটু কলটা ঠেসে দাও।”
তুলি বিরক্ত হলো„ —“এটা আপনাদের জমিদার বাড়ি না। এটা একজন স্কুল মাস্টারের বাড়ি সুতরাং এখানে থাকতে হলে নিজের কাজ নিজেকেই করতে হবে।”
তুলি মুখ বাঁকিয়ে চলে গেলো। সাইর দুষ্টু হাসলো। কল ঠাসতে নিলেই হাত পিছলে কলপারে পরে গেলো সে। ব্যথায় চিৎকার করল„ —“আহহহ।”
তুলি ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। দ্রুত পায়ে সাইরের কাছে গেলো„ —“কি হয়েছে আপনার? কোথায় ব্যথা পেয়েছেন? মুখে তো বড় বড় কথা বলতে পারেন? আর কাজের বেলা? অকর্মার ঢেঁকি।”
তুলি থামলো। কাকে কি বলছে সে? সে ঐ লোকটা যার জন্য মায়া করছে সে। হাত ধরে টেনে তুলল সাইরকে। নির্লিপ্ত কণ্ঠে বললো„ —“মাফ করবেন। আবেগের বসে এতকিছু বলে ফেলেছি। মাফ করুন।”
সাইর তাকালো তুলি দিকে„ —“আচ্ছা তুলি আমি কি মানুষ নই? আমার কি মন নেই? আমার কি আবেগ হয় না?”
তুলির সেদিনের রাতের কথা চোখের সামনে ভেসে উঠলো। চট করে উঠে দাড়ালো সে। হকচকিয়ে বলল„ —“নাহ। না আপনি মানুষ‚ আর না আপনার মন আছে। আবেগ তো সেখানে চুনোপুঁটি। আপনি নরখাদক। মানুষকে আপনার মায়ায় জড়িয়ে চূড়ায় নিয়ে গিয়ে তাদের সাথে অসভ্যতামি করেন। নিজেকে পশু বানানোর জন্য আপনি সবকিছু করতে পারেন।”
মুহুর্তেই রেগে গেলো সাইর। দ্রুত উঠে এক হাতে তুলির চুলগুলো মুষ্টিবদ্ধ করে নিলো। অন্য হাতে তুলির থুতনি চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলল„ —“আমি পশু হতে চাই কিংবা নরখাদক। তাতে তোমার কোনো সমস্যা নেই। আমার শেষ বলী তো তুমিই হবে। ভালোই ভালোই আমার সঙ্গে থাকো নয়তো কাঁচায় চিবিয়ে খেতে সময় লাগবে না আমার।”
সাইর তুলিকে দূরে সরিয়ে দিলো। ছিটকে মাটিতে পরে গেলো তুলি। সাইর বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো। তুলি উঠে চৌকিতে গিয়ে বসলো। পাশেই থালা ভর্তি মুড়ি মাখিয়ে রাখা হয়েছে। রাগে‚ ক্ষোভে হাত দিয়ে থালাটা ছুঁড়ে ফেলল আঙিনায়। দিক-বিদিক ছড়িয়ে গেলো মুড়িগুলো।
দুপুর হতেই জমিদার বাড়ি থেকে বরযাত্রী তৈরি হলো শহরে যাবার উদ্দেশ্যে। ট্রেনে করে পালকি নিয়ে যাবে জমিদার বাবু। কয়েক জন লোককে পাঠিয়েছিলো সাইরকে খুঁজে আনতে কিন্তু তারা সাইরকে পায় নি। ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছে জমিদার বাড়িতে। নির্ঘাত বিয়ের জন্য ট্রেন ছুটে যাবে নয়তো একেকটাকে চিপকে চাবুকের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত করে দিতো।
বিকাল বেলা হতেই শহরে পৌঁছে গেলো জমিদার বাড়ির সকল আত্মীয়রা। রঞ্জু মোল্লার বাড়িতে পৌঁছেছে বিকাল ৪টাই। বিয়ে ও যাবতীয় কাজ দিয়ে ২ঘন্টা সময় কেটেছে তাদের। কতশত আত্মীয়-স্বজন তাদের। বিয়ে উপলক্ষে সকলেই এসেছে। খাওয়া-দাওয়া আনন্দ উৎসব সব মিলিয়ে মাখো-মাখো পরিবেশ। সহিনী আর সাজাদের বিয়ের কাজ শুরু হলো। সকলেই তাদের নতুন জীবনের সাক্ষী হলো। বিভিন্ন লোকজন তাদের দোয়া-দাওয়া করে গেলো। পালকিতে বউ নিয়ে স্টেশন অব্দি ঢোলায় করেছে পালকি বাহকেরা। তারপর ট্রেনে করে পৌঁছেছে আগরতলান সেই জমিদার বাড়িতে। তখন চারদিকে প্রায় মাগরিবের আযান পরেছে।
রাত হয়েছে তবুও তুলি চৌকি থেকে নড়ে নি। মধুও তার পাশেই বসে আছে। হাত-পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে তুলির কোলে মাথা রেখে। তুলি হাত বুলিয়ে দিচ্ছে মধুর মাথায় আর মধু কান নাড়িয়ে নাড়িয়ে সম্মতি জানাচ্ছে তুলিকে।
মধুকে রেখে ঘরে বের গেলো তুলি। এশার আযান পরেছে তখন। দুপুরে সাইরের থাক্কায় মাটিতে পরে কোমড়ে ব্যথা লেগেছে তুলির। ঘন্টা খানিক বসে থেকেও কোনো জো মেলেনি। হারিকেন জ্বালিয়ে বারান্দায় রাখলো সে। বেড়াটা এগিয়ে দিয়ে কলপারে গেলো অজু করে ঘরে এলো নামাজ পরতে। তুলি নামাজ পরছে আর মধু তার পাশে বসে থেকে যাবর কাটছে। হঠাৎই শোঁ-শোঁ শব্দ শোনা গেলো বাইরে থেকে। মধু দরজার কাছে এসে দাড়ালো। সামনে তাকিয়ে ভয়ে দৌড়ে তুলির পাশে গিয়ে গা ঘেষে ম্যাঁ ম্যাঁ করে ডাকতে লাগলো। তুলি সেজদা দিচ্ছিল। মধুকে উত্তেজনা হতে দেখে দ্রুত সালাম ফিরে নামাজ শেষ করতেই কয়েকজন লোক হুড়মুড়িয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকে পরলো। তুলি ভীষণ ভয় পেয়ে গেলো। জড়োসড়ো হয়ে বলল„ —“আপনারা? এখানে কেন?”
দুই-জন লোক তুলির পেছনে এলো আর বাকি তিনজন সামনে। তুলি আমতা আমতা করে বলল„ —“জমিদার বাবু আপনার ছেলে আমার এখানে নেই। জানি না কোথায় গেছে।”
তুলির এহেন কথায় আরও রেগে গেলো জমিদার বাবু। সাজাদ পেছনে ছিল। ইশারা করতেই পেছনের দু’জন লোক তুলির দুই হাত চেপে ধরলো। টানতে টানতে ঘর থেকে বের করলো তুলিকে। আঙিনায় তুলিকে দার করিয়ে জমিদার বাবু প্রশ্ন করল„ —“বলবি কি না? ভালোই ভালোই বল আমার ছেলে কোথায়?”
তুলি সহসায় উত্তর দিলো„ —“আমি জানি না আপনার ছেলে কোথায়?”
জমিদার পাটের চাবুক এনেছেন সঙ্গে করে। তুলির কথাটা শোনা মাত্র চাবুক মেলে ধরলেন। তুলি ভয় পেয়ে গেলো৷ জমিদার বাবু আবারও বলল„ —“বল আমার ছেলে কোথায়?”
তুলি আমতা আমতা করলো„ —“আমি জানি না।”
জমিদার একের পর এক চাবুকের আঘাত করলো তুলির নরম শরীরের ওপরে। মধু এদিক-ওদিকে ম্যাঁ ম্যাঁ করে কাউকে ডাকছে। ছুটে বেড়াচ্ছে যেখানে-সেখানে। তুলি ব্যথায় মাটিতে পরে কাতরাতে থাকলো। তবুও জমিদার থামে নি। একের পর এক চাবুকের আঘাতের রক্তাক্ত করলো তুলির শাড়ি।
বেড়া ঠেলে হাত ভর্তি বাজার নিয়ে বাড়িতে ঢুকলো সাইর। তুলিকে মাটিতে পরে কাতরাতে রেখে আশ্চর্য হলো সে। সামনে তার বাবাকে পাষণের মতো চাবুকের আঘাত করতে দেখে মস্তিষ্ক রাগে চলাচল বন্ধ করে দিলো। বাজারের ব্যাগ ফেলে চম্বুকের মতো চিপকে গেলো তুলির রক্তাক্ত দেহের ওপরে।
—“বাবা সাইরকে কেন আঘাত করছো তুমি?”
সাজাদের কথা থেমে গেলো জমিদার বাবু। চাবুক ফেলে সাইরকে ডাকলো„ —“উঠে আয়। একটা কাজের মেয়ের জন্য বাড়ি ছাড়া মানায় না। তাছাড়া বাড়িতে আজকে উৎসবের দিন। বাড়ির ছেলে বাইরে থাকলে মানায় না।”
সাইর উঠে দাড়ালো„ —“আমি যখন বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছি তখন আর যাবো না ফিরে। আর আপনি? নিজের রাগের বসে একটা মেয়ের শরীরে এভাবে আঘাত করতে পারলেন? মায়া-দয়া হয় না আপনার?”
জমিদার বাবু কিঞ্চিৎ ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল„ —“যদি মায়া-দয়া করতাম তাহলে জমিদার হতে পারতাম না।”
সাইর স্নান হাসলো„ —“আপনাদের মতো জমিদাররা গরিবদের পীষে মেরে উপরে উঠে। চলে যান এখান থেকে আমি ফিরবো না।”
জমিদার বাবু চাবুক গুছিয়ে নিলো„ —“যাবে কি না সেটা বল?”
সাইর জোড় গলায় বলল„ —“আমি ফিরবো না, ফিরবো না‚ ফিরবো না।”
জমিদার বাবু তার চাবুক চালাতে লাগলো সাইরের ওপরে। দুইবার চাবুকের আঘাত সহ্য করে তৃতীয় বার ধরে ফেললো চাবুকটি। এক টানে চাবুকটা নিজের আওতায় এনে ছুঁড়ে ফেলে দিলো বাড়ির সীমানা পেরিয়ে। জমিদার বাবু ক্রুদ্ধ হলো। রাগে চোয়ালদ্বয় শক্ত করে তেড়ে এলো সাইরের দিকে। হঠাৎই চারদিক থেকে বাতাস এসে জোড়ে সেখানে। ধুলো-বালি উড়তে লাগলো চারপাশে। ঘূর্ণিঝড়ের মতো ধুলো পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে উড়তে লাগলো। জমিদারসহ বাকি সবাই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে পরলো মাটির দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝড় থেমে গেলো কিন্তু সেখান সাইর আর তুলি কেউই ছিল না। এমনকি মধুও না। এদিক-ওদিক হন্যে হয়ে খুঁজতে লাগলো সবাই কিন্তু সাইরকে কোথাও পেলো না কেউই। ব্যর্থ হয়ে জমিদার বাবু সবাইকে নিয়ে নিজ বাড়িতে ফিরে গেলো।
চাঁদের আলোয় রক্তাক্ত দেহটা জ্বলজ্বল করছে তুলির। পাশে মধু বসে বসে কাঁদছে। সাইর সবাইকে ফাঁকি দিয়ে তুলিকে নিয়ে চূড়ায় এসেছে। জ্ঞানহীন অবস্থায় খুপরিতে পরে আছে তুলি। সাইর গরম পানি নিয়ে গিয়ে তুলির ক্ষত-স্থানগুলোকে সেঁক দিতে লাগলো। শাড়ির স্তর ভেদ করে গরম পানি উষ্ণতা পৌঁছাতে পারছে না বলে শাড়ি খুলে উন্মুক্ত করলো তুলিকে। পিঠে সেঁক দিতে লাগলো গরম পানির। ব্লাউজ সরিয়ে তুলির পিটের ডান পাশের উপরে কার্ণিশে একটা চাঁদ চিহ্ন দেখতে পেলো সাইর। হ্যাঁ ঐ চিহ্নের কথায় বলেছিল অর্কা। তাহলে কি তুলি সত্যি সত্যি আমাকে মেরে ফেলবে?
মনের কথা শেষ হতে না হতেই ধোঁয়ার কুন্ডলী উড়তে থাকলো সাইরের সামনে। সাইর হকচকিয়ে উঠলো। দ্রুত শাড়ি টেনে তুলিকে ঢেকে দিলো। ধোঁয়া থেকে আওয়াজ আসলো„ —“তোমাকে বলেছিলাম মেয়েটি যখন জেগে থাকবে তখন তার জন্ম চিহ্ন খুঁজো আর তুমি? বারবার ভুল করো কেন তুমি? আমি তোমাকে বলেছিলাম কি? শেষ করে দাও মেয়েটাকে? বলী দাও? নয়তো তুমি নিজেই তার হাতে মৃত্যুবরণ করবে।”
সাইর নিশ্চুপ হয়ে রইলো। খানিক আগেই দুপুরে সাইর একটু ব্যথা পেয়েছিলো বলে মেয়েটা কতই না আবেগ প্রবণ হয়ে পরেছিল আর সেই মেয়েটাই নাকি তাকে হত্যা করবে। সাইর প্রশ্ন করল„ —“আমার জন্য মেয়েটা অনেক কষ্ট পেয়েছে। তাকে আগে সুস্থ করতে হবে। আমি তো বলেছিলাম এই মেয়েটিকে বলি দিয়েই তোমার থেকে আমি অমরত্ব লাভ করবো।”
অর্কা রাগান্বিত হয়ে বলল„ —“তাহলে বলী দিচ্ছো না কেন? কি এতো প্রয়োজন তোমার?”
সাইর চকিতে তাকালো„ —“পূর্ণিমা আসতে এখনো ১৭ দিন বাকি আছে। আর তুমি এতো উতলা হচ্ছো কেন অর্কা? আগে তো এমন ছিলে না?”
অর্কা বিরক্ত হলো„ —“আমি তোমার কোনো ক্ষতি হতে দিতে পারবো না সাইর। আমি চাই তুমি অমরত্ব লাভ করো। পুরো দুনিয়া শাসন করো। কিন্তু যদি মেয়েটা তোমাকে হত্যা করে তখন?”
সাইর তুলির দিকে তাকালো„ —“এমন কিছুই হবে না।”
অর্কা যেন আরও রেগে গেলো„ —“আমি এতো কিছু জানি না৷ আগামী কালই মেয়েটিকে বলি দিতে হবে তোমায়।”
সাইর মাথা নাড়ালো„ —“ঠিক আছে কালই বলীর বন্দবস্ত করবো আমি।”
খুশিতে আত্মহারা হলো অর্কা। যেনো পৃথিবীর সব সুখ খুঁজে পেলো সে। ধোঁয়ার কুন্ডলী উড়িয়ে মুহুর্তেই পালিয়ে গেলো সেখান থেকে। সাইর দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তুলির জন্ম চিহ্নটা বড্ড টানছে তাকে। কাছে এসে শাড়ি সড়িয়ে হাত রাখলো চিহ্নে। মুহুর্তেই শকড লাগলো সাইরের। এক ঝটকায় চৌকি ছেড়ে উঠে দাড়ালো সে। কই তুলি তো জ্ঞানহীন পরে আছে তাহলে শকড কেন খেলো সে? সব চিন্তা ছাড়লো মধুর ডাকে। সে ম্যাঁ ম্যাঁ করে ডাকছে। সাইর কিছু একটা বলে ফু দিলো মধুর শরীরে। পরপরই মধু মানুষের ন্যায় কথা বলতে লাগলো।
সাইর হাসলো„ —“তুই এখানে থাক আমি ঔষধ আনছি।”
মধু দু’পাশে মাথা ঝাকালো। সাইর বেরিয়ে পরলো খুপরি থেকে। মধুও বেরিয়ে গিয়ে কপাটের সামনে দাড়ালো। পেছনের দুই পা মাটিতে রেখে তার ওপরে শরীরে সব ভর দিয়ে দাড়ালো মধু। যেনো সে তার মালিকের হেফাজত করছে। ছাগল হতে পারে তবে বসার ধরন ছিল রাজকীয়।
বেশ খানিক্ষন ঔষধি গাছ খুঁজেও পেলো না সাইর। রাগে কটমট করতে লাগলো সে। উঠে দুই হাত মেলে ঈগলের রূপ ধারণ করলো। আকাশে উড়ে ঔষধি গাছের সন্ধান করলো। পেয়েও গেলো খুব তাড়াতাড়ি। দ্রুত নিচে নেমে গাছের নিকট গেলো। গাছের নিচে যেতেই স্বস্তি পেলো সাইর৷ সামনে একটা পা রাখতেই গাছকে ঘেরাও করে আগুনের গোল চক্ররেখা তৈরি হলো। মায়াবী আওয়াজ এলো„ —“চলে যাও এখান থেকে। এখানে কিছুই তুমি নিজের জন্য নিতে পারবে না।”
সাইর আগ বাড়ালো„ —“আমার আপনার সাহায্যের খুব প্রয়োজন। দয়া করে আপনার বৃক্ষের ছাল যদি আমাকে দিতেন।”
আবারও মায়াবী আওয়াজ আসলো„ —“তুমি নরপিশাচ। এই বৃক্ষের কোনো কিছুই তুমি পাবে না। যদি এখান থেকে চলে না যাও তাহলে তোমাকে ভস্ম করে দেবো।”
সাইর মিনতি করলো„ —“আপনি আমার কথা শুনুন?”
এবার রাগান্বিত স্বর শোনা গেলো„ —“চলে যাও নয়তো।”
বলেই একের পর এক আগুনের তীর ছুঁড়ে মারলো সাইরের দিকে। সাইর নিজেকে বাঁচাতে ব্যস্ত হয়ে পরলো। কেনই বা গাছটি তাকে এভাবে শত্রুর ন্যায় আক্রমণ করছে। সে তো কোনো খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে এখানে আসে নি। হঠাৎই একটা তীর একে সাইরের বাম হাতের বাহুতে বিঁধল। ব্যথায় আর্তনাদ করতে লাগলো সে। ডান হাতে বাহু চেপে ধরে চোখ বন্ধ করলো। একটানে তীর বের করলো। রক্ত ছিটকে পরলো এদিকে সেদিকে। চোখ বন্ধ করে কিছু বলতে লাগলো সাইর। মুহুর্তের মধ্যে হাত স্বাভাবিক হলো। গাছটি থেকে একটা শেকড় এসে পেঁচিয়ে ধরলো সাইরকে। চোখ বন্ধ করে জোড়ে একটা ঝটকা টান দিলো সাথে সাথে গাঠের শেকড়গুলো পালিয়ে গেলো। নিজেকে বাঁচানোর সব চেষ্টায় চালাতে লাগলো সাইর। আর গাছটাকেও নিজের ক্ষমতা বুঝিয়ে দিলো যে‚ সে কতটা শক্তিশালী মানব।
সৈয়দ মারিয়াহ্ হামিদ 🕊️
[ ভুল-ভ্রান্তির সম্ভাবনা আছে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। রিচেক দিই নি সুতরাং ভুলগুলো ধরিয়ে দিবেন। আর হ্যাঁ বেশি বেশি মন্তব্য করুন নয়তো পর্ব আসতে দেরি হবে। কেমন লেগেছে জানবেন কিন্তু। আবারও ক্ষমা চাচ্ছি কেননা পর্বটা বড় হয় নি 😥 ]

