#চূর্ণচূড়ায়_চাঁদের_পাহাড়
লেখনিতে— #সৈয়দ_মারিয়াহ্_হামিদ
৬.
তুলি কে নিয়ে বেরিয়ে সোজা চূড়ায় গেলো সাইর। জমিদার বাড়ি ছিল নিস্তব্ধ ঘুমন্তপুরী। চূড়ায় উঠতে যে সিঁড়িগুলো ছিল তা মাটির তৈরি। কিছুক্ষণ পরপরই কেঁপে কেঁপে উঠছে। তুলির বেশ ভয় হলো। মনে হচ্ছে মুহুর্তের মাঝেই চূড়া ধ্বসে পরবে। সাইর আলগতে তুলিকে আরও শক্ত করে ধরে। তুলি ভয়ে আট-শাট হয়ে রইলো। চূড়ার শেষ সিঁড়িতে সাইরের পা পিছলে গেলো। তুলি চট করে সাইরের দুই বাহু জড়িয়ে নিলো। চোখ মেলে পিটপিট করে তাকালো। নাহ পরে নি তারা। তুলিকে নিচে নামিয়ে দিলো সাইর। তুলি ভয়ে জড়োসড়ো হলো। শশির সাথে ঘটিয়ে যাওয়া অতীত কি এখন তার সাথে ঘটবে? কথাটা মাথা চাড়া দিতেই দৌড়ে পালালো তুলি। তাকে বাঁচতেই হবে যে করেই হোক। এত তাড়াতাড়ি সে মরতে চায় না।
সাইর তুলিকে চেপে ধরলো নিজের বক্ষে। বাম হাতে তুলির শাড়ির ফাঁকে পেট বরাবর হাত রেখে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো তুলিকে। তুলি দুই হাত সাইরের বুকে রেখে ঠেলছে। যেন একটু হলেই সে ছাড়া পাবে এখান থেকে। তুলির এমন বোকামো দেখে হাসতে লাগলো সাইর। ডানে হাতে তুবরি বাজিয়ে ছেড়ে দিলো তুলিকে। তুলি ছাড়া পেতেই হাসফাস করছে। ছুটে পালালো মাটির ফাটা-চৌচির সিড়ির ধাপগুলোর দিকে। একটা পা সিঁড়িতে রাখতেই কিছুর সাথে থাক্কা লেগে পেছনে সরে গেলো তুলি। সামনে তাকিয়ে কাউকে দেখতে না পেয়ে আবারও হাঁটা শুরু করলো। সিঁড়িতে পা রাখতেই আবারও ছিটকে দূরে সরে গেলো তুলি।
তুলির এমন বোকামো আচরণে বেশ কতক্ষণ হাসলো সাইর। সামনে ফিরে তুলিকে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এগিয়ে এলো তার কাছে। একটু দূর থেকে ডাকলো„ —“ঐ মেয়ে?”
কোনো সাড়াশব্দ এলো না তুলির থেকে। সাইর আবারও ডাকলো„ —“আমার সাথে তোমার এত শত্রুতা কেন বুঝলাম না? ডাকছি যে কথা কানে যাচ্ছে না?”
এবারও কোনো উত্তর এলো না। সাইর রেগেমেগে তুলির কাছে গেলো। তুলিকে কিঞ্চিৎ ধাক্কার দিয়ে ডাকল„ —“এই মেয়ে?”
সাইরের স্পষ্ট মাটিতে লুটিয়ে পরলো তুলি। সাইর ভরকে গেলো। এই মেয়ে কি কোনো জাদু-টোনা জানে নাকি? দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জ্ঞান হারায় কিভাবে? মাইয়া মানষের যত্তসব ঢং।”
সাইর তুলিকে তুলে খুপরিতে নিয়ে গেলো। সাইর পুকুর থেকে একটা পাত্রে পানি আনলো। তুলির ধ্যান ভাঙলো পানির ছিটায়। শিয়রের পাশে সাইর বসে আছে। তুলি ধরফরিয়ে উঠে বসলো। সাইরকে পাশে দেখে জড়োসড়ো হলো। সাইর উঠে বাইরে গেলো। তুলি সাইরকে যেতে দেখে খুপরি থেকে বেরিয়ে এলো। চাঁদের রঙটা গাঢ় লাল দেখা যাচ্ছে। সাইর চূড়ার শীর্ষে গিয়ে চাঁদের দিকে মুখ করে তাকিয়ে আছে।
তুলি আওড়ালো„ —“এই সুযোগে আমাকে এখান থেকে পালিয়ে যেতে হবে।”
তুলি পা টিপে টিপে সিঁড়ি দিকে গেলো। সিঁড়িকে পা ফেলার আগেই মাটি আঁকড়ে এক মুঠো বালি নিলো। সামনে ছিটিয়ে দিতেই দেখতে পেলো মাকড়সার জালের মতো চূড়ার আসে-পাশে কারেন্টের ভোল্ট রাখা আছে। যার কারণে তুলি পা রাখতেই কারেন্টের শকড লেগে পেছনে ফিরে আসছিল। তুলি পুনরায় এক মুঠো বালি নিয়ে দরুদে ইব্রাহিম পাঠ করতে শুরু করলো। ১১ বার পাঠ করার পরে মুষ্টিবদ্ধ হাত সামনে এনে ফু দিলো। মুহুর্তেই সাইরের মায়াবী জাদু নষ্ট হয়ে গেলো। তুলি পেছনে তাকালো সাইর তার দিকেই তাকিয়ে আছে। তুলি দুই হাতে শাড়ি উঁচিয়ে ধরলো। অতঃপর সিঁড়ি বেয়ে দৌড় দিলো নিচের দিকে।
দুই ধাপ পার হতেই মস্ত বড় একটা ঈগল সামনে এলো তার। ভয়ে পেছাতে লাগলো তুলি। পালানোর আর কোনো রাস্তা থাকলো না তার কাছে। তুলি আবার চূড়ায় ফিরে এলো। পেছনে তাকিয়ে দেখলো সাইর নেই সেখানে। সামনে ঈগলটা জোড়ে ডাকতে লাগলো। তুলি দুই হাতে কান চেপে ধরলো। সামনে তাকাতেই দেখলো ঈগলটা আরও বড় হয়েছে। ভয়ে পেছাতে পেছাতে চূড়ার শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেলো তুলি। ঈগলটা তবুও থামছে না এগিয়েই আসছে তার দিকে। তুলি একবার উপর-নীচ চূড়া দেখে নিলো। তারপর ঈগলের দিকে তাকিয়ে চূড়া থেকে ঝাঁপ দিলো।
ঈগলটাও দ্রুত গতিতে তার পাখনা মেলে উড়তে শুরু করলো। গাছপালার আঁচড়ে তুলি আবারও ক্ষত-বিক্ষত হতে শুরু করলো। ইউকেলেকটাস এর গাছগুলো মনে হলো তাদের ডালপালা দিয়ে তুলিকে একের পর এক ক্ষত-বিক্ষত করছে। শেষে শিমুলের গাছটা মুকুলের ডগায় ফারাক হয়ে গেলো। শিমুলের গাছের ভেতরে জলন্ত আগুনের কুন্ডলী। তুলি দেখেই ভয় পেয়ে গেলো। চোখ বুজে দোয়া-দরুদ পরতে লাগলো। ভয়ের চোখে কিছুই মাথায় আসছে না তার। বহু কষ্টে সুরাতুল ইয়া-সি-ন পড়তে শুরু করলো তুলি। ব্যাস আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই কুন্ডলীতে পরে যাবে তুলি আর এখানেই হয়তো তার মৃত্যু নিশ্চিত। জলন্ত আগুনের কুন্ডলীতে পরলে কেউ জীবিত থাকবে না। কুন্ডলীতে পরার শেষ মুহুর্তে ঈগলটা এসে তুলিকে তার হেফাজতে নিলো। ছো মেরে উড়াল দিলো আকাশের দিগন্তে। তুলি চোখ খুলে নিজেকে আকাশের উড়তে দেখে জ্ঞান হারালো।
চারদিকে ফজরের আযান পরেছে। আযানের ধ্বনি কানে আসতেই ধরফরিয়ে উঠলো তুলি। নিজেকে রান্নাঘরে অক্ষত দেখে বুকে হাত রেখে স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়লো। দুই হাত সামনে এনে উল্টেপাল্টে দেখে নিলো নতুন কোনো ক্ষতের চিহ্ন আছে কি না। না নেই। বুকে এক দলা থুতু দিয়ে বলল„ —“যাক বাবা স্বপ্ন দেখেছিলাম।”
মেঝে থেকে উঠে শাড়ির আঁচলটা মাথায় দিয়ে অজু করলো তুলি। সাদা একটা ওড়না মাটিতে বিছিয়ে ফজরের দুই রাকাত সুন্নত আর দুই রাকাত ফরজ নামাজ শেষ করলো সে। বাড়িতে আর কেউ এখনো ঘুম থেকে উঠে নি। তুলি পা টিপে টিপে দোতলায় সাইরের ঘরের দিকে গেলো। দরজার পাশে গিয়ে কান পেতে দাঁড়িয়ে রইলো। ভেতর থেকে গম্ভীর গলায় আওয়াজ আসলো„ —“লুকোচুরি করার কি আছে ভেতরে এসো?”
তুলি হকচকিয়ে গেলো। সাইর কি তার উপস্থিতি বুঝতে পেরেছে নাকি ঘুমের ঘোরে কিছু বলছে। তুলি আর একটু দরজার কাছে এগিয়ে গিয়ে কান খাঁড়া করে সাইরের কথা শুনতে লাগলো। ভেতর থেকে আর কোনো কথা এলো না। কেউ বিরবির করছে কিছু। তুলি সামনে তাকাতেই দরজার কপাট খুলে একটা হাত এসে তুলিকে নিয়ে গেলো অন্ধকার ঘরে। তুলি ভয়ে তড়পাতে লাগলো। জোড়ে জোগে চিৎকার করলো কিন্তু তার চিৎকার কারও কানে গেলো না। সাইর কিছু না বলেই তুলিকে উঠিয়ে তার খাটের উপরে রাখলো। তুলি ভযের চোটে কোনো কথা বলতে পারলো না। সাইর দরজা বন্ধ করে দিলো। ঘরের চারপাশ জোনাকিপোকারা তাদের নিজস্ব আলো দিচ্ছে। বেলি ফুলের গন্ধে ঘরটা মো-মো করছে। তুলি লম্বা একটা শ্বাস নিলো।
সাইর এসে তুলির পাশে বসলো। তুলি কিছুটা দূরে সরে যেতেই সাইর বলল„ —“আমাকে ভয় পেয়ো না। আমি তোমার কোনো ক্ষতি করবো না।”
তুলি কোনো মতেই সাইরকে বিশ্বাস করতে পারছে না। চোয়ালদ্বয় শক্ত করে বলল„ —“আমার কাছেও আসার চেষ্টা করবেন না আপনি? নয়তো আপনার সব গোপন কথা আমি সবাইকে বলে দিবো?”
সাইর হাসলো„ —“কি বলবে তুমি?”
তুলি সাহস সঞ্চয় করে বলল„ —“আপনি একটা নরখাদক। ৯৯টা নারীর মধু সুধা পান করে তাদেরকে হত্যা করেছেন। আর আর তাদের রক্ত‚ কলিজা চিবিয়ে চিবিয়ে খেয়েছেন।”
সাইর হাসলো„ —“তুমি যদি আমার পরিবারের কাছেই যেতে না পারো তাহলে বলবে কিভাবে শুনি?”
তুলি বোকার মতো তাকিয়ে রইলো সাইরের দিকে। সাইর মধ্যমা আঙুল তিনবার গোল গোল ঘুড়িয়ে একটা অবয়ব তৈরি করলো। তারপর তুলিকে ইশারা করলো। তুলি বুঝতে না পেরে বলল„ —“এটাকে দিয়ে কি করবো আমি?”
সাইর ইশারা করলো„ —“একবার স্পষ্ট করে দেখো?”
তুলি উঠে গিয়ে অবয়বটা স্পষ্ট করলো। অবয়বটা হুবহু তুলির মতো দেখতে তৈরি হলো। শুধু তাই’ই নয়। সে হাঁটা-চলাও করছে‚ কাজও করছে। শুধু কথা বলছে না। তুলি অবয়বটাকে জোড়ে একটা চড় মারলো। কিন্তু অবয়বটা কিছুই বললো না‚ এমনকি ব্যথায় আহ‚ ইসও বলল না। তুলি সাইরের দিকে তাকালো। সাইর কিছু একটা বলতে বলতে হাত মুষ্টিবদ্ধ করলো। মিনিট দুয়েক পরে হাতের তালুতে লাল রঙের আবির নিয়ে ফু দিলো। তুলি জ্ঞান হারিয়ে পরে গেলো মাটিতে আর অবয়বটা ব্যথায় ইশ করে উঠলো। সাইর সোজা হয়ে আদেশ দিলো„ —“এখন তুমিই তুলি। যাও বাড়ির প্রতিটি কাজ-কর্ম বুঝিয়ে করতে শুরু করবো। খবরদার কোনো কথা বলবে না।”
তুলির চলে গেলো। তুলি না‚ তুলি মতো দেখতে অবয়বটা চলে গেলো সাইরের আদেশ পাগল করতে। সাইর দরজা বন্ধ করে দিতেই ধোঁয়ার কুন্ডলী উড়তে শুরু করলো। ভেতর থেকে আওয়াজ আসলো„ —“এসব কি করছো তুমি সাইর? তোমাকে বলেছিলাম মেয়েটার শরীর থেকে চাঁদ চিহ্ন খুঁজে বের করতে আর তুমি? ক্ষণে-ক্ষণে তাকে বেহুশ করছো? তোমাকে বলেছিলাম যা করবে সজ্ঞানে করো?”
সাইর বিনীত স্বরে বলল„ —“জ্ঞান থাকা অবস্থায় কোনো মেয়ে একটা পুরুষকে তার শরীরে হাত দেওয়ার ক্ষমতা রাখে না৷ সেখানে আমি কিভাবে ঐ মেয়ের জন্ম চিহ্ন খুঁজবো?”
কুন্ডলী থেকে আওয়াজ আসলো„ —“যদি নাই পারবে তাহলে মেয়েটিকে বাঁচালে কেন? বেশ তো আমি মেয়েটিকে গিলে নিচ্ছিলাম তখন তুমি বাঁচালে কেন মেয়েটিকে?”
সাইর স্তব্ধ হলো। তখন শিমুল বৃক্ষে অর্কা ছিল। তুলির কাজকর্মে রাগান্বিত হয়ে তাকে আগুনের কুন্ডলীতে গিলে নিচ্ছিল ঠিক তখনই সাইর ঈগলের বেসে এসে তুলিকে বাঁচিয়ে নিয়েছিল। সাইর মাথা নিচু করলো„ —“তুমি তো বলেছিল মেয়েটিকে বলী দিতে হবে?”
অর্কা আরও রেগে গেলো„ —“তোমাকে বলেছিলাম আমার কথা মতো চলতে। মেয়েটিই তোমাকে বিনাস করবে সাইর? সময় থাকতে শুধরে যাও?”
সাইর অনুতপ্ত হলো„ —“আমাকে কি করতে হবে বলো?”
অর্কা হাসলো„ —“তুমি মেয়েটির সাথে অভিনয় করো। প্রেমের অভিনয়‚ ভালোবাসার অভিনয়। তারপর তার সর্বত্র কেঁড়ে নিয়ে তাকে চূর্ণচূড়ায় চাঁদের পাহাড়ে নিয়ে এসো। তার অন্তিম সংস্কার করে তোমার অমরত্ব লাভ হবে।”
সাইর একবার তুলির দিকে তাকালো। মায়াবী উজ্জ্বল মুখখানা চুপসে পরে আছে মেঝেতে। মেঝের মাটি তাকে আলিঙ্গন করছে। সাইর মাথা উপর-নিচু করে সম্মতি জানালো। অর্কা আবারও বলল„ —“ভুলেও মেয়েটির সামনে নিজের রূপে আসবে না। আমি যে তোমাকে চিল শক্তি দিয়েছি তা তুমি বিপদে কাজে লাগাতে পারো। এভাবে শক্তির অপচয় করো না।”
সাইর ছোট করে উত্তর দিলো„ —“আচ্ছা।”
অর্কা সেখান থেকে বিদায় নিলো। সাইর উঠে বাইরে গেলো। দরজার কপাট পেরিয়ে মস্ত বড় তালা ঝুলিয়ে দিলো বালায়। নাক বরাবর সোজা হেঁটে সাজাদের ঘরে গেলো সে। বাইরে থেকে দরজায় টোকা দিতে দিতে ডাকল বার কয়েক„ —“ভাইয়া? ভাইয়া ঘুম ভাঙেনি তোমার? জরুরি কথা ছিল তোমার সাথে?”
সাইরের ডাকাডাকিতে উঠে পরলো সাজাদ। দরজার কপাট খুলে লম্বা একটা হাই তুলে আড়মোড়া ভাঙলো শরীরের। সাইরকে চিন্তিত দেখে ভ্র উঁচিয়ে প্রশ্ন করল„ —“কি ব্যাপার সকাল ছ’টা বাজতেই এত তাড়া কেন?”
সাইর ভেতরে এসে সজোড়ে দরজা লাগিয়ে দিলো। সাজাদকে ধরে নিয়ে বিছানায় বসালো সেও বসলো। বলল„ —“ভাইয়া তোমাকে আমি বলেছিলাম মেয়েটার কথা? তুমি কি জানতে চাও মেয়েটা কে?”
সাজাদ তাকালো সাইরের দিকে। অকপটে বলল„ —“মেয়েটা তুলি। আমাদের বাড়িতে নতুন কাজে এসেছে।”
সাইরের মুখখানা চুপসে গেলো„ —“ভাইয়া তুমি জানতে?”
সাজাদ সোজা তাকালো সামনে„ —“জানতাম না শুধু অনুমান করেছিলাম। কিন্তু কাল রাতে তুই চুপিচুপি রান্নাঘরে গিয়ে তুলিকে নিয়ে বাইরে গিয়েছিলিস তখনই বুঝেছি ঐ মেয়েটাই আসলে তুলি।”
সাইর তার হাত দিয়ে নিজ উরুতে থাবা দিলো„ —“যাক তুমি যখন জেনেছো তাহলে চিন্তা মুক্ত হলাম। এখন তুমি যে করেই হোক বাবাকে একটু রাজি করাও যাতে সহিনী ভাবি আর তোমার বিয়ের সাথেই আমার আর তুলির বিয়েটা হয়।”
সাজাদ রেগে গেলো„ —“সকাল সকাল এসব কি বলছিস তুই? মাথা ঠিক আছে তোর? একটা কাজের মেয়ের জন্য বাবার কাছে আমি যাবো? তাও আবার তোর বিয়ের কথা নিয়ে? আর বাবা রাজি হবে এটাও তুই ভাবলি? তোর কি মনে হয় সাইর?”
সাইর হাসলো„ —“তুমি শুধু বাড়িতে জানিয়ে দাও বিষয়টা বাকিটা আমি দেখছি।”
সাজাদ ভড়কে গেলো„ —“তুই সত্যি সাইর? নাকি তুলি তোকে কোনো জাদু-টোনা করেছে? বাড়িতে বললে তোর কি অবস্থা হবে তা একবার ভেবে দেখ?”
—“কি হবে আর সি হবে না এসব আমি দেখবো না ভাইয়া। আমার যে কোনো কিছুর বিনিময়ে হলেও তুলিকে চাই। দরকার হলে পালিয়ে যাবো?”
সাজাদ হাসলো„ —“তুই পালিয়ে যাবি? একে তো কোনো কাজ করিস না তার উপর আবার একটা মেয়েকে নিয়ে পালাবি? কোথায় যাবি? কি খাবি? কোথায় থাকবি? মূর্খের মতো কথা বলিস না৷ যা গিয়ে ঘুমা।”
সাজাদ ঠেলে ঘর থেকে বের করে দিলো সাইরকে। সাইর শুধু তুলির কথা পরিবারকে বলতে চায় কিছু না৷ তারপর এখান থেকে চলে তুলিকে নিয়ে চলে যাবে সে। কিন্তু কিভাবে এই কথাগুলো পরিবারের কানে তুলবে এটাই ভাবতে লাগলো সে।
সকালের সূর্য মাথার উপরে উঠতেই সকলের তোড়জোড় বেরে গেলো। সকালের খাবার খেতে বসেছে সকলেই। রঞ্জু মোল্লা বাগদান শেষেই মেয়েকে নিয়ে শহরে গেছেন। আজ সন্ধ্যায় সাজাদের পরিবার গিয়ে বিয়ে পরিয়ে সহিনীকে তাদের বাড়ির বউ বানিয়ে আনবে। জমিদার বাড়ি নতুন করে ফুল রঙিন বানানো হয়েছে। সকলের খাবারের মাঝেই সাইর একে উপস্থিত হলো। তার বাবার সম্মুখে হয়ে দাঁড়ালো। এদিকে-ওদিক তাকিয়ে তার বাবাকে বলল„ —“আমার কিছু কথা আছে।”
জমিদার বাবু ইশারা করলেন ঘরের দিকে অতঃপর বলল„ —“ঘরে এসো শুনছি।”
সাইর বাঁধা দিলো„ —“আমি এখানেই বলবো। কথাটা সবার শোনা জরুরি।”
জমিদার বাবু বলার জন্য ইশারা করতে সাইর বলতে লাগলো„ —“বাবা আমি আমাদের বাড়ির নতুন কাজের মেয়ে তুলিকে ভালোবাসি। ওকে বিয়ে করতে চাই।”
তুলি রান্নাঘর থেকে তরকারির বাটি আনছিল। খাবার টেবিলের সামনে এসে সাইরের কথাটা হজম করতে পারলো না৷ হাত থেকে তরকারির বাটিটা মাটিতে পরে গেলো। সাইর তাকালো সেদিকে। জমিদার গিন্নী চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে তুলি গালে সজোরে একটা চড় বসিয়ে দিলো। কিন্তু আশ্চর্য চড়টা তুলির গালে পরে নি। তার আগেই সাইর তার মায়ের হাত ধরে ফেলেছে। জমিদার বাবু রেগে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়ালো। রাগান্বিত হয়ে বলল„ —“এসব কি বলছো তুমি? তুমি ভালোবাসার কি বুঝো? একে তো এই টুকু একটা ছোকরা? কাজকাম কিছুই করো না আবার ভালোবাসা?”
সাইর তার মায়ের হাত ছেড়ে দিলো„ —“আমি এতকিছু জানি না। আমি তুলিকে ভালোবাসি আর তুলিকেই বিয়ে করবো তাও আজকেই।”
তুলির হাতটা খপ করে ধরে নিলো সাইর। গটগট করে পা তুলে দরজার দিকে গেলো তুলিকে টানতে টানতে। তুলি কি করবে কিছুই বুঝতে পারছে না। জমিদার বাবুও ছেলেকে বাঁধা দিলেন না। জমিদার গিন্নী রাগান্বিত চোখে তাকিয়ে ছিল দরজার দিকে। এই হয়তো মেয়েটিকে বাইরে রেখে সাইর ভেতরে আসবে। কিন্তু না তাকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে সাইর চলে গেলো বাড়ি ছেড়ে। সাজাদ তার বাবার উদ্দেশ্যে বাণী ছুড়ল„ —“বাবা ওরা তো চলে গেলো?”
জমিদার বাবু টেবিলে একটা থাবা দিলেন„ —“পেটে টান পরলে আবার আমার কাছেই আসতে হবে। দেখি কতদূরে যেতে পারে। আমি তোমার বিয়ের আগে কোনো ঝামেলা চাই না। তুমি তোমার বিয়ের যাবতীয় কাজ পালন করো বাকিটা আমি দেখছি।”
সবাই নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত হয়ে পরলো। সাইর তুলিকে নিয়ে জমিদার বাড়ির পেছনে জঙ্গলের দিকে ঢুকেছে। জঙ্গলের শেষে এসে এক ঝটকায় নিজের হাত সাইরের থেকে ছাড়িয়ে নিলো তুলি। রেগেমেগে বলল„ —“এসব কি করছেন আপনি? আমি কি বুঝি না আপনি আমাকে বলী দিতেই এত ধান্দা করছেন? সেখানে এত নাটক করার কি আছে। নিন আমাকে আপনার করে বলী দিয়ে দিন?”
সাইর চুপ রইলো। তুলি আবারও জোড় গলায় বলল„ —“কি হলো নিন। আমাকে চূড়ায় নিয়ে গিয়ে আপনার মনস্কামনা পূর্ণ করুন।”
তুলির জোড় গলায় কথা বলতে শুনে হঠাৎই একটা ছাগল দৌড়ে এলো। তুলি মধুকে তার দিকে আসতে দেখে হাটু গেরে বসে দুই হাত বাড়িয়ে দিলো। মধু এসে তুলির কোল দখল করলো। তুলি মধুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল„ —“কেমন আছিস রে মধু? মা কেমন আছে?”
মধু ম্যা ম্যা করে কিছু বলছে। তুলি বুঝতে না পারলেও হুম হ্যাঁ বলছে। কিছুক্ষণ পরেই একটা বাচ্চা মেয়ে এলো। ৬-৭বছর বয়সী হবে। সে এসেই মধুকে ছিনিয়ে নিলো তুলির কোল থেকে। বলল„ —“আমার ছাগলকে তুলি ছুয়েছো কেন?”
তুলি আশ্চর্য হলো„ —“তোমার ছাগল?”
কিছুক্ষণ পরে একটা মহিলা এলো। তুলি দেখে চিনতে পারলো। এ তো এদের গায়ের পারুল। তুলিকে দেখে পারুল বিষম খেলো„ —“তুলি তুই বেঁচে আছিস?”
তুলি বিব্রত হলো„ —“হ্যাঁ খালা।”
পারুল চিন্তিত মুখে বলল„ —“তাহলে তোর মা যে বলল তুই মরে গেছিস?”
তুলি যেন আসমান থেকে পরলো। তার একটি বারের জন্য মনে হয়নি যে মাধুরী তাকে মৃত্যু ঘোষণা করবে। তুলিকে চেয়ে থাকতে দেখে পারুল বলল„ —“গত হপ্তায় তোর ছাগলকে আমাদের কাছে বেঁচে শহরে গেলো তোর বাবা-মা?”
তুলি মধুর দিকে তাকালো„ —“খালা তুমি মধুকে কত কড়ি দিয়ে কিনেছো?”
পারুল তাকালো মধুর দিকে„ —“তিনশ কড়ি দিয়ে?”
তুলি তাকালো পারুলের দিকে বলল„ —“আমি মধুকে ফিরিয়ে নেবো? কত কড়ি দিতে হবে বলো?”
পারুল চিন্তিত ভঙ্গিমায় বলল„ —“তিনশ কড়িতে কিনেছি আর হপ্তাই খাইয়ে দাইয়ে পঞ্চাশ কড়ি হবে। এক কাজ কর তুই তিনশ পঞ্চাশ কড়ি দিয়ে তোর ছাগলকে নিয়ে যা।”
তুলি আওড়ালে„ —“তিনশ পঞ্চাশ কড়ি।”
সাইর তার পকেট থেকে দুইশ কড়ি বের করে মহিলাটির হাতে দিলো আর বলল„ —“বাকি টাকা কাল-পরশুর মধ্যে পেয়ে যাবেন?”
পারুল মধুকে তুলির হাতে দিলো। তুলি খুশিতে মধুকে কোলে তুলে নিয়ে চুমু খেলো। পারুল আর ছোট বাচ্চাটি চলে যেতেই তুলি বলল„ —“আপনি কেন এত গুলো কড়ি দিতে গেলেন?”
সাইর সামনে হাঁটতে শুরু করলো„ —“দিতে মন চাইলো দিয়েছি।”
তুলি তাকালো সাইরের দিকে„ —“এখন কেথায় যাবেন? বাড়ি থেকে তো বেরিয়ে এলেন?”
সাইর চিন্তিত হলো। সেটাই তো? এখন কোথায় যাবে সে? এখন তো আর সে একা নয় সাথে তুলি আর মধুও রয়েছে। সাইরকে চিন্তিত দেখে তুলি বলল„ —“চলুন আমাদের বাড়ি। বাবা-মা যখন শহরে গেছে তাহলে বাড়ি নিশ্চয়ই ফাঁকাই আছে। আপনি সেখানেই থাকবেন চলুন।”
সাইর ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল„ —“আপাতত একটু শান্তি পেলাম।”
সৈয়দ মারিয়াহ্ হামিদ 🕊️
[ দেরিতে পর্ব দেওয়ার জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী। বড় পর্ব দিতে গিয়ে একটু বেশি দেরি করলাম। আর হ্যাঁ এবারের পিকটা গল্পের সাথে সাদৃশ্য। আগের পিকটা আমি অন্যমনস্ক হয়ে দিয়েছিলাম। পাঠকের জানার আগ্রহ থেকে আমি গল্প মোতাবেক এবারের পিকচারটা সেইভ করলাম। চাঁদটা অর্কা যে কিনা বারংবার সাইরকে তার কাছে টানছে। আর হাতটা সাইরের যদিও মেয়েদের হাতের মতো লাগছে কিন্তু এখানে ঈগলের নখ আর সাইরের হাত হিসেবেই ধরেছি আমি। আর ফুলটা হলো তুলি। যে কিনা অর্কা আর সাইরের মাঝে একটা দেওয়াল। দেওয়াল কেন বললাম তা আগামী পর্ব অবশ্যই জানতে পারবেন। আমি চেয়েছিলাম তুলি নিজের জীবন শেষ করার আগ মুহুর্তে সাইরকে খুন করবে। কিন্তু কমেন্ট বক্সে একজন বলেছিল যাতে হ্যাপি এন্ডিং দিই তাই আপাতত তাদের দুজনের মৃত্যুতে আপনারা কষ্ট পাবেন। এজন্য তাদের কোনো ক্ষতি করবো না। তবে হ্যাঁ অনেক টুইস্ট তো থাকছেই এদের মাঝে। সেগুলো না হয় ধীরে ধীরে পড়বেন কেমন? আজকের পর্ব কেমন হয়েছে অবশ্যই জানাবেন কিন্তু? রিচেক দিই নি ভুল থাকতে পারে মাফ করবেন। ভালো থাকবেন‚ সুস্থ থাকবেন‚ ধন্যবাদ ]

