#চূর্ণচূড়ায়_চাঁদের_পাহাড়
লেখনিতে— #সৈয়দ_মারিয়াহ্_হামিদ
১৩.
সকাল হতে চলল প্রায়। কৌশলী অপরূপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তুলির দিকে। পাশে বসে তুলির মাথা হাত বুলিয়ে দিতেই কৌশলীর হাত থেকে সাদা রস্মি বেরিয়ে পরলো। রাতের অন্ধকার সরিয়ে খুপরিটা আলোকিত হলো দিনের বেলার মতো। কৌশলী বিচলিত হলো। হঠাৎই তার শক্তি কেন তুলির ওপরে কাজ করতে শুধু করলো? সে তো তার শক্তি তুলির ওপরে প্রয়োগ করে নি? তাহলে এটা কি হলো?
বিরক্তিতে কুঁচকে গেলো কৌশলী। তুলির দিকে তাকাতেই দেখলো নীল শরীরটা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। গলায় লাগানো সংমিশ্রণ দাবাইটা শুঁকিয়ে গেছে। কৌশলী ধীরে ধীরে দাবাইটা তোলার চেষ্টা করলো। শুঁকিয়ে জমাট বেঁধেছে গলায়। আলতো টান দিতেই তুলি নড়েচড়ে উঠলো হয়তো ব্যথা পেয়েছে। কৌশলী ধীরে ধীরে দাবাইটা তুলে নিলো তুলির গলা থেকে। গলার ক্ষতটা যেন আরও তাজা হলো তুলির। কৌশলী তুলির ক্ষতস্থানে হাত রেখে কিছু পরতে লাগলো বিরবির করে। কৌশলীর পরীর শক্তিতে সাদা আলোর মিশ্রণে তুলির ক্ষত সেড়ে গেলো।
কয়েক মিনিটের ব্যবধানে তুলি চোখ খুললো। সামনে কৌশলী কে দেখে ধরফরিয়ে উঠে বসলো। ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে বলল„ —“কে তুমি? এখানে কিভাবে এলে? ঐ হাত? ওটা কি ছিল? আমাকে মারতে কেন চায়?”
কৌশলী আশ্বাস দিলো„ —“ভয় পেয়ো না। আমি কৌশলী। সাইর আমাকে এখানে এনেছে।”
তুলি চকিতে তাকাল„ —“চলে যাও তুমি? আমার কারও সাহায্য লাগবে না। মরতে দাও আমাকে। মরে গেলেই সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।”
কৌশলী তুলির কাঁধের হাত রাখলো„ —“ভয় পেয়ো না। সাইর তোমার কিচ্ছু হতে দেবে না। সাইর সব সময় তোমার পাশে ছায়ার মতো আছে। কিচ্ছু হবে না তোমার।”
কৌশলীর কথার পীঠে প্রশ্ন করলো তুলি„ —“তোমাকে ঐ লোকটা কি এমন জাদু-টোনা করেছে হ্যাঁ? যার ফলে তুমি ওনার নামে সাফাই গাইছো আমার কাছে?”
কৌশলী স্মিত হাসলো„ —“জাদু-টোনা না করেও আমি যে মায়ায় জড়িয়েছি তা তুমি বুঝবে না তুলি।”
তুলি মাথা কাত করল„ —“মানে? কি বলতে চাও তুমি?”
কৌশলী সামনে তাকালো„ —“আমি পরী। ঐ আকাশে আমাদের বসবাস। মা ছিলেন পরীদের নেতৃ। আমাদের পরিবারে ছিলাম আমরা তিনজন। আমার বাবা‚ মা আর আমি। তবে মা ছিল অন্তঃসত্ত্বা। নয় মাসের জবুথুবু পেট নিয়ে পরীদের রাজত্ব শাসন করতেন তিনি। তখন আমার বয়স ছিল পাঁচ বছর। একদিন আমি আমার সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে জাদুর বিদ্যা শিখতে বের হই। সেদিনই আমার মা প্রসব করে সদ্য-জাত ফুটফুটে এক কন্যা। পরী রাজ্যে সকলেই সেদিন কত-শত উৎসব পালন করলো। বাবা রাজ্যের সকলের জন্য আমাদের রাজ দরবার খুলে দিয়েছিল। ঠিক সেই সুযোগ ব্যবহার করে রাক্ষসরা। তারা সেদিন হামলা করে আমাদের রাজ্যে। মা যুদ্ধের জন্য ঘোষণা দিলেন। খুশির তাগিদে পরী রাজ্যের সকলেই যুদ্ধের জন্য অপ্রস্তুত ছিলো। ফলে রাক্ষসদের হাতে আমাদের পরাজয় হয়। সদ্য-জাত শিশুকে আকাশ থেকে ছুঁড়ে ফেলা হয় নদীতে। আমার মাকে মেরে ফেলা হয় ঐদিন রাতে। বাবাকে ঐদিনই পুড়িয়ে মারা হয় আগুনে। রাক্ষসরা আমাদের রাজ্যকে ধ্বংস করে দেয়। একেবারে নিশ্চিহ্ন যাকে বলে।”
গাল বেয়ে দু’ফোটা নোনা পানি গড়িয়ে পরলো কৌশলীর। হাতের তালু দিয়ে চোখের পানি মুছে তাকালো তুলির দিকে। তুলির চোখ ছলছল করছে। মনে হচ্ছে তারও খুব কষ্ট। কৌশলী আবারও বলল„ —“আমাকে নিয়ে আসা হয় মর্ণ গুহায়। রাক্ষসের পুত্র রাজেন্দ্র। সে আমার সাথে অসভ্যতা করার চেষ্টা করে। আমি পরীদের রাজকন্যা ছিলাম। রূপে-গুনে হাজার গুণ সৌন্দর্য ছিল আমার। ঐ রূপের কারণে রাজেন্দ্র আমার কাছে আসতো। একদিন আমার জাদু দ্বারা তার একটা চোখ আমি পুড়িয়ে দিই। আর সেদিন সে আমার রূপ-সৌন্দর্য্য ভস্ম করে দেয়। কালো কুচকুচে দেখতে একটা পেত্নী বানিয়ে দেয় আমাকে। আর বলেছিল ঐ মর্ণ গুহায় যে কর্ণফুলী নদীর পবিত্র পানি রাখে আছে একটা পাত্রে। যদি কোনো মানুষ ওটা আমাকে এনে দিতে পারি তাহলে তার পানি পান করলেই আমার আমার সৌন্দর্য আবারও ফিরে পাবো সাথে পাবো আমার শক্তি। এভাবে ২১ বছর পার হয়ে যায় কিন্তু কোনো লোকই ঐ গুহায় থেকে ঐ পাত্র আনতে পারে না। যে যেত ঐ গুহায় তাকেই মেরে খেয়ে নিতো একচোখা রাক্ষস। কিন্তু তোমার ভালোবাসার জোড়ে সাইর আমাকে সেই পানির পাত্র এনে দিয়েছে। আমি মোহিত হয়েছিলাম সাইরের ভালোবাসা দেখে। বেশ উৎকন্ঠা হলাম সেই ভালোবাসার মানুষকে দেখার জন্য। তাই সাইরের সাথে চলে এলাম তোমাকে দেখার জন্য। তুমি খুব ভাগ্যবতী বোন।”
কৌশলী তাকালো তুলির দিকে তুলি অঝড়ে কাঁদছে। কৌশলী তুলির চোখের পাসি মুছে দিতেই কৌশলীকে জাপটে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরলো তুলি। কৌশলী তুলির মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। বলল„ —“আমার সেই ছোট্ট বোনটা থাকলে আজ তোমার মতোই বড় হতো। সেদিন যদি রাক্ষসরা আমাদের ক্ষতি না করতো তাহলে আমাদের রাজ্যও আজ অক্ষত থাকতো। সুস্থ পরিবার আমার থাকতো। হয়তো বিয়ে করতাম। একজন স্বামী পেতাম। নিজের সংসার হতো। কিন্তু ভাগ্য আমাকে তা দেয় নি। শুধু কেড়ে নিয়েছে আমার থেকে সবকিছু।”
তুলি মাথা তুলি ডাকল„ —“আপা।”
কৌশলীর যেন এই একটা অভাব ছিল। সেটাও তুলি পূর্ণ করে দিলো। সে তুলির চোখে-মুখে হাত বুলিয়ে অঝড়ে কেঁদে দিলো। তুলি কৌশলীর চোখের পানি মুছে দিলো। দুজন মিলে বসে থেকে মনে সব কথার খোলাসা করল। যত দুঃখ ছিল দুজন মিলে ভাগ করে নিলো।
সাইর খুপরিতে এসে কৌশলী আর তুলিকে একসাথে বসে গল্প করতে দেখল। সাইরকে আসতে দেখে তুলি সাইরের আসে-পাশে তাকালো। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে সাইর বলল„ —“কাকে খুঁজছো?”
তুলি উদগ্রীব হয়ে বলল„ —“মধু কোথায়? ওকে তো দেখছি না? আপনার সাথেই তো গিয়েছিল?”
সাইর এগিয়ে গিয়ে তুলিকে ধরে বিছানা থেকে নামাল। তুলিও কোনো জড়তা ছাড়ায় সাইরের হাত ধরে বিছানা থেকে নামলো। সাইর আস্তে আস্তে অতব সাবধানে তুলিকে খুপরির বাইরে নিয়ে এলো। কৌশলীও তাদের পেছন পেছন এসেছে।
বাইরে এসে তুলি খুব উত্তেজিত হলো। দৌড়ে গিয়ে তার বাবা-মা কে জাপ্টে জড়িয়ে ধরলো তার বক্ষে। তুলিকে দেখে মাধুরী খুব খুশি হয়েছে। সাইরের দেওয়া পাঁচন খাওয়ার পরে সে তার মানসিক ভারসাম্য ফিরে পেয়েছে।
তুলি তার বাবা-মাকে পেয়ে খুব খুশি হলো। তাদেরকে নিয়ে খুপরিতে গেলো। এক চৌকিতে তুলি‚ তার মাধুর‚ তার বাবা তারেক রহমান আর কৌশলী বসে গল্প করছে। সামনে মাটিতে বসে ঘসস চিবচ্ছে মধু। তুলির তার বাবা-মায়ের সাথে কৌশলীর পরিচয় করিয়ে দিলো। সবার সাথে গল্প মশগুল হয়ে সাইরের কথা একদম মনে নেই তুলির। এদিক-সেদিক খুঁজেও সাইরকে দেখদে পেলো না তুলি। আর কিছু না হোক একটা ধন্যবাদ তো দিতে পারে সে তাই না।
তুলি চৌকি ছেড়ে উঠে গেলো। মাধুরী জিঞ্জেস করল„ —“কোথায় যাচ্ছিস?”
তুলি পেছনে ফিরে বলল„ —“মা আসছি আসলে ওনি?”
কৌশলী থামিয়ে দিলো তুলিকে„ —“যাও তুলি। আমি এখানে কথা বলছি।”
কৌশলী তুলির বাবা-মায়ের সাথে কথা বলছে। আজ অনেক দিন পর সে জনসমাগমে বসে কথা বলছে কারও সাথে। এতদিন তো ঐ বাবলা গাছের কবজ থেকে বেরই হতে পারে নি সে। আজ তাকে মনে হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখি মানুষ।
তুলি খুপরি ছেড়ে বাইরে এসে এদিকে সেদিকে তাকিয়ে খুঁজতে লাগলো সাইরকে। কিন্তু সাইর তো কোথাও নেই। মন খারাপ করে তুলি খুপরিতে গেলো। তুলি চৌকিতে বসতেই মধু এসে তুলির শাড়ির আঁচল কামড়ে ধরলো। তুলি বিরক্ত হলো„ —“কি বলবি আমাকে?”
মধু কিছু না বলে বাইরে বেরিয়ে এলো। তুলিও বিরক্তি নিয়ে বাইরে এলো। মধু পাহাড়ের শেষ চূড়ার দিকে তাকিয়ে বলল„ —“যাকে খুঁজছো সে ওখানে?”
তুলির ফেঁকাসে মুখটা কিছুটা স্বস্তি পেলো সাইর আছে শুনে। কিন্তু মধু এখনো এখানেই দাড়িয়ে আছে। তুলি রাগ দেখিয়ে বলল„ —“হুহ মোটেও না। আমি কাউকে খুঁজি নি। যা তুই ভেতরে যা।”
মধু ভেতরে চলে গেলো। তুলি এক-পা দুই-পা করতে করতে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে গেলো। সাইরের দাঁড়িয়ে আছে চাঁদের দিকে মুখ করে। তুলি চূড়ায় উঠে সাইরের পাশে দাড়ালো। সাইর একবার তুলির দিকে ফিরে আবারও চাঁদের দিকে তাকালো। তুলি ইতস্তত হলো„ —“শুনছেন?”
সাইর ঠাঁই দাঁড়িয়ে বলল„ —“শুনছি বলো?”
—“আপনাকে ধন্যবাদ আমাকে সাহায্য করার জন্য।”
সাইর তুলির দিকে ফিরলো„ —“তোমার কি মনে হয়? আমি এগুলো এমনি এমনি করেছি?”
তুলি বিস্মিত হলো„ —“মানে?”
সাইর দুই হাতে তুলির বাহু চেপে ধরলো„ —“আমি তোমাকে ভালোবাসি তুলি। কেন বোঝ না তুমি? আমার এসব যা করি তোমাকে খুশি দেখার জন্য করি। তোমাকে হাসতে দেখলে আমার মনটা শান্ত হয়। তোমার চেহারায় উজ্জ্বলতা দেখলে আমার দেহটা ক্ষান্ত হয়। কেন বোঝ না তুমি?”
তুলি ব্যধিত হলো„ —“লাগছে আমার ছাড়ুন। কষ্ট হচ্ছে আমার।”
সাইর ছেড়ে দিলো তুলিকে। রাগে চোয়ালদ্বয় শক্ত করলো। রাগ সংবরণ করতে নিচু হয়ে বসে জোড়ে একটা ঘুষি মারলো মাটিতে। তুলি হকচকিয়ে উঠলো। সাইরের এমন পাগলামি সে আগে দেখেনি। কাঁপা কাঁপা ওষ্ঠে প্রশ্ন করল„ —“আপনি তো আমাকে বলীর জন্য এনেছিলেন তাই না?”
সাইরের চোখ জোড়া রক্তবর্ণ ধারণ করলো। উঠে দাড়ালো তুলির সম্মুখে। চোখের মণি রক্তবর্ণ‚ হাত বেয়ে রক্ত পরছে অনবরত। তুলি কিছুটা ভয় পেয়ে গেলো। সাইর কিছু না বলে চলে গেলো চূড়া ছেড়ে।
তুলির খুপরিতে এসেছে কয়েক ঘন্টা হবে। তিনজনে কত-শত গল্প করছে কিন্তু তুলি এক কোণে চুপটি করে বসে আছে। তার কিছু ভালো লাগছে না। মনটা খারাপ খুব। কৌশলী এসে পাশে বসলো তুলির। কাঁধে হাত রেখে বলল„ —“তুমি সাইরকে ভুল বুঝো না বোন। সাইর সত্যি তোমাকে ভালোবাসে। তুমি তাকে ভালো না বাসলেও একটু সময় দাও। দেখবে ছেলেটা একেবারে ভালো হয়ে যাবে। সে তোমার জন্য তার বাবার সঙ্গ ছেড়েছে। তোমাকে পাওয়ার জন্য অমরত্ব বিফল করেছে। তোমাকে সুস্থ করার জন্য মৃত্যুর মুখেও গিয়েছে। পরিশেষে তুমি যদি তার না হও তাহলে তুমি কেন‚ সে পুরো ধরনীও ধ্বংস করতে সক্ষম হবে।”
তুলির চোখ-মুখ মুছলো„ —“আমার একটু ভালো কথায় যদি পুরো ধরনী বেঁচে যায় তাহলে আমি তাই করবো।”
কৌশলী মুচকি হাসলো। তুলির থুতনিতে হাত রেখে বলল„ —“এই তো আমার মিষ্টি বোন।”
সাইর আর জমিদার খুপরিতে ঢুকলো। জমিদার তুলির বাবা তারেক রহমানের সামনে গিয়ে হাত জোড় করে বলল„ —“ভাই তোমার মেয়েটাকে আমার ছেলের বউ বানাতে চাই দয়া করে আর না’ করবে না তুমি?”
তারেক ধরফরিয়ে চৌকি ছেড়ে নিচে নামলো। জমিদারের হাত চেপে ধরে বলল„ —“এসব কি বলছেন আপনি? আপনার দয়াতেই আমি আজ এত দূর এগিয়েছি৷ আপনার বাড়িতে আমার মেয়ে বউ হয়ে যাবে এতো আমার ভাগ্যের ব্যাপার।”
জমিদার কান্না মিশ্রিত গলায় বলল„ —“আমার ছেলেটার জন্য তোমার মেয়ের খুব প্রয়োজন।”
তারেক তুলির দিকে তাকালো„ —“মা তুই কি রাজি।”
তুলি দুই পাশে মাথা নাড়াল„ —“হুম বাবা আমি রাজি।”
কৌশলী তুলিকে নিয়ে গিয়ে সাইরের পাশে দাড় করালো। বলল„ —“বাহ্ আমার বোনটাকে তো বেশ মানিয়েছে।”
তুলি শাড়ির আঁচল তুলির মাথা ঢাকলো। জমিদার তাদের সামনে আসতেই সাইর আর তুলি মিলে পা ছুইয়ে সালাম করলো। জমিদার দুজনের মাথায় হাত রেখে দোয়া করলো। অকপটে বলল„ —“চলুন সবাই মিলে বাড়ি যাওয়া যাক। কি বলেন বিয়াই।”
তারেক হাসলো। চোখের কোনে পানি জমেছে তার। আঙুলের টোকায় পানি ছিটকে ফেলে বলল„ —“চলুন।”
সকাল হতেই জমিদার বাড়িতে বিভিন্ন রান্নার তোড়জোড় বেরে গেলো। আজ সাজাদ আর সাইরের বিয়ের তৃতীয় দিন। নিয়ম অনুযায়ী আজকে মেয়ের বাড়ির লোকেরা আসবে বউকে নিতে। জমিদার গিন্নী সকাল থেকেই নানান কাজে ব্যস্ত। কোনো মতে সকালে একটু চিঁড়ে-মুড়ি খেয়েছে সে। এখন পর্যন্ত কাজই শেষ হচ্ছে না তার। ক্লান্ত শরীর নিয়েও কাজ করছে সে। বাড়িতে নানান কাজের লোক আছে তবুও যেন কাজই শেষ হচ্ছে না। সহিনী আর সাজাদ ভোর সকালে খেয়েছে। এখন সোয়া ন’টা বাজে। জমিদার গিন্নী জোড়ে জোড়ে ডাকতে লাগলো„ —“সাজাদ? বউকে নিয়ে বাইরে আয় খাবার বেরেছি।”
দোতলা থেকে সাজাদ উত্তর দিলো„ —“আসছি মা।”
সহিনী গোসল সেরে এসে চেয়ার টেনে বসলো আয়নার সামনে। গামছা দিয়ে চুল মুছতে মুছতে তাকালো সাজাদের দিকে। সাদা গেঞ্জির পরেছে আর কালো চেক চেক লুঙ্গি। সহিনী ভ্রু-জোড়া কুঁচকে বলল„ —“বাড়িতে লোকজন আসবে আর তুমি কি-না লুঙ্গি পরেছো?”
সাজাদ একটু দেমাগ নিয়ে বলল„ —“তুমি কি বুঝবে লুঙ্গির মজা। আর লোকজন তো এখন আসছে না। ওদের আসতে আসতে দুপুর পেরিয়ে যাবে।”
সহিনী উঠে গামছাটা দরজার কপাটে রাখলো। কাঠের আলমারি থেকে একটু টাওজার এগিয়ে দিলো সাজাদের দিকে। বলল„ —“এটা পরে না।”
সাজাদ টাওজার সমেত সহিনীকে ঘুরিয়ে নিয়ে পেছন থেকে জমিয়ে ধরলো। কানের কাছে মুখ এনে বলল„ —“সারারাত তো লুঙ্গি পরেই ছিলাম। তখন তো কোনো সমস্যা হয়নি। তাহলে দিনের বেলা কেন হচ্ছে?”
—“ভাই সেই কখন থেকে মা ডাকছে তোকে খাবি আয়ে।”
কথাগুলো বলতে বলতে ঘরে এলো সাজাদের ছোট চাচার মেয়ে সাথী। সহিনী আর সাজাদের এভাবে দেখে চোখে হাত রেখে উল্টো ঘুরলো। ভীতু কন্ঠে বলল„ —“সরি সরি সরি। আমি কিছু দেখিনি।”
সাজাদ ছেড়ে দিলো সহিনীকে। সাথীর উদ্দেশ্যে বলল„ —“তুই যা আমরা আসছি।”
সাথী চলে গেলো। সহিনী টাওজারটা চৌকির উপরে রাখলো„ —“পরে নিও এটা। আমি নিচে যাচ্ছি। মা একা একা অনেক কাজই করছে।”
সাজাদ বাধা দিলো না। সহিনী নিচে চলে গেলো। সাজাদও টাওজার পরিধান করে নিচে এলো। খাবারের টেবিলে সবাই বসেছে। তখনই বাড়ির সদর দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকলো জমিদার। জমিদারকে দেখে দ্রুত এগিয়ে এলো জমিদার গিন্নী। রাগান্বিত কন্ঠে শুধালো„ —“কোথায় ছিলে সারা রাত হ্যাঁ? তোমার কি ছেলে-মেয়েদের কথা মনে পরে না?”
হাত উচিয়ে থামিয়ে দিলো জমিদার। সবার উদ্দেশ্যে বলল„ —“আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
সাজাদ চেয়ার ছেড়ে উঠলো„ —“কি সিদ্ধান্ত বাবা?”
জমিদার পেছনে তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে ডাকল„ —“ভেতরে এসো সবাই।”
সাইর তুলির হাত ধরে বাড়ির ভেতরে আসলো। তাদের দুজনের পিছু পিছু তুলির বাবা-মা আর কৌশলীও আসলো। জমিদার বলল„ —“আমি সাইর আর তুলির বিয়ে দিবো। আজ আর এক্ষুণি।”
জমিদারের কথা শুনে সবাই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়ালো। জমিদার গিন্নীর রাগটা আরও চওড়া হলো„ —“কি সব বলছো তুমি?”
—“চুপ। একদম চুপ। আমি যা বলছি তাই করো। বিয়ের জন্য যা যা প্রয়োজন সবকিছু এখনই জোগাড় করো।”
জমিদার ভেতরে চলে গেলো। সাইর তুলি আর তার বাবা-মা‚ কৌশলীকে নিয়ে দোতলার অতিথি শালাই গেল। জমিদার গিন্নী রেগে মেগে রান্নাঘরে গিয়ে সব জিনিসপত্র ভাঙতে লাগলো। প্রচন্ড রাগ হচ্ছে তার ঐ মেয়েটাকে দেখে। ইচ্ছে করছে বটি দিয়ে এক কোপে গলা হতে মাথা আলাগা করে দিই। রান্নাঘর থেকে হনহনিয়ে চলে গেলো জমিদারের কাছে। হয়তো এই বাড়িতে সে নিজে থাকবে নয়তো ঐ মেয়েটা। আজ একটা বিহিত করতেই হবে তাকে।
সৈয়দ মারিয়াহ্ হামিদ🕊️
[ কাল বলেছিলাম গল্পটা তাড়াতাড়ি শেষ করবো এতে আপনারা মন খারাপ করেছেন। আমি সেভাবে বলিনি যে কাটছাট করে শেষ করবো। যতটুকু ভেবেছিলাম। ঠিক ততটুকু তেই শেষ করবো। তবে বড় বড় পর্ব দিয়ে পার্ট ছোট করবো এই আর কি।
আজকের পর্বটা কেমন হয়েছে অবশ্যই জানাবেন কিন্তু। ভুল-ভ্রান্তির সম্ভাবনা আছে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। রিচেক দিই নি সুতরাং ভুলগুলো ধরিয়ে দিবেন।
পরবর্তী পর্বটি পেতে লেখিকার পেইজে ফোলো দিয়ে রাখুন। আর আপনারা যারা অন্য পেইজ থেকে গল্প পরেন তারা লেখিকার পেইজ খুঁজে তাকে ফোলো দিয়েন এতে আপনাদেরই লাভ। গল্প বিষয়ে সকল আপডেট লেখিকার থেকে পেতে পারেন। ভালো থাকবেন‚ সুস্থ থাকবেন‚ ধন্যবাদ ]

