#উৎসর্গ
#পর্ব:০৪
#তানজিনা ইসলাম
রুদ্র ক্লাস বাঙ্ক দিয়ে লাইব্রেরিতে এসে বসেছে। মায়াও এসেছে ওর পিছু পিছু। রুদ্র কোথাও যাবে, আর মায়া সে আভাস ধরে সেদিকে ছুটবে না, সেটা কস্মিনকালেও হতে পারে না। মায়া গালে হাত দিয়ে ফোন দেখায় ব্যস্ত। রুদ্র বসে নোটস করছে। এ নোটসগুলো ওর। অনেকগুলো প্র্যাক্টিকালও কমপ্লিট করা বাকি। মায়ার সব নোটস, প্র্যাক্টিকাল, রিসার্চ পেপার সব কিছু গুছিয়ে দিতে গিয়ে রুদ্র নিজের কাজ করার সময়ই পায়নি। তাও আরশি প্র্যাক্টিকাল আর রিসার্চ পেপার রেডি করে দিয়েছে এদিকে একটু চিন্তা কম আছে। মায়ার সবকিছু কমপ্লিট করে ওঁকে বুঝিয়ে দেওয়া রুদ্রর দায়িত্ব। তারপর ও নিজের কাজে হাত দিতে পারবে, এর আগে না। এসব অন্যায় ছোটবেলা থেকেই হয়ে আসছে ওর সাথে। আর রুদ্র নিজের সাথে এসব অন্যায় হতে দিচ্ছে। মায়া ফোন দেখতে দেখতে একপলক তাকালো রুদ্র দিকে। আবার ফেন দেখায় ব্যস্ত হয়ে কিছু একটা ভেবে বললো
-“রুদ্র,তুই আমাকে ভালোবাসিস?”
-“হু? হঠাৎ এ প্রশ্ন?”
রুদ্র লেখায় ব্যস্ত ছিলো। তাই সে কথাটা ততটা আমলে নিলো না। মায়া আবার জোড় দিয়ে বললো
-“বল না ভালোবাসিস কি-না!”
-“বাসি তো।”
-“কীরকম? কীরকম ভালোবাসিস?”
-“বন্ধুর মতো। আমি তোকে বন্ধুর মতো ভালোবাসি।”
-“বাট আমি তো তোর বন্ধুত্বের ভালোবাসা চাই না। আমি চাই তুই আমাকে বন্ধুর চেয়েও একটু বেশি ভালোবাসিস।”
রুদ্র এবার লেখা বাদ দিয়ে ভ্রু কুচকে তাকালো মায়ার দিকে।মায়া আবার বললো
-“আমি তোর চাইল্ডহুড বেস্টফ্রেন্ড। পিচ্চি কাল থেকে আমরা একসাথে আছি, ডাইপার পরার বয়স থেকে। তুই কেন আমাকে তোর অন্য বন্ধুদের মতো ভালোবাসবি বল? তোর উচিত না আমাকে একটু বেশি ভালোবাসা?”
রুদ্র অবুঝ দৃষ্টিতে তাকালো ওর দিকে। বললো
-“আমি তোকে সবার চেয়ে বেশি ভালোবাসি মায়ু। আমার সব ফ্রেন্ডদের চেয়ে বেশি। তুই আমার কাছে সবার থেকে আলাদা।”
-“বাট সেটা বন্ধুর মতো।”
-“তাহলে তুই কেমন চাচ্ছিস?”
-“যেমনটা আমি তোকে ভালোবাসি তেমন!”
-“তুই আমাকে কীরকম ভালোবাসিস?”
-“তুই বুঝিস না? তুই একটা গাধা!”
রুদ্র কথাগুলো খুব উদাস হয়ে বলছিলো। কারণ ও লেখায় ব্যস্ত ছিলো। ওর সমস্ত মনোযোগ সেদিকে ছিলো।
মুহুর্তেই মায়া রেগে, আগুন হয়ে তাকালো ওর দিকে। রুদ্র তড়িঘড়ি করে বললো
-“আরে বাবা, হলো টা কী? এক্ষুনি তো ঠিক ছিলি?”
মায়া চকিতে উঠে দাড়ালো। রেগেমেগে বললো
-“ধুর! তোকে বোঝানোই বেকার। আমাকে মামুনির সাথে কথা বলতে হবে!”
-“কী এমন কথা, যেটা আম্মু বুঝবে কিন্তু আমি বুঝছি না!”
-“ছ্যাচড়া না আমি। বারবার সেম কথা বোঝাবো তোকে। যাহ, তুই তো একশো একটা প্রেমিকা নিয়ে থাকগা। আমার কোনো দামই নাই তোর কাছে!”
ধুপধাপ পা ফেলে লাইব্রেরির কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলো মায়া। রুদ্র অনেকবার পিছু ডাকলো,
-“এই দাঁড়া। কোথায় যাচ্ছিস! আরে, হুট করে রেগে গেলি কেনো! আমি কি দোষ করেছি!”
মায়া শুনলো না। নিজের মতো বেরিয়ে গেলো। রুদ্র কপাল চাপড়ালো। বিরবির করে বললো
-“আল্লাহ! এই পাগল কে বোঝা আমার সাধ্যি না। কোথায় যে যাবো একে নিয়ে।”
,
উত্তপ্ত দুপুরে ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে বাড়ি ফিরলো মায়া।ক্লান্ত ভঙ্গিতে সদরদরজা দিয়ে প্রবেশ করলো ও। ড্রইংরুমে সোফায় একজন বসে আছে। মায়ার বাবা মুস্তাফিজ খান কারো সাথে বসে গল্প করছেন। মায়া খেয়াল করে দেখলো রুদ্রর বাবা রুয়ান চৌধুরী এসেছেন। দুজন হেসে হেসে কথা বলছেন। মায়া খুশি হয়ে এগিয়ে গেল তাদের দিকে।মিষ্টি হেঁসে সালাম দিলো রুয়ান চৌধুরীকে। মায়ার দিকে তাকিয়ে হাসলেন তিনি।প্রগাঢ় স্বরে বললেন
-“কেমন আছ,প্রিন্সেস?”
-“ভালো আছি বাবাই। তুমি কেমন আছো? ”
-“তোমাকে দেখেই ভালো হয়ে গেছি।”
-“মামনি কে আনোনি কেন??”
-“তোমার মামনি অসুস্থ।”
-“কী হয়েছে মামনির।”আতং*কিত হয়ে জিজ্ঞেস করে মায়া।
-“আরে তেমন কিছু না। মাথা ব্যাথা করছে তাই ঘুমাচ্ছিল। ডাকিনি আর।একাই চলে এসেছি।”
তক্ষুনি মিসেস মাহেরা খান নাস্তা নিয়ে এলেন।মুস্তাফিজ খান আর রুয়ান চৌধুরী ছোটোবেলা থেকেই ঘনিষ্ঠ বন্ধু। একই কলেজেও পরেছেন দুজনে।একেবারে বেস্ট ফ্রেন্ড যাকে বলে। তাই রুদ্রর আর মায়ার পরিবারের ছোটোবেলা থেকেই ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তার সম্পর্ক।আর তাই ছোটোবেলা থেকেই দুজন একসাথেই বড় হয়েছে। দুজনের বাসার দুরত্বও মাত্র পাঁচ মিনিট।
মায়ার মা মায়ার পাশে বসলেন।চার জনই গল্প করছে। মায়া গল্পের ঝুলি নিয়ে বসেছে রুয়ান চৌধুরীর কাছে।কধার মাঝেই রুদ্রর বাবা মায়াকে বললেন-
-“প্রিন্সেস। তুমি একটু বাইরে যাওতো। আমরা বড়রা একটু কথা বলব।
মায়া মাথা নাড়িয়ে উঠে দাড়ালো।চলে গেল গার্ডেনের দিকে।মুস্তাফিজ খান চিন্তিত হয়ে বললেন
-“কী এমন বলবি যে ওকে উঠিয়ে দিলি?”
-“তোর মনে আছে, আমরা দুজন কী ওয়াদা করেছিলাম??”
-“ওয়াদা তো অনেক করেছি। তুই কোনটার কথা বলছিস।”
-“মায়া, রুদ্রর আট মাসের ছোট।আমার এখনও মনে আছে, মায়া যখন জন্ম নিয়েছিল,তখন তুই বলেছিলি আমি যেটা চায় তুই আমাকে সেটা দিবি। আমি আমার ছেলের জন্য তোর মেয়েকে চেয়েছিলাম।তুই আমাকে কথা দিয়েছিলি দুইজন বড় হলেই আমার মেয়েকে আমার ছেলের হাতে তুলে দিবি।আমি আমার মেয়েকে নিয়ে যেতে চাই।এখন ওরা দুজন বড় হয়েছে। আমরাও বুড়ো হয়ে যাচ্ছি। দুজনের বিয়েটা দেওয়ার এটাই সঠিক সময়।”
-“প্রস্তাব টা সুন্দর। কিন্তু আমাদের দুজনের মতামত টাও নেওয়া প্রয়োজন। আমরা তো আর কিছু চাপিয়ে দিতে পারি না ওদের উপর।যদিও আমি জানি মায়ার তরফ থেকে হ্যাঁ ই হবে।আমার মেয়ের ব্যাক্তিগত কেউ নেই,আমি জানি৷ তুমি কি বলো মাহেরা??”
-“অবশ্যই।আর দু’জনেই যেহেতু বেস্টফ্রেন্ড, তখন আমার মনে হয় না আপত্তি থাকবে।ভালোবাসা টা বিয়ের পর এমনিতেই হয়ে যাবে।”
-“তাহলে আমার রুদ্রর তরফ থেকেও হ্যাঁ থাকল।আমি পৌঁছে মাত্র ওর সাথে কথা বলব।”
-“তাহলে এই কথায় থাকল।ভাবি কে নিয়ে আসিস।তার সাথেই তাহলে বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করব।”
-“আলহামদুলিল্লাহ। তাহলে খুব তাড়াতাড়িই বেয়াই হতে যাচ্ছি আমরা।”বলেই জড়িয়ে ধরলেন মোস্তাফিজ খান কে।
মাহেরা খান উঠে দাড়ালেন।কিচেনে গিয়েই চটজলদি মিষ্টি নিয়ে আসলেন।রুয়ান চৌধুরী, মুস্তাফিজ খানকে মিষ্টি খাইয়ে দিলেন।
মায়ার পা দুটো স্হির হয়ে গেল৷ নিজেকে ধাতস্থ করতে সময় নিল। সে কী কল্পনা করছে?নাকি মা-বাবারা সত্যিসত্যিই ওদের বিয়ে ঠিক করেছে?মায়া গার্ডেনে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে বাড়িতে ফিরে আসছিল।কিন্তু বড়দের বলা কথা-বার্তায় থমকে দাঁড়ালো।মায়ার বুকের মধ্যে এখনো ঢিপ ঢিপ শব্দ করছে।মনের মধ্য নিজের প্রিয়জনকে একান্ত নিজের করে পাওয়ার আশা। আচ্ছা ও কী আশায় বুক বাঁধবে? নাকি এ ইচ্ছা ভেঙ্গে গুড়িয়ে যাবে। মায়া নিজেকে বুঝ দিল। আশা ভাঙবে কেন।মা-বাবারা নিজেরা ওদের বিয়ে ঠিক করেছে।মায়া যে পথে এসেছিল সে পথে আবার দৌড় দিল। একেবারে গার্ডেনে গিয়ে থামল।
ইশ!চারপাশ এতো সুন্দর লাগছে।একটু আগেই তো গার্ডেনে এসেছিল। তখন তো এত সুন্দর লাগেনি। নিজের প্রিয় মানুষ কে বিয়ে করার খুশি বুঝি চারপাশ এতো সুন্দর করে দিয়েছে।মায়া ইয়ে বলে চিৎকার করে পুরো গার্ডেনে দৌড়াতে থাকল।ভালো লাগছে,অসম্ভব ভালো লাগছে।
জমিলার মা গার্ডেনে এসেছিলেন টমেটো নিতে।জমিলার মা মুলত মায়াদের গার্ডেনে কাজ করে।মাঝে মাঝে কিচেনেও টুকিটাকি কাজ করে দেয়। মায়া দৌড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলো। হাত ধরে ঘোরাতে লাগল তাকে।
-“ম্যাডাম,পইড়া যামু তো।ছাড়েন আমারে।”
-“এই তোমাকে না কতবার বলেছি আমাকে ম্যাডাম না ডাকতে। তারপরো তুমি ডাকছো।নাম ধরে ডাকবে।বুঝেছ??”
-“না,ম্যাডাম।আফনারে নাম ধইরা ডাকতে পারমু না।আফনে আমার ম্যাডামই।কিন্তু আফনারে আজকে অনেক খুশি মনে হইতাছে।”
-“হ্যাঁ আন্টি।আজকে আমি অনেক খুশি। অননেক।”
মায়া অমায়িক হাসলো।জমিলার মাও হাসলো তার হাসি দেখে।জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন মনে করল না এত খুশি কীসের। মায়াকে তার অসম্ভব সুন্দর মানুষ মনে হয়। নয়তো তার মতো কাজের লোকের সাথেও কত সুন্দর আচরণ করে। মানুষটাকে খুশি দেখলেই ওর খুশি লাগে। মায়া জানে না সামনে ওর জন্য কী অপেক্ষা করছে। তারপরও সে এই খুশির মুহূর্ত টা অনুভব করতে চায়।
#চলবে

