#উৎসর্গ
#পর্ব:৩
#তানজিনা ইসলাম
একটা দোতলা বাড়ির সামনে মায়ার গাড়ি এসে থামতেই দারোয়ান এসে তড়িঘড়ি করে গেইট খুলে দিলো।গাড়ি চালিয়ে খান মন্জিলে ঢুকলো মায়া।।সামনে সরু রাস্তা, দুই পাশে গার্ডেন।
গাড়ি পার্ক করে সদর দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো মায়া।বেল বাজিয়ে অপেক্ষা করলো দরজা খোলার। একটি হাস্যজ্জল মুখের নারী এসে দরজা খোলে।মায়া জড়িয়ে ধরলো সেই নারীকে।উচ্ছ্বসিত স্বরে বললো
-“আম্মু!”
-“আজকে হঠাৎ এত ভালোবাসা।এত তাড়াতাড়ি চলে এসেছ যে??ক্লাস হয়নি আজকে??”
-” আমি বুঝি তোমাকে ভালোবাসি না। আর ভার্সিটিতে প্রবলেম হয়েছিল, তাই আর ক্লাস করিনি।”
-“যাওয়ার কী দরকার ছিল তাহলে??”
-“বাদ দাও তো এসব।ওয়াও এত ঘ্রাণ কীসের। বিরিয়ানি রান্না করেছ বুঝি।”
-“হ্যাঁ।” বলেই কিচেনে গেলেন মাহেরা খান।মায়া পিছু পিছু হাটলো তার।কিচেনের সামনে দাঁড়াতেই মানারা পানির গ্লাস এগিয়ে দিলেন ওর দিকে।
-“এই নাও ঠান্ডা পানি।”
-“থ্যাংক্স,আম্মু।”
পানিটুকু একচুমুকে শেষ করে সিড়ি বেয়ে দোতলায় উঠলো মায়া।ক্লান্ত পায়ে এগিয়ে গেলো তার রুমের দিকে।রুমে এসে উদাস হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে পরলো নরম বিছানার উপর। উপুড় হয়ে শুতেই কখন যে চোখ লেগে এলো টের পেলো না মায়।
ফোনের তীব্র ভাইব্রেশনে ঘুম ভাংলো ওর।বিছানা হাতরে ফোন রিসিভ করে কানে দিল। চোখ টেনে খুলতে কষ্ট হচ্ছে।ওভাবেই জড়িয়ে যাওয়া কন্ঠে বললো
-“হ্যালো। কে বলছেন??”
-আমি আপনার জামাই বলছি ম্যাম।”
-“জামাই?? কিন্তু আমার তো এখনো বিয়ে হয়নি।” ঘুমঘুম স্বরে বললো মায়া।
-“কী বলছেন এসব??দেখুন, আমি জানি আপনি রেগে আছেন।তাই বলে আপনি আমাকে আর আমার সন্তান কে অস্বীকার করতে পারেন না।”
মায়া হকচকিয়ে উঠে বসে। ঘুম এখন পুরোপুরি কেটে গেছে।ভালো করে নাম্বার টা পরখ করে দেখে,নাম্বার টা ওর চেনা।ফোনের ওপাশ থেকে উচ্চস্বরে হাসির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। ভ্রূদ্বয় গুটিয়ে ফেললো মায়া।ঝাঁঝালো স্বরে বললো
-“রুদ্রর বাচ্চা। এই ভরদুপুরে কল করে বিরক্ত করছিস কেন??”
-“প্রথমত আমার এখনো বিয়ে হয়নি,আর বাচ্চা তো অনেক দুরের কথা।আর দ্বিতীয়ত এখন সন্ধ্যা, দুপুর না।”
ফোনে টাইম চেক করে দেখো ৬ টা বেজে ৩০ মিনিট। অবাক হলো মায়া।
এতক্ষণ ঘুমিয়েছে ও। যোহর,আসর এর নামাজ কাযা হয়ে গেছে। মাগরিব এর টা পরা যাবে।তবে কেও ডাকলো না কেন ওঁকে!
ওপাশ থেকে রুদ্রর ডাকে ভাবনার সুতো কাটলো ওর।রুদ্র বললো
-“কীরে কিছু বলছিস না কেন??”
-“ঘুমিয়ে পরেছিলাম। তাই খেয়াল করিনি যে এতোটা লেইট হয়ে গেছে। তুই কল কেন করেছিস ওইটা বল।”
-“তোকে বিরক্ত করতে।”
-“হাঁদারাম।”
খট করে কল কাটলো মায়া।রুদ্র মুচকি হেসে ফোন নামিয়ে রাখে। এর মানে সকালের রাগ আর নেই। ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে ট্রেডমিল এর উপর দৌড়ে মনযোগ দেয়।জিমে আছে এখন ও।অদূরেই ওর বন্ধুরা বসে এটা ওটা বলে বিরক্ত করছে ওঁকে।
মায়া মাগরিবের নামাজ আদায় করে নিচে নামে।মিসেস মাহেরা খান বসে টিভি দেখছেন।মায়া এসে ধুপ করে বসলো তার পাশে।মায়াকে পাশে বসতে দেখেই বললেন তিনি
-“এতক্ষণে তাহলে ঘুম ভেঙেছে। ”
-“ডাকোনি কেনো??”
-“অনেক ডেকেছি তোমাকে। দরজা বন্ধ ছিল তাই ভেতরে ঢুকে ডাকতে পারি নি।
-“কিছু দাও। ক্ষিদে পেয়েছে।”
-“বিরিয়ানি দিব??”
-“রাতে খাব।এখন অন্য কিছু দাও।”
-“বসো তুমি। আমি আনছি তুমি বসো।”
-“আব্বু কখন আসবে।”
-“এইত আরেকটু পর।”মায়া বললো না আর কিছু। নিশ্চুপ টিভি দেখায় মনোযোগ দিলো।
,
রাত ১২:০০ টা। বিছানায় শুয়ে চেটিং করছে মায়া।ওর ফ্রেন্ডদের একটা হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপ আছে ‘বিবিসি নিউস,চট্টগ্রাম’ নামে।সারাটাদিন, সারাটা রাত ওখানে টুংটাং ম্যাসেজ আসতেই থাকে।কে কার সাথে রিলেশনে গেলো,কার ব্রেকআপ হয়েছে,কে কার সাথে ডেইট এ যাচ্ছে সকর পরনিন্দা, পরচর্চা হয়ে থাকে সেখানে।
এখনো হুলুস্থুল চেটিং চলছে। গ্রুপে ঝগরা হচ্ছে মূলত।টপিক রুদ্রর জিএফ৷ ওর কখনো একজনকে বেশিদিন ভালো লাগে না। কিন্তু আরশি অনেকদিন ধরে টিকে আছে। কারন কী??কেউ কেউ বলছে রুদ্র আরশিকে সত্যিসত্যিই ভালোবাসে। আবার তার প্রতিবাদ করছে কেউ কেউ। ওঁদের ফ্রেন্ড’দের মধ্যে রিলেশনে যাওয়া নিয়ে বড্ড সমস্যা। এতে ওঁদের ধারণা বন্ধুদের প্রতি ভালোবাসা কমে যায়।তাই সবসময় লেগে থাকে একজন আরেকজনের পিছনে।মূলত রুদ্র ছাড়া আর কেওই রিলেশনে নেই।তাই এখন সবাই রুদ্রর জিএফ এর পেছনে হাত ধুয়ে পরে আছে।
-“না। রুদ্র মায়া কে ঠকাতে পারে না।”
এই একটা মেসেজে চোখ আটকারো মায়ার।মেসেজটা দিয়েছে রুহানি।মায়া দ্রুত টাইপিং করলো
-“কেন রে?ও আমাকে কথা দিছিল নাকি। নাকি আমি ওর জিএফ।”
-“না। তুই কষ্ট পাবি। ও যদি আরশিকে বিয়ে করে।”
-“কেন? ও কষ্ট পাবে কেন?আশ্চর্য!”
রুদ্র এতক্ষণে মেসেজ করলো।মায়া লিখলো না কিছু।দেখতে চাইলো ওর বলদ বন্ধুগুলো কী বলে।
-“কারন, ও তোকে ভালোবাসে।”
,
গ্রীষ্মের মাঝামাঝি সময়। কালবৈশাখী ঝড় হতে পারে যেকোনো সময়। আকাশে আজ খুব মেঘ করেছে।বৃষ্টি আসার আগ মুহূর্ত। ঝড়ো বাতাস বইছে।মায়া তার কক্ষের বেলকনিতে দোলনার উপর বসে আছে। বাতাসে তার কোমর ছাড়ানো লম্বা চুল গুলো সমানতালে উড়ছে। কফির কাপে চুমুক বসাচ্ছে কিছুক্ষণ পরপর।দৃষ্টি তার আকাশ পানে নিবদ্ধ। আকাশের মতো তার মনেও যে মেঘে ছেয়ে আছে।মায়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল।সকাল আটটা বেজেছে বোধহয়। কলেজ না থাকলে মায়া কখনও সকালে তারাতারি উঠে না।কিন্তু আজ উঠে গেছে৷ফজরের নামাজ পরে আর ঘুমাইনি। ঝড়ো আবহাওয়ার ফলে ভার্সিটি বন্ধ দিয়েছে।কাল রাতে রুহানির শেষ লেখা টা দেখার পর মায়া থমকে চেয়েছিলো কতক্ষণ। সাথে সাথে গ্রুপ থেকেও লেফ্ট নিয়ে নিয়েছিল।এরপর কী কথা হয়েছিল মায়ার জানা নেই। কিন্তু রুহানির কথা যে এক ফোটা মিথ্যা ছিল না। ঐ শ্যামপুরুষ কে ভালোবেসে মায়া সত্যিসত্যিই শেষ হয়ে যাচ্ছে। প্রতি নিয়ত বিরহের দহনে পুরছে সে।ঐ মানুষটার ওপর যে কোনো নারীর ছায়াও সহ্য হয় না।কিন্তু ওই নিষ্ঠুর মানব যে তা বোঝে না।সে যে তার কাছে আসা সব নারীকেই সাধরে গ্রহণ করে। সব নারী?? না। শুধুমাত্র সে ছাড়া।
আকাশ ঝেঁপে বৃষ্টি এলো। মায়ার ভাবনার অবসান ঘটে। তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে কক্ষের ভেতর প্রবেশ করে। সকাল না হলে একটু বৃষ্টি তে ভিজতে পারত। কিন্তু এতো তাড়াতাড়ি গোসল করতে চায় না সে। মায়া বিছানা থেকে নিজের মুঠোফোন হাতে নিল৷ ১২ টা মিসড কল। মায়া মুচকি হাসলো। এই মানুষগুলো তাকে খুব বেশিই ভালোবাসে।ওর বন্ধুগুলো ওর আরেকটা পরিবার কালকে গ্রুপ থেকে লেফ্ট নেওয়ার পর রাহুল ১২ বার ফোন করেছে। কিন্তু ফোন বন্ধ করে রাখায় মায়া ধরতে পারেনি।। কল ব্যাক করলো মায়া। রিং হতে হতেই কেটে যায় প্রথমবারে। মায়া বুঝলো প্রতিশোধ নিচ্ছে রাহুর। আবার ফোন দিল।একটা ঘুমঘুম কন্ঠস্বর ভেসে আসলো ফোনের অপর পাশ থেকে।
-“নাটক করতে কল দিয়েছিস। কালকে কয় বার কল করেছি তোকে??”
-“স্যরি, স্যরি।ফোন বন্ধ করে ঘুমিয়ে পরেছিলাম। ”
-“গ্রুপ থেকে লেফ্ট নিলি কেন??”
-“এমনিতেই। ভালো লাগছিল না।আমি লেফট নেওয়ার পর কোনো কথা হয়েছিল।”
-“না। রুহানি ওর লাস্ট মেসেজ টা ডিলিট করে দিয়েছিল।তোকে এড দিতে চেয়েছিলাম।কিন্তু তুই কেনো লেফট নিয়েছিস ওটা আগে জানতে চেয়েছিলাম।”
মায়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ফোনের অপর পাশ থেকে রাহুল শুনলো সে শব্দ। তবে বললো না কিছু।মায়া ভারাক্রান্ত স্বরে বললো
-” তুই তো সব জানিস। তারপরও কেন জিজ্ঞেস করছিস?”
-”হ্যাঁ,জানি। কিন্তু এভাবে তো ব্যাপারগুলো চলতে পারে না মায়ু।ওঁকে বল তোর মনের কথাগুলো।”
-“রুদ্র বাচ্চা না রাহুল। ও সবকিছুই বোঝে, জানে।শুধু আমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য নির্বিকার থাকে। দুনিয়ার সব নারীকে পছন্দ করে ও।যেই প্রেমের প্রস্তাব নিয়ে আসে কাওকেই ফিরিয়ে দেয় না।বিশাল বড় মন না তাই সবাইকেই পছন্দ হয়। শুধু পছন্দ না এই আমিটাকে।”
-“ওরা সবাই মোহো। টাইম পাস। কিন্তু তোকে ও টাইম পাসে রাখতে চায় না। তাই এমন করে।”
-“আমার মন যে মানে না।আমার ছোটো বেলা, কিশোরকাল,যৌবন কাল যে শুধু ওকেই চেয়ে এসেছে। ”
-“তোর ভালোবাসা তোর হবে মায়ু। দেখে নিস।”
-“না হলে জোর করে নিজের করব। ইউ নো আমি যেটা চাই সেটা আমি নিজের করেই ছাড়ি।ও চাক বা না চাক ওঁকে আমার হতেই হবে!” বাঁকা হেঁসে বললো মায়া।
রাহুল বললো
-“প্ল্যান থাকলে বল। আমরা সবাই আছি তোর সাথে।”
-“এখন না।আরেকটু সময় যাক।ওর সাথে ছলনা করতে চাচ্ছি না।”
-“আচ্ছা। তাহলে রাখছি এখন।”
রাহুল কল কেটে দেয়। মায়া আবার ভাবনায় ডুব দেয়।ফন্দি আটে কিছুর।
,
লাইব্রেরির একেবারে কর্ণারে মুড অফ করে বসে আছে রুদ্র। টেবিলের উপর খোলা বইটার পাতা পাখার বাতাসে উড়ছে। সেদিকে তেমন একটা খেয়াল নেই ওর।কোনো এক চিন্তায় মশগুল সে।জনমানবশূন্য লাইব্রেরি।নিরব পরিবেশ। সকালে তেমন একটা কেও এদিকে আসে না।
নিরবতার অবসান ঘটিয়ে ধুপধাপ পা ফেলে কক্ষে ঢুকলো আরশি।রুদ্র তাকালো না সেদিকে।গালে হাত দিয়ে ভাবনায় ব্যাস্ত ও।দৃষ্টি শেলফের দিকে নিবদ্ধ।
ওঁকে দেখতেই মাথা নুইয়ে হাসলো আরশি।ক্লাসে যাওযার পর বান্ধবীদের কাছ থেকে জানতে পারলো রুদ্র এসেছে।তবে সে ক্লাসে উপস্থিত ছিলো না তখন।
আরশি শিউর ছিলো তখন এখানে আসলেই রুদ্রকে পাওয়া যাবে।ওর চেয়ে বেশি ছেলেটাকে কে জানে!
আরশি ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো ওর কাছে।গলা খাঁকারি দিয়ে মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করলো।কাজ হলো বটে।রুদ্র হকচকিয়ে তাকালো।যেন সম্বিত ফিরলো এমন।আরশি ডান ভ্রু উচালো।রুদ্র অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বললো
-“তুমি?”
-বসি?”
-“অবশ্যই!”রুদ্র সরে বসে জায়গা করে দিলো ওর পাশে। আরশি একটু কাছ ঘেঁষে বসলো রুদ্রর।ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বললো
-“মন খারাপ কিছু নিয়ে?”
বিরস ভঙ্গিতে দু’পাশে মাথা নাড়লো রুদ্র। আরশি ফের বললো
-“আমাকে বলো।
-“ভালো আছো?” কথা ঘোরানোর চেষ্টা করলো রুদ্র।আরশি বুঝলো রুদ্র ব্যাপারটা জানাতে চাচ্ছে না ওঁকে। তবুও রুদ্রর চিন্তিত মুখ দেখে মন খারাপ হয় আরশির।ভীষণ সিরিয়াস কিছু একটা হয়েছে।যার ফলে প্রতিদিনের চিরায়ত হাসিটা মুখে নেই ওর।
আরশি হাত বাড়িয়ে রুদ্রর সিল্কি চুলগুলো এলোমেলো করে দিলো।মিষ্টি হেঁসে বললো
-“বলো আমাকে। মন হালকা হবে!”
-“তোমাকে বলার মতো হলে প্রথমবারেই বলে দিতাম আরশি।তোমার কথা বলো।এদিকে আসলে যে?”
-“তোমাকে খুঁজতে খুঁজতেই তো এলাম।”
আর কথা হয় না দু’জনের মধ্যে।আবারও নিরবতায় ছেয়ে যায় লাইব্রেরির বিশাল কক্ষটি।রুদ্রর সামনের খোলা বইটি আরশি হাত বাড়িয়ে টেনে নিলো।পাতা উল্টালো কয়েকটা।পরক্ষণেই কিছু মনে পরেছে এমনভাবে যত্রতত্র টেবিলের উপর রাখা ওর ব্যাগটা কোলে নিলো।ব্যাগ থেকে বের করলো কতগুলো প্র্যাক্টিকাল খাতা, অ্যাসাইনমেন্ট পেপার।
-“রুদ্র!”
আরশির ডাকে পাশ ফিরে তাকালো রুদ্র।গালে হাত ঠেকিয়ে কোমল স্বরে বললো
-“হু!
-“নাও তোমার অ্যাসাইন্টমেন্ট আর প্র্যাক্টিকাল গুলো।প্রজেক্টের বিবৃতিটাও নোট করে দিয়েছি!রিসার্চ পেপারটাও কমপ্লিট করে দিয়েছি।”
সোজা হয়ে বসলো রুদ্র।পরপর কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে তাকালো।কয়েকদিন ধরে আরশির সাথে তেমন একটা ভালো সম্পর্ক যাচ্ছিলো না ওর।অফিসে জয়েন করার পর থেকেই বড্ড ব্যস্ত সময় কাটছিলো।সে সময়টাতে মেয়েটাকে ভীষনভাবে উপেক্ষা করেছে ও।ওর কোনো কল ধরেনি, মেসেজের রিপ্লাই দেয়নি, সামনাসামনি দেখা হলেও না পারতে শুধু দু-এক কথা বলেছে তাও আরশি নিজ থেকে বলতে আসলে। তবুও আরশি কোনো অভিযোগ করেনি।সম্পর্ক ভেঙে দেয়নি।উল্টো সাহস দিয়েছে রুদ্রকে।ওর প্র্যাক্টিকাল খাতা, অ্যাসাইনমেন্ট পেপারগুলো পর্যন্ত নিয়ে গেছে নিজে করে দেওয়ার জন্য। যাতে ওর উপর বেশি চাপ না পরে।
রুদ্র ক্ষীণ স্বরে বললো
-“এতো কষ্ট করতে গেলে কেন ইয়ার?তোমার নিজেরটাও করেছো আবার আমার টাও করে দিয়েছো।শুধু শুধু এতো কষ্ট করলে।আমি করে নিতাম।”
রুদ্রর হাত আলতো করে নিজের হাতের মুঠোয় নিলো আরশি।মৃদুস্বরে বললো
-“তোমাকে হেল্প করেছি এতে কষ্ট হবে কেন!তোমার সমস্যা কী আমার সমস্যা না!অফিসের অনেক কাজ, বড্ড চাপ পরে যাচ্ছে তাই না রুদ্র।”
জবাবে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো রুদ্র।এখন আরশিকে কী করে বলবে, মায়ার প্র্যাক্টিকাল করতে করতে মরছে ও।মায়া একগাদা প্র্যাক্টিকাল, অ্যাসাইনমেন্ট করতে দিয়েছে ওঁকে। নিজের কাজ, পড়াশোনা তে অবস্থা খারাপ হচ্ছে রুদ্রর,রীতিমতো চোখে সর্ষে ফুল দেখার মতো অবস্থা সেখানেও মায়ার কাজ করতে হচ্ছে। নয়তো আছে সে বেডির বন্ধুত্বের দোহাই, ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল ফ্রি।
দরজার বাইরে দাড়িয়ে দু’জনকে উঁকিঝুঁকি মেরে দেখছিলো মায়া।ওর পিছনে রুহানি, তার পিছনে রিয়ানা।আবার ওদের তিনজনের পিছনে রাহুল, সাহিল আর আরিয়ান সারিবদ্ধ ভাবে বাঁকা হয় দাঁড়িয়ে আছে।রুহানি মুখ ঝামটি মেরে বললো
-“দেখলি, দেখলি কেমন পিরিতি করছে দু’টো!”
-“গা জ্বলছে রে বইন!” ফুঁসতে ফুঁসতে বললো মায়া।
রাহুল সোজা হয়ে দাঁড়ালো। ফুঁসে বললো
-“চলতো ভেতরে!বাইরে দাঁড়িয়ে নাটকগুলো দেখা আর সম্ভব হচ্ছে না।”
সবাই গটগটিয়ে ঢুকলো ভেতরে।রুদ্র আর আরশি নিজেদের মধ্যে কথা বলায় ব্যস্ত ছিলো।বন্ধু মহলের সবাইকে প্রবেশ করতে দেখতেই দাঁড়িয়ে গেলো রুদ্র।রাহুল এসে কাঁধ জড়িয়ে ধরলো ওর।রুদ্র অবাক স্বরে বললো
-“তোরা?”
-“তোকে খুঁজছিলাম আমরা!চল।”
-“কোথায়?”
-“যেখানে নিয়ে যাবো সেখানে যাবি তুই।কোথায় আবার কী? না বন্ধুর চেয়ে প্রেমিকা বেড়ে গেছে?”
ফিচেল হেঁসে বললো রাহুল।রুদ্র অস্থির হয়ে বললো
-“এভাবে বলছিস কেন?আচ্ছা চল!”
আরশি কে বিদায় দেওয়ার সময়টুকু দেওয়া হলো না ওঁকে। টেনেটুনে নিয়ে গেলো রাহুল আর আরিয়ান।সাহিল ওর প্র্যাক্টিকাল খাতাগুলো গুছিয়ে নিয়ে বেরিয়ে গেলো।
আরশি হাত মুষ্টিবদ্ধ করে বসে আছে।রাগ লাগছে ওর।ভীষণ ভাবে রাগ লাগছে।ওরা একসাথে হলেই তেড়ে আসে এরা।রুদ্রকে টেনে নিয়ে চলে যায় ওর থেকে।একটু কথা বলার সুযোগ টা পর্যন্ত হয় না ওর।
মায়া, রুহানি, রিয়ানা তখনো দাঁড়িয়ে ছিলো কক্ষে।মায়া শিষ বাজালো।তাচ্ছিল্য করে বললো
-“আহারে!বপ্পেনের সাথে টাইম স্পেন্ড করা হলো না আর, বেবি!”
রা*গে টেবিলে বারি মারলো আরশি।চকিতে উঠে দাড়িয়ে ফুঁ*সে বললো
-“তোদের সমস্যা টা কোথায়?সবসময় আমার সাথে এমন করার মানে কী!”
রুহানি দুপা এগিয়ে এলো।তর্জনী তুলে বললো
-“তোকে বলেছিলাম না রুদ্রর থেকে দূরে থাকতে।কথা শুনিস না কেন তুই?আমাদের বন্ধুর সাথে ঢলাঢলি করলে অবশ্যই আমাদের সমস্যা হবে!”
-“রিলেশনে আছি আমরা। কেন দূরে থাকবো ওর থেকে আমি!কেমন বন্ধু তোরা?ওর ভালোবাসাকে সবসময় দূরে ঠেলে দিস ওর থেকে।” গলা উঁচিয়ে বললো আরশি।
চোখ পাকিয়ে তাকালো মায়া।তপ্তস্বরে বললো
-“গলার আওয়াজ নিচে কর!কানে শুনতে পাই আমরা।আর তোকে কোনো ভালো টালো বাসে না ও।খেলছে তোকে নিয়ে ভাই,টাইম পাস করছে তোর সাথে,ভাই।কেন বুঝছিস না তুই?”
ফুঁস*তে ফুঁস*তে তাকালো আরশি।নাক ফুলাচ্ছে ও বারংবার।অনেক করে চেষ্টা করছে নিজের রাগ বাইরে বেরোতে না দিতে।রুহানি শ্লেষাত্মক হাসলো।ক্রো*ধান্বিত স্বরে বললো
-“কী মারবি আমাদেরকে?পারবি আমাদের সাথে?নাক ফাটিয়ে দি তোর?ডিপার্টমেন্ট হ্যাডকে গিয়ে বিচার দেই তোর নামে?আমাদের কথাই শুনবে সে।ইউ নো না আমরা টিচারদের ফেভারিট স্টুডেন্ট।শেষবার সাবধান করছি তোকে রুদ্র থেকে দুরে থাক।পরেরবার কথাটা শুধু মুখে বলবো না।হাতের প্রয়োগও খুব বিশ্রী ভাবে করবো।”
মুখ ঘুরিয়ে গটগটিয়ে বেরিয়ে গেলো তিনজন।ধ্বপ করে টেবিলে বসে পরলো আরশি।হাত দিয়ে মুখ কান্না আটকানোর চেষ্টা করলো নিজের।কেন যেন খুব করে কান্না পাচ্ছে। মেয়েগুলো সবসময় এমন করে ওর সাথে।ছেলেগুলো টেনেটুনে নিয়ে যায় রুদ্রকে।রুদ্রর সাথে রিলেশনে যাওয়ার পর থেকেই এসব শুরু করেছে ওরা।আরশি সত্যিই ফেইড আপ এসবে।
#চলবে

