উৎসর্গ #পর্ব:১০+১১(বিয়ে) #তানজিনা ইসলাম

0
19

#উৎসর্গ
#পর্ব:১০+১১(বিয়ে)
#তানজিনা ইসলাম

সকালে ঘুম থেকে উঠে মায়া দুটি নতুন মুখের সম্মুখীন হয়েছে। সিড়ি বেয়ে নামার সময় মায়া দেখতে পায় দুজন মহিলা বসে আছেন সোফায়। হাতে তাদের চায়ের কাপ।রাফানা চৌধুরীর সাথে হেসে হেসে কী যেন বলছেন।তার মামনির আবার কোনো বান্ধবী এলো নাকি?নিজের মতো ভাবনা সম্পন্ন করে মায়া নিচে নামে।তাদের সামনে গিয়ে সালাম দেয় দুজনকে।রাফানা চৌধুরী হাত ধরে মায়াকে নিজের পাশে বসান
-“আমার বৌমা,মায়া।”রাফানা চৌধুরী মায়ার কাধে হাত রেখে মিষ্টি হেসে বলে।

-“নতুন বৌ হয়ে এতো দেরিতে ঘুম থেকে উঠো?আমরা এসেছিই তো মনে হয় আধ ঘন্টার বেশি হয়ে গেল।”সোফার বামপাশে বসা মহিলাটি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন।

মায়া থমথম খেলো।আজ তো অন্য দিনের তুলনায় তাড়াতাড়িই উঠেছে। যখন বিছানা ছেড়ে দাড়িয়েছিল তখন ঘড়ির কাটায় সাড়ে আটটা।তারপরও বলছে দেরি করে ঘুম থেকে উঠেছে।মায়া উত্তর দিল না।মাথা নিচু করে রাখল। রাফানা চৌধুরী নিজেই উত্তর দিলেন-
-“আসলে কাল রাতে মেহেদী দিয়ে উঠতে দেরি হয়ে গিয়েছিল। দেরি করে ঘুমিয়েছে,তাই আজ উঠতেও দেরি হয়ে গেছে। নয়তো তাড়াতাড়িই উঠে যায়।”

-“আরে আপার কথা ধরো নাতো। কী মিষ্টি মেয়ে!রুদ্রর বান্ধবী ছিল তাই না?আমাদের রুদ্রর সাথে খুব মানাবে কিন্তু।”অন্য মহিলাটি হাসিমুখে বললেন।

-” হ্যাঁ। রুদ্রর ছোটবেলার বন্ধু।ছোটোবেলা থেকে একসাথেই বড় হয়েছে। “রাফানা চৌধুরী উত্তর করেন।

তারপর মায়াকে উদ্দেশ্য করে বলেন
-” ওরা দুজন আমার নিজের বোন।”বাম পাশের মহিলাটিকে দেখিয়ে বলেন”আমার বড় আপা রাবেয়া খাতুন”আর তার পাশের মহিলাটিকে দেখিয়ে বলেন “আমার ছোটো বোন রাহেলা জামান।”

-“রুদ্র আমাকে ছোট খালামনি ডাকে।তুমিও আমাকে ছোটো খালামনি বলে ডেকো।”রাহেলা জামান হাসলেন।মায়া নিজেও সৌজন্যতামূলক হাসলো।

রাবেয়া খাতুন হাতের কাপটা টেবিলের উপর শব্দ করে রাখলেন। মুখ বাকিয়ে বললেন
-“তা তুমি শাড়ি পরোনি কেন?নতুন বৌয়ের কোনো চিন্হই তো নেই তোমার গায়ে। না শাড়ি পরেছো,না হাতে চুড়ি পরেছো।এভাবে ছেলেদের মতো টিশার্ট পরে ঘুরছো কেন? মাথায় ঘোমটা না দিয়েই বড়দের সামনে চলে এসেছো।হ্যাঁ রে রাফা তোর বৌমাকে কিছু শেখাসনি?”

রাফানা চৌধুরীর মুখ কালো হয়ে যায়।তারপরও মুখে জোরপূর্বক হাসি টেনে বলেন
-“আসলে এখনো নতুনতো,তাই কোথায় কী করতে হবে বুঝতে পারছে না।আস্তে আস্তে সব বুঝে যাবে।ওতো আমার মেয়েই।আমার মেয়ে হলে যেভাবে সব হাতে ধরে শেখাতাম সেভাবেই শেখাব সব।সব শিখে যাবে।”

-“তোর কাহিনি কিছুই বুঝি না।দেখ রাফা অন্যের মেয়েকে তুই নিজের মেয়ে ভাবলেও সে কখনো তোকে নিজের মা ভাববে না।তাই আগেভাগেই লাগাম টেনে ধর।নয়তো পরে মাথায় চড়ে বসবে।আর এই মেয়েকে রুদ্রর বন্ধু বলছিস।এর মানে সমবয়সী। এই মেয়ে মানবে নাকি নিজের স্বামী কে। “রাবেয়া খাতুন নাক কুঁচকে বললেন।

মায়া হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ফেললো।যদি তার মামনির বোন না হতো তাহলে এই মহিলা নিজের প্রাণ নিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে পারত না।মায়া নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করলো।সে চায়না তার মামনির কোনো অসম্মান হোক।তাই চুপ থাকলো।

রাফানা চৌধুরী গম্ভীর কন্ঠে বললেন
-” ও আমাকে নিজের মা ভাবুক আর না ভাবুক।আমি ওকে নিজের মেয়েই ভাবি।আমার মেয়ের উপর আমার সম্পূর্ণ বিশ্বাস আছে। ও এমন কিছু করবে না।তোমাকে চিন্তা করতে হবে না আপা।” পরক্ষণেই আবার মায়ার দিকে তাকিয়ে বললেন
-“মায়া নাস্তা করে নে। আয়।”বলেই হাত ধরে কিচেনে নিয়ে যান।সোফায় বসা দুজনকে কথা বলার কোনো সুযোগই দেন না।

-“কিছু মনে করিস না বাচ্চা আমার। বড় আপা এমনই।কিছু ভেবে চিন্তে বলেন না।তুই মন খারাপ করিস না।”রাফানা চৌধুরী মন খারাপ করে বললেন।

-“আমি কী করে কিছু মনে করতে পারি মামনি?তুমি যদি আমার জন্য কিছু না বলতে। ওদের কথা মেনে নিতে তাহলে হয়তো অসম্ভব কষ্ট লাগতো আমার।কিন্তু তুমি যেভাবে আমার জন্য নিজের বোনের সাথে লড়াই করলে তার পর আমি কিভাবে মন খারাপ করে থাকতে পারি।তোমার বোন ভুল বলেছে মামনি,তুমি আমার আরেকটা মা।”বলেই শক্ত করে জড়িয়ে ধরেন রাফানা চৌধুরীকে।রাফানা চৌধুরী মুচকি হেসে মায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন।
,

সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আরেকটু পরেই হলুদের অনুষ্ঠান শুরু হবে।অতিথিরা সবাই আসতে শুরু করেছেন।বাড়ির বাইরে একপাশে বসে কয়েকজন মিলে হলুদ বাটছে।রান্নার লোকেরা রান্না করছেন।দুজনের গায়ে হলুদ এই বাড়িতেই হবে।এখনো মায়ার বাড়ির লোকেরা এসে পৌঁছায় নি।দোতলার একটি কক্ষে মায়াকে পার্লারের লোকেরা সাজিয়ে দিচ্ছে।রুহানি আর রিয়ানা গালে হাত দিয়ে চেয়ারের উপর বসে আছে। তাদের দৃষ্টি মায়ার দিকে।কয়েকজন মিলে মায়াকে শাড়ি পরানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু রাবেয়া খাতুন একবার একটা বলেই যাচ্ছেন।রুহানি আর রিয়ানা কিছু বলতে গেলেই ধমক দিয়ে থামিয়ে দিচ্ছেন।অবশেষে অনেক চেষ্টার পর মায়া শাড়ি পরতে সক্ষম হলো।এতক্ষণে রাবেয়া খাতুনের মনপুত শাড়ি পরাতে পেরেছে পার্লারের মেয়েরা।মায়া হলুদ আর সবুজ মিশেলের কাঞ্চি বরণ শাড়ি পরেছে।মাথায় আলাদাভাবে ডার্ক গ্রিন ওড়না দিয়ে ঘোমটা দেওয়া হয়েছে।মায়া স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে।এতক্ষণে মনে হচ্ছে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে জয়ী হয়েছে।একে একে সকলেই কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে আসে। রুহানি আর রিয়ানা মায়ার পাশে গিয়ে বসে।পার্লারের মেয়েরা মায়াকে সাজিয়ে দিতে শুরু করে।মায়াকে সাজানো শেষ হলে রুহানি আর রিয়ানাও হালকা সেজে নেয়।তিনজনই হালকা সাজ দিয়েছে।রুহানি আর রিয়ানা মায়াকে ফুলের গহনা পরিয়ে দিচ্ছে।
তখনই কক্ষে মাহেরা খান ঢোকেন।মায়া দৌড়ে গিয়ে নিজের মাকে জড়িয়ে ধরেন।মাহেরা খান ও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নিজের মেয়েকে।

-“এতক্ষণে আসার সময় হলো।কতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছি। “মায়া অভিমানী কন্ঠে বললো।

-” সব কিছু ব্যবস্হা করে আসতে হচ্ছে তো।তাই দেরি হয়ে গেছে। ”

-“বাবা কোথায়?”

-“নিচে বসে আছে বেয়াইদের সাথে।”

-“তোমাকে মিস করেছি অনেক আম্মু।”

-“আমিও তোমাকে অনেক মিস করেছি। তারপরও এখানে তোমার আরেক মা আছে।আমার তো ওখানে কেউ নেই।”মাহেরা খান মায়ার দিকে তাকিয়ে মলিন হেঁসে বললেন।

মায়ার চোখ থেকে একফোটা পানি গড়িয়ে পড়ে।মাহেরা খান যত্ন করে তা মুছে দেন।মায়া আবার শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার মাকে। রাফানা চৌধুরী কক্ষে এসে মায়াকে কাঁদতে দেখে চটজলদি এগিয়ে আসেন।তড়িঘড়ি করে বলেন
-“কাঁদছো কেন তুমি?সাজ নষ্ট হয়ে যাবে তো।”

-“দেখুনতো, ভাবি কীভাবে কাঁদছে!”
মায়া মায়ের বুকে মাথা রেখে নিঃশব্দে কাঁদছে। রুহানি আর রিয়ানাও এগিয়ে আসে মায়াকে শান্ত করতে।কিন্তু মায়া থামছেই না।অবশেষে অনেক্ষন পর মায়ার কান্না থামে।মাহেরা খান যত্ন করে টিস্যু দিয়ে মায়ার চোখ মুছে দেয়।মায়াকে নিয়ে একযোগে নিচে নামলো সবাই।

-“এতো দেরি হলে কেন?”রাবেয়া খাতুন রাফানা চৌধুরীর উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করেন।

-“আসলে মাকে কাছে পেয়ে আবেগি হয়ে পরেছিল।”

-“আচ্ছা। এবার নিয়ে চল ওকে।”

সবাই মিলে বাড়ির বাহিরে যায়।বাড়ির এক সাইডে স্টেজ করা হয়েছে।পুরো বাড়ির এরিয়ায় রং-বেরঙের লাইট জ্বলছে।স্টেজ এর ওদিক থেকে সুমধুর সুরে গান ভেসে আসছে।সকলেই হলুদ রঙের শাড়িতে সাজিয়েছে নিজেকে।

মায়াকে স্টেজে বসিয়ে দেওয়া হলো।মায়া আশেপাশে তাকাচ্ছে। কিন্তু কোথাও রুদ্রর দেখা নেই।ভীষণ লজ্জা লাগলো মায়ার।মাথা নুইয়ে বসে থাকলো।ইশ!এত লজ্জা কোত্থেকে উড়ে এলো ওর মাঝে কে জানে।পাশে কারো উপস্থিতি টের পেতেই মায়া দেখতে চাইলো তাকে।কিন্তু সেদিকে তাকাতেও যেন লজ্জা ঝরে ঝরে পরছে।মায়া এতো লজ্জার উৎস খুঁজে পেল না।
-“কীরে?লজ্জায় তো একেবারে শেষ হয়ে যাচ্ছিস।”পাশ থেকে আওয়াজ পেতেই মায়া বুঝে যায় এটা কার কন্ঠস্বর।ফিসফিসিয়ে বলে

-“তুই এসেছিস?”

-“হ্যাঁ এসেছি।তাকা আমার দিকে।”

-“লজ্জা লাগে তো।”

-“আহারে।লজ্জাবতী লতিকা আমার!এটাও আমাকে শুনতে হলো।তোর লজ্জাও আছে। বাহ!বাহ!শুনে খুশি হলাম।এখন, তাকা আমার দিকে। দেখ আমাকে।”
মায়া পাশেই চোখ তুলে তাকায় রুদ্রর দিকে।রুদ্র তার দিকে তাকিয়ে হাসছে।পরনে তার হলুদ পাঞ্জাবি। হাত দুটো ফোল্ড করা।বামহাতে ঘড়ি।চুলগুলো জেল দিয়ে সেট করে রাখা।মায়া আবার বড়সড় একটা ক্রাশ খেলো।পুলকিত স্বরে বললো

-“ওয়াও বন্ধু, লুকিং হ্যান্ডসাম!”
-“ট্রু?”
-“হুম, হুম।একশো পার্সেন্ট!”
-“থ্যাঙ্কিউ, থ্যাঙ্কিউ।আর আমিতো এমনিতেই সুন্দর।আবার নতুন করে সুন্দর লাগার কী আছে?”
-“আজকে একটু বেশিই সুন্দর লাগছে। আচ্ছা দেখে বল আমাকে কেমন লাগছে?”
-“পুরো শেওড়াগাছের পেতনি।”রুদ্র দাঁত দেখিয়ে বললো।

মায়া মুখ বাকিয়ে সামনে তাকায়। সামনে চোখে পরে রাহুল আর সাহিল কে।দুজনেই রুদ্রর মতো হলুদ পাঞ্জাবি পরেছে।দুজনেই হাত নাড়িয়ে মায়াকে হাই বলে।মায়া হাসে।একে একে সকলে এসেই রুদ্র আর মায়াকে হলুদ লাগিয়ে দিয়ে যায়,কেক খাইয়ে দেয়।বড়রা আসলে দুজনেই বড়দের কে সালাম করে।সাউন্ড বাক্সে গান বাজছে।অনেকেই গানের তালে তালে নাচছে।রুহানি গিয়ে ডিজে গানে একটা দারুন নাচ দেয়।রাহুল,সাহিল,রিয়ানা,রুহানি আরো অনেকেই যে যার মতো নাচছে।রুহানি অনেকবার টেনেছে মায়াকে।মায়া যেতে চাইলেও রুদ্রর জন্য যেতে পারেনি।রুদ্র হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে।
-“ইয়ার।তুই নিজেও যাচ্ছিস না,আমাকেও যেতে দিচ্ছিস না।”মায়া হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে বললো।

-“বড়রা আছে মায়ু।”

-“তো?ওরা কখনোই এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না!ভাই, নিজের বিয়েতে যদি নিজে নাচতে না পারি তাহলে এ অনুষ্ঠানের মানে কী?দেখ আমার আফসোস থেকে যাবে কিন্তু!”

-“কিছু করার নেই জান।বড়দের চিন্তা না থাকলেও বড় খালামনি কে আন্ডারেস্টিমেট করিস না।ওনি ওনেক কথা শোনাবেন তোকে।সহ্য করতে পারবি না।”রুদ্র মায়ার হাত চেপে ধরেই বললো।

মায়া ঠোঁট উল্টে বসে থাকে।অবশেষে হলুদের অনুষ্ঠান শেষ হয়।
এবার মায়া আর রুদ্রর গায়ে এক কলসি পানি ঢালবেন বড়রা।মানে গোসল করাবেন।এটাই বাড়ির নিয়ম।কনে আর বর নিজেরা গোসল করার আগে বড়রা তাদের মাথায় পানি ঢালবেন।মায়া তাজ্জব বনে গেছে এসব আজিব নিয়মের কথা শুনে।এখন ওকে এসব সাজগোছ নিয়ে এ জায়গায় ভিজতে হবে।দুইজনের জন্য দুইজায়গায় গোসলের ব্যবস্হা করা হয়েছে। মহিলারা সবাই মায়াকে এক সাইডে নিয়ে গেছে। এখানেই কলসি করে পানি ঢালা হবে।হঠাৎ মায়ার কিছু মনে পরতেই মায়া তড়িঘড়ি করে বলে উঠে
-” আমি একটু আসছি।”

-“এখন কোথায় যাবে তুমি?”রাফানা চৌধুরী ভ্রু কুচকে বললেন।

-“একটা কাজ আছে মামনি।এখনই চলে আসছি।”

-“আচ্ছা যাও। তাড়াতাড়ি এসো।”

ওদিকে বাড়ির ছেলেরা রুদ্রকে গোসল দেওয়ার জন্য অন্য সাইডে নিয়ে এসেছে।তখনই রাহুল বললো
-“রুদ্র তোকে একটু এক জায়গায় আসতে হবে।”

-“কোথায় যেতে হবে এই সময়ে?”রুদ্র জিজ্ঞেস করে।

-“ইটস আর্জেন্ট। গেলেই দেখতে পাবি।একটু চল। এক্ষুনি চলে আসব।”

-“আচ্ছা চল।তোমরা একটু অপেক্ষা কর।আমি এখনই চলে আসছি।”

রাহুল রুদ্রকে নিয়ে বাগান সাইডে যায়।রুদ্র অবাক স্বরে সুধালো
-“এখানে কী আছে?এখানে এনেছিস কেনো?”

-“এখনি বুঝতে পারবি।তুই দাড়া আমি আসছি।”বলেই চলে যায়।

রুদ্র অনেকবার ডাকলেও পিছন ফিরে তাকায় না।হঠাৎই রুদ্রর হাতে টান পড়াই রুদ্র পিছনে ফিরে তাকায়।অবাক হয়ে দেখে মায়াকে।তার হাতে হলুদের বাটি।
-“তুই এখানে?”

মায়া রুদ্রর প্রশ্নের জবাব দেয় না।হলুদের বাটি থেকে একটু হলুদ নিজের গালে লাগায়।রুদ্র হতভম্ব হয়ে মায়ার কার্যকলাপ দেখছে।মুখে তো হলুদ লাগানোই আছে।আবার লাগানোর দরকার টা কী।মায়া নিজের হিল খুলে রুদ্রর পায়ের উপর দাড়িয়ে রুদ্রর গলা জড়িয়ে ধরে ।তারপর নিজের মুখ রুদ্রর মুখের সাথে লাগিয়ে নিজের মুখের হলুদ রুদ্রর মুখে লাগিয়ে দেয়।রুদ্র পাথর বনে দাঁড়িয়ে থাকে চোখের দৃষ্টি নিবদ্ধ করে মায়ার চোখের উপর।মায়া রুদ্রর পায়ের উপর থেকে নামে।তারপর নিজের হিলগুলো এক হাতে নিয়ে আরেক হাতে শাড়ি একটু উচু করে ধরে দৌড় দেয়।রুদ্র অপলক তাকিয়ে থাকে শাড়ি পরিহিতা এক নারীর দৌড়ে যাওয়ার পানে।
,

ঘড়ির কাটায় দুপুর ১২ টা বাজে।উত্তপ্ত দুপুর।কাঠফাটা রোদ।সূর্য একেবারে মাথার উপর অবস্থান করছে।মায়া ঘুমুঘুমু চোখে বসে আছে।পার্লারের মেয়েরা সাজিয়ে দিচ্ছে তাকে।মায়া চোখ টেনে খুলে বসতে পারছে না।পুরো রাত ঘুমোতে পারে নি ও।সকালে যাও একটু ঘুম এসেছিল পার্লারের মেয়েরা চলে আসায় উঠে যেতে হয়েছে। কক্ষে এসি চলছে।তারপরও মায়া ঘেমে নেয়ে একাকার। এভাবে সাজার অভ্যাস নেই তার।পুরো বাড়িতে মানুষজন গিজগিজ করছে। দুই পক্ষের আত্মীয়রাই এ বাড়িতে আসছে।এখনো অনেক আত্মীয় আসা বাকি।সাজার জন্য মেয়েদের কে একটি কক্ষ আলাদাভাবে দেওয়া হয়েছে।মায়ার পাশে রুহানি,রিয়ানা, রুদ্রর খালাতো বোন মৈত্রী আর হাসনা,মামাতো বোন টিনা আর মায়ার ফুফাতো বোন পিয়াসা আর জিন্নাতসহ সবাইকে সাজিয়ে দিচ্ছে পার্লারের মেয়েরা।সবাই হালকা সাজ দিলেও মায়াকে আজকে ব্রাইডাল সাজ দিবে।
,

মুস্তাফিজ খান আর রুয়ান চৌধুরী বাড়িতে আসা সকল অতিথিকে অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন।খাওয়া দাওয়ার পাঠ শুরু হয়ে গেছে। মায়ার ভার্সিটির সব টিচারদেরকে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে। সাথে তাদের ক্লাসের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুকেও।তাদেরকে দাওয়াত দেওয়ার দায়িত্বে ছিল সাহিল আর রাহুল।সবাই একে একে আসতে শুরু করেছে।
রুদ্র কে তৈরী হতে সাহায্য করছে সাহিল আর রাহুল।কক্ষে তাদের সাথে তাদের আরো কয়েকজন বন্ধুও বসে আছে। রুদ্র একটি কফি কালারের শেরওয়ানি পরেছে।তাতে হালকা পাথরের কাজ করা।কিন্তু সকলে বলে কয়েও মাথায় পাগড়ি পরাতে পারলো না রুদ্রকে।তার একটায় কথা সে শুধু শেরওয়ানি পরে যাবে,মাথায় পাগড়ি পরবে না।সবশেষে রাহুল রুদ্রর হাতে সুন্দর একটি ঘড়ি পরিয়ে দিল।রুদ্র প্রশ্নবোধক চাহনিতে তাকালেই রাহুল কানে কানে বললো “মায়া দিয়েছে”।

মায়াকে সাজানো শেষ।শুধু মাথায় দোপাট্টা দেওয়া বাকি।খয়েরি রঙের লম্বা লেহেঙ্গা পরেছে মায়া।পুরো লেহেঙ্গা জুড়ে সোনালী পাথর আর সুতার কাজ করা।পায়ে হিল।গলায় সীতাহার।কানে বড় বড় হিরার দুল।হাত ভর্তি চুড়ি।মাথায় টিকলি পরা।নাকে বড় নথ। ঠোঁটে গাঢ় ডার্ক লিপস্টিক। পার্লারের একজন মায়ার মাথায় দোপাট্টা পড়িয়ে দিচ্ছে।দোপাট্টায় আরবি অক্ষরে রুদ্রর নাম লেখা।মায়া আয়নায় নিজেকে দেখল।সুন্দরই লাগছে।তখনই রাফানা চৌধুরী ব্যস্ত পায়ে ভেতরে ঢুকলেন।রুহানিদের উদ্দেশ্য করে বললেন
-” তোমরা না বলেছিলে গেট ধরবা।ছেলেরা তো বেরিয়ে পড়বে একটু পর তোমরা গিয়ে স্টেজের ওদিকটায় সব ব্যবস্হা করে ফেল।”

-“গেট তো অবশ্যই ধরব।”সবাই একসাথে চিল্লিয়ে বললো।

রুহানিসহ সবাই দৌড়ে কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যায়।পার্লারের মেয়েদেরও তাদের পাওনা টাকা দিয়ে বিদায় করা হয়।রাফানা চৌধুরী এগিয়ে আসেন মায়ার দিকে।মায়া উঠে দাড়ায় তাকে দেখে।রাফানা চৌধুরী কাজল নিয়ে মায়ার মুখের নিচে হালকা করে লাগিয়ে দেন দেখা না যায় মতো।তারপর কপালে চুমু খেয়ে বলে উঠেন”নজর না লাগুক”।

রুদ্রসহ তার সব বন্ধুরা একটি কক্ষে বসে আছে।ওদিকে মেয়েরা রুয়ান চৌধুরীকে দিয়ে খবর পাঠিয়েছেন ছেলেরা যেন এখন ওদিকে পা-ও না মাড়ায়।তারা ওদিকে ফিতা বাধছে।রাহুল পাইচারি করছে।মেয়েদের কথা মেনে চলতে হবে নাকি এখন ওদেরকে। মেয়েদের কথামতো বড়রা এখানে বসিয়ে রেখেছে ভাবতেই বুক ফেটে কান্না পাচ্ছে তার।সবাই গোল গোল চোখে রাহুলকে দেখছে।মেয়েদের কথা শুনে সব ছেলেরা প্রতিবাদ করে উঠলেও বড়দের কথা অমান্য করে যেতে পারছে না।কিন্তু সবাই বসে তো আছে।রাহুল তো নিজের পা দুটোকে জিরোতে দিতেই পারছে না।

-“এভাবে গাধার মতো এপাশ ওপাশ হাঁটছিস কেন?” ধমকে বললো রুদ্র।

-“কেন হাটছি জানিস না?বড়রা মেয়েদের কথা মতো এখানে বসিয়ে রেখেছে।আজকে মেয়েগুলা আমাদেরকে ফকির বানিয়েই ছাড়বে।”

-“সেটাই।সবাইকে মানাতে পারলেও রুহানি আর রিয়ানা মানবে না।”সাহিল আফসোসের সুরে বললো।

রুদ্র বসে বসে সবার প্যাচাল শুনছে।তখনই পেছন থেকে দুটি হাত রুদ্রর চোখ বন্ধ করে দেয়।রুদ্র হাত ধরে বোঝার চেষ্টা করে কে?
-“আরিয়ান।”আরিয়ান মুখে হাসি ফুটে উঠে। হাত দুটো সরিয়ে আনে।শুধু মাত্র হাত ধরেই রুদ্র তার প্রিয় বন্ধু কে চিনে গেছে।আরিয়ান হেঁসে সামনে আসে।গোল্ডেন পাঞ্জাবি তার পরনে।একেবারে তৈরী হয়েই এসেছে। আজকে ছেলেদের ড্রেসকোড গোল্ডেন ।রুদ্র ছাড়া সবাই একসাথে চিৎকার দেয় খুশিতে।

-“কেন এসেছিস তুই?”রুদ্র গম্ভীর স্বরে বললো।

-“আমি আমার বন্ধুর বিয়েতে আসবনা?”

-“কে তোর বন্ধু? আমি তোর বন্ধু নই।”

-“সেটাতো জানি।আমি তো মায়ার বিয়েতে এসেছি।ওই তো আমার বন্ধু।”আরিয়ান হাসি হাসি মুখ করে বললো।

আরিয়ানের পিঠে জোরে কি*ল বসালো রুদ্র।আরিয়ান চোখমুখ কুচকে ফেলে তারপরও তার ঠোঁট থেকে হাসি সরে না।
-“তুই না বলেছিলি আসবি না?”সাহিল অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে।

-“বলেছিলাম ঠিকি।তারপর ভাবলাম বন্ধুর বিয়েতে কবজি ডুবিয়ে খেতে না পারলে জন্মানো টাই বৃথা থেকে যাবে।আর তার চেয়েও বড় কষ্টের কথা হচ্ছে আরেকজন তো একেবারে বন্ধুত্বই ভেঙে দিচ্ছিল রা*গ করে,আসবনা বলার পর।”আরিয়ান রুদ্রর দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বললো।

রুদ্র গম্ভীর হয়ে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। আরিয়ান শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রুদ্রকে।রুদ্রও আরিয়ানের পিঠে হাত রাখে।সাহিল আর রাহুলও দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে দুজনকে।সবাই একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসে চারজনের বন্ধুত্ব দেখে।ওদের বন্ধুত্ব টা এমনই। একজনের কাজ আরেকজনকে ছাড়া কোনোভাবেই সম্পন্ন হয় না।তাও দুটো স্পেশাল দিনে আরিয়ান উপস্থিত ছিল না।যার ফলে রুদ্র রেগে ছিল তার উপর।
,

রুদ্রকে নিয়ে স্টেজের দিকে যাচ্ছে ছেলেরা।স্টেজের দিকেও গেট বসানো হয়েছে। দুর থেকে দেখা যাচ্ছে মেয়েরা গেট ধরেছে। গেটের সামনে লাল ফিতা বাধা।ছেলেরা সকলে ঢুকতে যাবে,তখনই মেয়েরা বাধা দেয়।মেয়েদের সামনে টেবিল।টেবিলে ফলের জুসসহ হরেক রকমের মিষ্টি রাখা।মেয়েদের লিডার রুহানি আর রিয়ানা। তারা সামনে দাঁড়িয়ে আছে।ছেলেদের লিডার রাহুল,আরিয়ান আর সাহিল। তারা তিনজনে এসে রুদ্রর পাশে দাঁড়ালো।
-“কী ব্যাপার আপনারা সবাই এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন আপুরা?”সাহিল টিপ্পনী কেটে বললো।

-“আসলে ভাইয়া,এখানে ঢুকতে হলে নগদ অর্থ দিয়ে ঢুকতে হবে।আমাদের মেয়েকে তো আর আমরা এমনি এমনি দিয়ে দিতে পারি না।আমাদের মেয়ের দাম আছে।” রুহানিও মুখ বাকিয়ে বললো।
-“অর্থ দিয়ে ঢুকতে যাব কেন?কোনো টাকা দিতে পারবনা।আমাদের ছেলে কী বানের জলে ভেসে এসেছে নাকি।সামনে থেকে সরুন।নয়তো সবাইকে ঠেলে ঢুকব।”

রাহুল হুমকি দিয়ে বললো।”সাবাস” রুদ্র মনে মনে রাহুলকে বাহবা দিয়ে বললো।রাহুলের হুমকি শুনেই মেয়েরা একসাথে চেচিয়ে উঠে। সাথে শুরু হলো তাদের ঝগড়া। একপক্ষ যেন অন্যপক্ষকে একচুল পরিমাণ ছাড় দিতে চাইছে না।মেয়েদের দাবি চল্লিশ হাজার টাকা। এ টাকা না দিয়ে একপাও আগাতে পারবে না ছেলেরা।মুস্তাফিজ খান তাদের ঝগড়া দেখে দৌড়ে আসেন।ছেলেদের সাথে আসা মুরব্বিদের নিয়ে ভেতরে ঢোকেন।কিন্তু একটা ছেলেকেও ঢুকতে দেয় না মেয়েরা।তাদের একটাই দাবি চল্লিশ হাজার টাকা।ছেলেদের সাথে বর নিজেও ঝগড়া করছে। তারা দরকার হলে এসব জুস,মিষ্টি খাবে না।তারপরও টাকা দিবে না।অবশেষে প্রায় চল্লিশ মিনিট পর তাদের ঝগড়া শেষ হলো। মেয়েরা বিজয়ী হলো।ছেলেরা হার মেনে আত্মসমর্পণ করলো।এই ঝলসে যাওয়া রোদে দাঁড়িয়ে থাকা আসলেই কষ্টকর ।আরিয়ান গুনে গুনে চল্লিশ হাজার টাকা তুলে দিল রুহানির হাতে।টাকাটা রুয়ান চৌধুরীই আরিয়ানকে দিয়েছিল।যদিও আরেকটু বারিয়ে দিয়েছেন।আরিয়ান চল্লিশ হাজার টাকা গুনে নিয়ে বাকিটা আবার নিজের পকেটে রেখে দিল।এটা দিয়ে ছেলেরা পার্টি করবে।রুহানি আর রিয়ানা মনে মনে আফসোস করে উঠলো আরিয়ানকে বাকি টাকা পকেটে রেখে দিতে দেখে।ইশ!আরেকটু বাড়িয়ে বলা উচিত ছিল।রিয়ানা রুদ্রকে মিষ্টি আর জুস খাইয়ে দিল। যখনই প্লেট টেবিলে রাখতে যাবে তখনই সঙ্গে সঙ্গে ছেলেরা প্রতিবাদ করে উঠল।এতক্ষণ তো শুধু রুদ্র দাঁড়িয়ে ছিল না।এই অসহ্য রোদে ওরা সবাই রুদ্রর সাথে দাঁড়িয়ে ছিল।তাহলে রুদ্রকে জুস আর মিষ্টি খাওয়ানো হলে ওরা পাবে না কেন?রিয়ানা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। টাকা যখন নিয়েছে তখন ওদের দাবি মানতেই হবে। রিয়ানা সবাইকে একে একে মিষ্টি খাইয়ে দিল।মুখ বিকৃত করলো সাহিল। বিতৃষ্ণায় মনটা ছেয়ে গেলো নিমিষেই।আর কাউকে বুঝি পায়নি।রিয়ানাকেই কেন সবাইকে মিষ্টি খাইয়ে দিতে হবে?তারপরও পরিস্থিতি ভেবে চুপ থাকলো। রুহানি রুদ্রকে ফিতা কাটার জন্য হাতে কাচি দিল।রুদ্র ফিতা কেটে সকলকে নিয়ে ভেতরে ঢুকলো।

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here