#উৎসর্গ
#পর্ব:১২
#তানজিনা ইসলাম
রুদ্রসহ সকলকে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হলো।ছেলেরা সবাই রুদ্রর সাথে স্টেজে ছবি তুলছে।তখনই রুহানি আসলো ওখানে।হাতের ইশারা দিয়ে রাহুলকে ডাকলো।রাহুল স্টেজ থেকে নেমে রুহানি কে বললো
-“আবার ডাকছিস কেন?তোদের সব দাবি মিটিয়েই তো ভেতরে ঢুকেছি।”
-“আরে ইয়ার সে জন্য না।মায়াকে পালকি করে আনা হবে এখানে।তুই তো মায়ারও বন্ধু। ওর প্রতিও কিছু দায়িত্ব আছে তোর।পালকি ধরার জন্য ডাকছে।”
-“কী বলিস?এখান থেকে এখানে পালকি করে আনতে হবে কেন?”
-“এটা নাকি এ বাড়ির নিয়ম।রুদ্রর দাদা তার স্ত্রী কে পালকিতে করে এ বাড়িতে এনেছেন।তারপর থেকে এ বাড়িতে এ নিয়ম তৈরী হয়েছে।নতুন বৌকে পালকিতে করে আনতে হবে।”
-“এ বাড়িতে ঠিক কত ধরনের নিয়ম আছে আমাকে বলবি?এ যুগে এসে এসব নিয়ম কে মানে ভাই?”রাহুল অবাক হয়ে বললো।
-“জানি না।তুই তাড়াতাড়ি চল।আরিয়ান আর সাহিলকেও ডেকে আন।ওদিকে সবাই অপেক্ষা করছে।”বলেই রুহানি দ্রুত পায়ে চলে যায়।
রাহুল, সাহিল আর আরিয়ানকে ডেকে আনে।ওঁদের কে যেতে দেখে, রুদ্র কোথায় যাচ্ছে জিজ্ঞেস করলে বাড়ির নিয়ম নিয়ে পিন্চ মারতেও ছাড়ে না।
তিনজনই কাঙ্ক্ষিত যায়গায় পৌঁছে দেখে পালকি রাখা আছে সদরদরজার সামনে। রুয়ান চৌধুরীর, মুস্তাফিজ খানসহ বড়দের মধ্যে কয়েকজন উপস্থিত আছে। রুহানি মায়াকে নিয়ে বাইরে বের হলো।আরিয়ান থমকালো মায়াকে দেখে।বুকের ভেতর অসহ্য ব্যাথাটা আবার শুরু হয়েছে।নিজের প্রিয় মানুষ কে অন্যের হয়ে যেতে দেখা কী এতই সোজা?মায়া জোর করে হলেও তার ভালোবাসা কে নিজের করেছে।কিন্তু সে?তার হাসিমুখে বুকের ভেতর দাফন করা যন্ত্রণা টা তো কেও দেখলো না।এজন্যই হয়তো বন্ধুর প্রেমে পরতে নেই। আজ তার ভালোবাসার চাইতেও বন্ধুত্বটাকে বেশি প্রাইয়োরিটি দিতে হচ্ছে।তার মনের গহীনে লুকিয়ে রাখা প্রেয়সীর বিয়েতে উপস্থিত থাকতে হচ্ছে।উহু,সে তার প্রেয়সীর বিয়ে খেতে আসেনি।এসেছে তার প্রাণপ্রিয় বন্ধুদের এক হওয়া দেখতে। কিন্তু মনকে কী মানানো যায়?এই যে মায়াকে আজ অসম্ভব সুন্দর লাগছে। এত সুন্দর করে সেজেছে সে।এই সাজটা তো অন্য কারো জন্য।এই বিষাক্ত সত্যটা মেনে নিতে যে কষ্ট হচ্ছে, ভীষণ ভাবে কষ্ট হচ্ছে। আরিয়ান সবার অগোচরে চোখের কোণে জমা পানি মুছে নিল।বুকে হাত দিয়ে জোরে জোরে বার কয়েক শ্বাস নিলো।মুখে মিথ্যা হাসি ফুটিয়ে এগিয়ে চললো সামনের দিকে।
মায়ার মুখে হাসি ফুটলো আরিয়ানাকে দেখে।আরিয়ানের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বললো
-“এসেছিস তাহলে।আমার সাথে দেখা করতে যাসনি কেন?”
-“তুই তো সাজ দিচ্ছিলি।তাই আর ওদিকে যাইনি।এর চেয়েও বড় কথা হচ্ছে আমি তো তখন বর পক্ষ ছিলাম।তাই রুদ্রর সাথে থেকেছি সবসময়। এখন আবার কনে পক্ষ হয়ে তোর পালকি তুলতে এসেছি।”
-“এতদিন আসিসনি কেন?মিস করেছি তোকে অনেক!”
-“একটু অসুস্থ ছিলাম রে।বাদ দে এসব কথা, পালকিতে উঠবি চল।”
মাহেরা খান এসে মায়াকে পালকিতে উঠতে সাহায্য করলেন।পালকির তিনটি খুঁটি রাহুল,আরিয়ান আর সাহিল ধরলো।আরেকটি খুঁটি মুস্তাফিজ খান ধরলেন।রুহানি আর রিয়ানাও ওদের সাথে তাল মিলিয়ে হাটছে।গেট পেরিয়ে মায়াকে পালকি সমেত স্টেজের দিকে নিয়ে আসা হলো।পালকি নামিয়ে দিয়ে রাহুল দৌড়ে স্টেজে গিয়ে রুদ্রর হাত ধরে নিয়ে এলো।মায়ার পালকির সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বললো”হাত ধরে নামা ওকে”।
রুদ্র পালকির ভেতর হাত বাড়িয়ে দেয়।মায়া রুদ্রর হাত আকড়ে ধরে নিচে নামে।দুজনের চোখাচোখি হয়।রুদ্র মায়ার হাত ধরেই স্টেজে ওঠে।মায়া আর রুদ্রর সব বন্ধুরা ওওও… বলে চিল্লিয়ে উঠে।সব বন্ধুরাই দুজনের পিছু পিছু স্টেজে ওঠে।
ক্যামরাম্যান এক এক পোজ দিয়ে ছবি তুলে দিচ্ছে সবাইকে।সবার সাথে ছবি তোলা শেষে মায়া আর রুদ্রকে অনেকগুলো কাপল পিক তুলে দিলো।
খাওয়ার সময় রুদ্র আর মায়াকে পাশাপাশি বসানো হলো।সবার দাবিতে রুদ্র মায়াকে একটু করে খাইয়ে দিল। মায়াও রুদ্রকে এক লোকমা খাইয়ে দিল। দুজনের সুন্দর দৃশ্যটি রাহুল ক্যামরাবন্দী করলো।
অবশেষে বিয়ের সকল কার্যক্রম শেষ হলো।রাহুল,সাহিল আরিয়ান আর মুস্তাফিজ খান আবার পালকি তুলে মায়াকে বাড়ি পর্যন্ত নামিয়ে দিলো।রাফানা চৌধুরীর কথায় রুদ্র মায়াকে কোলে তুলে বাড়ির ভেতরে ঢুকলো।
মুস্তাফিজ খান, মাহেরা খান আর মায়ার বাড়ির সকল আত্মীয়রা বাড়ি ফিরে গেছে।রুদ্রদের কিছু কাছের আত্মীয় এখনো থেকে গেছে। মুস্তাফিজ খান যাওয়ার আগে রুদ্রর হাত দুটো ধরে বলেছিলেন
-“রুদ্র,যদি পারো আমার মেয়েটাকে ক্ষমা করে দিও।আমাদের ক্ষমা করতে বলছিনা তোমাকে।আমরা সবাই অন্যায় করেছি তোমার উপর,তার কোনো ক্ষমা হয় না। কিন্তু মায়া।ও তোমাকে অনেক ভালোবাসে রুদ্র।আমার মেয়েটাকে দেখে রেখো,প্লিজ।আমি জানি ও তোমার জন্য ঠিক কতটা পাগল!এক জীবনে ও শুধু তোমাকেই চেয়ে গেছে।তাই বাবা হয়ে নিজের মেয়ের ভালোবাসাকে পূর্ণতা দিতে তোমার সাথে অন্যায় করে ফেলেছি।তুমি ওকে আগলে রাখবে তো??”
রুদ্রর মুখ দিয়ে তখন কিছুই বের হয়নি।সে শুধু মাথা নেড়ে আশ্বস্ত করেছিল সে মায়াকে আগলে রাখবে সারাজীবন।
,
রাত একটার দিকে রুদ্র ঘরে ঢুকতে পারল।কক্ষে ঢুকেই তাড়াহুড়া করে দরজার সিটকিনি লাগিয়ে দিল।বুকে হাত দিয়ে দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে শ্বাস নিল।মনে হচ্ছে যেন যুদ্ধ করে এসেছে।মেয়েগুলো দরজা আটকে দাঁড়িয়ে ছিল। আবার নাকি টাকা দিয়ে ঢুকতে হবে।নয়তো ঢুকতে দেবে না।রুদ্র সাফসাফ বলে দিয়েছে যে কোনো টাকা দেবে না।শেষমেশ রাহুল আর আরিয়ানের সাহায্যে ছাড়া পেয়ে একপ্রকার যেন পালিয়ে এসেছে।রুদ্র কক্ষে চোখ বোলালো।ফ্লোরে গোলাপের পাপড়ি ছেটানো।বেডে রজনীগন্ধা আর গোলাপ দিয়ে সুন্দর করে সাজানো।আবার গোলাপের পাপড়ি দিয়ে মাঝখানে একটা লাভ আঁকা।সুন্দর একটা স্মেল আসছে।কিন্তু মায়া কোথায়? মায়ার তো এখানে বেডের উপর সুন্দর করে বসে থাকার কথা ছিলো। রুদ্র কক্ষে ভালো করে খুজে দেখলো।না পেয়ে, বেলকনিতে গিয়ে খুঁজলো।আর পেয়েও গেলো। মায়া দাঁড়িয়ে আছে।এখোনো পরিপূর্ণ সাজেই আছে।মাথার দোপাট্টা পর্যন্ত খোলেনি। তার দৃষ্টি আকাশের দিকে।রুদ্র পা টিপে টিপে গিয়ে পেছন থেকে চিল্লানি দিলো। মায়া চমকে পেছনে ফেরে।রুদ্রকে দেখে বুকে থুতু ছেটায়। হৃৎপিণ্ড তড়িৎবেগে উঠানামা করছে।মায়া খেপে বললো
-“এই ছেলে, এভাবে কেউ আসে নাকি।আরেকটু হলেই হার্ট অ্যাটাক হয়ে যেত আমার।”
-“হার্ট অ্যাটাক হওয়া এতো সোজা নাকি?”
-“হ্যাঁ।তুই তো এটাই চাস।আমি যাতে হার্ট অ্যাটাক করে উপরে উঠে যায়।আর তুমি তোমার আরশিকে নিয়ে সুখে থাকবে।”
-“এখানে আরশির কথা কোত্থেকে আসছে ভাই?সবজায়গায় তোকে আরশির কথা আনতেই হবে তাই না।
-“আমি তো আনতে চাই না।ওই তো চলে আসে মাঝখানে।এখন একটু দূরে গিয়ে দাঁড়া।”
রুদ্র ভ্রু কুচকে একটু পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো।
মায়া চট করে ঝুঁকে রুদ্রর পায়ে সালাম করলো।রুদ্র চমকালো।মায়া থেকে এটা আশা করেনি ও।মায়া সালাম করলো তাও তার পা ধরে।
-“এটা কী করলি?”
-“বড় খালামনি বলেছে এভাবে নাকি প্রথম রাতে স্বামীকে সালাম করতে হয়।তুই আমাকে নিজের বউ নাই মানতে পারিস।কিন্তু আমি তোকে নিজের জামাই মানি।তাই সালাম করলাম।বুঝলা, আমার প্রাণপ্রিয় স্বামী! “মায়া হাসি হাসি মুখ করে বললো। তারপর কিছু একটা ভেবে বলে উঠে “ইশ!তুই তো আমার ঘোমটায় খুলতে পারলি না।” তারপর রুদ্রর হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় কক্ষের দিকে।রুদ্র এত বিস্ময় একসাথে কাটাতে পারে নি।মায়া খাটের পাশে গিয়ে রুদ্রকে দাঁড় করিয়ে দেয়।খাটের উপর উঠে বসে ঘোমটা টেনে দেয়।
-“ঘোমটা খুলে দে সুন্দর করে।তারপর আমার মুখের দিকে চেয়ে বলবি একদম চাঁদের মতো সুন্দর তুমি।”
রুদ্র কী করবে ভাবতে পারছে না।নিজের ভাবনার কোনো কুল-কিনারা খুজে না পেয়ে রুদ্র মায়ার পাশে বসে মায়ার ঘোমটা খুলে দিল।তারপর মায়ার দিকে তাকিয়ে বলে উঠে
-“ইশ!একেবারে শেওড়াগাছের পেতনি লাগছে তোকে।আমাদের তেঁতুলগাছের পেতনি টা তোকে দেখে সিওরলি জেলাস ফিল করবে।”মিষ্টি কন্ঠে বললো রুদ্র।
মায়া রেগে রুদ্রর পেটে গুঁতো দেয়।রুদ্র হাসতে হাসতে বিছানার গড়িয়ে পরে।
-“বলদের মতো না হেসে আমাকে এসব গয়না খুলতে সাহায্য কর।”মায়া ঝাঁজালো কন্ঠে বললো।
না, পরিস্থিতি গরম হয়ে গেছে। রুদ্র এগিয়ে এসে মায়াকে সাহায্য করে।মায়ার কানের দুল,টিকলি,হাতের চুড়ি সবকিছু একে একে খুলে দেয়। মায়ার চুলের ক্লিপগুলোও খুলে দেয় যত্ন করে,যাতে মায়ার চুলে ব্যথা না লাগে।লাগেজ থেকে একটা সুতির সালোয়ার বের করে মায়া ওয়াশরুমে ঢোকে।রুদ্র গোলাপের পাপড়ি সরাতে শুরু করে বেড থেকে। বেড থেকে ফুলগুলো সরিয়ে রুদ্র বেলকনিতে আসে।আকাশে আজ তারার মালা।মৃদু মন্দ বাতাসও হচ্ছে কিছু সময় পরপর।
-“এখানে কী করছিস?”মায়ার ডাকে রুদ্র ঘোর থেকে বেরিয়ে আসে।
-“এমনিই দাঁড়িয়ে আছি।আজকে আকাশটা সুন্দর লাগছে অনেক।”
মায়া রুদ্রর পাশে এসে দাঁড়ায়।কন্ঠ খাদে নামিয়ে বললো
-“তুই আমাকে অনেক ঘৃণা করিস তাই না রুদ্র?”রুদ্র চমকে তাকালো।অস্হির স্বরে বললো
-“কী বললি?ঘৃণা করব তোকে?তুই আমার ঘৃণা করার মতো কেউ নাকি।”
-“এই যে আমি তোর সাথে কত অন্যায় করলাম।তোর আমার প্রতি রাগ হওয়ায় স্বাভাবিক। ”
-“যা করেছিস তার শাস্তি তুই পাবিই।ওটা নিয়ে চিন্তা করিস না।”
-“আমার শাস্তির মেয়াদ শেষ হলে তুই আমাকে ভালোবাসবি তো রুদ্র?”
রুদ্র ভাবলো।আসলেই কী ও মায়াকে একটুও ভালোবাসেনা?ভেতর থেকে উত্তর এলো-না,ভালোবাসে।একজন বন্ধুর মতোই ভালোবাসে ওকে।
-“আমি তোকে ভালোবাসতে পারব না কোনোদিন। তোর প্রতি সেসব অনুভূতি আনিনি কোনোদিন। “রুদ্র নরম গলায় বললো।
-“কেন আনিসনি? আমার তো এসেছে!তোর আসলো না কেন? অবশ্য না আসাটাই স্বাভাবিক। কতোগুলো বেডির কাছে যে নিজের অনুভূতি ওয়েস্ট করেছিস,আমার জন্য আসবে কী করে?”
-“তুই আর ওরা সেম না!”
রুদ্র গম্ভীর কন্ঠে বললো।মায়া একটু এগিয়ে গিয়ে রুদ্রর বাহু আঁকড়ে ধরে,মাথা রাখে।মোলায়েম স্বরে বলে
-“আচ্ছা বাদ দে এসব। আজ আমাদের বাসর রাত রুদ্র।”
রুদ্র ছিটকে দুরে সরে যায়।তুতলিয়ে বলে
-” তো তুই কী করতে বলছিস?”
-“দেখ আমাদের যখন প্রথম বিয়ে হয়েছিলো তখনও তুই কিছু করিসনি।যা মেনে নিলাম সে রাতে রেগে ছিলি তুই।বাট আজ!আজ রাতটা অন্যভাবে কাটানো উচিত।”মায়া রুদ্র দিকে এগোতো এগোতে বললো।মুখে তার দুষ্টু হাসি।রুদ্র পেঁচাচ্ছে।
-“দেখ একদম কাছে আসবি না।দুরে থাক।”
-“দুরে থাকার জন্য বিয়ে করেছি নাকি?”
রুদ্র দেয়ালের সাথে মিশে গেছে।পেছানোর জায়গা না পেয়ে ঢোক গিললো।মায়া এগিয়ে এসে রুদ্রর একদম কাছে দাঁড়ালো।নাক কুঁচকে বললো
-“এতো ড্রামা কোত্থেকে শিখেছিস।একটা মেয়েকে ভয় পাচ্ছিস।”
-“ভয় পাচ্ছিনা।কিন্তু তোকে আমার বিশ্বাস নেই। তুই আমার ইজ্জত হরণ করতেও দুইবার ভাববি না।”
মায়া কোমড়ে হাত রেখে বিরক্তি নিয়ে তাকায়।সিরিয়াসলি!
একটা মেয়ে হয়ে ও কী করে একটা ছেলের ইজ্জত হরণ করতে পারে ওর বুঝে আসে না।রুদ্র মাঝে মাঝে একটু বেশিই নাটক করে,মায়া ভাবলো।মায়ার ভাবনার মাঝেই রুদ্র মায়াকে সামনে থেকে সরিয়ে কক্ষের ভেতরে চলে গেল।
,
রুদ্র গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।এলোমেলো সিল্কি চুলগুলো কপালের উপর লেপ্টানো।তেলতেলে চেহারা।মাথার নিচে এক হাত রেখে মায়া খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে তাকে।চাউনি তে একরাশ মুগ্ধতা। কী আছে এই মুখে?কেন তার সারাক্ষণ এই মুখের দিকে চেয়ে থাকতে মন চায় মায়ার জানা নেই। ফজরের নামাজের পর মায়া যে ধ্যান দিয়েছে রুদ্রকে দেখার, সে ধ্যান এখনো ভাঙ্গেনি।রুদ্রকে হাজার ডেকেও মায়া ঘুম থেকে তুলতে পারেনি নামাজের জন্য।কিন্তু এখন যে মনে অবাধ্য ইচ্ছে জাগঠে।রুদ্রর এই ঘুমানোর সুযোগ নিতে মন চাচ্ছে মায়ার।জেগে থাকলে তো রুদ্রর সাথে ঝগড়া করেই কূল পায় না। আচ্ছা ও যদি এখন একটা চুমু খায় তাহলে কী রুদ্র জেগে যাবে?জেগে গেলে যাবে।রুদ্রকে ভয় পায় নাকি ও?মায়া আরেকটু এগিয়ে গেল রুদ্রর দিকে।নরম,ঠোঁট এগিয়ে চুমু বসালো রুদ্রর কপালে।তারপর দুই গালে,নাকে,দুই চোখে।এগিয়ে গিয়ে ঠোঁটে ঠোঁট ছোয়াতে যাবে তখনই রুদ্র তার নিজের ঠোঁটের উপর হাত রাখল।মায়া হতভম্ব হয়ে চোখ মেলে।
রুদ্র ছোটছোট চোখে চেয়ে আছে।মায়া ছিটকে দুরে সরে বসলো।চক্ষু যেন বেরিয়ে আসবে। রুদ্র জাগলো কখন?
রুদ্র শোয়া থেকে উঠে বসলো।মায়া আতঙ্কিত চোখে চেয়ে আছে। না,ও ভয় পায় নি।কিন্তু রুদ্রর এভাবে দেখে ফেলা হজম করতে পারে নি।
রুদ্রর শান্ত দৃষ্টি। হাটু জড়িয়ে ধরে তার উপর চিবুক রাখলো।
-“কী করছিলি?”
-“কয়, কিছু করিনিতো।”মায়া কন্ঠ খাদে নামিয়ে বললো।
-“কিন্তু,আমি যে দেখলাম।”
-“কী দেখেছিস?
-“মায়ার বাচ্চা, চালাকি করছিস?”
-“আমার বাচ্চা এখনো হয়নি রুদ্র।আর তোর যে অবস্হা মনে হয় না কোনোদিন হবে?
রুদ্র তেড়ে গিয়ে কিছু বলতে যাবে তখনই মায়া দৌড় দিল।দৌড়ে ওয়াশরুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল।রুদ্র ফোস করে শ্বাস ফেলে।অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে মায়ার বেরোনোর।কিন্তু অনেক সময় কেটে যাওয়ার পরও মায়ার বের হওয়ার কোনো নাম গন্ধও নেই। রুদ্র আর অপেক্ষা করতে না পেরে কক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়।
,
নিচে ডাইনিং এ রাফানা চৌধুরী নাস্তা দিচ্ছে সকলকে।রুদ্র চেয়ারে বসে বসে মোবাইল টিপছে।রুয়ান চৌধুরী খবরের কাগজ পড়ছে মনোযোগ দিয়ে।
-“মায়া কোথায়?”রাফানা চৌধুরী চেয়ারে বসতে বসতে বললেন।
-“তোমার বৌমা ওয়াশরুমে বসে গু* খাচ্ছে!”
-“কী ছাতার মাথা বলছিস এসব?”
-“ওয়াশরুমে ঢুকেছে মনে হয় দুই ঘন্টার উপর হলো, এখনো বের হয়নি।”
তখনই ধুপধাপ পা ফেলে মায়া নিচে নামলো।তার পরনে সাদা রঙের সালোয়ার।কাধে ব্যাগ ঝুলানো।এসে চেয়ারে বসলো সবার সাথে।
-“এতক্ষণে আসার সময় হলো তোর?”রাফানা চৌধুরী বললেন।
-“আরে মামনি।একেবারে রেডি হয়ে আসছিলাম।তাই দেরি হয়ে গেছে। ”
-“রেডি মনে হয় তিনি একা হয়েছেন?”রুদ্র মুখ বাকিয়ে বলে।
মায়া চোরা চোখে চেয়ে দৃষ্টি সরিয়ে ফেলল।এখন রুদ্রর সাথে না লাগাই ভালো।
-“রেডি হয়েছো, কোথাও যাবে নাকি?”রুয়ান চৌধুরী খেতে খেতে বললেন।
-“হ্যাঁ বাবাই।সামনে এক্সাম।এমনিতেই অনেক ক্লাস মিস দিয়ে ফেলেছি।এখন থেকে রেগুলার এটেন্ড করতে হবে।”
-“রুদ্রও তো যাবে মনে হয়। দুজন তাহলে একসাথেই যেও।”
-“হ্যাঁ।একসাথেই যাবো।”
-“দুপুরে ওর জন্য গাড়ি পাঠিয়ে দিও বাবা।আমি ভার্সিটি থেকে অফিসে চলে যাবো।”রুদ্র তার বাবাকে উদ্দেশ্য করে বলে।
-“আজকে যখন ভার্সিটি তে যাচ্ছোই তখন আর অফিসে যেও না।এতো পেইন নেওয়ার দরকার নেই।ওদিকটা আমি সামলে নেবো।”
-“না,সমস্যা হবে না।এখন যেহেতু সব নতুন করে শিখছি,সেহেতু কাজে ডিসট্রেকশান না দেওয়ায় ভালো।আমি সব ম্যানেজ করে নিব।”
-“আচ্ছা।তুমি যা ভালো বোঝো।”
রুদ্র মাথা নাড়ায়।মায়া রাফানা চৌধুরীকে উদ্দেশ্য করে বলে
-“বাড়ি এতো ফাঁকা কেনো মামনি?সব অতিথিরা কী চলে গেছে?আর তোমার বোনেরা?”
-“সবাই চলে গেছে রে।এত করে থাকতে বলার পরও থাকলো না।সবার স্কুল, কলেজ,ভার্সিটি খোলা তাই চলে গেছে সকলে।”
খাওয়া শেষে রুদ্র উঠে দাঁড়ালো। মায়াকে উদ্দেশ্য করে বলে
-“তাড়াতাড়ি শেষ কর। আমি বাইরে ওয়েট করছি।”
মায়া তার মামনি আর বাবাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাইরে গিয়ে দেখে রুদ্র ড্রাইভিং সিটে বসে অপেক্ষা করছে । দৃষ্টি তার দিকে নিবদ্ধ। মায়া গিয়ে অপর সিটে বসলো।রুদ্র গাড়ি স্টার্ট দিলো।
গাড়ি চলছে তার আপন গতিতে।দুজনের মধ্যে পিনপতন নীরবতা।মায়া রুদ্রর দিকে তাকিয়ে নিরবতা ভেঙ্গে বলে উঠলো
-“রেগে আছিস আমার উপর?”
রুদ্র বা-হাতে আলতো করে চড় লাগালো মায়ার গালে।মায়া গালে হাত দিয়ে অবাক হয়ে তাকালো।যদি থাপ্পড় মারলোই এতো আস্তে মারলো কেন?
-“চুমুর পরিণামে থাপ্পড়।”গালে হাত ঠেকিয়ে বললো মায়া।
-“এতো লুচ্চা হলি কবে থেকে? ”
-“লুচ্চামির কী করলাম?নিজের জামাইকে চুমু খেয়েছি।পর-পুরুষ কে তো আর চুমু খেতে যায় নি।”
রুদ্র বিরক্তি নিয়ে তাকালো।না,এই মহিলাকে কিছু বলা আর শক্ত পাথরে মাথা ঠোকা দুটোই একি।কাজের কাজ কিছুই হবে না,ঐদিকে মাথা ফেটে রক্তক্ষরণ হবে।রুদ্র ড্রাইভিং এ মনোযোগ দিলো।
,
এক্সামের নোটিশ দিয়ে দিয়েছে।মায়া মনোযোগ দিয়ে টিচারের লেকচার শুনছে।আর নোট খাতায় নোট করছে।সেকেন্ড বেঞ্চে বসেছে সে।তারপাশে রুহানি আর রিয়ানা।তাদের পেছনের বেঞ্চে রাহুল,রুদ্র,সাহিল আর আরিয়ান চারজন গাদাগাদি করে বসেছে।সবার প্ল্যান ছিলো একেবারে লাস্ট বেঞ্চে বসে চিল করবে।কিন্তু মায়া তা হতে দিলে তো?সে ওদের কথা না মেনে সেকেন্ড বেঞ্চে বসেছে।আর ওরা সবসময় একসাথেই বসে।একজনও কখনো টিম কে ছেড়ে অন্য বেঞ্চে গিয়ে বসে না।তবে মাঝেমধ্যে রুদ্রর ক্ষেত্রে তা ব্যাতিক্রম হতো।ওর পাশে মাঝে মাঝে আরশি বসতো।আর ওর বন্ধুরা ওদের দুজনকে বিরক্ত করার জন্য ওদের আশেপাশে বসতো ।মায়া যেহেতু সেকেন্ড বেঞ্চে বসেছে তাই সবাই লাস্ট বেঞ্চ থেকে ওর সাথে বসার জন্য চলে এসেছে।শুধু মায়া আর আরিয়ান ওই মনোযোগ দিয়ে ক্লাস করছে।বাকিরা হয় একজন আরেকজনকে বিরক্ত করছে।নয়তো কলমের ক্যাপ দিয়ে গুতোচ্ছে।মায়া কিছুক্ষণ ওদের দেখছে তো কিছুক্ষণ পাশের রো তে বসা আরশিকে দেখছে।বেচারি বার বার রুদ্রকে কিছু বলার চেষ্টা করছে।কিন্তু টিচার থাকায় পারছে না। অবশেষে টিচারের লেকচার শেষ হলো।সবাইকে এক্সামের কথা পুনরায় মনে করিয়ে দিয়ে ক্লাস ছেড়ে বেরিয়ে গেলো। মায়া খাতা গুছিয়ে উঠে দাড়ালো।
সবাই মায়া আর রুদ্রর কাছে আসছে শুভকামনা জানাতে।ক্লাসের চেনা পরিচিত অনেককে দাওয়াত দেওয়া হলেও অনেকেই বিয়েতে উপস্থিত থাকতে পারে নি।তাই এখানে শুভকামনা জানাচ্ছে।যেহেতু মায়া ক্লাসের ক্যাপ্টেন আর ওদের গ্যাংকে অনেকেই সমীহ করে চলে তাই সবাই নতুন জীবনের জন্য শুভকামনা জানাতে আসছে।
প্রায় সবাই যখন ক্লাস থেকে ক্যান্টিনের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেলো।আরশি তখন রুদ্রর সামনে এসে দাড়ালো।অনেকক্ষণ ধরেই সে চেষ্টা করছিলো কিন্তু সবার জন্য আসতে পারছিলো না।
-“তৃমি নাকি বিয়ে করেছো রুদ্র?”আরশি ভাঙ্গা গলায় বলে।
-“হ্যাঁ।করেছি।”
আরশির অসম্ভব খারাপ লাগলো। কিন্তু তা হজম করলো।রুদ্রর কাছে অনেক প্রশ্নের উত্তর যে জানার আছে।প্যানিক হয়ে পরলে এসব কিছুই শোনা হবে না।
-“কিন্তু তুমি তো আমাকে ভালোবাসতে বলো।কেনো করলে এমন?”
-“আমি দুঃখিত আরশি।আমার তোমার সাথে এমন করা উচিত হয়নি। নিজের অজান্তেই ঠকিয়ে ফেলেছি তোমাকে।যদি পারো ক্ষমা করো আমায়।”
-“তুমি অজান্তে কষ্ট দাওনি আমায়।জেনেই সব কষ্ট দিয়েছো।আর তুমি ক্ষমা কেন চাইছো।আমি তো তোমার ক্ষমা চাওয়া দেখতে চায়নি। হয়তো তোমার কাছে সব নাটক আর টাইমপাস ছিলো।কিন্তু আমিতো তোমায় ভালোবেসেছি।আমার ভালোবাসা তো মিথ্যা ছিলো না।”
-“আমি তোমার সাথে এমন করতে চাইনি আরশি।”
আরশির চোখে পানি।রুদ্র আড়চোখে মায়ার দিকে চাইলো।ওর সব বন্ধুরা মায়ার সাথেই দাড়িয়ে আছে। আচ্ছা ওর কী আরশির জন্য একটু হলেও খারাপ লাগছে না?অনুশোচনা হচ্ছে না মনে?কারো ভালোবাসা কেড়ে নেওয়ার গিল্টি হচ্ছে না? মেয়েটা এতো পাথর কেন?
-“রুদ্র শুধু একবার বলো যে তুমি আমাকে এখনো ভালোবাসো।”রুদ্র তাকালো আরশির দিকে। চোখেমুখে অসম্ভব আশা নিয়ে আরশি তাকিয়ে আছে রুদ্রর দিকে।রুদ্র কিছু বলতে পারছে না।
মায়া এগিয়ে এলো ওদের দিকে। আরশির কাধে হাত রেখে বললো
-“তোকে ভালোবাসলে কী আর আমাকে বিয়ে করতো?”
-“তুই জোর করে বিয়ে করেছিস ওকে তাই না?”আরশি মায়ার হাত ঝারা মেরে সরিয়ে দিয়ে বলে।মায়া ফিচেল হাসলো।
-“আমার এতো সাহস কোত্থেকে আসবে যে ফারাবি চৌধুরী রুদ্র কে জোর করে বিয়ে করব আমি?ইজ হি এ চাইল্ড?যে আমি তাকে জোর করলাম আর সে সুরসুর করে বিয়ের পিড়িতে বসে গেলো!”
-“তুই সব করতে পারিস।অসম্ভব কিছুই না তোর কাছে।”
নাক ফুলালো মায়া।দাঁতে দাঁত চেপে বললো
-“জানিসই যখন সব করতে পারি তাহলে আমার জিনিসে হাত বাড়াতে এসেছিস কোন সাহসে?সাবধান করছি।এতদিন কিছু বলিনি মানে এই না যে এখনও কিছু বলবো না।এতোদিন অধিকার ছিলো না, তবুও অযাচিত অধিকার ফলিয়েছি অনেকভাবে। আর এখন তো অধিকার আছেই।কী করতে পারবো ভেবেনিস।দুরে থাক ওর থেকে নয়তো,
তুই জানিস আমি কতটা নিচে নামতে পারি!”
#চলবে

