উৎসর্গ #পর্ব:১৩ #তানজিনা ইসলাম

0
23

#উৎসর্গ
#পর্ব:১৩
#তানজিনা ইসলাম

রুদ্রর অফিস থেকে ফিরতে সন্ধ্যা পার হয়ে গেলো।দিনের আলোকে ছাপিয়ে রাতের অন্ধকার গ্রাস করে নিয়েছে চারিদিক।রুদ্র কক্ষের ভেতর ঢুকে ব্যাগ রাখলো টেবিলে।এসি ছেড়ে দিয়ে সটান হয়ে শুয়ে পরলো বিছানার উপর। আজকে একটু বেশিই চাপ পরেছে ।আসলেই ভার্সিটি থেকে শেষ করে অফিস সামলানো চারটি খানি কথা নয়।তারপরও সে তার বাবাকে সাহায্য করতে চায়।বাবার কথা মনে করলেই এসব কষ্ট, কষ্ট বলে মনে হয় না।

রুদ্র সিলিং এর দিকে তাকিয়ে দুপুরের কথা ভাবছে।অনেক কষ্টে বেঁচে ফিরেছে সে ভার্সিটি থেকে। আজকে হয় ও মায়ার হাতে খুন হতো নয়তো ওর অন্য বন্ধুদের হাতে। ওদের সামনে কখনো আরশির সাইড নেওয়া যায় না।কেন ওরা আরশিকে সহ্য করতে পারে না ?উত্তর একটাই, মায়া।মায়ার পছন্দ না আরশিকে।তাই ওর ফ্রেন্ডদের কারো সহ্য হয় না ওকে।রুদ্র দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ওর মা-বাবার মতো ওর বন্ধুরাও সবসময় মায়ার পক্ষই নেয়।মায়া ওদের কাছে সবচেয়ে পছন্দের।ওরা সবাই একপেশে মায়ার দিকেই টানে। মায়ার ভালোলাগা খারাপলাগা সবকিছুই ওদের কাছে অনেক বেশি ম্যাটার করে।ওর যে ম্যাটার করে না তা না।মায়া তো ওর বন্ধুই।কিন্তু মাঝে মাঝে অসম্ভব হিংসার বশবর্তী হয়ে যায় ও।শুধু ওরটাই কেন দেখে না কেও?প্রতিশোধ নিতে হবে।

মায়ার ওপর যেমন তেমন ভাবে প্রতিশোধ নেবেই ও।কিন্তু ওর দৌড় প্রতিশোধের প্ল্যান বানানো পর্যন্তই।প্রতিশোধ টা কীভাবে নেবে সেটাও ভাবা হয়ে উঠে না।প্রতিশোধ কার্যকরও হয়ে উঠে না।রুদ্র উঠে বসলো।মেয়েটাকে কখনো কক্ষে পাওয়া যায় না কেন?এখন কোথায় আছে কে জানে?কোথাও দু-দন্ড বসে থাকতে পারে না। রুদ্র ওঠে দাঁড়ালো।কক্ষ ছেড়ে অন্যান্য কক্ষে খুঁজে দেখলো।ছাঁদে গিয়ে পুরো ছাঁদ খুঁজে দেখলো।সিড়ি বেয়ে নিচে নেমে ডাইনিং, ড্রইংরুম খুঁজলো।আশ্চর্য! মেয়েটা গেলো কোথায়?ওর মামনির কাছে গিয়ে বসে নেইতো?মা-বাবার কক্ষে গিয়ে দেখলো রাফানা চৌধুরী বসে বসে কোরআন পড়ছে।তার বাবা হয়তো বাইরে কোথাও গেছে।

-“মায়া কোথায়,আম্মু?”

রাফানা চৌধুরী মাথা তুলে তাকালেন।
-“চলে এসেছো তুমি।বাড়িতেই কোথাও আছে।খুঁজে দেখো। আর কোথায় যাবে?তোমার কিছু লাগবে?”

-“না কিছু দরকার নেই। তুমি পড়ো।খুঁজে পাচ্ছিলাম না তাই তোমার কাছে জিজ্ঞেস করতে আসলাম।বাগানে গেছে হয়তো।আমি দেখে আসছি।”

রুদ্র বাগানে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পরে।মাথার উপর চাদঁ।আজ হয়তো পূর্ণিমা তিথি।রুদ্র হেটে বাগানের দিকে যাচ্ছে,চাঁদ টাও ওর সাথে সাথে হাটছে।
রুদ্র দুর থেকে দেখলো মায়া দোলনায় বসে আছে।চাঁদের আলো উপচে পরছে তার চোখে মুখে। অন্যমনস্ক হয়ে কী যেন ভাবছে।রুদ্র মায়ার সামনে গিয়ে কোমড়ে হাত দিয়ে দাঁড়লো।মায়া আচমকা রুদ্র কে দেখে জোরে একটা চিৎকার দিলো। রুদ্র চোখমুখ কুঁচকে বললো
-“চিল্লাচ্ছিস কেন শাঁকচুন্নি? ”

-“এভাবে কেউ সামনে আসে?”বুকে থুতু দিয়ে বললো মায়া।
-“এখানে বসে আছিস কেন?”

-“এমনিতেই।ভালো লাগছিলো দোলনায় চড়তে।বোস আমার পাশে।”মায়া এক সাইডে সরে গিয়ে রুদ্র কে জায়গা করে দিয়ে বলে।
রুদ্র মায়ার পাশে বসলো।মায়া রুদ্রর বাহু আকড়ে তার কাধে মাথা রাখে।মোহময় কন্ঠে আওড়ায়
-“দেখ কী সুন্দর জোৎস্না রাত!”

-“হুম। অনেক সুন্দর। ”

-“ভালোই হয়েছে দোলনা টা থাকায়। অফিস থেকে এসে ড্রেস বদলাসনি কেন?”

-“তোকে খুঁজতে খুঁজতে আর শার্ট বদলানোর সময়ই পাই নি।ঘামের গন্ধ বেরোচ্ছে? ”

-“উহু। এভাবেই ভালো লাগছে। “মায়া রুদ্রর বাহুতে নাক লাগিয়ে বললো।

-” মায়া। কন্ট্রোল। ”

মায়া জোরে হেসে দিলো।রুদ্র নিজেও হাসে ওর সাথে।দোলনা ছেড়ে উঠে দাড়িয়ে বলে
-“বাড়িতে চল।ফ্রেশ হওয়া দরকার।”।মায়া দোলনা ছেড়ে উঠে দাড়ালো।
,

রুদ্র শাওয়ার নিয়ে বের হয়।পরনে শুধুই টাওয়াল।গায়ে বিন্দু বিন্দু পানি।ভেজা চুলগুলো কপালের উপর এসে পরেছে। আরেকটা টাওয়াল দিয়ে মাথা মুচছে।মায়া বিছানায় বসে ফোন টিপছিলো।রুদ্রকে বেরোতে দেখে মোবাইল পাশে রেখে রুদ্রর দিকে দৃষ্টি দিলো।রুদ্র ভ্রু কুঁচকে শুধালো
-“এভাবে কী দেখছিস?”

-“তোমাকে দেখি।”মায়া দু’হাতে মুখ ঢেকে বললো।”

-“শোধরালি না আর। আর আমাকে দেখার কী আছে? আমি এতটাও সুন্দর নই।ফর্সা গায়ের রংও নেই আমার।”

-“আমার কাছে তো তুই সবচেয়ে সুন্দর। এভাবে আর কখনো বলবি না।”

রুদ্র মায়ার দিকে তাকালো।মায়া কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছে তার দিকে।এতক্ষণ দুষ্টুমি ভাবটা আর নেই।রুদ্র হেসে মাথা নাড়লো।
-“আচ্ছা আর বলবো না।তারপরও মুখটা কে বাংলা পাঁচের মতো করে রাখিস না।”

-“মোটেও আমি বাংলা পাঁচের মতো মুখ করে রাখিনি। জিম করিস,বন্ধু?”

-“অবশ্যই।আমি প্রতিদিনই জিমে যায়।যদিও এই কয়েকদিন যাওয়া হয়নি বিয়ের ঝামেলায়।”

মায়া সাইড টেবিল থেকে জুসের গ্লাস নিয়ে রুদ্রর দিকে এগিয়ে দেয়।
-“বাহ!লেবুর শরবতও বানিয়ে এনেছিস আমার জন্য।”

-“আমিই তো করবো এখন সব।এখানে তোমার আরশি আসবে নাকি তোমাকে জুস বানিয়ে দিতে?”মায়া মুখ বাকিয়ে বলে।রুদ্র প্রশ্নের উত্তর দিলো না।মায়ার সাথে না লাগাই বুদ্ধিমানের কাজ।কারণ রুদ্র কখনোই মায়ার সাথে কথাই জিততে পারে না।রুদ্র এক নিশ্বাসে পুরো গ্লাস শেষ করলো।আসলেই অনেক তৃষ্ণা পেয়েছিলো।

মায়া আবার মোবাইল দেখায় মনোযোগ দেয়।রুদ্র কাবার্ড খুলে টিশার্ট নিতে যাবে তখনই দেখে কাবার্ডে ওর একটাও ড্রেস নেই।সব মায়ার ড্রেসে ভর্তি। একি, ওর সব পোশাক গেলো কই?রুদ্র ওয়ারড্রব খুলে দেখলো।সেখানেও সব ড্রেস মায়ার। ড্রেসিং টেবিলেও সব মায়ার জিনিস।
-“আমার ড্রেসগুলো সব কোথায়,মায়ু?”

-“কাবার্ডেই আছে সব দেখ।”

-“এসে খুঁজে দে।পাচ্ছিনা কিছু।এখানে সব তোর ড্রেস।”

মায়া মোবাইল রেখে কাবার্ডের দিকে এগিয়ে যায়।কাবার্ডের অপর পার্টের দরজা খুলে রুদ্রর ড্রেস দেখিয়ে দেয়।
-“এইতো সব এখানে।”

ড্রেস রাখা জায়গার দিকে তাকিয়ে রুদ্র হতভম্ব হয়ে গেলো।পাঁচ ভাগের এক ভাগ জায়গায় রুদ্রর ড্রেসগুলো রাখা।গুছিয়েই রেখেছে সব।
-“মায়া সিরিয়াসলি।পুরো কাবার্ডই তো তুই দখল করে ফেলেছিস।আমাকে আর এটুকু জায়গা দেওয়ার কী দরকার ছিলো?”

-“দেখ রুদ্র এখানে যেমন তোর অধিকার আছে,তেমন সমান অধিকার আমারও আছে।অর্ধেক তোর, অর্ধেক আমার।ঘরের সব ফার্নিচারে অর্ধেক আমার অধিকার আছে।”

-“আরে নে না তোর অর্ধেক অধিকার।কিন্ত বাকি অর্ধেক জায়গা তো আমার।প্রায় পুরোটাই তো তোর দখলে। ”

-“আমার ড্রেস বেশি তাই জায়গাও বেশি লেগেছে।আর তোর ড্রেস তো গুছিয়েই রেখেছি।এলোমেলো করে তো আর রাখিনি।”

-“এতো কথা জানি না।যখন বলেই দিয়েছিস অর্ধেক অর্ধেক।তখন কাবার্ডের অর্ধেক জায়গা আমাকেই দিতে হবে।আমার জায়গা থেকে তোর ড্রেস গুলো সরা।”

-“আমার একটা ড্রেসেও হাত দিবি না।”

-“আমি তো হাত দেবোই। “বলেই রুদ্র যখনই মায়ার ড্রেস নিতে যাবে তখনই মায়া রুদ্রর হাত আকড়ে ধরে।

-” খবরদার। আমার ড্রেস ধরবি না।”

-“আমি তো ধরবোই।”

বলতে বলতে দুজনের মধ্যে মারপিট লেগে গেলো। একজন আরেকজনকে ছেড়ে কথা বলছে না। রুদ্র মায়ার চুল টেনে ধরেছে। আর মায়া রুদ্রকে চড়, থাপ্পড়, ঘুষি সব দিচ্ছে।ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে দুজনেই মেঝেতে নিচে পরে গেলো।সেখানেও একজন আরেকজনকে মেরেই যাচ্ছে।একজন বলছে আমার অর্ধেক কাবার্ডের জায়গা আমাকে ফিরিয়ে দে।আরেকজন বলছে দিব না মানে দিব না।
দোতলা থেকে ভেসে আসা শব্দে রাফানা চৌধুরী আর রুয়ান চৌধুরী উপরে দৌড় দিলেন।এসে দেখে দুজনে মেঝেতে পরে মারপিট করছে।
-“দুজনের মধ্যে হয়েছে টা কী ?মারপিট করছো কেন?থামো বলছি। “রাফানা চৌধুরী থামানোর চেষ্টা করলেন।

কিন্তু তাঁরপরও দুজনের থামার কোনো নাম নেই। রাফানা চৌধুরী আর না পেরে জোরে ধমক দেন দুজনকে।
ধমক খেয়ে দুজনে উঠে দাড়ায়। মায়ার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে মুখের ওপর এসে পরেছে। মায়া হাত দিয়ে চুলগুলো কোনোমতে ঠিক করার চেষ্টা করে।
-” বাচ্চাদের মতো মারমারি করছিলে কেন?বাচ্চা নাকি তোমরা?”

-“মামনি আমি বলছি সব।”বলেই মায়া রাফানা চৌধুরীকে এ টু জেড সব বললো।

-“বেস।শুধু এইটুকুর জন্য দুজন এভাবে মারামারি করছিলে?রুদ্র, মায়া না তোমার বেস্টফ্রেন্ড।বেস্টফ্রেন্ডের জন্য এটুকু সেক্রিফাইস করতে পারছিলেনা তুমি?”

-“মা।এইটাকে তুমি এইটুকু সেক্রিফাইস বলছো।তুমি নিজেই চেক করে দেখো পুরো কাবার্ড দখল করে নিয়েছে ও।আমার জন্য শুধু একটু করে জায়গা রেখেছে।”

-“কিন্তু তাই বলে তুমি ওর গায়ে হাত তুলবে?ওর চুল টেনে ধরেছো কোন সাহসে?”রুয়ান চৌধুরী রেগে বললেন।

-“বাবা,আমি ওর চুল ধরেছি সেটা দেখছো।কিন্তু ও যে আমাকে মেরেছে সেটা দেখছো না।পারশিয়ালিটি কেনো করছো?” হাত দেখিয়ে বললো
-“দেখো,ওর রাক্ষসের মতো নখগুলো দিয়ে কীভাবে খামছে দিয়েছে!র*ক্ত পরছে।ওঁকেও কিছু বলো।”

-“ও নিজেকে বাঁচানোর জন্য মেরেছে তোমাকে।এমনি এমনি মারে নি।আমার মেয়েটা কতটা ব্যাথা পেয়েছে চুলে।”রাফানা চৌধুরী মায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে দুঃখী মুখ করে বললেন।

মায়া জিহ্বা দেখায় রুদ্রর দিকে তাকিয়ে।রুদ্র হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে তিনজনের দিকে।ওর মা-বাবা বারবার জিজ্ঞেস করছে মায়া কোথাও ব্যাথা পেয়েছে কিনা?এই মুহূর্তে ওর হাত-পা ছড়িয়ে কাঁদতে মন চাইছে।ওরা সত্যিই ওর বাবা-মা তো?নয়তো ওর প্রতি এতটা অবিচার কেন?
-“নিচে চল।এখানে আর তোকে থাকতে হবে না।কিভাবে মেরেছে আমার মেয়েটাকে।”রাফানা চৌধুরী মায়াকে ধরে নিয়ে যেতে যেতে বলেন।
মায়া পিছনে ফিরে পাথর হয়ে যাওয়া রুদ্রর দিকে তাকিয়ে গা-জালানো হাসি উপহার দেয়।
,

রাতের নিস্তব্ধতা ঘিরে রেখেছে চারপাশ।সাথে রুদ্রর কক্ষেও এক রাশ নিস্তব্ধতা।কক্ষে ঝকঝকে আলো জলছে।এসির শো শো শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না।
রুদ্র বিছানার উপর বসে অফিসের ফাইল দেখছে।চোখে তার চশমা।কিছুক্ষণ পর পর চশমা ঠিক করছে আর ফাইলগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। পুরো বিছানায় একগাদা ফাইল ছড়ানো ছিটানো অবস্হায় আছে।পরশুদিন থেকেই প্রি-টেস্ট , তাই অফিসের কাজে বেশি সময় দিতে পারবে না।অনেক কাজ জমা হয়ে আছে। তাই আগেভাগে কাজগুলো গুছিয়ে রাখার চেষ্টা।সে আগে নিজেকে অফিসের এমডি হওয়ার যোগ্য প্রমাণ করতে চায়।যতই বাবার অফিস হোক তারপরও কেও যাতে তাকে অযোগ্য বলতে না পারে। মাঝে কেটে গেছে একদিন।কাল রাতের ঝগড়ার পর মায়া,রুদ্র কেও কারো সাথে কোনো কথা বলেনি।ঘুমানোর সময়ও কেও কারো সাথে কথা বলেনি।দুজন দুপাশ ফিরে ঘুমিয়েছে।যদিও রুদ্র কথা বলতে চেয়েছিলো,কিন্তু যতবারই মায়ার সাথে ঝগড়া হয় ততবারই রুদ্রই সরি বলে।তাই এইবার ও ভেবেই নিয়েছে মায়া যতক্ষণ না সরি বলবে ততক্ষণ কথা বলবে না।

রুদ্র ফাইল দেখার মাঝেই মায়া কক্ষে ঢোকে।রুদ্র একবার চোখ তুলে তাকায় না পর্যন্ত ।মায়া বিছানার একপাশে গিয়ে পা ঝুলিয়ে বসে।কাজে মনোযোগী রুদ্রকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠে
-“তোকে চশমা পরায় এতো সুন্দর লাগে জানতাম নাতো!”

রুদ্র অবাক হয়ে তাকালো মায়ার দিকে।মায়া মোবাইলে মনোযোগ দিয়ে গেমস খেলছে।মায়া যে প্রথমেই কথা বলা শুরু করবে তা ধারনা করেনি রুদ্র। নিজের অবাক হওয়া চেপে রেখে রুদ্র আবার ফাইল দেখায় মনোযোগ দেয়। একটু এটিটিউড তো দেখাতেই হবে। মায়ার এক বুলিতেই কথা বলে ফেলা নিজের ইগোকে হার্ট করে।মায়া নিজের মোবাইল পাশে রেখে,রুদ্রর হাতে ধরা ফাইল টান দিয়ে কেঁড়ে নেয়।
-“এটা কী হলো?”রুদ্র বিরক্তি নিয়ে বললো।

-“কী হবে?ইগনোর করছিস কেন?এটিটিউড দেখাচ্ছিস?”

-“ফাইল দে।কাজ করছি দেখতে পাচ্ছিস না।তুই কে হে যে তোকে ইগনোর করতে যাবো।কাজ আছে অনেক বিরক্ত করিস না।”

-“কথা বলছিস না কেন?”

-“তুই যে কারণে কথা বলছিস না আমিও সে কারনেই কথা বলছি না।তুমি কথা না বললে কিছু না,আর আমি এটিটিউড দেখালেই দোষ। ”

-“আমি তো কথা বলার চেষ্টা করছি।কিন্তু তুইতো সেই চেষ্টা টুকু সার্থক হতে দিচ্ছিস না।”

-“আসছে এখন চেষ্টা করতে।কাল পুরো রাত আজ পুরো দিন যে কথা বলিসনি সেটা মনে নেই।”

-“আমি কথা বলিনি বলে তুইও বলবি না?”

-“সবসময় আমিই কেন প্রথমে কথা বলবো।আমিই কেনো সরি বলবো সবসময়। কালকে বকাটাও আমিই খেয়েছি।যেখানে দোষ দুজনেরই সমান সমান ছিলো।মা-বাবা সবসময় তোর পক্ষই নেয়।”রুদ্র মন খারাপ করে বললো।

-“সেটা তো শুধু আজকে না।মামনি আর বাবাই সবসময় আমার পক্ষই নেয়। সেটাতো জানা কথা।”

-“কেনো নেবে?ওরা নিজেরা-ও এসে দেখেছে দোষ টা দুজনের ছিলো।তারপরও আমাকেই বকা দিয়েছে।সবসময় পারশিয়ালিটি করে।”

-“সেটা আমি কী করে জানবো আমার পক্ষ কেনো নেয়?আচ্ছা বাদ দে এসব।আই এম সরি।পরেরবার থেকে আর এমন করিস না।”

-“সিরিয়াসলি। এতো খাচ্চোর কেন তুই? দোষ দুজনেরই ছিল। তারপরও দায় আমার উপর চাপাচ্ছিস।”

মায়া টেডি হাসলো। রুদ্রর পাশ ঘেঁষে গিয়ে বসলো।রুদ্র মায়ার চুলে হাত দিয়ে বলে উঠে
-“আমার তোর চুল ধরে টানা উচিত হয় নি।মেয়েদের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা তাদের চুল।আর তোর চুল তো অনেক লম্বা।বেশি ব্যাথা পেয়েছিস?”

-“না।অতো জোরেও ধরিসনি।একটু এক্সট্রা একটিং করে ফেলেছি।কিন্তু আমি জানি তুই আমার মারে একটুও ব্যাথা পাসনি।”

-“ব্রো।যেখানে ছেলেরাই আমার সাথে জিততে পারে না।সেখানে তোর নরম হাতের মারে আমি আর কীই বা ব্যাথা পাবো!”রুদ্র ভাব নিয়ে বলে।
মায়া রুদ্রর দিকে নিজের হাতে থাকা ফাইল এগিয়ে দেয়।রুদ্র হাত বাড়িয়ে তা নেয়।
-“চশমা পরিস কখন থেকে?”

-“মাঝেমধ্যে পরি।মাথাব্যথা করলে বা কাজ করার সময় বা বেশিক্ষণ বই পরার সময়।”

-“হু।সুন্দর লাগছে তোকে।”মায়া মিটিমিটি হেসে বলে। রুদ্র বাকা চোখে তাকায়। মায়া পরক্ষণেই আবার বলে উঠে
-“শুধু কাজ করলেই হবে?খেতে হবে না?কত রাত হয়েছে তা খেয়াল আছে?”

রুদ্র দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকায়। টিক টিক শব্দে ঘড়ির কাটা অনবরত ঘুরে চলেছে। ঘড়ির কাটায় ১২ টা বেজে ৩৫ মিনিট।রুদ্র দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মায়ার দিকে তাকিয়ে বলে উঠে
-“এইতো ফাইলগুলোর কাজ শেষ করেই খাবো।মা-বাবা খেয়েছে।”

-“হ্যাঁ।তোকেও ডাকতে বলেছিলো, কাজ করছিস দেখে আর ডাকিনি।কিন্তু এখন খেয়ে নে রুদ্র।অনেক রাত হয়ে গেছে।”

-” অনেক কাজ থেকে গেছে রে।কালকেই ফাইলগুলো জমা দিতে হবে।কালকে প্রজেক্টের ফাইনাল ডেট। প্রথম বারেই ক্লাইন্টদের মনোক্ষুণ্ণ করতে চাই না।এখন যদি খেতে উঠি তাহলেও অনেক সময় চলে যাবে।”

-“তাই বলে খাবি না।তোর কষ্টটা বুঝি।স্টাডি,অফিস সব একসাথে সামলাতে হচ্ছে।এখন তোর বেশি স্ট্রং থাকা প্রয়োজন।আর স্ট্রং থাকার জন্য বেশি বেশি খেতে হবে।এতগুলো ফাইলের কাজ শেষ করতে করতে সিওরলি সকাল হয়ে যাবে ।”

-“আচ্ছা উঠছি।তুই খেয়েছিস?”

-“না,তোর সাথে খাবো।”

-“খাসনি কেনো তুই। এতো রাত হয়ে গেছে। মা-বাবার সাথে খেয়ে নিতি।ভালোবাসা দেখাচ্ছিস?”রাগী স্বরে বললে।

-“হুম। আমিই তো দেখাবো ভালোবাসা।আর কে দেখাবে?আমি খাইয়ে দেয়?” রুদ্রর গাল টেনে দিয়ে বললো মায়া।

-“তোর কষ্ট করতে হবে না।আমি উঠছি।তুই আগে নিজে খেয়ে নে।”

কিন্তু মায়া শুনলে তো।সে বিছানা ছেড়ে নেমে দাড়ালো। দ্রুত পায়ে কক্ষের বাইরে চলে গেলো।মিনিট দশেক পর আবার কক্ষে পিরে আসলো।হাতে ধরা ট্রেতে খাবার।মায়া বেডসাইড টেবিলে ট্রে টা রাখলো।রুদ্র ফাইল দেখার মাঝে মাঝে মায়ার কর্মকাণ্ড দেখছে। মায়া হাত ধুয়ে প্লেটে ভাত নিলো।
-“মায়ু।আগে তুই খেয়ে নে।”

-“একসাথে খাবো।গলদা চিংড়ি রান্না হয়েছে।তোর ফেবারিট ডিশ।”

রুদ্র হাসে।মায়ার দিকে করে বসে, যাতে মায়ার খাইয়ে দিতে সুবিধা হয়।মায়া খাইয়ে দিচ্ছে রুদ্রকে। সাথে নিজেও খাচ্ছে। রুদ্র তাকায় মায়ার দিকে।আলতো হাতে খাইয়ে দিচ্ছে তাকে।চোখেমুখে মায়া উপচে পরছে। রুদ্রর মনটা ভালো হয়ে যায়।এতো ভালোবাসা কপালে সইবে তো?
মায়া রুদ্রকে খাওয়ানো শেষে পানির গ্লাস এগিয়ে দেয়।ওড়নার শেষ অংশ দিয়ে রুদ্রর মুখ মুছে দেয়।
তারপর নিচে গিয়ে ট্রে রেখে আসে।
মায়া কক্ষে এসে পড়তে বসলো।মনে মনে ভেবে নিয়েছে।এবারেও ক্লাসে টপ করেই ছাড়বে ও।তিন বছরের পজিশন ধরে রাখতে হবে।ম্যাথ সল্ভ করতে বসেছে মায়া।পরশু ম্যাথ এক্সাম।মায়া পড়ার মাঝে রুদ্রকে উদ্দেশ্য করে বললো

-“অফিসের কাজ নাহয় শেষ করছিস।কিন্তু পরশু থেকে যে এক্সাম সেটা মনে আছে?এক্সামের জন্য কিছু পড়বি না?”

-“আমাদের কিছু পড়ার দরকার নেই।আমরা ছেলেরা এক্সামের আগের রাতে পরেই ফার্স্ট ক্লাস পেয়ে যায়। ”

-“তারমানে এবারেও সবকটা টুকলি করবি।”রুদ্র মাথা নাড়িয়ে হাসে।মায়া মনে মনে কয়েকটা গালি দিয়ে পড়ায় মনোযোগ দেয়।
,

এক্সাম শুরু হয়ে গেছে । দেড় মাস জুড়ে এক্সামের ডেট পরেছে।কিন্তু এবার মায়ার টিমের কারো সিট একসাথে পরেনি।তবুও সবার এক্সাম মোটামোটি ভালো হচ্ছে।রুদ্র,রাহুল,সাহিল ইচ্ছেমতো টুকলি করেছে।আরিয়ান এসবে নেই।সে পড়াশোনায় ভীষণ মনোযোগী। সবার চেয়ে বেশি বুঝদারও। দেড় মাসে আরশি অনেকবার রুদ্রর সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছে।কিন্তু বলতে পারে নি।মূলত রুদ্র নিজেই কথা বলতে চাইনি।কথা বললে আবার মায়া বাড়বে।আরশি আরো কষ্ট পাবে।রুদ্র আর কষ্ট দিতে চায় না কাউকে।কারো ভাঙ্গা মনের বদদোয়া অনেক কঠোর হয়।ও চায় না আরশির বদদোয়া নিতে।রুদ্রর সবসময়ই মনে হয় ও আরশির আবেগ ছাড়া আর কিছুই না। ও যেমন টাইমপাস করতে করতে আবেগে পরেছে।আরশিও তেমন প্রথম কারো আবেগে পরেছে।হয়তো নতুন কেও আসলে আরশি মুভ অন করতে পারবে।ভুলতে পারবে ওকে।তাই সবসময় আরশি থেকে দুরে থাকার চেষ্টা করছে।আজকে লাস্ট এক্সাম ছিলো।সবাই ক্যান্টিনে বসে আছে। আপাতত কয়েকদিনের শান্তি।ফাইনাল এক্সামের দেরি আছে আরো।তাই সবাই ক্যান্টিনে বসে চ্যায়ার আপ করছে।রুদ্র, রাহুল,আরিয়ান আর সাহিল কিছু নিয়ে আলোচনা করছে। মায়া,রিয়ানা আর রুহানি বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে আছে চারজনের দিকে।ওরা চারজন কানে কানে কিছু নিয়ে কথা বলছে বাট ওরা তিনজন সামনে আসলেই কথা থামিয়ে দিচ্ছে।মায়া আর না পেরে চারজনকে বলে উঠে
-“কিছু বলবি তোরা। সমস্যা টা কী?আমাদের সামনে এভাবে ফিসফিস করে কথা বলছিস কেনো?”

-“আসলে আমরা না একটা ডিসিশন নিয়েছি।বাট তোদের তিনজনকে বলতে পারবো না।”রাহুল ঢোক গিলে বললো।

-“আমাদেরকে বলতে যাবি কেন?আমরা তোদের বন্ধু নাকি।” মুখ বাঁকিয়ে বললো রুহানি।

-“আসলে আমাদের ভয় লাগছে তোদেরকে বলতে।”

-“আমরা ভুত নাকি ভাল্লুক?আমাদের ভয় লাগছে কেন?”

-“তোরা আমাদের প্ল্যান শুনলে আমাদেরকে সিওরলি মারবি।”সাহিল বললো।

সাহিল কে আর কিছু বলতে না দিয়ে রিয়ানা বলে
-“বলতে হবে না তোদেরকে। বললে বলবি না বললে নেই।আমাদের সামনে এত ফিসফিস করার দরকার কী?নাটক করছিস কেন চারজনে?”

-“আমরা একটা বেচেলর পার্টির অ্যারেন্জমেন্ট করেছি।শুধু ছেলেরা থাকবে সেখানে।মেয়েরা এলাউড না।”রুদ্র সবার উদ্দেশ্যে বলে।

-“ব্যাচেলর পার্টিতে তুই যাবি কেন?তুইতো ব্যাচেলর না।”মায়া গম্ভীর স্বরে রুদ্রকে বললো।

-“ব্যাচেলর পার্টি নাম দিয়েছি শুধু। যেহেতু শুধু ছেলেরা যেতে পারবে।বিবাহিত, অবিবাহিত সব ছেলে।”রুদ্র কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলে।

-” আমাদের ব্যাচের সব ছেলেরা থাকবে?”

-“হ্যাঁ।”

-“প্ল্যানের মূল হোতা কে?”মায়ার প্রশ্নে সবাই রুদ্রকে দেখিয়ে দেয়।রুদ্র মুখ কাচুমাচু করে বসে।

-“তোরা যে আমাদের ফ্রেন্ড ভাবিস না সেটা এবারে প্রমাণ করেই দিলি। পার্টি যখন দিলিই শুধুমাত্র ছেলেদের জন্যই কেন?আমরা মেয়েরা বাদ গেলাম কেন? “রুহানি রেগে বললো।সাথে কয়েকটা গালি ছুড়লো চারজনের উদ্দেশ্যে। ছেলেরা সাফাই দিয়ে কিছু বলবে তার আগেই মায়া উঠে দাড়ায়। রুহানি আর রিয়ানা কে উদ্দেশ্য করে ফুঁসে বললো

-“এই বেইমানগুলোর সাথে থাকার কোনো মানেই হয় না। রুহি, রিয়া চল এখান থেকে।এরা যা মন চায় তাই করুক।”

বড় বড় কদম ফেলে চলে যাচ্ছে মায়া। রুহানি আর রিয়ানাও ওর সাথে পা মেলালো।চেয়ারে বসা চারজনকে কিছু বলার সুযোগই দিলো না।

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here