উৎসর্গ #পর্ব:১৬ #তানজিনা ইসলাম

0
23

#উৎসর্গ
#পর্ব:১৬
#তানজিনা ইসলাম

হসপিটালের কেবিনের সামনে মাথা নিচু করে বসে আছে রুদ্র।একটু আগেই আরশিকে কেবিনে শিফট করা হয়েছে। ডক্টর বলেছেন আউট অফ ডেঞ্জার বাট এখনো বাড়ির কাউকে ভেতরে ঢোকার অনুমতি দেয়নি তারা।রুদ্রর পাশে সারিবদ্ধ চেয়ারে বসে আরশির মা চাপা কান্না করছেন। আরশির বাড়ির কয়েকজন আত্মীয় উপস্থিত আছে এখানে।একজন মহিলা আরশির মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছে।কিন্তু আরশির মা বিলাপ করেই যাচ্ছেন’ আমার মেয়ে আমার মেয়ে বলে’।

তাদের থেকে কিছুটা দুরে দাঁড়িয়ে আছে মায়া।রাহুল আর রুহানিও আছে ওর সাথে।মায়ার অস্থির অস্হির লাগছে।চোখের সামনেই একজন মা তার কলিজার টুকরাকে হারানোর ভয়ে কীভাবে কাঁদছে!মেয়েটাকে কতো গালমন্দ করেছে, অপমান করেছে।সবসময় একটা নিরব যুদ্ধ লেগেই থাকতো দুজনের মাঝে।এমনকি মেয়েটার ভালোবাসা পর্যন্ত কেড়ে নিয়েছে।কিন্তু কখনো এমন হোক সেটাতো চায়নি ও।
রাহুল খবর দেওয়ার পরপরই রাহুল,রুদ্র আর মায়া ছুটে এসেছিলো হসপিটালে। তখন আরশিকে ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডে রাখা হয়েছিলো।রুহানি একটু আগে এসেছে।তবে সে আরশির চেয়েও বেশি মায়ার জন্য এসেছে।সবসময় সবজায়গায় মায়ার সাথে যাওয়া এক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে ওর।পরিস্থিতিতে খারাপের দিকে যেতে পারে সে আশঙ্কায় মায়ার জন্য চলে এসেছে। যদি খারাপ কিছু হয় তাহলে অন্তত মায়ার পাশে দাঁড়িয়ে সাহস জোগাতে পারবে।
রাহুল সামনে তাকিয়েই বলে উঠলো
-“মেয়েটা এমন করলো কেন?”

-“সেটাইতো।কালকেওতো ভার্সিটিতে দেখলাম।হটাৎ আত্মহত্যার কারণ?কী এমন কষ্ট ছিলো কে জানে?”রুহানি চিন্তিত হয়ে বললো।

-“কালকেইতো ঝগড়া করলাম, আর আজকে এভাবে কষ্ট পাচ্ছে মেয়েটা।”

-“আল্লাহ ভালো করে দিক তাকে।কোনো মাকে যাতে তার মেয়েকে হারাতে না হয়।”

-“আমিন।”

-“সুইসাইড এটেম্প কীভাবে করেছে সেটা জানিস?”

-“শুনেছি হাতের শিরা কেটেছে।কিন্তু দরজা বন্ধ থাকায় ফ্যামিলির কেও দেখতে পায়নি।যতক্ষণে দরজা ভেঙে ঢোকা হলো ততক্ষণে অনেক রক্ত বেরিয়ে গেছিলো।”

-“ইশ!অনেক খারাপ হলো ইয়ার মেয়েটার সাথে।”রুহানি মন খারাপ করে বললো।

মায়া এতক্ষণের নিরবতা ভেঙে বললো
-“রুদ্র কেমন শান্ত হয়ে আছে দেখছিস?নিশ্চয়ই কষ্ট হচ্ছে ওর অনেক।”
-“কষ্ট হচ্ছে কিনা তা জানি না।তবে অপরাধবোধে ভুগছে নিশ্চিত। কেন জানি মনে হচ্ছে আরশির সুইসাইডের কারণ পরোক্ষভাবে রুদ্রই।”মায়ার পাশে দাঁড়িয়ে বললো রুহানি।

রুদ্র মাথা নিচু করে বসেই ছিলো তখনই একজন এসে ওর পাশে ধপ করে বসলো।রুদ্র মাথা তুলে তাকিয়ে দেখলো আরশির ছোট ভাই আমান। কাঁদতে কাঁদতে চোখমুখ ফুলিয়ে ফেলেছে।এখনো হেঁচকি তুলে কাঁদছে।আরশির সাথে রিলেশনে থাকাকালীন অবস্হায় আমানের সাথে অনেকবার দেখা হয়েছিল রুদ্রর।এই বছরেই ক্লাস এইটে উঠেছে ছেলেটা।সবসময় ছোট ভাইয়ের মতই স্নেহ করতো তাকে।রুদ্র আমানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো।স্নেহমাখা নরম কন্ঠে বললো
-“কেঁদো না আমান।ভালো হয়ে যাবে তোমার আপু।”

-“ভাইয়া, আপু এমন কেন করলো?আমার কথা কী তার একবারো মনে পড়েনি?দেখো না আম্মু কীভাবে কাদছে?”আমান কাঁদতে কাঁদতে বললো।

রুদ্র উত্তর দেয় না।এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যে তার নিজের কাছেও নেই।রুদ্র আমানকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে এক হাতে জড়িয়ে ধরলো।অপর হাতে জড়িয়ে সন্তর্পণে চোখের পানি মুছে দিলো।

-“রুদ্র ভাই।”আমান ভাঙ্গা গলায় ডেকে বললো।

-“বলো ভাইয়া।”

-“তুমি আপুকে ছেড়ে আরেকজনকে কেন বিয়ে করে নিলে?আরশি আপু তো তোমায় অনেক ভালোবাসতো।জানো যেদিন শুনেছিলো তুমি বিয়ে করেছো সেদিন অনেক কেঁদেছে।পুরো রাত ঘুমোইনি,দরজা বন্ধ করে শুধু কেঁদেছিলো।কেনো এমন করলে আপুর সাথে ভাইয়া?তোমার কী আপুর কথা একটুও মনে পরেনি?”

রুদ্রর অসম্ভব খারাপ লাগছে। ভালো নাইবা বাসলো তাকে কিন্তু তার জন্য মনে জমেছিলো অপ্রকাশিত মায়া।তাকে ঠকানোর কারণে অশেষ অপরাধবোধে ভুগেছিলো।রুদ্র অনেকবার সরি বলতে চেয়েছিলো আরশিকে, কিন্তু সেটা ওর ধাঁচের না, কারো কাছে ক্ষমা চায়নি ও কোনোদিন।তবুও
বারবার মন থেকে শুধু একটাই দোয়া করেছিলো যাতে মেয়েটা তাকে ভুলতে পারে।অন্য কেও এসে যাতে তার জীবনটা সুন্দর করে সাজিয়ে দেয়।তাইতো মেয়েটা হাজার বার কথা বলার চেষ্টা করলেও রুদ্র প্রত্যাক্ষান করেছিলো।জীবনে তো অনেক মেয়েই এসেছিলো।সবার সাথে সম্পর্ক ভেঙেও গেছে।তারা আবার নতুন কারো সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছে। কিন্তু কেওতো এমন করেনি।আরশি কেনো করলো। কেনো এমনটা হলো?এতটাই কষ্ট পেয়েছে যে মেয়েটা আত্মহত্যা করে বসলো। নিজের মা-বাবা ছোট ভাই কারো কথা ভাবলো না।

হঠাৎ দরজা খুলে একজন বয়স্ক ডাক্তার বেরিয়ে এলো।আরশির মা ছুটে গেলো তার কাছে।হুড়মুড়িয়ে প্রশ্ন করলো

-“ডক্টর আমার মেয়েটা বেঁচে আছেতো?ওর কিছু হয়নিতো?”

-“শি ইজ আউট অফ ডেঞ্জার। কিন্তু সেন্স কখন ফিরবে তা বলতে পারছিনা।আপনারা এখন গিয়ে পেশেন্টকে দেখে আসতে পারবেন।কিন্তু এতোজন একসাথে যাওয়া যাবে না।একজন একজন করে যান।কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবেন না।পেশেন্ট এর এখন ফুল রেস্ট দরকার।”বলেই ডাক্তার তার নিজের কাজে চলে যান।

আরশির মা কেবিনের ভেতরে চলে যান।রুদ্র দাঁড়িয়ে থাকে কেবিনের বাইরে।উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করে ভেতরে। কিন্তু দরজা প্রায় বন্ধ থাকায় ভেতরের কিছুই স্পষ্ট দেখা যায় না।
কাঁধে কেউ হাত রাখতেই রুদ্র পাশে ফিরে তাকায়। মায়া দাঁড়িয়ে আছে।রুদ্র মায়ার হাতে হাত রাখে।
মায়া শান্ত কন্ঠে প্রশ্ন করে
-“আরশি কে দেখতে ইচ্ছে করছে?”

-“আমি শুধু ওর মুখটা একবার দেখতে চাই মায়ু।বিশ্বাস কর, আমার বিয়েতে ও যতটা না কষ্ট পেয়েছে তার চেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছে আমার এই কয়েক মাসের অবহেলায়।আমার কষ্ট হচ্ছে রে।আমি তো কারও যন্ত্রণার কারণ হতে চাইনি।”

-“সব ঠিক হয়ে যাবে দেখিস।আরশি খুব তাড়াতাড়ি সেরে উঠবে। আন্টি বের হলেই কেবিনে ঢুকতে পারবি তুই।”

-“তুই প্লিজ আমাকে ভুল বুঝিস না। হ্যাঁ, হয়তো আমি ওঁকে ভালোবাসিনি। কিন্তু আমি খুব করে আবেগে পরেছিলাম রে। মেয়েটা এভাবে নিজেকে মেরে ফেলবে, তাও আমার জন্য সেটা আমি চিন্তাও করতে পারিনি।”

-“আমি অসুস্থ হয়ে গেলে, তুই আমার জন্যও এভাবে কষ্ট পাবি? কেয়ার করবি আমার?”

-“তুই এখানেও আরশিকে হিংসে করছিস মায়ু!”

-“হ্যাঁ, করছি। তুই এখন পুরোটাই আমার। তোর অন্য নারীর জন্য এই কনসার্ন আমার কলুষিত মন নিতে পারছে না। তোর উপর কোনো নারীর ছায়াও আমার সহ্য হয় না। ভালোবাসি তাই বোধহয়। আমার মনটা বড্ড পাথরের রে!”

রুদ্র নিষ্প্রাণ দৃষ্টি তে তাকালো মায়ার দিকে। দু’জনে অপেক্ষা করতে থাকে কেবিনের বাইরে।বেশকিছুক্ষণ পর আরশির মা আলিয়া শেখ কেবিন থেকে বের হয় চোখ মুছতে মুছতে।
রুদ্র কে কেবিনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার কাছে এগিয়ে আসে।রুদ্র কাচুমাচু হয়ে দাঁড়ায় তার সামনে।কোনো মা’ই নিশ্চয়ই এমন কাউকে মেনে নেবে না যে তার মেয়ের এই অবস্থার জন্য দায়ী।
আলিয়া শেখ রুদ্রকে গম্ভীর কন্ঠে বলেন
-“কেনো এসেছো তুমি এখানে?”

-“আন্টি আমি আরশিক…..

-“আরশির সাথে তোমার আর কোনো সম্পর্ক আছে বলে তো আমার মনে হয়না।তাহলে কেন দেখতে এসেছো ওকে? ওর যন্ত্রণাগুলো আর বাড়িয়োনা রুদ্র।অনেক কষ্ট পেয়েছে আমার মেয়েটা।ভালোবাসার বিনিময়ে ধোকা ছাড়া আর কিছুই পায়নি।এবার অন্তত আমার মেয়েটাকে শান্তিতে থাকতে দাও তুমি।”আলিয়া শেখ হাত জোড় করে বলেন।
রুদ্র তার হাত ধরে ফেলে। অপরাধবোধে জর্জরিত হয়ে বলে
-“আন্টি কী করছেন?”

-“চলে যাও রুদ্র।ও তোমাকে দেখে আরো দুর্বল হয়ে পরবে।”

-“একবার দেখেই চলে যাব আন্টি।প্লিজ!”রুদ্র অনুরোধ করে বললো
আলিয়া শেখ আবার কেঁদে দেন। রুদ্রর এই অনুরোধ ফেলতে পারেন না।আমানও বারবার তার মাকে বলছে যাতে তার রুদ্র ভাইয়াকে ভেতরে ঢোকার অনুমতি দেয়।
-“যাও।”
-“থ্যাংক্স আন্টি।”রুদ্র কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে ভেতরে ঢোকে।
আলিয়া শেখ শাড়ির আচলে চোখ মুছেন।মায়া, রাহুল আর রুহানি কে দেখে তাদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছোড়েন
-“তোমরা কারা?”

-“আমরা আরশির বন্ধু আন্টি।”তড়িঘড়ি করে উত্তর দেয় মায়া।

-“বন্ধু। কিন্তু তোমাদের তো কোনোদিন ওর সাথে দেখিনি।না,মানে ও ওর প্রায় বন্ধুকে বাড়িতে আনতো।তাদের মধ্যে তোমারাতো কখনো আসোনি।”

-“আমরা রুদ্রর বেস্টফ্রেন্ড আন্টি।আরশিরও খুব ভালো বন্ধু। আমিই রুদ্রকে খবর দিয়ে এখানে এনেছি।আরশির এই অবস্থা শুনে ওকে দেখতে এসেছি।”রাহুল এগিয়ে এসে বললো।

-“আচ্ছা।ওর অন্য বন্ধুরা মনে হয় খবর পায়নি এখনো।তোমরা এসেছো ধন্যবাদ এই জন্য।

-“ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করবেন না আন্টি।আচ্ছা ও এমন কেন করলো?হঠাৎ কী এমন হলো যে আত্মহত্যা করে বসলো? ”
রাহুল আমতা আমতা করে প্রশ্ন করে!

-“কেন জানো না?তোমাদের বন্ধুর দেওয়া কষ্ট সহ্য করতে পারেনি তাই।প্রেম করেছে আমার মেয়ের সাথে আর বিয়ে করেছে অন্য কাউকে। জানো এই কয় মাস কতটা যন্ত্রণাই ছিলো আমার মেয়েটা।”শ্লেষপূর্ণ কন্ঠে বলেন আলিয়া শেখ। একটু থেমে আবার বললেন

-“আচ্ছা ওর বউয়ের খবর কী?ওর বউ কী জানে ও যে এখানে এসেছে?”
-“আন্টি মায়াই তো….”
রাহুল কে থামিয়ে দিয়ে মায়া বললো
-“হ্যাঁ আন্টি জানে।ওর বউ নিজেও আসতে চেয়েছিলো কিন্তু মামনি মানে রুদ্রর মা একা থাকায় আসতে পারে নি।”

-“ও।আচ্ছা ওর বউ কী অনেক বেশি সুন্দরী?মানে আমার আরশির চেয়েও বেশি সুন্দর নিশ্চয়ই?তাইতো আমার মেয়েটাকে ছেড়ে ওকে বিয়ে করলো,তাই না?”

-“না,আন্টি। একটুও সুন্দর না।আরশির মতো তো একদমই না।”মায়া হাসিমুখে বললো।
রাহুল কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে বারবার।কিন্তু মায়া তাকে বলতে দিচ্ছে না।

-“কী বলো?সুন্দর না?”

মায়া মাথা নাড়িয়ে না বোঝায়।
-“তাহলে আমার মেয়েটাকে কেনো ছেড়ে দিলো?আবার এটাও শুনেছি আরশি থেকে ওর মা-বাবা নাকি জোর করে এক আত্মীয়ের মেয়ের সাথে বিয়ে দিয়েছে। রুদ্র নাকি বিয়ে করতে চায়নি?এটা কী সত্যি? ”

-“আন্টি রুদ্র কোনো বাচ্চা ছেলে নয় যে ওকে জোর করে বিয়ে দিবে বা কোনো কিছু জোর করলেই ও তা মেনে নিবে।”রাহুল জোর গলায় বললো।

-“সেটাও ঠিক।যদিও আমি ওর বউকে দেখিনি কোনোদিন।দেখার ইচ্ছাও নেই।তবে যদি তোমার মতো দেখতে হতো তাহলে বিয়েটা করলেও মেনে নেওয়া যেতো।কিন্তু তুমিতো বলছো সুন্দর না।”আলিয়া শেখ মায়াকে দেখিয়ে বলেন।
মায়া ঠোঁট প্রসারিত করে হাসে।আলিয়া শেখ অভিভূত হয় মায়ার হাসি দেখে।
-“ইশ! কী সুন্দর তোমার হাসি।নাম কী তোমার?”
-“মায়া।”
-“একদম নামের মতো মুখেরও যেন অগাধ মিল।”
আবার থেমে বলে -“তোমরা এসে বসো।রুদ্র বের হলেই দেখতে যেও।”আলিয়া শেখ চেয়ারে বসেন।

রুহানি মায়ার পিঠে চাপড় দিলো।কটমট করে ফিসফিসিয়ে বললো
-“কীরে?তুই বলিসনি কেন যে তুই রুদ্রর বউ?অন্য কেউ না?”
রাহুলও আরশির সাথে তাল মিলালো।
মায়া চোখমুখ কুচকে বললো
-“ওনার মেয়ে অসুস্থ সেটা তোদের বুঝতে হবে।এখন যদি আমি বলি আমাকেই বিয়ে করেছে রুদ্র তাহলে ওনার মনের অবস্থাটা কী হবে একবারো ভেবেছিস?ওনার মেয়ে যাকে ভালোবেসেছে সে আমাকে বিয়ে করেছে ব্যাপারটা কেমন জানি না?”

রুহানি মুখ বাকালো। ও এসব ভাবাভাবিতে নেই।ও শুধু ওর বন্ধুর ভালো চায়। বাকি পুরো পৃথিবী চুলোয় যাক, ওর ভাবনা নেই।
রাহুল কিছু বলতে গিয়েও চুপ করে গেলো।ভেবে দেখলো মায়া ঠিকই তো বলেছে।একজন মায়েরর জন্য এটা মেনে নেওয়া সত্যিই কষ্টকর। তার মেয়ের অবস্থার জন্য যারা দ্বায়ী তারাই আবার সিম্প্যাথি দেখাতে এসেছে!এটা তো কাটা ঘায়ে নুনের ছিটার মতো।
,

রুদ্র কেবিনে ঢুকে ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো আরশির দিকে।মেয়েটা অচেতন অবস্থায় শুয়ে আছে বেডের উপর।হাতে ক্যানোলা, মুখে অক্সিজেন মাক্স লাগানো।রুদ্র শব্দহীনভাবে বেডের সামনে রাখা টুলের উপর বসলো।কক্ষে পিনপতন নীরবতা। শুধুমাত্র স্যালাইন চলাচলের শব্দ আর অক্সিজেনের শো শো শব্দ শোনা যাচ্ছে।রুদ্র আরশির মুখ বরাবর বসে থাকলো।আরশির হাতের কবজিতে বেন্ডেজ করা।বেন্ডেজের উপর লাল রক্তের ছোপ ভেসে উঠেছে।রুদ্র মাথা নুইয়ে ফেললো। হাত ধরতে মন চাইলেও হাত ধরা থেকে বিরত থাকলো।একজনের স্বামী হয়ে আরেকজনের হাত ধরতে বিবেকে বাঁধছে। রুদ্র অচেতন ঘুমন্ত আরশির দিকে চোখ তুলে তাকালো।কন্ঠ খাদে নামিয়ে বললো

-“কেনো এমন করলে আরশি?এমন করলে কী আমাকে পাওয়া হয়ে যেতো তোমার?শুধু নিজের মা-বাবা আর ভাইয়ের কষ্টটা বাড়ালে।আমিতো জানতাম না আরশি যে এতটা ভালোবাসতে তুমি আমায়।আমি মনে করেছিলাম অন্যদের মতো দুইদিন পর তুমি আমকে ঠিকই ভুলে যাবে।কিন্তু কেনো ভুলতে পারলে না আমাকে?মায়ার মতো মনে রেখে দিয়েছো আমাকে।বিশ্বাস করো মায়ার পর হয়তো তুমিই আমাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসলে।হয়তো তুমি আমাকে স্বার্থপর ভাবছো, যে এতকিছুর পরও আমি বলছি মায়ার পরে ভালো বেসেছো।কিন্তু বিশ্বাস করো মায়ার সতেরো বছরের ভালোবাসার পর আমি তোমার ভালোবাসাকে বড় করে দেখতে পারিনি। মা-বাবার জোর-জবরদস্তি তে তাই হয়তো বিয়েটা করে নিয়েছিলাম।একটা সুক্ষ্ম ইচ্ছে বোধহয় আমারও ছিলো।কিন্তু এখন এই কি অবস্থায় ফেললে আমাকে?এই কোন দোটানায় পরলাম আমি?”

কেবিনের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো মায়া।রুদ্র নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে আরশির সামনে মাথা নিচু করে।আরশির এখনো জ্ঞান ফেরেনি।মায়া এগিয়ে গেলো রুদ্রর কাছে।আমতা আমতা করে ডাকলো
-“রুদ্র।”

রুদ্র হকচকিয়ে গেলো। পাশে মায়াকে দেখে বলে উঠলো
-“ও তুই।বল কী বলবি।”

-“আমি বাড়ি চলে যাচ্ছি রুদ্র। তুই আজকে অফিসে যাসনি তাই বাবাই চলে গেছে।মামনি বাড়িতে একা আছে। ফোন করছে আমাকে।তুই কী এখন যাবি?না, আরো কিছুক্ষণ থাকবি?”

-“আমি যদি আরো কিছুক্ষণ থাকি তাহলে কী তুই রাগ করবি আমার উপর?”রুদ্র উৎকন্ঠা নিয়ে প্রশ্ন করে।

-“আমাকে তোর এত খারাপ মনে হয়? একজন অসুস্থ মানুষের পাশে থাকাতে আমি কীকরে রাগ করতে পারি?ওর জ্ঞান ফেরা পর্যন্ত থাক তুই।আমি যাচ্ছি।সময় পেলে আবার আসবো ওকে দেখতে।”

-“আচ্ছা। আম্মুকে দেখে রাখিস।”
মায়া মাথা নাড়িয়ে বিদায় জানালো,পরপর বেরিয়ে আসলো কেবিন থেকে।

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here