উৎসর্গ #পর্ব:১৭ #তানজিনা ইসলাম

0
29

#উৎসর্গ
#পর্ব:১৭
#তানজিনা ইসলাম

গাড়ির পেছনের সিটে চুপটি করে বসে আছে মায়া।গাড়ির জানালার কাচে মাথা রেখে বাইরের পরিবেশ দেখছে ।তারপাশে রুহানি বসে অনবরত ফোন টিপে চলেছে।রাহুল ড্রাইভিং করছে মনোযোগের সহিত।মিররে মায়ার দিকে চোখ পরলে তার দিকে তাকিয়ে বললো
-“তোর কী মন খারাপ মায়ু?”

মায়া বাইরে থেকে চোখ সরিয়ে সোজা হয়ে বসলো।রাহুলের প্রশ্নের উত্তরে বললো
-“মন খারাপ হবে কেন?মন খারাপ হওয়ার মতো কিছু ঘটেছে নাকি?”

-“এই যে রুদ্র থেকে গেলো আরশির কাছে,তোর কষ্ট হচ্ছে না?”

-“কষ্ট হবে কেন?আরশি অসুস্থ রাহুল।আর অসুস্থ হয়েছেও রুদ্রর জন্য।ওর উচিত আরশির পাশে থাকা। ইভেন আমাদের সবার উচিত আরশিকে সাপোর্ট করা।”

রুহানি অবাক হয়ে মাথা ঘুরে সিটে পরে যাওয়ার নাটক করলো।মায়া ভেংচি কেটে ওর হাত ধরলো, একটানে তুলে বসিয়ে দিলো সিটের উপর।রুহানি খোঁচা মেরে মায়াকে বললো
-“এসব কথা কার থেকে শুনছি আমি?এই তুই আসলেই মায়া তো?মায়ার মুখ থেকে এসব কথা কস্মিনকালেও বের হতে পারে না।

-“রুহানি,বোন আমার নাটক কেন করছিস?”

-” নাটক করছি না।তোর কাহিনি দেখে আসলেই আমার মাথা ঘুরছে।এইসব বিহেভিয়ার তোর সাথে মানায় না।অতি ভালো হওয়ার চেষ্টা করিস না বেবি।যেমন আছিস তেমনি থাক।”

মায়া মাথা রাখলো রুহানির কাধে।অন্যমনস্ক হয়ে বললো
-“মাঝে মাঝে সিচুয়েশন অনুযায়ী বদলে যেতে হয় রুহি।
আমরা ভালোবাসিই হেরে যাওয়ার জন্য।সেখানে আমাদের কোনো ভালো খারাপি মাথায় আসে না।ভালোবাসা হয় আমদের অতিরিক্ত খারাপ বানিয়ে দেয়, নয়তো সংযত হতে শেখায়।
,

মায়া সোফার উপর শুয়ে আছে রাফানা চৌধুরীর কোলে মাথা রেখে।রাফানা চৌধুরী মায়ার মাথায় বিলি কেটে দিচ্ছে আর এটা ওটা প্রশ্ন করছে।
-“মেয়েটা ভালো আছে তো এখন? আত্মহত্যা করার কারন জানতে পেরেছিস?”

-“হ্যাঁ মামনি।ডাক্তার বলেছে আউট অফ ডেঞ্জার। কিন্তু আমি যখন চলে আসছিলাম তখনো জ্ঞান ফেরেনি।তাই রুদ্র থেকে গেছে।আর আত্মহত্যার কারণ তুমি নিজেও জানো।”

রাফানা চৌধুরী চুপ করে গেলেন। কী যেন ভেবে ফের মায়াকে বললেন
-“রুদ্র কেমন করছিলো ওখানে?”

-“কিছু করেনি মামনি।শুধু মাথা নিচু করে বসেছিলো।”

-“নিয়ে আসতে পারতি ওকে।আবার বিকালে গিয়ে দেখে আসতি।”

মায়া হাসলো। শোয়া থেকে উঠে রাফানা চৌধুরীকে বললো
-“ও বাচ্চা নাকি যে ওকে ধরে নিয়ে আসবো?ওর আসতে মন চাচ্ছিলো না মামনি, তাই আর জোর করে বলিনি। থাকুক না ওখানে সমস্যা কী তাতে?”

-“সমস্যা তো নেই।শুধু উলোটপালোট ডিসিশন না নিলেই হলো।আমার ছেলেকে চিনি না আমি!নিজের ডিসিশন নিজে নিতে পারে না ও।যেটা মাথায় ঢোকে গো ধরে সেটাই করতে থাকে।জেদ জানিস না ওর!জেদের বশে ভুল -ঠিক বিচার করার মতো মানসিকতা থাকে না ওর।তাই ভয় লাগছে।”

রাফানা চৌধুরী এই বলে উঠে যান।মায়া ঠাঁই বসে থাকে সোফার উপর।
,

মায়া গোলাপ কিনছে আরশির জন্য। একটু আগেই রুদ্র কল করে বলেছে আরশির জ্ঞান ফিরেছে। তাই সবাই আবার যাচ্ছে হসপিটালে। ওর বন্ধুমহলের সবাই গাড়িতে বসে আছে।রুহানি আর রাহুলতো ছিলোই, এখন রিয়ানা,সাহিল আর আরিয়ান ও কোত্থেকে টপকে পরেছে।মায়া সবাইকে দেখে অনেক বেশি অবাক হয়েছিলো।আরশির জন্য সবার ভালোবাসা যেন ঝরে ঝরে পরছে। আচমকা এতো ভালোবাসা কোত্থেকে উদয় হলো মায়ার জানা নেই।
মায়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকালো রাস্তার সাইডে দাঁড় করানো গাড়িটির দিকে।সবাই এদিকে তাকিয়ে আছে।আর কোনো একটা টপিক নিয়ে অনবরত কথা বলে যাচ্ছে।
মায়া দোকানদারকে তাগাদা দিলো ফুলগুলো তাড়াতাড়ি দেওয়ার জন্য। দোকানে কাজ করা পিচ্চি ছেলেটা এসে মায়ার হাতে একশো গোলাপের তোড়া দিয়ে গেলো।মায়া বিল মিটিয়ে হাটা ধরলো গাড়ির উদ্দেশ্যে।
রাত ও দিনের মাঝামাঝি সময় ।আকাশ অন্ধকার হয়ে আসছে ধীরে ধীরে। একটু পরেই মাগরিবের আজান দিবে। মায়ার পরনে সাদা রঙের লং ফ্রক।পায়ে সাদা রঙের কেডস।হাতেও সাদা রঙের স্মার্ট ওয়াচ।চুলগুলো পনিটেইল করে পেছনে বাধা। আজকে যেন পুরো সাদা রঙে মুড়িয়ে এসেছে মায়া।শুভ্রতার প্রতিকে শুভ্র হয়ে এসেছে যেন।
হাতে লাল টকটকে গোলাপ নিয়ে ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটে এসে বসলো মায়া।আরিয়ান ড্রাইভিং সিটে বসেছিলো।পাশে মায়াকে পাশে বসতে দেখেই গাড়ি স্টার্ট দিলো।রুহানি গজগজ করে বললো

-“তোর কাহিনিগুলা জাস্ট অসহ্য লাগে আমার।মানে এতো ভালোমানুষি কোত্থেকে খুঁজে পাস আমি বুঝি না।”

-“আবার কী করলাম আমি?” হতাশ শ্বাস ফেলে বললো মায়া।যখন থেকে বলেছে আরশির জন্য গোলাপ কিনবে তখন থেকে সবাই একটা না একটা পিন্চ মেরেই যাচ্ছে এই মেয়ে।

-“কিছুই করিসনি তুই। এমনভাবে গোলাপ নিয়ে যাচ্ছিস যেন আরশিকে সতীন করে ঘরে তুলবি।”

-“বাহ!আমার মনের কথা কিভাবে জানলি তুই?”মায়া পেছনে ফিরে রুহানিকে বলে। রুহানি আবার মুখ বাকায়।

যানজট পূর্ণ ব্যস্ত রাস্তা ধরে গাড়ি এগিয়ে চলেছে।পেছনের সিটে বসা তিন বাচাল কিছু একটা নিয়ে ননস্টপ কথা বলেই যাচ্ছে। শুধু মায়া আর আরিয়ানের মুখেই কোনো কথা নেই।আরিয়ান ভিউ মিররে বারবার দেখছে মায়াকে।খুব করে ওর এই সৌন্দর্যের প্রশংসা করতে মন চায়ছে। সাদা ফ্রকে মায়াকে শুভ্র পরীর মতো লাগছে আরিয়ানের কাছে।কিন্তু আফসোস!ওর যে সে অধিকার নেই।ও যে চাইলেও যখন তখন মায়ার প্রশংসা করতে পারে না।আরিয়ান মিরর থেকে চোখ সরিয়ে সামনে তাকালো।এভাবে আরেকজনের বউকে দেখতে পারে না ও।এটাও যে পাপ।কিন্তু একটা আফসোস ওর সারাজীবন থেকে যাবে। মায়াকে আগেভাগে ভালোবাসার কথা না জানানোর আফসোস ওর এই ইহজীবনে শেষ হবে না।
অবশেষে গাড়ি এসে হসপিটালের সামনে থামলো।সবাই একে একে নামলো গাড়ি থেকে। আরিয়ান পার্কিং লটে গিয়ে গাড়ি পার্ক করলো।সবাই একসাথে হাটা ধরলো তিনতলায় আরশির কেবিনের উদ্দেশ্যে।
মায়া কেবিনের সামনে এসে থেমে গেলো।কেবিনের দরজা সম্পূর্ণ খোলা। সেই খোলা দরজা দিয়েই দেখলো রুদ্র কতো যত্ন নিয়ে একটু একটু করে স্যুপ খাইয়ে দিচ্ছে আরশিকে।আবার মুখে লেগে গেলে টিস্যু দিয়ে তা মুছেও দিচ্ছে।রুদ্র পেছন দিকে ঘুরে থাকায় ওদের কাউকে দেখতে পেলো না।মায়া আর পা আগাতে পারলো না।কী যত্ন করে খাইয়ে দিচ্ছে আরশিকে। আচ্ছা বিয়ের এতো দিন পরেও ওকে কোনোদিন এভাবে খাইয়ে দিয়েছে রুদ্র?মায়ার মনে পরে না।যেখানে কোনোদিন এই ঘটনা ঘটেইনি সেখানে মনে পরবে কীভাবে? চোখ দুটো হয়তো ভিজে যাবে এক্ষুনি। মায়ার নিজেকে খুব বেশিই হিংসুটে মনে হচ্ছে।একজন অসুস্থ মানুষকে হিংসা করার কারণে আবার খারাপও লাগছে।কিন্তু তারপরও এই দৃশ্যকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়ার জন্য নিজের মনকে বুজ দিতে পারছে না।এখানে করিডোরের মেঝেতে বসে হাত-পা ছড়িয়ে কাঁদতে পারলে মনে হয় শান্তি লাগতো।

মায়া নিজেকে অতিদ্রুত সামলে ফেললো।পেছনে সবগুলা দাঁড়িয়ে আছে। মায়া ঢুকছে না বলে তারাও ঢুকছে না।
মায়া কচ্ছপের গতিতে ভেতরে ঢুকলো।আরশি সবাইকে দেখে চোখ বড় বড় করে তাকালো।রুদ্র আরশির দৃষ্টি অনুসরণ করে পেছনে তাকালো।রুদ্র নিজেও যেন অবাকের শেষ সীমানায় পৌঁছে গেলো।
মায়া আরশির কাছে গিয়ে হাতে থাকা ফুলের তোড়া এগিয়ে দেয়।আরশি হাত বাড়িয়ে তা গ্রহণ করে, মিষ্টি হাসি উপহার দেয়। মায়া বেডসাইডে গিয়ে বসলো।রুহানি, রিয়ানা,সাহিল কেবিনে রাখা সোফায় বসলো আর রাহুল, আরিয়ান দাঁড়িয়ে থাকলো।

রুদ্র অবাকের রেশ রাখতে না পেরে বলেই ফেললো
-“তোরা সবাই এই সময়ে?”

-“আমরাতো আরশিকে সারপ্রাইজ দিতে এসেছিলাম।কিন্তু এসে নিজেরাই সারপ্রাইজড হয়ে গেছি।আরে তুই থেমে গেলি কেনো।স্যুপ ঠান্ডা হয়ে যাবে তো।খাইয়ে দে ওকে।”রুহানি উপহাস করে হেসে বলে।

রুদ্র তাকালো নিজের হাতের স্যুপের বাটির দিকে। রুহানির কটাক্ষ বুঝতে পেরে আমতা আমতা করে বলার চেষ্টা করলো
-“আসলে ওর আম্মু বাড়িতে গেছেতো,আর নার্স এসে স্যুপ দিয়ে গেছে।এখন এই অবস্থায় ও কীকরে খাবে?তাই খাইয়ে দিচ্ছিলাম।”

-“আচ্ছা ওর মা চলে গেছে বাড়িতে।কিন্তু তুই এখনো যেতে পারলি না।তোকে সারাদিনই এখানে সেবায় থাকতে হলো তাই না রুদ্র।”রুহানি আবার হাসি হাসি মুখে বললো।

রুদ্র সাফাই গাইতে যাবে তখনই রাহুল গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলো
-“অসুস্থ মানুষের সেবা দেখি খুব ভালোভাবেই করতে শিখেগেছিস।হসপিটাল অথোরিটিকে বলে একটা ওয়ার্ডবয়ের পার্টটাইম জব জোগাড় করেদি?”

রুদ্র অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো মায়ার দিকে।চোখের দৃষ্টিতে মায়াকে অনুরোধ করে বললো যাতে বাঁচায় ওকে এদের হাত থেকে।
মায়া রুদ্রর দিকে তাকিয়ে বললো
-“তুই থেমে গেছিস কেনো?খাইয়ে দে ওকে।ওদের কথা ধরিস না।এরা হুদাই আজাইরা কথা বলছে।”
তারপর সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললো
-“তোরা কী এখানে আরশিকে দেখতে এসেছিস?নাকি রুদ্রকে পিন্চ মারতে এসেছিস,কিছুই তো বুঝছি না।”

সবাই চুপ করে গেলো মায়ার কথায়। আরশি রুদ্রর দিকে তাকিয়ে বললো
-“খাইয়ে দাও।আমার এখনো পেট ভরেনি।”রুদ্র সবার দিকে তাকিয়ে ঢোক গিললো।জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে, আরশিকে খাইয়ে দিতে শুরু করলো।

মায়া আরশির দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বললো
-“এখন কেমন লাগছে আরশি?”
-“হুম,ভালো।জানো,জ্ঞান ফিরে রুদ্রকে দেখে আরো সুস্থ হয়ে গেছি যেন।”আরশি হেসে মায়ার দিকে তাকিয়ে বললো।
মায়া কথার প্রেক্ষিতে কী বলবে বুঝতে পারলো না। তাই চুপ থাকলো।

সবাই এটা ওটা জিজ্ঞেস করতে লাগলো আরশিকে।
প্রায় অনেক্ষণ কেটে যাওয়ার পর আরিয়ান বললো
-“এবার আমাদের যাওয়া উচিত। অনেক্ষণ তো হলো।”

সবাই আরিয়ানের কথায় সাই জানালো।রুহানি রুদ্রকে উদ্দেশ্য করে বললো
-“যাবি? নাকি আজ রাতেও এখানে থাকার প্ল্যান আছে?”
-“যাবো,যাবো।”
বলেই রুদ্র উঠে দাড়ালো।
আরশি রুদ্রর হাত ধরে ফেললো।ক্যানোলা লাগানো হাতে ব্যাথা পেলেও তোয়াক্কা করলো না। রুদ্রর দিকে তাকিয়ে উৎকন্ঠা নিয়ে বললো
-“আবার আসবে তো?”
-“কাল সকালে আবার দেখতে আসবো।”
-“প্রমিস?”

-“প্রমিস।”রুদ্র আরশির হাতে হাত রেখে বললো।পরক্ষণে আরশির হাত যত্ন করে বেডের উপর রাখলো।
মায়া সবাইকে পেছনে রেখে বড় বড় পা ফেলে বেরিয়ে গেলো।এখানে থাকা সম্ভব নয় ওর পক্ষে। এসব দেখলে হৃদয় ভেঙে যাবে।সে ভাঙা হৃদয় মায়ার পক্ষে জোড়া লাগানো সম্ভব হবে না কোনোদিন ।
,

মধ্যাহ্নের সময়। চোখ ঝলসানো রোদে বাইরে বের হওয়া দুষ্কর। মায়া বসে আছে বাগানে টানানো দোলনাটার উপর। ঘন গাছপালা থাকায় এদিকে তেমন সূর্যের আলো পরছেনা।কিন্তু অনুভব করা গরমে সূর্যের তেজ ঠাওর করা যাচ্ছে। ক্ষণকাল পর পর মৃদুমন্দ বাতাসে এখানে বসে থাকতে মন্দ লাগছে না।
আজ আরশিকে রিলিজ দেওয়া হবে হসপিটাল থেকে।তাই সকাল সকাল রুদ্র চলে গেছে হসপিটালে।আরশির মা একা মানুষ। আরশির বাবা বাইরে থাকেন।ভিসার সমস্যার কারণে তাই তিনি চেয়েও মেয়ের এই অবস্থায় দেশে আসতে পারেনি। হসপিটালের যাবতীয় ফর্মালিটিজ পূরণ করার জন্য, আরশিই সকালে কল দিয়ে ডেকেছে রুদ্রকে।বলেছে তার মায়ের পক্ষে একা এতকিছু সামলানো সম্ভব না।তাই তাকে যাতে হসপিটাল থেকে ছাড়িয়ে আনে।
সেদিন আরশিকে দেওয়া নিজের ওয়াদা রেখেছে রুদ্র।প্রতিদিনই সকাল বিকাল আরশিকে দেখতে গেছে।এই কয়েকদিনে যতবারই আরশি ফোন দিয়ে বলতো ওর ভালো লাগছে না,ততবারই রুদ্র দেখতে গেছে ওকে।যদিও রাফানা চৌধুরী রাগারাগি করেছেন এই নিয়ে,বারবার রুদ্রকেই কেনো ছুটে যেতে হবে?আর কী কেও নেই? তারপরও মায়া সামলেছে তাকে।বুঝ দিয়েছে এই বলে শুধু বন্ধুর মতো পাশে থাকছে রুদ্র,যেহেতু ওদের মধ্যে একসময় অন্যরকম সম্পর্ক ছিলো। এর চেয়ে বেশি কিছু না। কিন্তু আরেকজনকে বুঝ দিলেও নিজেকে বোঝানো কী এতই সোজা?যার উপর অন্য কোনো নারীর ছায়াও সহ্য করতে পারে না,তাকে কতো অবলীলায় যেতে দিতে হচ্ছে অন্যের কাছে।মায়া নিজেও কয়েকবার গিয়ে দেখে এসেছে আরশিকে। মায়া এখন নিজেকে দেখে অবাক হয়।বিয়ের আগে যেখানে আরশিকে রুদ্রর সাথে কথায়ই বলতে দিতো না,সেখানে এখন বিয়ের পর রীতিমতো একসাথে মেনে নিচ্ছে ওদেরকে।যখন অধিকার ছিলো না তখন অযাচিত অধিকার খাটিয়েছে। আর এখনতো অধিকার আছে,তাহলে কেন এই অধিকারবোধ আসছে না?কোথায় গেল ওর সেই সার্থপরতা?
মায়া দোলনা থেকে নেমে দাড়ালো। রাফানা চৌধুরী ডাকছেন তাকে।মায়া বাড়ির দিকে পা বাড়ালো।অনেক হয়েছে রুদ্রর বাড়াবাড়ি। শুধুমাত্র আরশি অসুস্থ ছিলো বলে মায়া এতদিন কিচ্ছুটি বলেনি রুদ্রকে।অসুস্থ মেয়েটার কথা ভেবে রুদ্রর সব বাড়াবাড়ি মেনে নিয়েছে। কিন্তু এখন আর না।এখনতো আরশি সুস্থ হয়ে গেছে। এখনতো আর যখন তখন আরশির কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নেই ওর।অনেক হয়েছে ভালো হওয়া।রুহানি ঠিকই বলেছিলো,এই অতি ভালো হওয়া ওর সাথে মানায় না।মায়া খারাপ ছিলো,আছে , থাকবে।ওর জিনিসে কেও কোনোদিন হাত দিতে পারবে না। যেটা ওর, সেটা শুধুই ওর।
,

রুদ্র সদরদরজা দিয়ে ঢুকে চুপিচুপি সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠলো।গেইট দিয়ে ঢোকার পর অনেক সাবধানতা অবলম্বন করে এখানে এসেছে।রুদ্রর মনে হচ্ছে সে নিজের বাড়িতেই চুরি করতে ঢুকছে।কিন্তু এভাবে রাফানা চৌধুরীর সামনে পরলে আজ ওর নিস্তার ছিলো না।রাফানা চৌধুরীর অনেক নিষেধ সত্বেও হসপিটালে গিয়েছিলো।ও জানে মায়া সামলেছে তাকে,কিন্তু কয়েকদিন ধরে খালি এটা নিয়েই বকা খাচ্ছে ও,তাই এতো সাবধানতা।।
রুদ্র কক্ষে ঢুকে দেখলো মায়া বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে মোবাইল টিপছে। চুলগুলো ছড়িয়ে আছে পিঠের উপর।মোবাইলে এতই ধ্যান-জ্ঞান দিয়েছে যে ও এসেছে সেটাও টের পায়নি।রুদ্রর মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি চাপলো।মায়ার পেছনে গিয়ে জোরে একটা চিৎকার দিলো।মায়া হড়বড়িয়ে উঠে বসে।রুদ্র হেসে দেয়।মায়া বুকে হাত দিয়ে জোড়ে জোড়ে নিঃশ্বাস নিচ্ছে।নিঃশ্বাস থেমে যাওয়ার উপক্রম ওর। রুদ্র মায়ার দিকে তাকিয়ে দুষ্টু হেসে বললো

-“কীরে?ভয় পেলি নাকি?”

-“এই ছেলে, তুই এতো ফালতু কেনরে?এভাবে কেও ভয় দেখায়?আরেকটু হলেই আমি ব্রেইন স্টুমার করতাম।”

-“কী করতি?”রুদ্র মায়ার কথা না বুঝে প্রশ্ন করে।

-“আমার মাথা।”

মায়া চোখমুখ কুচকে তাকায়। রুদ্র এখনো মিটিমিটি হাসছে।মায়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো
-“আরশির কী খবর?”

-“হুম,ভালো।বাড়িতে পৌঁছে দিয়েই এলাম।ডক্টর বলেছে মেন্টাল হেল্থ ঠিক রাখতে সবসময়। যাতে কখনো আপসেট হয়ে না পরে। ”

-“ভালো করেছিস।কতো বড় বিপদ গেল মেয়েটার উপর।”

-“হুম।আমি যাওয়ার পর বাড়িতে নিশ্চয়ই ঘূর্ণিঝড় বয়ে গেছে?”

-“না, তেমন কিছু হয়নি।মামনি প্রথমে রেগে গেলেও আমি হাবিজাবি বুঝিয়ে শান্ত করে ফেলেছিলাম।”

-“আমিতো জানতাম।তুই একটু বোঝালেই মা শান্ত হয়ে যাবে।মানে আমি তার নিজের ছেলে হওয়া সত্বেও মা তোকে বেশি ভালোবাসে।”

-“বাদ দে এসব।”

তারপর নিজের পা দেখিয়ে বললো
-“দেখ, মামনি দিয়েছে পায়েল দুটো।সুন্দর না?”
রুদ্র এগিয়ে গিয়ে মেঝেতে মায়ার পাশে বসলো।মায়া বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসেছে।মায়ার পা দুটো নিজের কোলে নিয়ে পায়েলে হাত ছোয়ালো। স্বর্ণের দুটো মোটা পায়েল।মায়া খুশিতে গদগদ হয়ে বললো
-“জানিস পায়েল দুটো নাকি মামনির শাশুড়ী তাকে দিয়েছে। আর মামনি আমাকে দিয়ে দিয়েছে।কেমন লাগছে আমাকে?”

-“হুম জানি,এগুলো দাদিআম্মা মায়ের বিয়ের দিন দিয়েছিলো৷ সুন্দর লাগছে তোকে।”

-“সত্যি? ”

-“হুম।শ্যাম্পু লাগিয়েছিস?”

-“হ্যাঁ।মামনি হ্যায়ার প্যাক লাগিয়ে দিয়েছিলো,তাই।”

-“ঘ্রাণটা অনেক কড়া।কী শ্যাম্পু লাগিয়েছিস? এত সুন্দর একটা স্মেল।”

-“ওটা অর্গানিক।হ্যায়ার প্যাকের সাথে অনলাইনে অর্ডার করেছি। ”

-“আমাকে দিসতো।আমিও ইউস করবো।”

-“আচ্ছা। ”

-“তোর চুলগুলো অনেক সুন্দর মায়ু।”

মায়া রুদ্রর চিবুক ধরে ওর মাথা উপরে তুললো।হঠাৎ চিন্তিত হয়ে প্রশ্ন করলো
-“কী হয়েছে তোর বলতো?এতো প্রশংসা করছিস যে।তোর মুখে আমার এতো প্রশংসা তো আমার হজম হচ্ছে না।”
-“কুত্তার পেটে কখনো ঘি সহ্য হয় শুনেছিস?তাই আমার প্রশংসাও তোর সহ্য হচ্ছে না।চিন্তা করিস না।আমি তোর প্রশংসা করছি না।আমি তোর চুলের প্রশংসা করছি।দুটোই আলাদা।শুধুমাত্র তোর এই চুলগুলোই আমার এতটা সুন্দর লাগে।”

-“মানে বলতে চাচ্ছিস আমার শুধু চুল সুন্দর। আর বাকি আমিটা সুন্দর না, তাই তো?”

-“ইয়েস,তোর এই শাঁকচুন্নির চেহারাকে সুন্দর বলার মতো মহান আমি নই।”রুদ্র হাসি হাসি মুখে বললো।

মায়া ঠাস করে চ*ড় বসালো রুদ্রর পিঠে। রুদ্র চোখমুখ কুচকে উঠে দাড়ালো।নিচের ঠোঁট কামড়ে বলে উঠলো
-“স্বাদে তোকে শাঁকচুন্নি বলি?”

মায়া জিহ্বা দেখালো।রুদ্র ওয়াশরুমের দিকে যাওয়া ধরলো।
মায়া পিছন থেকে ডেকে বললো
-“তাড়াতাড়ি নিচে আসিস।মামনি এক্ষুনি দুপুরের খাবারের জন্য ডাকবে।সারপ্রাইজ আছে আজকে একটা।”
-“ওকে।”

রুদ্র ফ্রেশ হয়ে নিচে নামলো। চেয়ারে তার বাবা বসে আছে।রুদ্র তার পাশে গিয়ে বসলো।মায়া কিচেন থেকে সব এনে দিচ্ছে আর রাফানা চৌধুরী প্লেটে খাবার বাড়ছেন।রুদ্র দেখলো টেবিলে হরেক রকমের খাবার। কমপক্ষে পনেরো রকমের ডিশ তো হবেই। রুদ্র রাফানা চৌধুরীর উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করলো
-“আজকে কী কোনো স্পেশাল কিছু আছে নাকি আম্মু ?হঠাৎ এতো আয়োজন? ”

-“এখন কী তোমাকে জিজ্ঞেস করে রান্না করতে হবে?কখন কী হবে সেটা তোমার থেকে পারমিশন নিয়ে করতে হবে নাকি?তুমি তো কারো পারমিশনের ধার ধারো না।”

রুদ্র দেখলো পরিস্থিতি গরম হয়ে যাচ্ছে।মানে তার মায়ের রাগ এখনো কমেনি।রুদ্র চুপ থাকায় শ্রেয় মনে করলো।
মায়া কিচেন থেকে সব এনে টেবিলে রাখলো।রাফানা চৌধুরীকে জোড় করে চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে বললো
-“তুমি বসো।আমি বেড়ে দিচ্ছি।”

রুদ্র আর সবুর করতে পারলো না।বিশেষ করে আজ গলদা চিংড়ি রান্না হয়েছে। রুদ্র গলদা চিংড়ির বাটি টেনে নিলো।এটা দিয়েই খাবে আগে।
রুদ্র খাওয়া শুরু করলো।খেতে খেতে রাফানা চৌধুরীকে উদ্দেশ্য করে বললো
-“আম্মু আজকে সবকিছু এতো মজা হয়েছে।কোনটা ছেড়ে কোনটা খাবো ভেবে পাচ্ছি না।আজকে তোমার রান্নাগুলা ডিফারেন্ট লাগছে একদম।”

-“আজকে আমি রান্না করিনি।”রাফানা চৌধুরী রুদ্রর দিকে না তাকিয়েই উত্তর দিলো।

-“তুমি করোনি?তাহলে এতোকিছু কে করেছে?”

-“আজকে সবকিছু আমার প্রিন্সেস রান্না করেছে।”রুয়ান চৌধুরী মায়ার দিকে তাকিয়ে হেসে বললো।মায়াও বিনিময়ে হাসলো।

রুদ্রর হাত থেমে গেলো।এ কী অবিশ্বাস্য কথা!এতোসব রান্না করেছে তাও আবার মায়া।যে কিনা একগ্লাস পানি পর্যন্ত নিজে ঢেলে খায় না। কোনোদিন কিচেনেও গিয়েছে কি-না সন্দেহ।সে রান্না করেছে,তাও এতো মজার খাবার। রুদ্র অবাক চোখে মায়ার দিকে তাকিয়ে বললো
-“কী করে করলি এতোসব?আমিতো জানতাম তুই রান্নার র ও জানিস না।”

-“ইউটিউব দেখে শিখেছি।”মায়া হেসে বললো।

-“হুম।আমার মেয়েটা অনেক টেলেন্টেড।একবার দেখেই সবকিছু রপ্ত করে নিতে পারে।”রাফানা চৌধুরী খেতে খেতে বললো।

রুদ্র তাকিয়ে দেখে মায়াকে।হেসে হেসে তার মা-বাবাকে এটা ওটা বেরে দিচ্ছে।মেয়েটা আসলে ওর মা-বাবাকে নিজের মা-বাবার মতোই ভালোবাসে।এটা ওর পরিবার। তাই হয়তো এই পরিবারে রুদ্রর চেয়েও মায়ার প্রায়োরিটি সবসময় বেশি।

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here