#উৎসর্গ
#পর্ব:৭
#তানজিনা ইসলাম
পাচঁ মিনিট ধরে বেল বাজাচ্ছে রুদ্র। কিন্তু কেউ দরজা খুলছে না।ত্রিশ মিনিটের রাস্তা পনেরো মিনিটে পার করে এসেছে ও। আ*তঙ্কে হাত পা কাঁপছে।তড়িৎবেগে লাফাচ্ছে হৃৎপিণ্ড।ওর বাবা ঠিক আছে তো?কিছু হয়নি তো মানুষটার, মায়া সেভাবে জরুরি তলব করলো কেন?
অবশেষে অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে কেউ একজন দরজা খুলে দিলো।
মায়া দরজা খুলে রুদ্র কে দেখে অবাক হলো ভীষণ। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে ছেলেটার।শার্টের দুটো বোতাম খোলা।ঘেমে নেয়ে একাকার অবস্থা। চোখে পানি চিকচিক করছে। রুদ্র কে এই অবস্থায় দেখে মায়ার খারাপ লাগলো।দরজা থেকে সরে রুদ্র কে ঢোকার জন্য জায়গা করে দিল।
-“বাবা কই?” রুদ্রর কাতর কন্ঠস্বর।
-“উপরে আছে।দোতলায় ।আমরা সবাই উপরে ছিলাম তাই বেলের আওয়াজ শুনতে পায়নি।”
রুদ্র কিছু না বলে দৌড়ে দোতলায় গেল।মায়াও তার পিছু পিছু ছুটলো।মায়ার বলা কক্ষে গিয়ে দেখল একজন ডাক্তার তার বাবার চেক-আপ করছেন।রুয়ান চৌধুরী শুয়ে ছিলেন।
রুদ্র,সেই অবস্থায় গিয়েই শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো তাকে। রুয়ান চৌধুরী কিছু বললেন না শুধু নিশ্চুপ রুদ্রর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
কক্ষে সবাই উপস্থিত আছে।রুহানি আর রাহুলও এসেছে।মুস্তাফিজ খান আর রুয়ান চৌধুরীর ছোটবেলার বন্ধু হামিদ ইয়াসির তার ট্রিটমেন্ট করছেন।
বুক থেকে মাথা তুললো রুদ্র।হামিদ ইয়াসির এর দিকে তাকিয়ে অসহায় স্বরে আওড়ালো
-“আঙ্কেল,আমার বাবার কী হয়েছে?”
-“তুমি তো জানো তোমার বাবার হা*র্টে প্রবলেম দেখা দিয়েছিল অনেক বছর আগেই। আমার মনে হয় তোমার বাবা কিছু নিয়ে খুব বেশিই চিন্তা করছিলো।যার ফলে এতো চাপ সহ্য করতে পারেনি,অ*সুস্থ হয়ে পরেছে!”
-“এত কীসের চিন্তা তোমার বাবা?”
-“চিন্তা নেই বলছিস। আমার ছেলে আমার কথা শুনছে না।এত বার বিয়ে করতে বলার পরও করছে না।আমার যেকোনো সময় যেকোনো কিছু হয়ে যেতে পারে।আমি মরার আগে তোর বিয়েটা দেখে যেতে চাই।”
-“পাগল হয়েছো তুমি?কী বলছো এসব?আমার কিন্তু শুনতে একটুও ভালো লাগছে না!”ভেজা কন্ঠে বললো রুদ্র।পরক্ষণেই হামিদ ইয়াসিরের দিকে তাকিয়ে বললো
-“আঙ্কেল আপনি বাবাকে বোঝান। এসব কী বলছে সে?”
-“উত্তেজিত হোসনা রুয়ান।এটা তোর শরীরের জন্য ক্ষতিকর।”
-“ওকে জিজ্ঞেস কর ও মায়াকে বিয়ে করবে কি-না?” অস্হির স্বরে বললেন রুয়ান চৌধুরী। বুকে হাত দিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে আবার বললেন
-“রুদ্র তুই আমাকে কথা দে – তুই মায়াকে বিয়ে করবি।”
-“বাবা,বাবা কী হয়েছে তোমার?”রুদ্র এবার সত্যিই কান্না করে দিলো।
-“আমি মরার আগে তোদের বিয়েটা দিয়ে যেতে চাই। মায়া যেদিন জন্ম নিয়েছিলো, বিশ্বাস কর সেদিনই আমি ওঁকে নিজের পুত্রবধূ ভেবে ফেলেছি৷ মুস্তাফিজের কাছে ওঁকে চেয়ে ফেলেছি। প্লিজ তুই বাবার কথাটা রাখ। মায়া আমার মেয়ে রুদ্র। ওঁকে বিয়ে কর।”
-“আঙ্কেল। আই থিঙ্ক বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।তুমি তাড়াতাড়ি এম্বুলেন্স ডাকো।”
-“হামিদ ওকে বলতে বল যে ও মায়াকে বিয়ে করবে। ছেলের
বিয়ে দেখলে আমি এমনিতেই সুস্থ হয়ে যাব।”
মায়া দৌড়ে গিয়ে রুয়ান চৌধুরীর হাত ধরেন।সান্ত্বনা দেওয়ার ভান করে কানে কানে ফিসফিসিয়ে বলে
-“বাবাই।একটিং একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে।সব বুঝে যাবে ও।ওভার একটিং কেন করছো!”
বলেই চোখ টিপলো মায়া।
-“ও,সরি সরি। আসলে একটর হওয়ার অনেক শখ ছিল।মরহুম বাবার জন্য সে শখ পূরণ হয়নি।তাই আজকে যখন সুযোগ পেয়েছি সব টেলেন্ট ঢেলে দিচ্ছি। “রুয়ান চৌধুরী বোকা বোকা হাসলেন।
রুদ্র একটু দুরে থাকায় আর চিন্তিত থাকায় তাদের কথা কিছুই শুনতে পায়নি। মায়া দুঃ*খী দুঃ*খী ফেস করে বললো
-” তুমি এসব কী বলছো বাবাই।যদি কেউ আমাকে বিয়ে করতে না চায় তাহলে তুমি তাকে জোর করতে পারো না।”
-“তাহলে কী আমাকে বিধবা হতে বলছিস আমাকে?” অসহায় স্বরে আওড়ালেন রাফানা চৌধুরী।
-“মা!”রুদ্র চিৎকার করে বলে উঠে।
-“খবরদার মা ডাকবি না আমাকে। শুধুমাত্র তোর জন্য আজ তার এই অবস্থা।” ধমকে বললেন রাফানা চৌধুরী।
রুয়ান চৌধুরী রুদ্রর হাত শক্ত করে ধরলেন।ক্ষীণ স্বরে বললেন
-“আমাকে বল যে তুই মায়াকে বিয়ে করবি।”
রুদ্র অসহায় চোখে তাকালো বাবার দিকে।নিজেকে আজ পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় ব্যাক্তি মনে হচ্ছে। বাবাকে সে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে।তার কিছু হলে যে রুদ্র নিজেকে ক্ষমা করতে পারবে না।রুদ্র আশেপাশে তাকায়।শ্বাস নিতেও যেন কষ্ট হচ্ছে।তার বাবা তার কাছে প্রথম বার এভাবে কিছু চায়ছে।অথচ সেটা রুদ্র মেনে উঠতে পারছে না কোনোমতেই।আর কিছু ভাবতে পারে না রুদ্র।রুয়ান চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে গুমোট স্বরে বলে
-“আমি বিয়ে করব।”
-“সত্যিই তুই বিয়ে করবি?”
-“হ্যাঁ।”
-“হামিদ এক্ষুনি কাজিকে কল কর।আজ রাতেই বিয়ে হবে দুজনের।”
-“আজকেই? ”
-“হ্যাঁ।আজকেই।”
দীর্ঘশ্বাস ফেললো রুদ্র। আর কিছু বলতে পারল না ওর বাবার হাসি মুখের দিকে তাকিয়ে।
,
ড্রইং রুমে বসে আছে চারজন।রুদ্র কিছুক্ষন পরপর টিস্যু দিয়ে চোখ মুচছে।
রাহুল টিস্যু এগিয়ে দিচ্ছে।মায়া আর রুহানি তাদের দুজনের সামনের দিকের সোফায় বসে আছে।মায়া কপাল কুচকে তাকিয়ে আছে রুদ্রর দিকে। চোখে পানি নেই একটুও!অথচ নাক টানছে বারংবার!নাটক করা কেও ওর কাছে শিখুক।মায়া বিরক্তিকর স্বরে বললো
-“এভাবে মেয়েদের মতো কাদছিস কেন?”
-“তুই দেখছিস না ওরা কেমন করছে আমার সাথে।এতদিন মেয়েদের কে জোর করে বিয়ে দিতে শুনেছি।এখন তো দেখছি ছেলেদেরও জোর করে বিয়ে দেওয়া যায়।আমি যেন বলির পাঠা!”
-“তুই মনে হয় একাই বিয়ে করছিস আমাকে দেখ না, আমার কত ইচ্ছে ছিল বিয়ে নিয়ে।মেহেনদি,গায়ে হলুদ,ব্রাইডাল সাজ অনেক কিছু করার ইচ্ছা ছিল।কিন্তু দেখ বিয়েটা কিভাবে হচ্ছে!”
-“তো করিস না বিয়ে! সবাইকে বলে দে তুই বিয়ে করতে চাচ্ছিস না, তাহলে তো আমিও বেঁচে যাই।”
-“নো, আমি তো বিয়ে করতে চাচ্ছি। আমি তো সেই পিচ্চি কাল থেকে তোকে বিয়ে করতে চাচ্ছি। হয়তো ইগোর জন্য বলতে পারিনি। কিন্তু এখন…
-“বিশ্বাস কর, তোকে বিয়ে করার বিন্দু মাত্র ইচ্ছে নেই আমার।”
মায়াকে বলতে না দিয়ে বিরক্তিকর স্বরে বললো রুদ্র। মায়া মুখ বাকিয়ে বললো
-“তুই বিয়ে করবি না, তোর বাপে করবে।”
-“তাহলে আমার বাপকেই কর।আমাকে কেন ফাঁসাচ্ছিস, শয়তান!”
-“তোর আম্মা হতে বলছিস?”
রুদ্র কুশন ছুড়ে মারলো ওর মুখের উপর। মায়া চোখমুখ কুঁচকে নাক ফুলিয়ে তাকালো।
বড়রা ওদেরকে নিচে পাঠিয়ে দিয়েছে। রুয়ান চৌধুরীর সাথে রাফানা চৌধুরী আর মাহেরা খান আছেন।মুস্তাফিজ খান আর হামিদ ইয়াসির কাজি আনতে গিয়েছেন।চারজন নিজেদের মতো বসে ছিল তখনই রাফানা চৌধুরী ডাকলেন মায়াকে।মায়া উঠে তার কাছে গেলো।
রাফানা চৌধুরী তড়িঘড়ি করে বললেন
-“কাজি নিয়ে দু’জনে রওনা দিয়েছেন।তাই তোমাকে তাড়াতাড়ি তৈরি হতে হবে।”
-“বাবার এই অবস্হা আর তুমি ওকে তৈরি হতে বলছো মা?”
-“রুদ্র বিয়ে জীবনে একবারি আসে।যদিও বিয়েটা স্বাভাবিক ভাবে হচ্ছে না।তারপরো একটু তৈরী তো হতেই হবে।তোমার বাবা রেস্ট নিচ্ছেন।ডক্টর তাকে মেডিসিন দিয়ে দিয়েছেন। সমস্যা হবার কথা না।রাহুল তুমি রুদ্র কে তৈরী হতে সাহায্য করাে।রুহানি আমার সাথে এসো।”বলেই রাফানা চৌধুরী মায়াকে নিয়ে চলে গেলেন।রুহানিও চলে গেল তাদের পিছুপিছু।
রুদ্র অবাক না হয়ে পারছে না।যে মা তার বাবার একটু অসুস্থতা সহ্য করতে পারে না, কাঁদতে কাঁদতে অবস্থা খারাপ করে ফেলে, তার এই পরিস্থিতি তে এমন ব্যবহার।এতটা শান্ত,নির্বিকার।
কাজি চলে এসেছেন।মুস্তাফিজ খান আর হামিদ ইয়াসির তার সাথে বসে আছেন। কাজি সাহেব কাবিন নামা সহ সবকিছু ঠিকঠাক করছেন।অবশেষে তিনি বর কে ডাকতে বললেন।হামিদ ইয়াসির রুদ্রকে ডাকতে উঠবেন তার আগে রাহুল আর রুদ্র নিচে নামলো।দুজন গিয়ে বসলো সোফায়।কাজি বিয়ে পড়াতে যাবেন তার আগে হামিদ ইয়াসির বলে উঠেন
-“রুদ্র আগে তোমার বাবাকে ডেকে নিয়ে আসি।”
-“বাবাকে এই অবস্থায়? ”
-“আরে আমি মেডিসিন দিয়েছি কিছু হবে না।আর তার ইচ্ছাতেই তো বিয়েটা হচ্ছে।যদি বিয়েটা দেখতেই না পারেন তাহলে কেমনে হবে।”রুদ্র কিছু বলার আগেই তিনি সিড়ি বেয়ে উপরে চলে গেলেন।তারপর ধরে ধরে নিয়ে আসলেন রুয়ান চৌধুরীকে।রুদ্র উঠে গিয়ে সাহায্য করল।কাজি বিয়ে পড়ানো শুরু করলেন।সবশেষে মায়ার ডাক পরলো।রাহুল গিয়ে তাগাদা দিয়ে আসলো তাদের।
রুদ্র কাজির কথা শুনতে শুনতে অন্যমনস্ক হলো।সামনে তাকিয়ে দেখলো এক শাড়ি পরিহিতা রমনী ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে। রুদ্রর সেই রমনী কে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী নারী মনে হলো।সব সৌন্দর্য যেন আজ মায়ার কাছে ধরা দিয়েছে। মায়াকে এনে রুদ্রর সামনে বসিয়ে দেওয়া হলো।মায়া সোনালী পাড়ের একটি কালো শাড়ি পরেছে।চোখে আলতো করে কাজল টানা।আর কোনো সাজসজ্জা আপাতত নেই।পরিস্থিতি মনে আসতেই রুদ্র চোখ সরালো মায়ার থেকে।
কাজি সব নিয়ম শেষ করে বলার পর রুদ্রকে কবুল বলতে বলেন।রুদ্র মায়ার দিকে তাকালো।ছোট ছোট চোখ করে তাকিয়ে আছে ও।মুখ বাকালো রুদ্র।জিহ্বা দেখিয়ে ব্যা*ঙ্গ করলো মায়া।কাজি আবার বললেন কবুল বলতে।রুদ্র এবার গড়গড়িয়ে বললো
-“কবুল,কবুল, কবুল।
-“আলহামদুলিল্লাহ। এবার কনে বলুন।”
মায়া মনে মনে রুদ্র কে সরি বলে। তারপর এক নিঃশ্বাসে তিনবার কবুল পড়ে।
,
নিস্তব্ধ রাত।রাতের অন্ধকারে হাওয়ার সাথে তাল মিলিয়ে সবেগে সা সা করে ছুটছে একটি সাদা রঙের গাড়ি। সময় ছুটছে তার নিজ গতিতে।রাত্রির দ্বি-প্রহর শেষ হয়েছে কিছু সময় হলো। গাড়ির জানালা দিয়ে অপলক নিস্তব্ধ প্রকৃতি অবলোকন করছে মায়া।কিছুক্ষণ পর পর তাদের গাড়ির পাশ কাটিয়ে এক একটি গাড়ি যাচ্ছে।সাউন্ড-বক্সে মৃদু স্বরে গান বেজে চলেছে। এখন তাদের গন্তব্য “চৌধুরী ম্যানশন”।
রুদ্র-মায়ার বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে অনেক্ষণ হলো। মায়া কবুল বলার পর তাদের বিয়ের পাঠ চুকিয়ে কাজি সাহেব বিদায় নেন।রুদ্র তখনো নিশ্চুপ ছিল। রাফানা চৌধুরী তখনই ছেলে আর বৌমাকে বাড়ি নিয়ে যেতে চাইলেন।মুস্তাফিজ খান থাকার কথা বলেছিলেন।কিন্তু পরে বড় অনুষ্ঠান করে রুদ্র আর মায়াকে থাকার জন্য পাঠাবেন বলে রুয়ান চৌধুরী কথা দিয়েছেন। মজার বিষয় হচ্ছে ছেলের বিয়ে দেখার পর তিনি সত্যি সত্যিই সুস্থ হয়ে উঠেছেন।একেবারে উৎফুল্ল হয়ে কথা বলছিলেন ছোটোবেলার প্রাণপ্রিয় বন্ধুর সাথে।রুদ্র সন্দিহান চোখে তাকিয়ে ছিল।বাবার কানে ফিসফিস করে বলেছিল, “নাটক ছিল সব তাই-না।”রুয়ান চৌধুরী আমতা আমতা করে হাসেন।
বিদায়ের সময় মুস্তাফিজ খান রুদ্রর হাত ধরে কেদে ফেলেন একপ্রকার।বারবার রুদ্রর হাত ধরে বলেছিলেন মায়াকে যাতে আগলে রাখে সবসময়। তার মেয়ে তার সবকিছু। রুদ্র কথা দিয়েছিল সে তার সব দায়িত্ব পালন করবে।মায়াকে ভালো রাখার সম্পুর্ন চেষ্টা করবে।মাহেরা খান কেদেছিলেন মেয়েকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। তিনি যদি পারতেন বিয়ে না দিয়ে সারাজীবন নিজের কাছেই রেখে দিতেন। কিন্তু তা যে সম্ভব নয়।মেয়েদের জীবনটায় যে এমন। নিজের মা-বাবা, পরিবার সবাইকে ছেড়ে অন্যের বাড়িতে, সম্পূর্ণ অজানা-অচেনা মানুষের কাছে চলে যেতে হয়।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে যার জন্য এত কান্না সে একটুও কাদেনি।মায়ার চোখে একফোঁটা পানিও আসেনি।সে শুধু মা-বাবাকে সান্ত্বনা দিয়েছিল।পাষাণ হৃদয়। যদিও এটা নিয়ে রাহুল আর রুহানি অনেক পচিয়েছিল তাকে। কিন্তু সে শুধু একটা কথাই বলেছিল, “কান্না না আসলে আমি কী করব?”
রাফানা চৌধুরী মাহেরা খানকে সান্তনা দিয়ে বলেছিলেন যে সে তার মেয়েকে নিয়ে যাচ্ছেন।তার মেয়ে এক বাড়ি ছেড়ে তার অন্য বাড়িতে যাচ্ছে।
মায়াকে গাড়িতে উঠানো হয়।মায়ার পাশে রুদ্র কে বসানো হয়েছিল। সামনের ড্রাইভিং- সিট এ রাহুল বসেছিল।পুরো রাস্তা সে ড্রাইভিং করে নিয়ে যাবে।তার পাশের সিটে রুহানি।রুয়ান চৌধুরী আর রাফানা চৌধুরী অন্য গাড়িতে আগে আগে চলে গেছেন। বাড়িতে গিয়ে তাদের সবকিছু ঠিকঠাক করতে হবে।পুরো রাস্তা রাহুল আর রুহানি অনেক মজা করেছে। দুজনকে নিয়ে দুষ্টামিও করেছে অনেক।কিন্তু যাঁদের নিয়ে এতো হটকারিতা তাদের মুখেই কোনো কথা ছিল না।
,
অবশেষে গাড়ি ‘চৌধুরী ম্যানশনের’ সামনে এসে দাঁড়ালো। দারোয়ান গেইট খুলেতেই প্রবেশ করলো গাড়িটি। গাড়ি থেকে ধীরে স্বস্তে নামলো চারজন।রুহানি গিয়ে বেল বাজায়।রুদ্র আর মায়া পাশাপাশি হাটে।কিন্তু কোনো কথা বলে না।রাফানা চৌধুরী দরজা খুলে দেন। রাহুল আর রুহানি ভেতরে ঢোকে। কিন্তু মায়া আর রুদ্র ঢুকতে গেলে বাঁধ সাধেন রাফানা চৌধুরী।
-” রুদ্র।তুমি মায়াকে কোলে নিয়ে ভেতরে ঢুকবে।”
-“কী?কোলে নিয়ে ভেতরে ঢুকতে হবে মানে কী?আমি পারব না এটা করতে।”
-“এটাই এ বাড়ির নিয়ম।নতুন বউ স্বামীর কোলে চড়েই এ বাড়িতে প্রথমবার পা রাখে।”
-“এ নিয়ম কখন তৈরি হলো।আগে তো ছিল না।”
-“আগে ছিল কি-না ছিল না সেটা তুমি জানবে কী করে।এ বাড়িতে তোমার জন্মের পর কোনো বিয়ে হয়েছে নাকি। আমিও তোমার মাকে কোলে করেই বাড়িতে ঢুকে ছিলাম।”পাশ থেকে রুয়ান চৌধুরী হাসি হাসি মুখ করে বলে উঠে।
-“ছেলে-মেয়েদের সামনে এসব কী বলছো?”রাফানা চৌধুরী হা-হুতাশ করে বললেন।
মায়া নিজেও সমস্যায় পরে গেছে।রুদ্রর কোলে উঠবে কী করে। লজ্জা লাগবে তো।পরক্ষণে ভাবলো লজ্জা পাবে আর ও।লজ্জা শব্দ টা তো ওর ডিকশনারির কোথাও লেখা নেই।
রাহুল আর রুহানিও পাশ থেকে পিন্চ মেরে যাচ্ছে।বেস শুধু রুদ্র একবার কোলে নিক বন্ধুমহলে সেই একটা ট্রল হবে।
-“আমি কোলে নিতে পারব না।”রুদ্র শান্ত স্বরে বললো তার মাকে।
-“ঠিক আছে তাহলে।সারারাত বাইরে দাঁড়িয়ে থাকো। মায়াকে কোলে নেওয়া ছাড়া ভিতরে ঢুকতে পারবে না তুমি।”
-“কী বলছো?সারারাত বাইরে দাঁড়িয়ে থাকব?”
-“হ্যাঁ থাকবে।মায়া ভিতরে এসো তুমি।”
-“ও কেনো ভিতরে যাবে।নিয়ম তো দুজনের জন্যই।তাহলে আমি শাস্তি পেলে ও কেনো পাবে না।”
-“ও তো আর অবাধ্য হচ্ছে না। অবাধ্য হচ্ছ তুমি।ভেবে দেখো কী করবে?”
রুদ্র কিছুক্ষণ চিন্তা করার পর ভাবলো, সারারাত এখানে দাঁড়িয়ে থাকার চেয়ে মায়াকে কোলে নিয়ে ভেতরে ঢোকায় ভালো।রুদ্র তাকালো মায়ার দিকে। মায়া এতক্ষণে তাকিয়েছে তার দিকে।সাথে মুখে লেপ্টে আছে গা-জালানো হাসি।রুদ্র চোখ দিয়ে আত্মস্থ করলো,মানে পরে দেখে নিবে ওকে।
-“চোখে চোখে কথা বলো মুখে কিছু বলো না।” পাশ থেকে রাহুল চিল্লিয়ে বলে।সবাই ঠোট টিপে হাসছে।
রুদ্র কিছু না বলে মায়াকে কোলে তুরে নেয়। রুদ্রর বুকের দিকের পান্জাবি খামচে ধরলো মায়া।একপলক দৃষ্টি তাক করলো ওর গোমড়ামুখের দিকে। সবাই দরজা থেকে সরে দাড়ায়।রুদ্র মায়াকে নিয়ে ভেতরে ঢোকে। রাহুল আর রুহানি “ও,ও ” বলে চিল্লাচ্ছে। ডাইনিং এ গিয়ে নামিয়ে দেয় মায়াকে।তারপর আর একমুহূর্তও না দাঁড়িয়ে, হনহনিয়ে চলে যায় দোতলায়। রাফানা চৌধুরী পিছন থেকে অনেক ডাকে ওঁকে। কিন্তু রুদ্র শোনে না।
মায়া থামালো তাকে। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বললো
-“মামনি ডেকোনা ওকে।যেতে দাও।”
-“কিন্তু….. ”
-“কোনো কিন্তু না।এমনিতেই অনেক কাহিনী করেছি ওর সাথে!বেচারা ফেড আপ।আর না ঘাঁটানোয় ভালো ওঁকে!”
রুহানি মায়ার কাধে হাত রাখলো। মৃদু হাসলো মায়ক।রাফানা চৌধুরী তিনজনকে সোফায় বসালেন।মায়াময় স্বরে বললেন
-“দুপুর থেকে কিছু খাওনি।ক্ষিদে লেগেছে নিশ্চয়ই।রান্না তো বসানো হয়নি।অন্য কিছু খেয়ে নাও সবাই। ”
-”রুদ্রও কিছু খায়নি মামনি।ওকে ছাড়া খেয়ে নেবো সবাই?” মুখ কালো করে বললো মায়া।
রাফানা চৌধুরী হতাশ স্বরে বললেন
-“তুমি খেয়ে নাও মায়া।ও রেগে আছে।খাবে না এখন।”
-“তোমরা খেয়ে নাও মামনি।আমিও দেখব কতক্ষণ রেগে থাকে ও।খেলে ওর সাথেই খাবো।”
-“ভালুপাসা চুন্দল।”পাশ থেকে রুহানি টিপ্পনি কেটে বলে উঠে। রাহুলো তার মেলায় ওর সাথে।মায়া কনুই দিয়ে গুতা দেয় রুহানি কে।
রাফানা চৌধুরী আর রুয়ান চৌধুরী অনেক বলেও মায়াকে খাওয়াতে পারল না।
-“রুহানি মায়াকে রুদ্রর রুমে দিয়ে এসো।”রাফানা চৌধুরী রহানি কে উদ্দেশ্য করে বলেন।
-“ওকে দিয়ে আসতে কেন হচ্ছে।ও কী নিজে যেতে পারে না?নতুন এসেছে না-কি এ বাড়িতে?না রুদ্রর রুমে কোনোদিন ঢোকেনি ও?” বিহ্বল স্বরে বললো রাহুল।
রাফানা চৌধুরী হাসলেন।বললেন
-“প্রতিদিন যাওয়া আর আজকের যাওয়া আলাদা। আজ ওঁদের বিয়ে হয়েছে তাই নতুন বউ হিসেবে দিয়ে আসতে হবে।”
-“নতুন বউ চলো।”দাঁত দেখিয়ে হাসলো রুহানি।
মায়া ভেংচি কাটে।দুজন উঠে দাড়ায় যাওয়ার জন্য।
-“আমিও যাব, আমিও যাব।”বলে রাহুলও উঠে দাড়ালো।
সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলো তিনজনে।
-“হে রে মায়ু।আমিতো জানি বউরা অপেক্ষা করে জামাই দের জন্য।এখানে তো জামাই অপেক্ষা করছে।”ভাবুক স্বরে বললো রুহানি।
রাহুল হাসি হাসি মুখে বললো
-“আররে মায়ার বিয়ে বলরে কথা, সবকিছুই ইউনিক হতে হবে।”
অবশেষে রুদ্রর কক্ষের দরজার সামনে এসে পৌঁছায় তিনজনে।মায়ার বুকের মধ্যে ধুপধুপ করছে।এই কক্ষে অনেকবার এসেছে ও।কিন্তু আজকের অনুভূতি আলাদা।অনুভূতির চেয়েও বেশি রুদ্রর চোখে চোখ রাখার ভয়।যা যা ঘটিয়েছে তাতে রুদ্র ওঁকে জ্যান্ত না চিবিয়ে খায়!
রুহানি দরজা ধাক্কা দেয়।তবে ভেতর থেকে সাড়া দেয় না রুদ্র।
-“রুহি ও কী দরজা খুলবে না?”রাহুল চিন্তিত স্বরে জিজ্ঞেস করলো।
-“একশোবার খুলবে।না খুললে দরজা ভেঙ্গে ঢোকাবো মায়াকে।”রুহানি জবাব দেয়।
তাদের কথার মাঝেই খট করে দরজা খুলে যায়।রুহানি আর রাহুল শয়তানি হেসে মায়াকে ধাক্কা দেয়।তারপর দরজা আটকে দেয় বাইরে থেকে।সুবিধার জন্য লক করে না।মায়া হুমরি খেয়ে পরে রুদ্রর বুকে।রুদ্রর বুকের ঢিপঢিপ শব্দ শুনতে পাচ্ছে ও।চোখ তুলে পিটপিট করে তাকালো রুদ্রর মুখের দিকে তাকালো মায়া।রুদ্র নিষ্প্রভ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
রুদ্রর কাছ থেকে দ্রুত সরে দাঁড়ালো ও। রুদ্র গিয়ে দরজার হুক তুলে দিলো।মায়া একপলক সেদিকে তাকিয়ে আবার সামনে তাকালো। চক্ষু ছানাবড়া হলো ওর। রুমের অবস্থা কাহিল।কক্ষের একটা কাঁচ আস্ত নেই।সব ভেঙে চুরে গুঁড়িগুঁড়ি হয়ে পরে আছর ফ্লোরে।ধ্বং*সযজ্ঞ চালিয়েছে কেউ কক্ষ টার উপর।
শুধুমাত্র সাউন্ড-প্রুফ দরজা হওয়ায় এতো শব্দ বাইরে যায়নি।মায়া সামনের ভাঙা কাচ পেরিয়ে খাটের সাথে হেলান দিয়ে মেঝেতে বসলো।মনোযোগে দেখতে থাকলো রুদ্রর কার্যকলাপ। যেন কোনো ইন্টারেস্টিং সিনেমা দেখতে বসেছে ও।হাতে একটা পপকর্ণ বোল থাকলে ভালো হতো, মনে মনো ভাবলো মায়া।
রুদ্র দাঁড়িয়ে আছে সামনে।চাউনি নির্লিপ্ত ওর।দৃষ্টি নিষ্প্রাণ। অথচ নাকটা ফুলাচ্ছে একাধারে।যেন এসব কাঁচ মেঝেতে না ভেঙে মায়ার মাথায় ভাঙতে পারলে খুশি হতো!
-“আর কিছু ভাঙ্গা বাকি আছে?”মিষ্টি হেঁসে বললো মায়া।
রুদ্র শক্ত চোখে তাকায়।মায়ার হাসি গায়ে জ্বা*লা ধরিয়ে দেয়,ভেতরের আ*গুন আরো দা*উ দা*উ করে জ্ব*লতে শুরু করে।ক্ষোভে পাশে থাকা ফ্লাওয়ার ভাস হাতে নেয় রুদ্র।সবেগে ছুঁড়ে ফেলে মেঝেতে।ফ্লাওয়ার ভাসের কাচগুলো ভেঙে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে।মায়ার ভ্রুক্ষেপ হয় না এসবে।আর না কোনো অনুশোচনা হয়!
#চলবে

