#উৎসর্গ
#পর্ব:৮
#তানজিনা ইসলাম
রাতের অন্ধকার কেটে গিয়ে সকালের আলো ফুটছে।মানবজাতি এখনো ঘুমে তলিয়ে থাকলেও পাখিরা তাদের ভাগ্যের সন্ধানে বেরিয়ে গেছে।মায়ার ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর নিজেকে কারো বুকের উপর অনুভব করলো। মায়া পিটপিট করে চোখ খুলে। মাথা তুলে সামনে তাকাতেই চোখে পরে রুদ্রর ঘুমন্ত মুখ।মায়া থমকায়।তারপর মনে পরে কালরাতের কথা।তাদের বিয়ের কথা।মায়ার নিজেকে অসম্ভব দুর্বল লাগছে।খিদেয় পেট চো-চো করছে। কালরাতে রুদ্রর সাথে পরে খাবে বলে খায়নি।কিন্তু রুদ্রর উৎপীড়নে পরে আর খাওয়া হয়নি।
মায়া বিছানা ছেড়ে নেমে দাড়ালো।দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে ঘড়ির কাটায় ৫:৩০ বাজে।শুধুমাত্র খিদের কারণেই এতো সকালে ঘুমটা ভাঙে গেছে ওর। কিন্তু এখন খাবার কই পাবে?বাড়ির কেউ নিশ্চয় এতো সকালে উঠেনি।
পরনে এখনো শাড়ি।যদিও ঘুমানোর দরুন শাড়ি টা এলোমেলো হয়ে আছে। মায়া পরনের শাড়ি ঠিক করে দরজা খুলে বাইরের দিকে পা বারালো ।পা টিপে টিপে সিড়ি বেয়ে নিচে নেমে দেখলো কেউ নেই।সবাই ঘুমে কাদা।রান্না ঘরে যাবে ভাবলেও পরে আর যাওয়া হলো না।প্রথম দিন এসেই এভাবে রান্না ঘরে যাওয়া ঠিক হবে না।একটু হাটাহাটি করলে হয়তো পেটের খিদে কম অনুভূত হবে।
সদরদরজার সামনে গিয়ে দেখে দরজা টানানো। কিন্তু তালা দেওয়া নেই। মায়া মনে মনে খুশি হলো।নিশ্চয় কোনো সার্ভেন্ট নামাজ পরতে উঠার পর দরজা খুলে দিয়েছে।মায়া দরজা খুলে বাইরে পা দেয়।বাড়ির সামনের উঠোনের একপাশে বাগান আছে।এখানে অনেকবার আসার ফলে বাড়ির সবকিছুই চেনা ওর।
সতেজ,স্নিগ্ধ বাতাস।নিচের মাটি স্যাতস্যাতে।নিশ্চয় কাল রাতে বৃষ্টি হয়েছে। মায়া বুক ভরে শ্বাস টানে।পায়ের চপল খুলে খালি পা ঘাসের উপর রাখে।একটু একটু ঠান্ডা লাগছে।মায়া গায়ের শাড়ি আরেকটু জড়িয়ে নেয়।তারপর হাটতে থাকে সামনে।বাগানের একপ্রান্তে আম গাছের নিচে দোলনা টাঙানো। মায়া দৌড়ে গিয়ে দোলনা তে বসে পরে।
দোলনা টা হয়তো নতুন টাঙানো হয়েছে।কারণ এর আগে দোলনা টা চোখে পরে নি।মায়া মনের সুখে দোল খাচ্ছে।হঠাৎ সামনে তাকাতেই মায়া চমকে যায়।একি আরিয়ান দাঁড়িয়ে আছে! মায়া চোখ কচলে আবার সামনে তাকায়।হ্যাঁ,আরিয়ানই তো।কিন্তু এতো সকালে আরিয়ান এখানে কী করবে? মায়া এগিয়ে যায় আরিয়ানের দিকে।আরেক দফা অবাক হয় আরিয়ানের দিকে তাকানোর পর। হালকা নীল রঙের শার্ট পরেছে।শার্টটা হালকা ভিজে গায়ের সাথে লেপ্টে আছে।উপরের দুটো বোতাম খোলা। চোখ ফুলে অবস্থা খারাপ।নিষ্পলক তাকিয়ে আছে তার দিকে।মায়া অবাক হয়ে শুধালো
-“রিয়ান।এতো সকালে তুই এখানে?”
-“তোর আর রুদ্রর বিয়ে হয়ে গেছে মায়ু!আমাকে একবার বললিনা পর্যন্ত।”ভাঙা গলায় বললো আরিয়ান।
-“ইয়ার। এমন পরিস্হিতিতে বিয়েটা হয়েছে যে কাউকে বলার সুযোগটাই পেলাম না।কিন্তু তুই এত সকালে শুধুমাত্র এটা বলার জন্য এসেছিস?”
-“না।তোকে দেখার জন্য এসেছি। ”
-“আমাকে?তাও এতো সকালে?”
-“হ্যাঁ।আমি অনেক আগেই এসেছি।”
-“তোকে কে বলল আমাদের বিয়ের কথা?”
-“রাহুল বলেছে।আমি তোকে শুভেচ্ছা জানাতে এসেছি।অবশেষে তোর ভালোবাসার মানুষ তোর হলো।”আরিয়ানের গলা কাপছে।মায়া অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। বিধ্বস্ত লাগছে ওকে।চোখে পানি টলমল করছে।
-“রিয়ান তুই কাদছিস?”
-“কই না-তো।”
-“কিন্তু আমি যে দেখতে পাচ্ছি।শুধুমাত্র বিয়েতে দাওয়াত দি নি বলে এভাবে কাদবি?
আরিয়ান ক্ষীণ হাসলো।তারপর মায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো।
-“দোয়া করি,অনেক বেশি ভালো থাক তুই। সৃষ্টিকর্তা তোদের সংসার সুখের চাদরে মুড়িয়ে দিক।কোনো কষ্ট যাতে তোকে ছুতে না পারে।ভালোবাসা হারানোর মতো যন্ত্রণা যাতে কোনোদিন না আসে তোর জীবনে।”মায়া চমকে তাকায় ওর দিকে।কী বলছে এসব আরিয়ান।এতোটা বিষাদ কেন কন্ঠে।যেন বহু কষ্টে কান্না আঁটকে রেখেছে!
আরিয়ান পিছু ফিরে চলে যাবে তার আগেই মায়া ধরফরিয়ে ডেকে উঠলো
-“চলে যাচ্ছিস?”
-“তোকে দেখার জন্য এসেছিলাম।দেখা হয়ে গেছে। তাই চলে যাচ্ছি।নয়তো আমি আবার দুর্বল হয়ে যাব।হিংসা করবো দোস্ত। বন্ধুত্বে হিংসা নেই।আর হ্যাঁ, শাড়িতে তোকে অনেক সুন্দর লাগছে।কোনোদিন দেখিনি কোকে শাড়ি পরতে!”
আজকে যেন মায়ার অবাক হওয়ার পালা শেষ হয় না।এসব কথায় কিছু লুকিয়ে আছে।আরিয়ান কেঁদেছে দেখেই বোঝা যাচ্ছে। চোখ মুখ এখনো টকটকে লাল ওর।ছেলেটার হয়েছে কী! মায়া আটকাতে চেয়েও আটকাতে পারেনা ওকে।আরিয়ান গেইট পেরিয়ে বেরিয়ে যায়। মায়ার মাথায় এখনো ওর বলা কথাগুলো ঘুরছে।কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছে না।
মায়া দোলনায় চড়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। তাই আবার বাড়ির দিকে চলে যায়।
কক্ষে গিয়ে দেখে রুদ্র এখনো ঘুমিয়ে আছে। মায়া সোফার পাশে মেঝেতে হাঁটু মুড়ে বসলো।রুদ্রর দিকে মায়াময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো অনেক্ক্ষণ।
সিল্কি চুল গুলো কপালে লেপ্টে আছে।মায়া হাত দিয়ে চুলগুলো সরিয়ে দেয়।রুদ্র ঘুমের ঘোরে মায়ার হাত টেনে নিয়ে বুকের মাঝে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। মায়া হাসে।হাতটা টেনে নেওয়ার ইচ্ছা জাগে না।ওভাবেই ওঁকে দেখতে দেখতে পাশে একটু জায়গা করে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পরে।
পর্দার ফাক গলিয়ে জানালা দিয়ে সূর্যের আলো আসতেই রুদ্রর ঘুম ভেঙে যায়।বুকে কারো হাত অনুভব করতেই মেঝেতে বসা মায়াকে দেখতে পায়।দু-হাত সোফার উপর রেখে তার উপর মাথা কাত করে বাচ্চাদের মতো বেঘোরে ঘুমাচ্ছে।চুলগুলো খোলা থাকায় সবগুলো মুখের ওপর এসে পরেছে।এভাবে ঘুমাচ্ছে কেন মেয়েটা?আশ্চর্য!ঘাড়ের ব্যাথা উঠে যাবে তো।কিন্তু পরক্ষণেই মনে পরে মায়ার জন্য কিছুই অসম্ভব নয়।রুদ্র আলতো ধাক্কা দিয়ে ডাকে মায়াকে।মায়া নড়েচড়ে আবার ঘুমিয়ে পরে। রুদ্র এবার জোরেই ডাক দেয়। মায়া লাফ দিয়ে উঠে বসে।আতঙ্কিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে হড়বড়িয়ে বলে
-“এভাবে ষাঁড়ের মতো চেচাচ্ছিস কেনো?”
-“আমি ষাঁড়?”
-“ষাঁড় তো বলিনি।বলেছি ষাঁড়ের মতো চেচাচ্ছিস।”
-“ওই একিই হলো।কতক্ষণ ধরে ডাকছি! ”
থম মেরে বসে থাকলো মায়া।ঘুমের রেশ এখনো পুরোপুরি কাটে নি।ঘুমঘুম স্বরে জিজ্ঞেস করলো
-“কয়টা বাজে?”
-“৯:৫০”।রুদ্র ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললো।”আবার মায়াকে ওভাবে বসে থাকতে দেখে বললো
-“কী হয়েছে,এভাবে বসে আছিস কেনো?”
-“অনেক খিদে পেয়েছে রে। “অসহায় মুখ করে বললো মায়া।
-“কাল রাতে কিছু খাসনি?”
ঠোঁট উল্টে দু পাশে মাথা নাড়ালো ও।
-“খাসনি কেন?তোর মামনি বুঝি কিছু খেতে দেয়নি?” রেগে জিজ্ঞেস করলো রুদ্র।
-“দিবে না কেন?তোর সাথে খাব বলে খাইনি।”
-“আহারে আসছে আমার,ভালোবাসা দেখাতে।তুই যে খিদে সহ্য করতে পারিস না সেটা জানিস না! সাফার করতে বলেছে কে তোকে?মানে হুদাই সবকিছু নিজের মাথার উপর নিয়ে বসে থাকতে হবে তোকে, তাইনা!”
মায়া এখনো ঠোঁট উল্টে অসহায় মুখ করে তাকিয়ে আছে।
-” উঠে বস।আমি নাস্তা নিয়ে আসছি উপরে।”সোফা থেকে নেমে বললো রুদ্র।
তখনই দরজায় টোকা পরে। রুদ্র গিয়ে দরজা খুলে দেয়।রাফানা চৌধুরী খাবারের প্লেট নিয়ে ভেতরে ঢোকে।সেন্টার টেবিলে প্লেট রেখে বলে
-“কাল রাতে দুটো কিচ্ছু খাসনি।এখন সব খাবার শেষ করবি দুজনে।”
-“কাল রাতে তোমাদের সাথে খাইয়ে দাওনি কেন ওকে।খিদের চোটে দাড়াতে পারছে না ও।”
-“ওই তো বললো তোর সাথে খাবে।”
-“তুমিতো জানো মা ও খিদে সহ্য করতে পারে না।”
-“আচ্ছা সরি সরি।”
রাফানা চৌধুরী রুদ্র কে পাশ কাটিয়ে মায়ার হাতে একটা শাড়ি ধরিয়ে দিয়ে বলে।
-“এটা পরে নিচে নামিস কেমন।তোকে কয়েকজন দেখতে আসবে।”
মায়া অবাক হয় দেখতে আসার কথা শুনে।ওদের বিয়ের কথা তো কাউকে জানানোই হয়নি।
মায়ার মনের কথা বুঝতে পেরে রাফানা চৌধুরী নিজেই বলেন
-“আসলে আমার কয়েকজন ফ্রেন্ড। এই আশেপাশেই থাকে ওরা।আজ সকালেই কল দিয়ে বলেছি সবাইকে।”
রুদ্র বিরক্তির শ্বাস ফেলে। তার মায়ের বান্ধবীর অভাব নেই।এই এলাকার সবগুলো মহিলাই তার মায়ের বান্ধবী ।তার মা পারে না এই এলাকার আশেপাশের এলাকার সব মহিলা কে বান্ধবী বানিয়ে ফেলতে।সবগুলোই পাশের বাসার আন্টি।
রুদ্র আর না দাঁড়িয়ে মুখ ধুতে চলে যায়।
-“কিন্তু মামনি।আমিতো শাড়ি পরতে জানি না।এটা তো তুমি আর আম্মুই পরিয়ে দিয়েছিলে।” দুখী দুখী মুখ করে বললো মায়া।
-“আরে আমি পরিয়ে দেব আরকি আমার মেয়েকে।তুই আগে খেয়ে নে।তারপর আমি এসে পরিয়ে দেব।”রাফানা চৌধুরী চলে যান।
রুদ্র ততক্ষণে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে গেছে। রুদ্র বেরোনোর পর মায়া ঢোকে ওয়াশরুমে।
মায়া বেরিয়ে দেখে রুদ্র অলরেডি খেতে বসে গেছে ওকে ছাড়ায়।গজগজ করতে করতে সামনে এলো ও।অভিযোগের স্বরে বললো
-“আমাকে ছাড়াই খেতে বসে গেলি।একটু অপেক্ষা তো করতে পারতি।”
-“তুই কোন দেশের প্রধানমন্ত্রী হে, যে তোর জন্য অপেক্ষা করতে হবে।”
-“কালকে তোর জন্য আমি না খেয়ে অপেক্ষা করেছিলাম।পুরো রাত খিদের জ্বালায় কষ্ট পেয়েছি। তাও কিচ্ছু খাইনি,শুধুমাত্র তুই খাসনি বলে।”
-“আমি তোকে না খেয়ে কষ্ট পেতে বলিনি।”
মায়া মনে মনে কষ্ট পেল।কিন্তু মুখে কিছু বললো না।মুখ কালো করে খেতে বসে পরলে।
আগে পেটকে শান্ত করতে হবে।তারপর দেখে নিবে রুদ্র কে।
দুজনেই খাওয়া শেষ করলো।রাফানা চৌধুরী মায়াকে এসে শাড়ি পরিয়ে দিলেন।রুদ্র বাইরে কোথাও গেছে। কলাপাতা রঙের শাড়ি মায়ার ফর্সা শরীরে সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।
শাড়ি পরানো শেষে মায়ার মাথায় ঘোমটা টেনে দিলেন।মায়ার কপালে চুমু খেয়ে থুতনি ধরে বলে উঠেন “নজর না লাগুক।”
মায়া মিষ্টি হাসলো।একজন সার্ভেন্ট এসে জানালো,
অতিথিরা চলে এসেছে।রাফানা চৌধুরী মায়াকে নিয়ে সিড়ি বেয়ে নিচে নামছেন।ডাইনিং রুমে দশ -এগারোজন মহিলা বসে আছেন।তাদের হাসির শব্দ শোনা যাচ্ছে।
,
রাফানা চৌধুরী নিচে নামলেন মায়াকে নিয়ে। সোফায় বসিয়ে দিয়ে পাশে বসলেন। মায়া সবাইকে লক্ষ্য করে সালাম দিল।রাফানা চৌধুরী মিষ্টি হেসে বলে উঠলেন-
-” দেখো সবাই আমার মিষ্টি বৌমা কে।”
-“বাহ! তোমার বৌমা তো অনেক সুন্দর দেখতে। তা তোমার নাম কী?” টেবিলে দেওয়া নাস্তার প্লেট হাতে নিতে নিতে একজন বলেন।।
-“মায়া।” মায়া মাথা নিচু করে বলে উঠে।
-“খুব সুন্দর নাম।”
রাফানা চৌধুরী খেয়াল করে দেখেন সবাই ফিসফিস করে কিছু বলছে। মূলত সবাই মায়ার প্রশংসা করছে।রাফানা চৌধুরী গর্ব করে হাসেন।মায়ার হাসফাস লাগছে। কখনো কারো সামনে এভাবে ভদ্র হয়ে বসেছিল কিনা মায়ার মনে পরে না।
-“তোমার চুলগুলো একটু দেখাও তো।”মিষ্টি খেতে খেতে সামনের একজন বলে।
মায়া চমকে তাকায়।চুল দেখাবে মানে কী?রাফানা চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে।রাফানা চৌধুরীও অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন।
মেয়ে দেখার প্রাচীন নিয়ম। যা যুগ যুগ ধরে চলে এসেছে।এখনো চলছে।হয়তো কিছু মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু কিছু মানুষ এখনো সেই প্রাচীন নিয়মেই আটকে আছেন। মেয়েকে অবশ্যই সব দিক থেকেই পরিপূর্ণ হতে হবে।সুন্দর গায়ের রং, সুন্দর চুল,সর্ব কাজে গুণান্বিত হতে হবে।মেয়েদের কোনো খুত থাকা যাবেনা।আর কিছু মানুষ তো মেয়ে দেখতে গেলে একেবারে পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত খুটিয়ে খুটিয়ে দেখে।
-“চুল দেখাবে মানে কী আপা?রাফানা চৌধুরী সাথে সাথে প্রতিবাদ করে উঠেন।
-“না মানে চুলগুলো কতটুকু লম্বা একটু দেখতাম আর কি।
-“আমার বৌমার চুল দেখে আপনি কী করবেন?”রাফানা চৌধুরী শান্ত কিন্তু গম্ভীর স্বরে বলেন।
সামনের মহিলাটা হয়তো অপমানবোধ করলেন।আমতা আমতা করে কিছু বলতে যাবে তার আগেই রাফানা চৌধুরী বলেন-
-“আমি বৌমা আনি নি আপা। আমি বাড়ির জন্য একটা মেয়ে এনেছি।তাই তার কোনো কিছু দেখার প্রয়োজন বোধ করিনি।তার গায়ের রঙ কেমন তা দেখিনি। তার চুল লম্বা নাকি ছোট তাও দেখিনি।সে রান্না করতে জানে নাকি জানে না তাও দেখিনি।সে যদি রান্না করতে না জানে আমি তাকে শিখিয়ে দেব।তাই আমি এটাই আশা করবো আমার মেয়ের কোনো দোষ -গুণ আপনারা দেখতে চাইবেন না।”
রাফানা চৌধুরীর কথা শুনে সবাই চুপ করে গেল।মায়া অভিভূত হয়ে শাশুড়ী কে দেখলো।আসলেই শুধু মুখে ই বলেনি যে তার মেয়ে। কাজেও প্রমাণ করে দেখালেন।
নাস্তা করা শেষে সবাই বিদায় নিল।মহিলাটি রাফানা চৌধুরীর কাছে ক্ষমা চাইলেন।কিন্তু রাফানা চৌধুরী কিছুই
বলেননি।
,
রাফানা চৌধুরী দুপুরের রান্না করছেন। মায়া কিচেনে উঁকি দিল।যদিও কয়েকজন সার্ভেন্ট তাকে সাহায্য করছে,তারপরও মায়া গিয়ে তার পিছনে দাড়ালো।তারপর আহ্লাদী গলায় বললো
-“মামনি। আমি তোমাকে সাহায্য করি।”
-“সাহায্যের প্রয়োজন নেই। তুই গিয়ে রেস্ট নে।আমার রান্না প্রায় হয়েই এসেছে।”
-“সকাল থেকেই তো রেস্ট করছি।প্লিজ মামনি। আমাকে কোনো একটা কাজ দাও।”
-“তোর বাড়িতে যেমন কাজ করতি না,এখানেও করার দরকার নেই। এটাও তোর বাড়ি।”
-“জানি তো। তারপরও সবাই কাজ করছে, আমি কিছু করছি না কেমন জানি লাগছে।”
মায়ার জোড়াজুড়িতে রাফানা চৌধুরী মায়াকে টেবিল সাজানোর দায়িত্ব দিলেন।
মায়া কিচেন থেকে তরকারি আর প্লেটগুলো নিয়ে ডাইনিং টেবিলে সাজালো।
রুদ্র নিচে নেমে টেবিলে বসলো।রুয়ান চৌধুরীও কক্ষ থেকে বের হলেন।
-“আরে আমার মেয়ে প্রথম দিনেই কাজ করছে কেন?”রুয়ান চৌধুরী টেবিলে বসতে বসতে বলেন।
-“আমি কিছুই করিনি বাবাই৷ সব মামনি আর ওরা করেছে। আমি তো শুধু টেবিল সাজাচ্ছি।”
রুদ্র মুখ বাকালো। মাঝে মাঝে অসম্ভব হিংসা লাগে ওর।ওর মা-বাবা যেন ওর চেয়ে মায়াকে একটু বেশিই দেখতে পারে।
-“এবার তুই বসে পর।”রাফানা চৌধুরী সবার প্লেটে খাবার তুলে দিতে দিতে মায়াকে উদ্দেশ্য করে বললেন।
মায়া টেবিলে বসে।চারজন খাওয়া শুরু করে।রুয়ান চৌধুরী খাবার খাওয়ার মাঝেই সবার উদ্দেশ্যে বললেন
-“আমি চাচ্ছি খুব তাড়াতাড়িই মায়া আর রুদ্রর বিয়ের অনুষ্ঠান টা করে ফেলতে।”
-“বাবা বিয়ে তো হয়েই গেছে। আবার অনুষ্ঠান করার দরকার কী?”কপালে ভাজ ফেলে বললো রুদ্র!
-“বিয়েটা হয়েছে। কিন্তু কী পরিস্থিতিতে হয়েছে সেটা তুমিও জানো।বিয়ে মানুষের জীবনে একবারই আসে।হয়তো তোমার কোনো ইচ্ছা নেই। কিন্তু মায়ার তো তার বিয়ে নিয়ে স্বপ্ন থাকতেই পারে।আর এছাড়াও মায়ার বাবা আর আমি বিজনেস পার্টনার।এখন অন্য পার্টনাররা কোনো না কোনোদিন তোমাদের বিয়ের কথা জানতেই পারবে।তখন যদি তারা বদনাম করে। ছেলের বিয়ে লুকিয়ে দিয়েছি বলে ভাবে। তাই পরশু থেকেই অনুষ্ঠান শুরু হবে।কালকে থেকে প্রস্তুতি নিব।
-“তাহলে তো ভালোই হলো।দেরি করা ঠিক হবে না।মায়া তোর কিছু বলার আছে?”রাফানা চৌধুরী মায়ার উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করেন।
-“না।আমি কি বলব।তোমরা যা ভালো মনে করো।”খাওয়ায় মনোযোগ দিয়ে বললো মায়া।
রুদ্র দীর্ঘশ্বাস ফেলল।এ বাড়িতে ওর মতামতের কোনো দাম কি আছে?কেউ ওর মতামতের কোনো দামই দেয় না।বিয়ে যেনো শুধু মায়ার হয়েছে।তাই শুধু ওর মতামত নিলেই চলবে।একদিনে এসেই বাড়ির সবকিছু কবজা করে নিয়েছে।বেস শুধু একটা সুযোগ, এই সবকিছুর প্রতিশোধ নেবে মায়ার উপর।সবকিছুর জন্য মায়া দ্বায়ী!জীবনটা ঝালাপালা করে দিলো ওর!
#চলবে

