আপনার_হৃদয়ে_আমি #পর্ব_১৫

0
35

#আপনার_হৃদয়ে_আমি
#পর্ব_১৫
#জান্নাত_সুলতানা

তিয়ান দৌড়ে নামাজের জন্য যাচ্ছিল। প্রিয়ম গেইট থেকে বেরিয়ে ধাক্কা খেলো লম্বা চওড়া যুবকের সাথে। ব্যথায় চোখ বন্ধ করে নিচে পরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিলো। কিন্তু কিছু সময় পরে-ও যখন সে নিচে পরেনি তখন ভয়ার্ত চোখ খুলে তাকাল।

“লেগেছে পিচ্চি?”

তিয়ান থমথমে খেয়ে তাকিয়ে আছে মেয়ে টার ভীতু মুখের দিকে। প্রিয়ম দ্রুত তিয়ানের পাঞ্জাবি ছেড়ে দিলো। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে দুই দিকে মাথা নাড়ল। তিয়ান ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেললো। বললো, “থ্যাংকস গড।”

তিয়ান মৃদু হেঁসে প্রিয়ম কে পাশ কাটিয়ে চলে গেলো। প্রিয়ম অস্বস্তি লজ্জায় চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। এরমধ্যে সবাই এলো।

নির্ভাণ সফেদা রঙের একখানা পাঞ্জাবি গায়ে বেরুলো বাড়ি থেকে। সব মেয়েদের এভাবে এক সাথে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করলো,

“গ্রুপের লিডাররা কোথায়?”

“আফি আপু সানায়া আপু কে ডাকতে গিয়েছে।”

রাহার উত্তর। নির্ভাণ হাতের ঘড়ির ফিতা বাঁধছে। রাফা মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সুপুরুষ দেখতে নির্ভাণের দিকে। এরমধ্যে আফি এসে উপস্থিত হলো। সবাই কে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো,

“সবাই চলো। সানায়া যাবে না।”

সানায়া যাবে না শুনে সবাই অবাক। গতকাল থেকে এতো এক্সাইটেড ছিলো আজ যাবে না? রাফা অবাক হয়ে শুধালো, “এ মা কেনো?”

“ওর মাথাব্যথা।” আফির সোজাসাপ্টা জবাব। নির্ভাণ ততক্ষণে বেরিয়ে যাচ্ছে গেইট দিয়ে। কথাটা শুনে একটু থমকাল কী? তবে ঠাহর করা গেলো না কিছু। ইকবাল পেছন থেকে এসে কাঁধ জড়াজড়ি করে টেনে নিয়ে যেতে লাগল নির্ভাণ কে। তবুও আফির শেষোক্ত কথা দুটো কানে পৌঁছাল।

—–

বাড়ির বাগানের পেছন বড়ো এক আম গাছে মাইক দেওয়া। চারপাশে ও অনেক মাইক লাগিয়েছে। মাহফিলের শব্দে কারোর কথাই কেউ শোনার উপায় নাই। কাছে দাঁড়িয়ে কথাও চেঁচিয়ে বলতে হয়। আর এতো শব্দের মাঝে-ও সানায়া ঘুমিয়ে আছে প্রায় সেই চার টা থেকে। এখন সময় সন্ধ্যায় সাড়ে ছয় টা। ঘুম ভেঙে নিজেকে অন্ধকার রুমেই আবিষ্কার করলো৷ মামুনি লাইট যে ওর জন্যই দেয়নি সন্ধ্যা হওয়ার পরে-ও সেটা বুঝতে পেরেই মৃদু হাসলো। এখান থেকে একবারে ফ্রেশ হয়ে তবেই বেরিয়ে এলো। নিচে কারোর সাথে দেখা না করে নিজের দরকারে রুমের দিকে গেলো। পথিমধ্যে দেখা মিললো একান্ত তৃতীয় তলার সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছে। সানায়া একটু অবাক হলো। একান্তর রুম দোতলায়। তিনি তিন তলার সিঁড়িতে কী করছে? সানায়া পরক্ষণেই মনে পড়লো হয়তো ছাঁদে গিয়েছে। একান্ত ওকে দেখেই মিষ্টি করে হাসলো।

“তুমি মাহফিলে সবার সাথে যাওনি?”

একান্ত ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইলো। যেনো জেনে ও না জানার ভান করছে। সানায়ার কেনো জানি মানুষ টাকে সুবিধার লাগে না। সে হাসলো সব সময়ের মতোই জোর করে। তবে সুন্দর দেখতে এটা মানতে হবে। সানায়া মাথা দুলিয়ে বলে উঠলো, “ঘুমিয়ে ছিলাম।”

একান্ত আর কিছু বলবে তার আগেই সানায়া তাকে পাশ কাটিয়ে ওপরে উঠতে লাগলো। একান্ত সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলো তখনও।

আফি রুমে নেই। বিছানায় বাঁ পাশের বালিশের ওপর এক মুঠো সাদা রঙের চুড়ি রাখা। সানায়া সাদা দেখে একটু অবাক হলো। সাদা আফির পছন্দের রঙ নয়। আর না ওর। চুড়ি গুলো হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখে ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখলো। এরপর গায়ের জামা টা পরিবর্তন করে একটা সাদা রঙের কামিজ পরলো। সানায়র কামিজ তেমন নেই। ফ্রক, কূর্তি এসবেই পরে সে। গতবছর রমজানে নির্ভাণ ভাই নিজের কোচিং-এর প্রথম আর্নের টাকায় সবাই কে ঈদে মার্কেট করে দিয়ে ছিলো। সেই প্রথমবারের মতো সানায়াকে কেউ থ্রি-পিস দিয়ে ছিল। সানায়া এটা যত্ন করে রেখে দিয়েছে। যদিও এর পরে অনেক গুলো থ্রি-পিস পেয়েছে সে। তবে এটা কেনো জানি খুব বিশেষ কারণ ছাড়া পরতে ইচ্ছে করে না। সাদা রঙের চুড়ি সাদা রঙের থ্রি-পিস। মাথায় ঘোমটা তুলে তবেই নিচে নেমে এলো। বাড়িতে তখন সবাই উপস্থিত না থাকলে-ও কয়েকজন পুরুষ ছাড়া সবাই আছে। মাহফিল থেকে অনেক কিছুই এনেছে সবাই। সন্ধ্যার নাশতা শেষ হলো সে-সব দিয়েই। আফি কেমন সন্দিহান দৃষ্টিতে বারবার তাকাচ্ছে সানায়ার দিকে। সানায়া কে একা পেয়েই আফি ছাঁদে নিয়ে এলো। আশেপাশে যা গেরিলা বাহিনী কিছু বলতেও ভয় লাগে কখন কোথায় কী প্যাচ লাগিয়ে বসে থাকে ওরা।

“কী হয়েছে আপু?” সানায়া ছাঁদে এসেই জিজ্ঞেস করলো। পরপরই নিজের চুড়ি গুলো নেড়েচেড়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠলো, “চুড়ি গুলো ড্রেসের সাথে মানিয়েছে আপু। তোমাকে অনেক গুলো চুমু মাই লাভ।”

“আমি যে কসমেটিক এনেছি সে গুলো এখনে আমি আনপ্যাক করিনি সানা।” সানায়া এতো সময় আফির মুখের দিকে না তাকালেও এবার পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে অবাক হলো। আফির চোখে-মুখে সন্দেহের ছোঁয়া সাথে অস্থিরতা। সানায়া বুকের ভেতর ধ্বক করে উঠলো। আফি আবারও সন্দিহান কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো, “সত্যি করে বল সানা, এই চুড়ি তুই কোথায় পেয়েছিস?”

“তুমি রুমে রাখোনি এটা?”

আতংকিত সুর মেয়ে টার। জিহ্বা দিয়ে নিজের শুঁকনো ঠোঁট ভেজাল। আফি হতাশ হয়ে। এই মেয়ে একটু বড়ো কবে হবে? আফি দীর্ঘ নিঃশ্বাসের সাথে জবাব দিলো, “না।”

তাহলে এই চুড়ি কোত্থেকে এলো রুমে? আফিকে রাফা ডাকতে ডাকতে ছাঁদে চলে এসছে। নিচে একান্ত না-কি সব মেয়ে আর বাচ্চাদের এক সাথে ডেকেছে নিজের রুমে। আফি গেলেও সানায়া আর নড়তে পারল না সেখান থেকে। তার মনে তখন বারবার একান্তর সেই তিনতলার সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য চোখে ভাসছে। সে যদিও এসব সে ভাবতে চাচ্ছে না। তবুও কেনো জানি ওই মানুষ টাকেই সানায়ার সন্দেহ হচ্ছে।

“খুব বড়ো হয়েছিস? হুম? ছেলেরা চুড়ি দিচ্ছে। আবার সেটা হাতে পরে ঘুরছি। বাহ্।”

হঠাৎ নির্ভাণের কণ্ঠস্বর শুনে চমকে উঠলো সানায়া। শরীরের রক্তহিম হয় সাথে সাথে। চোখ বড়ো বড়ো করে পেছনে তাকায়। নির্ভাণ ভাই দাঁড়িয়ে আছে ছাঁদের একদম শেষ প্রান্তে। হাতে কিছু মিটমিট করে জ্বলছে। সানায়ার বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটা বেতালে ছুটছে। তবুও সে সাহস করে বিস্মিত হয়ে বলে উঠলো,

“কী সব বলছেন আপনি?”

নির্ভাণ ঝড়ের বেগে ওর সামনে এসে উপস্থিত হলো। সিগারেট ফেলে ওর হাতের কব্জি চেপে ধরে সামনে নিয়ে এলো হাত। দুজনের মুখের সামনে হাতটা উঁচু করে ধরে হাতের দিকে ইশারা করে বলে উঠলো, “এটা মিথ্যা নয় নিশ্চয়ই?”

“আমি জানি না এটা কে রেখেছে। আমি ভেবেছি আপু রেখেছে।”

সানায়ার অস্থির কণ্ঠে স্বীকারোক্তি। নির্ভাণ চোয়াল শক্ত করে শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে হাতের দিকে। সানায়ার ভয়ে কলজের পানি শুঁকিয়ে এলো যখন দেখলো নির্ভাণ সিগারেট ধরা রাখা ডান হাতটা ওর হাতের দিকে এগিয়ে আনছে। তিনি কী হাত পুড়িয়ে দিবে? কিন্তু কেনো? তিনি এটা করতে পারে না। সানায়া চোখ বন্ধ করে নিলো। ভয় রাগ দুটোই হলো। তিনি কী একটু বেশি বাড়াবাড়ি করছে না?

“প্লিজ আমার হাত পোড়াবে,,,”

আর কিছু বলার আগেই সে অনুভব করলো তার হাত থেকে চুড়ি গুলো খুব সাবধানের সহিত একটা একটা করে খুলছে নির্ভাণ ভাই। সানায়া বিস্ময় নিয়ে চোখ খুলতেই দেখলো নির্ভাণ চুড়ি খুলে ছাঁদ থেকে একটা একটা করে ফেলে দিচ্ছে। সানায়া অবাক যেমন হলো তেমনই রাগে এবার সে জ্বলে উঠল। হাত ঝাড়ি মেরে সরিয়ে নিতে চেষ্টা করেও ব্যার্থ হলো। ফলস্বরূপ শক্ত হাতে কব্জি আরও চেপে ধরলো নির্ভাণ। এক এক করে সব কয়টা চুড়ি খুলে ছাঁদ থেকে ফেলে দিলো। রাগে সানায়ার চোখের কোঠায় জল জমে। নির্ভাণ হাত টা ছেড়ে দিতেই সানায়া নিজের হাতটা বুকে চেপে ধরলো।

“আপনি খুব পাষাণ।”

টলমল চোখে চেয়ে অভিযোগ রাখলো। নির্ভাণ শান্ত। অন্ধকারে দূরে তাকিয়ে জবাব দিলো,

“তোর থেকে আমি আমার সার্টিফিকেট চাইনি।”

পরপরই নিজের পাঞ্জাবির পকেট হাতড়ে কিছু একটা বের করে সানায়ার হাত টা টেনে সেটা ওর হাতে দিলো। সানায়া তাকিয়ে দেখলো এটা একটা কালো রঙের চুড়ি। ওই সাদা চুড়ির চেয়েও দামি হবে নিসন্দেহে। সানায়ার রাগে পিত্তি জ্বলে উঠে। ফোঁস করে ওঠে বললো, “নাটক করেন? আমার চুড়ি ফেলে এখন নিজের টা দিচ্ছেন?”

“ওটা তোর ছিলো না। এটা তোর।”

যুবকের শান্ত স্বরেও যেনো খুব গম্ভীর শোনাল। সানায়ার রাগ এই যুবকের শান্ত স্বরের কাছেও ফিকে হয়ে আসে। গলার সুর নিচু করে ক্রন্দনরত কণ্ঠে বললো,

“আমি চাইনা আপনার চুড়ি। এটা আপনি নিন নয়তো এটা ফেলে দেব এক্ষুনি আমি।”

নির্ভাণ আচমকাই মেয়ে টার কোমরে হাত রেখে ছাঁদের রেলিঙের সাথে ঠেসে ধরলো। সানায়া ভয়ে নির্ভাণের পাঞ্জাবি খামচে ধরে ভীত চোখে একবার সামনে তো আরেকবার ঘাড় সামন্য বাঁকিয়ে পেছনে চায়। নির্ভাণ নিচের দিকে তাকিয়ে ফিচলে স্বরে বলে উঠলো,

“ছাঁদ টা কিন্তু তিন তলা। বেশ উঁচু। পরলে হাড়গোড় সব ভেঙে যাবে শিওর।”

সানায়ার চোখ বড়ো বড়ো হয়ে আসে। হাতের মুঠোয় থাকা পাঞ্জাবি আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো সে। ভীত কাঁপা কাঁপা গলায় বললো, “ভয় পাই না আমি।”

নির্ভাণ ফিচলে হাসল। কোমরে রাখা হাতটা আরো দৃঢ় হয় নির্ভাণের। আরও একটু পেছনে ঠেলতেই সানায়ার ভয় এবার গলায় ওঠে এলো। আচমকাই মানুষ টার গলায় হাত জড়িয়ে নিলো। সাথে সাথে থমকে গেলো নির্ভাণ। এই মেয়ে এমন অবুঝ কেনো? কিভাবে তাকাচ্ছে দেখো। নির্ভাণের বুকের ভেতর খুব জোরেই বিট করছে হার্ট। হাত ঢিলে হয় ধীরে। ঢোক গিলে সন্তপর্ণে।

“যা তোর তা তোর মানতে শিখ এখন থেকে। হোক সেটা খারাপ অথবা ভালো।”

নির্ভাণ ওকে আচমকাই ছেড়ে দিলো। পরপরই ছাঁদ থেকে নেমে যাওয়ার আগে বলে গেলো উপরোক্ত কথাখানা৷ সানায়া বুকে হাত চেপে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করছে। বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটা যেনো এক্ষুণি বেরিয়ে আসবে। সানায়া বুঝলো না নির্ভাণ ভাই কেনো বললো এমন কথা? সে ভয় পায় এটাই সত্য। এটাই কী মেনে নিতে বললো!

#চলবে…..

[আজ বড়ো পর্ব দিয়েছি কিন্তু। ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here