আপনার_হৃদয়ে_আমি #পর্ব_২২

0
28

#আপনার_হৃদয়ে_আমি
#পর্ব_২২
#জান্নাত_সুলতানা

“রাত বাজে দেড় টা। তুই এতোক্ষণে ডিনার করছিস?”

আচমকাই পেছনে থেকে নির্ভাণের রাশভারী কণ্ঠস্বর সানায়াকে ভয় পাইয়ে দিলো। কিছু টা ভয়ার্ত হলো বুক। পরক্ষণেই পিটপিট করে তাকায় মানুষ টার মুখপানে। ক্লান্ত চোখ, উষ্কখুষ্ক চুলসহ এলোমেলো শার্টে দাঁড়িয়ে নির্ভাণ। এতেও মারাত্মক লাগছে মানুষ টাকে। বুকের ভেতর হৃৎস্পন্দনের ধুকপুকানি তীব্রতা অস্থির করে তুলছে ওকে।

“উত্তর দিচ্ছি না যে?” নির্ভাণের গমগমে গলায় আবারও প্রশ্ন। সানায়া নিজেকে ধাতস্থ করলো তৎক্ষনাৎ। মিনমিন করে জানালো,”পড়তে পড়তে কখন ঘুমিয়ে গেছিলাম মনে নেই।”

তন্বী রহমানের মাঝেমধ্যে কোমরে ব্যাথা হয়। গতকাল হঠাৎ করে সেই ব্যাথা উদয় হয়েছে। মা হয়তো এইজন্যই ওকে রাতে ডাকতে যেতে পারেনি। নির্ভাণ দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। ফুপিমণি একটু বেশি উদাসীন মেয়ের প্রতি। মেয়ে খেলো কি-না ঠিক আছে কি-না কিছু নিয়ে মাথাব্যথা নেই ওনার। শুধু পড়াশোনা নিয়েই রাজ্যের চাপ দিবে মেয়ে কে।
নির্ভাণ জুতো খুলে দরজায় রেখে এসছে। রান্নাঘরের বেসিনে হাত ধুয়ে নিজেও টেবিলে বসলো। প্লেটের খাবার নিয়ে নিজেও খেতে আরম্ভ করে। সানায়া পাশে থম মেরে বসে তখনও। নির্ভাণ কাটা ছাড়িয়ে মাছ পাতে রাখতেই হুঁশ এলো ওর।
সারাদিন মানুষ টা বাইরে ছিলো। এখন আবার এসেই বসছে ওর সেবায়। সানায়া এটা ভেবে বললো,

“মাছ খাব না আমি।”

“জিজ্ঞেস করিনি আমি।”

নির্ভাণের গম্ভীর স্বরে জবাব। সানায়ার মুখ চুপসে এইটুকুন হয়ে আসে। আশ্চর্য, সে তো ভালোর কথা ভেবেই না করে ছিল। নির্ভাণ কোনো কথা শুনে না। সানায়াও তাই চুপচাপ খেতে শুরু করে।

নির্ভাণের খাওয়া আগেই শেষ হলো। সানায়া এটা দেখে নিজেও মুখের খাবার টা দ্রুত গিলে নিয়ে বললো, “আপনি প্লেট রেখে দিন। আমি ধুয়ে রাখব।”

“খাওয়া শেষ প্লেট নিয়ে আয়।”

নির্ভাণের থমথমে স্বরে আদেশ। সানায়া মাথা নিচু করে। শেষ লোকমা মুখে পুরে নির্ভাণের পেছনে যায়। নির্ভাণ নিজের প্লেট ক্লিন করে ওর টাও করে দেয়। সানায়া পেছনে দাঁড়াল, ঘাড় বাঁকিয়ে দেখে মানুষ টাকে। কত যত্নবান তিনি। ওনার বউ নিসন্দেহে ভাগ্যবতী। ইশ। বউ! বউ কথা টা মাথায় আসতেই মন টা খারাপ হয়। সে যে ওনাকে ভালোবেসে ফেললো যদি এটার পূর্ণতা না পায়? তখন কী হবে? নির্ভাণ ভাই তো অন্য কাউকে বিয়ে করবে। “না না এটা কিভাবে মানব আমি?” মনে মনে আওড়াল সানায়া।
পরপরই তাকাল মানুষ টার দিকে। নির্ভাণ ফিল্টার থেকে পানি নিচ্ছে গ্লাসে। সানায়া স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সেদিকে। মানুষ টার পানি পান করার সাথে সাথে গলার সেই উঁচু অংশ টা আরও আকর্ষণীয়। সে শুঁকনো ঢোক গিলে। ভীত চোখে চেয়ে থাকে সেদিকে।

“রুমে যা। পরীক্ষার আগে আগে বেশি রাত জাগলে শরীর দুর্বল হবে।”

সানায়া আকস্মিক নির্ভাণের কণ্ঠে চমকায়। থতমত খেয়ে মাথা নেড়ে সোজা ডাইনিং ছেড়ে আসে। নির্ভাণ ওর যাওয়ার পথে তাকিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। পকেট হাতড়ে সেই কাপল কি-চেইন টা এক ঝলক দেখে আবারও তা আগের স্থানে রাখলো। ফের মেয়ে টার পেছনে এলো।

লম্বা কদম ফেলে আগে আগে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠে গেলো। ইচ্ছে ছিলো এখনই কি-চেইন টা দেওয়ার। কিন্তু নিজের স্বভাবের কারণেই সেটা করা হলো না। নিজের সাথে করে রুমে নিয়ে গেলে।

——

দেখতে দেখতে সানায়ার পরীক্ষা ও চলে এসছে। কাল থেকে পরীক্ষা শুরু। অন্যদিকে নির্ভাণের পরীক্ষা শেষ সে নিজের তিন বন্ধুর সাথে ছোটখাটো একটা ট্যুরে অংশ নিয়েছে। সানায়া এতে ভীষণ রাগ হলে-ও এখানে তার কিছু করার নেই। নিজের বেলায় তো কোনো বাঁধা নেই। শুধু তার বেলায় ওনার যত নিয়ম।
গতকাল সন্ধ্যায় গিয়েছে। আর আজ রাতে আবার ফিরে আসবে। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য সানায়া ছটফট করছে কখন ফিরবে নির্ভাণ। সারাক্ষণ চোখের সামনে থাকা মানুষ টা পুরো ছত্রিশ ঘন্টা দেখতে না পেয়ে অস্থিরতা কাজ করছে ভেতর ভেতর। রাত তখন সাড়ে বারোটার বেশি বাজে। সন্ধ্যা রাতে মা এক দফা বকাঝকা করেছেন। কেননা সে পড়াশোনা নিয়ে সিরিয়াস নয়। মায়ের কথায় তার এখন তেমন মন খারাপ হয় না। বরং বাবার ওপর রাগ হয়। তিনি কেনো নেই? কেনো স্ত্রী সন্তানের দায়িত্ব থেকে পালিয়ে গেলেন? এসব থেকে মুক্তি পেতে পড়ায় মনোযোগ দিলো।
কিছু পড়া রিভিশন করে অস্থির হলো সে। এতোটা অস্থিরতা তার আগে কখনো আসেনি। কোনো কিছু না ভেবেই গুটিগুটি পায়ে দোতলায় ওঠে এলো। নির্ভাণের রুম টা বাইরে থেকে বন্ধ করা। সে দরজা খুলে খুব সাবধানে কক্ষে প্রবেশ করলো। লাইট জ্বলছে। সানায়া গিয়ে নির্ভাণ রোজ সোফায় যেখানে বসে ঠিক সেই বরাবর বসলো। সুন্দর এক সুগন্ধি কক্ষ জুড়ে। চারপাশে কেমন একটা প্রশান্তির ছোঁয়া যেনো লেপটে। আনমনে সে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ টার পারফিউম, ঘড়ি, নাড়াচাড়া করতে লাগলো। এগুলোতে তার কতোটা ভালো হয়েছে জানা নেই। তবে বিষণ্ণতা আরও বেড়েছে বৈ কমে নি। চাপা নিঃশ্বাস বুক চিড়ে বের হয়ে আসে। সেই শব্দের তোপে দরজার শব্দ ক্ষীণ যেনো। সানায়া চমকে উঠলো। ভয়ে বুকের ভেতর ধড়ফড়িয়ে উঠে। ঘাড় বাঁকিয়ে তৎক্ষনাৎ চাইলো পেছনে। আফি ফোনে হাতে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে ওর দিকে। তীক্ষ্ণ সেই দৃষ্টি সানায়া অগ্রাহ্য করে গেলো। ঢোক গিলে চোরা হাসলো।

“ধর, কথা বল।”

আফি হাতের মোবাইল টা সানায়ার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো। সানায়ার বিষয় টা বুঝতে কিয়ৎক্ষণ সময় লাগলো। হাত বাড়িয়ে ফোন টা নিয়ে কানে রাখলো।

“এতো রাতে আমার রুমে কী তোর?”

শরীরের রক্তহিম হয়ে আসে সানায়ার। কণ্ঠনালি দিয়ে শব্দ বেরিয়ে আসে না। অস্থিরতায় নাকের নিচে ঘামে চিকচিক করে ওঠে ত্বক।

সানায়া মাথা নুইয়ে ঠোঁট কামড়ে ফোন কানে ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। কিছু সময় নীরবতা ওপাশে। সানায়া ভাবল কল লাইন বোধহয় কেটে গেলো। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার তোড়জোড় কিশোরীর বুকের ভেতর। তক্ষুণি ভেসে এলো রাশভারি সুর, “ড্রেসি টেবিলের নিচে ড্রয়ার টা খুল।” সানায়া তৎক্ষনাৎ সেখানে দৃষ্টিপাত করলো। এরপর বিনাবাক্যে হাঁটু গেঁড়ে বসে ড্রয়ার খুললো।

ড্রয়ার সম্পূর্ণ ফাঁকা ছিলো না। সেখানে দুটো কি-চেইন চকচক করছিল। যেমন টা সেগুলো দেখে সানায়ার চোখ ও চকচক করে উঠলো। ঠোঁটের কোণে বিস্ময়। সে যেনো বিশ্বাস করতে পারছে না সত্যি এমন কিছু হয়েছে। একটা গোল রেজিনের ভেতর শুঁকনো ফুল এবং অন্য টা একটা হার্ট শেইপের।

“এটা কত সুন্দর।” সানায়া ফিসফিস করে উঠলো। নির্ভাণের ভারি নিঃশ্বাসের শব্দ। মনে মনে সে আওড়াল, “তোর কাছে কিছুই না।” এই কথা অন্য কোনো ছেলে কিভাবে বলতো! ঘটা করে? ফ্লার্ট করতো? নিশ্চয়ই এমন ফ্লার্ট করার সুবর্ণ সুযোগ হাত ছাড়া করতো না! কিন্তু নির্ভাণ তা করতে পারে না। সে চাপা নিঃশ্বাসের সাথে কণ্ঠ খাদে নামিয়ে বললো, “রাতে কুয়াশার জন্য গাড়ি চালানো মুশকিল। তাই আগামীকাল ফিরব আমি।” এইজন্যই তাকে এটা আজই দিয়ে দিলো? এটা কী পরীক্ষার হাদিয়া? হয়তো। সানায়ার মনে তখন হাজার রঙের প্রজাপতি ডানা নাড়ায়। তার খুশি আরও একটু বাড়িয়ে গম্ভীর মানুষ টা ফের বলে উঠলো,

“পছন্দ হয়েছে?” নির্ভাণ নিজের হাতে থাকা কাপল সেট কি-চেইন টার দিকে তাকিয়ে আছে অনিমেষে। নরম দৃষ্টি। কানে ফোন চেপে ওপ্রান্ত হতে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠের অপেক্ষায় সে।

“দুইটাই অনেক সুন্দর।” মেয়ে টার চোখমুখে উচ্ছ্বাস। একটু সময় নিশ্চুপ রইলো সানায়া। যেনো কিছু নিয়ে দ্বিধা কাজ করছে৷ অবশেষে বলে উঠলো, “আপনাকে অনেক গুলো থ্যাংকস।”

“শুধু থ্যাংকস?” নির্ভাণের ফিচলে স্বর। সানায়া হঠাৎ খেই হারিয়ে ফেলে কথার। বেতাল সে কোনো রকম শুধালো,

“আর কী?”

“চাইলে দিবি?”

মানুষ টা কী পাগল হয়েছে? তার সাথে রসিকতা করছে! সানায়া খুব সহজে এমন সুন্দর কথাবার্তা চালিয়ে নিতে হিমশিম খেলো। তাল সামলে গুনগুন করে জানতে চাইলো,

“বলুন আগে।”

“সময় মতো চেয়ে নেব।” একটু থেমে আবার বললো, “এখন ঘুমতে যা।”

সানায়ার ইচ্ছে করলো আরও একটু এমন করে কথোপকথন চালাতে। তবে এটা বলার মতো কোনো সম্পর্কই তাদের মধ্যে নেই। নির্ভাণ ওপ্রান্ত হতে কল লাইন কেটে দিতেই সানায়া নিজের আঁটকে রাখা দম টা যেনো ছাড়লো। গাল ফুলিয়ে নিঃশ্বাস ফেলে দরজায় তাকাল। নেই আফি। সে মোবাইল দিয়েই চলে গিয়েছে। সানায়া স্বস্তি পায়। এরপর তটস্থ পায়ে বেরিয়ে এলো রুম থেকে।

——

নির্ভাণ ফিরেছে বেলা এগারোটার দিকে। সেই যে রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে ঘুমিয়েছে এখনো নামেনি নিচে। এখন বাজে সাড়ে বারোটা। সানায়াকে সকালে ফারাজ সিদ্দিকী পরীক্ষার কেন্দ্রে পৌঁছে দিয়েছে। নিয়ে আসার কথা নিজাম সিদ্দিকীর ছিলো। তবে তিনি একটা কাজে আঁটকে গিয়েছে। তাই এখন নির্ভাণ কে যেতে হবে নিতে। তাকে ফোন করে ও বারকয়েক কোনো লাভ হয়নি। তাই তিনি তন্বী রহমান কে কল করে জানিয়েছেন যেনো নির্ভাণ গিয়ে নিয়ে আসে ওকে। তন্বী রহমান ছেলের রুমের সামনে এসে আমতা আমতা করে ডাকলেন ছেলেকে। নির্ভাণ ঘুম থেকে ওঠে মাত্র ফ্রেশ হয়ে বেরিয়েছে।

“কিছু বলবে আম্মু?”

“মেয়ে টার পরীক্ষা শেষ হবে একটু পর। তোর আব্বু নিয়ে আসার কথা ছিলো। কিন্তু কাজে না-কি আঁটকে পড়েছেন।”

নির্ভাণের অভিব্যক্ত বোঝা গেলো না। সে ওয়ালেট খুঁজে পকেটে গুঁজে নিলো। এরপর বাইকের চাবি হাতে মাকে উদ্দেশ্য করে বললো, “আমি নিতে যাচ্ছি। টেনশন করো না।”

তন্বী রহমান যেনো স্বস্তি পায়। তিনি তক্ষুণি নিজাম সিদ্দিকী কে কল করতে করতে বেরিয়ে গেলেন। নির্ভাণ নিজেও ঘুম থেকে দ্রুত ওঠেছে ওকে নিতে যাওয়ার জন্য। মনে হচ্ছে কত যুগ হয়েছে দেখতে পায়নি ওই কিশোরী কে। ছটফট করছে মন। অস্থির হচ্ছে চিত্ত। তৃষ্ণায় ধুঁকছে চক্ষুদ্বয়। ভীষণ পীড়াদায়ক সময় কেটেছে গত দু’দিন। নির্ভাণ তপ্ত শ্বাস ফেলে বাইকের চাবির গোছায় লাগানো কি-চেইন টা দেখলো। এটা সাথে লাগানো সেই কি এর কি-চেইন। আর সানায়ার কাছে আছে হার্ট শেইপের টা যেটা দেখতে লক এর মতো। আর চাবিটা নির্ভাণের কাছে। বোকা মেয়ে সেটা হয়তো খেয়ালও করে নি। নির্ভাণ এসব ভেবেই আনমনে হাসল সামন্য।

#চলবে…..

[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here