#আপনার_হৃদয়ে_আমি
#পর্ব_৪
#জান্নাত_সুলতানা
নভেম্বর-ডিসেম্বর মানেই শিক্ষা সফর। স্কুল থেকে থেকে ষোল ডিসেম্বরের আগেই শিক্ষা সফর নেবে এবার। মাঝে দুই বছর নেয়নি একটা বিশেষ কারণ আছে না নেওয়ার পেছনে। তবে কারণ টা সানায়া জানে না। আর এবার যেহেতু পরীক্ষা শেষ তাই রেজাল্টের আগেই নিয়ে যাবে। সানায়া কখনোই নিজের জেলা ছাড়া কোথাও ঘুরতে যায়নি। স্কুল টু বাসা। আর সর্বোচ্চ মামিদের বাপের বাড়ি। নিজের দাদা বাড়ি ও সে বারো বছর হয়েছে ছেড়ে এসছে। এরমধ্যে তার বড়ো আব্বু ওকে দেখতে এসছে ছয় সাত বার। নিতেও চেয়েছে পারিবারিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। কিন্তু আরোরার এক কথা। মেয়ে কোথাও যাবে না। স্বামী হারিয়েছে মেয়ের কিছু হলে সে কিছুতেই মেনে নিতে পারবে না। সানায়ার ইচ্ছে হলে-ও কখনো মায়ের ভয়ে আর ইচ্ছের কথা বলতে পারেনি।
“কি রে? কী এতো ভাবছিস?”
হঠাৎ ধাক্কায় তাল সামলাতে না পেরে হেলে পড়ে সানায়া। সোজা হয়ে বসে সে অপ্রস্তুত হয়ে বান্ধবীদের দিকে তাকায়। তায়েবা বলে উঠলো,
“কিছু তো বললি না৷ তুই যাবি তো এবার?”
সেভেনে থাকতে একবার স্কুল থেকে ঘুরতে নেওয়া হয়। তখন সানায়া যায়নি। ওরা সবাই যেতে না চাইলেও সানায়া ওদের বুঝিয়ে পাঠায়। তাই ওরা এবার ও নিশ্চিত হয়ে নিচ্ছি সানায়া যাবে কি-না। যদি না যায় তবে ওরাও যাবে না। সানায়া তৎক্ষনাৎ কিছু জবাব দিতে পারলো না। তবে সে নিজেও যেতে চায়। কিন্তু বাড়ি থেকে? কেউ বাঁধা দেয় বা না দেয়, ওই পাষণ্ড পুরুষ বাঁধা ঠিকই দিবে।
—–
স্কুল থেকে ফিরে সানায়া ফ্রেশ হয়ে খেয়েদেয়ে এক বেলা পড়ে কাটিয়ে দিলো। আজ নির্ভাণ ভাইয়ের ডাক আসে নি। মানে তিনি এখনো বাসায় ফিরেনি। সানায়া বই বন্ধ করে। গুটিগুটি পায়ে নিচে নেমে আসে। আসার আগে মায়ের রুমে উঁকি দেয়। মা এশার নামাজ পড়ছে। এমন সময় বড়ো মামি রান্না ঘরে থাকে। সানায়া রান্না ঘরে উপস্থিত হয়ে নিজের কাঙ্খিত ব্যাক্তি কে পেয়ে খুশি ও হয়। একমাত্র মানুষ এই বাড়িতে যার কাছে নির্দ্বিধায় সব আবদার করা যায়। সানায়া ওনার সাথে হালকা আলাপ শেষ করে নিয়ে আশেপাশে তাকাল। যতদ্রুত সময় কথা শেষ করতে হবে। খাবারের সময় হয়ে এলে সবাই থাকবে তখন আর কিছুই বলা যাবে না। তন্বী ওর মতিগতি বুঝে। এই মেয়ে সেধে সেধে রান্না ঘরে আসার মেয়ে নয়। তিনি ওর দিকে মায়াময় দৃষ্টিতে তাকায়। সানায়া কফিতে ধীরে চুমুক দিয়ে হড়বড়িয়ে বলে,
“মামুনি স্কুল থেকে ঘুরতে নিচ্ছে। যেতে চাই আমি।”
“কোথায় নিচ্ছে?”
“চট্টগ্রাম।”
“মাকে বলেছিস?”
“না তুমি বলে দাও প্লিজ দাও। আমি কখনো কোথাও যাইনি।”
মেয়ে টা এমন করে বায়না জুড়ে দিলো যে তন্বী কিছুই বলতে পারে না। শুধু সান্ত্বনা দেন ওর মায়ের সাথে আর মামাদের সাথে ও কথা বলবেন এব্যাপারে। তবুও সানায়া মনে মনে হাসফাস করছিলো নানিজান আর তার গুনধর নাতি বাগড়া দেবেই দেবে।
——
রাতে খাবার টেবিলে তন্বী এই কথা তুললেন। আরোরা তৎক্ষনাৎ রেগে গেলো। মেয়ের দিকে আগুন চোখে তাকালেন। ভস্ম করে দেওয়ার সেই দৃষ্টি সানায়া বড়ো মামার থেকে সম্মতিসূচক বার্তা পেয়ে অগ্রাহ্য করে গেলো। তবে এরমধ্যে নির্ভাণ বলে উঠলো, “লাস্ট এই স্কুল থেকে যখন ট্যুরে নিয়ে যায় ওই বছর দুটো ছেলেমেয়ে পালিয়ে যায় ট্যুর থেকে। এমন পরিবেশে ওর না যাওয়াই বেটার।”
ব্যাস এই এক ব্যক্তব সবার ডিসিশন চেঞ্জ করার জন্য যথেষ্ট ছিলো। সানায়ার খাওয়া মাঝপথে থেমে গেলো। রাগে তার শরীর তখন জ্বলছিল। ফারাজ সিদ্দিকী ও ফোনে কিছু একটা করছিলো। তিনিও ফোন রেখে গম্ভীর স্বরে বললো,
“হ্যাঁ মামুনি, তোমার এক্সাম শেষ আমরা সবাই ঘুরতে যাবো। মন খারাপ করো না।”
ভাইয়ের কথা শেষ হতেই আরোরা বলে উঠলো, “নির্ভাণ যেহেতু বারণ করছে মানে নিশ্চয়ই সে ভালো খারাপ ভেবেই বলছে। সামনে পরীক্ষা এসবে নাচানাচি না করে পড় মন দিয়ে।”
আরোরা জাহান ভাইদের খুব মানেন। এরচেয়ে বেশি মানে বড়ো ভাইয়ের ছেলেকে। বাড়ির সবাই এই যুবকের কথা খুব গুরুত্ব দেন। সানায়ার রাগে-দুঃখে কান্না পায়। খাবার না খেয়ে সে কিছু সময় চুপচাপ বসে থেকে বড়ো মামির দিকে তাকাল। এখানে যদিও কিছু করার নেই ওনার। সানায়া খাবার না খাওয়ার সিদ্ধান্ত যখন নিজের মনে নিয়ে প্লেটে হাত ধুতে যাবে তখনই ওর বরাবর চেয়ার বসে থাকা যুবক গম্ভীর স্বরে বলে উঠলো, “একটা দানা ও প্লেটে থাকলে খুব খারাপ হবে সানা।”
এই যুবকের কণ্ঠে কী আছে সানায়া খুঁজে পায় না বুঝতে পারে না। সে শুধু অনুভব করে এই কণ্ঠস্বর তার শরীর হীম হয়ে আসে। কণ্ঠনালী রোদ হয়। সব সময় ফরফর করে কথা বলতে থাকা ঠোঁট দুটি তখন একে-অপরের সাথে যুদ্ধ করেও নিজেদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাতে অক্ষম হয়। সানায়ার ইচ্ছে না থাকা স্বত্বেও বাধ্য হয়ে খাবার টুকু পানি দিয়ে গিলে ত্রস্ত পায়ে ডাইনিং ছাড়ল।
——
রাতে সানায়া খুব কাঁদল। বাবা থাকলে নিশ্চয়ই মা এবং তাকে এভাবে অন্যের অধীনে চলতে হতো না। জীবনে আর যা-ই হোক স্বাধীনতা থাকতো। সবাই এভাবে জোর করে নিশ্চয়ই সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতো না। তার ইচ্ছার ও প্রাধান্য দিতো। কান্নার ফলে মাথাব্যথা হয়ে গেলো। শুক্রবার থাকায় খুব বেলা করে আজ ঘুম থেকে উঠলো সানায়া। ও যখন রুম থেকে বেরিয়ে এলো তখন বেলা এগারো টা। মায়ের কড়া চোখের কবল থেকে সে রান্না ঘরে এসে উপস্থিত হলো। ছোট মামি সকালের নাশতা তুলে রেখেছিলেন সেটাই খেতে দিলো ওকে। সানায়া খেয়ে রুমে চলে এলো আবার। প্রিয়ম সেহের আফি এসে একটু আড্ডায় বসলো। চোখ-মুখ দেখে সবাই বুঝলো ও কেঁদেছে। আফি বললো, “কেঁদে লাভ নেই। ভাইয়া না করেছে যেহেতু আর যাওয়ার কোনো চান্স নেই।”
সানায়া মুখ বেজার করে বললো, “তিনি নিজেও তো কত যায়গা যায়। তখন কী কেউ না করে? আজ বাবা থাকলে হয়তো আমার ও সব ইচ্ছে পূরণ হতো।”
সবাই তৎক্ষনাৎ চমকায় সানায়ার কথায়। আফি সাথে সাথে ওকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে। সান্ত্বনা দেয় ওকে। কিন্তু সানায়ার সেই এক কথা। বাবা নেই বলেই তার জীবন টা এমন।
—–
সকালে না খেয়ে সানায়া স্কুল চলে গেলো। স্কুলে গিয়ে আজ আরেক ঝামেলা। ওই জুনিয়র ছেলে আজ সোজা প্রপোজাল দিয়ে বসেছে। সানায়ার মুড এমনিতেই খারাপ। তারউপর এই উটকো ঝামেলা। জীবন তো এমনিতেই শান্তি নেই এখন আবার সেধে সেধে নিজের স্কুলের স্বাধীনতা ও অন্য কারোর হাতে তুলে দেওয়ার কোনো ইচ্ছেই আপাতত তার নেই। কিশোর মন একটু-আধটু দুর্বলতা দেখা দিলে-ও সানায়া রেগে-মেগে নিজের জেদ আগে রাখলো। এক বাক্য বলে দিলো, “আমি এসব করতে চাই না। আমাকে সেকেন্ড টাইম আর বিরক্ত করলে স্কুলের প্রিন্সিপাল স্যার কে বলে দেব।”
ছেলে টা তৎক্ষনাৎ নিজের রূপ টা দেখালো। এতো দিন সে নরম হয়ে থেকেছে। ভেবেছে মেয়ে টার মন ভালো ব্যবহার দিয়ে জয় করবে। যখন এটা হবে না বুঝতে পারলো তৎক্ষনাৎ সে নিজের ফোন বের করলো। সবার সামনে ওই গানের ভিডিও দেখিয়ে থ্রেট দিলো, “আমার তোমাকে পছন্দ। ভালোয় ভালোয় আমার সাথে রিলেশনশিপে যাবে নয়তো এটা আমি সোস্যাল মিডিয়ায় আপলোড করবো।”
সানায়া ভয়ে তখন থরথর করে কাঁপছে। রাগ ও হচ্ছে। কিন্তু তার ভয় হচ্ছে এটা ভেবে বাড়িতে বড়োরা কেউ এটা জানতে পারলে কী হবে? যখন এটা লিক হবে তখন তো তার মামাদের সম্মানে প্রশ্ন আসবে। সানায়া এরপর লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে এলো। ক্লাসে এক কোণে অন্যমনস্ক হয়ে বসে রইলো। ওর বান্ধবীরাও বুঝতে পারে না কী করলে এই ঝামেলা থেকে বেরুতে পারবে।
—–
লাইব্রেরিতে থাকা ছেলেটার নাম উৎসব। ছেলেটার বাবা মা কিছুই নেই। ভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে জীবনে যুদ্ধ করে হলে যায়গা পেয়েছে। সাথে কিছু ফ্রেন্ড’দের সাহায্য নিয়ে টিউশন করতে প্রথম সেমিস্টার টপকে গেলেও দ্বিতীয় বর্ষে গিয়ে সে বিপাকে পড়ে গেলো। তখনই নির্ভাণ তাকে লাইব্রেরিতে জব টা দিয়েছে। ফারাজ সিদ্দিকীর শ্যালক স্কুলের সভাপতি। ওনার সুপারিশেই উৎসব চাকরি টা পেয়েছে।
স্কুলের সব খবর নির্ভাণ কে উৎসব দিয়ে থাকে। নির্ভাণ আজকের খবর পেয়ে ভার্সিটি থেকে বেরিয়ে এলো। তখন সন্ধ্যায়। নির্ভাণ, ইকবাল, তিয়ান, উৎসব চারজন তিনটি বাইক নিয়ে স্কুলের সেই মোড়ে এলো। ছেলেটা কিছু ছেলেপুলেদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিল টিউশন শেষ। উৎসব গিয়ে ওই ছেলে কে নিয়ে এলো। ছেলেটা চারজন কে এক সাথে দেখে ভয় পেলো। যতোই হোক সে সবেমাত্র এসএসসি ক্যান্ডিডেট। আর তার বিপরীতে ছিলো ভার্সিটির ফাইনাল ইয়ারের চার চারজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ। নির্ভাণ গায়ে থাকা শার্টের হাতা ফোল্ড করে কনুইয়ের ওপর ভাজ করে রাখতে রাখতে বাইক থেকে নেমেই ছেলেটার গালে চড় লাগাল। চক্ষুদ্বয় দিয়ে যেনো সামনের জনকে ভস্ম করে দিচ্ছে। রাগে কপালের রগ গুলো ধপধপ করছে। হাতের শিরা গুলো টানটান হয়ে ভেসে উঠছে। থাপড় দিয়ে খ্যান্ত হলো না যুবক। রাস্তায় ফেলে হাঁটু গেঁড়ে বসে মুষ্টি শক্ত করে ঘুষি লাগাল ছেলেটার নাক বরাবর। গোধূলি অনেক আগেই শেষ হয়েছে। আবছা অন্ধকার আর ল্যাম্পপোস্ট আলোতে স্পষ্ট হলো রাস্তায় অবহেলায় পড়ে থাকা সাদা স্কুল ড্রেস পরিহিত কিশোর ছেলেটার ঠোঁট ফেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। অবস্থা বেগতিক দেখে তিয়ান ইকবাল নির্ভাণ কে টেনে হিঁচড়ে সরিয়ে নিলো। উৎসব ছেলেটার থেকে ফোন নিয়ে লক খুলেছে ততক্ষণে। নির্ভাণ ফোন টেনে নিয়ে ভিডিও ডিলিট করলো। এখানেই ইতি হতে পারতো। কিন্তু না, নির্ভাণ ফোন টা রাস্তায় আঁচড়ে ফেললো। একবার দুইবার পরপর কয়েকবার। ফোন টা ভেঙে একদম তচনচ হয়ে গেলো মূহুর্তে। ছেলেটা ব্যাথা এবং নিজের ফোনের জন্য কাঁদতে শুরু করলো। নির্ভাণ ছেলেটার কলার টেনে ধরে রোষপূর্ণ স্বরে হিসহিসিয়ে বলে উঠলো , “নেক্সট টাইম ওর আশেপাশে দেখলো তোর অবস্থাও ওই ফোনের মতো হবে। নতুন ফোন পেয়ে যাবি কাল।”
#চলবে…….
[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]
