#হিপনোটাইজ
#তাজনিন_তায়্যিবা
পর্ব:40
আকাশের মুখ ভার।নীল আকাশ গায়ে মেখেছে ধূসর বর্ণ।আবহাওয়া খারাপ।ঝড়ের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে বাতাসে।ঘূর্ণিঝড় হবে ভাব,স্ব গতিতে গাছের ডাল গুলো নড়ার ক্যাচ ক্যাচ শব্দ পাচ্ছে নিস্পা।
অদ্ভুত ভাবে মধ্যাহ্নের শেষ রোদ টুকু মুছেনি এখনো।সূর্যের এক পালি তীর্যক আলো সরাসরি এসে পড়ছে নিস্পার মুখের উপর।নিস্পা উঠে দাড়ালো, জানালার সামনে গিয়ে একহাতে টানতে চাইলো অবিরত উড়তে থাকা পর্দা দু’খানা।ঠিক তখনই নজর আটকালো আকাশ পানে। অদ্ভুত ভাবে আকাশের একাংশ হয়ে আছে কালো,এবং তার বিপরীত অংশে দেখা যাচ্ছে সূর্য।পরিবেশের ভয়ংকর তান্ডবের মাঝে এই সূর্যের আলো খানি বরই বেমানান।
নিস্পা বিস্মিত দৃষ্টিতে কেবল তাকিয়েই রইলো।ভাগ্যিস দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়েছে, নয়তো এমন বিরল দৃশ্য কি করে দেখতে পেত সে?কথাগুলো ভাবতে গিয়ে হটাৎ বুকটা ধড়ফড় করে উঠলো নিস্পার,মনে হলো প্রকৃতি কোন অশুভ ইঙ্গিত দিচ্ছে।বা এমন কিছু ঘটার ইঙ্গিত দিচ্ছে যার জন্য নিস্পার কোন বিপদ হতে পারে।
নিস্পার ভাবনায় ব্যাঘাত ঘটালো বীনা পাখি,সে কোত্থেকে যেন উড়ে এসে বসলো নিস্পার কাধে,নিস্পা নড়েচড়ে দাড়ালো, তাকালো বীনা পাখির দিকে,তারপর আদর করে হাত বুলিয়ে দিলো মাথায়,বীনা পাখি আদর পেয়ে কি সুন্দর মিশে গেলো তার গালের সঙ্গে। নিস্পা বেশ খুশি হলো,আনমনে বললো কথা,
“কেমন আছো সত্যবীনা পাখি?আমাকে গোলকধাঁধায় ফেলে দিয়ে নিশ্চয়ই বেশ সুখে আছো তাইনা?”
“আমার পাখি তো কথা কইতে পারে না অলিক কন্যা।”
নিস্পা চকিতে তাকালো,গ্রিবা নাড়িয়ে দৃষ্টি ঘোরালো সত্যের দিকে।সত্য পা ঝুলিয়ে বসে আছে তার বিছানায়।নিস্পা নিগূঢ় দৃষ্টিতে তাকালো ছেলেটার কৃষ্ণবর্নের নিঁখাদ মুখশ্রীর দিকে, বয়স খুব বেশি নয়, চার হবে হয়তো।গায়ের রঙ কুচকুচে কালো, চোখ গুলো মার্বেলের মতো গোল,চ্যাপ্টা মুখটা চাঁদের মতোই লাগছে,কত স্নিগ্ধ,সুন্দর।নিস্পার ইচ্ছে হলো তার একটা নাম দিতে,সত্য নামটা বড্ড বেমানান লাগছে,সে ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে এগিয়ে গেলো সত্যের দিকে,আহ্লাদী কন্ঠে বললো,
“তোমার পাখিকে কথা শেখাও নি কেন কালাচাঁদ?”
সত্য ড্যাবড্যাব করে তাকালো নিস্পার মুখের দিকে, তারপর ঠোঁট টিপে হেসে দিয়ে বললো,
“আমার নাম তো সত্য।তুমি কালাচাঁদ কারে কইলা গো অলিক কন্যা?”
“তোমারেই বললাম।কেন রাগ করেছ নাকি?”
“না না, রাগ করুম কেন?আমার শরম লাগলো তাই কইলাম।”
সত্যের কথা শুনে পিক করে হেসে দিলো নিস্পা,পরপরই মনে পড়ে গেলো ডক্টর কিয়ানের বলা সেই কথাগুলো, নিস্পাকে পাওয়ার লোভে সে নিজের আপন মানুষ গুলো কে হত্যা করেছে।সত্যিই তো ভবিষ্যতে সে যাকে সত্যবীনা পাখি হিসেবে চিনে এসেছে অতীতে তাদের অস্তিত্ব আলাদা,একজন সত্য আরেকজন বীনা,তারমানে তো নিশ্চয়ই এমন কিছু হয়েছে যার জন্য সত্য বেঁচে থাকার সুযোগ পায় নি,আর তাই সে পূনর্জন্ম পেয়েছে সত্যবীনা পাখির বেশে। তারমানে খারাপ কিছুই ঘটেছিলো, নিস্পার মন কু ডাকলো, কিছু একটা খারাপ ঘটবে,সে এই বাড়িতে থাকলে কিছু একটা হবে নিশ্চয়ই।তাকে আটকাতে হবে,ভাগ্য তাকে সুযোগ দিয়েছে, এই সুযোগ টা কাজে লাগাতে হবে তার।
সে আর এক মূহুর্ত এই বাড়িতে থাকবে না,এক্ষুনি ছাড়বে এই বাড়ির সীমানা।
কথাগুলো ভেবেই দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো নিস্পা,তাকালো সত্যের মায়াবী মুখের দিকে,তারপর বললো,
“যাও তোমার আম্মিজানকে ডেকে এসো।গিয়ে বলো আমায় বিদায় দিতে,আমি আজই চলে যাবো।”
____________
পড়ন্ত গোধুলির বাকহীন নির্জন বালুচরের কচুরিপানায় আবৃত এক কন্যা।চোখ ধাধানো রুপে প্রথম দেখাতেই মোহাবিষ্ট হয়েছিলো আব্দুল হানিফ।ধুদ সাদা ফর্সা ত্বক জুড়ে লেপ্টে থাকা কচুরিপানা গুলো, যেন ছোট ছোট নক্ষত্রের ন্যায় বিছিয়ে ছিলো তার চোখে মুখে।ভেজা চুল পেচিয়ে ছিলো তার গলায়,কি এক অপরুপ দৃশ্য,মনে করলেই হৃদয় পুলকিত হয়,আকাশের তিমিরে বোনা অচেনা দীপের ন্যায় দুটো সুন্দর চোখজোড়া,আর সাপলা ফুলের ন্যায় কোমল ঠোঁট গুলো ছুয়ে দিতে ইচ্ছে হয় আনমনে।
ছোটবেলায় খুব শুনেছিলো রুপকথার গল্প।সে গল্পের রাজকুমারী নাকি ছিলো খুব সুন্দর,অসীম রুপের অধিকারী।তার চোখ ছিলো টানা টানা, ঠোঁট ছিলো পদ্ম পাপড়ির ন্যায়।টসটসে সাদা গাল দুখান নাকি লাল হয়ে থাকতো সবসময়, তার চুল নাকি ছিলো ইয়া লম্বা,মাটি ছুই ছুই।সেই ছোটবেলা থেকেই হানিফ স্বপ্ন বুনতো, এক রুপকথার রাজকন্যার ছবি আঁকত হৃদয়ের ক্যানভাসে।
কাল যেন ঠিক সেই একইরকম এক রুপকথার পরি এসে ধরা দিয়েছে তার কাছে।সে কুড়িয়ে পেয়েছে রাজকন্যা,রুপকথার রাজকন্যা।যার মুখ দেখে সে ভুলেছে পূর্ব- পশ্চিম, উত্তর -দক্ষিন,হয়েছে মতিভ্রম।যাকে পাওয়ার লোভ কাবু করেছে তার বুকের ভেতরে অবস্থিত লাল পিন্ডকে।
যে করেই হোক এই কন্যাকে পেতেই হবে,এক অনির্বচনীয় সত্য রুপে এই কন্যাকে থেকে যেতে হবে তার হয়ে, একমাত্র তার হয়।
কথাগুলো একমনে ভাবতে ভাবতে বক্র হাসলো হানিফ,বুকে হাত রেখে বিরবির করলো,
“ভালোবাসি রুপাঞ্জেল,অতিমাত্রায় ভালোবাসি তোমায়।যতটা ভালোবাসলে নিজেকে বদ্ধ উন্মাদ লাগে ততটাই ভালোবেসে ফেলেছি।”
_____________
বাড়ির উঠানের অপরপাশে দুইচালা বিশিষ্ট আরেকটি ঘর।মূলত সেই ঘরে আব্দুল হানিফের আব্বা আম্মা থাকে।সকালের দিকে মালেকাকে রান্নাঘরে বসিয়ে দিয়ে হানিফের আম্মা মমতা বানু গিয়েছে পাশের বাড়িতে,গল্প গুজবের বড় নেশা তার,কোন দরকারি কাজে গেলেও কথা পাইলে ছাইড়া আসতে মন চায় না একদম।
সেই সকালে গিয়েছে সে, এখন বেলা বেড়ে সময় গড়িয়েছে অনেকদূর অথচ তার আসার কোন নামই নেই।ঘরে একা বসে আছে হানিফের আব্বা আব্দুল হিকমত মোল্লা।
আজ অজানা কারণেই মনটা ভারাক্রান্ত তার।জমিদার আব্দুল শওকত মোল্লা তারই আপন বড় ভাই।বাবা মারা যাওয়ার পর সম্পত্তির ভাগ নিয়ে দুই ভাইয়ের মধ্যে মত বিরোধ হয়েছিলো,বড় ভাই শওকত মোল্লা জালিয়াতি করে আত্মসাৎ করেছিলো সব সম্পত্তি,ভাইয়ের প্রতি রাগ অভিমানে সেদিনই জমিদার বাড়ি থেকে নিজের স্ত্রী সন্তান নিয়ে বেড়িয়ে এসেছেন তিনি।
শুনেছে আজ তার আদরের ভাতিজির বিয়ে,তাও কিনা ব্রিটিশ পুত্রের সাথে,অথচ তার ভাই সব দ্বন্দ্ব ভুলে তাকে একটিবারও ডেকে পাঠালো না,মেয়েটাকে দোয়া করারও সুযোগ দিলো না একবার।
হিকমত মোল্লার আকাশ পাতাল ভাবনার মাঝেই কারো একজনের ঘরে ঢোকার শব্দ হলো,হিকমত মোল্লা ভাবলো হয়তো মমতা বানু এসেছে,তাই বিরস কন্ঠে ডাকলো,
“মমতা?কই ছিলা এতোক্ষণ, আমার পাশে আইয়া একটু বও তো।”
প্রতিত্তোরে শোনা গেলো না মমতা বানুর কন্ঠ,বরং কিছুক্ষণ নিঃশব্দে কাটার পর ভেসে এলো হানিফের কন্ঠস্বর,
“আব্বা আমি,হানিফ।”
হিকমত মোল্লা বেশ অবাক হয়,অবাক হওয়ারই কথা,বাপ ছেলের সম্পর্ক খুব একটা সুস্থ নেই তাদের মধ্যে,প্রায় বেশ কিছু বছর পর হানিফ পা রাখলো এই ঘরে,
“তুমি?হটাৎ আমার ঘরে?”
“আমি আপনার পুত্র,আপনার ঘরে এসে অন্যায় করেছি নাকি?”
“বিষয় টা ঠিক তা নয় হানিফ।তোমার মনে আছে তুমি ঠিক কবে আমার ঘরে এসেছিলে?”
“সেসব মনে করতে অনিচ্ছুক আমি।”
“কিন্তু আমি তোমাকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই।সেবারের মতো কোন অন্যায় আবদার নিয়ে এসে থাকলে আমি বলবো ফিরে যাও।”
“বেগম মালেকার কন্যা সন্তানকে মেরে ফেলাটা জরুরি ছিলো আব্বা।তুমি কি এই বংশের প্রথম সন্তান হিসেবে কন্যা সন্তান মেনে নিতে?”
“হয়তো কন্যার মুখ দেখলে মেনে নিতে পারতাম হানিফ, তুমি তো সেই সুযোগ টুকুও দেও নি আমাকে।আমার জবানের অনুমতি নিয়ে তুমি মস্ত বড় পাপ করেছ, যার জন্য আমি নিজেকে কখনোই ক্ষমা করতে পারবো না।”
“সে আপনার ব্যার্থতা আব্বা,বারবার আমাকে দোষারোপ করা বন্ধ করুন।আমি যা বলতে এসেছি সেটা মনযোগ দিয়ে শুনুন।”
“শুনে কি লাভ হানিফ? আমার কোন মতামতের কোনো গুরুত্ব তো তুমি দেও না।বরং তুমি নিজের মতামত জোর করে আমার জবান থেকে বের করো।”
“আপনার জবান আমার জন্য শুভ আব্বা। আমার সবগুলো শুভ কাজ আমি আপনার জবানের অনুমতি নিয়েই শুরু করতে চাই।”
হিকমত মোল্লা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল,এই ছেলের সাথে তর্কে জড়িয়ে কখনো কোন সুরাহা পায় নি সে,উল্টো ছেলের জেদের কাছে বরাবর হার মানতে হয়েছে তাকে,না চাইতেও এক প্রকার বাধ্য হয়ে ছেলের সবগুলো অন্যায় আবদারে জবান দিতে হয়েছে তাকে।না জানি আজ আবার কোন আবদার নিয়ে এসেছে, যদিও এগুলো কে এখন আর আবদার মনে করে না হিকমত মোল্লা,পাঁচ বছর আগে বেগম মালেকার গর্ভ থেকে জন্মানো নিজের ঔরসজাত কন্যা সন্তানকে মাটিচাপা দিয়ে হত্যা করার পর হানিফের আবদারে ভয় হয় তার, আতংকে গলা শুকিয়ে যায় অদৃশ্য কারণে।
হিকমত মোল্লা হাতের তালু দিয়ে কপালের ঘাম মুছলো,ঠান্ডা কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“কি বলবে বলো।”
হানিফের অভিব্যক্তি বরাবরের মতোই কঠিন,সে বুক ফুলিয়ে শক্ত কন্ঠে বললো,
“আমি বিবাহ করতে চাই আব্বা।”
হিকমত মোল্লা চমকে উঠলো,হানিফের কথা শুনে চোখ বড়বড় হয়ে গেলো তার।ক্রোধিত কন্ঠে বললো,
“তুমি পাগল হয়ে গিয়েছ হানিফ?এই বংশের রেওয়াজ ভুলে বসেছ নাকি?আমি তোমাকে মনে করিয়ে দিতে চাই মোল্লা বংশের কোন পুরুষ একাধিক বিয়ে করে নি, এবং ভবিষ্যতেও যেন না করে এমন বিধান আরোপ করা হয়েছে।আর এই জন্যই মালেকার আব্বা বিশ্বাস করে তার মেয়েকে তোমার হাতে তুলে দিয়েছে।”
“তাতে কি আব্বা?বেগম মালেকার আব্বা তো আর জীবিত নেই,তাই তার বিশ্বাস বহন করার প্রয়োজন বোধ করছি না আমি।”
হানিফের কথায় প্রচন্ড রেগে গেলো হিকমত মোল্লা,ক্রোধিত কন্ঠে বললো,
“তুমি এতো অকৃতজ্ঞ কেন হানিফ?তোমার মনে নেই তোমার খারাপ সময়ে ওই লোকটা তার সর্বোচ্চ টা দিয়ে সাহায্য করেছিলো তোমায়।”
“সেটা সাহায্য ছিলো না আব্বা,আমাকে সাহায্য করার বিনিময়ে তিনি তার কুৎসিত মেয়েকে আমার জীবনে চাপিয়ে দিয়েছিলেন,যার প্রতি আজ পর্যন্ত আমার ক্ষুদ্রতম ভালোবাসাটুকুও জন্মায় নি।”
“বিয়ের ছয় বছর পর তুমি এই কথা কি করে বলতে পারো হানিফ?মালেকা শুনতে পেলে কতটা কষ্ট পাবে ভাবতে পেরেছ?”
“তাতে আমার কিছু যায় আসে না আব্বা।আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল।”
“তাহলে আমার কাছে কেন এসেছ?কেন শুনতে এসেছ আমার জবানের কথা?তুমি ভালো করেই যানো আমি মরে গেলেও তোমাকে দ্বিতীয় বিয়ের জবান দিতে পারবো না।”
হানিফের চোখ মুখ শান্ত, সে ঠান্ডা স্বরে প্রতিত্তোর করলো,
“আপনার বয়স হয়েছে আব্বা,এখন আর কোন কাজেই প্রয়োজন হয় না আপনাকে, বেঁচে থেকে কি লাভ?”
হিকমত মোল্লা আঁতকে উঠল,কলিজা মুচড়ে এলো যন্ত্রণায়, তার নিজের ছেলে, যাকে সে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছে সে নাকি তার বাবাকে বলছে মরে যাওয়ার কথা?হিকমত মোল্লার হাতটা কেঁপে উঠল,চোখ জ্বলে উঠলো ব্যাথায়,ছেলের প্রতি অভিমান বুকে চেপে শক্ত করলো হাত,চক্ষু লাল করে তুললো জোড়ালো থাপ্পড়,হানিফ বাচ্চাদের মতো ঠোঁট ফোলালো গালে হাত রেখে মায়াভরা দৃষ্টিতে তাকালো হিকমত মোল্লার দিকে,নাটকীয় কন্ঠে বললো,
“তুমি আমাকে মারতে পারলে আব্বা?আমি কি খুব বেশি কিছু চেয়েছি বলো?আমি তো বিয়ে করতে চেয়েছি, আমার রুপাঞ্জেল কে, রূপকথার মতো সুন্দর সে,যাকে প্রথম দেখায় প্রেমে পড়েছি, হৃদয় হস্তান্তর করেছি সজ্ঞানে।নিজের ভালোবাসাকে বিয়ে করা পাপ নয় আব্বা।”
হিকমত মোল্লার বৃদ্ধাঙুল কাঁপছে রাগের তোপে,যন্ত্রণায় চেপে আসছে কণ্ঠনালী,
“ঘরে বউ বাচ্চা রেখে পরনারী কে ভালোবাসা পাপ হানিফ।একটা অচেনা অজানা বাইরের মেয়ের জন্য তুমি নিজের বাবাকে মরে যাওয়ার কথা কি করে বলতে পারলে?”
“তাহলে জবান দেও আব্বা।নিজ জবানে অনুমতি দেও আমার রুপাঞ্জেলকে বিয়ে করার।”
হিকমত মোল্লা আর নিতে পারলো না হানিফের খামখেয়ালি কথা,সে ধমকে উঠলো কড়া কন্ঠে,
“রুপাঞ্জেল, রুপাঞ্জেল। কে এই রুপাঞ্জেল?কালকের ওই কুড়িয়ে পাওয়া মেয়েটা?তুমি কি পাগল হয়েছ হানিফ, কাল মেয়েটাকে কুড়িয়ে পেয়েছ আর বলছো বিয়ে করবে?এটা কেমন ভালোবাসা?সামান্য এক রাতের মধ্যেই কীভাবে একজনকে ভালোবাসা যায়?”
“সামান্য রাতটাই নয় আব্বা,সামান্য ত্রিশ সেকেন্ডে ভালোবেসেছি আমি।ভালোবাসা সময় গননা করে হয় না।”
“জ্ঞান দিও না, একদম জ্ঞান দিও না আমায়,আমি এক্ষুনি ওই মেয়েকে বাড়ি থেকে বেড় করে দিবো,আমার বাড়িতে ওই মেয়ের কোন স্থান হবে না।”
হিকমত মোল্লার এবারকার কথায় চরম ক্ষেপে উঠলো হানিফ,হিংস্র দৃষ্টি ঘোরালো এদিক ওদিক।হিকমত মোল্লার পানের বাটার উপর রাখা একটি চকচকে ধাতব চাকু,হয়তো পান কাটার কাজে ব্যাবহার করেন রোজ।হানিফ ক্ষুব্ধ হয়ে তুলে নিলো সেটি।তারপর! তারপর শোনা গেলো গোৎ গোৎ আওয়াজ।যেভাবে মুরগির গলা কাটা হয় ঠিক সেইভাবে হানিফ তার নিজ হাতে গলা কেটে দিয়েছে তার পিতার।
কি এক নির্মম দৃশ্য,ঘরের মেঝেতে তড়পাতে তড়পাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলো হিকমত,শেষ বারের মতো তাকালো হানিফের দিকে,কিছু একটা বলতে চাইছিলো, কিন্তু অসহায় বাবার চোখ কথা বললেও কাটা কণ্ঠনালী সে সুযোগ দিলো না,বলতে পারলো না শেষবারের জন্য বলতে চাওয়া কথাটা।
______________
ফ্লোরেন্সাকে খুঁজে বের করার জন্য পুরো অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে প্রিন্স জোসেফের সৈন্য,তারা হন্যে হয়ে খুঁজছে ফ্লোরেন্সাকে।প্রিন্স জোসেফ নিজেও থেমে নেই,বিয়ের আসর থেকে বেড়িয়ে প্রতিটি অলিগলি খুঁজে যাচ্ছে ফ্লোরেন্সাকে।আর সেই উদ্দেশ্যেই পা রেখেছে মোল্লা বাড়ির উঠোনেও।
হানিফ নিজ বাড়ির উঠোনে প্রিন্স জোসেফকে দেখতে পেয়েই হতচকিত হলো,অবাক হয়ে দ্রুত এগিয়ে গেলো সেদিকে,বিস্মিত কন্ঠে শুধালো,
“স্বয়ং ব্রিটিশ পুত্র আমার বাড়িতে?হটাৎ কি মনে করে আসা?”
প্রিন্স জোসেফ কাঠকাঠ উত্তর দিলো,
“উদ্দেশ্য বিহীন যাত্রা আমি খুব কম করি জনাব।”
হানিফ নিচের ঠোঁট এলিয়ে দিলো কিঞ্চিৎ,হাঁক ছুড়ে ডাকলো মালেকাকে,
“বেগম মালেকা?জল চকি নিয়ে এসো,ব্রিটিশ পুত্রের আপ্যায়নের ব্যাবস্থা করো দ্রুত।”
হানিফের কন্ঠ শুনে ভয়ে আতংকে তটস্থ মালেকা থরথর করে কেঁপে উঠলো,তার রুহ বরাবর যেন কেউ পেরেক ঠুকেছে,কলিজাটা খানখান হয়ে জমাট বেঁধেছে দলা দলা রক্ত,বাইরের প্রকৃতির চেয়েও বেশি ঝড় বয়ে যাচ্ছে তার বুকের মধ্যখানে।ঠান্ডা শীতল আবহাওয়ার মাঝেও শরীর ভিজে উঠেছে ঘামে,অতিমাত্রায় ঘাবড়ে গিয়ে হাপানি রোগীর মতো হাপাচ্ছে সে।চোখের সামনে ভাসছে সেই দৃশ্য,ছেলের হাতে পিতার গলা কাটার দৃশ্য তাকে পাগলের মতো বানিয়ে দিয়েছে।
হানিফের ডাকে মালেকা কোনরূপ সাড়া না দেওয়ায় হনহনিয়ে ঘরে প্রবেশ করলেন হানিফের মা মমতা বানু।ঘরে এসে মালেকাকে এমন চুপচাপ বসে থাকতে দেখে কর্কষ কন্ঠে কিছু তিক্ত কথা শোনলেন তিনি,
“কিগো বউ? কানে কি তালা লাগাইয়া বইয়া আছো নাকি?খোকা সেই কহন থিকা ডাকতাছে হুনতাছো না?বাড়িতে ব্রিটিশ পোলা আইছে,তার আপ্যায়নে কোন ত্রুটি হইলে সে যে ক্ষেইপা যাইবো তার কোন ধারণা আছে তোমার? তাত্তারি যাও, যাইয়া জল চকি খান দিয়া আসো।
আমি যাই উনুনে এক পাতিল দুধ গরম করি।নাস্তা পানি তো কিছু দিতে হইবো নাকি?”
শাশুড়ির কথায় কর্ণপাত করলো না মালেকা।পাথরের মূর্তির মতো বসে রইলো টিনের বেড়ায় হেলান দিয়ে।
পরপরই নিস্পার ঘর থেকে ছুটে এলো সত্য,বীনা পাখি মাথার উপর দিয়ে উড়ছে তার,সে দৌড়ে এসে ডাকলো মালেকাকে,
“আম্মিজান? ও আম্মিজান।অলিক কন্যা ডাকতে পাঠাইছে তোমারে।সে নাকি চইলা যাইবো,সন্ধ্যা হওয়ার আগেই রওনা করবো।তোমার সাথে দেখা করতে চায় একটি বার।”
মালেকা তাও কথা বলে না, নড়েচড়ে না।সত্য মালেকার কাধ ঝাকায়,মালেকা সাড়াশব্দ টিও করে না।মমতা বানুর টনক নড়ে এবার,চোখ ছোট ছোট করে চায় মালেকার দিকে,তারপর আগিয়া আইয়া নিজেও ঝাকায় মালেকাকে,
“বউ?ও বউ?নাতি ডাকে তুমি কথা কও না কে?”
মালেকা নিশ্চুপ,নির্বাক তার হাতের ভেজা কাদামাটি শুকিয়ে সাদা হয়ে গিয়েছে।মালেকার এমন আচরণে ক্ষানিক ভয় পায় মমতা বানু,তিনি আরেকটু ঝুকে এইবার,মালেকার দুই গালে মৃদু থাপ্পড় দিয়া ফের ডাকে,
“কিলো বউ?ও বউ?কথা কও?কথা কও না কে?কি হইছে তোমার?”
মালেকা হেচকি তুলে,নড়েচড়ে উঠে আতংকে, চোখের সামনে শাশুড়ীকে দেখে মনে পড়ে যায় একটু আগের ঘটনা,নিজের কাঁদায় মাখা হাতটা কাঁপতে কাঁপতে চোখের সামনে তুলে ধরে সে,একটু আগেই নিজের বাবা সমতুল্য পিতার কবর লেপে এসেছে সে, পরিস্কার করে এসেছে ঘরের মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা লাল রক্ত।
মালেকা শব্দ করে কেঁদে উঠে, হাত দিয়ে চাপড়ায় কপাল,কাঁদতে কাঁদতে বলে,
“উনি পাগল হয়ে গিয়েছে আম্মা, ওই রূপবতী কন্যার জন্য উনি পাগল হইয়া গিয়াছে।উনি ঘরের মধ্যে মাটি খুইরা আব্বারে,,,,,,,,”
“বেগম মালেকা।”
হানিফের শান্ত কন্ঠস্বরে কম্পন তুললো মালেকার শরীর,সে হাত দিয়ে চেপে ধরলো তার মুখ, শুখনো ঢোক গিলে তাকালো মমতা বানুর পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা হানিফের দিকে।হানিফের ভাব ভঙ্গি স্বাভাবিক, সে শান্ত কন্ঠে বললো,
“কখন থেকে ডাকছি তোমাকে?বাড়িতে ব্রিটিশ পুত্র এসেছে তার বসার ব্যাবস্থা করো।”
মালেকা ভয়ে আতংকে চোখের পানি মুছলো তাড়াতাড়ি,উপর নিচ মাথা নাড়িয়ে বললো,
“যা,,যাচ্ছি,যাচ্ছি আমি।”
মালেকা দ্রুত হানিফের চোখের সামনে থেকে আড়াল হতে চাইলো,একহাতে কাপড়ের কুচি সামলে ধরে বেড়োতে চাইলো ঘরে থেকে।কিন্তু বেড়োনোর আগেই পেছন ডাকলো হানিফ,
“দাড়াও।”
হানিফের ডাক শুনে শিরদাঁড়া শক্ত হয়ে গেলো মালেকার,ভয়ের তোপে বড় বড় দুই চোখ কোটর ফেটে বেড়িয়ে যাওয়ার উপক্রম।সে ঘনঘন নিঃশ্বাস নিলো, ভয়ে ভয়ে তাকালো হানিফের দিকে, হানিফ একটা ওড়না হাতে নিয়ে এগিয়ে এলো, তারপর খুব যত্ন নিয়ে গুছিয়ে দিলো মালেকার কপালে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এলোমেলো চুল।মালেকার ঠোঁট কাপছে ভয়ে,হানিফের মোলায়েম স্পর্শের মাঝে পাচ্ছে রক্তের গন্ধ, হিংস্রতার দাপট।হানিফ সুন্দর করে ওড়না টা দিয়ে ঢেকে দিলো মালেকার মাথা, তারপর ছোট্ট করে বললো,
“যাও।”
মালেকা আর এক মূহুর্ত দাড়ালো না,অনুমতি পাওয়া মাত্রই দৌড়ে বেড়িয়ে গেলো ঘর থেকে।
মালেকা এমন আচরণে সন্দেহ প্রকাশ করলো মমতা বানু,ছেলের উদ্দেশ্যে বললো,
“বউয়ের মতিগতি ঠিক লাগতাছে না খোকা,জ্বিন পরি আবার আচর করলো নি কে যানে?”
হানিফ বিশেষ কোন প্রতিক্রিয়া দেখালো না,শান্তভাবে বললো,
“সে যা হওয়ার হোক,তুমি তোমার কাজ করো গিয়ে আম্মা।ব্রিটিশ পুত্রের জন্য জলখাবারের ব্যাবস্থা করো।”
মমতা বানু আর কথা বাড়ালেন না,কাপড়ের আঁচল টেনে ঢাকলেন মাথা,তারপর পা বাড়ালেন রান্নাঘরের দিকে,কিছু একটা মনে করে হানিফ পিছু ডাকলো তৎক্ষনাৎ,
“আম্মা।”
মমতা বানু ফিরা চাইলো হানিফের দিকে, জিজ্ঞেস করলো,
“কিছু কইবি খোকা?”
হানিফ এগিয়ে এসে তাকালো তার মায়ের গলায় ঝুলন্ত সোনায় মোড়ানো মালাটির দিকে,তারপর নরম কন্ঠে বললো,
“এই মালাটা আমাকে দেও আম্মা।”
হানিফের এরুপ আবদারে কপাল কুচকে এলো মমতা বানুর,সে উত্তেজিত কন্ঠে প্রতিত্তোর করলো তুরন্ত,
“কি কস খোকা?তুই জানস না এইডা কিসের মালা?তোর দাদি মইরা যাওয়ার সময় এই মালা আমারে ফিন্দিয়া দিয়া গেছে, বংশের ধারা মোতাবেক এই মালা আমি মরনের সময় মালেকার গলায় ফিন্দিয়া দিয়া যামু।”
“এই মালা বেগম মালেকার প্রয়োজন নেই আম্মা তুমি এই মালা আমার হাতে দেও।”
“তুই এই মালা দিয়া কি করবি খোকা?তোর কি হাত খালি হইয়া গেছে?টেহা পয়সার দরকার? আমি তাইলে আমার আরেকটা মালা তোরে দেই,তুই সেটা বেইচ্চা দিস।”
“বাচ্চাদের মতো কথা প্যাচাও কেন আম্মা?আমি যখন বলেছি আমার এই মালাটাই চাই, তার মানে এটাই।”
হানিফ আর কোন কথা বললো না,মমতা বানু কে ফেলে রেখেই চলে গেলো ঘরের বাইরে।
___________
কাঠের উপর নকশা করা জল চকিতে বসতে দেওয়া হয়েছে প্রিন্স জোসেফকে।কিন্তু সে বসে নি,হানিফ এসে দেখলো জোসেফ ঠিক আগের মতোই দাঁড়িয়ে আছে সটান হয়ে।জোসেফ না বসায় কিঞ্চিৎ অপমানবোধ করলো হানিফ তবে প্রকাশ করার দুঃসাহস দেখালো না,বর্তমানে দেশের যে অবস্থা ব্রিটিশ পুত্রের সাথে সখ্যতা বজার রাখতে পারলেই টিকে থাকতে পারবে।
হানিফ খেয়াল করলো তার হাতে লেগে আছে এক ফোটা রক্ত,হিকমত মোল্লার গলা কাটার সময় নিশ্চয়ই লেগেছে ভুল করে,হানিফ স্বাভাবিক ভঙিতে একটা রুমাল বের করে রক্তটুকু মুছতে মুছতে এগিয়ে এলো প্রিন্স জোসেফের দিকে,তারপর ঠোঁটে হাসি টেনে বললো,
“ব্রিটিশ পুত্রের কি আমার আথিতেয়তা পছন্দ হয় নি?বসার ব্যাবস্থা করার পড়েও দাঁড়িয়ে আছে যে?”
প্রিন্স জোসেফ তাকালো জলচকির দিকে তারপর গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
“উঁচু নিচু জাত বলতেও তো একটা ব্যাপার আছে জনাব।”
জোসেফের এবারকার উত্তরে এবার বেশ অপমানিত হলো হানিফ,ভেতর ভেতর ফুসে উঠলো রাগ,চাপা কন্ঠে বললো,
“শুনেছি কয়েকদিন আগে বাকের গঞ্জে গিয়েছিলেন?এক দাসী ধরে আনার জন্য নাকি কয়েকদিন অতিবাহিতও করেছেন সেথায়,তখন বুঝি জাত পাত ভুলে গিয়েছিলেন?”
প্রিন্স জোসেফের চোয়াল শক্ত, দৃষ্টি অনমনীয়, সে কেবল ভরাট কন্ঠে প্রতিত্তোর করলো,
“আপনাকে আমি সাবধান করতে চাই জনাব,আপনি কিন্তু প্রিন্স জোসেফের সাথে তর্কে জড়ানোর স্পর্ধা দেখাচ্ছেন।”
হানিফ মুচকি হাসলো, জোসেফকে জায়গা মতো খোচা দিতে পেরে খুশি হয়েছে বেশ,
“থাক গে সেসব বিষয়,আজ তো জুবাইদার সাথে আপনার বিয়ে হওয়ার কথা ছিলো,তা বিয়ের আসর ছেড়ে কন্যার চাচাতো ভাইয়ের কাছে কি উদ্দেশ্যে আসা?”
জোসেফ সময় ব্যয় করলো না,প্রতিত্তোরে বললো,
“আমার মহল থেকে একজন দাসী পালিয়েছে।আমি আশাবাদী সে বহুদূর যেতে পারেনি।এই অঞ্চলের আশেপাশেই ঘাপটি মেরে আছে হয়তো।”
প্রিন্স জোসেফের কথা শুনে বুকের ভেতর তোলপাড় শুরু হলো হানিফের,এক মূহুর্তের জন্য মনে হলো জোসেফ যেই দাসী কে খুজছে সেই দাসী তার রুপাঞ্জেল নয়তো?
নিজের মনের ভেতর জেগে উঠা প্রশ্নের সমাধান পেতে হানিফ প্রশ্ন ছুড়ে দিলো জোসেফের উদ্দেশ্যে,
“তা দেখতে কেমন সে দাসী?চেহারার বিবরণ পেলে খুঁজে পেতে সুবিধা হতো।”
প্রিন্স জোসেফের দৃষ্টি রুক্ষ,মুখাবয়ব ধারালো,অভিব্যক্তি জুড়ে প্রবল কঠোরতা,সে সচকিত কন্ঠে উত্তর দেয়,
“মেয়েটার বিবরণ দিতে চাইলে প্রসংশা করতে হবে,একজন দাসীর প্রসংশা করতে নারাজ আমি।”
হানিফ বুঝে ফেললো প্রিন্স জোসেফের কথা,প্রিন্স জোসেফ যে তার রুপাঞ্জেলকেই খুঁজছে এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ রইলো না তার।কারণ একমাত্র এই মেয়েই আছে যার রুপের বর্ণনা দিতে গেলে হাজার বার প্রশংসা করতে হয় নিজের অজান্তেই।তবে প্রিন্স জোসেফকে কিছুতেই জানতে দেওয়া যাবে না রুপাঞ্জেলের কথা,রুপাঞ্জেল শুধুমাত্র তার,যেই রুপাঞ্জেলের সাথে দেখা হওয়ার পর থেকে প্রতিটি সেকেন্ড তার সুখ সুখ অনুভুতি হচ্ছে, সেই রুপাঞ্জেল সারাজীবন তার জীবনে থেকে গেলে তার জীবনে নিশ্চয়ই শুখের অভাব হবে না।
কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই বিভ্রম থেকে বেড়োয় হানিফ,নমনীয় কন্ঠে বলে,
“আমি আপনার দাসীকে খুঁজে দেওয়ার যথেষ্ট চেষ্টা করবো।এই অঞ্চলে যদি এমন কোন মেয়ের সন্ধান মিলে তৎক্ষনাৎ খবর পাঠানো হবে আপনাকে, আপনি নিশ্চিন্তে যেতে পারেন।”
রাশভারি কন্ঠস্বরে সম্মতি জানিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায় প্রিন্স জোসেফ।ঠিক তক্ষুনি টিনের বেড়া জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকালো নিস্পা,দৃষ্টি তখন ঘুরপাক খাচ্ছে একটি হিজল গাছের চূড়ার দিকে।ঠিক সেই পথেই নজর আটকায় নিস্পার,একজড়া নীল চোখ।নিখাদ নিখুঁত সেই চোখ জোড়া।নিস্পা বষিভুতের ন্যায় তাকিয়ে থাকে বেশ কিছুক্ষণ, তন্মধ্যেই মনে পড়ে ত্রিজয়ের কথা,
“তার দুটো নীল চোখের সম্মুখীন হওয়ার কথা ছিলো নিস্পার।” তার মানে কি এই সে?আগের জন্মের ত্রিজয়।যাকে খোঁজার জন্য ভেতরটা তড়পাচ্ছে তার।কথাটা ভাবতেই এক মূহুর্তের জন্য থমকালো নিস্পা,দৃষ্টি জুড়ে ছড়িয়ে পড়লো উত্তেজনা, অস্ফুটে আওড়াল,
“আপনিই কি সে?”
কথাটা আওড়ানোর সময় লগ্নে প্রিন্স জোসেফ চোখের আড়াল হলো তার,চলে গেলো দৃষ্টিসীমার বাইরে,ধু ধু প্রান্তরে দেখা গেলো কিছু সৈন্য সামন্ত আর প্রিন্স জোসেফের পিঠের অংশটুকু।
নিস্পা হতচকিত হলো,হন্তদন্ত হয়ে জানালা দিয়ে বাড়ালো হাত,গলায় জোর দিয়ে ছুড়লো হাঁক,
“ওই নীল চোখ?শুনুন, ওই,,,,,”
প্রিন্স জোসেফ শুনতে না পাওয়ায় নিস্পা অস্থির হলো,দৌড়ে বেড়োতে চাইলো ঘর থেকে,ব্যাকুল চিত্তে ছুটতে গিয়েই বাধলো বিপত্তি,তার কোমল মাথাটা গিয়ে স্ব জোরে আঘাত প্রাপ্ত হলো হানিফের শক্ত বুকের সাথে।ঘটনার আকস্মিকতায় ভড়কালো নিস্পা,তাড়াহুড়ো কন্ঠে বললো,
“সরি সরি।”
হানিফ হা হয়ে তাকিয়ে রইলো নিস্পার মুখের দিকে,নিস্পার কন্ঠ থেকে বেড়িয়ে আসা বাক্যে খুব এক কর্ণপাত করলো না সে,তার ব্যাকুল দৃষ্টি স্থির নিস্পার কোমল মুখের উপর, সে একধারে তাকিয়ে থেকে বিভ্রম কন্ঠে বিরবিরালো,
“তুমি চাইলে আরো কিছুক্ষণ এই বুকে মাথা রাখতে পারো রুপাঞ্জেল।আমি শান্তি অনুভব করছি।”
হানিফের অভিব্যক্তি আন্দাজ করতে পেরে সমুদ্রগত তরঙ্গোচ্ছ্বাসের ন্যায় ফুসে উঠলো নিস্পা,অপ্রস্তুত ভঙ্গিমায় বললো,
“ভুল বুঝছেন আপনি,আমি আসলে বাইরে বেড়োতে চেয়েছিলাম,ভুল বসত আপনার সাথে ধাক্কা লেগে গিয়েছে।”
“তোমার মতো রূপবতী কন্যার ভুল গুলো আমি ফুল হিসেবে গ্রহণ করতে প্রস্তুত রুপাঞ্জেল।”
নিস্পার দৃষ্টিতে তীক্ষ্ণ সন্দেহ,স্বশব্দে প্রতিত্তোর করলো,
“আমি আপনাকে মনে করিয়ে দিতে চাই আপনার স্ত্রী এবং সন্তান আছে।”
হানিফ বাঁকা হাসলো,নরম কন্ঠে দিলো স্বীকারোক্তি,
“ইসলামে একজন পুরুষের চারটি বিয়ে জায়েজ আছে।আমি দুটো বিয়ে করার ইচ্ছে পোষন করে খুব বেশি অন্যায় করি নি বোধহয়।”
হানিফের মতিগতি বুঝতে পেরেই নিস্পা গ্রিবা ঘোরায়,ভ্রুকুটি তুলে প্রতিত্তোর করে দ্রুত,
“টুনটুনিতে এতো কারেন্ট কেন আপনার?ঘরে বউ রেখে আরেকটা মেয়েকে বিয়ের কথা বলতে লজ্জা করছে না?”
নিস্পার কর্কষ কন্ঠের প্রতিত্তোরে ক্ষোভ প্রকাশ করলো হানিফ,
“ভাষা সংযত করো রুপাঞ্জেল।আমি কিন্তু ভিষণ রাগী।”
নিস্পা তোয়াক্কা করলো না,উত্তর দিলো চটপট,
“আপনার এসব দু টাকার রাগের দু পয়সাও দাম দিতে ইচ্ছুক নই আমি।”
হানিফের অভিব্যক্তি পাল্টালো মূহুর্তেই, পাঞ্জাবীর পকেট থেকে বের করলো সেই ধারালো ধাতব চাকুটা।নিস্পা ঘাবড়ায়,চকচকে চাকুটার গায়ে জমে আছে হাল্কা রক্ত,যা দেখা মাত্রই ভ্রু বেঁকে আসে নিস্পার,কন্ঠে সন্দেহের পারদ ঢেলে শুধায়,
“এটা কেন?আমাকে ভয় দেখাতে চাইছেন আপনি?”
হানিফ কুটিল হাসলো,ধিরে ধিরে এগিয়ে আসলো নিস্পার অনেকটা কাছে, তারপর চাকুটা ঠিক নিস্পার চোখের সামনে ধরে বললো,
“এটা দিয়ে মাত্রই আমার আব্বার গলা কেঁটে এসেছি।”
নিস্পার চোখ বড়বড় হয়ে গেলো, অদৃশ্য ভয়ে আঁতকে উঠল হটাৎ,কঠোর নেত্রপটে জমা হলো আতংকের ছায়া,সে ঘার ঘুরিয়ে সরাসরি জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো, আকাশে অস্থির তান্ডব এখনো বিদ্যমান,অশুভ সংকেত দিচ্ছে ক্ষনে ক্ষনে, তার মানে কি এই লোকটাই সেই বিপদ, যার সংকেত প্রকৃতি তাকে দিচ্ছিলো এতোক্ষণ?
নিস্পার নিস্তব্ধতা দেখে হাসলো হানিফ,কন্ঠ খাদে নামিয়ে বললো,
“আমার আব্বাকে কেন মেরেছি জানতে চাইবে না?”
নিস্পা শুখনো ঢোক গিললো,ধরা গলায় অস্পষ্ট উচ্চারণ করলো,
“কেন?”
“আমি জবান নিতে গিয়েছিলাম আব্বার কাছে,উনার জবান থেকে বের হওয়া অনুমতি আমার জন্য শুভ হয় জানো।তাই আমি তোমাকে বিয়ে করার আবদার নিয়ে গিয়েছিলাম আমার আব্বার কাছে,কিন্তু উনি কি করলো জানো?উনি জবান তো দিলোই না আমাকে সরাসরি বারন করে দিলো।আমার খুব রাগ হচ্ছিলো রুপাঞ্জেল।আমি তো তোমাকে প্রথম দেখাতেই ভালোবেসে ফেলেছি বলো?তোমাকে কি করে হারাই আমি?উনি বৃদ্ধ মানুষ,আয়ু তো অর্ধেক ফুরিয়েই এসেছে,উনি আর বেঁচে কি করতো?তাই আমি মেরে দিয়েছি।”
নিস্পা বাকরুদ্ধ। রাশভারি পুরুষালি কন্ঠ থেকে ধেয়ে আসা প্রত্যেকটি শব্দ করাতের মতো আঘাত হানলো তার কানে।
“খোকা?এইডা তুই কি হুনাইলি বাপ।”
পিনপতন নৈঃশব্দের মাঝে ধ্বনিত হলো মমতা বানুর করুন কন্ঠস্বর।নিস্পা চকিতে তাকালো মমতা বানুর দিকে,মমতা বানু দাঁড়িয়ে নেই, তিনি স্ব বেগে ছুটে এসেছে হানিফের কাছে,হানিফের বুকের উপর পাঞ্জাবি টা খামচে ধরে শব্দ করে কেঁদে উঠলো তিনি,কাঁদতে কাঁদতে হানিফের বুকে নিজের কপাল চাপড়ালো,ফুপিয়ে ফুপিয়ে বললো,
“এইডা তুই কি করলি খোকা।ওই মানুষ টা তোরে কোলে পিঠে কইরা বড় করছে,নিজে না খাইয়া তোর মুখে খাওন দিছে।আর তুই কিনা এইভাবে ছুড়ি মারলি?একটা মাইয়ার জন্য কেমনে পারলি নিজের বাপের গলা কাটতে?”
হানিফ সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে,তার চোখে মুখে অন্যায়বোধের লেশমাত্রও নেই,সে দৃঢ় কন্ঠে বললো,
“কেঁদো না আম্মা।ভাইবা নেও এইডা দূর্ঘটনা।আব্বার বয়স হইছে একদিন না একদিন তো মরতোই তাই না?এসব ভাইবা নিজেরে কষ্ট দিও না আম্মা।”
নিস্পার রাগ বাড়লো প্রচুর,হানিফের এমন খামখেয়ালি উত্তরে চড়াও হলো মেজাজ,ক্রোধিত কন্ঠে বললো,
“আপনি কেমন সন্তান?নিজের বাবাকে খুন করে এমন নির্দিধিয়া স্বীকারোক্তি দিচ্ছেন কি করে?আপনার ভেতরে অন্যায়বোধের ছিটেফোঁটাও নেই,আপনাকে মানুষ না, একটা জানোয়ার মনে হচ্ছে আমার।”
হানিফ মুখটা চুপসে ফেললো,অভিমানী কন্ঠে বললো,
“এভাবে বলছো কেন রুপাঞ্জেল?তোমাকে ভালোবেসেই তো জানোয়ার হতে বাধ্য হলাম আমি।তোমাকে পাওয়ার লোভেই তো খুনি হলাম নিজের বাপের।”
নিস্পা চোখ মুখ বিকৃত করলো,ধমকে উঠলো রূঢ় স্বরে,
“চুপ!চুপ!একদম চুপ!কাপুরষ একটা।”
মমতা বানু কপট রেগে গেলো নিস্পার উপর,এই মেয়ে কাল আসতে না আসতেই আজ তার বাড়িতে এতো বড় অশান্তি শুরু হয়েছে, এই মেয়ে অলক্ষি,নির্ঘাত তার সংসার ধ্বংস করার উদ্দেশ্য এসেছে,হয়তো কোন কালোযাদু করে বশ করে নিয়েছে তার খোকাকে।মমতা বানু নিজের ভাবনাকেই সত্য হিসেবে বিবেচনা করলেন, ক্রোধে ফেটে পড়লেন নিস্পার উপর, পরপরই নিজেকে সামলাতে না পেরে দু দুটো থাপ্পড় বসিয়ে দিলো নিস্পার গালে,
“অলক্ষি মাইয়া, তুই আমার বাড়িতে পা রাখছচ কোন উদ্দেশ্যে? নিশ্চয়ই কালোযাদু করছচ তাইনা?আমার খোকারে বশ কইরা আমার সংসার ধ্বংস করার লাইগা আইচছ তাই না?”
অতর্কিত আঘাতে নিস্পা ভড়কালো,অসহায় চোখ তুলে তাকালো মমতা বানুর দিকে।অথচ সে তাকানো মাত্রই হৃদপিন্ড ছলকে উঠলো ,অসহায় চোখে ভির জমালো আতংক,অপ্রস্তুত হয়ে দু হাতে চেপে ধরলো মুখ,ধপ করে বসে পড়লো ঘরের মেঝেতে, পেছতে পেছতে গিয়ে পিঠ ঠেকালো টিনের বেড়ায়।
ততক্ষণে মমতা বানুর নিভু প্রান পুরোপুরি নিভে গিয়েছে,গলায় চেপে ধরা হাতটা নিস্তেজ হয়ে ঝুলে গিয়েছে,পুরো শরীরের ভর গিয়ে পড়েছে হানিফের উপর।হানিফ তার হাতের রক্ত মাখা চাকুটা চেপে ধরে মায়ের মাথাটা যত্ন করে রাখলো বুকের ভেতর,চুপটি করে থাকলো বেশ কিছুক্ষণ, তারপর আদুরে কন্ঠে বললো,
“ওর গায়ে হাত তুললে কেন আম্মা?ওমন সুন্দর কোমল ত্বকে তোমার খসখসে চামড়ার আঘাতে দাগ পড়ে গিয়েছে দেখেছ?”
আতংকে নিস্পার হাত-পা কাঁপছে,দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরে ডুকরে উঠছে সে।ঠিক সেই সময় ঘরের ভেতর দৌড়ে প্রবেশ করলো সত্য,দাদির এমন রক্তাক্ত অবস্থা দেখে ছোট্ট মন ভয়ে আতংকে গুটিয়ে গেলো অনেকটা,সে ছুটে এলো দাদির নিথর শরীরের কাছে,দাদির নিস্তেজ ঝুলন্ত হাতটা আঁকড়ে ধরে ডাকলো,
“দাদি?ও দাদি?কি হইছে তোমার?”
দাদি কথা কয় না, সত্য তাকায় তার বাবার চোখের দিকে,আকুল কন্ঠে শুধায়,
“দাদির কি হইছে আব্বা?দাদি কথা কয় না কেন?”
হানিফ খুব সাবধানে পাশের বিছানায় শুইয়ে দিলো মমতা বানুর শরীর খান,তারপর সত্যকে উদ্দেশ্য করে বললো,
“তোমার দাদি ঘুমাইতাছে বাপ,দাদিরে বিরক্ত কইরো না।”
নিস্পার গলা শুখিয়ে গিয়েছে আতংকে সে ফুফিয়ে ফুফিয়ে ডাকলো সত্যকে,
“সত্য,পুলিশ ডাকো,তোমার বাবা মিথ্যা কথা বলছে, তোমার বাবা খুন,,,,”
শেষ টুকু বলতে পারলো না নিস্পা,অদ্ভুত ভঙ্গিমায় পা ল
“ভয় পেয়ো না রুপাঞ্জেল।একদম ভয় পেয়ো না।আমি তোমার কোন ক্ষতি করবো না বিশ্বাস করো।আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি,কাল যখন নদীর ধারে তোমাকে প্রথমবারের মতো অচেতন অবস্থায় দেখেছি তখনই প্রেমে পড়ে গিয়েছি।আমার কি দোষ বলো?সব দোষ ওই উপর ওয়ালার,তিনি কেন আমার মনে এই অনুভূতির জন্ম দিলো বলো?”
“আমি তোমাকে পেতে চাই রুপাঞ্জেল।সব ধ্বংস করে হলেও পেতে চাই।আমি সেই ধ্বংস স্তুপের মাঝে তোমায় নিয়ে রুপকথার সংসার বাঁধতে চাই আজীবন।”
নিস্পার চোখ মুখ দ্বিধান্বিত,মেরুদণ্ড বেঁকে গিয়েছে ভয়ে,সে ভয়ে ভয়ে ঠোঁট নাড়ালো, কম্পিত কণ্ঠনালী থেকে উচ্চারণ করতে চাইলো কিছু।কিন্তু তার আগেই তাকে অবাক করে দিয়ে ঘটে গেলো আরো এক ভয়ংকর দৃশ্য,তার চোখের সামনে নিস্তেজ হয়ে মেঝেতে মুখ থুবড়ে পড়েছে হানিফ,পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মালেকার কম্পিত হাতে একটি কাঠের খন্ড।
নিস্পা হতহ্বিবল, কিংকর্তব্যবিমুঢ়। একে একে এতোগুলো ভয়ংকর ঘটনা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে তার।সে কি করবে বুঝে উঠতে পারলো না এবারেও।কাঁদতে কাঁদতে বললো,
“কি করলেন?কি করলেন এটা আপনি?”
মালেকা কিছু বললা না।খুব দ্রুত হাত চালালো তার কাপড়ের আঁচলে বাঁধা গিটে,গিট খুলে বেড় করলো দুটো আট আনার সিকি।তারপর সেগুলো নিস্পার হাতে তুলে দিয়ে বললো,
“পালাও কন্যা।এই ধ্বংসের খেলা থেকে পালাও।নিজের জীবন বাঁচাও।”
নিস্পা পালাতে নারাজ,সে ভেঙে ভেঙে বললো,
“কিন্তু আমি পালিয়ে গেলে তো উনি আপনাদেরকে মেরে ফেলবে।”
বেগম মালেকা উন্মাদ, কি করবে কিছুই বুঝে আসছে না তার,সে অসহায় দৃষ্টে তাকালো পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা তার নারী ছেড়া ধন সত্যের দিকে।পরিস্থিতি ভয়াবহ, মায়া ত্যাগ করতে হবে অতিদ্রুত। মালেকা সত্যকে জাপ্টে ধরলো তার বুকের ভেতর, হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বললো,
“আমার সত্যরে বাচিঁয়া নেও কন্যা।আমার সত্যরে নিয়া যাও তোমার সাথে।”
মাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা শুনেই ঘাবড়ে গেলো সত্য,দুহাতে খামচে ধরলো মালেকার পড়নের কাপড়,কাঁদতে কাঁদতে বললো,
“আমি যামু না আম্মিজান,তোমারে ছাইড়া আমি কোত্থাও যামু না।”
মালেকা ঠোঁট ভেঙে কাঁদলো ছেলেকে জড়িয়ে ধরে,উন্মাদের মতো চুমু খেলো সত্যের চোখে মুখে, তারপর নিস্পার দিকে তাকিয়ে বললো,
“সময় নষ্ট কইরো না কন্যা,পালাও, সত্যরে নিয়া দ্রুত পালাও।”
সত্যের ছোট্ট হাতটা মালেকা যত্ন করে তুলে দিলো নিস্পার হাতে, তারপর অসহায় কন্ঠে বললো,
“আমার সত্যরে দেইখা রাইখো কন্যা।”
নিস্পা দ্বিমত করলো,মালেকাকে সাথে নিয়ে যাওয়ার জন্য বললো,
“আপনিও চলুন।আপনাকে ছেড়ে আমরা কি করে যাবো?”
মালেকা সময় নষ্ট করলো না কথা বাড়িয়ে, নিস্পার হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেলো ঘরের বাইরের দিকে, তারপর বললো,
“আমার কথা ভাইবো না কন্যা,তোমরা পালাও, বুড়িগঙ্গার কিনার ধইরা বা দিকে দৌড়াও,আমি আমার সোহাগ ছাইড়া কোথাও যাইতে পারুম না।”
___________
বুড়িগঙ্গা নদীর কিনার ধরে প্রানপন ছুটছে নিস্পা,তার হাত ধরে সমান তালে দৌড়াচ্ছে সত্য।ছেলেটা দৌড়াচ্ছে আর কাঁদছে,বিরবির করছে কেবল একটা শব্দ,
“আম্মিজান, আম্মিজান, আম্মিজান।”
তার মাথার উপর দিয়ে ছায়ার মতো উড়ছে বীনা পাখি।তার ডানা ঝাপটানোর শব্দ ফাঁকা হাওয়ার মাঝে তৈরি করছে সুর।বুড়িগঙ্গা নদীর পানি স্বচ্ছ,দেখা যাচ্ছে হাল্কা স্রোত,অদূরে ভাসমান নৌকায় দেখা যাচ্ছে জেলেদের, তারা জাল ফেলছে নদীতে,তাদের পায়ের শব্দ পেয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে যাচ্ছে বালিহাঁস,প্রকৃতির অবস্থা নিদারুণ,বৃষ্টি নেই অথচ আকাশ অন্ধকার,প্রবল বেগে বইতে থাকা ঝড়ো হাওয়ায় নদীর পার ঘেসে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলো ধুলছে,ঠিক যেমন মুসল্লিরা জিকির করার সময় মাথা দোলায়। কি অপরুপ দৃশ্য,নিস্পার এক মূহুর্তের জন্য মন চাইলো একটু থেমে যেতে,দু চোখ ভরে দেখতে প্রকৃতির রহস্যময়ি রুপ।
নিজের মনের ইচ্ছেকে আস্কারা দিলো নিস্পা,ছুটতে থাকা পা থামিয়ে নিলো হটাৎ।সত্য চোখ তুলে তাকালো নিস্পার দিকে,ভেজা গলায় বলল,
“থামলা কেন অলিক কন্যা? আম্মা তো কইছে বুড়িগঙ্গা নদীর পাশ ধইরা দৌড়াইতে,নয়তো আব্বা আইয়া ধইরা ফালাইবো মোগোরে।”
সত্যের কন্ঠে এমন কথা শুনে চুপসে গেলো নিস্পা,হৃদয়ে অনুভব করলো ক্লান্তি।অদ্ভুত খারাপ লাগায় বিষিয়ে এলো কণ্ঠনালী।সে কোমল হাত রাখলো সত্যের গালে, তারপর বিবষ যন্ত্রণা গিলে আদুরে কন্ঠে বললো,
“ভয় পেয়ো না সত্য, তুমি এখানে দাড়াও আমি একটু চোখে মুখে পানি দিয়ে আসছি।”
সত্যকে দাঁড় করিয়ে রেখে নিস্পা এগিয়ে গেলো নদীর পাড়ে। পড়নের লম্বা ফ্রকটা দুইহাত উঁচুতে তুলে পা ভেজালো নদীর শীতল পানিতে।তারপর ঝুকে গিয়ে দু হাতে তুলে নিলো নদীর পানি,চোখে মুখে ছেটাতে যাবে তন্মধ্যেই অযাচিত আক্রমণে সচকিত হলো মস্তিষ্ক, অতর্কিত একটি তীরের ফলা ধেয়ে এলো বিদ্যুৎ গতিতে,সাই-সাই করে মূহুর্তেই ধারালো ফলা বিদীর্ণ করলো নিস্পার বা হাতের বাহু।নিস্পার চোখমুখ বিকৃত হয়ে উঠলো যন্ত্রনায়,দু হাতে তুলে নেওয়া পানিটুকু পড়ে গেলো ঝড়ঝড়িয়ে,কানে ভেসে এলো এক রাশভারি গম্ভীর কন্ঠস্বর,
“মহল থেকে পালানোর দুঃসাহস দেখিয়ে একদমই ঠিক করো নি ব্লু ব্লাড গার্ল।”
বাক্য শেষ হতে না হতেই নিস্পার মস্তিষ্ক ঝাকুনি দিয়ে উঠে,সে ঝাপসা চোখে তাকায় কাঁচের মতো স্বচ্ছ নদীর পানির দিকে,যেখানে স্পষ্ট ভাসছে একজোড়া প্রগাঢ় নীল চোখ।নিস্পা সেদিকে তাকিয়ে মিহি স্ব বিরবিরায়,
“নীল চোখের নীলাদ্রি পুরুষ অবশেষে আপনার আমার দেখা হলো দ্বন্দ্ব দিয়ে।”
চলবে,,,,,,
⭕আপনাদের রিকুয়েষ্টে লিখে ফেললাম,রেসপন্স পেলে অবশ্যই এখন থেকে তাড়াতাড়ি লিখবো নয়তো আপনাদের মতো আমিও আলসেমি করবো⭕

