#হিপনোটাইজ
#তাজনিন_তায়্যিবা
পর্বঃ 48
জঙ্গলের ঠিক বা পাশে একটা বড় চালের গুদামঘর আছে আইরিশের,সেখানটাতেই নিয়ে এসে আটকে রেখেছে ফ্লোরেন্সাকে।অথচ মন মানছে না,মেয়েটাকে একা ফেলে রেখে যেতে সাই দিচ্ছে না অন্তর।অন্তরের তাড়নায় গত এক ঘন্টা ধরে গুদামঘরের একটা ছোট্ট জানালার কাছে এসে দাড়িয়ে রয়েছে চুপচাপ,দু চোখ ভরে দেখছে তার আলেকজান্দ্রার শুভ্র মুখখানা।যতবার দেখছে, যতবার পলক পেলছে ততবারই হৃদয়ের ঠিক মধ্যখানটায় পেরেক ঠুকিয়ে দেওয়ার মতো তীব্র যন্ত্রণায় ছটপট করে উঠছে হৃদয়।
মেয়েটা কান্না করছে,দু হাটুতে মুখ গুজে সেই কখন থেকে হেচকি তুলছে,হেচকির তোপে কম্পিত হচ্ছে তার চিকন শরীরের প্রত্যেকটি বাঁক,আইরিশের খুব ইচ্ছে করলো মান ভাঙাতে, সেই আগের মতো মেয়েটার গাল ছুয়ে বলতে,
“কাদিস না মেয়ে,বুকে যে যন্ত্রণা হচ্ছে ভিষণ ভাবে পুড়ে যাচ্ছে বা পাশ টা।”
অথচ অদৃশ্য এক ভয়ে টানাপোড়ন শুরু হলো বুকের গভীরে,হৃদয়ের আকাঙ্খাকে প্রশ্রয় না দিয়ে নিজেকে সামলে নিলো খুব সাবধানে, বিরবির করে বললো,
“ক্ষমা করিস আলেকজান্দ্রা। তোকে জেনেশুনে মৃত্যুর মুখে দাড় করানোর সাহস আমার কলিজায় নেই।”
মেয়েটার কানে পৌছায় না আইরিশের মিনতি,কোনমতেই থামে না কান্না,আইরিশের বড্ড অভিমান হয়,অভিযোগে তেতো হয়ে উঠে হৃদয়,আক্ষেপ মাখা কন্ঠে বলে,
“সেই আগের মতো বোকাটাই রয়ে গেলি তুই,যে হৃদয় তোর নামে ক্ষত হয় প্রতিদিন,সে হৃদয়কি অন্য কারো আলিঙ্গনে সেরে উঠবে কোনদিন?”
বাক্যটা সম্পূর্ণ করার আগেই এক ফোটা চোখের পানি টুপ করে গড়িয়ে পড়লো আইরিশের গাল বেয়ে,আইরিশ আঙুলের ডগায় তুলে নিলো সেই তপ্ত পানির ফোটা,ব্যাকুল কন্ঠে বললো,
“এই চোখ তোর বিরহে ভিজে প্রতিদিন,সেখানে অন্যকারো নাম কি করে হবে রঙিন?”
কথাটা বলতে গিয়েও পিচলে হাসলো আইরিশ,অভিমানে ভেজা কন্ঠে বললো,
“এতোদিনে এই চিনলি আমায়?ভাগ্যিস এখনও চিনে উঠতে পারিস নি,নয়তো অভিনয়ের শুরুতেই ধরা পরে যেতাম।”
দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল আইরিশ,চুপটি করে সরে দাড়ালো জানালার পাশ থেকে,তারপর সোজা ধরলো বাড়ির পথ,যেতে যেতে বিরবির করে বললো,
“কেঁদে নে, আজ থেকে কাল অব্দি সবটুকু সময় তোর।মনে রাখিস এর পর থেকে কান্নার সুযোগ দিবো না তোকে।”
____________
ফ্লোরেন্সাকে রেখে সোজা বাড়ি ফিরে এসেছে আইরিশ,এসেই লেগে পড়েছে কাজে।চাচিকে পাহাড়া দিয়ে চুপটি করে ঢুকেছে রান্নাঘরে।দ্রুতহাতে একটা প্লেটে কিছু খাবার বেড়ে নিয়ে বেড় হয়েছে সতর্কতার সাথে।তারপর ফ্লোরেন্সার কিছু কাপড় নিয়ে সোজা চলে গেলো বাড়ির পেছনে।
সেখানে ফুলমতিকে অপেক্ষা করতে বলে গিয়েছে আইরিশ।কথামতো ফুলমতিও অপেক্ষার নামে পাইচারি করে যাচ্ছে বেশ অনেক্ষন যাবৎ।
খুব সতর্কতার সাথে এদিক সেদিক নজর বুলিয়ে অবশেষে আইরিশ এসে দাড়ালো ফুলমতির কাছে,তাড়াহুড়ো করে হাতের খাবারের থালা আর কাপড়ের থলে টা বাড়িয়ে দিতে দিতে বললো,
“এখানে একটা পোশাক আর কিছু খাবার আছে এগুলো নিয়ে সোজা আমাদের গুদাম ঘরে চলে যাও।”
ফুলমতি অবাক হয়ে তাকালো,বিস্মিত কন্ঠে বললো,
“কিন্তু এইগুলা তো মনে হইতাছে ফ্লোরেন্সা আম্মিজানের পোশাক , এইগুলো নিয়া আমি গুদাম ঘরে গিয়া কি করুম?”
আইরিশ জ্বিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজালো,খসখসে কন্ঠ খাদে নামিয়ে বললো,
“ওখানে ফ্লোরেন্সা আছে,তাকেই দিয়ে আসবে।”
ফুলমতি চোখ উল্টে তাকালো,আইরিশের কথা বুঝতে না পেরে বললো,
“মানে? আপনে ঠিক কি কইতাছেন আমি বুঝতাছি না,ফ্লোরেন্সা ওইহানে কখন গেলো? একটু আগেই না দেইখা আইলাম ঘরে ঘুমাইতাছে।”
আইরিশ তার স্বর আরেকটু লঘু করলো,ফিসফিসিয়ে বললো,
“একটা গোপন কথা বলছি শোন,কেউ যেন না জানে।”
কৌতুহল বাড়লো ফুলমতির,আগ্রহী কন্ঠে শুধালো,
“কি কথা?”
আইরিশ প্রলম্বিত শ্বাস ফেললো,কন্ঠে স্বাভাবিকতা ধরে রেখে বললো,
“ঘরে যে ফ্লোরেন্সা ঘুমিয়ে আছে সে আমাদের আসল ফ্লোরেন্সা নয়,ফ্লোরেন্সার মতো দেখতে অন্য এক মেয়ে।”
অথচ আইরিশের স্বাভাবিক কন্ঠস্বর শুনেও অস্বাভাবিক ভাবে ঘাবড়ে গেলো ফুলমতি,উত্তেজিত কন্ঠে বললো,
“কি কন আপনে?তাহলে তো এই কথা সব্বাইরে কইতে হইবো,এই বহুরূপী মাইয়া তো মনে হয় খারাপ উদ্দেশ্য নিয়া আসছে এই বাড়িতে।”
ফুলমতির কন্ঠ জ্বলে উঠা মাত্রই তড়িঘড়ি তার মুখ চেপে ধরলো আইরিশ, চাপা রাগান্বিত স্বরে বললো,
“আহ!এতো বেশি কথা বলো না তো ফুল।আগে আমি যেটা বলছি সেটা শোন।”
ফুলমতি কথা বলতে না পেরে চোখ দিয়ে ইশারা করলো আইরিশের হাতের দিকে।আইরিশ নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে ফুলমতির মুখের উপর থেকে সরিয়ে নিলো হাত।ফুলমতি হা করে শ্বাস টানলো দুবার,তারপর বুকে হাত চেপে রেখে বললো,
“হ্যাঁ শুনতাছি,কন আপনে।”
আইরিশ ঠান্ডা স্বরে বললো,
“এই মেয়েটার কোন খারাপ উদ্দেশ্য নেই,ও নিজের মুখেই অনেকবার বলেছে ও ফ্লোরেন্সা নয়।কিন্তু আমার বিশ্বাস হয় নি,একই দেখতে একই রকম চেহারার দুজন ভিন্ন মানুষ হয় বলে বিশ্বাস হয় নি আমার।কিন্তু আজ যখন গঞ্জ থেকে ফেরার সময় আমার প্রেম আমার সত্যিকারের আলেকজান্দ্রাকে দেখতে পেলাম,তখন বিশ্বাস হলো মেয়েটা যা বলছে সত্যিই বলছে।”
“যা বলছে মানে?আর কি কি বলেছে মেয়েটা?”
“সে বলেছে সে নাকি ভবিষ্যৎ থেকে এসেছে,এও বলেছে সে নাকি ভবিষ্যতে কি হবে সব জানে।”
স্বল্প জ্ঞানুধারি ফুলমতির মাথায় এতো প্যাচালো কথা ঢুকলো না,ঠোঁট উল্টে বললো,
“কি আবোলতাবোল বলছেন আপনে?কিছু মাথায় ঢুকতাছে না।”
“ঢোকাতে হবে না,তুই শুধু শোন, কাল আমাদের বিয়ের অনুষ্ঠান। মেয়েটা একবার বলেছিলো 1947 সালে এক বিয়ে বাড়ি নাকি মৃত্যুপুরিতে পরিনত হবে।আমার মনে হচ্ছে সেটা কলকেই হতে যাচ্ছে।”
আকাশ থেকে হটাৎ বজ্রপাত আছড়ে পরার মতো চমকে উঠলো ফুলমতি,বিস্ময়ে কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে হা হয়ে গেলো পুরু ঠোঁট,বাকরুদ্ধ কন্ঠে বললো,
“আল্লাহ রে কি কন আপনে?আমার বিশ্বাসে আইতাছে না।”
“আমিও বিশ্বাস করি নি প্রথমে ,ভেবেছি ফ্লোরেন্সা উল্টো পাল্টা বকছে,কিন্তু আজ যখন ফ্লোরেন্সাকে পেয়ে গেলাম তখন কেন যানি এই মেয়েটার কথা বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করলো।”
“তাহলে তো কালকের এই বিয়া ভাঙতে হইবো,আর আম্মিজানরে আপনে গুদামঘরে কেন রাইখা আইছেন?ওরে তো বাড়িতে নিয়া আসাটা জরুরি।”
“না ফুল।এই বিয়ে ভাঙাটা হইবো সবচেয়ে বড় বোকামি।তুমি ভাবতে পারতাছো একটা বিয়া বাড়ি মৃত্যু পুরিতে পরিনত করবে কেউ।নির্ঘাত সে আমাদের শত্রু,আর এই শত্রুকে কাল যেভাবেই হোক ধরতে হবে আমার।”
“কিন্তু ওই মাইয়া তো আপনেরে কইছে এইডা ঘটিয়মান ভবিষ্যৎ, তার মানে আপনে যাই করেন না কেন নিয়তি পাল্টাইবো না।”
“পাল্টাইলেও পাল্টাইতে পারে ফুল।হয়তো এই জন্যই ভবিষ্যৎ থেকে এই মেয়েটাকে পাঠানো হয়েছে আমাদের জন্য।”
“আমার কেন যানি এসব বিশ্বাস হইতাছে না,মনে হইতাছে স্বপ্ন দেখতাছি।”
“ওই মেয়েটা যদি সত্যি বলে থাকে তাহলে কালকেই আমি সেই গোপন খুনিকে ধরার ফাঁদ তৈরি করবো।”
“কিন্তু কেমনে?ওই খুনি কোন দিক দিয়া, কিভাবে আঘাত করবো তা আন্দাজ করবেন কেমনে আপনে?”
“আন্দাজ করতে না পারি চেষ্টা তো করতে পারি।যদি আটকাতে পারি,বদলাতে পারি নিয়তি,আর বাচিঁয়ে নিতে পারি পরিবারের সকলকে।”
“তাহলে আগে আপনে এই বিয়া বন্ধ করেন।”
“বিয়ে বন্ধ করা যাবে না,এই বিয়েটাই হবে সেই খুনিকে ধরার ফাঁদ। তুমি আর দাঁড়িয়ে থেকো না তো,আমার কলিজাটা কতক্ষণ ধরে না খেয়ে আছে কে যানে, দ্রুত যাও।”
“আম্মিজানরে ওইখানে রাইখা আসার কি প্রয়োজন?ওরে আমি সাথে নিয়া আসি?”
“ওকে বাড়িতে আনা যাইবো না ফুল।ওর সাথে মাত্রই খুব ভয়ংকর ব্যাবহার করে এসেছি আমি।”
ফুলমতি জিজ্ঞেসা দৃষ্টিতে তাকালো আইরিশের দিকে।আইরিশ অপরাধবোধে নমিত করলো তার দৃষ্টি,চিবুক নামিয়ে ভেজা গলায় বর্ণনা করলো একটু আগের ঘটিয়ে আসা ঘটনার কথা।
ফুলমতি রীতিমতো অবাক,আইরিশের কাজকে একদম সমর্থন করতে পারলো না সে,বিরোধিতা জানিয়ে বললো,
“কি বলেন কি আপনে?ওমন সরল মাইয়াডারে আঘাত দিয়া মোটেও ঠিক করেন নাই আপনে?মাইয়াডা কত কষ্ট পাইতাছে বলেন দেখি?”
আইরিশের কন্ঠ ভাঙ, ভেতর ভেতর গুমরে মরছে সে নিজেও,
“কিছু করার নেই ফুল।ফ্লোরেন্সাকে যদি সত্যি বলতাম ও কখনোই এই মৃত্যু খেলায় জড়াতে দিতো না আমাকে,নাতো বউ সাজতে দিতো ওই মেয়েটাকে।বরং নিজেই অংশিদার হতে চাইতো এই খেলার।”
“আম্মিজান তো আপনারে প্রত্যাখ্যান কইরা চইলা গেছিলো, তাইলে আপনের জন্য এতো কিছু করবো কি করে বুঝলেন?”
ফুলমতির প্রশ্নে ম্লান হাসলো আইরিশ,অনুভুতি শুন্য কন্ঠে বললো,
“ওর চোখের গভীরে তাকিয়েছি আজ।যে চোখে একসময় আমার জন্য অনুভুতির রেশ পর্যন্ত ছিলো না, সে চোখে আজ আমি স্পষ্ট দেখেছি ভালোবাসার নীল সমুদ্র।আমার প্রানঘাতীনি আমার আলেকজান্দ্রা অবশেষে ভালোবেসেছে আমায় সে কথা চিৎকার করে বলে দিয়েছে তার ওই দুখানা নয়ন।”
“তাইলে?তাইলে আপনে কেমনে পারলেন মাইয়াডারে এতো কষ্ট দিতে?”
“আলেকজান্দ্রা আমার,আমি সেই ছোট্ট থেকে ওরে বিয়ে করার স্বপ্ন দেইখা বড় হইছি।কিন্তু সেই বিয়া যদি হয় মৃত্যুর খেলা, তাইলে তো আমার আর তারে পাওয়া হইবো না ফুল।আমার আলেকজান্দ্রাকে বউ বানানোর স্বপ্ন পূরণ হইবো না এই জনমে।”
“আপনে কি সত্যি সত্যি ওই মাইয়ার কথা বিশ্বাস করতাছেন?এমন অদ্ভুত ঘটনা শুনছেন আপনে কখনো?”
“শুনি নাই,তবে আমার পুরা বিশ্বাস ওই মেয়ে মিথ্যা বলে নাই।”
“ওই মাইয়ার কথা বিশ্বাস কইরা আম্মিজানরে শুধু শুধু কষ্ট দেওয়া কি ঠিক হইবো?আম্মিজানরে সব বুঝাইয়া বলমু আমি।”
“না ফুল,এই ভুল করিস না।আলো আর আগের মতো নাই,ও অনেক ঝড় ঝাপটা সহ্য করেছে,সহজ সরল প্রানবন্ত মেয়েটা একেবারে পাল্টে গেছে,ওর মুখের দিকে তাকাতে পারি নাই আমি,ওর নির্জিব ফ্যাকাসে মুখে আগের মতো উচ্ছ্বাস নেই,মেয়েটা বেঁচে থেকেও আধমরার মতো হয়ে গিয়েছে।”
“আর আপনি আজ ওরে শেষ আঘাত টুকু করে তো মেয়েটাকে সম্পূর্ণ মেরে ফেলার ব্যাবস্থা করে এসেছেন।”
“সামান্য একটাই তো দিন ফুল।কালকের দিনটা কেটে গেলেই ওরে সব সত্যি বলে দিবো আমি।আজ যেই কষ্ট টা দিলাম তার চেয়ে হাজার গুন সুখে মুড়িয়ে দিবো ওর জীবন।”
ফুলমতির কন্ঠে দ্বন্দ্ব, সে অনিশ্চিত কন্ঠে বললো,
“আর যদি সুযোগ না পান?যদি সময় বেইমানি করে আপনের লগে?তাইলে তো মেয়েটা দুখের সাগরে বানভাসি হবে।”
আইরিশের বুকের বা পাশটা হালকা কেঁপে উঠলো,এই একই সংশয়ে হৃদয় কাপছে তার,অথচ তার কিছুই প্রকাশ করলো না ছেলেটা,আনমনে উত্তর দিলো,
“কাল যদি নিয়তি পাল্টাতে না পারি,যদি বাঁচতে না পারি কোনভাবে তাহলে ওকে বলে দিয়ো আমি ওরে ভালোবাসি,জন্মের পর জন্ম আজন্মকাল ধরে কেবল ওরেই ভালোবেসে যাবো।বলে দিও ওই বকুল গাছের নিচে অপেক্ষা করতে আমার জন্য।মানুষ না হই আমি ওর কাছে পুনরায় ফিরবো চড়ুই হয়ে।”
কিছুক্ষণ কাটলো এমনিই।পিনপতন নিরবতায়।অত:পর প্রলম্বিত শ্বাস ফেললো আইরিশ,ননৈঃশব্দ্য ভেঙে নিরুত্তাপ কন্ঠে বললো,
“এখন যাও মেয়েটা শুকিয়ে গিয়েছে,এতোমাস ঠিক মতো খাবার খায় নি বোধহয়।তুমি গিয়ে ওরে নিজের হাতে খাইয়ে দিয়ে এসো।”
ফুলমতি ভাতের থালাটা শক্ত করে ধরে বললো,
“আইচ্ছা,তাইলে আমি যাই তাত্তারি।”
ফুলমতি যেতে নিলেই পিছু ডাকে আইরিশ,উদাসীন কন্ঠে বলে,
“শোন ফুল।তোমারে আমার কসম।কালকের আগে ফ্লোরেন্সারে টু শব্দ অব্দি জানাইবা না।”
মুচকি হাসলো ফুলমতি,ভরসা দিয়ে বললো,
“আইচ্ছা কমু না।আপনে যেইভাবে বুকের ভেতর কষ্ট লুকাইয়া মিথ্যা অভিনয় করছেন আমিও করুম আপনের আলেকজান্দ্রার জন্য,আপনের রত্ন আমি খুব যত্ন কইরা রাখুম।”
“কৃতজ্ঞ থাকবো ফুল।আমার রত্নকে যত্ন করে আগলে রাখার জন্য সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকবো আমি।”
“একটা দিনেরই তো ব্যাপার,চিন্তা কইরেন না,আম্মিজানরে সব দুঃখ ভুলাইয়া রাখুম আমি।”
এতোক্ষণে প্রশান্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো আইরিশ,ভাবগুরে কন্ঠে বললো,
“ওখানে গিয়ে সবার আগে ওর চুল গুলো বেধে দিও,অবহেলায় অযত্নে মেয়েটার শখের চুলগুলো কোমলতা হারিয়েছে।”
“বাহ!এতোকিছুর মাঝে সেদিকেও খেয়াল দিয়েছেন?”
ঠোঁট কামড়ে লজ্জায় মাথা নোয়ালো আইরিশ,তারপর ফতোয়ার পকেটে থেকে একটা লিপস্টিকের ছোট কৌটা বের করে ফুলমতির হাতে এগিয়ে দিয়ে বললো,
“এইটা ওর ঠোঁটে পড়িয়ে দিস,ঠোঁট গুলো কামড়ে বোধহয় ভিষণ কাঁদছে এখনো।বীবর্ণ দেখাচ্ছিলো তখনই। ”
ফুলমতি ঠোঁট টিপে হাসলো,ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“আর?আর কিছু নিতে হইবো?”
আইরিশ মুচকি হাসলো,লাজুক কন্ঠে বললো,
“দক্ষিনের ছোট জানালাটা খুলে রেখে এসেছি ওটা যেন আবার বন্ধ করো না,আমি ওখানে দাঁড়িয়ে সারা রাত পাহাড়া দিবো ওকে,পাছে না আমার অবর্তমানে নতুন কোন বিপদে পরে যায়।”
“বাহানা তো ভালোই দিতে পারেন আপনে,পাহাড়া দেওয়ার বাহানায় যে তাকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখবেন সেটা তো কইলেন না।”
আইরিশের হৃদমাজারের শুন্য অনুভূতি কুন্ঠিত হয়,বুকের ভেতর বইতে শুরু করে বসন্তের ঠান্ডা হাওয়া, মোহিত স্বরে প্রত্যুত্তর করে বলে,
“দেখবো তো,দু চোখ ভরে দেখবো। কত মাস পর ওই চেহারা দেখার সুযোগ হলো বল তো?দেখতে দেখতে আজ সারা রাত কাটিয়ে দিলেও চোখের তৃষ্ণা মিটবে না।”
___________
সেই আগের মতোই বিছানায় বসে টিনের বেড়ার সাথে মাথা কাত করে রেখেছে নিস্পা।অজানা এক শঙ্কায় খচখচ করছে হৃদয়গহ্বর।ঠিক সেই মূহুর্তে ঘরে এসে উপস্থিত হলো আইরিশ।আইরিশকে দেখেই ছটপটিয়ে উঠলো তার ভেতরটা,কিছু একটা বলার জন্য হাসপাস করে উঠলো কণ্ঠনালী।অথচ কিছু বলার সময় সুযোগ পেলো না নিস্পা,তার আগেই কর্নগোচর হলো আইরিশের হিমশীতল কন্ঠ,
“খবর শুনেছেন?”
আইরিশ কি খবর শোনার কথা বলেছে সেদিকে মনযোগ দিল না নিস্পা,বরং কিছুক্ষণ আগে তুই তুই বলে ডাকা লোকটা হটাৎ আপনি ডাকায় বেশ বিব্রত হলো,প্রশ্নবিদ্ধ চাহনি নিক্ষেপ করে জিজ্ঞেস করলো,
“তুই থেকে হটাৎ আপনি?”
নিস্পার প্রশ্নের উত্তর দিলো না আইরিশ,বরং খাপছাড়া কন্ঠস্বরে বললো,
“ব্রিটিশ মহলে কাল রাতে আগুন লাগিয়েছে গঞ্জ বাসি।শুনেছি পুরো মহল পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে।”
এই দুস্কর খুবরটা তীক্ষ্ণ তীরের ফলার মতো ছুটে গিয়ে সরাসরি বিদ্ধ করল নিস্পার বুকের মাংসপিণ্ড।চিরচির করে ছিড়ে গেলো হৃদয়ের সমস্ত প্রতিরোধ,রক্তাক্ত হলো কণ্ঠনালী,অথচ বরফের ন্যায় শক্ত অভিব্যক্তিতে চির ধরলো না একটুও,কঠিন স্বরে করলো পাল্টা প্রশ্ন,
“তো সেটা আমাকে কেন বলছেন?”
আইরিশ নিচের ঠোঁট হাল্কা এলিয়ে দিয়ে, নির্বিকার কন্ঠে বললো,
“কেউ নাকি বেঁচে বেড়োতে পারে নি।”
নিস্পা চোখ বন্ধ করে ঢোক গিললো,অন্তরের তাড়নায় জখম হয়েছে তার তার জ্বিভ,যেকোনো মূহুর্তে খসে পড়ার উপক্রম, খুব কষ্ট করে বেড় করলো আরও কিছু কঠিন শব্দ,
“আমি শুনে কি করবো?”
আইরিশ একই অভিব্যক্তি বজায় রেখে বললো,
“প্রিন্স জোসেফও,,,, ”
নিস্পার মস্তিষ্ক ঝাজিয়ে উঠলো, নিতে পারলো না এই বিভৎস সত্য কথাটা, সে ক্রোধে ফেটে গিয়ে বললো,
“আপনাকে তখন থেকে একটা কথা বলতে চাইলাম শুনলেন না,আমার কথাটা আগে শুনুন। ”
আইরিশ গায়ে মাখলো না,প্রতিক্রিয়া বিহিন বললো,
“কি বলবেন?আপনি ফ্লোরেন্সা নয় এটাইতো?”
নিস্পা শ্বাস টেনে বললো,
“হ্যাঁ আমি ফ্লোরেন্সা নই।”
আইরিশ সংক্ষেপে জবাব দিলো,
“জানি আমি।”
নিস্পা অবিশ্বাস্য চাহনিতে তাকালো আইরিশের দিকে,ভ্রুকুটি তুলে জিজ্ঞেস করলো,
“বিশ্বাস করেছেন আমার কথা?বিশ্বাস করা তো দূর একটু আগেও তো গঞ্জে যাওয়ার সময় কিছুই শুনতে চান নি।”
“এখন বিশ্বাস করছি, এবং শুনতেও চাইছি আপনার সব কথা।”
“হটাৎ এতো পরিবর্তনের কারণ?”
“কারণ আমি আমার আলেকজান্দ্রাকে ফিরে পেয়েছি।সেই চেনা চোখ, সেই চেনা ঠোঁট আর সেই কোমল কন্ঠস্বরে আইরিশ ভাই ডাকা মেয়েটাকে পেয়ে গিয়েছি আমি।যেটা আপনার সাথে দেখা হওয়ার পর একবারের জন্যও শুনি নি।”
“কি করে শুনতেন?আমি যে ফ্লোরেন্সা নই।ওমন ডাকেও অভ্যস্ত নই।”
“আপনি ফ্লোরেন্সা নয় তাহলে আপনি কে?
“আমি ভবিষ্যৎ থেকে সময় ভ্রমণ করে এসেছি,একটা ভিন্ন সময়ের মানুস।আমার সময়ের মতো আমার জগৎ ভিন্ন,সম্পূর্ণ আলাদা।”
“ভিন্ন সময়?কতটা ভিন্ন সময় শুনি?”
“আমি 2025 সাল থেকে এসেছি।”
“তোমার মনে হয় এসব বিশ্বাস করার মতো কথা?মনে হচ্ছে না আপনি কোন আজগুবি কিংবা রুপকথার গল্প বলছেন?”
“যা সত্যি তাই বলছি আমি।আমি জানি এসব কথা বিশ্বাস করার যোগ্য নয় কিন্তু এটা যে সত্য সেটা অস্বীকার করার পথ নেই।”
“কিন্তু এটা কি করে সম্ভব?কেন ভবিষ্যৎ থেকে সময় ভ্রমণ করে এখানে পাঠানো হলো আপনাকে?”
নিস্পা ভবগুরে কন্ঠে উত্তর দিলো,
“হয়তো অতীত রটাতে নয়তো অতীত পরিবর্তন করতে।”
আইরিশ বুঝতে পারলো, কপাল কুচকে বললো,
“ঠিক বুঝতে পারলাম না, কি বলতে চাইছেন আপনি?”
“বলতে চাইছি কাল যে বিয়ের অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হতে চলেছে সেই অনুষ্ঠান মৃত্যুর খেলায় পরিনত হবে।হয়তো এই খেলা বন্ধ করার জন্যই এখানে পাঠানো হয়েছে আমাকে।”
নিস্পার কথা শুনে আগ্রহ বাড়লো আইরিশের, কন্ঠে উদ্বেগ মিশিয়ে বলল,
“এই কথাটা আপনি আরও একবার বলেছিলেন আমাকে,কেন বলেছিলেন? আপনি কীভাবে এতো নিশ্চিত ভাবে বলতে পারেন।”
অনিশ্চয়তায় কন্ঠ নিভে এলো নিস্পার,সংশয়ি কন্ঠে বললো,
“আমি নিশ্চিত ভাবে বলতে পারছি কারণ আমি ভবিষ্যৎ থেকে এসেছি,আর ওইযে ফুলমতি, উনি আমার দাদি,উনার মুখেই শুনেছি এসব।”
আইরিশ কিছু একটা ভাবলো ক্ষনকাল চুপ থেকে শঙ্কিত কন্ঠে বললো,
“তার মানে আমার সন্দেহই ঠিক,কাল এমন কিছু হবে যার জন্য আমার আলোর বিপদ হতে পারে।”
নিস্পা অস্ফুটে শব্দ করলো,
“হু।”
চিন্তায় নানাবিধ প্রশ্নে জর্জরিত হলো আইরিশের মস্তিষ্ক, সে উদ্বিগ্ন কন্ঠে বললো,
“কিন্তু আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু প্রিন্স জোসেফ তো মরে গিয়েছে আর কে থাকতে পারে আমাদের ক্ষতি করার মতো?”
নিস্পা ঠোঁট উল্টে জবাব দিলো,
“জানিনা।”
আইরিশ আবার চুপ করে গেলো, প্রায় অনেক্ষন ভাবনা চিন্তার পর অনিশ্চয়তার সু তুলে বললো,
“আমার মনে হচ্ছে আপনাকে পাঠানোই হয়েছে ব্রিটিশ প্রিন্সের বিনাশ করার জন্য।আর হয়তো ব্রিটিশ প্রিন্স মরে যাওয়াতে কাল বিয়ের আসরের ঘটনাও পাল্টে যাবে।কোন ধরনের বিপদ নাও তো ঘটতে পারে।”
নিস্পার হৃদয়ট হু হু করে কেঁদে উঠলো পুনরায়,কণ্ঠনালী বিরোধ করে বললো,
“কিন্তু আমি তো ব্রিটিশ প্রিন্সের বিনাশ করি নি।”
“নিজ হাতে না করুন হৃদয় দিয়ে তো করেছেন।প্রিন্স জোসেফ কত ভয়ংকর ধারণা নেই আপনার।আপনি তার হৃদয়ে ক্ষত তৈরি করে তাকে দূর্বল করেছেন বলেই তো গঞ্জবাসি মহলে আগুন লাগানোর সুযোগ পেলো।নয়তো প্রিন্স জোসেফ যতটা বিচক্ষণ মহলে আগুন লাগানো তো দূর একটাকেও হয়তো জীবিত ফিরে আসতে দিতো না।”
নিস্পা দমে গেলো, নিস্পল হয়ে এলো কন্ঠ,আনমনা স্বরে বললো,
“তাহলে পরোক্ষভাবে ওনার পতনের পেছনে আমার নামটাই জড়িয়ে গেলো।”
আইরিশ তপ্ত শ্বাস ছাড়লো, নিরেট কন্ঠে শুধালো,
“প্রিন্স জোসেফকে আপনি ভালোবেসে ফেলেছিলেন তাই না।”
নিস্পার ভঙ্গুর হৃদয় মেড়মেড় করে উঠলো, বুক পাজরে উপলব্ধি হলো চিনচিনে ব্যাথা,সে এবারেও মনের বিরোধিতা করে বললো,
“যে মানুষ একটা ছোট্ট শিশুকে খুন করতে দ্বিধা করে না তাকে আমি কখনোই ভালোবাসতে পারবো না।তাই এই প্রসঙ্গ না তুললেই খুশি হবো।”
আইরিশ আর কথা বাড়ালো না,ছোট্ট করে বললো,
“আপনার খুশিই খুশি।”
প্রসঙ্গ এড়োনোয় স্বস্তি পেলো নিস্পা,বললো,
“আপনি তো বললেন আপনি আপনার ফ্লোরেন্সকে ফিরে পেয়েছেন তাহলে ওকে নিয়ে আসুন।আর সবাইকে বলুন আমি নই ও আসল ফ্লোরেন্সা,এভাবে এতোগুলো মানুষের সাথে অভিনয় করতে ভালো লাগছে না আমার।”
“তাতো আনতেই পারি।”
“হ্যাঁ তাই করুন।কালকে না হয় আসল ফ্লোরেন্সাকেই বউ বানিয়ে আজীবনের মতো নিজের করে নিবেন।”
“কিন্তু ফ্লোরেন্সার ব্যাপারে এতো বড় একটা ঝুঁকি কি করে নিবো আমি।”
নিস্পা ভ্রুকুটি তুলে জিজ্ঞেস করলো,
“কীসের ঝুঁকি?ঠিক,,,,
বাক্য সম্পূর্ণ করার আগেই আইরিশ বলে উঠলো,
“কাল যদি সত্যিই কোন অঘটন ঘটে যায়?”
নিস্পা স্পষ্ট উত্তরে বললো,
“নিয়তিতে যদি লিখা থাকে তবে ঘটলেও ঘটতে পারে,আর আমার মনে হচ্ছে না কিছু ঘটবে কারণ আপনিই তো বললেন আপনার একমাত্র শত্রু আর,,,,,
” তাতেও নিশ্চিত হতে পারছি না।একটা উপকার করতে পারবেন?”
“কি?”
“কাল বিয়ের শেষ লগ্ন পর্যন্ত আপনি বউ সাজবেন?”
“আপনার কথা আমি বুঝতে পারছি না।”
“মানে কাল বউ সাজবেন আপনি আর আমি বিয়ে করবো আমার ফ্লোরেন্সাকে।”
“মানে কিসব বলছেন আপনি? ফ্লোরেন্সাকে বিয়ে করবেন ভালো কথা, কিন্তু আমি কেন বউ সাজবো, আর আমি বউ সাজলে ও কি করবে?”
কথাগুলো বলতে বলতে থামলো নিস্পা,তীক্ষ্ণ মস্তিষ্ক বুঝে ফেললো আইরিশের চাল,
“ওয়েট ওয়েট, আপনি কোনভাবে আমাকে বলির পাঠা বানাতে চাইছেন না তো?আমাকে সামনে রেখে ফ্লোরেন্সাকে বিয়ে করবেন মানে কাল যদি কোন অঘটন ঘটে যায় তাহলে আমার উপর দিয়ে যাবে আর আপনার ফ্লোরেন্সা বেঁচে যাবে।”
রাগে তেঁতে উঠলো নিস্পা, ঝাজালো কন্ঠে বললো,
“কি ভয়ংকর বুদ্ধি আপনার,আমার কল্পনায়ও আসছে না আপনি কতবড় স্বার্থপরের মতো চিন্তা করছেন,মানে নিজের ভালোবাসাকে বাঁচানোর জন্য আরেকটা মেয়েকে মৃত্যুর দুয়ারে সপে দিবেন?”
আইরিশ ব্যাতিব্যাস্ত হলো, নিস্পার উত্তেজিত হওয়ার কারণ বুঝতে পেরেছে সে,নিস্পাকে শান্ত করার জন্য মোলায়েম কন্ঠে বললো,
“দেখুন আমি কিন্তু আপনার ভালোর জন্যই বলছি।কারণ আপনি বলছেন আপনি এই সময়ের মানুষ না,তাই এই সময়টা আপনার জীবন থেকে হয়তো কিছু মূহুর্ত কেড়ে নিতে পারবে কিন্তু আপনার জীবন না।”
এক মূহুর্তের জন্য স্তব্দ হলো নিস্পা,শান্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“কি বলতে চাইছেন আপনি?”
“আমি বলতে চাইছি এই সময় বড়জোর আপনাকে আটকে রাখতে পারবে কিন্তু আপনাকে মারতে পারবে না।হয়তো, হয়তো কাল যদি কোন অঘটন ঘটে তাহলে সেটা আপনার জন্য মিরাক্কেল হয়ে যাবে।”
“কীভাবে?”
“যেভাবে আপনি এই সময়ে চলে এসেছেন সেভাবেই হয়তো ফিরে যেতে পারবেন আপনার দুনিয়ায়।”
নিস্পা চুপ করে গেলো,হিসেব মেলাতে পারলো না আইরিশের কথার।আইরিশ একই উদ্বেগ নিয়ে আবার বললো,
“কি ভাবছেন?দেখুন কাল আপনি বউ সাজলে আমার আপনার দুজনেরই লাভ।কাল যদি সত্যিই আপনার ভবিষ্যৎ বানী ফলে যায় তাহলে আমার ফ্লোরেন্সাকে কষ্ট পেতে হবে,মৃত্যু পথযাত্রী হতে হবে।আর যদি সেখানে কাল ওর পরিবর্তে আপনি থাকেন তাহলে হতে পারে সেই মৃত্যুই হবে আপনার সময়ে ফেরত যাওয়ার রাস্তা।”
অনিশ্চয়তায় কন্ঠ কেপে উঠলো নিস্পার,সন্দ্বিগ্ন কন্ঠে বললো,
“আর?আর যদি ব্রিটিশ পুত্র মৃত্যুর কারণে ভবিষ্যৎ বানী মিথ্যা হয় তখন?”
“তখন না হয় শেষ মূহুর্তে আমি ফ্লোরেন্সাকে সবার সামনে হাজির করবো।”
নিস্পা এবারেও চুপ হয়ে গেলো,কি বলবে? কি উত্তর দিবে ভেবো পেলোনা।অথচ নিস্পার উত্তর পাওয়ার জন্য ঘনঘন শ্বাস ফেলছে আইরিশ, উদ্বিগ্ন কন্ঠে তাড়া দিয়ে বললো,
“কি হলো আবার কি ভাবছেন?”
নিস্পা বড় করে শ্বাস ফেললো,শীশিরের মতো ভেজা স্বরে আওড়াল,
“বিয়ের আয়োজন শুরু করুন।ভবিতব্যে যা আছে তাই হবে।”
_________
রাত তখন গভীর, ঘুম আসছিলো না নিস্পার,তাই একা একাই দোর খুলে বাড়ির উঠানে নেমে দাড়িয়েছে বেশ কিছুক্ষণ হলো। একপ্রকার দিশাহীন ঘোরের মাঝে বোধবুদ্ধি খুইয়ে বসে আছে নিস্পা,ক্ষনকাল আগে আইরিশের বলা কথাগুলো কানে বাজছে ভিষণ ভাবে।জোসেফের মৃত্যুর খবরটা তীব্র ব্যাথার ন্যায় পাথরের মতো বুকে চেপে আছে তার।ব্যাকুল হৃদয় বারবার উতলা হয়ে জানতে চাইছে,
“সত্যিই কি মানুষটা মরে গেলো? সত্যিই কি উনার অস্তিত্ব মুছে গেল চিরতরে?নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা কি একবারও করে নি লোকটা?”
অথচ দৃঢ় আত্মসংযমে প্রতিজ্ঞ মস্তিষ্কটা তীব্র আক্রোশ নিয়ে রুখে দিলো ব্যাকুল হৃদয়ের উতলা হওয়ার সমস্ত সঙ্ঘাকে,তপ্ত ক্রোধ নিয়ে বললো,
“সাবধান নিস্পা,যে লোক একটা নিস্পাপ শিশুকে হত্যা করতে পারে সে মানুষ নয় একটা জানোয়ার,একটা মানুষরুপি পিচাশের জন্য এতো কিসের ব্যাকুলতা তোর হৃদয়ে?”
নিস্পার ব্যাকুল হৃদয় উপহাস করে হাসলো,বিদ্রুপ করে বললো,
” জানোয়ারকে যদি ভালোবাসা যেতো তবে নিজের সবটুকু কোমলতা বিলিয়ে দিতাম,আফসোস মানুষ হয়ে জানোয়ারকে ভালোবাসা প্রকৃতি বিরুদ্ধ।”
আত্মসংযমে প্রতিজ্ঞ মস্তিষ্কটা ফের প্রত্যুত্তর করবে তার আগেই ওর হাতের কব্জিটা করতালুর শক্ত বাধনে বন্দী করে নেয় কেউ একজন।নিস্পার কলিজা ধড়পড়িয়ে উঠে,আচানক এমন শীতল স্পর্শে ছলকে উঠে নাজুক সত্ত্বা,উদগ্রীব নয়ন জোড়া ঘুরিয়ে চায় পেছনের দিকে।
তার সামনে স্বয়ং ব্রিটিশ প্রিন্স দাঁড়িয়ে আছে,মরে যাওয়া মানুষটাকে নিজের এতো কাছে দেখতেই ঝলসে উঠলো নেত্রমনি, রুদ্ধশ্বাস গিলে নিয়ে হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে হিহ্বলতায়,মূর্তিমান নির্জিব জোসেফের নীল নেত্রমনির দিকে প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টি তাক করে অস্পষ্ট আওড়ায়,
“আপনি? আপনি এখানে?”
“কেন?কি ভেবেছিস মরে গিয়েছি?”
হীম গলায় প্রত্যুত্তর করতে গিয়ে ঠোঁট এলিয়ে দিয়ে বক্র হাসলো ব্রিটিশ প্রিন্স,তারপর প্রখর আত্মবিশ্বাসী কন্ঠে বললো,
“ওই সামান্য আগুন আমাকে পোড়ানো ক্ষমতা রাখে না,যতটা না তুই রাখিস,শরীরের বদলে ভেতরটা পুড়িয়ে দিয়েছিস কি নিখুঁত পরিকল্পনায়।”
এতোক্ষণে বিভ্রম কেটে মস্তিষ্ক সজাগ হলো নিস্পার,বুকের ভেতর উথলে উঠা ভয়ানক ব্যাথাটা হটাৎ করেই উবে গেলো যেন।অথচ এই প্রশান্তির বিষয়টা সংগোপনে মাটিচাপা দিয়ে দিলো নিস্পা,বিদ্রুপমাখা স্বরে বললো,
“বেঁচে আছেন তাহলে?”
নির্বিকার ভঙিতে চোয়াল শক্ত করলো জোসেফ,ক্রোধিত কন্ঠে বললো,
“খুশি হস নি৷ তাইনা? একদম খুশি হোস নি।আমি মরে গেলে খুশি হতি খুব?”
নিস্পার বুকের প্রকম্পন বৃদ্ধি পেতে শুরু করলো,বুকের পাজর ভেঙে বাইরে বেড়িয়ে আসতে চাইলো হৃদয়ের না বলা কথাগুলো, অথচ এবারেও নিজেকে সামলে নিলো মেয়েটা,তেঁতে উঠা কন্ঠে বললো,
“বাজে কথা বলবেন না।আপনি কেন এসেছেন এখানে?মরেন নি দেখাতে এসেছেন? নাকি মরতে এসেছেন?”
জোসেফ বড় করে শ্বাস টানলো, পূর্ণদৃষ্টিতে তাকালো নিস্পার নাজুক মুখের দিকে,অতঃপর গভীর থমথমে কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“তুই বিয়ে করছিস?”
নিস্পা শুস্ক ঢোক গলদঃকরন করলো, প্রস্তরবেদির ন্যায় কঠোর করলো কন্ঠ, প্রতিরোধী সুরে বললো,
“আমি যা ইচ্ছে করি আপনার তাতে কি?আপনি এখানে কেন এলেন?”
হিংস্র নেকড়ের ন্যায় ক্ষোভে ফোসফোস করে উঠে জোসেফ,নীলাদ্রি চোখে জ্বলে উঠে আগুনের স্ফুলিঙ্গ,করাতের মতো ধারালো কন্ঠে বলে,
“যা ইচ্ছে করবি মানে? যা ইচ্ছে কেন করবি তুই?তুই জানিস না আমি এখানে কেন এসেছি?”
“যে কারণেই আসুন না কেন, আমি জানতে ইচ্ছুক নই।কেউ দেখার আগে দয়া করে এখান থেকে চলে যান।”
জোসেফ আরও বেশি ক্ষুব্ধ হয়,তেড়ে এসে চেপে ধরে নিস্পার কোমল গাল,তারপর নিস্পার ফ্যাকাসে চোখে দৃষ্টিপাত করে উচ্চারণ করে হিমালয়ের ন্যায় শীতল হুংকার,
“যাবো না বলেছিনা,তার মানে যাবো না আমি।যেতে হয় তোকে এখান থেকে নিয়ে তবেই যাবো । ”
এহেন হুংকারে কোনরুপ হেলদোল হয় না নিস্পার,বরং জোসেফের হাতটা ঝড়ি মেরে সরিয়ে দিয়ে বিক্ষুব্ধ কন্ঠে বললো,
“কোথায় যাবেন?কোথায় যাবেন আপনি আমাকে নিয়ে?আমি তো শুনেছি আপনার পাপের সাম্রাজ্য পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে গঞ্জ বাসি।”
জোসেফ ঘনঘন শ্বাস ফেললো,তপ্তস্বরে বললো,
“যেখানেই নিয়ে যাই, তোকে আমার সাথেই যেতে হবে।”
“কতদূর নিয়ে যাবেন?কতদূর পর্যন্ত গেলে আমাকে নিয়ে বাঁচতে পারবেন আপনি?আপনার তো নিজের জীবনেরই নিরাপত্তা নেই তাহলে আমার জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন কি করে?”
“সেটা তোর ভাবতে হবে না,প্রিন্স জোসেফ তার শরীরের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও তার ভালোবাসাকে রক্ষা করবে।”
নিস্পা বিদ্রুপ হাসলো, একের পর এক ধারালো বাক্যে প্রশ্নবিদ্ধ করলো জোসেফের পোড়া হৃদয়,
“চোখে কি পট্টি বেঁধে রেখেছেন?তাকান, চারদিকে তাকান।হাওয়া গরম,বাঙালীর সুদিন আসছে আর আপনার দূর্দিন।ব্রিটিশ শাষকদের একটা পিপড়েও বেঁচে নেই এই তল্লাটে, ভাবতে পারছেন আপনি কত নিঃসঙ্গ?”
জোসেফের কন্ঠ নিভে এলো,ধরা গলায় বলল,
“তাহলে সঙ্গ দে, অন্তত আমার বিনাশ অব্দি আমার সাথে থেকে যা।”
আরেকদফা বিরক্তিতে বিষিয়ে উঠলো নিস্পার কন্ঠনালী,অপ্রতিরোধ্য কন্ঠে বললো,
“পাপের বিনাশে বড়জোর দু ঠোঁট প্রসারিত করে উদযাপন করা যায়, কিন্তু পাশে থেকে সঙ্গ দেওয়া যায় না।”
জোসেফ থমকায়,অকারণ একটা বিকট ব্যাথা মস্তিষ্ক এফোড় ওফোড় করে দিচ্ছে তার,সে চোখ বুঝে শীতল কন্ঠে আওড়াল,
“আমি তোকে ভালোবাসি ।”
জোসেফের মোহিত স্বর কানে বাজতেই বিক্ষিপ্ত স্বরে প্রতিবাদ করে উঠলো নিস্পা,
“আমি ফ্লোরেন্সা নই।আপনি চাইলে আসল ফ্লোরেন্সাকে খুঁজে নিয়ে ভালোবাসতে পারেন।”
“আসল নকল বুঝি না,আমার তোকে চাই।”
“আমাকে তো ফ্লোরেন্সা ভেবেই ভালোবেসেছেন।”
জোসেফের ভবগুরে নীল নয়ন নিস্পার পানে আবদ্ধ,নিস্পার যুক্তি তর্ক কোনটাই জোসেফের ভালোবাসা ডিঙাতে সম্ভব নয়,সে ভালোবাসে, তার ঊর্ধ্বে গিয়ে এই মেয়েটার মাঝে হুট করেই ভিষণভাবে আশক্ত হয়ে গিয়েছে সে,যে আশক্তি কাটানো সম্ভব না,কোনভাবেই সম্ভব না। হৃদয় তোলপাড় করা অভিমানি আক্ষেপের মাঝেই নিঃসৃত হয় জীসেফের আহত কন্ঠস্বর,
“সামান্য নামে কিচ্ছু যায় আসে না, তোকে ছুঁয়ে ফেলা অনুভবে আসক্ত আমি”
অন্তরের অগ্নিদাহে প্রকম্পিত হয় নিস্পার বুক,অভিযোগি কন্ঠে বলে,
“অনুভবের নামে আসক্তি দেখিয়ে আমাকে খুন করতে এসেছেন তাই না?এই সুযোগ দ্বিতীয়বার দিচ্ছি না আমি।”
জোসেফের দৃষ্টি নরম হয়ে আসে,সহসা এগিয়ে আসে নিস্পার দিকে,হাত বাড়িয়ে দু’হাতে আগলে নেয় নিস্পার দুধসাদা তুলতুলে বদন,অন্তরের তাড়নায় দুরত্ব ঘোচায় আরেকটু,নিস্পার কপালে কপাল ঠেকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে আওড়ায়,
“হ্যাঁ খুন করতে এসেছি,তোর নিঃশ্বাসে ভালোবাসার বিষ মিশিয়ে দিয়ে তোকে খুন করতে এসেছি আমি।লাল রঙের শাড়ি দিয়ে রক্তাক্ত করতে এসেছি তোর হৃদয়।”
তারপর? তারপর আর কি?অশুভ শক্তি মাথা নত করলো ফের,নিটোল চিবুক খানা নামিয়ে হাটু ভেঙে বসলো নিস্পার সামনে, হাতে বন্দী লাল রঙের শাড়িটা বাড়িয়ে দিয়ে দহন দগ্ধ স্বরে বললো,
“আমাকে বান্ধিয়া নে এই লাল শাড়ির আঁচলে।”
নিস্পার শীর্ণকায় বুক প্রকম্পিত হলো, সে স্পষ্ট অনুভব করলো হৃদয়ের শীতিলতা,ভেতরটা উথাল-পাথাল করে উঠলো হটাৎ, এই প্রথমবারের মিতো নিষ্ঠুর জালিম প্রিন্সের দহনে চোখ ছাপিয়ে জল এলো নিস্পার,বুকের ভেতর টের পেলো ভাঙন,অতঃপর আকুতি ভরা কন্ঠে বললো,
“আপনি চলে যান।দয়া করে চলে যান।আর ভেঙে দিবেন না আমাকে।”
আর এক মূহুর্ত বিলম্ব করলো না নিস্পা, জোসেফকে বাইরে ফেলে রেখেই দ্রুতপায়ে ছুটে এলো ঘরের ভেতর,প্রলম্বিত হাতে দরজার কপাট লাগিয়ে বসে পড়লো দরজা ঘেঁষে,কন্ঠরোধ হয়ে কান্না উগ্রে এলো মেয়েটার,দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরে কোনমতে সামলালো নিজেকে,ভাঙা কন্ঠে বিরবিরালো,
“চলে যান, চলে যান আপনি।”
কিয়ৎক্ষনের নিরবতা ছাপিয়ে দরজার ওপাশ থেকে শোনা গেলো জোসেফের রুদ্র কন্ঠস্বর,
“আমাকে তাড়িয়ে তুই ওই আইরিশ কে বিয়ে করবি তাই না?তুই ওই আইরিশ কে বিয়ে করার জন্য আমাকে প্রত্যাখ্যান করছিস।শুনে রাখ আমি যদি তোকে না পাই তবে কাউকে পেতে দিবো না,কাল তোর বিয়ে বাড়ি আমি শ্মশানে পরিনত করবো।”
জোসেফের ধিম কন্ঠস্বর খামচে ধরলো নিস্পার হৃদস্পন্দন,হৃদয়ের তাড়নায় অজান্তেই দু’হাতে কান চেপে ধরলো নিস্পা,জড়োসড়ো কন্ঠে বললো,
“হয়তো আমাকে ভবিষ্যৎ থেকে অতীতে পাঠানোই হয়েছে এই মৃত্যুর খেলা বন্ধ করার জন্য।আমি বেঁচে থাকতে আপনাকে সফল হতে দিবো না।”
ওপাশ থেকে দ্রিম করে দরজায় লাথি বসায় জোসেফ,রক্ত জমাট কন্ঠে বলে,
“এতো জেদি কেন তুই?জানিস না আমি যা বলি তাই করি।যদি কাল সত্যি সত্যি তুই অন্যকারো জন্য বউ সাজিস তবে আমি সব ধ্বংস করে দেব।”
তড়িৎ এর মতো উর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে নিস্পার হৃদস্পন্দন, হাফড়ের মতো শ্বাস ফেললো জোড়ে জোড়ে, ভয়াল, বিপর্যস্ত কন্ঠে আওড়ালো,
“যদি এমন কিছু হয় আপনাকে কক্ষনো ক্ষমা করবোনা আমি। ঘৃনা করবো,এই মূহুর্তের চেয়ে আরও অধিক গুন ঘৃনা করবো আপনাকে।
______________
বিয়ে বাড়ির পরিবেশ রমরমা।একটা নতুন পাঞ্জাবী পড়ে ইমরান সোজা এসে ঢুকেছে নাবহার ঘরে।মেয়েটাকে কাল রাতে অজ্ঞান অবস্থায় বাড়িতে নিয়ে এসেছিলো ইমরান।বড় ভাইকে বুঝিয়ে বাঝিয়ে অনেক অনুরোধের পর নাবহাকে একটা থাকার ঘরের ব্যাবস্থা করে দিয়েছে।
তখনও বেহুশ ছিলো মেয়েটা, অচেতন অবস্থায় এতোদূর এসেছে টেরই পায় নি।তারপর ভোররাতের দিকে জ্ঞান ফিরেছিলো,জ্ঞান ফেরার সাথে সাথেই হাজারটা প্রশ্নে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিলো ইমরানকে।ইমরান কবুতরের মতো এক এক করে সব প্রশ্নের উত্তর দিলো, খুব ধিরে সুস্থে বুঝিয়ে সুঝিয়ে মেয়েটাকে শান্ত করে ফিরে এসেছিলো ঘরে।।
শুধুমাত্র বিয়ের উছিলাতেই নয়,নিজেকে আজ একটু বেশিই পরিপাটি করার পেছনে যে নাবহার নামটাই জড়িয়ে আছে সে কথা স্পষ্টতই ফুটে উঠেছে ইমরানের ঠোঁটের কোনে ঝুলে থাকা লাজুক হাসির মাঝে।
মায়ের কাছ থেকে ফ্লোরেন্সার একটা জামা ধার করে নিয়ে এসেছে নাবহার জন্য।আপাতত সেই জামাটা দেওয়ার জন্যই আসা এই ঘরে।
নাবহা চুপচাপ বসে আছে বিছানার ওপর। কাল রাতের আগুন লাগার বিভীষিকাময় ঘটনা বারবার দুঃস্বপ্ন হয়ে ফিরে আসছে, কেড়ে নিচ্ছে তার চোখের পাতার সামান্যতম প্রশান্তি টকুনও। বারবারের মতো এবারও চোখ বন্ধ করে ঘুমের কাছে আত্মসমর্পণের চেষ্টা করছিল সে। কিন্তু অন্ধকারের ভেতরেই আবার ভেসে উঠলো সেই ভয়ংকর দৃশ্যপট। হৃদপিণ্ড ধড়ফড়িয়ে উঠলো পুনরায়,চোখ মেলে তাকালো ধড়মড় করে। চোখ খুলতেই সামনে ইভানকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভড়কে উঠলো কিঞ্চিৎ, বিব্রতকর কন্ঠে বললো,
“একি?আপনি কখন এলেন?”
ইমরান এতোক্ষণ মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে ছিলো নাবহার দিকে,নাবহার কন্ঠে ধ্যানমগ্ন হয় তার,নড়চড়ে উঠে বলে,
“মাত্রই এলাম।তুমি ঘুমাচ্ছিলে বলে আর ডাকতে মন চাইলো না।”
ইমরানের মোহিত দৃষ্টি চোখে পড়তেই চিবুক নামায় নাবহা,দায়সারা উত্তরে বলে,
“ঘুমাচ্ছিলাম না, এভাবে তাকিয়ে থাকার চেয়ে ডেকে দিলে খুব একটা ক্ষতি হতো না।”
ইমরান মুচকি হাসলো, প্রশ্নবিদ্ধ নয়নে তাকালো নাবহার দিকে,তারপর নরম স্বরে বললো,
“কেন?তাকিয়ে ক্ষতি করে ফেলেছি নাকি?বলতে পারো ক্ষতিপূরণ দিয়ে দেবো নাহয়।”
নাবহা অস্বস্তিতে হাসফাস করে উঠলো,ইমরানের কথার বিপরীতে প্রত্যুত্তর করলো দ্রুত,
“আমি আজকেই এখান থেকে চলে যাবো।আপনি আমার জীবন বাঁচিয়েছেন এজন্য আমি চিরকৃতজ্ঞ। ”
নাবহার চলে যাওয়ার কথা শুনে মুখটা চুপসে ফেললো ইমরান,অনুরাগী কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“এখানে কি অসুবিধে হচ্ছে তোমার?চলে যাবে কেন?”
নাবহা কাঠকাঠ কন্ঠে উত্তর দিলো,
“অন্যকারো বাড়িতে আশ্রিতার মতো থাকতে আত্মসম্মানে লাগবে আমার।তাই এখানে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব।”
ইমরান চুপ করে রইলো কিছুক্ষণ।মেয়েটার আত্মসংযমের পরিচয় পেয়ে আরেকটু মুগ্ধ হলো ছেলেটা,ভালোবাসা বুঝি এমনই হয়?ভালোবাসায় ঘিরে থাকা মানুষটা যা করে তাই ভালোলাগে, মুগ্ধতা কমার বদলে বাড়তে থাকে পালাক্রমে।
আজ ফ্লোরেন্সার বিয়েটা শেষ হলেই বড় ভাইয়ের সাথে আলোচনা করবে ইমরান।নাবহাকে আশ্রিতা নয়,বরং সসম্মানে বাড়ির বউ করে রেখে দিবে তার কাছে,এমন রত্নকে কোনকিছুর মূল্যে হারাতে চায় না সে,কিছুতেই চায় না।কিন্তু নাবহা রাজি হবে তো?মেয়েটার যা আত্মসংযম, যদি রাজি না হয়?ভেতরকার দ্বিধাদ্বন্দে আবারও দপ করে নিভে গেলো ইমরানের হাস্যজ্বল মুখটা।
ফ্লোরেন্সার বিয়ে শেষ হওয়ার পর না হয় নিজের মনের সব কথা বলে দিবে নাবহাকে,খুব করে অনুরোধ করে তার হয়ে থেকে যাওয়ার জন্য মানিয়ে নিবে নাবহাকে।মনে মনে ফন্দি এঁটে বুক ফুলিয়ে শ্বাস ফেললো ইমরান তারপর নাবহার হাতের দিকে হাতে করে নিয়ে আসাটা জামাটা বাড়িয়ে দিয়ে বললো,
“আচ্ছা সে না হয় পড়ে দেখা যাবে।আপতত বিয়ের অনুষ্ঠান টা শেষ হোক।ততক্ষন না হয় বিয়ের অতিথি হয়েই থেকে যাও এই বাড়িতে।”
বিয়ের কথা শুনতেই কপাল কুচকালো নাবহা,জামাটা হাতে নিতে নিতে জিজ্ঞেস করলো,
“এই বাড়িতে বিয়ে নাকি?কার বিয়ে আজ?”
“কার বিয়ে আবার? ফ্লোরেন্সা আর আইরিশ ভাইয়ের বিয়ে।ভালোই হলো বলো?ফ্লোরেন্সা তো শুনেছি তোমার সই,এক উছিলায় সইয়ের বিয়ে খেতে পারবে।”
ফ্লোরেন্সা আর আইরিশ ভাইয়ের বিয়ে এই একটা শব্দে থমকে গেলো নাবহা, বাদবাকি শব্দ গুলো মিলিয়ে গেলো হাওয়ায়।এর বেশি ধারন করার সাহস হলো না যন্ত্রণায় অসুস্থ মস্তিষ্কটার।মনে হলো এক্ষুনি দম বন্ধ হয়ে মরে যাবে সে।চোখের সামনে অন্ধকার লাগলো সবকিছু।নিঃশ্বাস নিতেই ভুলে গেলো মেয়েটা।সমস্ত যন্ত্রণা একত্র হয়ে রক্ত জমাট বেধে গেলো তার শ্যামল চোখে।
ইমরান বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেও কিছু বুঝতে পারলো না,নাবহাকে জামা পাল্টানোর সময় দিতে ঘর ফাঁকা করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলো খুব।তাই আর দাঁড়িয়ে না থেকে বললো,
“তারাতাড়ি তৈরি হয়ে বাইরে আসো।ফ্লোরেন্সা তোমাকে দেখলে খুব খুশি হবে।”
কথাটা বলেই বেড়িয়ে যেতে নেয় ইমরান,তারপর আবার কি মনে করে যেন থামে,নাবহার দিকে পূর্ণদৃষ্টি তাক করে আকুতি ভরা কন্ঠে বলে,
“না বলে চলে যাওয়ার চিন্তা করো না মেয়ে।ঘর থেকে বেড়িয়ে দক্ষিণ দিকে একটা পুকুর আছে,আজ বিকেলে সেই ঘাটে তোমার জন্য অপেক্ষা করবো আমি।”
নাবহা রা রু কিছুই বললো না, হয়তো শুনলোই না ইমরানের বলে যাওয়া কথাগুলো, বিভ্রমে আচ্ছন্ন মেয়েটা জাগতিক খেই হারিয়ে ডুবে গিয়েছে, প্রানপন সাঁতরাচ্ছে যন্ত্রণার মহাসমুদ্রে।
বুকভরা যন্ত্রণা আর পৃথিবীর সমস্য ক্লেশ নিয়ে পা এগিয়ে আনে নাবহা,দু’হাতে দরজা বন্ধ করে দ্রুত।যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে হু হু করে কেঁদে উঠলো মেয়েটা,এতোক্ষণে হাল্কা হলো গুমোট বাতাস,সমুদ্রের মতো থৈথৈ করে উঠলো তার চোখের পানি। নিজেকে সামলাতে না পেরে নিজের হাতেই নিজের গালে থাপ্পড় মারতে শুরু করলো অনবরত, নিজেই নিজেকে ধিক্কার জানিয়ে বলতে শুরু করলো,
“তুই নির্লজ্জ নাবহা,তুই বেহায়া।তুই কেন কাঁদছিস?কেন অন্যকারো বিয়ের খবরে ভেঙে যাচ্ছে তোর বুকের হাড় গুলো। এতো কেন দূর্বল তুই?এতো কেন অসহায়?”
_____________
কোমরে ওড়না বেঁধে বিয়ের বাড়ির কাজ সামলাচ্ছে সুফি, কিন্তু হাতের গতি আর চোখের ভাষা,দুটোকে মনে হচ্ছে আলাদা জগতের বাসিন্দা।বুকের ভেতরে কাঁটার মতো বিঁধে আছে কিছু একটা, সে কাল রাত থেকে জ্বালাচ্ছে মেয়েটাকে।বারকে বার চোখদুটো ভিজিয়ে দিতে চাইছে বেহায়ার মতো।
অথচ মেয়েটা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, নিজের কাছে নিজে প্রতিজ্ঞা করেছে সে।আইরিশ ভাইয়ের জীবনের এতো বড় আনন্দ ঘন দিনে একটুও মন খারাপ করে থাকবে না সে,চোখের পানি ফেলে দিনটাকে অশুভ করবে না এক মূহুর্তের জন্যেও।
মনকে ভুলিয়ে রাখার জন্য সকাল থেকে এ পর্যন্ত এটা ওটা কাজে নিজেকে ব্যাস্ত রেখেছে সুফি।কাজের ভারে আইরিশ ভাইকে ভুলে থাকার প্রচেষ্টা চালাতে চালাতে ক্লান্ত মেয়েটা আজ হাফাচ্ছেও না,যন্ত্রণায় হয়তো ভারী হয়ে আছে বুক।
দূর থেকে এসব কিছু পর্যবেক্ষন করলো ছবি।দাঁড়িয়ে থেকে দেখলো এই নিষ্ঠুরতম ছবি।জায়গাটা এখন খালি প্রায়,এদিকটায় কেউ নেই,কেবল এক ধ্যানে এক মনে শীল পাটায় মশলা পিষছে সুফি।
ছবি সুযোগ পেয়ে এগিয়ে গেলো,সোজা গিয়ে দাড়ালো সুফির সামনে,তারপর মোলায়েম কন্ঠে বললো,
“আর কত কষ্ট দিবে নিজেকে সুফি?হাফাচ্ছো না তুমি?”
শীল পাটায় বাটনা বাটা হটাৎ থমকায় সুফির,গ্রীবা উঁচিয়ে চায় সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির পানে,কিন্তু চিনে উঠতে পারে না,মেয়েটাকে আগে কখনো দেখেছে বলেও মনে হচ্ছে না।
সুফি হাত ধুয়ে ওড়নায় হাত মুছতে মুছতে উঠে দাড়ালো, কৌতুহলি কন্ঠে জিজ্ঞেস করল ,
“কে তুমি?আমার নাম জানলে কি করে?”
ছবি মুচকি হাসে,কোমল কন্ঠে বলে,
“আমি ছবি,তোমার নামটা আমি আমার মায়ের কাছে শুনেছি।”
“ওহ তোমার মা আমায় চেনে নাকি?কি নাম তোমার মায়ের?”
প্রশ্নের সোজাসাপ্টা উত্তর দিলো না ছবি,ঘুরিয়ে পেচিয়ে বললো,
“আমার মা তোমাকে চিনে কিন্তু তুমি বোধহয় চিনবে না।তবে তুমি হয়তো আমার মায়ের বোনকে চিনতে পারো।”
সুফি অবাক হলো, ভ্রুকুটি তুলে জিজ্ঞেস করলো,
“তোমার মাকে চিনবো না অথচ তার বোনকে চিনবো সেটা কি করে?”
“কারণ আমার মায়ের বোনের নাম ফাতিমা।”
এপর্যায়ে বিস্ময়ে অক্ষিপুট বড়বড় হয়ে গেলো সুফির,কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে অস্ফুটে আওড়াল,
“মানে?”
“মানে আমি তোমার খালাতো বোন।আমার মা তোমার মায়ের বোন ছিলো।”
“সত্যি বলছো তুমি?কই আমি তো শুনি নি আমার মায়ের কোন বোন আছে।”
“কীভাবে শুনবে?শোনানোর জন্য তোমার পাশে কেউ ছিলো নাকি?”
ছবির কথাগুলো সুফির ব্যাথাতুর হৃদয়ে তীরের ফলার ন্যায় বিদ্ধ হলো,মাটিচাপা দেওয়া তার অন্ধকার অতীত পুনরায় সামনে আসায় ভিষণ ভয় পেলো মেয়েটা।
ছবি আরও দু কদম এগিয়ে এসে দাড়ালো সুফির সম্মুখে,তারপর শান্ত কন্ঠে বললো,
“হুজুর আব্দুল খালেকের তিনজন মেয়ে ছিলো, তোমার মা, আমার মা, আর?আর একজন কে আমি জানি না।”
“কেন?তার কথা জানো না কেন?”
“কারণ সে নাকি তখন তার পালিত মায়ের কাছে ছিলো,আমাদের নানু, মানে হুজুর আব্দুল খালেকের স্ত্রী তার তৃতীয় কন্যা জন্ম দেওয়ার সময় মৃত্যুবরন করেছিলেন, আর ওই সময় দুগ্ধজাত সন্তানের একজন দুগ্ধ মায়ের প্রয়োজন ছিলো।সেসময়ই খবর আসে পাশের গ্রামের এক মহিলা সন্তান জন্ম দানের সময় মৃত সন্তান জন্ম দেন।তখন আমাদের নানা তার মা হারা নবজাতক শিশুকে ওই মহিলার হাতে তুলে দেন।যদিও তোমার মা আর আমার মা তার ছোট বোনকে অন্যকারো হেফাজতে দিতে নারাজ ছিলেন,কিন্তু তাদের কিছু করার ছিলো না।”
“তুমি এতোসব জানলে কি করে?”
“আমার মায়ের কাছ থেকে জেনেছি,শুধু এটুকু নয়, আরও অনেক কিছু জানি আমি।”
“আরও?”
অস্ফুটে আওড়াল সুফি।ছবি তপ্ত শ্বাস টেনে বললো,
“হ্যাঁ আরও।”
“আমি তখন আমার মায়ের পেটে, চার মাস চলছিলো তার।আমার বাবা দিনমজুর,খেটে খায়।তোমার মা ফাতিমাকে খুব কষ্ট করে পড়াতো আমার বাবা,এদেশে নারীদের জন্য শিক্ষা ব্যাবস্থা ছিলো না,এজন্য তার এক পরিচিতের সাথে কথা বলে তোমার মাকে ভারত পাঠিয়ে দেয় পড়াশোনার জন্য।আমার বাবা দিন রাত পরিশ্রম করে মাসে মাসে কিছু খরচপাতি পাঠাতো তোমার মাকে।এভাবেই তোমার সেখানে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে শুরু করে,এবং তার পাশাপাশি আর্টিকেল লেখাও শুরু করে।সংবাদপত্রে বিভিন্ন আর্টিকেল লিখতো তিনি।
তবে একপর্যায়ে তার মনে হলো তার নিজের জন্মভূমি নিয়ে কিছু লিখা উচিত।তখন ব্রিটিশ শাসকরা খুব বাজেভাবে শোষন করছিলো বাঙালীর রক্ত।এই উদ্দেশ্যই বাংলাদেশে ফিরে আসেন তিনি।আর তখনি দেখা হয় ফ্লোরেন্সার বাবার সাথে।সাক্ষাতের এক পর্যায়ে তারা ভয়ানক ভাবে আসক্ত হয় একে অপরের প্রতি।যদিও ফ্লোরেন্সার বাবার দিক থেকে সেটা আসক্তি ছিলো না বরঙ চাহিদা ছিলো, যেকোনো মূল্যে একটা মেয়ে সন্তান লাভের আকাঙ্খা ছিলো তার বুকের ভেতর।
ছলে বলে কৌশলে শেষ পর্যন্ত তোমার মাকে লুকিয়ে বিয়ে করে নেন তিনি।বিয়ের একমাসের মধ্যে তুমি তোমার মায়ের গর্ভে আসো আর তখনই তোমার মা জানতে পারে লোকটা বিবাহিত শুধু বিবাহিত নয় অধিক সন্তানের বাবা।
তোমার মায়ের মাথায় তখন আকাশ ভেঙে পড়ে,তোমার মা দিশেহারা হয়ে ছুটে আসে আমার বাবার কাছে, সব খুলে বলার পর, আমার বাবা তক্ষুনি ক্ষুব্ধ হয়ে আসে এই বাড়িতে,সব কিছু ফাস করে দেওয়ার জন্য। কিন্তু আমার বাবা সেই যে এলো আর ফিরব গেলো না,তার স্ত্রীর গর্ভে লালিত হয়ে বেড়ে উঠা নয় মাসের বাচ্চাটার টানেও আর এলো না।আর সেদিন থেকেই শুরু হলো আমাদের দূর্দিন।তারপরের ঘটনাতো তুমি জানোই।”
পুরো ঘটনা শুনে বাকরুদ্ধ সুফি,কি বলবে ভাষা হারালো সে,দাঁতে দাঁত চেপে শক্ত পিলারের ন্যায় দাঁড়িয়ে রইলো চুপচাপ।
ছবি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল,তারপর শান্ত স্বরে বললো,
“হারেতে হারাতে সবই তো হারিয়ে ফেললে সুফি,শেষ পর্যন্ত নিজের ভালোবাসাকেও।তোমার কি প্রতিশোধ নিতে ইচ্ছে হয় না?ভয়ংকর প্রতিশোধ।”
সুফি খরখরে জ্বিভের আগা দিয়ে ভেজাতে চাইলো শুখনো ঠোঁট,বুকে পাথর চেপে বললো,
“ওরা নিষ্ঠুর তাই বলে আমি কি করে নিষ্ঠুর হই বলো?কি করে ভুলে যাই ওরা আমার রক্ত।কি করে পাল্টা আঘাত করি বলতো?নিজের আপন মানুষ গুলোকে আঘাত না করে ভালো থাকতে দেখতেও যে বড় তৃপ্তি।”
তাচ্ছিল্য হাসলো ছবি, নির্বিকার ঠোঁট উল্টে রহস্যময় কন্ঠে বললো,
“তুমি যেমন দেখাও তুমি তেমন নয় তাইনা?”
সুফি চোখ বড় বড় করে তাকায়,রুদ্ধশ্বাসে আওড়ায়,
“কি বলতে চাইছো তুমি?”
ছবি ঠোঁট বাঁকায় পুনরায়,বক্র হেসে বললে,
“এতো কোমল হলে বুঝি নিজের পালিত মা বাবার গলা কাটতে পারতে?”
সুফি আতংকে কেপে উঠে,শুকিয়ে আসে তার গলবিল,এতোদিন নিঃশব্দে সংগোপনে লুকিয়ে রাখা কথাটা প্রকাশ্যে আসার ভয়ে কেঁপে উঠল পায়ের নিচের মাটি।আতংকিত স্বরে বিরবির করে বললো,
“চুপ, একদম চুপ।যেভাবে এসেছ সেভাবে ফিরে যাও।আর কখনো এমুখো হবে না বলে দিলাম।”
___________
বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে এসেছে ছবি।যেই বাবাকে কখনো চোখে দেখেনি,যে বাবার আদর কপালে জোটে নি তার,যে বাবার মৃত্যুর পেছনে এই পরিবারের কেউ না কেউ দায়ি সে পিরিবারকে শেষ করে দিতে এসেছে ছবি।ধ্বংস করে দিতে এসেছে এতো সুন্দর আনন্দঘন পরিবেশ।
উঠানের একপাশে দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকাচ্ছে ছবি,কল্পনায় আঁকছে কিছুক্ষণ পরের মূহুর্ত,এই হাসিখুশি কলরবে ভরা পরিবেশ আরকিছু মূহুর্তের মধ্যেই ধুলিৎশাত হতে চলেছে।
“আরে তুমি?”
পরিচিত কন্ঠস্বর কর্ণগোচর হতেই অবিলম্বে ঘাড় ঘোরায় ছবি,চোখের সামনে ইমরানকে দেখতে পেয়ে বিহ্বলতায় ফাঁক হয়ে আসে দুই ঠোঁট,বিস্মিত কন্ঠে বলে,
“আপনি!এটা আপনার বাড়ি?”
ইমরান এগিয়ে এসে দাঁড়ায় ছবির কাছে, তারপর নমনীয় কন্ঠে বলে,
“হ্যাঁ তো, পরশু রাতে তো এই বাড়ির কিথাই বলেছিলাম তোমাকে।”
“ওহ আমি খেয়াল করি নি বোধহয়।”
ইমরান হাস্যজ্বল কন্ঠে বললো,
“যাহ বাবা, আমি আরও ভাবলাম তুমি আমার সাথে দেখা করতে এলে।”
ছবি ঠোঁট টিপে গুনগুনিয়ে উত্তর দিলো,
“খেয়াল করলে বোধহয় আজকের বদলে হয়তো গতকাল আসতাম,তখন আপনিই বিরক্ত হতেন,ভাগ্যিস আসি নি।”
ইমরান রসিকতা করে বললো,
“তা এসেছেন কি জন্যে?বিয়ে উপলক্ষে দাওয়াত খেয়ে পেট ভরাতে নাকি আমার সাথে হাসতে হাসতে পেট ভরাতে।”
“যে কারনেক আসি না কেন দুটোই হয়ে যাবে।”
“তা অন্তত ভুল বলোনি।”
কথাটা বলেই থামলো ইমরান,চট করে জিজ্ঞেস করলো,
“আচ্ছা পাঞ্জাবিতে কেমন লাগছে আমায়?সেদিন তো ভালো ভাবে দেখোনি, যেটুকু দেখেছো নিশ্চয়ই ভুত ভেবে ভয় পেয়েছিলে। আজ দেখো তো কেমন লাগছে?দেখে বলোতো এই সুরতে কোন রমনীর হৃদয় ঘায়েল করতে পারবো কিনা।”
ছবি পূর্ণদৃষ্টিতে দেখলো ইমরানের আপদমস্তক।লোকটাকে ভিষন রকম সুন্দর লাগছে, সেদিন রাতের চেয়েও বেশি সুন্দর লাগছে আজ।কত স্নিগ্ধ প্রানচঞ্চল লোকটা।ছবি চিবুক নামিয়ে ফের তাকালো,মোহমায়িত কন্ঠে স্বগোতক্তিতে বিরবিরালো,
“কোন রমনীর হৃদয় ঘায়েল করতে পারবেন কিনা যানি না, তবে আপনার এই সর্বনাশা রুপ আমার হৃদয় ঠিকই ঘায়েল করেছে।”
________________
আইরিশের কথামতো নীল রঙের শাড়ি পড়ে বসে আছে নিস্পা। বউ সেজেছে।কপালে টিপ,চোখে কাজল আর ঠোঁটে ছুইয়েছে কৃত্রিম রঙ।এসবকিছুই নিছক আনুষ্ঠানিকতা।সাজের আভিজাত্যে নেই কোনো প্রাণের দীপ্তি,কাজলে রাঙা চোখের আড়ালে ঢেকে রাখা আছে এক অস্থির শূন্যতা। এই সাজগোজের প্রতি খুব একটা মনযোগ নেই নিস্পার,নিয়তির কাছে আত্মসমর্পণ করা এক নীরব যাত্রীর ন্যায় সে কেবল তাকিয়ে দেখছে বাহিরের দৃশ্য।
গঞ্জের প্রায় অনেক মানুষ এসেছে।বাড়ির উঠানে তালপাতায় বোনা পাটিতে বসতে দেওয়া হয়েছে সকলকে।এতো এতো মানুষ দেখেই নিস্পার মনের ভয়টা হুরহুর করে বেড়ে যাচ্ছে,চোখে ফুটে আছে অজানা আতঙ্ক।মনে হচ্ছে প্রতিটি মুহূর্তে অপেক্ষা করছে অদৃশ্য কোনো বিপর্যয়ের আগমনের।
নিস্পার অবিন্যস্ত উদ্বিগ্ন নয়ন জোড়া হন্যে হয়ে খুজছে জোসেফকে।সে ভেবেছিলো প্রিন্স জোসেফের মৃত্যুতে ভবিষ্যৎবানী পাল্টে গিয়েছে,কিন্তু প্রিন্স জোসেফ তো মরে নি,সে জীবিত আছে,আর একমাত্র সেই আছে যে কিনা নিস্পা আর আইরিশের এই বিয়েতে নারাজ।কাল তো হুমকিও দিয়ে গিয়েছে,যদি এই বিয়ে হয় তবে পুরো বিয়ে বাড়ি স্মশানে পরিনিত করবে।
নিস্পার বুকের ভেতর ধুকপুক ধ্বনি প্রতি মুহূর্তে দ্রুততর হচ্ছে,ঠিক যেন সেই শ্মশানের আগুনের প্রতিধ্বনি আগাম শোনা যাচ্ছে তার কানে।সে হাসফাস করতে করতে তড়িৎ উঠে দাঁড়ায়,জোসেফ কিছু করার আগেই আটকাতে হবে তার,তাকে বুঝিয়ে বলতে হবে,যদি আজই তার এই সময়ে শেষ দিন হয় তবে বলে যেতে হবে সে না চাইতেও ওই জালিম প্রিন্সকে কল্পনা করে বউ সেজেছে।তার এই সাজ একান্তই ওই নিষ্ঠুর মানুষটিকে ঘিরে আঁকা এক অবচেতন প্রতিচ্ছবি।
খোস আমেজে রান্নার প্রস্তুতি চলছে বাড়ির কেটে ফেলা সেই বকুল গাছটার শেকড়ের কাছটাতেই।বাতাসে ভাসছে গরম ভাত, মাংস আর মশলার তীব্র সুবাস, ঘ্রানে মো মো করছে চারদিক।
আইরিশ খুব বিচক্ষণতার সাথে তদারকি করছে সব।যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্য নিয়োগের মতো বাড়ির চারপাশে রেখেছে কড়া পাহারা।এমনকি খাবারের ডেকের কাছে বিশ্বস্ত পাহাড়া দাড় রেখেছে চার পাচ জন।কোন আত্মিয় স্বজনকে সে ঘরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয় নি।কড়াকড়ি ভাবে সব দিকে একটা সুরক্ষা বেড়া প্রস্তুত করেছে আইরিশ।
অতিথি সবাই খাবার খেতে বসেছে।পাটি পেতে সারি সারি বসে খাচ্ছে সবাই, কেউ গরম ভাতের সাথে মাংস,আবার কেউ বা কোরমার ঝোলের প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
খাবারের পরপরই শুরু হবে বিয়ে পড়ানোর পর্ব।একটা থালাতে নিস্পাকেও খাবার দিয়ে যাওয়া হয়েছে কিছুক্ষণ আগে।টেনশনে নিস্পার জান যায় অবস্থা,তার মাঝে খাবার খেতে একদমই ইচ্ছে করলো না মেয়েটার।কিন্তু বিয়ের কনেকে এভাবে তো আর সারাদিন না খাইয়ে বসিয়ে রাখা যায় না, তাই ফুলমতি নাকে কাপড় চেপে দু লোকমা ভাত নিজের হাতে তুলে খাইয়ে দিলেন নিস্পাকে।নিস্পাও আর আপত্তি করলো না,বরং সব চিন্তা ভুলে গিয়ে জোয়ান দাদির হাতে খাবার খাওয়ার ব্যাপারটা বেশ খুব উপভোগ করলো।
অতিথিদের মাঝে একটা হাত দেখা যাচ্ছে।সাদা ফকফকে চামড়ার।লোকটা তৃপ্তি করে খাবার খাচ্ছে।গলায় বিধে যাওয়ার দরুন পানি দিয়ে গিলে নিচ্ছে ভাতের দলা।অথচ খাচ্ছে,মাথাটা নোয়ানো,বাদামী রঙের চুলগুলো দেখা যাচ্ছে তার,আর? আর খেয়াল করলেই দেখা যাচ্ছে একজোড়া নীল রঙের চোখ জোড়া থেকে টুপ করে গড়িয়ে পড়া অশ্রু মিশে যাচ্ছে মাংসের ঝোলে মাখা গরম ভাতের সাথে।
নিস্পা খেয়াল করলো,হ্যাঁ ঘরের জানালা দিয়ে উঁকি দিতেই খেয়াল করলো এই দৃশ্য।তার অস্থির নয়ন জোড়া এই লোকটাকে চিনে ফেললো এক ঝটকায়।কাল রাতে এসে দাপট দেখানো দাপুটে,বেপরোয়া পুরুষ আজ শান্ত,ঠিক ঝড় আসার আগে পরিবেশ যেমন শান্ত থাকে তেমনই শান্ত তার আচরণ।
নিস্পার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় কিছু একটার সংকেত দিলো।সে দ্রুত উঠে দাড়ালো বিছানা থেকে।বুকের ধড়পড়ানি ক্রমশই বাড়ছে তার, ওই মানুষটার সামনে না দাঁড়ানো অব্দি এই ধড়পড়ানি থামবে না কিছুতেই।সে দরজার খুলে বেড়োলো ঘর থেকে,উঠানের অন্যপাশ ঘুরে সকলের নজরের আড়ালে গিয়ে দেখা করতে হবে জোসেফের সাথে,নয়তো গঞ্জবাসি যদি টের পায় মানুষটাকে হত্যা না করা অব্দি শান্ত হবে না।
যেই ভাবা সেই কাজ,শাড়ির আঁচল টা মাথায় টেনে নিস্পা বেড়িয়ে গেলো উঠানের দক্ষিণ দিক দিয়ে।চুপিচুপি বড়জোর চার কদম এগোলো সে,তার মাঝেই পথ রুখে দাড়ালো এক নারীমূর্তি।ফ্যাকাসে চোখ,চুপসানো মুখ,প্রানহীন ঠোঁট পুরোটাই যেন একটা মৃত মানুষ দাঁড়িয়ে আছে নিস্পার সামনে।নিস্পা থমকায়,অবরুদ্ধ হয় তার পথ।বিষাধের ভারে থরথর কেঁপে উঠে তার বুক।গভীর রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে মানুষ যেমন ধরপড়িয়ে উঠে ঠিক তেমন করেই রক্তের উচ্চচাপ বাড়ে নিস্পার, রুদ্ধশ্বাস কন্ঠে অস্পষ্ট আওড়ায়,
“ফ্লোরেন্সা।”
“আমাকে চিনিস দেখছি।অবশ্য চেনারই কথা,আমার পরিচয় ব্যাবহার করে আমার সবকিছুই যে কেড়ে নিয়েছিস তুই।”
ঠান্ডা কন্ঠের কঠিন কথাগুলো শুনেই শুখনো ঢোক গিললো নিস্পা,সচেতন দৃষ্টিতে এদিক ওদিক তাকিয়ে ফ্লোরেন্সার সন্যিকটে এগিয়ে এলো নিস্পা, বিস্মিত কন্ঠে বললো,
“তুমি?তুমি এখানে কি করছো?”
“কেন?খুশি হোস নি নাকি?এসে কি খুব বড় অপরাধ করে ফেলেছি নাকি?”
নিস্পা অস্থির হয়ে চারদিকে চোখ বোলায় পুনরায়,উৎকন্ঠিত স্বরে বলে,
“আমি যানি তুমি আমার উপর রেগে আছো,রেগে থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু এই মূহুর্ত আর এই সময়টা অস্বাভাবিক। তুমি দ্রুত এখান থেকে চলে যাও।তোমার আইরিশ ভাই দেখলে রেগে যাবে।”
ফ্লোরেন্সা রাগে আক্রোশে ফেটে পড়ে,ক্ষিপ্ত হয়ে দু’হাতে চেপে ধরে নিস্পার গলা,চেচিয়ে বলে,
“আমার আইরিশ ভাই হ্যাঁ আমার আইরিশ ভাই।তুই নিয়ে গিয়েছিস।আমার আইরিশ ভাই যে আমায় ছোট্ট থেকে ভালোবাসে তাকে তুই কেড়ে নিয়েছিস।কেন করলি?কি শত্রুতা তোর আমার সাথে?কে তুই বহুরূপী?”
বিদ্যুৎস্পষ্টের ন্যায় ছলকে উঠে নিস্পা,বোধশক্তি লোপ পায় কিছু মূহুর্তের জন্য, ফ্লোরেন্সার হাত থেকে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য খামচে ধরে ফ্লোরেন্সার হাত,করুন সুরে হ্যাসহ্যাসিয়ে বলে,
“ভুল বুঝছো,ভুল বুঝছো তুমি আমায়।তোমার আইরিশ ভাই,,,”
“হ্যাঁ আমার আইরিশ ভাই নিজ জবানে আমাকে অস্বীকার করেছে,আমি বোকা, আমি সহজ সরল, এজন্য, এজন্য আমাকে অস্বীকার করেছে।আর কতকাল সরল থাকবো আমি?”
⭕আর মাত্র তিন হাজার শব্দ বাকি।একশো রেসপন্স পেলে দশটার মধ্যেই দিয়ে দিবো।লিখাই আছে শুধু ফেসবুক এলাউ করলো না বলে দিতে পারলাম না।⭕
চলবে,,,,,

