হিপনোটাইজ #তাজনিন_তায়্যিবা পর্ব:12

0
35

#হিপনোটাইজ
#তাজনিন_তায়্যিবা
পর্ব:12
⭕পূনর্জন্ম বা টাইম ট্রাবল কোন ধর্মে গ্রহনযোগ্য
___________________________________________ নয়,এটি কেবল রুপকথার উপমা।
_______________________________⭕

দূর্বিষহ যন্ত্রণায় গোটা একটি রাত কেটে গিয়েছে ফ্লোরেন্সার। মস্তিষ্ক সচল হতেই মনে পড়ে গিয়েছে তার করা জঘন্যতম ব্যাবহারের কথা। কি করে করলো সে?এই কাজ তার দ্বারা কি করে হলো? কি করে এতো কঠিন কথা তার আব্বুজানকে বলতে পারলো সে? কি করে প্রত্যাখ্যান করলো আইরিশ ভাইয়ের ভালোবাসাকে।

চিৎকার করে কাদছে ফ্লোরেন্সা, ছোট থেকে এই অব্দি কখনো পরিবার পরিজন থেকে দূরে থাকে নি সে, আর সে মেয়ে কিনা নিজ ইচ্ছেতে পরিবার, পরিজন, কাছের মানুষ গুলো ছেড়ে এতো দূর চলে এসেছে।এটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না ফ্লোরেন্সা, হাত পা ছুড়ে বাচ্চাদের মতো কাদছে সে,

“এই পরি বোন কাঁদছো কেনো তুমি?কেঁদো না দয়া করে, এই মহলে বন্দিনীদের কাঁদা নিষেধ, খুব শাস্তি পেতে হয়।” অনুনয়ের স্বরে কথাটা বললো নাবহা।

ফ্লোরেন্সার কান্না থামে না, হেচকি তুলতে তুলতে বললো,
“আমাকে আমার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে এসো, আমি ওদের ছাড়া কি করে থাকবো? প্রিন্সকে ডেকে পাঠাও একটিবার, আমি ওনাকে অনুরোধ করবো।”

“কি বলো বোন?কাকে অনুরোধ করার কথা বলছো তুমি?ওই জালিম প্রিন্স তোমার অনুরোধ কখনোই রাখবে না।
এই যে আমাকে দেখছো? আমার বাবা মায়ের খুব আদরের ছিলাম আমি, কিন্তু ওই প্রিন্স আমাকে সম্মোহন করে এই মহলে নিয়ে এসেছে, সেই যে এলাম আর নিস্তার পেলাম না। কত অনুরোধ করেছি যানো?কত কেদেছি, আমিও না তোমার মতো জানতাম না এই মহলে কান্না করা নিষিদ্ধ, এই মহলে কান্না করলে কঠিন শাস্তি পেতে হয়।ওরা আমাকে খুব মারতো জানো?আমাকে কত দিন কিছু খেতে দেয় নি, পা বেধে উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখতো।শাস্তি সহ্য করতে না পেরে মরতেও চেয়েছিলাম, কিন্তু সেটাও আমার ভাগ্যে নেই, এই মহলের প্রতিটি বন্দিনীর ভাগ্য প্রিন্স জোসেফ নিজ হাতে লিখেন, তার অনুমতি ছাড়া মৃত্যুও অসম্ভব।” আহত কন্ঠে নিজের কথা গুলো বলতে বলতে দু ফোটা অশ্রু বিসর্জন দিলো নাবহা। তড়িত দু হাতে মুছেও নিলো সেই অশ্রুকনা।

ফ্লোরেন্সা থ মেরে বসে আছে প্রেমিক পুরুষের এমন নির্মমতার পরিচয় পেয়ে। থমকে গেলো তার হৃদস্পন্দন। আচমকা জড়িয়ে ধরলো নাবহা কে, কাদতে কাদতে বললো,

“তুমি মিথ্যা বলছো তাই না?আমার সাথে কীসের স্বার্থে মিথ্যাচার করছো তুমি?”

“তোমাকে মিথ্যা বলে আমার লাভ কোথায় শুনি?আমি তোমাকে সম্পূর্ণ সত্যি কথা বলছি।ওই প্রিন্স কারো ভালোবাসার যোগ্য হতে পারে না,উনি একটা জালিম, নিষ্ঠুর,হৃদয়হীনা এক শয়তান।অশুভ শক্তির প্রতিক।”

” কি বলছো তুমি এসব?তার মানে কি, উনি আমাকেও সম্মোহন করেছে?আমি স্ব জ্ঞানে উনাকে ভালোবাসিনি?তবে সব ছিলো সম্মোহনের ঘোর?”

“তোমার কি মনে হয় পরি বোন? তোমার মতো মেয়ে কি করে এমন জালিম প্রিন্সকে ভালোবাসতে পারে, এ সমস্তটাই সম্মোহনের প্রভাব।”

ফ্লোরেন্সা উন্মাদের মতো কান্না করতে করতে নিজের গলায় পড়ে থাকা কালো কুচকুচে পাথর টি এগিয়ে ধরলো নাবহার সামনে,

“তবে এটা কি ছিলো? এটাও কি তবে ভালোবাসার উপহার নয়?”

পাথর টা দেখা মাত্রই আঁতকে উঠল নাবহা, কাঁপা হস্তে ছুয়ে দেখলো পাথর টা, তারপর এক টানে ছিড়ে নিয়ে ছুড়ে ফেললো অদূরে,

“এই পাথর টি কালো জাদুর অংশ, তোমাকে প্রিন্স কালো জাদু করেছে পরিবোন।”

আঁতকে উঠল ফ্লোরেন্সা, এবার যেনো বাধ ভাঙলো কান্নারা, গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে ডাকতে শুরু করলো জোসেফকে,

“প্রতারক, মিথাবাদী, জালিম পুরুষ কোথায় আপনি?কেনো করলেন আমার সাথে এমন? কি অন্যায় করেছি আমি? কেনো আমার কোমলতা এভাবে ধ্বংস করে দিলেন। কোথায় আপনি,আমাকে যেতে দিন, আমি থাকবো না আপনার বন্দিনী হয়ে, আমাকে মুক্তি দিন, আমার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিন।”

হাতের কাছে যা পাচ্ছে বন্ধ দরজার দিকে ছুড়ে মারছে ফ্লোরেন্সা, নাবহা বাধা প্রয়োগ করেও ব্যার্থ হচ্ছে, ফ্লোরেন্সা শোকে যেনো পাগলপ্রায় হয়ে গিয়েছে। হাতের কাছে সর্বশেষ একটি পিতলের গ্লাস পেয়ে ছুড়ে মারলো কারুকার্যের নকশা খচিত দুই পাল্লা বিশিষ্ট দরজার দিকে, ঠিক সেই সময় হাট করে খুলে গেলো দরজা,ছুড়ে মারা পিতলের গ্লাস টি সোজা গিয়ে আঘাত করলো জোসেফের কপালে।

নাবহা আতংকে হাত চেপে ধরলো মুখে, কিঞ্চিৎ কেঁটে গিয়েছে জোসেফের ফর্সা কপাল। জোসেফ দুই চোখ বন্ধ করে খুলে নিলো সেকেন্ডের গতিতে।প্রতিক্রিয়া বিহীন এগিয়ে গেলো ফ্লোরেন্সার কাছে।ফ্লোরেন্সা থেমে নেই, ছুটে এসে খামচে ধরলো জোসেফের বুকের উপরের সুট,চেচিয়ে উঠলো ক্রোধিত কন্ঠে,

“প্রতারক, আপনি আমার সাথে প্রতারণা করেছেন, আমি আপনাকে ভালোইবাসি নি, আপনি সম্মোহন করেছেন আমাকে। ওই কালো পাথর টা আপনার ভালোবাসার উপহার ছিলো না, কালো জাদুর অংশ ছিলো। কেনো করলেন এমন, আমাকে কেনো আমার আপনজনদের বিরুদ্ধে বিষিয়ে দিলেন।”

ফ্লোরেন্সার কান্না বিরক্ত ঠেকছে জোসেফের নিকট।সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে রাগের বহ্নিশিখা।
ফ্লোরেন্সার কথা থামতেই দুই আঙুলের ভাজে চেপে রাখা সিগারেটের ধোঁয়া টেনে নিলো ঠোঁটের ভাজে, তারপর দু ঠোঁট গোল করে সিগারেটের কুন্ডলী পাকানো ধোয়া উড়িয়ে দিলো ফ্লোরেন্সার মুখের উপর, ধোয়ার ঝাজালো গন্ধে কাশতে শুরু করলো ফ্লোরেন্সা।শ্বাসকষ্টে লাল হয়ে এলো কান্নারত চোখ,ফ্লোরেন্সার এমন যন্ত্রনায় পৈশাচিক আনন্দ পেলো জোসেফ।

নিজের হাতে থাকা জ্বলন্ত সিগারেট চেপে ধরলো ফ্লোরেন্সার উদরে।জ্বলন্ত উল্কার ছেকা পেতেই, যন্ত্রণায় চেচিয়ে উঠলো ফ্লোরেন্সা, তৎক্ষনাৎ জোসেফ নিজের আরেকহাতে চেপে ধরলো ফ্লোরেন্সার গলা, প্রতিক্রিয়া বিহীন শান্ত এবং ভয়ংকর কন্ঠে বললো,

“এই মহলে আমার অনুমতি ব্যাতিত কান্না নিষেধ ব্লু ব্লাড গার্ল।আমার আম্মিজান আমার কাছে সবচেয়ে সুন্দরী দাসি উপহার চেয়েছেন। আমি তার যথাযোগ্য সন্তান, তার উপহার হিসেবে তোমাকে নির্বাচন করেছি।আজ থেকে তুমি আমার আম্মিজানের খাস দাসি।”

যন্ত্রণায় নীল হয়ে গিয়েছে ফ্লোরেন্সার ফর্সা মুখ, নিঃশ্বাস আটকে গিয়েছে কণ্ঠনালীতে, জ্বলন্ত সিগারেটের উল্কা তখন ফ্লোরেন্সার জামা পুড়ে গিয়ে নাভিপদ্মের পাশে গভীর লাল ক্ষত সৃষ্টি করেছে।অসহনীয় যন্ত্রণায় চোখ খুলে রাখা সম্ভব হলো না আর,

“আমি কারো দাসি হতে পারবো না” কথাটা বার কয়েক বিরবির করতে করতে জোসেফের বুকে ঢলে পড়লো ফ্লোরেন্সা।জোসেফ এক হাতে চেপে ধরলো ফ্লোরেন্সার শীর্ন শরীর।বিরবির করে বললো,

“তুমিই প্রথম এবং ভাগ্যবতী কন্যা, যাকে বুকে রেখে জোসেফ প্রশান্তি অনুভব করছে অথচ নাম না যানা বিষক্রিয়ায় জ্বলন ধরেছে হৃৎপিন্ডে, এই অযাচিত অনুভুতির কারন কি ব্লু ব্লাড গার্ল?”

◾◾◾◾◾◾◾◾◾◾

নিজ কক্ষে বসে বিশ্রাম নিচ্ছে ক্যাথরিন মেরি। তার সেবায় নিয়জিত দুজন দাসি, দুজনের মধ্যে একজন নাবহা, আরেকজন শাকিলা। নাবহা ক্যাথরিন মেরির পা টিপে দিচ্ছে আর শাকিলা তার নিপুণ কৌশলে ক্যাথরিনের মাথা টিপে দিচ্ছে।

ক্যাথরিনের অনুমতি ব্যাতিত ঘরে প্রবেশ করলো জোসেফ।জোসেফ এর উপস্থিতি তে তড়িঘড়ি উঠে দাড়ালো নাবহা এবং শাকিলা, মাথা নতজানু করে দাড়ালো জোসেফের সামনে। জোসেফ সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করলো না, শান্ত কন্ঠে ডেকে বসলো,

“আম্মিজান।”

জোসেফের ডাক শুনেই ফট করে চোখ খুলে নিলো ক্যাথরিন।টানা এক মাস সময় পর পুত্রের দেখা মিললো, অথচ তার চোখে খুশির চিহ্ন অব্দি নেই।তবে বিরক্তিতে অন্ধকার নেমেছে মুখে,

“তোমাকে কতবার বলবো জোসেফ? আম্মিজান বলে যখন তখন পুত্রের অধিকার দেখাতে ঘরে ঢুকে পড়বে না, বিষয় টা আমার কাছে অপছন্দের।”
কর্কষ কন্ঠে জোসেফের উদ্দেশ্যে কথা গুলো বলে উঠলো ক্যাথরিন।

জোসেফ চোয়াল শক্ত করে উত্তর দিলো,
” সে অপছন্দের কারণ টা কি সুধুই আমি আপনার নিজের রক্তসুত্রিয় সন্তান নই বলে?”

ক্যাথরিন দাম্ভিক কন্ঠে বললো,
“যদি বলি কারনটা তাই, অন্যকারো সন্তানকে নিজের সন্তান বলতে ঘৃনা হয় আমার।”

“অথচ আমি আপনাকে আম্মিজান বলতে একটুও কৃপনতা করি না।”

“সেটা সম্পূর্ণ তোমার ইচ্ছে জোসেফ, তবে আমি কিছুতেই তোমাকে নিজের সন্তান হিসেবে স্বীকার করবো না।তুমি এক নর্তকির সন্তান,জন্মের ওই তো ঠিক নেই”

জোসেফ রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে তেড়ে এসে গলা চেপে ধরলো ক্যাথরিনের।চোখে মুখে তার অগ্নিস্ফুলিঙ্গ, ক্রোধের দাবানলে সবকিছু ধ্বংস করার পয়তারা তার,

” ইচ্ছে করলে আমি আপনাকে সম্মোহন করে নিতে পারি আম্মিজান। ভেবে দেখুন তো কেমন হবে লর্ড মাউন্টের দ্বিতীয় রানি প্রিন্সের কথায় উঠবে আর বসবে।আমি তা করছি না কেনো যানেন?কারন আমি মায়ের ভালোনাসা চাই, যে ভালোবসা জন্মের পর আমার ভাগ্যে জোটে নি সেই ভালোবাসা পেতে চাই। আফসোস আপনি আমার মা হওয়ারই যোগ্য হয়ে উঠতে পারছেন না।”

ক্যাথরিনের দম বন্ধ হয়ে এসেছিলো প্রায়,চোখ দুটো উল্টে নিয়ে হাসপাস শুরু করেছে, জোসেফ ছেড়ে দিলো নিজের হাতের বাধন, আহত কন্ঠে বললো,

“একটু ভালোবেসে দেখুন, যেই হাতে আপনার গলা টিপে ধরেছি সেই হাতে পুরো দুনিয়াটা আপনার পায়ের কাছে হাজির করবো।”

ক্যাথরিন ঘনঘন নিশ্বাস নিচ্ছে, হাফাচ্ছে অনবরত,

“এখান থেকে চলে যাও জোসেফ, এই কাজটা তুমি মোটেও ঠিক করলে না।”

“আমার ঠিক কাজগুলো যখন আপনার বেঠিক লাগে তখন বেঠিক কাজটা কেনো ঠিক ভাবে গ্রহণ করতে পারলেন না আম্মিজান।”

“চুপ করো জোসেফ তোমার একটা কথাও শুনতে ইচ্ছে করছে না আমার।”

জোসেফ ব্যঙ্গ হাসলো,বেড়িয়ে যেতে যেতে বললো,
“অযোগ্য মা, এই জোসেফ আপনার যোগ্য সন্তান আপনার পছন্দের উপহার আদায় করতে নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে মৃত্যুকে বরন করে ফিরেছে।”

“আমার সম্মোহনী দুটো চোখ ঝলসে দেওয়ার মতো এক সুন্দরী কন্যাকে আপনার খাস দাসি হিসেবে নিয়ে এসেছে সে।”

কথাগুলো বলে গটগট পায়ে বেড়িয়ে গেলো জোসেফ।ক্যাথরিন দাতে দাত চেপে বিরবির করে বললো,
“তাও তো মরলে না,মৃত্যুর জন্যই তো এমন অসাধ্য উপহার চেয়েছিলাম, অথচ তুমি ঠিকই বেচে ফিরলে।”
বিরক্তিতে “চ” সূচক শব্দ বের করলো ক্যাথরিন।

______________________

ফ্লোরেন্সার জ্ঞান ফিরে এসেছে মাত্রই, পোড়া যায়গাটায় ভিষণ জ্বালা করছে তার। শিয়রে বসে আছে নাবহা।ফ্লোরেন্সার জ্ঞান ফেরার সাথে সাথেই হাত থামালো সে, এতোক্ষণ ধরে পোড়া যায়গাটায় বরপ লাগাচ্ছিলো সে। ফ্লোরেন্সাকে উঠতে দেখে অস্থির কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো নাবহা,

“তুমি ঠিক আছো পরি বোন?জ্বালা কমেছে?”

ফ্লোরেন্সা হেচকি তুলে কেদে উঠলো আবার,
“পোড়া অংশে বরপের প্রলেপ দিচ্ছো, কিন্তু আমার ভেতরটা? সেখানটা যে পুড়ে যাচ্ছে, সেই জ্বালা কিসের প্রলেপ দিয়ে কমানো যাবে বোন?”

“সহ্য করে নেও, এটা তোমার ভাগ্য, স্বয়ং প্রিন্স লিখে দিয়েছে, এই ভাগ্য খন্ডন করার শক্তি তোমার নেই।”

উঠে দাড়ালো নাবহা, কিছু খাবার এনেছে ফ্লোরেন্সার জন্য,
“কিছু খেয়ে নেও বোন, একটু পর কাজে নিয়জিত হতে হবে, রানি ক্যাথরিন ডেকে পাঠালো বলে।”

ফ্লোরেন্সা আঁতকে উঠল,
“অসম্ভব, আমি কিছুতেই কারো দাসি হতে পারবো না।”

তাদের কথার মাঝেই ঘরে প্রবেশ করলো আরো দুজন দাসি, তাদেরকে মূলত ক্যাথরিন পাঠিয়েছে ফ্লোরেন্সাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য,

“ফ্লোরেন্সা দ্রুত চলুন আপনাকে রানী ক্যাথরিন ডেকে পাঠিয়েছে।”

ফ্লোরেন্সা আপত্তি জানালো,
“আমি কোত্থাও যাবো না, আমি কারো দাসি হতে পারবো না। ”

দাসি দুজন একে অপরের মুখ চাওয়া চায়ি করলো অত:পর দুজনে এগিয়ে গেলো ফ্লোরেন্সার নিকট, দু দিক থেকে দুজন চেপে ধরলো ফ্লোরেন্সার দু বাহু, ফ্লোরেন্সা জোরাজোরি করতে শুরু করলো,
“আপনারা আমাকে এভাবে কেনো ধরেছেন? যেতে দিন আমায়, আমি কোত্থাও যাবো না।”

ফ্লোরেন্সার কথা শোনার অপেক্ষায় নেই কেউ,দুজনেই এক প্রকার টানতে টানতে নিয়ে গেলো ফ্লোরেন্সাকে।

___________________

ক্যাথরিনের চোখ ঝলসে যাওয়ার উপক্রম।এমন সুন্দরী কন্যা তার এই দুচোখ প্রথম দেখলো হয়তো। একি কোন মানবকন্যা নাকি আকাশ থেকে নেমে আসা কোন পরি?নাকি বাগান থেকে তুলে আনা সদ্য ফোটা গোলাপ নাকি পদ্ম সরবার থেকে তুলে আনা পদ্মফুল?ক্যাথরিন ভেবে পায় না এই মেয়ের সৌন্দর্যকে কিসের সাথে তুলনা করলে স্বার্থক হবে।এ সৌন্দর্য যে অতুলনীয়, অপার্থিব, সকল বর্ননার ঊর্ধ্বে।

মহলের কারো চোখ এড়ালো না ফ্লোরেন্সার এমন রুপ। সবার মুখে মুখে ফ্লোরেন্সার রুপের গুঞ্জন। ক্যাথরিনের মনে জন্ম দিলো হিংসার। সে সহ্য করতে পারলো না ফ্লোরেন্সার এমন চোখ ধাদানো রুপের প্রশংসা। ফ্লোরেন্সা তার সাথে হাটলে লোকে তাকে নয় বরং ফ্লোরেন্সাকেই রানী হিসেবে আখ্যা দিবে, এটা সে কিছুতেই মানতে পারবে না। হিংসার বশবর্তী হয়ে ক্যাথরিন এক ভয়ংকর সিদ্ধান্তে উপনীত হলো, সে ঠিক করলো ফ্লোরেন্সার মুখ ঝলসে দিবে,এমন ভাবে ঝলসে দিবে যেনো প্রশংসার বদলে সবাই ঘৃনা করে।

ক্যাথরিনের এমন সীদ্ধান্ত বাতাসের গতিতে ছড়িয়ে গেলো পুরো মহলে।জোসেফের কানে পৌছাতেও বাদ গেলো না সে খবর।

ফ্লোরেন্সা চিৎকার করে কাদছে, তাকে বেধে রাখা হয়েছে, তত্ত্বাবধানে রেখে গিয়েছে নাবহা কে। ফ্লোরেন্সার চিৎকারে কাদছে নাবহা, আফসোসের স্বরে বলে,
“কেনো এতো সুন্দর হতে গেলে তুমি?এমন সুন্দর না হলে তো এই যন্ত্রণা পেতে হতো না তোমায়?আমার যদি ক্ষমতা থাকতো তোমায় বাচিঁয়ে নিতাম পরি বোন।”

ডুকরে কেঁদে উঠলো ফ্লোরেন্সা,
“আমার বাবা এই সৌন্দর্য আল্লাহ তায়ালার রহমত বলেছিলো অথচ সেই সৌন্দর্য আজ আমার জীবনে অভিশাপ হয়ে বর্ষিত হলো।”

নাবহা ভেজা কন্ঠে বললো,
“তোমাকে এই অবস্থায় দেখে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে পরি বোন, তোমার ভয়ংকর পরিনতির কথা ভাবলেই গায়ে কাটা দিয়ে উঠছে।”

“ভয় করো না বোন, আমি আল্লাহ কে বিশ্বাস করি, তিনি আমাকে এই সৌন্দর্য দান করেছেন, এই সৌন্দর্য রক্ষা করার মালিক তিনি।”

___________________

ফ্লোরেন্সার মুখ পুড়িয়ে দেওয়ার জন্য এক বিশেষ তরল তৈরি করা হয়েছে। রানি ক্যাথরিন সেই তরল নিয়ে উপস্থিত হয়েছে ফ্লোরেন্সার কাছে।ফ্লোরেন্সা অনুনয় করলো না একটুও, শান্ত কঠিন কন্ঠে বললো,

“শেষ পর্যন্ত একজন সামান্য দাসির সৌন্দর্যকে হিংসে করলেন স্বয়ং ব্রিটিশ রানী?কি হাস্যকর ব্যাপার।”
ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো ফ্লোরেন্সা।ফ্লোরেন্সার কটুক্তি গায়ে ফোসকা পড়ার মতোই অনুভব হলো ক্যাথরিনের,

“নিজেকে সংযত করে কথা বলো মেয়ে, নইলে রুপের সাথে গলার স্বরও হারাবে চিরদিনের মতো।”

ফ্লোরেন্সার মনে ভয় ডর কিছু নেই, চোখে নেই এক ফোটা আতংকের চিহ্ন, নিজের ভাগ্যকে বরন করে নিয়েছে সে, উপর ওয়ালার প্রতি রয়েছে অগাধ ভরসা।কন্ঠ অনড় রেখে আবার বললো,

“আমি ভয় ডর সব খুইয়েছি যখন নিজের পরিবারের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছি। আমার কিছু হারানোর ভয় নেই। আপনি নির্দিধায় আমার সবকিছু কেড়ে নিতে পারেন।তবে যেনে রাখবেন আমি বাঙালি কন্যা, যদি একবার কেড়ে নেওয়ার সুযোগ পাই তবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সর্বস্ব কেড়ে নিবো।”

ফ্লোরেন্সার এমন জবাবে রাগে কেপে উঠলো ক্যাথরিনের শরীর।তৎক্ষনাৎ ফ্লোরেন্সার মুখে তরল নিক্ষেপ কড়ার আদেশ ছুড়লো,

“শাকিলা ঝলসে দেও এই মেয়ের রুপ, ভেঙে গুড়িয়ে দেও এই মেয়ের অহংকার।”

ক্যাথরিনের আদেশ পাওয়া মাত্রই শাকিলা কার্য সম্পাদনের জন্য উদ্যত হলো।ঠিক তখনই বাতাসের সাথে ভেসে এলো এক গম্ভীর কন্ঠ,
“ফ্লোরেন্সার গায়ে একটা আঁচড় যেনো না লাগে আম্মিজান।”

সিগারেটের ধোঁয়া উড়াতে উড়াতে এগিয়ে এলো প্রিন্স জোসেফ। প্রিন্স জোসেফ কে দেখা মাত্রই মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে গেলো শাকিলা।জোসেফ নিজ হস্তে খোলা শুরু করলো ফ্লোরেন্সার বাধন।ফ্লোরেন্সার মুখে রা নেই পাথরের মতো অশ্রুসিক্ত চোখে তাকিয়ে রইলো কেবল।
ফ্লোরেন্সাকে মুক্ত করে এক হাতে তার কোমড় চেপে ধরলো জোসেফ।গম্ভীর কন্ঠে বললো,
“আমার আম্মিজানের সাথে উঁচু গলায় কথা বলার স্পর্ধা দ্বিতীয় বার দেখাবে না।”

ক্যাথরিন রাগ ফুসলো, রাগান্বিত কন্ঠে বললো,
“আমার কাজে বাধা প্রয়োগ করার অধিকার কোথায় পেলে জোসেফ? আমার দাসির সাথে আমি যা ইচ্ছে তাই করবো।”

জোসেফ আরেকটু চেপে ধরলো ফ্লোরেন্সাকে, গমগমে কন্ঠে জবাব দিলো,
“এই মেয়েটা আমার সম্পত্তি আম্মিজান,আপনাকে ধার দেওয়া হয়েছে হস্তান্তর করা হয়নি। আমার সম্পত্তির উপর অধিকার খাটানোর অধিকার আমি আপনাকেও দেই নি। এই মেয়েকে আঘাত করার অধিকার একমাত্র আমার।”

ফ্লোরেন্সার অস্বস্তি হচ্ছে, গা জ্বালা করছে, বুকের ব্যাথা বাড়ছে এই জালিম প্রতারকের সংস্পর্শ পেয়ে,ছটপট করতে করতে কর্কষ কন্ঠে বললো,

“ছাড়ুন আমাকে, জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ভস্ম করে দিন তবুও আপনার নোংরা হাতে আমাকে স্পর্শ করবেন না।”

জোসেফ বাকা হাসলো, হাতের জ্বলন্ত সিগারেট একইভাবে চেপে ধরলো ফ্লোরেন্সার উদরে,শান্ত কন্ঠে বললো,

“শুনো ব্লু ব্লাড গার্ল,
এই রক্তাক্ত হৃদয়ে তুমি নীল রঙা এক যন্ত্রণা,
মহাপ্রলয় হলে হোক তোমাকে আমি ছাড়ছি না।”

চলবে,,,,,,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here