#হিপনোটাইজ
#তাজনিন_তায়্যিবা
পর্ব:14
⭕পূনর্জন্ম বা টাইম ট্রাবল কোন ধর্মে গ্রহনযোগ্য
___________________________________________ নয়,এটি কেবল রুপকথার উপমা।
_______________________________⭕
সূর্যের প্রখর তেজ আগুনের মতো ঝলসে দিচ্ছে পৃথিবীর বুক। আকাশের নীলিমা ধু-ধু করে জ্বলছে, বাতাসে একফোঁটাও শীতলতা নেই। চারপাশে ধুলো আর তাপের ভারে নিস্তব্ধ প্রকৃতি।মৃদু হাওয়ায় গাছের পাতা নড়লেও সেই হাওয়ায় স্বস্তি নেই, শুধু তপ্ত বাষ্পের ছোঁয়া।
শরীর ঘামে ভিজে একেবারে ক্লান্ত, গ্রীষ্মের ভ্যাপসা গরমে হারিয়ে যাচ্ছে শক্তি।
প্রকৃতির রুক্ষতার সাথে পাল্লা দিয়ে পাল্টেছে ভোজন সভার স্বকীয়তা।থমথমে গুমোট পরিবেশে দাঁড়িয়ে ঝিমোচ্ছে ফ্লোরেন্সা, যেনো এক পা এদিক ওদিক হলেই গর্দান যাবে তার।মেয়েটার কম্পিত ঠোঁট আর রুগ্ন দৃষ্টিতে প্রতিফলিত ভয়ের ছাপ স্পষ্ট প্রকাশ করে দিচ্ছে এই মূহুর্তে তার ধরাশায়ী অবস্থা।
ক্যাথরিন মেরির রক্তা’ভ চোখে হিংস্রতার প্লাবন,ভেতরের ক্রোধ বিস্ফোরিত হবে বলে, মুষ্টিবদ্ধ হাত সংযম হারিয়েছে ইতমধ্যে,রাজকিয় টেবিলের উপর সাজিয়ে রাখা অভিজাত খাবারের থালাটা ছুড়ে ফেললো মেঝেতে।শ্বাস গাঢ় করে অগ্নিময় কন্ঠে চেচিয়ে উঠলো,
“এই তোমার দাসী জোসেফ?আমার খাবার টা একেবারে নষ্ট করে ফেলেছে।”
জোসেফ প্রতিক্রিয়া বিহীন একটি পানির গ্লাসে চুমুক দিলো, তারপর আবারো নিজের মতো করে খাওয়া শুরু করলো মনযোগ দিয়ে,যেনো এখানে তেমন কিছুই হয় নি।
ক্যাথরিন বেশ ক্ষেপলো এবার,তাকালো লর্ড মাউন্টের দিকে,
“জোসেফের সাথে সাথে কি আপনিও মুখে কুলুপ এঁটেছেন? কিছু বলবেন না এই দাসী কে?আমার খাবার নষ্ট করার অপরাধের শাস্তি কি দেওয়া হবে না তাহলে?”
লর্ড মাউন্ট খাওয়া স্থগিত করলেন,তাকালেন জোসেফের দিকে। জোসেফ ভাবলেশহীন খাবার খাচ্ছে।লর্ড মাউন্ট গম্ভীর কণ্ঠে আদেশ ছুড়লেন,
“এই দাসী কে এক্ষুনি এখান থেকে নিয়ে যাও,পাঁচশ চাবুকের ঘা মারার নির্দেশ জারি করা হলো এই দাসীর উপর।”
লর্ড মাউন্টের আদেশ পাওয়া মাত্রই কয়েক জন সৈন্য ছুটে এলো, যেনো তারা সুযোগের অপেক্ষাতেই থাকে, ফ্লোরেন্সার পবিত্রতা ছুয়ে দেওয়ার লালশায় তারা সুযোগ সন্ধানী।
তিন চারজন সৈন্যকে এগিয়ে আসতে দেখেই জীর্ণশীর্ণ মেয়েটা ভয়ে গুটিয়ে গেলো আরেকটু।ভীত নয়ন তুলে তাকালো প্রিন্স জোসেফের দিকে, কেনো যানি মনে হলো এই একমাত্র ব্যাক্তি, যে তাকে সুরক্ষা দিতে পারবে।অথচ প্রিন্স জোসেফের উদাসীনতা দেখেই ভীত নয়ন জুড়ে তৈরি হলো ঘৃনার সরোবার,স্বচ্ছ চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো সে সরোবারের অস্বচ্ছ জল।
এদিকে সৈন্যরা তার নৈকট্যে,কয়েকটা নোংরা হাতের অশুভ ছোয়া তার গায়ে লাগলো বলে।ফ্লোরেন্সা ঠোঁট কামড়ে কেঁদে উঠলো,রুগ্ন কন্ঠে চেচিয়ে উঠলো জোসেফকে উদ্দেশ্য করে,
“চুপ করে থাকবেন আপনি? আমাকে এতোগুলা অশরীরির হাত স্পর্শ করার জন্য ধেয়ে আসতে দেখেও চুপ করে থাকবেন?প্রয়োজনে আমাকে মেরে ফেলুন কিন্তু আমার পবিত্রতাতে দাগ লাগতে দিবেন না দয়া করে।”
প্রিন্স জোসেফ শুনলো কিনা বুঝা গেলো না, তার শান্ত নিরব অভিব্যক্তি কেমন খাপছাড়া,যেনো আশেপাশের কোন কিছুতেই ধ্যান নেই তার, খাবারের শেষ অংশ টুকু মুখে দিলো একই ভঙিতে।
ফ্লোরেন্সা আবার চেচিয়ে উঠলো,
“আপনাকে ভালোবাসার অপরাধে নিজের মনকে কলঙ্কিত করেছিলাম।আজ বুঝি সেই অপরাধে আমার শরীর টাও কলঙ্কিত হতে চলেছে?”
প্রিন্স জোসেফের হাত থমকালো,বড় বড় নিঃশ্বাস ফেললো কয়েকবার, এক জোড়া অনূভুতি শুন্য শিকারি চোখ নিক্ষেপ করলো ফ্লোরেন্সার দিকে।কন্ঠ চড়াও করে আদেশ ছুড়লো,
“দাড়াও।”
তৎক্ষনাৎ দাঁড়িয়ে গেলো সৈন্যরা,অনুমতি ব্যাতিত ফ্লোরেন্সাকে স্পর্শ করার সাহস তাদের নেই।
জোসেফের পাল্টা আদেশে বিব্রত হলো লর্ড মাউন্ট,একটু বিব্রতকর কন্ঠেই বললো,
“শাস্তি কি কম হয়েছে জোসেফ?”
জোসেফ উত্তর দিলো না, তার ব্যাক্তিত্বের সাথে কৈফিয়ত দেওয়ার বিষয় টা একেবারেই বেমানান।সে যেই হোক না কেনো,নিজের কাজের কৈফিয়ত দিতে সে বাধ্য নয়।
প্রিন্স জোসেফ উঠে গিয়ে দাড়ালো ফ্লোরেন্সার কাছে,ভরা ভোজন সভায় দাঁড়িয়ে,সবার দৃষ্টিকে উপেক্ষা করে নিজের শীতল হাতটা লতার মতো পেচিয়ে নিলো ফ্লোরেন্সার কোমরে।ফ্লোরেন্সা দাতে দাত চেপে ধরলো,দুটো চোখ খিচে বন্ধ করে নিতেই গড়িয়ে পড়লো ভেজা চোখের অশ্রু।
প্রিন্স জোসেফের এহেন কার্যে ঈর্ষান্বীত হলো জুবাইদা।ফ্লোরেন্সার উপর চাপা রাগ প্রকাশিত হলো আচমকা,দাতে দাত চাপলো নিজেকে সামলাতে, কন্ঠে নমনীয়তা টেনে বললো,
“ক্ষমা করবেন প্রিন্স জোসেফ, আপনার এমন কর্মকান্ড বরাবরের মতোই আমাকে ব্যাথিত করেছে। নিজের হবু স্ত্রীর সামনে পরনারীকে স্পর্শ করা কি আদৌও শোভনীয়?”
প্রিন্স জোসেফ চোয়াল শক্ত করলো,ঘুরে তাকালো জুবাইদার দিকে,চোখের রঙ রক্তা’ভ ধারণ করে বললো,
“হুশশ,,,ও পরনারী নয়,ও আমার হৃদয়ে সিলমোহর আঁকা প্রথম নারী।”
জুবাইদার মুখের উপর যথাযথ উত্তর দিয়ে বিলম্ব করলো না জোসেফ,এস্ত ঘুরে তাকালো ফ্লোরেন্সার খিচানো চোখের দিকে।মেয়েটার চোখের পানির দিকে তাকিয়ে নিম্ন ঠোঁট স্মিথ বাকালো জোসেফ, নিজের মুখটা ধিরে ধিরে এগিয়ে নিয়ে রাখলো ফ্লোরেন্সার উজ্জ্বল ফর্সা কানের কাছে, ফিসফিসিয়ে বললো,
“দুনিয়ায় সবার স্পর্শ অশরীরির আর আমার?আমার স্পর্শ কেমন লাগে ব্লু ব্লাড গার্ল?”
ফ্লোরেন্সা দাতে দাত পিষলো,ফোলালো নাকের ডগা,অগ্নি কন্ঠে বললো,
“আপনার স্পর্শ বিষাক্ত,আমার সর্বাঙ্গে বিষ ছড়িয়ে পড়ে, মৃত্যু যন্ত্রনা হয় আমার।”
প্রিন্স জোসেফ আরেকটু জোড়ালো করলো তার হাতের বাধন,কন্ঠে তীক্ষ্ণতা বজায় রেখে বললো,
“তাহলে তো তোমায় প্রতিদিনই মরতে হবে ব্লু ব্লাড গার্ল।”
জোসেফের চোখ রাঙানিতে জুবাইদা গুটিয়ে গেলেও,ক্যাথরিন চুপ থাকতে পারলো না একদম।রাগে হিসহিসিয়ে বললো,
“তোমার কর্মকান্ডে আমি অবাক না হয়ে পারছি না প্রিন্স, আমার তো মনে হচ্ছে তুমি এই মেয়েটাকে দাসী হিসেবে নয়, বরং মেয়েটার সাথে রঙ্গলীলার জন্য নিয়ে এসেছো।”
প্রিন্স জোসেফের রক্তা’ভ মুখবিরে ধরা দিলো ক্রোধের দাবানল,অথচ শীতল কন্ঠে বললো,
“প্রিন্স জোসেফের রঙ্গলীলার প্রয়োজন হলে এই মহলে সবার প্রথম বাইজী গৃহ তৈরি করা হতো আম্মিজান।প্রিন্স জোসেফের নিটোল হৃদয় আকর্ষণ করা কোন মেয়ের পক্ষেই সম্ভব নয়।”
জোসেফ ছেড়ে দাড়ালো ফ্লোরেন্সাকে, কঠোর কন্ঠে আদেশ করলো,
“খাবার গুলো সুন্দর করে থালায় তুলে নেও মেয়ে,আম্মিজানের সামনে পরিবেশন করো দ্রুত।”
ফ্লোরেন্সা হকচকালো, সেই সাথে কপাল কুচকালো ক্যাথরিনের,
“কি বলতে চাইছো জোসেফ? মেঝেতে পড়ে থাকা খাবার তুলে আমার সামনে পরিবেশন করার অর্থ কি?”
“অর্থ হলো আপনাকে আমি অভুক্ত থাকতে দিবো না আম্মিজান।”
জোসেফের অভিব্যাক্তিহীন উত্তরে বেজায় রেগে গেলো ক্যাথরিন,
“তুমি বড্ড বেশি বাড়াবাড়ি করছো জোসেফ।”
“কীসের বাড়াবাড়ি আম্মিজান?আমি তো কোন বাড়াবাড়ি দেখছি না।আপনি সকালেই বললেন এই মেয়েটা রান্না না করলে আপনি খেতে পারবেন না, সারাদিন অভুক্ত থাকবেন।মেয়েটা তো আপনার কথা মতো রান্না করেছে।এখন আপনার খাবার পালা,সেটা যেমনই হোক আপনাকে খেতেই হবে।আমি কথা দিয়েছি আপনার খাস দাসীই আপনার জন্য রান্না করবে,আবার এটাও কথা দিয়েছি আপনি অভুক্ত থাকবেন না।এখন আমার কথা তো আমাকে রাখতে হবে আম্মিজান।”
লর্ড মাউন্ট চোখ ছোট ছোট করে তাকালেন, তার বিচক্ষণ পুত্রের দিকে, তারপর মৃদু স্বরে বললেন,
“একটা বাঙালী মেয়ের জন্য মহলে কোন বিশৃঙ্খলা হোক আমি চাই না জোসেফ,নয়তো মেয়েটাকে মৃত্যুদন্ড দিতে বাধ্য হবো।”
“আপনার মতামত কে আমি শ্রদ্ধা জানাই আব্বুজান,তবে এই ব্যাপারে কথা না বললে আমি খুশি হবো।কারন আমি চাই না আমাদের মা পুত্রের মধ্যে অন্য কেউ কথা বলুক,এই মেয়েটা এখানে একজন দাসী, তার মানে সে দাসীই, তাকে আমি গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন দেখছি না।”
জোসেফের উত্তরে সন্তুষ্ট হলেন লর্ড মাউন্ট,প্রয়োজন ব্যাতিত আর একটি শব্দ অপচয় না করে ত্যাগ করলেন ভোজন সভা।
প্রিন্স জোসেফ ফ্লোরেন্সার দিকে তাকালো, খুব রুক্ষ স্বরে ধমকে উঠলো এবার,
“এই মেয়ে কথা কানে যায় নি?খাবার গুলো তুলে পরিবেশন করো দ্রুত।”
ফ্লোরেন্সা মাথা নাড়ালো, বাধ্য মেয়ের মতো বসে পড়লো মেঝেতে, ব্যাস্ত হাতে তুলতে শুরু করলো মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে থাকা খাবার গুলো।
_________________
খাঁন বাড়িতে শোকের মিছিল,আইরিশ নাওয়া খাওয়া বন্ধ করে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে গত কয়েকটা দিন।ফ্লোরেন্সার প্রত্যাখ্যান যতটা না কষ্ট দিয়েছে তার চেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েছে, ওই ব্রিটিশ পুত্রের হাতটা আঁকড়ে ধরাতে।
তার সময়টা যেনো সেখানেই আটকে গিয়েছে, সেই ভয়ংকর দৃশ্য ভেসে বেড়াচ্ছে চোখের সামনে, বুকটা পুড়ে যাচ্ছে অসহনীয় যন্ত্রণায়।
“আইরিশ ভাই, কিছু খেয়ে নিন না দয়া করে।” সুফির সুকন্ঠি স্বর কানে ভেসে আসতেই চোখ তুলে তাকালো আইরিশ।নিজেকে সামলে নিয়ে কন্ঠে গম্ভীরতা টেনে বললো,
“খাবার গুলো নিয়ে যা সুফি,আমি এগুলো খাবো না।”
সুফি এগিয়ে এলো দু কদম,চোখ তুলে তাকালো প্রিয় প্রেমিক পুরুষের দিকে,মানুষটার উজ্জ্বল চেহারা, শ্যাওলার মতোই অস্বচ্ছ ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছে। সময়ের গুমোট অন্ধকার যেন মানুষটার প্রাণশক্তি শুষে নিয়েছে।
ভালোবাসা আর আশায় পূর্ণ চোখের দৃষ্টিতে গভীর শূন্যতা,ধু ধু নিস্তব্ধতা। পুরো পরিবেশটাই যেন তার নিস্তব্ধতার ভারে চাপা পড়ে আছে, আর সেই নিস্তব্ধতার মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা জীবন্ত থেকেও যেন মৃত।
সুফি বৃদ্ধাঙুলের সাহায্যে মুছে নিলো চোখের অশ্রু,ভেজা কন্ঠে বললো,
“দোহাই আপনার নিজেকে এতো বেশি কষ্ট দিবেন না।”
“নিজেকে আর কি কষ্ট দেবো সুফি?আমার আলেকজান্দ্রা আমাকে যে কষ্ট দিয়েছে তার ভারই তো সামলে উঠতে পারছি না।”
“এভাবে বলবেন না আইরিশ ভাই,দোয়া করুন ফ্লোরেন্সার জন্য, একটা কথা সবসময় মনে রাখবেন,ভালোবাসা আমার না হলে অন্য কারো হোক তবুও সুখি হোক।ফ্লোরেন্সা তার ভালোবাসার মানুষের কাছে সুখে আছে, সেটা ভেবে আপনি নিজেকে সুখি করার চেষ্টা করুন।”
“কিন্তু আলেকজান্দ্রা তো সুখি নেই সুফি।ও আমাকে ভালো না বাসুক, আমি তো ওকে হৃদয়ের সবটা দিয়ে ভালোবেসেছি। আমার আত্মা ওকে অনুভব করে,আমার মনে হয় ও সুখে নেই, বরং বিপদে আছে।
বুকের মধ্যখানটায় আমার খুব যন্ত্রণা হয় সুফি, নিশ্চয়ই আমার আলেকজান্দ্রাও যন্ত্রণায় আছে।”
“আপনি অযথাই চিন্তা করছেন আইরিশ ভাই,ফ্লোরেন্সা নিশ্চয়ই ভালো আছে তার ভালোবাসার মানুষের কাছে।”
“তাই যেনো হয় সুফি, তবে আমি ভাবছি একবার ওই ব্রিটিশ মহলে যাবো, দু চোখে দেখে আসবো আমার আলেকজান্দ্রার সুখ।”
আইরিশের কথা শুনে আঁতকে উঠল সুফি,মুখে হাত চেপে বললো,
“কি বলছেন কি আইরিশ ভাই?ওই ব্রিটিশ মহলে কি করে যাবেন আপনি?”
আইরিশ নিস্পল তাকালো জানালা দিয়ে বাড়ির উঠোনের কোনে দাঁড়িয়ে থাকা বকুল গাছটার কাটা শেকড়ের দিকে, রহস্যময় কন্ঠে বললো,
“যেভাবে ওই ব্রিটিশ পুত্র আমাদের বাড়িতে এসেছে, সেভাবেই তার মহলে যাবো আ,,,,,,,”
কথার মাঝেই হুরমুড়িয়ে ঘরে প্রবেশ করলো ফুলমতি,আতংকিত কন্ঠে বললো,
“আব্বাজান আপনাকে ডেকে পাঠিয়েছে, মাজারের বড় বটগাছটায় আজ আরো দুটো লাশ পাওয়া গিয়েছে।”
____
“লাশ?” কথাটা উচ্চারণ করতে গিয়ে কেঁপে উঠলো নিস্পাপের কণ্ঠনালী।চোখে মুখে তার কৌতুহলের ছড়াছড়ি,দ্বিগুণ উদ্বেগ নিয়ে শুধালো ফের,
“প্রিন্স জোসেফ তো তার মহলে ছিলো, তাহলে গ্রামের নতুন লাশ কীভাবে এলো দিদা?তাহলে কি জোসেফ খুনি ছিলো না?তার নাম রটিয়ে অন্য কেউ খুন করতো?”
ফুলমতির মুখে অন্ধকার নামলো,খুব মনযোগ দিয়ে বানালো এক খিলু পান, তারপর মুখে দিতে দিতে বললো,
“কেমনে কমু রে বইন, সব রহস্য জানার আগেই তো সবাই মইরা গেলো।”
ফুলমতির কথা শুনে আঁতকে উঠল নিস্পাপ,
“সবাই মরে গেলো মানে?ফ্লোরেন্সা, প্রিন্স জোসেফ, তারপর আইরিশ ভাই সবার পরিনতি কি তবে অধরাই রয়ে গেলো?”
“পূর্ণতা পাইয়াও পায় নাই রে বইন, শেষ মুহুর্তে সব তছনছ হইয়া গেছিলো।একটা সুন্দর বিয়া বাড়ি পরিনত হইছিলো মৃত্যুপুরিতে।”
নিস্পাপের মনে জানার আগ্রহ বাড়লো আরো কয়েকগুন,
“কেনো দিদা?ফ্লোরেন্সা শেষ মেষ কাকে পেয়েছিলো?আইরিশ ভাই কি গিয়েছিলো সেই মহলে? ওই জালিমের হাত থেকে কি করে রক্ষা পেয়েছিলো ফ্লোরেন্সা? আর বিয়ে বাড়ি মানে? কার বিয়ে বাড়ি ছিলো? প্লিজ দিদা সবটা আমাকে বলো, আমার কেনো যানি ছটপট লাগছে।”
ফুলমতি পান চিবোতে চিবোতে এক গাল হাসলো, তারপর নির্ধারিত পাত্রে পানের পিক ফেলে বললো,
“কইতাছি বইন কইতাছি, তুই জুত কইরা বয়।ফ্লোরেন্সা চইল্লা যাওয়ার পর যহন আমাগো বাড়িতে একেবারে অন্ধকার নাইম্যা আইছিলো, ঠিক তহন,একদিন হটাৎ কইর আইরিশ ফ্লোরেন্সারে নিয়া বাড়িত ফিরা আসে।তার কিছু দিনের মইধ্যেই আইরিশের লগে ফ্লোরেন্সার বিয়া ঠিক হয়।”
“আর প্রিন্স জোসেফ?সে কি ফ্লোরেন্সাকে ভালোবাসতে পারে নি?ফ্লোরেন্সা কি প্রিন্স জোসেফের হৃদয় সম্মোহন করতে পারেনি?”
“তাতো হুনি নাই বইন,তয় কান কথা হুনছিলাম, ওই ব্রিটিশ পুত্র নাকি আমাগো বাড়ির সামনে আইয়া ফ্লোরেন্সার জন্য দাড়াইয়া থাকতো,আবার কহনো কহনো হুনছি ফ্লোরেন্সার লগে গোপনে দেখাও করতো,হুনছিলাম ওই বেটা নাকি ফ্লোরেন্সারে ভালোবাইসা ফালাইছিলো।”
নিস্পাপ নড়েচড়ে বসলো,নিজের দুই হাত বাড়িয়ে আগলে ধরলো ফুলমতির হাত,উৎকন্ঠা নিয়ে বললো,
“আর ফ্লোরেন্সা?সে কি আইরিশ ভাইকে ভালোবেসেছিলো?”
“কিজানি?ওই মাইয়াতো ছিলো একঘেয়ে স্বভাবের, জীবনেও কিছু মুখ ফুইট্টা কইতে চায় না।কিন্তু আমি মাইয়াডারে কানতে দেখতাম জানছ?মনে হইতো মাইয়াডাও মনে মনে ওই ব্রিটিশ পুত্র রে ভালা জানতো।”
“তাহলে বিয়েতে কোনো রাজি হলো দিদা?”
“কেমনে কইতাম বইন?হেয় কি আর হের গোপন কথা আমাগোরে কয়।”
“সব যখন ঠিকঠাক ছিলো তখন বিয়ে বাড়ি মৃত্যুপুরি কেনো হয়েছিলো দিদা?”
ফুলমতি চুপ করে গেলেন, তার চোখে মুখে খেলে গেলো রহস্য,চেহারার ধরন হয়ে উঠলো বিবর্ণ,চোখের কোনে ভির জমালো অশ্রুরা, ভেজা কন্ঠে বললো,
“তোর বাপ তহন আমার পেডে, কিছু মুখে দিতাম পারতাম না, খাওনের গন্ধ শুখলেই খালি গা গুলিয়া আইতো, মুখ ভইরা বোমি আইতো।সেদিন বিয়া বাড়িতে কত রকম খাওন রান্ধা হইছে। তেল মশলার গন্ধে আমি অনেক বোমি করলাম, খারাইয়া থাকতে না পাইরা অস্থির হইয়া শুইয়া পড়লাম নিজের ঘরে যাইয়া।কিছুক্ষনের মইধ্যেই চোখে মরন ঘুম লাইজ্ঞা আইলো।
কিন্তুক মরি নাইরে বইন,আমি ঘুম থিকা যহন উঠলাম , তহন আমার দুনিয়া আন্ধার হইয়া গেলো।বিয়া বাড়ির রমরমা পরিবেশ তহন আর নাই,তোর দাদা, বড়বাবা, চাচা, সবার নিথর শরীর পাইলাম একেক যায়গায়।ফ্লোরেন্সা, আইরিশ সবাই মইরা গেছিলো রে বইন,কেউ তাগো সবার খাবারে বিষ মিশিয়া খাওয়াইছিলো, ওই বিষের হাত থেকা কেউ রেহাই পায় নাই, বাড়ির উঠানটায় কেবল লাশ আর লাশ পইড়া ছিলো, বিয়া বাড়িতে নেমন্তন্ন আত্মিয় স্বজন গুলাও আর ফিরা যাইতে পারে নাই।সবাই লাশ হইয়া মাটির সাথে মিশা গেছিলো।”
ফুলমতির মুখে এমন নিসংস ঘটনা শুনতেই গায়ে কাটা দিয়ে উঠলো নিস্পাপের, সারা শরীরের লোমকূপ দাঁড়িয়ে গেলো, হাপড় হাপড় লাগলো নিঃশ্বাস।দ্রুত উঠে গিয়ে ঢকঢক করে এক গ্লাস পানি খেয়ে শান্ত করলো নিজেকে।তারপর আবার ফিরে এসে বসলো ফুলমতির সামনে, প্রশ্ন করলো,
“সবার খাবারে বিষ কে মিশিয়েছিলো দিদা?ওই ব্রিটিশ পুত্র প্রিন্স জোসেফ?”
“কেমনে কমু বইন?ওই ব্রিটিশ পুত্র তো সেইখানে একই বিষ খাইয়া মইরা আছিলো।একমাত্র আমি ছাড়া বিয়া বাড়ির একটা মানুষও বাইচ্চা আছিলো না।
থামলো ফুলমতি,শ্বাস নিয়ে বললো,
” একটা আশ্চর্যকর কথা কি যানছ?”
“কি দাদু?”
“ভালোবাসা সবার জীবনে এক না,ভালোবাসা কারো জীবনে বিষের চেয়েও যন্ত্রণার, এই যে ফ্লোরেন্সা, তারে দুইডা পুরুষ কত ভালোবাসছিলো, মৃত্যুর সময়ও দুইজনে দুই দিক দিয়া আগলাইয়া ধইরা রাখছিলো ফ্লোরেন্সার দুইডা হাত।”
“ওরা মইরা গিয়াও ভালোবাসার ভাগ ছাড়ে নাই।”
চলবে,,,,,,,,,,,,
‼️সবাই প্লিজ রেসপন্স করবেন, আমি রেসপন্স না পেলে৷ গল্প লেখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলি, গল্প লেখায় অনীহা চলে আসে‼️

