হিপনোটাইজ #তাজনিন_তায়্যিবা পর্ব:16

0
37

#হিপনোটাইজ
#তাজনিন_তায়্যিবা
পর্ব:16
⭕পূনর্জন্ম বা টাইম ট্রাবল কোন ধর্মে গ্রহনযোগ্য
___________________________________________ নয়,এটি কেবল রুপকথার উপমা।
_______________________________⭕

গোধূলির শেষ রঙ মুছে দিয়ে আকাশ ঢেকে গেলো আবছা অন্ধকারে, অন্ধকার আকাশে ছোপ ছোপ লালীমা আঁচর ধরনীকে সাজিয়েছে অতুলনীয় সৌন্দর্যের পরিপূরক হিসেবে।
সন্ধ্যা নামতেই নিস্পাপ দোকানের সাটার টেনেছে ব্যাস্ত উদ্যোগে।হাতে তার বাসি ফুলের বড়সড় একটা পলিথিন।চোখে দেখতে না পাড়ায়, ব্যাগটা নিয়ে হাঁটতে বেগ পোহাতে হলো খুব।মনে পড়ে গেলো আয়মানের কথা।লোকটা সেই যে উধাও হলো আর খোঁজ খবর পাওয়া গেলো না।আচ্ছা?আয়মান ঠিক আছে তো?ওই এমপি ওনার কোন ক্ষতি করে দিলো নাতো?যদি এমন কিছু হয়ে থাকে তবে নিস্পাপ ওই এমপি কে কিছুতেই ছাড়বে না।

ভাবনার মাঝেই নিস্পাপের হাতের ভারি পলিথিন টা হালকা অনুভব হলো,নিস্পা চমকালো কিছুটা, তড়িৎ জিজ্ঞেস করলো,

“কে? কে আমার পাশে?”

“আলেকজান্দ্রা।” উত্তরে ভেসে এলো তাকরিমের গম্ভীর ভরাট কন্ঠস্বর।

তাকরিমের কন্ঠ এক ঝটকায় চিনে ফেললো নিস্পাপ,দাতে দাত চেপে বললো,

“আপনি? আপনি আমার পেছনে কেনো পড়ে আছেন বলুনতো? আপনার সাথে আমার কি সম্পর্ক?”

“আমাদের জন্ম জন্মান্তরের সম্পর্ক আলেকজান্দ্রা,আমরা নিঃশ্বেস হয়েও নিঃশ্বাস নিচ্ছি,আমাদের মৃত্যু আমাদেরকে আরো একটি সুযোগ দিয়েছে।”

“কীসব আজগুবি কথা বলছেন আপনি? জন্ম, মৃত্যু,সুযোগ মানে কি এগুলোর?কীসের সুযোগের কথা বলছেন আপনি? ”

“পূর্নতা।আমাদের অসমাপ্ত কাব্যের ইতি টানতে হবে আলেকজান্দ্রা।”

নিস্পাপ বিরক্ত হলো এবার,
“দেখুন,আপনি কি বলছেন কিচ্ছু বুঝতে পারছি না আমি।ইতি টানতে হয় টানুন গিয়ে,কিন্তু আমার পিছু ছাড়ুন,আমাকে এসবের মধ্যে টানবেন না।”

“যদি বলি তুমিই সেই কলম, যার মাধ্যামে কাব্য তার ছন্দ পাবে,
মৃত্যু দিয়ে সূচিত, এক অলিখিত পূনর্জন্ম স্বার্থক হবে।”

চাপা বিরক্তিতে চোয়াল শক্ত হলো নিস্পার,প্রচন্ড ক্রোধিত কন্ঠে বললো,

“আমার মনে হচ্ছে আপনার মাথায় সমস্যা আছে, নয়তো এসব আজগুবি কথা আমাকে বলতে আসতেন না।”

“ফ্রিতে একটা এডভাইস দেই শুনুন,দেশের এমপি হিসেবে আপনার মতো একজন বেহায়া মানসিক বিকারগস্ত মানুষ কে সোভা পায় না, তার চেয়ে বরং মানসিক হাসপাতালে গিয়ে ভর্তি হন,অন্তত অল্প বয়সে মাথা টা হারাতে হবে না।”

তাকরিম বিব্রত হলো না একটু,দুই ঠোঁট এলিয়ে দিয়ে বললো,
“তোমার সরলতার চেয়ে তোমার তেজ মারাত্মক আলেকজান্দ্রা,আমি তোমার এই রুপে নতুন করে মুগ্ধ হলাম।”

রাগে নিস্পা গজগজিয়ে উঠলো,
“এনাফ, অনেক সহ্য করেছি আপনার বকবক।আমার কাছে ঠিক কি চান সেটা ক্লিয়ার করে বলুন।”

“আমার একটা প্রশ্নের উত্তর চাই আলেকজান্দ্রা।”বলল তাকরিম।

ফ্লোরেন্সা দাতে দাত চেপে বড় নিঃশ্বাস ছাড়লো, বিরক্তি কন্ঠে বললো,
“কি প্রশ্ন বলুন, তাড়াতাড়ি।”

তাকরিম ছোট দম নিলো, তাকালো লালীমা আকাশের দিকে, যেটা এখন পুরোপুরি অন্ধকারে ঢেকে গিয়েছে,শুন্য চোখে তাও তাকিয়ে রইলো সেদিকে, নিস্প্রান কন্ঠের মিলন ঘটিয়ে বললো,

“সবই তো ঠিক ছিলো, তবে খাবারে বিষ কে দিয়েছিলো আলেকজান্দ্রা?কেনো রমরমা পরিবেশ পরিনত হয়েছিলো মৃত্যু পুরিতে?”

তাকরিমের কথার আগা মাথা কিছুই বুঝলো না নিস্পাপ,তাজ্জব হয়ে চুপ করে রইলো কিছুক্ষন, তারপর গজগজিয়ে বললো,

“আপনার মাথা পুরোটা শেষ,আপনি যদি দ্বিতীয় বার এসব আজগুবি প্রশ্ন করেছেন তো?আমি কিন্তু আপনাকে সত্যি সত্যি বিষ খাইয়ে দিবো।”

কথাটা বলে এক দন্ড দাড়ালো না নিস্পাপ,অগত্যা দিক দিশা পর্যবেক্ষন না করেই, হাঁটা শুরু করে বললো,

“একদম পিছু নিবেন না সাবধান।”

অথচ অন্ধ মেয়েটা টের ও পেলো না, জেদের বসে সে মেইন রোডে পা বাড়িয়ে বসে আছে।দু দিক থেকে দুটো বড় গাড়ি ধেয়ে আসছে তাকে পিষে দেওয়ার জন্য।
নিস্পাপ দেখতে না পেলেও তাকরিম ঠিকই দেখতে পেলো ,বাজপাখির মতো ধেয়ে আসা দুটো গাড়িকে।নিস্পাপের বিপদ আঁচ করতে পেরেই হৃৎপিন্ডের গতি বেগতিক হারে বাড়লো তার,ছুটে গিয়ে আগলে নিতে চাইলো নিজের আলেকজান্দ্রা কে।কিন্তু তার আগেই নিস্পাপের বাহু ধরে টান বসালো অনুরিকা, রাগচটা কন্ঠে বললো,

“কি করছিলি কি নিস্পাপ?একটু হলে তো চাপা পড়তি।ভাগ্যিস আমি সময় মতো এলাম।”

নিস্পাপের বুক উঠানামা করছে, চোখে দেখতে না পাড়লেও বিপদের আভাস পেয়েছে স্পষ্ট।ঘনঘন ঢোক গিলে বললো,

“আমি,,আমি,,আসলে,,,

” তুমি না আসলেও আমার আলেকজান্দ্রার কিছুই হতো না মেয়ে,তাকে হেফাজত করার জন্য আমি ছিলাম।”

তাকরিমের ভরাট কন্ঠ পেয়ে তড়িৎ ফিরে তাকালো অনুরিকা,তাকরিমের পরিচিত মুখ দেখতে পেয়েই ছুড়ে দিলো ঝাজালো কথার বান,

“আপনি?এখানো নিস্পার পিছনে পড়ে আছেন?তাইতো বলি নিস্পার মতো সচেতন একটা মেয়ে কি করে না বুঝে মেইন রোডে পা বাড়ালো।এখন তো দেখছি শনির দশা তার পিছনেই লেগে আছে।মেয়েটার আর কি করার।” ফোস করে নিঃশ্বাস ছাড়লো অনুরিকা।

অপরদিকে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো তাকরিম,রাগে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে বললো,

“নিজের চরকায় তেল দেও মেয়ে,আমার কাজের কৈফিয়ত চাইতে এলে সোজা পৃথিবী থেকে গায়েব করে দিবো।”

“কেনো?আপনি ম্যাজিশিয়ান নাকি?”

“যদি বলি এক অতৃপ্ত আত্মা,যে কিনা আলেকজান্দ্রা কে নিজের করে পাওয়ার জন্য মৃত্যুকে জয় করেছে।”

“তবে জেনে রাখুন, আমি দোয়া কালাম জানি, আপনার মতো অনেক প্রেত আত্মাকে বোতলে বন্দী করে সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে এসেছি।”

“তবে তো তাই করতে হবে দেখছি,আমার আর আলেকজান্দ্রার মাঝখানে আসার অপরাধে তোমার লাশটা সোজা নদিতেই ভাসিয়ে দিবো কি বলো?”

অনুরিকার মুখটা চুপসে গেলো তৎক্ষনাৎ, একটু কাচুমাচু করে বললো,

“ভয় দেখাচ্ছেন?”

“হুমকি দিচ্ছি।” তাকরিমের দাপটিয় উত্তরে ভ্যাবাচেকা খেলো মেয়েটা।আগ বাড়িয়ে মুখের উপর উত্তর দেওয়ার আগেই নিস্পাপকে উদ্দেশ্য করে আবারও বলে উঠলো তাকরিম,

“শুনো আলেকজান্দ্রা, আমি কেড়ে নিবো না, তবে তোমার ভালোবাসার ভাগ কাউকে দিবো না।ওই প্রিন্স জোসেফ কেও না।”

“আমি দোয়া করি মানুষ রুপে নয়, কোন শঙ্খচীল বা কাশফুলের বেশে জোসেফ আসুক,
চোখ ভরে দেখুক, আমার আলেকজান্দ্রার অপূর্ণ তিথির একখন্ড সুখ।”

অনুরিকা তাজ্জব হয়ে চেয়ে রইলো তাকরিমের দিকে,পরপর চিমটি কাটলো নিস্পাপ কে, ফিসফিস করে বললো,

“হ্যাঁ রে,এই বেটা আলেকজান্দ্রা বলে কাকে।”

নিস্পাপ চাপা স্বরে ফিসফিসিয়ে উত্তর দিলো,

“আরে বাল, আমাকে ছাড়া আর কাকে বলবে।”

“বইন এটা তো দেখি পাবনা থেকে পালিয়ে আসা রোগী, এরে এমপি কে বানাইলো?”

“বাপের ক্ষমতা বুঝিস না, ক্ষমতার জোড়ে পাগল ছাগলও মন্ত্রি মিনিস্টার হয়ে বসে থাকে।”

নিস্পাপের ফিসফিসানি কানে না আসলেও, মেয়েটার সাথে এতো বেশি ঘনিষ্ঠতা সহ্য হলো না তাকরিমের,একটু শক্ত কন্ঠে ডেকে উঠলো,

“আমি তোমাকে কিছু বলেছি আলেকজান্দ্রা।”

আলেকজান্দ্রা নামটা শুনতেই বিরক্তিতে দাত কিরমির করে উঠলো নিস্পাপ,প্রচন্ড ক্ষোভে কর্কষ কন্ঠে চেচিয়ে উঠলো,

“এই এই, আর একবার আলেকজান্দ্রা বলে ডাকলে ঝাটা মারবো বলে দিলাম।”

_______________

নিজের কাউচের উপর ভাবলেশহীন বসে আছে ত্রিজয়,চোখে মুখে নিস্পৃহ ভাব।কিছু একটা নিয়ে গভীর ধ্যানে ডুবে আছে অথচ প্রতিক্রিয়া ফুটে উঠছে না চেহারায়।একের পর এক সিগারেট ধরাচ্ছে আর ধোঁয়া উড়িয়ে যাচ্ছে নির্বিঘ্নে।

পাশেই বিরক্তিভরে নাক কুচকে দাঁড়িয়ে আছে ইভান। তার ভ্রু কুঁচকে আছে, চোখে ধরা দিয়েছে বিরক্তির ছাপ। প্রায় এক ঘণ্টা হতে চললো, অথচ ত্রিজয় একইভাবে নিশ্চল বসে আছে,চোখে সেই একই নিস্পৃহ দৃষ্টি, হাতে ধরা আরেকটি সিগারেটের ধোঁয়া ধীরগতিতে মিশে যাচ্ছে বাতাসে। ইভান অধৈর্য হয়ে একবার পা চালিয়ে আবার থেমে যায়, অথচ ত্রিজয় তাকে কোনো প্রতিক্রিয়া জানানোর প্রয়োজনই মনে করছে না।এক প্রকার অধৈর্য হয়েই কণ্ঠনালীর মিলন ঘটালো মৃদু সুর তুলে,

“স্যার কিছু অন্তত বলুন,এমপি কিন্তু অলরেডি আমাদের গোপন স্পাইকে মেরে ফেলেছে। অথচ আমরা এখনো কিছুই করতে পারলেন না।”

ত্রিজয় সিগারেট টানা বন্ধ করলো, ভাজ হয়ে বসলো চেয়ারে,শান্ত অভিব্যক্তি বজায় রেখে ধিরে ধিরে গ্লাসে ওয়াইন ঢালতে শুরু করলো,রাশভারি কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

“লাশটা কোথায়?”

ইভান নড়েচড়ে দাড়ালো, একটু ভীতি কন্ঠে বললো,

“স্যার শুধু কাটা মাথাটাই পাঠিয়েছে,শরীরটা পাওয়া যায় নি।”

ত্রিজয় এবারেও প্রতিক্রিয়া বিহীন, ওয়াইনের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে বললো,

“পাথর টার কি খবর?”

“স্যার পাথরটা এমপি মশাই একটা মেয়ের হাতে পড়িয়ে দিয়েছেন।মেয়েটির ফুলের দোকানের সামনের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গিয়েছে, ওই এমপি মেয়েটার আশেপাশে জোকের মতো লেগে থাকে, ইনফেক্ট মেয়েটার জন্য একটা ছেলেকে আটক করে টর্চার চালাচ্ছে গত কয়েকদিন যাবৎ।”

“মেয়েটা কে?”

“মনে তো হচ্ছে এমপির স্পেশাল কেউ।”

ইভানের কথায় বাকা হাসলো ত্রিজয়, ওয়াইনের গ্লাসে শেষ চুমুক টুকু দিয়ে বললো,

“তার মানে আমার জন্যেও মেয়েটা স্পেশাল।”

“বুঝলাম না স্যার।”

“মেয়েটার মাথা চাই আমার।”

“স্যার আপ,,,”

হাত উচিয়ে থামিয়ে দিলো ত্রিজয়, শান্ত কন্ঠে বললো,

“আমি সন্দেহ করছি এই মেয়েটাই সে, যার পেটে পোড়া দাগ থাকার কথা।যাকে এমপি এবং আমি দুজনেই খুজছি।”

“মানে স্যার? এমপি খুজছে বুঝলাম কিন্তু আপনি কেনো খুজছেন?”

“কারন আমি অনেক আগেই জানতে পেরেছি পোড়া দাগ চিহ্নিত মেয়েটা এমপি মশাইয়ের দূর্বলতা হবে।আর এমপির দূর্বলতা মানে আমার দাবার মূখ্যম গুটি।”

__________________

ড্রইং রুমের একপাশের দরজা টা হালকা লাগোয়া,দমকা হাওয়ার দাপাদাপি তে উড়ছে জানালার পর্দাগুলো,আকাশের অবস্থা ভালো নয়,ঝড় বৃষ্টির প্রবণতা বাড়িয়েছে কালো রঙের ভাসমান মেঘ গুলো।নিস্পাপ রেডি হয়েছিলো দোকানে যাওয়ার উদ্দেশ্যে, কিন্তু ঝড় তুফানের আসনী সংকেত ইজ্ঞিত করতে পেরে ফুলমতি আর বেড়োতে দেয় নি তাকে।

অনুরিকাও যেতে পারে নি ভার্সিটি।বাড়ির তিন তিনজন সদস্য আজ প্রথমবারের মতোই একসাথে এক ছাদের নিচে উপস্থিত সারাদিনের জন্য।প্রকৃতি তাদেরকে আটকে দিয়েছে, হয়তো কোন এক বিশেষ কারণ নয়তো বা প্রকৃতির আপন ইচ্ছে।

ফুলমতি নিজের ঘরে খিল এটেছে প্রায় অনেকক্ষন হলো,দমকা হাওয়ার সাথে গুড়ি গুটি বৃষ্টি পড়া শুরু হয়েছে প্রবল বেগে।বিছানায় কাত হয়ে শুয়ে আছে নিস্পাপ।কানের কাছে ছোট্ট বাটম ফোনটায় পুরোনো দিনের গান বাজছে মৃদু সুর তুলে।সেই সুরের সাথে বিরবির করে তাল মিলাচ্ছে সে।

অনুরিকা রান্নাঘরে চিপস ছেড়েছে গরম তেলে।তেলের ছ্যাৎ ছ্যাৎ শব্দ আর বৃষ্টির রিনিঝিনি গুঞ্জনের সাথে মিলে মিশে কেমন একটা আলাদা শব্দ তৈরি করেছে।

পুরো পরিবেশ শান্ত শীতল।আবহাওয়া মন ভুলানো।স্বাভাবিক শান্ত পরিবেশ টা হটাৎ করেই অস্বাভাবিক হয়ে এলো, যখন কাক ভেজা হয়ে ঘরে প্রবেশ করলো ত্রিজয় তেজ।
অনুরিকার তখন চিপস ভাজা শেষ।চিপসের বাটি হাতে নিয়ে রান্নাঘর থেকে বেড় হতেই, শরীর ঝাঁকুনি দিলো, চোখের সামনে ল’ইয়ার ত্রিজয় কে দেখেই রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে এলো তৎক্ষনাৎ।

ত্রিজয় ভাবলেশহীন এসে বসলো সোফার উপর,বুকের উপর দুই হাত ভাজ করে,পাশে এসে দাড়ালো ইভান।

অনুরিকা তেড়ে এলো,আঙুল তাক করে ত্রিজয়ের উদ্দেশ্যে বললো,

“জানোয়ার তুই আমার বাড়ি পর্যন্ত চলে এসেছিস?তোর সাহস কি করে হলো?”

ত্রিজয় সিগারেটের ধোঁয়া উড়ালো নিজ কৌশলে, তীক্ষ্ণ নজর বুলালো অনুরিকার তাক করা আঙুল বরাবর।তারপর আচমকাই মুচড়ে ধরলো আঙুল টা, আঙুলের পিঠে জ্বলজ্বল করতে থাকা আলেকজান্দ্রা আন্টি টির দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললো,

“এই টাই সেই পাথর টা ইভান?”

ইভানের কন্ঠে ব্যাস্ততা, তাড়াহুড়ো করে বললো,

“পাথর টা এইটাই কিন্তু মেয়েটা ভিন্ন।সিসিটিভি ফুটেজে অন্য মেয়ে ছিলো।”

আংটির কথা তুলতেই কপাল কুচকালো অনুরিকা,চোখ ছোট ছোট করে তাকালো আংটি টির দিকে, তার মাথায় আসছে না এই আংটি টার পেছনে রহস্য টা কি, তখন ভার্সিটির ওই মেয়েটা আর এখন এই জানোয়ার লোকটাও এই আংটির পেছনে পড়েছে।নিশ্চয়ই এটা কোন মহামূল্যবান সম্পদ যেটা কিনা সবাই হাতিয়ে নিতে চাইছে।

“আংটির মেইন মালিক কোথায়?”

ত্রিজয়ের প্রশ্নে ধ্যান ছুটলো অনুরিকার,রাগে গজগজ করতে করতে বললো,

“এই আংটির মালিক আমিই,আর এই আংটির পেছনে কেনো পড়ে আছেন আপনারা?এই আংটি আমি কাউকে দিবো না বলে দিলাম,আমি এক্ষুনি পুলিশ ফোন করবো ।”

অনুরিকার কথায় বাঁকা হাসলো ত্রিজয়, বৃদ্ধাঙুল দ্বারা কপাল চুলকে বললো,

“আংটি টা নয়, এই পাথরটার আসল মালিককে চাই আমার।”

অনুরিকার চোখে মুখে ফুটে উঠলো কৌতুহল,বিস্মিত কন্ঠে তেজ এনে বললো,

“কি বলতে চাইছেন আপনি? এই পাথরে আছে টা কি?”

“এই পাথরে কি আছে স্যার সেটা যানতে ইচ্ছুক নয়, কিন্তু এমপি তাওসিফ তাকরিম যেহেতু পাথরটা কাউকে দিয়েছে, সেহেতু সেই মানুষ টা নিশ্চয়ই এমপি মশাইয়ের স্পেশাল কেউ।”

অনুরিকা অবাকের চরম পর্যায়ে, এমপি তাওসিফ তাকরিমের কথা শুনতেই মুখ হা হয়ে গেলো আপনা আপনি,অদ্ভুত ভাবে তাকালো হাতের আংটিটির দিকে,হতভম্ব হয়ে বললো,

“কি বললেন?এই আংটিটা নিস্পাকে এমপি তাওসিফ তাকরিম দিয়েছে?”

“নিস্পাপ?” অস্ফুটে শব্দ করলো ত্রিজয়।কন্ঠ চওড়া করে বললো,
“নিস্পাপ কোথায়?”

“কেনো? কি দরকার ওকে?”

“তুলে নিয়ে যাবো।” ত্রিজয়ের ছোট্ট সহজ স্বীকারোক্তি ।

অথচ তেঁতে উঠলো অনুরিকা,

“অসম্ভব, নিস্পাকে তুলে নিয়ে যাবেন মানে?মামা বাড়ির আবদার পেয়েছেন নাকি?”

ত্রিজয় স্মিথ ঠোঁট বাকালো,শান্ত অভিব্যক্তিতে উচ্চারণ করলো,
“ইভান।”

ত্রিজয়ের ডাক পাওয়া মাত্রই দাঁত কেলিয়ে হাঁসলো ইভান,খুবই দূর্ততার সাথে পকেট থেকে বেড় করলো একটি রিভালবার।
রিভালবার টা দেখা মাত্রই বেশ ভয় পেলো অনুরিকা,তবে ভয়টুকু প্রকাশ করতে চাইলো না এই মূহুর্তে।শুখনো ঢোক গিলে, ঝাঝালো কন্ঠে বললো,

“ওকালতি ছেড়ে দিয়ে সন্ত্রাস গিরী করা শুরু করেছেন নাকি?”

ত্রিজয় বিরক্ত হলো, অস্ফুট “চ” সূচক শব্দ বের করে বললো,
“মেয়েটার মুখটা বেশি চলছে ইভান।মুখটা বন্ধ করে দিই কি বলো?”

ইভান মুচকি হাসলো, রিভালবার টা দিয়ে কপালের কার্নিশ টা চুলকে বললো,

“আপনার তো এটা বা হাতের খেল স্যার।”

ত্রিজয় উঠে দাড়ালো, অনুরিকা ভরকে গেলো তৎক্ষনাৎ, ক্রোধিত দৃষ্টিতে তাকালো ত্রিজয়ের দিকে।তাকালো তো তাকালোই,ওই চোখের দৃষ্টি নামাতে সক্ষম হলো না এক বিন্দু।থমকে যেতে বাধ্য হলো ত্রিজয়ের নীল নেত্রমনির গহ্বরে।ত্রিজয় শান্ত শীতল ভয়ংকর টোনে জিজ্ঞেস করলো,

“নিস্পাপ কোথায়?”

প্রানহীন অনুভুতি শুন্য অনুরিকা চোখের পল্লব অব্দি ঝাপটালো না, যন্ত্রমানবের মতো দেখিয়ে দিলো নিস্পাপের ঘর।

ত্রিজয় তার ঠান্ডা হাত রাখলো অনুরিকার গালে,অস্পষ্ট ভাবে বললো,

“গুড গার্ল।”

তারপর বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে গেলো নিস্পাপের ঘরের দিকে।নিস্পাপ তখন গানের সাথে তাল মিলিয়ে সুর তুলেছে আপন মনে,

“আমার একলা আকাশ থমকে গেছে রাতের স্রোতে ভেসে
শুধু তোমায় ভালবেসে
আমার দিনগুলো সব রঙ চিনেছে তোমার কাছে এসে
শুধু তোমায় ভালবেসে
তুমি চোখ মেললেই ফুল ফুটেছে আমার ছাদে এসে
ভোরের শিশির ঠোঁট ছুঁয়ে যায় তোমায় ভালবেসে

আমার ক্লান্ত মন,ঘর খুঁজেছে যখন
আমি চাইতাম পেতে চাইতাম শুধু তোমার টেলিফোন
ঘর ভরা দুপুর
আমার একলা থাকার সুর
রোদ গাইতো,আমি ভাবতাম তুমি কোথায় কতদূর
আমার বেসুর গীটার সুর বেঁধেছে তোমার কাছে এসে
শুধু তোমায় ভালবেসে
আমার একলা আকাশ চাঁদ চিনেছে তোমার হাসি হেসে
শুধু তোমায় ভালবেসে,,,,,

নিস্পাপের সুকন্ঠি স্বরের সাথে প্রথম পরিচয় হলো ত্রিজয়ের, অথচ মনে হলো এ পরিচয় প্রথম নয়, বরং জন্ম জন্মান্তরের পরিচয়।
যে মেয়েটির গলা কাটার জন্য এতো বন্দবস্ত, সেই মেয়েটার গলার স্বরে মুগ্ধ হয়ে থমকে গেলো নীলাদ্রি পুরুষের বিষাক্ত হৃদয়।

চলবে,,,,,,,,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here