#ফালাক #লেখিকা_ইনায়া_জারিশ
#পর্ব______১০
বিয়ের সেই রাতের পর কেটে গেছে কয়েক দিন। মির্জা ভিলা এখন কিছুটা শান্ত। নতুন দুই বউ—নিজেদের গুছিয়ে নিতে শুরু করেছে। আত্মীয়স্বজনরা একে একে বিদায় নিচ্ছেন, বাড়ির হইচই কমে আসছে। সাদ এই কয়েক দিনে প্রায় বাড়িছাড়া। মাঝে মাঝে গভীর রাতে ফেরে, আবার সকালে কারো সাথে কথা না বলে বেরিয়ে যায়।
______
রাত তখন প্রায় একটা। মির্জা ভিলার বাকি সবাই আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু ফালাকের চোখে আজ ঘুম নেই। ঘরের এক কোণে ল্যাম্প জ্বালিয়ে বসে নিপুণ হাতে নকশিকাঁথা সেলাই করছে।
সুঁই-সুতোর এই খেলা ফালাকের খুব প্রিয়। যখনই মন অস্থির থাকে, সে কাপড়ের ওপর সুতোর ফোঁড় দিয়ে নিজের কষ্টগুলো বুনে ফেলার চেষ্টা করে। লাল-নীল-সবুজ সুতোর আঁচড়ে সাদা জমিনে এক মায়াবী নকশা ফুটে উঠছে। ফালাক এতটাই মগ্ন ছিল যে, ঘরের দরজা খোলার শব্দটাও প্রথমে খেয়াল করেনি।
সাদ ঘরে ঢুকেছে। প্রতিদিনের মতো আজ তার মধ্যে বিধ্বংসী মেজাজটা যেন উধাও। ধীরপায়ে আলমারির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আয়নায় ফালাকের প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছে—ল্যাম্পের আলোয় মেয়েটিকে আজ কোনো এক প্রাচীন শিল্পীর মতো দেখাচ্ছে। সাদ কোনো কথা বলল না, কোনো চিৎকার করল না। শুধু ঘড়ি আর মানিব্যাগটা ড্রয়ারে রেখে চুপচাপ বিছানায় শুয়ে পড়ল।
সাদের এই অস্বাভাবিক নীরবতা ফালাককে কিছুটা অবাক করল। কাজটা থামিয়ে আড়চোখে সাদের দিকে তাকায়। লোকটা আজ কেমন যেন কুঁকড়ে শুয়ে আছে। ফালাক দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুঁই-সুতো গুছিয়ে রাখে। তারপর ল্যাম্পটা নিভিয়ে বিছানার এক পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ল।
মাঝখানের দূরত্বটা পাহাড়ের মতো অটল। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই ফালাক অনুভব করল, বিছানাটা কাঁপছে। একটা মৃদু শব্দ আসছে সাদের দিক থেকে—যেন কেউ দাঁতে দাঁত চেপে কোনো যন্ত্রণা সহ্য করার চেষ্টা করছে।
ফালাক অন্ধকারেই ইশারায় বোঝার চেষ্টা করল। সাদ থরথর করে কাঁপছে। তার বলিষ্ঠ শরীরটা চাদরের নিচে যেন একটা শুকনো পাতার মতো কাঁপছে। ফালাকের মনে হলো সাদের নিশ্বাসটা অনেক ভারী হয়ে আসছে।ফালাক দোটানায় পড়ে গেল।
বিবেকের দংশনে শেষ পর্যন্ত ফালাক নিজেকে আটকে রাখতে পারল না। সন্তর্পণে সাদের কপালের ওপর হাত রাখল। হাত ছোঁয়াতেই সে শিউরে উঠল।
“ওরে বাবা! এ তো দেখি গা পুড়ে যাচ্ছে!”
সাদের গায়ের তাপমাত্রা আগুনের মতো তপ্ত। জ্বরের তীব্রতায় সাদ কাঁপছে।
ফালাক ধড়ফড় করে বিছানা থেকে নামল। আলমারি থেকে আরও একটা ভারী কম্বল বের করে সে সাদের ওপর দিয়ে দিল। কিন্তু তাতেও কাঁপুনি থামছে না। ফালাক বাথরুমে গিয়ে একটা কাপড় আর জল নিয়ে এল।, এই প্রবল জ্বরে জলপট্টি না দিলে সাদের বিপদ হতে পারে।
অন্ধকার ঘরে সাদের মাথার কাছে বসে ফালাক কাপড় টা ভিজিয়ে কপালে জলপট্টি দিতে শুরু করে।
ফালাক স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। তার চোখে জল। কেন যেন সাদের এই অবস্থা ফালাকের খুবই যন্ত্রনা হচ্ছে।
সারারাত জলপট্টি দিলো ফালাক। সাদের শিয়রে বসেই রাত কাটালো।
_____
ভোরের এক চিলতে মিঠে রোদ জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে চুইয়ে এসে সাদের মুখে পড়ল। সাদের চোখের পাতা দুটো খুব ভারী হয়ে আছে। গত রাতের অসহ্য দহন এর কথা আবছা মনে পড়ছে তার। ধীরে ধীরে চোখ মেলতেই অনুভব করল, কপালে একটা শীতল ছোঁয়া। খুব সাবধানে হাত বাড়িয়ে কপাল থেকে একটা ভেজা কাপড় সরিয়ে নিল।
সাদ একটু নড়েচড়ে শুতে গিয়েই থমকে গেল। বিছানার পাশেই, বসে ঘুমিয়ে আছে ফালাক। মাথাটা বিছানার কিনারে এলিয়ে পড়ে আছে। গত রাতের নকশিকাঁথাটা অসম্পূর্ণ অবস্থায় একপাশে পড়ে আছে, আর তার হাতের কাছেই রাখা পানির বাটি। আলোয় ফালাকের মুখটা দেখাচ্ছে কোনো এক ক্লান্ত পরীর মতো।
সাদের বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তের জন্য মোচড় দিয়ে উঠল। কাল রাতে যখন সে জ্বরের ঘোরে যন্ত্রণায় ছটফট করছিল, তখন বাড়ির আর কেউ জানত না; কেবল এই অবহেলিত মেয়েটিই তার শিয়রে বসে রাত জেগেছে। ফালাকের চোখের নিচে হালকা কালচে ছায়া—নির্ঘুম রাতের ছাপ।
সাদ অনেকক্ষণ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। সাদের কঠোর মনে আজ এক অদ্ভুত বিড়ম্বনা দানা বাঁধল। বুঝতে পারল, ঘৃণা করা সহজ, কিন্তু কারো অকৃত্রিম দয়া নেওয়া পৃথিবীর সবচাইতে কঠিন কাজ। বিশেষ করে সেই মানুষের কাছ থেকে, যার ওপর আপনি অন্যায় করে এসেছেন।
ঠিক তখনই ফালাক একটু নড়ে উঠল। সাদ বুঝতে পারল ফালাক এখন চোখ মেলবে। ফালাক পুরোপুরি জেগে ওঠার আগেই সাদ খুব সাবধানে পাশ ফিরে অন্য দিকে ঘুরে শুয়ে পড়ল। দেয়ালের দিকে মুখ করে নিজের শরীরটাকে গুটিয়ে নিল।
ফালাক চোখ মেলে দেখল ভোর হয়ে গেছে। ধড়ফড় করে উঠে বসল। প্রথম কাজটি করলো সাদের কপালে হাত রাখা। সাদ অনুভব করল কোমল হাতের স্পর্শ। ফালাকের আঙুলগুলো তার চুলের গোড়ায় বিলি কাটল এক মুহূর্তের জন্য, যেন নিশ্চিত হতে চাইছে জ্বরটা সত্যিই কমেছে কি না।
ফালাক খুব নিচু স্বরে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করল “আলহামদুলিল্লাহ, শরীরের উত্তাপ অনেক কমেছে। যাক, রাতের বিপদটা কেটেছে।”
ফালাক বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। ফালাক পা টিপে টিপে বাথরুমের দিকে গেল, যেন কোনো শব্দ না হয়, সাদের ঘুম যেন না ভেঙে যায়।
_________
মির্জা ভিলার রান্নাঘরে সকালের ব্যস্ততা তুঙ্গে। চুলায় রুটি সেঁকা হচ্ছে, অন্যপাশে ভাজি।ফালাক রাত জাগার ক্লান্তি চোখে নিয়ে নিপুণ হাতে সবার জন্য নাস্তা তৈরি করল। বাড়ির নিয়ম অনুযায়ী সবাই একসাথে ডাইনিং টেবিলে বসে নাস্তা করে, কিন্তু আজ ফালাকের সবটুকু মনোযোগ পড়ে আছে ওপরের ঘরটাতে।
সবার নাস্তা শেষ হওয়ার পর ফালাক খুব যত্ন করে একটা ছোট সসপ্যানে চিকেন আর সবজি দিয়ে পাতলা সুপ বসাল।এই জ্বরের পর শরীর খুব দুর্বল থাকে, ভারী খাবার সাদ হজম করতে পারবে না।
সাদের ছোট চাচি জিজ্ঞেস করে
” ফালাক? নাস্তা তো সবাই টেবিলেই খেলো, তুমি আবার আলাদা করে ট্রে সাজাচ্ছ কেন?
ফালাক ভাবল সে যদি এখন বলে সাদের গত রাতে খুব জ্বর ছিল, তবে সারা বাড়িতে শোরগোল পড়ে যাবে। মা অসুস্থ মানুষ, তিনি দুশ্চিন্তায় ভেঙে পড়বেন। সাদের বাবাও হয়তো ব্যস্ত হয়ে ডাক্তার ডাকবেন। সাদ এসব হাঙ্গামা একদম পছন্দ করে না, হয়তো উল্টো ফালাকের ওপরই চটে যাবে।
“হ্যাঁ চাচি, আসলে উনি আজ একটু দেরি করে ঘুম থেকে উঠেছেন তো, তাই বললেন ঘরেই নাস্তা করবেন। আর শরীরটা বোধহয় একটু ম্যাজম্যাজ করছে, তাই ভারি কিছু না দিয়ে সুপ করে দিচ্ছি।”
ছোট চাচি একটু অবাকই হলেন। সাদ বাড়িতে সচরাচর খাবার খায় না, আর খেলেও নিজের মেজাজে খায়। আজ যে সে নিজে থেকে ঘরে খাবার চেয়েছে, এটা তাঁর কাছে ভালো লক্ষণ মনে হলো।
“ভালোই তো! ছেলেটা বাইরে বাইরে ঘুরে নিজের শরীরটা শেষ করে ফেলছে। তুমি যখন এত যত্ন করে করছো, নিয়ে যাও।
ফালাক ট্রে-তে বাটি, চামচ আর পানির গ্লাস গুছিয়ে নিল। ধোঁয়া ওঠা গরম সুপের বাটিটা হাতে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে শুরু করল, । প্রতিটা ধাপ যেন এক একটা পাহাড় পার হওয়া ফালাকের কাছে।
“উনি কি খাবারটা নেবেন? নাকি রাগের মাথায় ট্রে-টা ফেলে দেবেন?
ঘরের দরজার সামনে এসে ফালাক কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। ভেতরটা একদম নিস্তব্ধ। গভীর একটা নিশ্বাস নিয়ে খুব সাবধানে পা টিপে টিপে ভেতরে ঢুকল।
ফালাক ট্রে হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকে, দেখল বিছানাটা খালি। বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তের জন্য ধক করে উঠল—সাদ কি তবে এই শরীর নিয়ে বাইরে চলে গেল? কিন্তু পরক্ষণেই বাথরুমের ভেতর থেকে পানির শব্দ শুনে স আশ্বস্ত হলো।
চুপচাপ জানালার পাশের ছোট টেবিলটার সামনে গিয়ে বসল। ধোঁয়া ওঠা সুপের বাটিটা থেকে একটা হালকা সুবাস বেরোচ্ছে। ফালাক দ্বিধায় আছে—সাদ কি চিৎকার করবে? নাকি তাকে ঘর থেকে বের করে দেবে?
কিছুক্ষণ পর বাথরুমের দরজা খোলার শব্দ হলো। সাদ বের হয়ে এলো। তার চুলগুলো ভেজা, কপালে এখনো অসুস্থতার একটা ম্লান ছাপ। তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে এক পলক ফালাকের দিকে তাকাল, কিন্তু কোনো কথা বলল না। চোখের চাহনি আজ খুব গভীর, কিন্তু সেখানে আগের মতো সেই রুক্ষতা নেই।
সাদ সরাসরি আলমারির কাছে চলে গেল। ফালাক দেখছিল লোকটা এখনো কিছুটা টলছে। একটা হালকা নীল রঙের শার্ট বের করল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ধীরপায়ে বোতামগুলো লাগাতে শুরু করে। ঘরজুড়ে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। ফালাক চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
“আপনার জন্য সুপ এনেছি… শরীরটা খুব দুর্বল, এটা খেয়ে নিন।”
সাদ ফালাকের একদম সামনে এসে দাঁড়ায়। ফালাক মাথা নিচু করে আছে, অনুভব করল সাদের দৃষ্টি তার ওপর স্থির হয়ে আছে।
সাদ কোনো কথা বলল না। শুধু ফালাকের চোখের দিকে গভীর এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
পরক্ষণেই সাদ টেবিলের ওপর রাখা সুপের বাটিটা হাতে তুলে নিল। ফালাক ভেবেছিল সাদ হয়তো দূরে সরিয়ে দেবে, কিন্তু সাদ চুপচাপ সুপটা খেতে শুরু করে। ফালাকের চোখের দিকে তাকিয়ে সুপটা খেতে থাকে।
ঠিক তখনই সাদের পকেটে থাকা ফোনটা সজোরে বেজে উঠল। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে সাদের চোয়ালটা আবার আগের মতো শক্ত হয়ে গেল। কোনো এক জরুরি কল, যা বাটিটা টেবিলের ওপর রেখে তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়াল। দ্রুত পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
দরজার হাতলে হাত রাখতেই পেছন থেকে ফালাকের কাঁপা কাঁপা কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
“একটু দাঁড়ান… প্লিজ!”
সাদ দাঁড়িয়ে গেল। কেন জানি আজ তার পা দুটো ফালাকের অবাধ্য হতে পারল না। পেছনে না ফিরেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
ফালাক দ্রুত পায়ে ড্রয়ারের কাছে গেল। সেখান থেকে ফার্স্ট এইড বক্সটা বের করে একটা ওষুধের পাতা নিল। প্যাক থেকে একটা ট্যাবলেট বের করার জন্য টেবিলের ওপর রাখা ছোট কেঁচিটা হাতে নিল। খুব নিপুণভাবে, নিঃশব্দে ওষুধটা কেটে আলাদা করল। ফালাক ওষুধটা নিয়ে সাদের সামনে এসে দাঁড়ায়।
সাদ ঘুরে তাকাতেই দেখল ফালাকের প্রসারিত হাতের তালুতে একটি ছোট সাদা ট্যাবলেট। ফালাকের চোখে এক অদ্ভুত আকুতি।
“”এটা খেয়ে নিবেন প্লিজ…
সাদ কিছু না বলে ওষুধটা হাতে তুলে নিল। এরপর ওষুধটা নিয়ে মুঠ করে বেরিয়ে গেলো।
চলবে —

