#ফালাক #লেখিকা_ইনায়া_জারিশ
#পর্ব________১১
ভোরের ঝাপসা আলোয় মির্জা ভিলার উঠোনটা এক ব্যস্ত জনপদে পরিণত হয়েছে। চারদিকে একটা চাপা উত্তেজনা আর ছোটাছুটি। আজ সবাই মিলে গ্রামের বাড়ি ‘মির্জা মঞ্জিল’-এ যাচ্ছে। বাড়ির সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষ, সাদের দাদি, এই সফরের মধ্যমণি। তাঁরই হুকুমে পুরো পরিবার আজ শহর ছেড়ে শেকড়ের টানে গ্রামে পাড়ি দিচ্ছে।কিন্তু এই ব্যস্ততার মাঝে একধরণের শূন্যতা কাজ করছে। গত রাতেই সাদকে জানানো হয়েছিল দাদির সাথে গ্রামে যাওয়ার কথা। কিন্তু সাদ তখন খুব সংক্ষিপ্ত এবং নিরুত্তাপ ভাষায় ‘না’ বলে দিয়েছিল। তার সেই ‘না’ শোনার পর বাড়ির কেউ আর দ্বিতীয়বার বলার সাহস পায়নি।
সাদের মা জানেন ছেলে তার কেমন, তাই কি করবে আর সাদ কে রেখেই চলে যেতে হবে তাই বাড়িতে কাজের লোক আছে ওদের বলে রেখে গভহে সাদ কিছু চাইলে দিতে। ফালাক যদিও যেতে চায় নি। সবাই জোর করে নিয়ে যাচ্ছে।
আসলে সবাই জানে, সাদ এসব পছন্দ করে না, আর পরিবারের এই আনন্দঘন পরিবেশ তাকে খুব একটা টানে না।
_________
সাদের বাবা ফারদিনকে বলছে-
”সবাই কি গাড়িতে উঠেছ? দাদিকে সাবধানে ধরো ফারদিন। আমাদের এখনই বেরোতে হবে, নইলে রোদে কষ্ট হবে।”
দাদি গাড়িতে উঠতে উঠতে একবার দোতলার সেই বন্ধ জানালার দিকে তাকান, যেখানে সাদের ঘর। তাঁর প্রিয় নাতিটা গেলো না, সেই চিন্তায় তাঁর কপালে ভাঁজ পড়ে। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে গাড়িতে বসেন।
ফালাক সবার শেষে গাড়িতে উঠতে যায়। একবার বাড়ির দিকে তাকায়। বিশাল রাজপ্রাসাদের মতো মির্জা ভিলা আজ একদম নিস্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে।
নীলা ফালাক কে ডাক দিয়ে বলে-
”বড় ভাবী, এসো! তোমার জন্য পাশের সিটটা খালি রেখেছি।”
বলা বাহুল্য আয়ান আর ঈশানের বউ নীলা আর রিমা দুইজনই খুব মিশুক ওদের দেখেমনে হয়না কয় দিন আগে বিয়ে হয়ে এসেছে মনে হয় এই বাড়ির মেয়ে।
ফালাক গাড়িতে গিয়ে বসে। ইঞ্জিন স্টার্ট নেওয়ার সাথে সাথে এক অদ্ভুত হাহাকার তার মনে ভিড় করে। সবাই যাচ্ছে, শুধু এই বিশাল বাড়িতে একটা মানুষ একা পড়ে থাকবে। ফালাক জানে সাদ একা থাকতে পছন্দ করে, তবুও।
গাড়িগুলো শহরের যানজট ছাড়িয়ে হাইওয়েতে ওঠে, তখন জানালার বাইরে দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করে। ধূসর ইটের দালানের বদলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে দিগন্তজোড়া সবুজ ধানখেত। ভোরের কাঁচা রোদ সেই ঘাসের ওপর পড়ে সোনালী আভা ছড়াচ্ছে।
গাড়ির ভেতর হাসাহাসি আর গানের আড্ডা চলছে। আয়ান আর ঈশান মিলে পুরনো দিনের সব মজার গল্প বলছে। মীরা বারবার ফালাককে বলছে—
”ভাবী, দেখো! ওই যে বকগুলো উড়ছে। গ্রামটা না একদম ছবির মতো। তুমি দেখবে, আমাদের গ্রামের পুকুরটা কত বড়!”
ফালাক হাসছে, সবার সাথে তাল মিলিয়ে কথা বলছে, কিন্তু তার মনটা পড়ে আছে অন্য জায়গায়।
ঘন্টা চারেকের জার্নি শেষে গাড়িগুলো যখন গ্রামের মাটির রাস্তায় ঢুকল, তখন দুপুর হতে চলেছে। দুপাশে বড় বড় আম আর কাঁঠাল গাছের সারি। গ্রামের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা গাড়ি দেখে পেছনে ছুটছে।
মির্জা মঞ্জিল কেবল একটা বাড়ি নয়, যেন কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক শ্বেতশুভ্র রাজপ্রাসাদ। মাইলের পর মাইল সবুজ ধানের খেত পেরিয়ে যখন গাড়িগুলো গ্রামের মেঠো পথে ঢোকে, তখন দূর থেকেই চোখে পড়ে আকাশছোঁয়া সেই ধবধবে সাদা রঙের দালানটি। বিশাল বিশাল থাম আর খিলানওয়ালা এই বাড়িটি মির্জা বংশের আভিজাত্যের প্রতীক। বাড়ির চারপাশ ঘিরে আছে আম, জাম, কাঁঠাল আর লিচু গাছের নিবিড় অরণ্য। পাতায় পাতায় বাতাস লেগে যে ঝিরঝির শব্দ হয়, তা যেন কোনো এক প্রাচীন সুরের মূর্ছনা। বাড়ির ঠিক পাশেই টলটলে জলের এক বিশাল পুকুর, যার পাড় বাঁধানো শ্বেতপাথর দিয়ে। পুকুরের জলে আকাশের নীল আর চারপাশের সবুজের প্রতিচ্ছবি মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে।
মির্জা মঞ্জিলের গেটে পৌঁছাতেই দেখা গেল বিশাল এক আয়োজন। পাড়া-প্রতিবেশী আর আত্মীয়স্বজনে বাড়িটা মুখরিত।
গাড়ি থেকে নামতেই দাদিকে ঘিরে ধরল সবাই। ফালাক গাড়ি থেকে নেমে যখন মাটির সোঁদা গন্ধটা নাকে নিল, তার মনে হলো সে এক অন্য জগতে চলে এসেছে। এখানে কোনো কৃত্রিমতা নেই।
সাদের দাদি লাঠিতে ভর দিয়ে খুব ধীরে ধীরে বাড়ির মূল ফটক দিয়ে ভেতরে ঢোকেন। তাঁর চোখে জল, পুরোনো ভিটেয় ফেরার আনন্দ। তিনি হুকুম দিচ্ছেন কাকে কোথায় মালপত্র রাখতে হবে।
সাদের বাবা তিনি তাঁর ভাইদের সাথে বাইরের বৈঠকখানায় বসে গেছেন। গ্রামের মাতব্বর আর আত্মীয়দের সাথে কুশল বিনিময় করছেন। তাঁর গাম্ভীর্য আজ কিছুটা শিথিল, গ্রামের মেঠো ঘ্রাণে তিনিও যেন কিশোর হয়ে উঠেছেন।
মীরা ও রিমা এরা দুজনে যেন ডানা মেলা পাখি। গাড়ি থেকে নেমেই তারা পুকুর পাড়ের দিকে দৌড় দিল। মীরা চিৎকার করে বলছে, “রিমা ভাবি, দেখ! ওই শাপলাগুলো কত বড়!” তাদের খিলখিল হাসি পুরো উঠোনে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
বাড়িটার ভেতর ঢুকতেই ফালাকের নজরে এল ড্রয়িং রুমের সেই বড় ছবিটা। সাদের দাদার আমলের ছবি। তার নিচেই একটা খালি সোফা পড়ে আছে। ফালাকের মনে হলো, এই উৎসবে সবই আছে, শুধু সেই মানুষটা নেই যার উপস্থিতি পুরো বাড়িটাকে একধরণের গাম্ভীর্যে ভরিয়ে রাখত।
সবার হইহুল্লোড়ের মাঝে ফালাক নিজের জন্য বরাদ্দ করা ঘরটির দিকে এগিয়ে যায়। দাদিই ঠিক করে দিয়েছেন ফালাক নিচের তলার পশ্চিম পাশের বড় ঘরটাতে থাকবে। ঘরটা বেশ বড়, মেঝেটা লাল রঙের মোজাইক করা, যা এখনকার সময়ে বিরল। ঘরে ঢুকতেই ফালাক অনুভব করে এক শীতল পরশ। দেয়ালগুলো অনেক পুরু, তাই বাইরের গরম ভেতরে ওতো অনুভব হয় না।
ঘরে একটা বিশাল সেগুন কাঠের পালঙ্ক, যার ওপর ধবধবে সাদা চাদর বিছানো। এক কোণে একটা পুরোনো আমলের ড্রেসিং টেবিল আর কাঠের বড় আলমারি। কিন্তু ফালাকের মন কাড়ল ঘরের বিশাল জানালাটা।
পায়ে পায়ে জানালার কাছে এগিয়ে যায়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই জানলায় কোনো লোহার গ্রিল নেই। আগেকার দিনের বড় বড় কাঠের পাল্লা। ফালাক যখনই জানালার পাল্লা দুটো দুদিকে মেলে ধরল, সাথে সাথে যেন এক জাদু বয়ে গেল ঘরজুড়ে।
জানালার পাল্লা খুলতেই হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে পড়ল একদম সতেজ, ফুলের ঘ্রাণ মাখা ঠান্ডা বাতাস। শহরের ধোঁয়া আর ধুলোবালির লেশমাত্র নেই এখানে। জানালার ঠিক নিচেই বাগান, যেখান থেকে হাসনাহেনার মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছে।
জানালা দিয়ে তাকালে সরাসরি চোখ পড়ে পুকুর পাড়ের ওপর। পুকুরের শান্ত জল মৃদু বাতাসে ছোট ছোট ঢেউ তুলছে। ওপাড়ে বিশাল এক বটগাছ তার ডালপালা মেলে দিয়ে যেন পুকুরটাকে পাহারা দিচ্ছে। জানালার কোনো গ্রিল না থাকায় মনে হচ্ছে ফালাক যেন সরাসরি প্রকৃতির ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে। হাত বাড়ালেই যেন বাইরের গাছের পাতাগুলো ছুঁতে পারবে।
ফালাক জানালার কার্নিশে হাত রেখে চোখ বুজে দীর্ঘ একটা নিশ্বাস নেয়। কতদিন পর এত স্বস্তিতে নিশ্বাস নিতে পারছে! জানালার পাল্লায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। রোদের ঝিলিক পুকুরের জলে লেগে মুখে এসে পড়ছে। বাড়ির ভেতর থেকে ভেসে আসছে কানাকানি আর রান্নার সুবাস।
দুপুরে খাওয়ার আয়োজনটা ছিল দেখার মতো। বিশাল লম্বা উঠোনে চাদর বিছিয়ে সার বেঁধে সবাই বসেছে। বড় বড় পিতলের গামলায় ধোঁয়া ওঠা বাসমতী চালের ভাত, পুকুরের টাটকা রুই মাছের ঝোল, আর দেশি মুরগির ভুনা। ফালাক, নীলা আর রিমা—তিনজনেই মিলে সবাইকে পরিবেশন করেছে। বাড়ির বড়রা তৃপ্তি করে খেলেন। খাওয়ার পর দাদি পান চিবোতে চিবোতে বললেন, “আহ! নাতবউদের হাতের ছোঁয়ায় খাবারের স্বাদ যেন দ্বিগুণ হয়ে গেছে।”
বিকেল গড়াতেই মির্জা মঞ্জিলের সদর দরজায় ভিড় জমতে শুরু করল। গ্রামের মহিলারা খবর পেয়ে গেছেন—মির্জা বাড়ির তিন নাতবউ এসেছে। তারা নতুন বউদের দেখার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে।
মির্জা মঞ্জিলের বিশাল বৈঠকখানায় পাটি আর জাজিম বিছানো হয়েছে। ফালাক, নীলা আর রিমা—তিনজনকেই দাদি সাজিয়ে বসিয়েছেন।
ফালাক এর পরনে একটা জামদানি শাড়ি, চেহারায় এক ধরণের স্নিগ্ধতা মিশে আছে।
নীলা উজ্জ্বল রঙের সিল্ক পরেছে, চুলে একগুচ্ছ তাজা বকুল ফুল গোঁজা। তার চঞ্চলতা সবাইকে মুগ্ধ করছে।
রিমা হালকা গোলাপি রঙের সুতি শাড়িতে তাকে খুব মিষ্টি দেখাচ্ছে, লাজুক হাসিতে সে সবার মন জয় করে নিচ্ছে।
একে একে গ্রামের, বয়স্ক দাদি-নানিরা আর পাড়ার মেয়েরা ঘরে ঢুকতে লাগল। সবার হাতে ছোটখাটো উপহার—কেউ এনেছে গাছের তাজা ডাব, কেউ বা নিজের হাতের বানানো পিঠা।
এক বৃদ্ধা বলে উঠেন
“ওরে মা! বড় নাতবউ তো দেখি একদম পূর্ণিমার চাঁদ। চোখ দুটোর দিকে তাকালে মায়া লাগে। সাদ যেমন তেজি ছেলে, তার জন্য এমন শান্ত হীরের টুকরোই দরকার ছিল।”
অন্য একজন মহিলা নীলা আর রিমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন—
“তিনটা মেয়েই তো মাশাআল্লাহ! মির্জা বাড়ির ভাগ্য ভালো, এমন নিপুণ আর লক্ষ্মীমন্ত বউ আগে কখনও এই তল্লাটে দেখিনি। এরা তো শুধু সুন্দরী না, এদের ব্যবহারের কীসুন্দর!”
ফালাক ভাবছে সবাই তাকে ‘সাদের বউ’ হিসেবে এতো সম্মান দিচ্ছে, সাদ নিজে কি কখনও তাকে সেই সম্মানটা মনে থেকে দেবে?
__________
সাদ গাড়ি নিয়ে মির্জা ভিলার গেটে ঢুকল, তখন রাত প্রায় ৯টা বেজে ১০ মিনিট। বরাবরই অভ্যাসবশত গাড়ি পার্ক করে সোজা দোতলায় নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াল।
সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় বাড়িটা আজ বড় বেশি নিস্তব্ধ ঠেকল সাদের কাছে। ভুতুড়ে এক নীরবতা যেন চার দেয়াল থেকে চুইয়ে পড়ছে। কিন্তু সাদের সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। নিজের ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। ঘরটা অন্ধকার, কেউ ল্যাম্পটা পর্যন্ত জ্বালিয়ে রাখেনি। সাদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুইচবোর্ডের দিকে হাত বাড়াল। আলো জ্বলতেই তার চোখে পড়ল খালি ঘরটা।
তোয়ালে নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকল। শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে ঠান্ডা জল মাথায় নিতেই সারাদিনের ক্লান্তি কিছুটা প্রশমিত হলো। মিনিট বিশেক পর চুল মুছতে মুছতে ঘর থেকে বের হয়ে এল।
বের হয়েই সে অভ্যাসবশত দরজার দিকে তাকাল। প্রতিদিন এই সময়টায় ফালাক দরজার কাছে একটা কাঁচের গ্লাসে লেবুর শরবত নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। সাদের ফেরার শব্দ শুনলেই মেয়েটা ঠিক হাজির হয়ে যায়। কোনোদিন সাদ তৃষ্ণার্ত হয়ে এক নিশ্বাসে শরবতটা খেয়ে নেয়, কোনোদিন মেজাজ তুঙ্গে থাকলে গ্লাসটা হাত দিয়ে ঝাড় মেরে ফেলে দেয়। কাঁচ ভাঙার শব্দে ফালাকের বুক কেঁপে ওঠে, কিন্তু তার পরদিনও সে ঠিক একইভাবে দাঁড়িয়ে থাকে।
আজ দরজার কাছে কেউ নেই। নীল রঙের পর্দাটা বাতাসে সামান্য উড়ছে শুধু। সাদের মনে হলো ঘরের আবহাওয়াটা খুব ভারী। ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে আয়নায় দেখল। হঠাৎ তার মনে হলো, কেউ যেন পেছন থেকে শরবতের গ্লাসটা এগিয়ে দিচ্ছে। দ্রুত পেছনে ফিরল—কিন্তু না, ঘরটা একদম জনশূন্য।
সাদ ঘর থেকে বের হয়ে বারান্দায় এল। নিচ তলার দিকে তাকিয়ে সে থমকে গেল। পুরো বাড়িতে একটা লাইটও জ্বলছে না। শুধু সিকিউরিটি গার্ডের টর্চের আলো একবার উঠোনে ঝিলিক দিয়ে গেল। হঠাৎ মস্তিষ্কের কোণে বিদ্যুৎচমকের মতো মনে পড়ল—আজ তো বাড়িতে কেউ নেই। সবাই গ্রামের বাড়ি চলে গেছে।
পরক্ষণেই তার মনের আয়নায় ভেসে উঠল ফালাকের মুখটা।
“ওই মেয়েটাও তো গেছে।
সাদ আবার নিজের ঘরে ফিরে এল। বিছানায় গা এলিয়ে দিল ঠিকই, কিন্তু ঘুম তার চোখের ধারেকাছেও নেই। অদ্ভুত এক অস্থিরতা তাকে কামড় দিচ্ছে। বিছানা ছেড়ে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। ফালাক এই ঘরে থাকলে এক ধরণের সুবাস পাওয়া যায়— আজ ঘরটায় শুধু এসি-র যান্ত্রিক ঠান্ডা বাতাস।
সাদের মনে এক বিচিত্র অনুভূতি খেলা করছে। সে তো বরাবরই একাকীত্ব চেয়েছিল। চেয়েছিল ফালাক যেন তার চোখের সামনে না থাকে, তাকে বিরক্ত না করে। আজ ফালাক নেই, অথচ সাদের মনে হচ্ছে ঘরের প্রতিটি কোণ যেন তাকে বিদ্রূপ করছে।
সাদ বিড়বিড় করে নিজেকেই শাসন করল—
“কী হচ্ছে এসব? একটা সাধারণ মেয়ে, যাকে আমি দুই চোখে দেখতে পারি না, সে না থাকায় আমার কেন খারাপ লাগবে? পাগল হয়ে যাচ্ছি আমি!”
কিন্তু মন তো আর যুক্তি মানে না। বারবার ফালাকের মুখ টা দেখতে ইচ্ছে করছে।
রাত তখন এগারোটা পেরিয়ে গেছে। শহরের ব্যস্ততা কমে এসেছে, কিন্তু সাদের ভেতরের ঝড় থামছে না।
হুট করে আলমারি থেকে নিজের বাইকের চাবি আর লেদার জ্যাকেটটা টেনে নিল। গ্যারেজে নেমে এসে বাইকটা স্টার্ট দিল। ইঞ্জিনের সেই পরিচিত গর্জন মাঝরাতের নিস্তব্ধতাকে চিরে খানখান করে দিল।
সাদ গেট দিয়ে বেরিয়েই এক্সিলারেটর চেপে ধরল। শহরের নিওন আলোগুলো তার পাশ দিয়ে তীরের মতো চলে যাচ্ছে। বাইকের স্পিডোমিটারের কাঁটা দ্রুত ওপরের দিকে উঠতে শুরু করল—৮০… ১০০… ১২০।
চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে ফালাকের সেই শান্ত মুখ, এর প্রতিচ্ছবি। সাদ জানে না সে কেন এত দ্রুত যাচ্ছে, কিন্তু তার অবচেতন মন চাইছে যত দ্রুত সম্ভব মির্জা মঞ্জিলে পৌঁছাতে। ঐ মুখটা তার এখন দেখতেই হবে।
বাইকের হেডলাইটের তীব্র আলো অন্ধকার পিচঢালা রাস্তাটাকে দুভাগ করে দিচ্ছে। সাদের দুপাশে এখন ঘন জঙ্গল আর ধানের ক্ষেত। মাঝে মাঝে দু-একটা ট্রাক পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সাদের সেদিকে খেয়াল নেই। তার পুরো অস্তিত্ব এখন শুধু একটা গন্তব্যের দিকেই ছুটছে।
_______
“রাত তখন আড়াইটা। মির্জা মঞ্জিলের চারপাশ এক গভীর নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর গাছের পাতার খসখস শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। ফালাকের চোখে আজ কিছুতেই ঘুম আসছে না। কেন জানি তার মনটা এক অজানা অস্থিরতায় কাঁপছে। এপাশ-ওপাশ করে শেষমেশ সে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল।
ধীরপায়ে বিশাল জানালার কাছে এগিয়ে গেল। জানালার পাল্লা দুটো মেলে ধরতেই এক ঝাপটা ঠান্ডা বাতাস মুখে আছড়ে পড়ল। বাতাসটা বড় বেশি সতেজ। ফালাক চোখ বুজে সেই শীতলতা অনুভব করছিল। গ্রিলহীন জানালা দিয়ে বাইরের বাগান আর পুকুর পাড়টা চাঁদের আলোয় রুপালি দেখাচ্ছে।
আরাম করে জানালার কার্নিশে হাত রাখল। কিন্তু নিচে তাকাতেই হৃদপিণ্ডটা যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না।
জানালার ঠিক নিচে, মাটির ওপর দেয়াল ঘেঁষে পা ছড়িয়ে বসে আছে একটা মানুষ। দেয়ালের সাথে মাথা হেলান দিয়ে বসে আছে।চাঁদের আলো ঠিক তার মুখে পড়ছে।
ফালাকের মন অস্ফুট স্বরে বলে উঠল, “সাদ মির্জা!”
যেন অবাক হওয়ার চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। নিজের চোখ কচলে আবার দেখল। হ্যাঁ, এ তো সাদ-ই! সেই কালো শার্ট, এলোমেলো চুল, পাশে পড়ে থাকা তার বাইকের হেলমেট। ধুলোবালি মাখা অবস্থায় সাদ সেখানে এমনভাবে বসে আছে, যেন সে কোনো দীর্ঘ যুদ্ধের পর একটু আশ্রয়ের খোঁজে এখানে এসে আছড়ে পড়েছে।
ফালাক জানালার পাল্লা ধরে একটু ঝুঁকে নিচু স্বরে ডাকল—
“আপনি? আপনি এখানে কেন? এভাবে নিচে কেন বসে আছেন?”
সাদ ফালাকের কণ্ঠস্বর শুনে ধীরে ধীরে চোখ মেলল।মিলিত হলো দুটি চোখ।।। এলোমেলো চুলে ফালাক দাঁড়িয়ে আছে, চাঁদের আলোয় যাকে কোনো অপার্থিব পরীর মতো লাগছে। সাদ কোনো উত্তর দিল না। শুধু ফালাকের দিকে তাকিয়ে রইল।
এই সেই চোখ, যা গত কয়েক ঘণ্টায় সাদের মস্তিষ্কে বিদ্রোহ করে যাচ্ছিল। এই সেই মায়াবী মুখ, যার অনুপস্থিতি কয়েক হাজার বর্গফুটের বিশাল মির্জা ভিলাকে সাদের কাছে এক জনশূন্য মরুভূমি বানিয়ে দিয়েছিল। সাদ কোনো কথা বলল না, শুধু একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল।
সাদের চোখের গভীর চাহনি দেখে ফালাকের কণ্ঠস্বর গলার কাছেই আটকে গেল। এই প্রথম সাদের চোখে কোনো ঘৃণা দেখছে না, কোনো উপেক্ষা দেখছে না; বরং দেখছে এক তৃষ্ণার্ত মানুষের হাহাকার।
সাদ প্রাণ ভরে দেখে নিলো ফালাককে। এলোমেলো উড়ন্ত চুল, বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে যাওয়া চোখ আর জানালার কার্নিশ আঁকড়ে ধরা শুভ্র দুটি হাত—ফালাককে এই মুহূর্তে সাদের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য মনে হচ্ছে। এই মুখটা দেখার জন্য সে যদি আরও কয়েক হাজার মাইল বাইক চালিয়ে আসত, তবে সেটাও বুঝি কম হতো।
বাতাসটা আবার জোরে বইতে শুরু করল। বাগানের হাসনাহেনার তীব্র সুবাস সাদের নিশ্বাসে মিশে যাচ্ছে, আর সাদের চোখের স্থির দৃষ্টি মিশে যাচ্ছে ফালাকের কম্পিত হৃদয়ে। ফালাক কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি সরাল না, বরং আরও নিবিড়ভাবে ফালাকের দিকে তাকিয়ে থাকল। যেন সে এই কয়েক মিনিটের দেখায় আগামী কয়েক জনমের তৃষ্ণা মিটিয়ে নিতে চায়………..
চলবে —
( সবাই গল্প সম্পর্কিত গঠনমূলক কমেন্ট করবেন। Nice,next করবেন না please!)

