ফালাক #লেখিকা_ইনায়া_জারিশ #পর্ব______৩

0
27

ভোরের আলো মির্জা ভিলার জানলা দিয়ে উঁকি মারছে। সারা শরীরের অসহ্য যন্ত্রণা আর মনের ভেতর জমে থাকা একরাশ হাহাকার নিয়ে ফালাক খুব ভোরেই ঘুম থেকে উঠে পড়ল। পাশের মানুষটা তখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ফালাক খুব সাবধানে বিছানা ছেড়ে উঠে ওয়াশরুমে গিয়ে গোসল সেরে নিল। আজ সে একটা সাধারণ নীল রঙের সুতি শাড়ি পরেছে। ভেজা চুলগুলো পিঠের ওপর ছড়িয়ে দিয়ে সে ধীরপায়ে নিচে নেমে এল।
পুরো বাড়ি তখনো নিস্তব্ধ। মির্জা বাড়ির কেউ এখনো ঘুম থেকে ওঠেনি। রান্নাঘরে গিয়ে ফালাক দেখল কাজের লোকগুলোও আসেনি। নিজেই আটা মেখে রুটি বেলতে শুরু করল। নরম হাতগুলো রুটি বেলার সময় কাঁপছিল ঠিকই, কিন্তু সে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে চাইল। ফালাক যখন রুটিগুলো সেঁকছিল, তখন সাদের মা আর সাদের কাকি রান্নাঘরের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন। ফালাককে দেখে ওনারা অবাক হয়ে থমকে দাঁড়ালেন।
“ওমা! ফালাক, তুমি এই সাতসকালে উঠে পড়লে যে মা? আর এসব কী করছ? রুটি বানাচ্ছ কেন তুমি? বাড়িতে তো লোক আছে এসব করার জন্য।”

“ঠিকই তো! নতুন বউ তুমি, এত তাড়াতাড়ি রান্নাঘরে ঢোকার কী দরকার ছিল? শরীরটা তো তোমার ভালো লাগছে না মা, মুখটা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে আছে।”

ফালাক মাথা নিচু করে রুটি সেঁকতে সেঁকতে ম্লান হাসল।
ফালাক “না মা, ঘুম ভেঙে গেল তো, তাই ভাবলাম আপনাদের সবার জন্য নাস্তাটা আমিই তৈরি করি। কাজ করলে ভালো লাগে।”

“লক্ষ্মী মেয়ে তুমি।

ফালাক বুঝল, এই বাড়ির বড়রা তাকে মায়া করছে তবে ওপরতলায় যে মানুষটা আছে, তার মায়ার কোনো চিহ্ন নেই। চুপচাপ রুটিগুলো হটপটে রাখতে লাগল।
সাদের মা আর কাকি শাশুড়ির সাথে নাস্তার আয়োজন শেষ করে ফালাক আর নিচে দাঁড়ায় না। ওপরতলায় নিজের রুমে ফিরে এল।ঘরে ঢুকে দেখল ঘরটা সেই আগের মতোই অগোছালো হয়ে আছে। সাদ এখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। বিছানার একপাশে অঘোরে ঘুমিয়ে আছে, গায়ের চাদরটা অর্ধেক মেঝেতে লুটিয়ে পড়েছে। ফালাক খুব সাবধানে পা টিপে টিপে ঝাড়ু হাতে নিল। মেঝের ধুলো আর সাদের ফেলে রাখা সিগারেটের ছাই—সবকিছু সে পরম ধৈর্যে পরিষ্কার করতে লাগল।
রুম ঝাড়ু দেওয়া শেষ করে আলতো করে সাদের গায়ের চাদরটা টেনে ঠিক করে দিল। লোকটা যখন জেগে থাকে, তখন সে এক জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি, কিন্তু ঘুমের ঘোরে তার চোখেমুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি, যা ফালাককে ক্ষণিকের জন্য অবাক করল।
এরপর ফালাক বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। ভোরের স্নিগ্ধ বাতাস তার ভেজা চুলে দোলা দিয়ে যাচ্ছে। সামনের বিশাল বাগানে শিশিরভেজা ঘাস আর দূরে রাস্তার ব্যস্ততা—সবই যেন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় মোড়া। ফালাক রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে শূন্যতা। কাল পর্যন্ত সে ছিল তার ভাই-ভাবির আশ্রয়ে এক বোঝা, আর আজ সে এই বিশাল অট্টালিকার এক বন্দিনী।
পেছনে ঘরের ভেতর সাদ এখনো ঘুমিয়ে। ফালাক জানে, এই মানুষটা জেগে উঠলেই আবার শুরু হবে তার শাসন, তার ঘৃণা আর অবজ্ঞার সুর। তবুও এই মুহূর্তের শান্ত পরিবেশটা ফালাক খুব উপভোগ করছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল—‘আল্লাহ,, আমাকে সহ্য করার শক্তি দিও।’
বারান্দার কোণে রাখা টবে একটা ছোট গোলাপ কুঁড়ি ফুটেছে। ফালাক সেদিকে তাকিয়ে রইল।
______
দুপুরে সাদের তিন ভাই বাড়িতে এলো। ড্রয়িং রুমে তখন বেশ আড্ডা জমছে। ফালাক ট্রে-তে করে শরবত নিয়ে এল। সাদা সুতি শাড়িতে তাকে খুব সাধারণ, স্নিগ্ধ লাগছে।
সাদের ভাই আয়ান (ডাক্তার), মেজো চাচার ছেলে ইশান (যে এখন বাড়ির ব্যাবসা সামলায়) আর সবার ছোট ফারদিন (ভার্সিটি পড়ুয়া)। তারা তিনজনেই সাদের নেওটা।

এই দুইদিনে এদের সাথে কথা হয় নি। তবে ফালাক আজকে দুপুরে জেনেছে তার ননদ এর কাছে,, এরা তিনজন ফালাকের দেওর।
আমি আয়ান, সাদ মির্জার ভাই। বাড়ির ডাক্তার হয়েও ভাইটার মেজাজ কোনোদিন ঠিক করতে পারলাম না। ফালাক মাথা নিচু করে দারিয়ে রইলো।
ঠিক তখন ফারদিন, সোফায় পা তুলে বসে ফোনে গেম খেলছিল, মুখ তুলে ফালাকের দিকে তাকায় । তার চোখে দুষ্টুমি।

“ওরে বাবা! সাদ ভাইয়ার ঘরে একদম চাঁদের কণা এসেছে পড়েছে! ভাবি, তুমি কলেজে পড়ার বয়সে এই হিটলারের সাথে ঘর করতে এলে কেন? আমি তো ভেবেছিলাম ভাইয়ার ভয়ে কোনো মেয়ে এই বাড়িতে পা-ই দেবে না।

ফালাক ফারদিনের কথায় একটু হাসল। “আপনারা সবাই খুব ভালো। শরবত টা খেয়ে নিন ভাইয়ারা, ক্লান্ত দেখাচ্ছে আপনাদের।

ওরা তিনজনই একে অন্যের দিকে তাকাচ্ছে এতো মিষ্টি করে বলছে কি কোমল মেয়েটা। আয়ানের বেশ মায়া হলো তার ভাইটা যেন বেশ রাগী স্বভাবের।

ঠিক তখনই সিঁড়িতে বুটের শব্দ হলো। সাদ নামছে। ফারদিন চট করে সোফা থেকে পা নামিয়ে সোজা হয়ে বসল। ইমতিয়াজও তার হাসিখুশি মুখটা গম্ভীর করে ফেলল। সাদের উপস্থিতিতে যেন এই বাড়ির বাতাসও ভারি হয়ে যায়।
সাদ ড্রয়িং রুমে ঢুকেই দেখল ফালাক তার ভাইদের সাথে কথা বলছে। তার কপালে ভাঁজ পড়ল।

“কী হচ্ছে এখানে? ফালাক, তোর কি সারাদিন কোনো কাজ নেই? ড্রয়িং রুমে দাঁড়িয়ে আড্ডা দেওয়া শুরু করেছিস? যা এখান থেকে!”

আয়ান বাধা দিয়ে বলল, “আরে ভাইয়া, আমরা তো ওর সাথে পরিচিত হচ্ছিলাম। ও তো এখন আমাদেরও বোন।”
সাদ কোনো কথা না বলে ফালাকের দিকে তীব্র চোখে তাকাল।

সাদ একটা সোফায় পা ছড়িয়ে বসল, তার চোখেমুখে রাজ্যের বিরক্তি। আয়ান, ঈশান আর ফারদিন—তিনজনেই এখন সাদের মুখোমুখি।
সাদ পকেট থেকে সিগারেট বের করল,এই বাড়িতে সে কাউকে তোয়াক্কা করে না।

“ভাইয়া ভাবি এই বাড়িতে আসার পর তুমি কি একবারও ওর সাথে শান্ত হয়ে কথা বলেছো ?আমরা সব জানি। মেয়েটা এতিম, ওকে এভাবে সারাক্ষণ শাসনে রেখো না।”

সাদ একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিল।
“তোরা জানিস্ না, এই মেয়েদের বংশটাই লোভী। ওর ভাই একে বিক্রি করেছে। যে টাকার বিনিময়ে এসেছে, তাকে কেন আমি মাথায় তুলে রাখব? ও শুধু এ বাড়ির কাজ করবে আর চুপচাপ থাকবে, এটাই ওর পরিচয়।”
ফালাকের বুকটা কেঁপে উঠল। ভাইদের সামনে এই অপমান তার সহ্য হচ্ছিল না। ফারদিন এবার কথা বলে উঠল।

“ভাইয়া, তুমি সবকিছুর মধ্যে টাকা আর মাস্তানি কেন আনো? ভাবি তো কোনো দোষ করেনি। দেখো, ও কত সুন্দর করে সকাল থেকে সবার জন্য রুটি বানিয়েছে, তোমার হাতের ব্যান্ডেজটাও নাকি ও-ই করে দিয়েছে। ও যদি লোভী হতো, তবে কি তোমার মতো রাগী লোকের সেবা করত?”

সাদ ফারদিনের দিকে রাগী চোখে তাকায় “ফারদিন, নিজের পড়াশোনায় মন দে। বড়দের মাঝখানে বেশি কথা বলবি না। তোরা ওকে প্রশ্রয় দিচ্ছিস বলেই ওর সাহস বাড়ছে।”

ঈশান বলল ভাই আমরা চাই ভাবি এই বাড়ির একজন হয়ে থাকুক।ভাবি, তুমি একদম ভয় পেও না। আমরা তোমার সাথে আছি।

ফালাক নিচু স্বরে বলল, “ঠিক আছে ভাইয়া।”
সাদ হঠাৎ উঠে দাঁড়ায় । ফালাকের সামনে এসে খুব নিচু হয়ে তার চোখের দিকে তাকাল। ফালাক ভয় পেয়ে দ্রুত দৌড়ে গিয়ে রান্নাঘড়ে চলে গেলো।

আয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বুঝল সাদকে বোঝানো অসম্ভব। সাদ গটগট করে বাইরে বেরিয়ে গেল।

______
রাতের ডাইনিং টেবিলের বিশাল টেবিলের এক প্রান্তে বসে আছেন সাদের বাবা— তার চোখেমুখে বিরক্তি স্পষ্ট। পরিবারের বাকিরা খেতে বসেছে। ফালাক এক কোণে দাঁড়িয়ে সবার পাতে খাবার তুলে দিচ্ছিল।
সাদ গটগট করে এসে চেয়ার টেনে বসল, পুরো ঘরটা যেন আরও নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সাদের শার্টের হাতা গোটানো, চোখে সেই একই অবাধ্য চাউনি। কেবল ভাতে হাত দিয়েছে, অমনি সাদের বাবা গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন—
“শুনেছি আজকেও বাজারে বড় ঝামেলা হয়েছে? লোকে বলে সাদ মির্জা এলাকা শাসন করে, আর আমি শুনি আমার ছেলে এখন রাস্তার মাস্তান। মির্জা বাড়ির মান-সম্মান তো তুই ধুলোয় মিশিয়ে দিচ্ছিস। এই অসভ্য জীবন তুই কবে ছাড়বি?”
সাদ খাওয়া থামিয়ে তার বাবার দিকে স্থির চোখে তাকাল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে এল।
“মান-সম্মানের কথা আপনি বলছেন ? যার জীবনের অর্ধেকটা আমি একা লড়াই করে এই পর্যায় পর্যন্ত এনেছি, সেই জীবনের হিসেব আপনি নেবেন না। আমি কেমন, সেটা পুরো শহর জানে।
সাদ আর এক মুহূর্তও সেখানে বসল না। রাগে ভাতের থালাটা ঠেলে দিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। থালাটা মেঝেতে পড়ার শব্দে ফালাক শিউরে উঠল। সাদ কারও দিকে না তাকিয়েই সিঁড়ি দিয়ে গটগট করে উপরে চলে গেল।
টেবিলে সবার খাওয়া শেষ হলো বিষণ্ণতায়। বাড়ির নিয়ম অনুযায়ী এরপর বাড়ির মেয়েরা খেতে বসল। সাদের মা ফালাককে অনেকবার বললেন, “বোসো মা, খেয়ে নাও।”

“না মা, আপনারা খান। আমার খিদে নেই।”

______
ফালাক রান্নাঘরে গিয়ে একটা ট্রে-তে করে সাদের জন্য ভাত আর তরকারি বেড়ে নিল। সাদের মা রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে সব দেখছিলেন। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—
“চেষ্টা করে দেখো মা, কিন্তু লাভ হবে না। সাদ একবার জেদ করলে কেউ তাকে খাওয়াতে পারে না। গত কয়েক বছরে ও কতবার যে না খেয়ে রাত কাটিয়েছে তার হিসেব নেই। ওর জেদের কাছে আমাদের সবার যত্ন হার মেনে গেছে।”
ফালাক কোনো কথা বলল না। সাদের জন্য কোথায় যেন ফালাকের মনে এক অদ্ভুত টান তৈরি করেছে। লোকটা সারারাত না খেয়ে থাকবে ভেবে kemon যেনো লাগছে। ট্রে হাতে নিয়ে ধীরপায়ে দোতলায় সাদের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।
দরজাটা আধখোলা। ঘর অন্ধকার। শুধু বারান্দা থেকে আসা চাঁদের আলোয় দেখা যাচ্ছে সাদ বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। ফালাক ঘরে ঢুকে ট্রে-টা টেবিলের ওপর রাখল।

অন্ধকার ঘরে সাদের উপুড় হয়ে শুয়ে থাকা অবয়বটা দেখে ফালাকের বুকের ভেতরটা কেমন যেন হাহাকার করে উঠল। লোকটা নিষ্ঠুর, সন্দেহ নেই। লোকটা তাকে স্রেফ টাকা দিয়ে কেনা পণ্য ভাবে, তাতেও ভুল নেই। কিন্তু এই যে নিজের বাবার কাছে এতগুলো মানুষের সামনে অপমানিত হয়ে না খেয়ে পড়ে থাকা—এই দৃশ্যটা ফালাকের সহ্য হচ্ছে না। ফালাক নিজেও অনাথ, অপমানের স্বাদ সে ছোটবেলা থেকেই চেনে। তাই হয়তো সাদের এই জেদি নীরবতা তার মনে এক অদ্ভুত কষ্টের ঢেউ তুলছে।
ফালাক খুব ধীর পায়ে বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। সাদের ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে।
“উঠে পড়ুন। একটু খেয়ে নিন।”
সাদ নড়ল না। কোনো উত্তরও দিল না। ফালাক দমে গেল না। সে আরেকটু কাছে গিয়ে বসল।
বাবার ওপর রাগ করে না খেয়ে থাকলে শরীরের ক্ষতি আপনারই হবে। রাত বাড়ছে, শরীরটা তো এমনিতে ভালো নেই, তার ওপর হাতে চোট…”
“তোকে কে আসতে বলেছে এখানে? দরদ দেখাতে এসেছিস? বলেছি না, আমার সামনে আসবি না!”
সাদ এক ঝটকায় উঠে বসল। অন্ধকারেও তার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। দেখল ফালাক ভয়ে পিছিয়ে না গিয়ে বরং খাবার হাতে তার সামনেই বসে আছে।
“আপনার মা বললেন, আপনি অনেক রাত না খেয়ে থাকেন। —অন্তত দুই লোকমা খেয়ে নিন। তারপর যা ইচ্ছে হয় আমাকে বলবেন, আমি সয়ে নেব।”
সাদ অবাক হয়ে ফালাকের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। এই মেয়েটার চোখে ভয় আছে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি আছে এক গভীর মমতা। যে মমতা সাদ এই পাথুরে মির্জা ভিলাতে বহুদিন পায়নি।
সাদ ফালাকের হাত থেকে প্লেটটা নিতে চাইল না। ফালাক নিজ হাতে একটা লোকমা মেখে সাদের মুখের কাছে ধরল। সাদের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। একবার ফালাকের চোখের দিকে তাকাল, তারপর যেন নিজের অজান্তেই মুখ খুলল।
সাদ প্রথম লোকমাটা মুখে নিতেই ফালাকের ঠোঁটের কোণে খুব সূক্ষ্ম একটা হাসির রেখা দেখা দিল। সাদের মতো একজন পাষাণ হৃদয়ের মানুষ আজ তার থেকে এক চৌদ্দ বছরের ছোট মেয়ের জেদের কাছে হার মানল। সাদ নিঃশব্দে খাচ্ছে, আর ফালাক পরম যত্নে তাকে খাইয়ে দিচ্ছে।
খাওয়া শেষ করে সাদ মুখ ফিরিয়ে নিয়ে শুয়ে পড়ল।
ফালাক ট্রে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। এই যে আজ রাতে লোকটা খালি পেটে ঘুমাবে না—এটাই ফালাকের মনে এক অদ্ভুত শান্তি এনে দিল।
দ্রুত গল্প পেতে পেজ টা ফলো দিয়ে রাখুন Inaya’s Diary

রান্নাঘর থেকে খালি প্লেটটা ধুয়ে গুছিয়ে রাখতে রাখতে ফালাকের মনের ওপর থেকে যেন মস্ত বড় একটা পাথর নেমে গেল। নিজের জন্য যতটা না খারাপ লাগছিল, তার চেয়ে বেশি শান্তি লাগছে এই ভেবে যে, অন্তত লোকটা আজ রাতে খালি পেটে ঘুমাবে না।
ফালাক যখন সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠছিল, তখন সে খেয়ালই করেনি রান্নাঘরের পাশের অন্ধকার দেওয়াল ঘেঁষে সাদের মা দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি আড়াল থেকে পুরো দৃশ্যটা দেখেছেন। সাদের মা আজ নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছেন না—যে ছেলেকে গত কয়েক বছরে হাজার সাধাসাধি করেও অভিমানে খেতো না,সেই জেদি ছেলেটা ফালাকের হাতের ছোঁয়ায় আজ খেয়ে নিল!
সাদের মার চোখের কোণে আনন্দ আর স্বস্তির জল চিকচিক করে উঠল।
ফালাক ঘরে ঢুকে দেখল সাদ বারান্দার দিকে মুখ করে শুয়ে আছে। রুমের লাইট বন্ধ, শুধু বারান্দা দিয়ে আসা চাঁদের মৃদু আলোয় ঘরটা কেমন মায়াবী হয়ে আছে। ফালাক খুব সন্তর্পণে বিছানার এক কোণে গিয়ে শুয়ে পড়ল।
অনেকক্ষণ পর অন্ধকারের নিস্তব্ধতা ভেঙে সাদ পাশ ফিরে শুল। ফালাক ভাবল সাদ হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে, কিন্ত হঠাৎ এক হ্যাঁচকা টানে ফালাককে নিজের বুকের খুব কাছে টেনে নিল । সাদের শরীরের পুরষালী গন্ধ ফালাকের নাকে আছড়ে পড়ল। ফালাক ভয়ে সাদের বুকের ওপর ছোট দুটি হাত দিয়ে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু সাদের পাশবিক শক্তির সামনে তার সেই চেষ্টা ছিল বালির বাঁধের মতো।

“তোর এই মায়া, এই চোখের জল—সবই কি আমাকে বস করার কৌশল? আমি বলেছিলাম না, তুই এ বাড়িতে কেন আছিস সেটা ভুলবি না!”

সাদ ফালাকের কোনো উত্তরের অপেক্ষা করল না। তার শক্ত আঙুলগুলো ফালাকের ব্লাউজের বোতামে গিয়ে ঠেকল। ফালাক শিউরে উঠল। সাদের আঙুলগুলো যেন এক একটি আগুনের গোলার মতো তার শরীরে বিঁধছে। একে একে সব কটি বোতাম খুলে ফেলল সাদ। ফালাক দুহাত দিয়ে নিজেকে ঢাকার চেষ্টা করল, কিন্তু সাদের আক্রোশ মেশানো অধিকারবোধ আজ অন্য মাত্রায়।
সাদ ফালাকের ঘাড়ের কাছে নিজের মুখটা ডুবিয়ে দিল। তার তপ্ত নিঃশ্বাস ফালাকের গলার সেই কালশিটে পড়া দাগগুলোতে আছড়ে পড়ছে। আজ রাতে সাদের মধ্যে কোনো ঘৃণা ছিল না, ছিল এক আদিম উন্মাদনা। যেন ফালাকের শরীরের প্রতিটি ইঞ্চি দখল করে নিতে চায়। ফালাক যন্ত্রণায় আর লজ্জায় চোখ বন্ধ করে ফেলল।
সেই গভীর অন্ধকারে ফালাকের কান্নার শব্দ আবার ঘরের দেয়ালে প্রতিধ্বনি হতে লাগল, যা বাইরে যাওয়ার কোনো পথ পেল না। সাদ তাকে আবারও বুঝিয়ে দিল যে, মায়া আর মমতা যাই থাকুক না কেন, রাতের শেষে সে কেবল সাদের তৃষ্ণা মেটানোর এক সামগ্রী মাত্র।
অন্ধকার ঘরটা যেন আরও বেশি ভারী হয়ে উঠল সাদের তপ্ত নিঃশ্বাসে। সাদের মধ্যে আজ কোনো ধীরস্থিরতা নেই, নেই কোনো দয়া। ফালাকের শরীরের প্রতিটি ভাঁজে সে যেন নিজের আধিপত্যের সিলমোহর এঁকে দিতে চাইছে।
সাদের শক্ত ঠোঁটগুলো ফালাকের গলায়, কাঁধে আর বুকে আছড়ে পড়ছে এক প্রলয়ঙ্কারী ঝড়ের মতো। প্রতিটি স্পর্শে মিশে আছে আক্রোশ আর এক অবদমিত তৃষ্ণা। ফালাক অসহায়ের মতো বিছানার চাদরটা খামচে ধরে আছে। সাদের এই উন্মত্ততা ফালাকের সারা শরীরে নীল বেদনার ঝড় তুলছে, অথচ সে মুখ ফুটে কোনো শব্দ করতে পারছে না।
সাদ আজ যেন নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে। ফালাকের স্নিগ্ধ শরীরের ওপর তার অধিকার জাহির করতে গিয়ে সে আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তার প্রতিটি চুম্বনে যেন মিশে আছে এক বিষাক্ত নেশা। ফালাকের নরম চামড়ায় সাদের ঠোঁটের চিহ্নগুলো নীল বর্ণ ধারণ করছে, যেন প্রতিটি দাগই এক একটি অপমানের সাক্ষ্য।

চলবে —
(গল্পটা আপনাদের কেমন লাগছে বড় করে কমেন্ট চাই পাখিরা 🌷)

#ফালাক
#লেখিকা_ইনায়া_জারিশ
#পর্ব______৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here