#ফালাক
#লেখিকা_ইনায়া_জারিশ
#পর্ব______৪
কেটে গেছে কয়েকটা দিন। মির্জা ভিলার পাথুরে দেওয়ালে দেওয়ালে ফালাকের দীর্ঘশ্বাসগুলো এখন পুরনো হয়ে গেছে। সাদের সেই রাতের পর রাতের পাশবিকতা আর দিনের বেলার বরফশীতল অবজ্ঞা—সবই এখন ফালাকের জীবনের অংশ। ফালাকের শরীরের নীল দাগগুলো কখনো সারে, আবার কখনো নতুন দাগে ঢাকা পড়ে যায়। সে এখন এই বাড়ির এক ছায়া-মানবী, যে নিঃশব্দে সবার সেবা করে যায় কিন্তু কারো চোখে চোখ রেখে কথা বলে না।
এরই মধ্যে সাদের আচরণে এক অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সে আগের মতো ফালাকের ওপর হাত তুলছে না ঠিকই, কিন্তু তার নীরবতা যেন চাবুকের চেয়েও বেশি ধারালো। সে বাড়িতে ফিরলে ফালাক তটস্থ থাকে, আর বাইরে গেলে ফালাক জানলায় দাঁড়িয়ে ধুলো ওড়া পথের দিকে তাকিয়ে থাকে এক অজানা মুক্তির আশায়।
বাথরুমের এক কোণে বসে ফালাক এক বালতি ডিটারজেন্টের ফেনার মাঝে সাদের শার্ট আর জিন্সগুলো ভিজিয়ে রেখেছিল, সেগুলো ধুয়ে দিচ্ছ।
সাদের শার্ট ধোয়ার সময় ফালাক গন্ধ পেল সাদের গায়ের কড়া পারফিউমের ঘ্রাণ আর তামাকের গন্ধ—যা প্রতি রাতে ফালাকের শ্বাসরোধ করে দেয়। শার্টের হাতায় রক্তের দাগ লেগে আছে, রক্তের দাগগুলো জেদি, সহজে উঠতে চায় না—ঠিক সাদের ওই কর্কশ স্বভাবের মতো।
ভেজা কাপড়গুলো বালতিতে ভরে সিঁড়ি দিয়ে ছাদে উঠল, ছাদে গিয়ে সাদের শার্টগুলো ঝেড়ে দড়িতে মেলছিল, তখন বাতাসের ঝাপটায় ভিজে কাপড় থেকে ছিটকে আসা পানির ফোঁটাগুলো ফালাকের তপ্ত মুখে এসে পড়ছিল।
রোদের তেজ কিছুটা কমেছে, কিন্তু ভ্যাপসা গরম এখনো আছে। ফালাক একটা একটা করে কাপড় মেলে দিচ্ছে। বাতাসের ঝাপটায় শাড়িটা বারবার গায়ের সাথে লেপটে যাচ্ছে, কিন্তু সেদিকে তার খেয়াল নেই। ফালাক খেয়ালই করেনি, ছাদের এক কোণে বড় পানির ট্যাংকিটার পাশে সাদ আগে থেকেই দাঁড়িয়ে ছিল। সাদ তার অভ্যাসমতো সিগারেট ফুঁকছে আর একদৃষ্টিতে ফালাকের দিকে তাকিয়ে আছে। সুতি শাড়িতে এই মেয়েটাকে কেন জানি আজ অনেক বেশি মায়াবী লাগছে সাদের কাছে। তার ভিজে চুলের কয়েকটা গোছা পিঠে লেপটে আছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে সাদের নজর গেল পাশের বাড়ির তিনতলার বারান্দার দিকে। সেখানে ১৮-১৯ বছরের একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটা নির্লজ্জের মতো অপলক দৃষ্টিতে ফালাকের কাপড় মেলার দৃশ্য দেখছে।
সাদের ভেতরের জানোয়ারটা মুহূর্তেই জেগে উঠল। ত কপালে রগগুলো ভেসে উঠল, চোখ দুটো রাগে লাল হয়ে এল। হাতের সিগারেটটা পিষে ফেলল।
ফালাক বালতি হাতে উল্টো ঘুরতেই চমকে উঠল। সাদ কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে আছে। সাদের চোখেমুখে এমন এক হিংস্রতা, যেন সে এখনই কাউকে ছিঁড়ে ফেলবে।
“আপনি… আপনি এখানে কখন এলেন?”
সাদ কোনো উত্তর দিল না। বড় বড় পা ফেলে ফালাকের দিকে এগিয়ে এল। ফালাক ভয়ে দুপা পিছিয়ে গেল, পেছনের দেওয়ালের সাথে তার পিঠ ঠেকে গেল। সাদ ফালাকের একদম সামনে এসে দাঁড়াল। শরীরের তপ্ত নিঃশ্বাস ফালাকের নাকে লাগছে।
“খুব তো শখ না? আঁচলটা খসিয়ে সবার সামনে নিজেকে বিলিয়ে দিতে খুব ভালো লাগে তোর? ওই ছোকরাটা কতক্ষণ ধরে তোকে দেখছে, তুই কি জানিস না?”
ফালাক আকাশ থেকে পড়ল। পাশের বাড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল ছেলেটা সাদের রুদ্রমূর্তি দেখে দৌড়ে ভেতরে পালিয়ে যাচ্ছে।
“বিশ্বাস করুন, আমি দেখিনি… আমি শুধু কাপড় মেলতে এসেছিলাম।”
সাদ ফালাকের বাহুটা শক্ত করে চেপে ধরল। ফালাক যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠল।
“চুপ! একটা কথা বলবি না। তোর মতো সতী সাবিত্রী আমি অনেক দেখেছি। কাল রাতে আমার নিচে পড়ে যেভাবে কাঁদছিলি, এখন এই পরপুরুষের নজর দেখে সেভাবেই আমোদ পাচ্ছিস? আজ তোর সব ঢং আমি বের করছি!”
সাদ ফালাককে চ্যাংদোলা করে কাঁধে তুলে নিল। ফালাক হাত-পা ছুড়তে লাগল, “ছাড়ুন আমাকে! কেউ দেখে ফেলবে! মা দেখলে কী ভাববে?”
কিন্তু সাদ আজ উন্মাদ।
সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় সাদের ছোট বোন মীরা ঠিক সামনে পড়ে গেল। সাদের কাঁধে ফালাককে ছটফট করতে দেখে আর সাদের ওই রক্তবর্ণ চোখ দেখে মীরা স্তম্ভিত হয়ে গেল। তার ভাই যে মেজাজি সেটা সে জানে,
“ভাইয়া! কী হয়েছে? ভাবিকে ওভাবে নিয়ে যাচ্ছ কেন?
সাদ মীরার দিকে ফিরেও তাকাল না। তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে, শরীরের পেশিগুলো রাগে কাঁপছে। মীরাকে পাশ কাটিয়ে প্রায় ঝড়ের গতিতে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।
যা এখান থেকে!”
মীরা অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে রইল। জানে সাদকে থামানোর ক্ষমতা এই বাড়িতে কারোর নেই। সাদ ঘরে ঢুকেই ফালাককে এক ঝটকায় কাঁধ থেকে নামিয়ে সজোরে বিছানায় ছুড়ে ফেলে দিল। ফালাকের মাথাটা বিছানার পাশে কাঠের ফ্রেমের সাথে হালকা ধাক্কা খেল। যন্ত্রণায় চোখে জল চলে এল।
সাদ লাথি মেরে ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিল। তারপর ধীরপায়ে এগোতে লাগল ফালাকের দিকে। ফালাক বিছানার ওপর পিছিয়ে যেতে যেতে দেয়ালের সাথে সেঁটে গেল।
“আমার কোনো দোষ নেই… আমি সত্যিই ওদিকে তাকাইনি। আপনি আমাকে ভুল বুঝছেন। দোহাই আপনার, আমাকে আর মারবেন না!”
সাদ খাটের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে ফালাকের গলার কাছে হাত রাখল। তার স্পর্শে কোনো ভালোবাসা নেই, আছে কেবল এক হিংস্র অধিকারবোধ।
সাদ ফালাকের দুই হাত চেপে ধরল। শরীরের ভারে ফালাক পিষ্ট হতে শুরু করল। সাদের ভেতরে এখন এক বিষাক্ত হিংসা কাজ করছে।
নিচতলায় এক আনন্দ সংবাদ নিয়ে শোরগোল পড়ে গেল। সাদ যখন ঘরে ফালাককে নিয়ে উন্মত্তের মতো আচরণ করছে, তখন দরজায় মীরার ধাক্কাধাক্কি আর চিৎকার আরও বেড়ে গেল।
“ভাইয়া! ভাইয়া দরজা খোলো! জলদি নিচে আসো! বড় চাচ্চু ফোন করেছেন, আমাদের ঈশান আর আয়ান ভাইয়ার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে! মা-বাবা এখনই সবাইকে নিচে ডাকছেন!”
মীরার এই খুশির খবরটা যেন সাদের উত্তপ্ত মস্তিষ্কে এক বালতি ঠান্ডা জল ঢেলে দিল। ফালাকের ওপর থেকে নিজের ভার সরিয়ে নিয়ে স্তম্ভিত হয়ে বসে রইল। ফালাক তখনো ভয়ে কাঁপছে, তার এলোমেলো চুল আর ভিজে শাড়ির অবিন্যস্ত অবস্থা তাকে আরও অসহায় করে তুলেছে।
সাদ বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। মির্জা বাড়ির দুই ছেলের — বিয়ে হওয়া মানে পুরো বংশের জন্য এক বিশাল উৎসবের আয়োজন।নিচে নামতেই দেখা গেল পুরো বাড়ি উৎসবে মাতোয়ারা। ফালাক আধো-ভেজা শাড়ি বদলে একটা মার্জিত সুতি শাড়ি পরে নিচে নামল, সাদের মা জড়িয়ে ধরলেন
“শুনেছিস ফালাক? দুই ছেলের বিয়ে একসঙ্গে! এখন তো আমাদের বাড়িতে নহবত বসবে। তুই এখন একা বউ নোস, আরও দুইজন আসছে এই বাড়িতে। এখন থেকে তোকে অনেক দায়িত্ব সামলাতে হবে মা।”
ফালাক ম্লান হাসল। এদিকে সাদ ফালাককে এক মুহূর্তের জন্যও আড়াল হতে দিচ্ছে না। সবার হাসাহাসির মাঝেও সাদের তীক্ষ্ণ নজর ফালাকের ওপর আঠার মতো লেগে আছে।
চলবে —

