ফালাক #লেখিকা_ইনায়া_জারিশ #পর্ব______৫

0
30

#ফালাক #লেখিকা_ইনায়া_জারিশ
#পর্ব______৫

আয়ান আর ঈশান—দুই জনেরই পছন্দ করা মেয়ের সাথেই বিয়েটা ঠিক হয়েছে। আয়ান বিয়ে করছে তার মেডিকেল কলেজেরই এক বান্ধবীকে, আর ঈশান বিয়ে করছে তার বন্ধুর বোনকে, যাকে সে দীর্ঘদিন ধরে মনে মনে পছন্দ করত।
বাড়ির বড়দের কাছে খবরটা পৌঁছানোর পর সবাই খুশি মনে মেনে নিয়েছেন। বড় দুই ছেলে নিজের পছন্দে ঘর বাঁধছে—এই আনন্দ পুরো বাড়ির চেহারা বদলে দিল।
সবাই ড্রয়িং রুমে বসে আড্ডা দিচ্ছে।
মীরা বলছে ” দুই ভাবিই কত অভিজাত পরিবারের! আমাদের মির্জা বাড়ির সাথে একদম মানানসই।”

দাদি পান চিবুতে চিবুতে বললেন—
“হবে না কেন? ওরা তো নিজেদের যোগ্যতায় পছন্দ করেছে। নামী-দামী ঘরের মেয়ে না হলে কি আর মির্জা বাড়ির দুই ছেলের সাথে মানায়?”

কথাটা তীরের মতো ফালাকের বুকে গিয়ে বিঁধল। দাদি যেন পরোক্ষভাবে তাকেই খোঁচা দিলেন। ফালাকের বিয়েটা কোনো পছন্দ বা আভিজাত্যের ছিল না, ছিল স্রেফ একটা ‘টাকা দিয়ে কেনা’ চুক্তি। যেখানে কোনো প্রেম ছিল না,।
ফালাক এক কোণে দাঁড়িয়ে ট্রে-তে করে মিষ্টি আর নাস্তা পরিবেশন করছে। তার চোখ ভিজে এল। ঠিক তখনই সে দেখল সাদ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। সাদের কানেও কথাগুলো গেছে। সে দেখল ফালাকের কাঁপা হাত থেকে মিষ্টির প্লেটটা পড়ে যাওয়ার উপক্রম।
সাদ এগিয়ে এসে ফালাকের হাত থেকে ট্রে-টা এক প্রকার ছিনিয়ে নিল। সাদ ভাইদের সুখী মুখগুলোর দিকে তাকাচ্ছে আর তারপর তাকাচ্ছে ফালাকের বিবর্ণ মুখের দিকে।
সাদ কোনো কথা না বলে গটগট করে উপরে চলে গেল। ফালাকের মনটা খারাপ হলো। সাদের যাওয়ার দিকে আবার নিজের দিকে তাকালো ফালাক সাদ এর ভাগ্যে জুটেছে তার মতো এক ‘গরিব ঘরের কেনা মেয়ে’।
________________

নিচের সব কাজ শেষ করতে করতে ফালাকের অনেক রাত হয়ে গেল। ফালাকের মনের ভেতর একটা অজানা আতঙ্ক কাজ করছে। দুপুরের সেই ঘটনার পর ফালাক আর ঘরে যায় নি।ভয়ে হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে।
খুব ধীরপায়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠল। সাদের রুমের দরজার সামনে গিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। তারপর বুক ধড়ফড়ানি নিয়ে ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকে
পুরো রুমটা একদম ঘুটঘুটে অন্ধকার। ফালাক দেয়াল ধরে ধরে সুইচবোর্ডের দিকে এগোতে লাগল। ঠিক যখনই সুইচে হাত দিতে যাবে, তখনই অন্ধকারের ভেতর থেকে হুট করে একটা শব্দ হলো—’টিক!’
এক মুহূর্তের জন্য একটা লাইটার জ্বলে উঠল। আগুনের সেই ছোট শিখায় সাদের মুখটা এক ভয়ংকর মূর্তির মতো দেখা গেল। আগুনের আলোয় চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। সাদ বিছানার এক কোণে বসে নির্লিপ্তভাবে সিগারেটটা ধরিয়ে নিল। আগুনের শিখাটা নিভে যেতেই আবার অন্ধকার নেমে এল ঘরে, শুধু সিগারেটের অগ্রভাগটা লাল হয়ে জ্বলছে আর নিভছে।
ফালাক ভয়ে ওখানেই জমে গেল। তার শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। কাঁপাকাঁপা হাতে লাইটের সুইচটা টিপে দিল।
পুরো ঘরটা সাদা আলোয় ভরে উঠে। সাদ একই জায়গায় বসে আছে। চোখে দুপুরের হিংস্রতাটা এখন অনেকটা থিতিয়ে এসেছে, কিন্তু সেখানে জমা হয়েছে এক গভীর বিষাদ আর গাম্ভীর্য। সাদ এক দৃষ্টিতে ফালাকের দিকে তাকিয়ে রইল।
ফালাক চট করে চোখ সরিয়ে নিল। ফালাক সাদের পাশ কাটিয়ে বিছানার অন্য প্রান্ত যাবে তখনি কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই সাদের শক্তিশালী হাতটা ফালাকের সরু কোমর জাপ্টে ধরল। এক হ্যাঁচকা টানে ফালাককে নিজের কোলের ওপর বসিয়ে নিল সাদ।
ফালাক ভয়ে কুঁকড়ে গেল। সাদের বাঁ হাতটা ফালাকের কোমরে লোহার শিকলের মতো শক্ত হয়ে জেঁকে বসেছে। ফালাক ভয়ার্ত চোখে সাদের দিকে তাকিয়ে রইল। ঘরের উজ্জ্বল আলোয় সাদের পাথুরে মুখটা খুব কাছ থেকে দেখা যাচ্ছে। তার চোখে আজ সেই আদিম লালসা নেই, বরং সেখানে জমা হয়ে আছে এক প্রচণ্ড রাগ আর অধিকারবোধ।
সাদ অনেকক্ষণ কোনো কথা বলল না। শুধু স্থির দৃষ্টিতে ফালাকের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল, যেন সে ফালাকের মনের গহিনে থাকা ভয়টা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। ফালাকের ঠোঁট দুটো কাঁপছে, নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে।

“তুই আর ছাদে যাবি না “…………..

“আমি… আমি তো শুধু কাপড় মেলতে গিয়েছিলাম। কাপড়গুলো তো ধুয়ে ছাদে দি …”
সাদের রাগ যেন আবার চড়ে গেল। ফালাকের কোমর আরও জোরে চিপে ধরল। তারপর নিজের হাতে থাকা আধপোড়া সিগারেটটা শেষবারের মতো টান দিয়ে একরাশ সাদা বিষাক্ত ধোঁয়া সরাসরি ফালাকের মুখের ওপর ছেড়ে দিল।
ফালাক কাশতে শুরু করে। ওই কড়া তামাকের ধোঁয়া নাকে-মুখে ঢুকে দমবন্ধ হওয়ার মতো অবস্থা তৈরি করল।

“কাপড় মেলার জন্য বাড়িতে দশটা চাকর আছে। তুই আর যাবি না।

চলবে —

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here