#ফালাক #লেখিকা_ইনায়া_জারিশ
#পর্ব________৬
ভোরের আকাশটা তখনো পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি, হালকা কুয়াশার চাদর জড়িয়ে আছে চারপাশ। মির্জা ভিলার এক কোণে যে বাগানটা আছে, সেখানে কয়েকটা বড় শিউলি গাছ। রাতে ঝরে পড়া অজস্র শিউলি ফুলে ঘাসের ওপর যেন সাদা-কমলা রঙের এক গালিচা বিছানো।
ফালাক আজ খুব ভোরেই উঠে পড়েছে। ভোরের এই স্নিগ্ধ বাতাসটা খুব প্রয়োজন ছিল। শিউলি গাছের নিচে হাঁটু গেড়ে বসল। পরনে একটা কলাপাতা রঙের সুতির শাড়ি, চুলে আলগা হাতখোঁপা।
দুই হাত ভরে ঘাসের ওপর থেকে টাটকা শিউলি ফুলগুলো কুড়াতে লাগল। এই ফুলের ঘ্রাণটা ফালাকের ভীষণ প্রিয়। ফুলের বোঁটার ওই গাঢ় কমলা রং আর পাপড়ির শুভ্রতা যেন তার মনের সব গ্লানি মুহূর্তের জন্য মুছে দিচ্ছে। একটা ফুল নাকের কাছে নিয়ে চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস টেনে নিল।
পুরো বাড়ি এখনো ঘুমে আচ্ছন্ন। এই সময়টুকু শুধু ফালাকের নিজের। বাগানের এই দিকটা বড় রাস্তা থেকে দূরে, তাই এখানে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা বিরাজ করে। ফালাক মনে মনে ভাবল—‘ইশ! জীবনটা যদি এই ভোরের মতো শান্ত আর সুন্দর হতো! কোনো শাসন নেই, কোনো ভয় নেই, শুধু এই শিউলি ফুলের স্নিগ্ধ ঘ্রাণ আর আমি।’
একমনে ফুলগুলো কুড়িয়ে তার শাড়ির আঁচলে জমা করছে। ভোরের শিশিরে শাড়ির পাড়টা ভিজে যাচ্ছে, কিন্তু সেদিকে তার খেয়াল নেই। এদিকে উপরের ঘরের জানলা দিয়ে হয়তো কেউ একজন এখনো তার প্রতিটি নড়াচড়া লক্ষ্য করছে।
শিউলি ফুল কুড়ানো শেষ করে ফালাক ধীরপায়ে রান্নাঘরে ঢুকল। ভোরের ওই শান্ত মুহূর্তটুকু তাকে এক অদ্ভুত শক্তি দিয়েছে। নিজ হাতে সবার জন্য নাস্তা তৈরি করতে শুরু করল। আটা মেখে গরম গরম ফুলকো রুটি আর ভাজি বানিয়ে নিলো।
হঠাৎ মনে পড়ল, গতকাল রাতে খাবার টেবিলে আয়ান বলছিলেন যে আজ হাসপাতালে পর পর তিনটা বড় সার্জারি আছে। তার মানে আজ তার নিঃশ্বাস ফেলারও সময় হবে না। ফালাক ভাবল, বাইরের খাবার খাওয়ার চেয়ে বাড়ি থেকে কিছু নিয়ে গেলে জন্য ভালো হবে।
ঝটপট একটা টিফিন ক্যারিয়ার বের করল। তাতে যত্ন করে কয়েকটা রুটি, সবজি আর কিছু ফল গুছিয়ে নিল। আয়ান ফালাকের সাথে সবসময় মার্জিত আর বড় ভাইয়ের মতো আচরণ করে। তার প্রতি মনে এক গভীর শ্রদ্ধা কাজ করে।
_______
সবাই নাস্তা ফালাক ও এটা ওটা এগিয়ে দিচ্ছে।
ঠিক সেই সময় আয়ান তৈরি হয়ে নিচে নেমে এলো। পরনে সাদা শার্ট।
“খুব দেরি হয়ে গেল আজ! মা, আমি চললাম। নাস্তা করার সময় নেই, হাসপাতালে রোগী অপেক্ষা করছে।”
তখনি ফালাক বলে ভাইয়া দাঁড়ান–
ফালাক চট করে টিফিন ক্যারিয়ারটা নিয়ে আয়ানের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।
“ভাইয়া, এই যে আপনার নাস্তা। আপনার তো আজ তিনটা সার্জারি, না খেয়ে থাকলে শরীর খারাপ করবে। আমি সব গুছিয়ে দিয়েছি, সময় পেলে একটু খেয়ে নেবেন।”
আয়ান কিছুটা অবাক হলো, তারপর এক চিলতে হাসি ফুটল আয়ানের মুখে।
“আরে ভাবি! তুমি মনে রেখেছ? আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম। সত্যি ভাবি, তুমি আসার পর এই বাড়ির সব কিছু কেমন যেন গোছানো মনে হচ্ছে। অনেক ধন্যবাদ ।”
সময় কম থাকায় আয়ান টিফিনটা হাতে নিয়ে বের হয়ে যায়। আয়ানের মনটা ভোরে গেছে আজ। নিচে থাকা সবারই এই দৃশ্য দেখে মনটা ভিড়ে গেলো।
রান্নাঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে সাদের মা ফালাকের ব্যস্ততা দেখছে। ফালাক যেভাবে সবার রুচি আর প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে কাজ করছে, তা দেখে তাঁর মনটা ভরে উঠল। তিনি মনে মনে ভাবলেন—
“মেয়েটা সত্যিই লক্ষ্মী। এই কয়েকদিনে বাড়িটা কেমন মায়ায় বেঁধে ফেলেছে। আমার ওই পাথর মনের ছেলেটাকে যদি ও একটু ঠিক করতে পারত! সাদের জেদ আর অন্ধকার যদি ফালাকের এই স্নিগ্ধতায় ধুয়ে যেত, তবে আমি শান্তি পেতাম।”
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি যখন ড্রয়িং রুমের দিকে ফিরলেন, দেখলেন সাদের বাবাও ফালাকের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছেন। সাদের বাবার মনেও এক সময় ফালাককে নিয়ে অনেক অনীহা ছিল। ফালাকের পারিবারিক পরিচয় আর ‘টাকা দিয়ে কেনা’র তকমাটা তিনি মেনে নিতে পারেননি। কিন্তু গত কয়েক দিনে ফালাকের নিঃস্বার্থ সেবা তাঁর সেই কঠোর ধারণাকে বদলে দিয়েছে।
বাইরে থেকে ক্লান্ত হয়ে ফিরলে ফালাক যেভাবে এক গ্লাস শরবত নিয়ে সামনে দাঁড়ায়, বিনয়ের সাথে জিজ্ঞেস করে—”বাবা, আপনার কি আর কিছু লাগবে?”—তাতে তাঁর দীর্ঘদিনের জমে থাকা আভিজাত্যের অহংকার গলে যাচ্ছে। তিনি মনে মনে ভাবছেন—
“এত অল্প বয়স মেয়েটার, অথচ কত বড় মন! বাড়ির বড় বউ হয়ে সব দিক সামলাচ্ছে। কিন্তু আমার ওই অবাধ্য ছেলেটা না জানি একে কত যন্ত্রণা দেয়! সাদের ওই মেজাজ আর পাশবিকতা সহ্য করার মতো ক্ষমতা কি এই মেয়েটার আছে?”
________
ড্রয়িং রুমে বসে সবাই মিলে বিয়ের বিশাল পরিকল্পনা করছে। কার্ড কেমন হবে, মেনুতে কী কী থাকবে, গেস্ট লিস্ট কত লম্বা হবে—সব নিয়ে হইচই চলছে।
ঠিক তখনই সিঁড়িতে ভারী পায়ের শব্দ শোনা গেল। সবাই একসাথে ওপরের দিকে তাকাল। সাদ সিঁড়ি দিয়ে অর্ধেকটা নেমে এসে দাঁড়িয়েছে। তার পরনে একটা কালো শার্ট, হাতাগুলো কনুই পর্যন্ত গোটানো। গম্ভীর আর রুক্ষ চেহারার দিকে তাকালে বাড়ির বাকিদের হাসি-তামাশা যেন এক নিমেষে থমকে যায়।
সাদ নিচে নামল না। ওপর থেকেই গম্ভীর গলায় শুধু দুটো শব্দ উচ্চারণ করল—
“কফি দে।”
বলেই সে কারো উত্তরের অপেক্ষা না করে আবার উল্টো ঘুরে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। তার গলার স্বরে এমন এক কর্তৃত্ব ছিল যে ফালাক আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। দ্রুত রান্নাঘরে গিয়ে সাদের পছন্দমতো কড়া করে এক কাপ কফি বানাল। কফি নিয়ে ধীরপায়ে ওপরের দিকে উঠতে লাগল।
ফালাক ঘরে ঢুকে, দেখল সাদ বারান্দার রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। রুমের ভেতরে এসি চলছে, বাইরের ভ্যাপসা গরমের মাঝেও ঘরটা বেশ ঠান্ডা। ফালাক ট্রে-টা টেবিলের ওপর রেখে নিচু স্বরে বলল—
“আপনার কফি।”
সাদের মাথার ভেজা চুল থেকে টপ টপ করে পানি পড়ছে। সাদ গোসল করে মাথা ঠিকমতো মোছেনি। কাঁধের ওপর দিয়ে পানি গড়িয়ে কালো শার্টের পেছনের অংশটা ভিজে সপসপে হয়ে আছে। সাদ বিছানায় এসে বসে ফালাকের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়। ফালাক কফির কাপটা তার হাতে দেয়, কিন্তু তার চোখ আটকে আছে সাদের ভেজা চুলে।
সাদ এক চুমুক কফি দিয়ে ফালাকের দৃষ্টি অনুসরণ করে। সে বুঝতে পারে ফালাক তার দিকে তাকিয়ে
“কী দেখছিস? এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন?”
“আপনার চুলগুলো…
সাদ কোনো উত্তর দেয় না, শুধু কফির কাপে চুমুক দেয়। ফালাক কেন জানি আজ একটু সাহসী হয়ে ওঠে। আলমারির পাশ থেকে একটা শুকনো তোয়ালে নিয়ে আসে। খুব ভয়ে ভয়ে সাদের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। কয়েক সেকেন্ড ইতস্তত করার পর সাহসে ভর করে সাদের মাথায় তোয়ালেটা চেপে ধরে। ফালাকের ছোট ছোট আঙুলগুলো তোয়ালের ওপর দিয়ে সাদের চুলে বিলি কাটছে। খুব যত্ন করে সাদের মাথাটা মুছে দিতে থাকে।
সাদ একদম স্থির হয়ে বসে আছে। আজ কোনো চিৎকার করছে না, ফালাককে সরিয়ে দিচ্ছে না। উল্টো ফালাক যখন তার খুব কাছে দাঁড়িয়ে মাথা মুছছে, তখন ফালাকের শরীর থেকে আসা টাটকা বেলি ফুলের স্নিগ্ধ সুবাস সাদের নাকে আছড়ে পড়ছে। এই মিষ্টি ঘ্রাণটা সাদের স্নায়ুগুলোকে যেন এক নিমেষে অবশ করে দিচ্ছে।
হঠাৎ করেই সাদের ভেতরের সেই আদিম সত্তাটা জেগে ওঠে। ফালাক সরে যেতে নিলেই সাদ এক হাতে কফির কাপটা ধরে রাখে আর অন্য হাত দিয়ে চোখের পলকে ফালাকের কোমর জড়িয়ে এক হ্যাঁচকা টান দেয়। ফালাক ভারসাম্য হারিয়ে সরাসরি সাদের সামনে এসে পড়ে। সাদ তাকে নিজের পায়ের মাঝখানে টেনে আনে।
সাদ যেন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। ফালাকের পেট আর নাভির মাঝখানের উন্মুক্ত অংশে নিজের মুখটা ডুবিয়ে দেয়। ফালাকের পেটের নরম ত্বকে সাদের উষ্ণ ঠোঁট আর নাকের স্পর্শ লাগতেই সারা শরীরে এক তীব্র শিহরন খেলে যায়। ফালাকের হাতের তোয়ালেটা মেঝেতে পড়ে যায়। শক্ত হয়ে সাদের চুলগুলো খামচে ধরে।
সাদ নিজের অজান্তেই ফালাকের গায়ের ঘ্রাণ নিতে নিতে পাগলপ্রায় হয়ে উঠছে। সে কী করছে তা সে নিজেও জানে না। বেলি ফুলের সুবাস আর ফালাকের শরীরের কোমলতা তাকে এক মায়াবী নেশায় ডুবিয়ে দিচ্ছে। ফালাক কাঁপছে; এই স্পর্শে ভয় আছে, আবার এক অজানা উত্তেজনাও আছে। ঘরের ভেতরের এসি-র ঠান্ডা বাতাসও যেন এখন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
ফালাকের নিশ্বাস দ্রুত হয়ে আসছে। সাদের মাথার ওপর নিজের হাত রেখে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এই মুহূর্তে মির্জা ভিলার দুই হৃদয়ের তীব্র ধুকপুকানি আর এক অবদমিত তৃষ্ণা।
সাদের স্পর্শের তীব্রতা এখন নেশার মতো বাড়ছে। পেটের ওপর তপ্ত নিঃশ্বাস আর মুখ ডুবিয়ে রাখাটা ফালাককে পাথর করে দিয়েছে। সাদের এক হাত ফালাকের কোমরে ইস্পাতের মতো শক্ত হয়ে চেপে বসে আছে, আর অন্য হাত থেকে কফির কাপটা কখন পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে…..
সাদ হঠাৎ মুখ তুলে ফালাকের চোখের দিকে তাকায়। রক্তবর্ণ চোখ দুটো এখন ঘোলাটে, তাতে এক আদিম তৃষ্ণা আর তীব্র অধিকারবোধ ছটফট করছে। ফালাকের কাঁপাকাঁপা ঠোঁট আর ভয়ার্ত চাউনি দেখে সাদের ভেতরের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি ভেঙে যায়। ফালাককে এক ঝটকায় বিছানায় শুইয়ে দেয় এরপর তার ওপর নিজের ভারী শরীরটা এলিয়ে দেয়।
ফালাক দুহাত দিয়ে সাদের বুক ঠেলতে চায়, কিন্তু সাদের শক্তির কাছে সে খড়কুটোর মতো অসহায়। সাদ ফালাকের দুহাত মাথার ওপর চেপে ধরে বিছানার সাথে গেঁথে ফেলে। ফালাকের শাড়ির আঁচলটা অবিন্যস্ত হয়ে মেঝেতে লুটোপুটি খাচ্ছে। সাদের ভিজে চুলের কয়েক ফোঁটা জল ফালাকের কপালে আর গলায় পড়ছে, যা এই আগুনের মতো উত্তপ্ত মুহূর্তে হিমশীতল স্পর্শের মতো লাগছে।
সাদ আবার ফালাকের গলার সেই নীল দাগগুলোর ওপর নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দেয়। তবে এবার তাতে আক্রোশ কম, নেশা বেশি। ফালাকের শরীরের প্রতিটি ভাঁজে নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। ফালাকের কান্নার শব্দ আজ আর বেরোচ্ছে না, কেবল এক গভীর দীর্ঘশ্বাস বুক চিরে বেরিয়ে আসছে। সাদের এই বন্য ভালোবাসার কাছে ফালাক নিজেকে সমর্পণ করতে বাধ্য হচ্ছে।
ঘরের এসি-র তাপমাত্রা অনেক কমানো থাকলেও, সাদের দেহের উত্তাপে ফালাক ঘামতে শুরু করেছে। বেলি ফুলের সেই মৃদু ঘ্রাণ এখন সাদের কড়া পারফিউমের সাথে মিশে এক অদ্ভুত মাদকতা তৈরি করেছে। সাদ ফালাকের ব্লাউজের বাকি বোতামগুলো খুলে ফেলল।
বাইরে তখন দুপুর রোদে খাঁ খাঁ করছে বাগান, নিচে বাড়ির সবাই বিয়ে নিয়ে হাসি-তামাশায় মত্ত, অথচ এই বদ্ধ ঘরের ভেতরে সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। সাদ ফালাকের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরে তার সবটুকু আর্তনাদ শুষে নেয়। একে অপরের নিশ্বাসের শব্দ এখন ঘরের নিস্তব্ধতাকে চুরমার করে দিচ্ছে।
দীর্ঘক্ষণ ধরে চলে সেই আদিম মিলন। সাদ আজ শুধু ফালাকের শরীর ভোগ করছে না, সে যেন ফালাকের আত্মার ওপর নিজের নাম খোদাই করে দিচ্ছে।
চলবে —

