ফালাক #লেখিকা_ইনায়া_জারিশ #পর্ব__________৮

0
28

#ফালাক #লেখিকা_ইনায়া_জারিশ
#পর্ব__________৮

মির্জা ভিলার ফটক থেকে শুরু করে ছাদ পর্যন্ত বর্ণিল আলোকসজ্জায় সেজে উঠেছে। আজ আয়ান আর ঈশানের গায়ে হলুদ। বাড়ির প্রতিটি কোণে এখন উৎসবের আমেজ। সারা বাড়ি সাজানো হয়েছে।বাগানের গাছগুলোতে ছোট ছোট মরিচ বাতিগুলো জোনাকির মতো জ্বলছে। সন্ধ্যা নামার আগেই বাড়িটা আত্মীয়-স্বজন আর কাজিনদের কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে ওঠেছে।
বাড়ির উঠানে বিশাল প্যান্ডেল করা হয়েছে। একপাশে হলুদ আর সাদা কাপড়ের কারুকাজ করা স্টেজ, যেখানে দুই বর আয়ান আর ঈশান বসবে। চারদিকে কাঁচা হলুদের ঘ্রাণ আর সুগন্ধি ফুলের মৌ মৌ গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে আছে। আত্মীয়দের ভিড়ে তিল ধারণের জায়গা নেই। কাজিনরা হুল্লোড় করে বেড়াচ্ছে।
মীরা আর ফারহান আজ সবচাইতে ব্যস্ত। সে তার বান্ধবীদের নিয়ে নাচের মহড়া দিচ্ছে। ফারহান পাঞ্জাবি পরে এদিক-ওদিক ছুটছে । ড্রয়িং রুমে বসে কাজিনরা উচ্চস্বরে হাসাহাসি করছে, কেউ কেউ আবার সেলফি তোলায় ব্যস্ত। সব মিলিয়ে বাড়িটা যেন একটা জীবন্ত উৎসবে পরিণত হয়েছে।
কিন্তু এই এত হাসিখুশি আর আলোর ভিড়েও একটা অন্ধকার কোণ রয়ে গেছে। সেটা হলো সাদের অনুপস্থিতি। মির্জা বাড়ির বড় ছেলে, যার নেতৃত্বে এই আয়োজন হওয়ার কথা ছিল, সে আজ সাত দিন ধরে নিখোঁজ। এসব যদিও সবার কাছে স্বাভাবিক সাদ প্রায়ইসাউন্ড সিস্টেম ঠিক করার জন্য বাড়ি থেকে চলে যায় অনেকদিন আসে না। তবে ফালাক এর কাছে অস্বাভাবিক। তার মনটা খুঁজতে থাকে সাদকে। একেই হয়তো বলে তিন কবুলের টান।

বাড়ির বড় বউ হিসেবে সবার আপ্যায়নের দায়িত্ব পালন করছে। মেহমানদের শরবত দেওয়া, নাস্তার প্লেট এগিয়ে দেওয়া—সবই সে যান্ত্রিকভাবে করে যাচ্ছে। তার মনটা পড়ে আছে অন্য জায়গায়।
আত্মীয়রা কানাঘুষা করছে। একজন বলে উঠলেন—
“বড় ছেলেটার দেখা নেই কেন?
_______
বাড়িজুড়ে উৎসবের উন্মাদনা এখন চরমে। ম ম গন্ধে ভরে আছে চারপাশ—গাঁদা ফুলের সুবাস আর কাঁচা হলুদের ঘ্রাণ মিলেমিশে একাকার। মীরা আর ফারহান বন্ধুদের নিয়ে ড্রয়িং রুমে নাচের শেষ মুহূর্তের রিহার্সাল দিচ্ছে। সাউন্ড বক্সে তারস্বরে বাজছে বিয়ের গান। একটু পরেই আয়ান আর ঈশানকে নিয়ে সবাই স্টেজের দিকে যাবে।
ফালাক আজ এক মুহূর্তের জন্য বসার সুযোগ পায়নি। বাড়ির বড় বউ হিসেবে সব দায়িত্ব যেন তার কাঁধেই। ড্রয়িং রুমে এসে মেহমানদের শরবত আর মিষ্টি এগিয়ে দিচ্ছে। আত্মীয়স্বজনেরা তাকে ঘিরে নানা প্রশ্ন করছে, কেউ কেউ প্রশংসা করছে তার রূপের, কিন্তু ফালাকের সেসব শোনার সময় নেই।
হাতে একটা রুপালি ট্রে-তে সাজানো মিষ্টি নিয়ে স্টেজের দিকে এগিয়ে যায়। সেখানে গিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে সব ঠিক আছে কি না। পিতলের বাটিতে কাঁচা হলুদ বাটা, রঙিন ডালিতে সাজানো ফলমূল, মাঝখানে বড় একটা কেক—সবকিছু একদম নিখুঁত। ফালাক একটা তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলে। আয়ান আর ঈশানের এই বিশেষ দিনটা যেন কোনোভাবেই নষ্ট না হয়, সেদিকেই তার সব খেয়াল।

কাজ শেষ করে ফালাক যখন ওপরের দিকে পা বাড়ায়, তখন তার অবস্থা বেশ আলুথালু। সারাদিনের খাটুনিতে মাথার ক্লিপটা ঢিলে হয়ে চুলগুলো পিঠের ওপর ছড়িয়ে পড়েছে। এক হাতে একটা বড় ফুলের ডালা, যাতে ঠাসা হলুদ গাঁদা ফুল। অন্য হাত দিয়ে বারবার উড়ন্ত চুলগুলো সামলানোর চেষ্টা করছে সে। তার এখন জরুরি একটা হেয়ার ব্যান্ড দরকার।
ধীরপায়ে নিজের রুমের সামনে এসে দাঁড়ায়। সারা বাড়ি তখন আলোয় ঝলমল করছে, প্রতিটি বারান্দায় মরিচ বাতির রোশনাই। কিন্তু ফালাক দরজায় হাত দিয়ে ধাক্কা দিতেই দেখে ভেতরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। ফালাক আলতো করে পা টিপে ঘরে ঢোকে। অন্ধকারের ভেতর আবছা আসবাবপত্র দেখা যাচ্ছে। দেয়াল হাতড়ে সুইচবোর্ডের কাছে যায়। ‘টিক’ করে সুইচে চাপ দিতেই পুরো ঘর দুধে-সাদা আলোয় ঝলমলিয়ে ওঠে।
আর ঠিক তখনই ফালাকের হৃদপিণ্ড যেন থমকে গেল।
বিছানার পাশের ইজি চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে সাদ। তার পরনে কালো শার্টটা, দুই পা সামনের টেবিলের ওপর তোলা। এক দৃষ্টিতে ফালাকের দিকে তাকিয়ে আছে—
ফালাক: “আহ্!”
হঠাৎ এই দৃশ্য দেখে ফালাক এতটাই আঁতকে ওঠে হাতে থাকা গাঁদা ফুলের ডালাটা সজোরে মেঝেতে পড়ে যায়। ফুল ছিটকে গিয়ে সাদের পায়ের কাছে আর সারা মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ে। ফালাক পাথরের মতো দাঁড়িয়ে কাঁপছে, তার বড় বড় চোখ দুটো ছানাবড়া। ফালাকের বুকটা ওঠানামা করছে। সাতটা দিন… দীর্ঘ সাতটা দিন এই মানুষটার কোনো চিহ্ন ছিল না। অথচ এখন সে চোখের সামনে রক্তমাংসের মানুষ হয়ে বসে আছে।

“সাদ- কখন এলো!ফালাক কাঁপাকাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করে—
“আপনি… আপনি কখন এলেন? সাদ কিছু বলে না।

বাড়িতে এতো মানুষ, সবাই আপনার খোঁজ করছিল।”

সাদের মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই তার মনে কী চলছে। কোনো উত্তর দেয় না, যেন ফালাকের অস্তিত্বই তার কাছে এখন গৌণ।
পকেট থেকে একটা সিগারেটের প্যাকেট বের করে। লাইটারের একটা তীক্ষ্ণ ‘ক্লিক’ শব্দ হয়, আগুনের শিখায় সাদের রুক্ষ মুখটা এক মুহূর্তের জন্য উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। গভীর একটা টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ে। সাদের এই মৌনতা ফালাকের মনে হাজারটা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। মানুষটা কি রেগে আছে? এই সাত দিন কোথায় ছিলো।
ফালাক অপলক দৃষ্টিতে সাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। গত সাত দিনে কতবার ভেবেছে। কিন্তু এখন সামনাসামনি দাঁড়িয়ে ফালাকের গলা দিয়ে কোনো স্বর ফুটছে না। ফালাক মেঝেতে পড়ে ফুলগুলো হাত দিয়ে কুড়োতে থাকে। তার চুলে সেই ব্যান্ডটা লাগানো হয়নি, তাই অবাধ্য চুলগুলো বারবার চোখের সামনে এসে পড়ছে।
সাদ একবার ঘাড় ঘুরিয়ে ফালাকের দিকে তাকায়।

ফালাক কথা বলতে গিয়ে তোতলাচ্ছে।
“আ… আমি… আমি জানতাম না আপনি এখানে। আমি শুধু একটা ব্যান্ড নিতে এসেছিলাম।”
সাদ আস্তে করে তার পা দুটো টেবিল থেকে নামাল।
চেয়ারের পাশেই টেবিল রাখা ব্যান্ড। ফালাক নিতে আসে হাত বাড়িয়ে। এতে সাদের কাছে চলে আসে কিছুটা।। ফালাক আসতেই সাদের নাকে বেলি ফুলের সুবাস আসে। নাক টেনে একবার ঘ্রান নেয়।।

ফ্লাসব্যাক*____

মির্জা ভিলার ফটক দিয়ে সাদের কালো জিপটা ভেতরে ঢুকল, তখন বাড়ির ভেতর উৎসবের ডামাডোল তুঙ্গে। সাদের মেজাজটা এমনিতেই সপ্তমে চড়ে আছে। আয়ান আর ঈশান যেভাবে দিনরাত তাকে ফোন করে আর মেসেজ দিয়ে অতিষ্ঠ করে তুলেছে, তাতে না এসে উপায় ছিল না। ভাই দুটোর এই জেদ আর “তুই না এলে বিয়ে করব না” এসব ই টেনে এনেছে।
গাড়ি থেকে নামতেই ঝা চকচকে আলোকসজ্জা আর আত্মীয়দের ভিড় দেখে সাদের ভেতরে এক তীব্র বিতৃষ্ণা জন্ম নিল। বিড়বিড় করে বলল—
“ফালতু যত সব আদিখ্যেতা!
পকেটে হাত দিয়ে হনহনিয়ে ভেতরে ঢুকল। সাদ কারো দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে সোজা সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল।
ঠিক সেই মুহূর্তে সিঁড়ির বাঁকে সাদের দৃষ্টি হঠাৎ থমকে গেল। ওপর থেকে নেমে আসছে ফালাক।
বাসন্তী রঙের সুতির শাড়িটা ফালাকের গায়ের দুধে-আলতা রঙে যেন এক নতুন মায়া ছড়িয়েছে। হাতে কাঁচের চুড়িগুলোর রিনঝিন শব্দ সিঁড়িতে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
সাদ এক মুহূর্তের জন্য পাথরের মতো দাঁড়িয়ে পড়ল। সাদের রুক্ষ আর বিশৃঙ্খল মস্তিষ্কে কে যেন হঠাৎ এক মুঠো স্নিগ্ধতা ছুঁড়ে দিল। বাসন্তী রঙে মেয়েটাকে অপার্থিব রূপবতী বলে মনে হচ্ছে। সাদের কঠোর চোখের চাহনি এক মুহূর্তের জন্য শিথিল হয়ে এল। সে অপলক দৃষ্টিতে ফালাকের ওই মায়াবী মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল। কেন জানি সাদের মনে হলো, এই সাত দিনে মেয়েটা যেন আরও একটু বেশি সুন্দর হয়ে গেছে। নাকি এতো দিন পর দেখল তার জন্য বেশি সুন্দর মনে হচ্ছে কেন জানে।
ফালাক সিঁড়ি দিয়ে নেমে চলে গেল। কিন্তু সাদের দিকে একবারও তাকাল না। তার চোখ নিচে, সে ব্যস্ত হয়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। হয়তো আত্মীয়দের জন্য কোনো নাস্তা বা শরবত আনতে যাচ্ছে। সে টেরই পেল না যে তার ঠিক পাশেই সেই মানুষটা দাঁড়িয়ে আছে, যার জন্য সে সাত দিন ধরে চাতক পাখির মতো প্রতীক্ষা করেছে।
ফালাক রান্নাঘরের আড়ালে চলে যেতেই সাদ যেন সম্বিৎ ফিরে পেল। দ্রুত নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নিল। তার বুকের ভেতর একটা অজানা ধকধকানি শুরু হয়েছে যা সে ঘৃণা করে। নিজেকে সামলে নিয়ে সে দাঁতে দাঁত চেপে সাদ বড় বড় পা ফেলে ওপরে নিজের রুমে চলে গেল।

_____বর্তমান*_____

এসিকে টেবিল থেকে ব্যান্ড নেওয়ার সময় সাদের কাছাকাছি যেতে সাদের গায়ের পুরুষালি ঘ্রাণ ফালাকের নাকে আসতেই সে চোখ বন্ধ করে ফেলে। ফালাকের বুক ধড়ফড় করছে।
এরপর হঠাৎ ই……..

চলবে –
( আজকে রোজা ছিলাম তাই গল্প দিতে late হলো,, sorry সবাইকে 🥹)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here