#শূন্য_অর্থ_পূর্নতা(১১)
(নওশাদ এর কি হলো? )
…
হুর তাহাজ্জুদ এর নামাজ পড়েছিল তখন, আইভি হয়তো ঘুমিয়েছে।হুর হাঁটু অবধি বড়ো একটা হিজাব পড়ে আছে ।নিচে একটা ফ্রক আর প্লাজু পড়া । খুব স্নিগ্ধ লাগছিল তাকে । হঠাৎ হুর লক্ষ্য করলো কেউ তাকে দেখছে।মনের মধ্যে একগাদা সংশয় নিয়ে তসবিহ রেখে উঠে দাড়ালো ।ভীতু দৃষ্টি হুরের , হঠাৎ একটা ছায়ামূর্তি দেখে থমকে গেলো।
নিশ্চিত হতে দুপা এগিয়ে গিয়ে ভয়ে পিছিয়ে গিয়ে মৃদু চিৎকার দিলো । এরপর জোড়ে ডাকতে নিলো- পাপা!
মুখটা চেপে ধরলো কেউ , ছটফট করছে অনবরত হুর।ভয়ে মুখটা শুকিয়ে গিয়েছে।
ফিসফিস গম্ভীর স্বরে লোকটা বললো- চুপ একদম চুপ।এখন সোজা গিয়ে লাইট অন করবে ।কোনো চালাকি করলে খবর আছে ।
হুর সেটাই করলো পুতুল এর মতো ।
লাইট জালিয়ে আগন্তুক এর দিকে ফিরেই অবাক হয়ে গেলো- আপনি!
নওশাদ বুকে হাত গুজে বললো- হ্যাঁ আমি ,তুমি তো আমাকে ভুলে গিয়েছো তাই না? সত্যি ই ভুলে গিয়েছো ? নাকি নাটক করছো ?
নওশাদ কথাটা সন্দিহান আর রাগী স্বরে মিলিয়ে বললেও হুর বুঝলো অন্যটা ,সে ভাবলো তার স্বামী হয়তো কষ্ট পেয়েছে সে তাকে ভুলে যাওয়ায় ,তাই হুর মাথাটা নিচু করে ফেললো ,কোমল কন্ঠে বললো – আমি সত্যি ভুলে গিয়েছি ? আপনি কি কষ্ট পাচ্ছেন? আমি দুঃখিত আপনাকে আজ আঙ্কেল বলে ফেলেছি ।আপনি কি রাগ করেছেন?
নওশাদ এর চেহারা দেখার মতো হলো ,ধপ করে পাশে রাখা চেয়ারে বসে পড়লো ,কিছু বলার ভাষা নেই তার কাছে এখন ,হুর তারাতারি করে একগ্লাস পানি এনে নওশাদ কে দিলো । নওশাদ সেটা নিয়ে ঢকঢক করে এক নিমিষেই সাবার করে ফেললো।
এরপর হুরের দিকে তাকিয়ে হাতের ইশারায় বললো- এদিকে আসো ।
হুর বাধ্য মেয়ের মতো এগিয়ে গেলো । নওশাদ হুরকে তার সামনাসামনি বিছানায় মুখোমুখি হয়ে বসতে বললে হুর তাই করলো ।
নওশাদ – আমার চোখের দিকে তাকাও তো হুর ।
হুর শান্ত ভাবেই তাকালো, নওশাদ সরু চোখে হুরকে পরখ করলো ,না এটা নাটক মনে হচ্ছে না।
কিন্তু হঠাৎ হুর লাফিয়ে উঠে বললো- আপনি এখানে কি করে আসলেন? বাহিরে তো অনেক গার্ড।
নওশাদ ফোস করে শ্বাস ছাড়লো ,কি বলবে? থ্রেট দিতে এসেছে?আসলে দেখতে এসেছিল হুরের কিছু মনে আছে নাকি ।মনে থাকলে থ্রেট দিয়ে চলে যেত ।
নওশাদ ফট করে বললো – তোমাকে দেখতে এসেছি ।
এরপর নিজেই চোখ বড়বড় করে ফেললো,এটা কি বলেছে ও? কিন্তু হুরের দিকে তাকাতেই সবকিছু উলট পালট হয়ে গেলো ।
মেয়েটা লজ্জা পেয়েছে বোধহয়,ফোলা ফোলা গাল দুটো লাল হয়ে গিয়েছে। এমনিতেই লাল তার উপরে আবার লজ্জা পেয়েছে ।
নওশাদ মনে মনে ভাবে- হুর তোমার যদি সব মনে থাকতো এভাবে লজ্জা তো দূর কেঁদেও কুল পেতে না ।যত তাড়াতাড়ি হোক তোমাকে আমার সাথে নিয়ে যেতে হবে ।নাহলে তুমি সব কাহীনি উল্টে দিবে ।আমি তোমাকে সব বুঝিয়ে বলবো ।
হুর – আপনি রাতে খেয়েছেন?
নওশাদ নিজের চিন্তা থেকে বেরিয়ে এলো ,হুরে দিকে তাকিয়ে বললো- আমি এখন আসি ।
নওশাদ খেয়াল করলো হুর কিছু বলতে চাইছে ,তাই নওশাদ জিজ্ঞেস করলো – কিছু বলবে তুমি ?
হুর মাথা নাড়ালো ,চোখ পিটপিট করে বললো- আমাদের কি আবার বিয়ে হবে?
নওশাদ এর হাসি পেলো , কিন্তু হাসলো না – হ্যাঁ হবে ।
হুর তড়িঘড়ি করে বললো- পাপা মাম্মা চাইবে বড়ো অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে আপনি প্লিজ না করে দেবেন।
নওশাদ অবাক হলো , অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে তার কোনো সমস্যা নেই কিন্তু তার আগে এই মেয়ের সব মনে পড়ে গেলে অনুষ্ঠান তো দূরে থাক বিয়েই হবে না।
– আচ্ছা ঠিক আছে কিন্তু কারন টা বলো।
হুর – আসলে ইসলামে বিয়ে হওয়া উচিত সাদামাটা, শান্তিপূর্ণ।
১.নাচ-গান, মিউজিক, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা বা পর্দা লঙ্ঘন হলে তা ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ নয়।
২.অযথা খাবার নষ্ট করা বা অতিরিক্ত সাজসজ্জায় অর্থ অপচয় করা ইসলামে হারাম বা গর্হিত কাজ ।
৩.রাসূল (সা.) বলেছেন, “সবচেয়ে বরকতময় বিয়ে হলো সেটিই, যাতে সবচেয়ে কম খরচ হয়”
এতে অপচয় বৈকি কিছুই হয়না।
নওশাদ মুগ্ধ হয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো কথাগুলো শুনলো , এরপর হুরকে বললো- অবশ্যই তোমার ইচ্ছে পুরন হবে ।
হুর আবারো বলে উঠলো – শুনুন?
নওশাদ – হুম ,বলো.
হুর – এশার নামাজ আদায় করেছেন?
নওশাদ কি বলবে বুঝতে পারলো না,হুরের সামনে নিজেকে এভাবে তুলে ধরতে ইচ্ছে করলো না তাই মিথ্যা বললো- হ্যাঁ পড়েছি ।
হুর খুব খুশি হলো যেন , মুচকি হেসে বললো- আলহামদুলিল্লাহ, এখন তাহলে বাসায় গিয়ে তাহাজ্জুদ পরুন । ইনশাল্লাহ আল্লাহ নিশ্চয়ই ভালো কিছু রেখেছে আমাদের জন্য।
নওশাদ ধীর পায়ে বারান্দায় এলো ,হুর ও পিছু পিছু এলো ,- কীভাবে যাবেন?
নওশাদ – লাফ দিয়ে।
কথাটা বলে লাফ দিয়ে নিচে নেমে গেলো ।হুর ভয় পেয়ে মুখে হাত দিলো ।
নওশাদ হাত নাড়িয়ে বিদায় নিল ,হুরকে রুমে যেতে ইশারা করলো ।
হুর রুমে চলে যেতেই নওশাদ হাফ ছেড়ে বাঁচলো। মিথ্যা বলে আজ জীবনের প্রথম বার এতো খারাপ লাগছে ।
তীক্ষ্ণ চোখে আসেপাশে দেখে এগোতে নিল ঠিকই কিন্তু এগোতে পারলো না ,ঠিক কপালের মাঝবরাবর চকচকে সোনালী রঙের বন্দুক টা ঠেকিয়ে রেখেছে সুঠামদেহী একজন লোক ।
তার লোমে আবৃত ফর্সা বলিষ্ঠ হাত দেখে নওশাদ অবাক হলো ,মনে পড়ে গেলো তার জীবনের মূল্যবান পাঁচ বছরের জীবন।এই হাত ,সেই বন্দুক,সেই ব্রেসলেট!
তীক্ষ্ণ চোখের চাহুনি।
নওশাদ অবাক হলো ,এই লোকটার সাথে ও কাকে যেন গুলিয়ে ফেলছে!
– আপনি!আপনি তো ইতালিতে ছিলেন? তাহলে এসব কি?
সামনের লোকটা কিঞ্চিৎ পরিমাণ অবাক হলেও প্রকাশ করলো না, কতগুলো গার্ড এসে নওশাদ কে আটকে ফেললো ।
সামনের লোকটা বললো – বড়ো ভুল করলে নওশাদ, সত্যি টা লুকিয়ে, আমার প্রিন্সেস কে ঠকাতে চাইছো তোমার কলিজা ছিঁড়ে রাখার ক্ষমতা আমি রাখি ।
নওশাদ কে একটা অন্ধকার রুমে রাখা হলো ,মৃদু আলো জলছে। নওশাদ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লোকটাকে দেখে চলেছে ।
…..
কড়া হলুদ আলো আসছে একটা রুম থেকে,একটা লোকের মৃদু আর্তনাদ ভেসে আসছে । একজন কালো আলখাল্লা পড়া লোক সেখানে প্রবেশ করলো ।সামনে ছটফট করছে একটি প্রান ।
তাতে লোকটার কিছু যায় আসলো না হাতে ছুরি নিয়ে লোকটার গালে স্লাইড করতে করতে বললো – মেহবুবা চৌধুরী হুর এর নামে মিথ্যা ইনফরমেশন কেন দিয়েছিলি ?
আহত লোকটা কিছু বললো না। আগন্তুক রেগে চাকুটা আহত ব্যাক্তির হাতের তালুতে গেথে দিলো ।
– বস তোকে পিটিয়েছে আমি তোকে গরম ফুটন্ত পানিতে চুবাবো । এরপর ধীরে ধীরে তোর শরীর থেকে মাংস আলাদা করবো । সত্যি বললে বেচে যেতে পারিস ।
আহত লোকটা – বলছি বলছি ,ছেড়ে দিন , আমাকে কেউ একজন বলেছিল এটা করতে ।
আহত লোকটা কিছু বলতে যাবে তার আগে একটা বুলেট লোকটার মাথা এফোঁড় ওফোঁড় করে দিলো । আগন্তুক শান্ত হয়ে বসে রইলো ,ধীরে ধীরে কয়েকটা শব্দ বললো- দেখ যার হয়ে কাজ করেছিলি সেই লোক নিজেকে বাঁচাতে তোকে মেরে দিলো ।তোর থেকে না জানতে পারলেও ওকে ঠিকই বের করে নেব ।
নিজেকে খুব চালাক মনে করে ,পিঠপিছে ছুঁড়ি মেরে বেশিদিন লুকাতে পারবি না ।
এখন রাত দুটো বাজে , আলখাল্লা পড়া লোকটা বেরিয়ে এলো জায়গাটা থেকে । নির্জন রাস্তায় একাকি হাঁটতে লাগলো ।
হাতের ফোন এর কিছু লেখা টাইপ করে ম্যাসেজ টা সেন্ড করে দিলো ।
…..
সকাল দশটা ,,,,
এয়ারপোর্ট থেকে বের হলো সাদিক চৌধুরী। গন্তব্য হুর মহল , ব্লেজার খুলে হাতে ঝুলিয়ে রেখেছে । এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে নিজেই ড্রাইভ করে যেতে লাগলো ।ব্যাকসিট এ প্রচুর গিফট রাখা আছে ।হুরের মতোই চোখ সবুজ রঙের।মায়ের চোখের রং পেয়েছে ছেলে মেয়ে দুজনই।তবে হুরের থেকেও সাদিক মারাক্তক সুন্দর।গালে চাপদাড়ি বিদ্যমান থাকায় আরোও আকর্ষণীয় লাগে ।
কিছুদূর যেতেই গাড়ি ব্রেক কষতে হলো ,নেমে দেখলো একটা মেয়ে কানে হাত দিয়ে নিচে বসে আছে ।সাদিক এগিয়ে গেলো – হেই মিস ? আপনি ঠিক আছেন?উঠে পরুন কিছু হয়নি আপনার।
এতো সুন্দর কন্ঠ সুনে ভীতু দৃষ্টিতে মেয়েটা তাকালো ,তাকাতেই যেন পলক ফেলতে ভুলে গেলো ।এই সুন্দর পুরুষ টির কন্ঠ আরোও বেশি সুন্দর।
চোখের সামনে তুড়ি বাজাতেই মেয়েটা নজর ফিরিয়ে নিলো ।
সাদিক মুচকি হাসলো ,সামনে ছিমছাম গড়নের একটা মেয়ে ,পড়নে কমদামি সস্তা একটা জামা । তবুও যেন স্নিগ্ধ লাগছে ।
সাদিক খেয়াল করে দেখলো মেয়েটার হাত থেকে রক্ত ঝড়ছে ,সাদিক তাই দ্রুত বললো- মিস আপনি আমার সাথে আসুন,আপনাকে আমি নামিয়ে দিচ্ছি যেখানে যেতে চান । আপনার হাত থেকে রক্ত ঝড়ছে ।
মেয়েটাও অদ্ভুত ভাবে মন্ত্রমুগ্ধের মতো মাথা নাড়িয়ে সাদির সাথে গেলো।গাড়িতে বসে সাদি ব্যান্ডেজ করে দিলো ।মেয়েটা তখনও চেয়েছিল।
সাদি মুচকি হেসে বললো – আপনার নাম টা মিস!
হুমায়রা কেঁপে উঠলো, নিজের সপ্ন পুরুষ কে নিজের সামনে দেখলে কেই বা ঠিক থাকতে পারে?
হুমায়রা মাথা নিচু করে বললো- জি হুমায়রা ।
সাদি আবারো হাসলো , হুমায়রার ইচ্ছে করলো সেদিকে সারাক্ষণ চেয়ে থাকতে বেহায়ার মতো কিন্তু সাদির প্রশ্নে মন খারাপ হয়ে গেলো ।
– কোথায় নামবেন মিস মায়রা ?
হুমায়রা তাকিয়ে দেখলো আশ্রম এসে গিয়েছে তাই বললো- এখানে নামবো ।
হুমায়রা তাকে ধন্যবাদ দিয়ে চলে গেলো ।
সাদি ও চলে গেলো নিজ গন্তব্যে, কিন্তু সাদি দেখলো না তার যাওয়ার পর সেই রাস্তায় এসে হুমায়রা দাঁড়িয়েছে ।চোখ টলমল করছে পানিতে ,হাতে একটা সাদা গোলাপ।
সাদি যেখানে গাড়ি টা থামিয়েছিল সেখানে ফুলটা রেখে দিয়ে বললো- তিনবছর আপনাকে এভাবেই গোলাপ দিয়ে এসেছি গোপনে । জানিনা কোথায় হারিয়েছিলেন,কখনোই সাহস করিনি আজকেও করলাম না ।তাই গোলাপ আপনার অগোচরে রেখেই পালাতে হলো ।
চোখের পানি মুছে এগিয়ে গেলো আশ্রম এর দিকে ।
….
হুর ঘুমে তলিয়ে আছে , তখনই মনে হলো তার মুখের উপর কেউ ঝুঁকে আছে ।চোখ মেলতেই অবাক হয়ে চিৎকার দিয়ে ছড়িয়ে ধরলো । সাদিক হকচকিয়ে গেলো ।সে মাত্রই পানির ছিটা দিয়ে নিয়েছিল। প্ল্যান ভেস্তে গেলো ।যাই হোক বোনকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খেলো ।তার মিষ্টি বোনটা তাকে ছাড়া কিছুই বোঝে না।
হুর কাদো কাদো হয়ে বললো- ভাইয়া তুমি খুব খারাপ আমাকে কিছু বলোনি কাল । তোমার বিয়ে হবে একটা শাকচুন্নির সাথে যাও অভিশাপ দিলাম।
সাদি হেসে ফেললো বোনের কথায়,একটা নীল গোলাপের তোড়া এগিয়ে দিলো – এই নে হুর পাখি তোর নীল ফুল।আমার কপালে সুন্দর বউই আছে ,এই দেখ তোর চেয়েও সুন্দর আমি ।
শুরু হয়ে গেলো দুই ভাই বোনের গবেষণা,কে বেশি সুন্দর।হুর তার হাত আর সাদির হাত একসাথে করলো ।
– এই দেখো সাদ ভাই ,আমি তোমার থেকে সুন্দর, আমার হাতের নখগুলো কত্ত গোলাপী। তোমার নখগুলো কেমন যেন ইশ গিদর গিদর লাগে ছিঃ।
সাদি উচ্চ স্বরে হেসে ফেললো – আমার আঙুল গুলো তোর থেকে বড়ো দেখ ,তোর গুলো খাটো খাটো ,যা বাচ্চাদের সাথে ঝগড়া করতে হয় না ,
আমার চোখ দেখ হুর পাখি তোর থেকেও সুন্দর থেকেও সুন্দর।
হুর মুখটা বাংলার পাঁচ করে উঠে দাড়ালো – আমি মাম্মা,পাপা কে জিজ্ঞেস করবো হুহ, তোমার থেকেও আমার চোখ সুন্দর।আমি সুন্দর তুমি কাইল্লা বিড়াল ।
আইভি জোরে জোরে বলতে শুরু করলো – কাইল্লা বিড়াল, কাইল্লা বিড়াল ।
চলবে কি?
মিহিকা রোজা- Black Rose
আগের পর্ব:
https://www.facebook.com/61573741746335/posts/122169577286791391/?app=fbl

