শূন্য_অর্থ_পূর্নতা(১৪)

0
33

#শূন্য_অর্থ_পূর্নতা(১৪)

হুর তখন নওশাদ এর বাড়িতে তার রুমে ছিলো , কাঁচের জানালা দিয়ে বাইরে সবকিছু দেখা যায়, সেদিন ও আচমকা ওর বাবার গাড়ি দেখতে পেয়ে প্রথমে বিশ্বাস করেনি, পরে নিচে নেমে নিজের বাবাকে দেখে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।
এতোটুকু মনে পড়তেই ঘুম থেকে উঠে গেলো , ঝাপসা কিছু মনে পড়ছে , তবে পুরোটা কেন মনে পড়ছেনা বুঝতে পারলো না।হাতে মেহেদির লাল রং জ্বলজ্বল করছে। সেখানে “হাবিবি” লেখা জ্বল জ্বল করছে।
হুরকে আহিয়া মেহেদি পরিয়ে দিয়েছে , কিছুদূর এ আহিয়া তার ছোটো বোন কে মেহেদি দিয়ে দিচ্ছিল ।

হুর উঠে ফ্রেশ হতে গেলো , ফ্রেশ হয়ে এসে কিছুক্ষন কুরআন তিলাওয়াত করলো । তখুনি ইয়াসমিনা চৌধুরী ভেতরে প্রবেশ করলেন।তিনি আজ পাকিস্তানি থ্রিপিস পড়েছেন মাথায় ওড়না টানা ।হুর বেশ অবাক হলো তার মাকে সে কখনোই এরকম পোশাক এ দেখেনি । সবসময়ই তার পোশাকে আধুনিকতার ছোঁয়া থাকতো ।
হুর দীর্ঘশ্বাস ফেলে, সে কখনোই তার মাকে বোঝাতে পারেনি, তবে সে পাঁচ ওয়াক্তের নামাজ বাদ দেয় না ।হুর তার বাবাকে প্রথম যেদিন এই সম্পর্কে বলেছিল তার পর থেকে রেয়ান চৌধুরী মাঝে মাঝে নামাজ পড়েন ।তবে ইবাদত তো আল্লাহকে খুশি করতে করা উচিত!

হুর আজীবন শুকরিয়া আদায় করবে গত এগারো বছর আগের কথা মনে করে , হুর তার আট বছর বয়সে এমন একজন শিক্ষক এর সাথে দেখা হয়েছিল যে তাকে বুঝিয়েছিল, পর্দার ফজিলত বলেছিল। নামাজ কি? কেন পড়তে হয় ? যিকির কি? এসবকিছু হাতে কলমে শিখিয়েছিলেন তিনি হুর কে।সেই শিক্ষক কে কেবল হুরকে কুরআন শিক্ষা দেওয়ার জন্য ইয়াসমিনা চৌধুরী রেখেছিলেন, কারন তিনি ছিলেন সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের মেয়ে , অতিরিক্ত আধুনিক হ্ওয়ার কারনে তিনি কখনোই সেরকম পর্দার সংস্পর্শে আসেন নি ।
কিন্তু হুরের নানুর কথায় হুরের জন্য শিক্ষক রাখেন । মহিলাটি তার জীবনের নূর এর রাস্তা দেখিয়েছিল ।

ইয়াসমিনা চৌধুরী – এদিকে আসো প্রিন্সেস।
হুর গুটি গুটি পায়ে গিয়ে দাঁড়ালো মায়ের কাছে , ইয়াসমিনা চৌধুরী মেয়ের কপালে চুমু খেয়ে বললেন – কতো বড়ো হয়ে গিয়েছে আমার প্রিন্সেস, আমার তোমার উপর বিশ্বাস আছে , তুমি সবকিছু সামলে নিতে পারবে ইনশাআল্লাহ।

হুরের চোখে পানি এলো , সেও বললো- ইনশাআল্লাহ মাম্মা। মাম্মা তুমিও যাবে আমার সাথে ?
ইয়াসমিনা চৌধুরী মুচকি হাসলেন মেয়েটার যখন তিন বছর বয়স তখন তারা এই দেশ ত্যাগ করে ইয়াসমিনার জন্মস্থান মিশরের কায়রো শহরে চলে যায় । সেখানে রেয়ান চৌধুরী মেয়ের নামেই হুর প্যালেস তৈরি করেন । এরপর আর আসা হয়নি হুরের , বাংলা ভাষাটা জানলেও পরিপক্ক নয় সে । এইবার থাকার উদ্দেশ্যে এসেছিল তারা , ভেবেছিল বাংলাদেশেই থেকে যাবে।
তাই হুরের বিয়েটাও এখানে দিতে আপত্তি করেনি ।

ইয়াসমিনা চৌধুরী – অবশ্যই আমাদের দেখা হবে , সবকিছুর সাথে মানিয়ে নিতে হবে প্রিন্সেস,আসো খাবার খাইয়ে দেই এরপর তো তোমার হাসবেন্ড খাইয়ে দেবে ।
বলেই হাসলেন ইয়াসমিনা চৌধুরী।

হুর লজ্জা পেয়ে বলল – মাম্মা আমি হাত দিয়েও খেতে পারি হুহ ,তোমরা বাসায় না থাকলে তো আমি হাত দিয়েই খাই ,তোমরাই তো আমাকে হাত দিয়ে খেতে দাওনা ।

হুরকে খাবার খাইয়ে ইয়াসমিনা চৌধুরী চলে গেলেন ,আহিয়া ইয়াসমিনা চৌধুরীর সাথে গেলো । আহিয়ার ছোটো বোন আফিয়া হুরের পাখিটার সাথে কথা বলছে ।
হুরের আবার আফিয়া কে বেশ পছন্দ মেয়েটা চুপচাপ শান্ত একেবারে হুরের মতো ।আহিয়া ফর্সা সুন্দর হলেও আফিয়া হলদেটে গায়ের রং। চোখগুলো বড়ো বড়ো দেখতে পুতুল পুতুল লাগে ।

তখুনি সাদিক আসলো ভেতরে ,সাদিক আসতেই আইভি উড়ে এসে হুরের ঘাড়ে বসলো – কালা বিড়াল এসেছে ,এসেছে ।

সাদিক হুরের দিকে চোখ গরম করে তাকাতেই হুর জিভ দেখিয়ে দিলো । সাদিক এসে হুরের দুই হাত জড়িয়ে ধরে বললো- বনু তোর তো বিয়ে তাই না ।
হুর ভ্রু কুঁচকে মাথা নাড়ায়।
সাদিক ঠোঁট কামড়ে হাসলো , এরপর বললো- আচ্ছা একটু আগে যে আম্মু তোকে খাবার খাইয়ে দিয়ে গেলো ,বিয়ের পর তো তুই শশুর বাড়ির লোককে ভেঁজে খাবি ।

হুর এর মেজাজ খারাপ হয়ে গেল, দুহাতে সাদিকের ঘন চুল গুলো হাতের মুঠোয় পুরে নিলো ।

….
ভাইয়া!
হুমায়রার কন্ঠ শুনে নওশাদ চমকে তাকালো ,হাতের থেকে লেন্স এর বক্স টা পড়ে গেলো নিচে ।
হুমায়রা সেখানেই থমকে গেলো ,তিন হাতের দূরত্ব তাদের মধ্যে, হুমায়রা এসেছিল একটা রুমাল নিয়ে,এটা নওশাদ এর জন্য সে নিয়েছে ।
– ত ত তোমার চোখ!
নওশাদ শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো- এটা লেন্স!

হুমায়রা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বললো -আপনি কে?আমার ভাই কখনোই কারো লেন্স লাগাতো না ,আপনির চোখ বেগুনী রঙের,আর লেন্স এর উপর লেন্স কেউ কেন লাগাতে যাবে? আমার ভাই কোথায়?

নওশাদ বাঁকা হাসলো – বেশি কথা বলো না,তোমার ভাই আমি এটাই মনে রাখো আপাতত,আর বেশি বাড়াবাড়ি করবেনা।

হুমায়রা সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো- আপনিই তো আমাকে ব্লাকমেইল করতেন ! আম্মা কে বোকা বানাতে পারলেও আমাকে পারবেন না সেটা আপনি খুব ভালো করেই জানতেন।আপনি আমার ভাইকে কিছু করেছেন তাই না?

নওশাদ গায়ে পারফিউম স্প্রে করতে করতে বললো- বুদ্ধিমতী মেয়ে ! আজকে যদি কোনো ঝামেলা করেছো তাহলে এই মির্জা ভিলা জ্বালিয়ে দেব।
শুধু চুপ করে থাকবে লক্ষী বোন আমার।তোমার হারামি ভাইকে দিয়ে দেব যাও ,এই বিয়েটা হতে দাও।তুমি জানো আমি কি করতে পারি

কথাগুলো বলে নওশাদ বেরিয়ে এলো রুম থেকে , হুমায়রা সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল থম মেরে।

….

সময়মতো বিবাহ সম্পন্ন হলো নওশাদ হুরকে নিয়ে রওনা হলো , কান্না করতে করতে হুর জ্ঞান হারিয়েছে।ঢলে পড়েছে নওশাদ এর গায়ে। নওশাদ কেমন বিরক্ত মাখা চোখ এ হুরকে দেখলো । এরপর ফোনের দিকে মনোযোগ দিলো ।
আবার হুরের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললো- তোমাকে যদি মেরে ফেলি মেয়ে তাহলে তোমার বাবা মা কি সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাবে?
আচ্ছা চলো তোমাকে একটা সুন্দর জায়গায় নিয়ে যাই ।

কথাটা বলেই হুরের ঘাড়ে একটা ইনজেকশন পুশ করে দিলো ।গাড়িটা তার গতি কমিয়ে ফেললো এবং রাস্তা বদল করলো ।

নওশাদ বিড়বিড় করে বলে উঠলো – চলো চলো , ঘুরিয়ে আনি তোমায় জাহান্নামের বাগান থেকে।

….
ইয়াসমিনা চৌধুরী পায়ের উপর পা তুলে রাজকীয় ভাবে বসে আছে , অন্যদিকে তার পাশে হুইল চেয়ারে বসে আছে রেয়ান চৌধুরীর বোন যার বাড়িতে সুরকে রেখে গিয়েছিল তারা।
সামনেই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে রিমি হুরের ফুপাতো বোন।
-তুই কতটা অমঙ্গল জনক হলে এরকম কাজ করিস ! তোর মা করেছে হার্ট অ্যাটাক আমার মেয়ের শোকে আর তুই কিনা তার ক্ষতিই করলি? বুঝতে পারিসনি আমার মেয়ে কতটা মূল্যবান!

রিমি চুপচাপ কাপছে শুধু,ওর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে ,বুঝতে পারেনি ধরা পড়ে যাবে ।
ইয়াসমিনা চৌধুরী হুঙ্কার দিয়ে বললো – জানোয়ার কোথাকার,তুই আমার ননদের মেয়ে কি করে হলি? কথা বল কেন করেছিস ?

রিমি – আসলে আমি ওকে হিংসা করতাম সকলেই ওকে খুব ভালোবাসে,তাই আমি ওকে ভুলিয়ে ভালিয়ে ক্লাবে নিয়ে গিয়েছিলাম ।

ঠাস করে একটা থাপ্পর পড়লো ওর গালে , থাপ্পড় টা সাদিক মেরেছে , শান্ত ছেলের এমন রূপ দেখে একটু ভরকে গেলেন ইয়াসমিনা চৌধুরী।

সাদিকের মুখ রাগে লাল হয়ে গিয়েছে – বাজে মেয়ে কোথাকার, তোমার সাথে আমার বোনের তুলনা কিকরে করলি ,তোর পোশাক দেখে , রাস্তার মেয়েদের মতো , নোংরা মেয়ে কোথাকার, আমার বোন হলো পবিত্র তোর সাথে তুলনা করলে ওকে অপমান করা হয়।

রিমির মুখ অপমান এ থমথমে হয়ে আছে ,সাদিক কে মনে মনে পছন্দ করে সে ,তার কাছে এমন অপমান হয়েছে রিমি তার মানতে পারছেনা।

….
রাত এগারোটা,,,
কলিং বেল এর আওয়াজ শুনে নাবিলা বললো – ইয়াদ কে এসেছে একটু দেখো ।
ইয়াদ ল্যাপটপ এ কাজ করছিল, বিরক্ত হয়ে বললো – তুমি দেখো আমি খুব ব্যাস্ত,কাজ না করলে খাওয়াটাই বন্ধ হয়ে যাবে ।যাও দড়জা খোলো ।

নাবিলা দাতে দাত চেপে নিজেকে সামলে নিলো – এতোগুলো কথা আমার দিকে তাকিয়ে বলে সময় নষ্ট না করে গিয়ে খুললেই তো পারতে ।

ইয়াদ নাবিলার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

নাবিলা দড়জা খুলতেই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল,কালো শেরওয়ানি পড়া একজন লোক মুখে কালো মাস্ক।
লোকটা নাবিলা কে ডিঙিয়ে ভেতরে এলো ,ইয়াদ নাবিলার কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে সেখানে এসে অবাক হলো । নাবিলা কে বললো- কাকে ভেতরে ঢুকতে দিয়েছো? চেনো নাকি? অপরিচিত।

লোকটা তার মাস্ক খুলে ফেললো, নাবিলা অবাক হয়ে বললো- নওশাদ আপনি এখানে?

নওশাদ বাঁকা হাসলো ,ইয়াদ রেগে তাকিয়ে আছে নওশাদ এর দিকে – তুই এখানে?

নওশাদ নাবিলার দিকে তাকিয়ে বললো- নওশাদ কে চেনো তো নাবিলা?

নাবিলা নওশাদ এর কথা কিছু বুঝলো না ,ইয়াদ রাগে ফুঁসছে – নওশাদ না মানে আর্থার থেমে যা।

নওশাদ ইয়াদের দিকে তাকিয়ে জোড়ে জোড়ে হেসে বললো – তোর তো কৈ মাছের প্রান নওশাদ, আমাকে নওশাদ বললেও কিছু মনে করবো না।

চলবে কি?
রেসপন্স করবেন সবাই।
#মিহিকা_রোজা
সাইলেন্ট রিডার্স রা রেসপন্স না করলে সবগুলো নেশাখোর।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here