প্রিয়_নীলপদ্ম —১০. #মুশরাফা_মিরা

0
51

#প্রিয়_নীলপদ্ম —১০.
#মুশরাফা_মিরা
[কোনো প্রকার কপি নিষিদ্ধ]

আরিফুর রেহমান আর সামিদ বাজার করতে গিয়েছে যেগুলো লাগবে পার্টিতে তা আনতে।রিমা ও তার কন্যা ওদের আড্ডায়, মজায় সামিল হবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। বলেছে ‘এসব রংঢং করার ইচ্ছে তাদের নেই’তারা একথা যেই বললো আর কেউ তাদের জোর করেনি।আনন্দ করা প্রতিটা জীবনে সাথে জড়িয়ে। প্রতিটা মানুষের উচিত পরিবারের সাথে আনন্দ-মজা করা।বয়স বাড়লে এতো এগুলোই স্মৃতির পাতায় যুক্ত হয় তাই না?ছাদে বারবিকিউ পার্টির আয়োজন করা হয়েছে।মেহেরবা আবার ডেকোরেশন করায় বেশ পটু।তাই তাসফিকে নিয়ে ও ছাদ সাজাচ্ছে। তুলি,হাফসা আর রুখসানা নিজেদের মাঝে গল্পে ব্যস্ত।

______

ফোন বাজতেই নৌমি ছুটে এলো ওয়াশরুম থেকে।ফোনস্ক্রিনে ‘আব্বু’ নামটা দেখে একটু হাসলো।ওর মাঝেমধ্যে নিজেকে কেমন পাষাণ মনে হয় নিজ থেকে সহজে ফোন দেওয়া হয়না দাদিমা,বাবাকে।যে-ই বাবার সাথে কথা না বললে সময় কাটতো না,দাদিমার কোলে মাথা না রাখতে পারলে ঘুম হতো না এখন ঠিকই তাদের ছাড়া দিব্যি দিন,সময় কেটে যাচ্ছে।আর ওর বাবার সাথে দূরত্বটা তো বেড়েছ মা..মা মারা যাওয়ার পরেই।বাবার সেই আগের ভালোবাসাটা আর পাওয়া হয় না। মা মারা যাওয়ার পরে বুঝতে পেরেছে ‘পৃথিবীতে মা না থাকলে কেউ কারো না’। ভাবতে ভাবতে ফোন কেটে গেলো।ভাবলো না, এবার ফোনটা দেওয়া উচিত যত হোক বাবা তো।কল করার সাথে সাথে রিসিভ হলো ওপাশ থেকে। তাতে নৌমি বেশ একটু হাসলো।সালাম দিতেই ওর বাবা বাশার হক বলে,

‘কেমন আছো নৌমি?আব্বুকে ভুলে গেছো তাই না?’

‘ভালো আছি আমি। আর বাবা-মাকে কি ভোলা যায় আব্বু?অন্যরা পারলেও আমি তো পারি না।আব্বু তুমি ক’দিন মনে করে ফোন দিয়েছো আমায়?আমি নাহয় ভুলে গেছি কিন্তু তুমি?’

মেয়ের অভিমানী কন্ঠের বিপরীতে কোনো কথা এলো না তার মুখে।সত্যি তো সে নিজ থেকে কবার ফোন দিয়েছে?ফোন না দিক কিন্তু তেমন তো মেয়েকে আগের মতো মনে করা-ও হয় না। আসলেই তো সে পাল্টে গেছে।বুঝালো নিজের অপরাধ তবুও তা ধরা দেওয়ার ইচ্ছে তার নেই। তাই প্রসঙ্গ পাল্টে বলে,

‘জামাই বাড়ি ফিরেছে সেকথা জানাও নি কেন আমায়?’

‘তুমি ফোন ধরোনি আব্বু।’

শান্ত স্বরে শুধু উত্তর দিচ্ছে নৌমি নিজ থেকে নিজে কিছু জিজ্ঞেস করছে না ও।সেই..সেই মনমানসিকতাই নেই ওর।বাশার হক নৌমির ভুল ধরাতে গিয়ে নিজেই ভুল হয়ে বের হলো। থতমত খেয়ে কোনোমতে বললো,

‘আচ্ছা তাহলে বেড়াতে এসো জামাইকে নিয়ে।ভালো থেকো’

নৌমি প্রতিউত্তর করলো না।বাশার হক ওপাশ থেকে কল কাটতেই নৌমির চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পরলো। ফোনটা বুকের সাথে চেপে ধরে বাবাকে উদ্দেশ্য করে বলে,

‘আব্বু তুমি তোমার মেয়েকে ভালোবাসতে পারো নি।কেন এতো বদলে গেলে?আমি আমার আগের আব্বুকে মিস করি খুব। হয়ে যা-ও না আমার ভালো আব্বু!’

মেয়ের অভিযোগ শুনলে পেলো না বাশার।হয়তো নৌমি নামের মেয়েটার কথা মনেই থাকবে না এখন আর।কিছু মানুষ হয়না, যাদের মনে ক্ষতের অভাব না থাকলেও মুখে হাসির অভাব হয়না।অবশ্য মেয়েদের বেলায় তা একটু বেশিই ঘটে। নৌমি আর রুমে থাকলো না এখানে থাকলেই মন আরো খারাপ হবে,নিজের ভাগ্যকে নিয়ে আফসোস হবে।নিচে নামার পথে দেখা হলো তূর্যের সাথে কানে ফোন নিয়ে উপরের দিকেই উঠছিল।অফিস থেকে ফোন এসেছে কিছু সমস্যা সমাধানের জন্য। একজন সেনাসদস্য হওয়ার দরুন বাড়ি হোক কিংবা অন্য কোথাও দায়িত্ব এড়ানোর সাধ্য নেই তাদের।

তূর্য দেখলো নৌমির চোখ কেমন ফোলা ফোলো, নাকের ডগা লাল অল্পতেই বুঝে গেলো কেঁদেছে মেয়েটা।এই অল্প সময়ের মাঝে কি এমন হলো যে মেয়েটাকে কেঁদেছে?নৌমি তূর্যকে দেখে কিছু না বলে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নেয়।মন ভালো নেই তাই তর্ক কিংবা কথা কোনো কিছু বলার ইচ্ছে নেই ওর আপাতত। তবে তূর্য তা হতে দিলে হয় কল হোল্ড করে নৌমিকে জ্বালাতে জিজ্ঞেস করে,

‘আমার বিরহে কাঁদছিলে নাকি মিসেস?’

‘আপনার জন্য আগে যে পরিমাণে কেঁদেছি তার হিসেবে আগে উঠাই তারপর বাকিটা দেখা যাবে’

মেয়েটার উত্তর কি সবসময় রেডিই থাকে নাকি?কিছু বলার সাথে সাথে বুলেট ছোটে মুখ থেকে।কিছু বলে ছাড় পাওয়ার সুযোগটুকু রাখে না।তবে তূর্যর ইচ্ছে হলো না হেরে যেতে নৌমির কাছে তাই দুষ্টমি করে আরেকটু কাছে আসে নৌমির বলে,

‘যে পরিমাণে কেদেছো কাছে এসো সেই পরিমাণে আদর দি, আসো কাছে’

নৌমি হতবাক হয়ে চেয়ে থাকে তূর্যের দিকে।ও-কি ভুল শুনলো না-কি?হয়তোবা, না হলে তূর্য এমনভাবে কথা বলার মানুষ?এসব যায় তূর্যের সাথে?অবশ্য পুরুষ মানুষ বলে কথা এমন স্বভাব থাকাটা দোষের কিছু না।তারউপর নৌমির সাথে এমন দু-একটা কথা বলা ওর জন্য হালাল।
নৌমি নিজের চোখজোড়া ছোটছোট করে লজ্জা ঢেকে ফিসফিসিয়ে বলে,

‘লুইচ্চা মানিক একটা’

বলেই পগারপার নৌমি মোটেও দাঁড়ালো না ওখানে।দাঁড়ালে নিশ্চয়ই দু-একটা ধমক জুটতো ওর কপালে।এদিকে তূর্য হা হয়ে গেছে নৌমির কথায়। ও লুচ্চা?কি এমন বললো?আর এই মানিক কে?কিভাবে জানে নৌমি এই পুরুষের কথা?গুগলে সার্চ দিবে জানতে কে এ-ই লুইচ্চা মানিক?নাকি চ্যাটজিপিটি!বউয়ের থেকে এমন বাজে একটা ট্যাগ পেয়ে তূর্য অস্থির হয়ে উঠলো।ভুলে গেলো কেউ অপেক্ষা করছে ফোনের ওপাশে ওর জন্য। হাঁক ছেড়ে ডাকতে নেয় নৌমিকে,

‘এই..এই কে লু..’

উফ তূর্য পাগল হয়েছো তুমি?এক্ষুনি চিৎকার দিয়ে নিজের ইজ্জত খোয়াতে যাচ্ছিলে কেন তুমি?ভুলে গেলে নিচে তোমার মা-দাদি আছে!তূর্যর কেমন পাগল পাগল লাগছে।রাগ গিয়ে পরে নৌমির উপর, এই মেয়েটা সব নষ্টের গোড়া। দেখা হওয়ার পর থেকে তূর্য নিজের ব্যক্তিত্ব হারাতে বসেছে।যে তূর্য বেশি কথা বলতো না সে এখন বাঁচাল হয়ে যাচ্ছে, রসিকতা না করা ছেলেটা রসিকতা করে জোকার খাতায় নাম লেখাচ্ছে,বাবা-ভাই-বোনদের কাছে ইজ্জতের দফারফা করাচ্ছে আর..আর শেষমেশ তো লুচ্চা মানিক নামের ট্যাগ-ও পাচ্ছে।এগুলোর মূলে কে?নৌমি!তূর্য রুমের দিকে যেতে যেতে সিদ্ধান্ত নিলো একা পাক মেয়েটাকে ছাড়বে না ও কিছুতেই।এর বদলা ও নেবেই,হুহ্।

_____________

মশলা মাখিয়ে মুরগি ছাদে নিয়ে আসা হয় ভাজার জন্য সঙ্গে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র।নৌমি ছাদে এসে দেখে ভিষণ সুন্দর করে তাসফি-মেহেরবা ছাদটাকে সাজিয়েছে।দেখেই মন ভালো হয়ে গেলো ওর।আরিফুর রেহমান বিছিয়ে রাখা গদিতে বসে পরেছে ইতিমধ্যে। বসে বসে তদারকি করছে সবকিছুর।হাফসা খাতুনের হাঁটু ব্যাথা তাই তিনি ছাদে উঠতে নারাজ তারউপর করা ঘুমের ঔষধ তো আছেই।তুলি-রুখসানা এসেছে বাচ্চাদের মজা উপভোগ করতে।

‘বউ মনি এদিকে এসো তো।দাড়িয়ে আছো কেন?’

‘তোমাদের ডেকোরেশন দেখছিলাম কি সুন্দর সাজিয়েছো!’

‘আমি কিছু করিনি সব করেছে মেহু।ওর এসবে আইডিয়া ভালো।’

‘তুই পারলে তো করবি।পারিস তো শুধু গন্ডারের মতো ভোস-ভোস করে নাক ডেকে ঘুমাতে।’

ছোট বেলা থেকেই সামিদ আর তাসফি একে অপরের পিছনে লেগেই থাকে।আবার গলায় গলায় ভাবও প্রচুর ওদের। সামিদের ব্যঙ্গত্ত্বক কথার পিঠে তাফসি চেচিয়ে ওঠে,

‘সামি ভাই একদম মিথ্যা বলবে না বলে দিলাম।আমি নাক-ডাকি না।’

‘চোর কখনো বলে আমি চুরি করেছি?’

‘সামি ভাই!’

সামিদ-তাসফির কান্ডে মেহেরবা আর নৌমি পারে না একে অপরের গায়ে ঢলে পরতে হাসতে হাসতে।বাকিরাও হাসলেন বাচ্চাদের কান্ডে তবে রুখসানা ছেলেকে শাসালেন,

‘সামিদ! কি হচ্ছে টা-কি?বাচ্চাটাকে এভাবে জ্বালাচ্ছো কেন?’

মায়ের ধমকে তাসফিকে আর কিছু বললো না সামিদ চুপচাপ বারবিকিউ মেকারটা সেট-আপ করাতে লেগে গেলো।তূর্য ছাদের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে দেখছিলো এতক্ষণ এসব।ইশ!নিজ কারনে পরিবারের কত আনন্দ মিস করে ফেললো ও,দূরত্ব বাড়ালো পরিবারের সাথে নিজের করা ভুলতে জন্য প্রতিনিয়ত আফসোস হয় ওর।দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে এগিয়ে সবার দিকে।নৌমির চোখ পরলো প্রথম ওর দিকে।মনে পরে গেলো কিচ্ছুক্ষন আগের ঘটনা।তূর্যের করা ফাজলামো আর নিজের বোকামো।তূর্য ওকে দেখলো ছোটছোট চোখে।চোখমুখের ভাবখানা এমন —হাতে পাই একবার তোমায় চান্দু ছাড়বো না একটুও, মোটেও না।

সবাই বসলো গোল হয়ে একসাথে তুলি মেরিনেট করা মাংস গুলো বারবিকিউ মেকারে পুড়ছে আর দেখছে সকলের কর্মকান্ড।সামিদ বলে,

‘আচ্ছা গানের কলি খেলি আজ?মোটামোটি সবাই তো গান পারোই।না পারলেও সমস্যা নাই আমরা আমারই তো!’

কেউ দ্বিমত পোষণ করলো না।শুরুতেই গান গাওয়ার টার্ন এলো আরিফুর রেহমানের।তিনি বেশ উৎসাহিত এসব নিয়ে।গান-বাজনায় বেশ আগ্রহ ছিলো যৌবনকালে।এরপর চাকরি-বাকরিতে ব্যস্ত জীবন পার করাতে আর সময় হয়ে ওঠে না এসবের। এবার সময় এলো বাচ্চাদের কারণে তাই তিনি বেজায় খুশি।গলা খাঁকারি দিয়ে গাইলেন কয়েক লাইন,

তুমি এসেছিলে পরশু
কাল কেন আসনি
তুমি কি আমার বন্ধু
কাল ভালোবাসনি

এটুকু বলেই থামলেন বয়স বাড়াতে সুর টেনে উঠাতে কষ্ট হয় ওনার।হাততালি আর হইচইতে পুরো ছাদ আনন্দে ভরে উঠলো।

‘গুরুউ কি গাইলে,সেই-সেই!গানটা কি কোনো ভাবে মামিকে ডেডিকেট করা, হু?’

সামিদ দুষ্ট হেঁসে ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলো আরিফুর রেহমানকে।ভাগ্নের দুষ্টমিতে হাসলেন আরিফুর রেহমান।চাইলেন স্ত্রীর মুখের পানে যিনি আড়চোখে স্বামীকে একপলক দেখে নিজ কাজে মন দিয়েছে। ভাবখানা এমন যে তিনি কিছু শোনেন নি।স্বামীর দিকে চোখ রেখেই বলে,

‘কোনভাবে-টাবে না তাকে মনে করেই গানটা গাওয়া।তাকে ছাড়া আর কাউকে নিয়ে ভাবার ইচ্ছে কিংবা সময় কোনোটাই নাই, ভাগ্নে।’

তাসফি,মেহেরবা আর সামিদ পারে না হট্টগোল করে পুরো ছাদ মাথায় তুলতে।তুলি স্বামীকে চোখ রাঙালেন, শাসালেন এভাবে বাচ্চাদের সামনে তাকে লজ্জায় ফেলাতে।নৌমি মুগ্ধ চোখে দেখে নিজের শ্বশুর-শাশুড়ীকে।এই পাঁচবছরে যতটুকু তাদের দেখেছে এতে ও চোখে সেরা কাপল হলো এরা।দুজন দু’জনার প্রতি শ্রদ্ধাশীল, বিশ্বাস-ভালোবাসায় পরিপূর্ণ।

তূর্য নিজের বউয়ের দিকে তাকিয়ে দেখে সে তার বাবা-মাকে দেখতে ব্যস্ত।এতে অসহায়বোধ করে ও।কি কপাল তূর্যের বউ তার দিকে নজর না দিয়ে তার বাবা-মায়ের দিয়ে তাকিয়ে থাকে,হাহ্।গলা খাকারি দিলো নৌমির মনোযোগ আকর্ষন করতে। তবে হায় কপাল বউয়ের মনোযোগ আকর্ষন করতে যেয়ে বাপের করে ফেললো। আরিফুর রেহমানের পাশেই তূর্য বসে।তাই তিনি সহজের তূর্যর করা শব্দ শুনতে পেলো।ছেলের দিকে কিছুসময় চেয়ে মুখ ফিরিয়ে সকলের উদ্দেশ্যে বলে,

‘ বাচ্চারা শেখো শেখো আমার কাছ থেকে কিভাবে যত্ন করতে হয় প্রিয়মানুষের।অনেকে তো আছে যারা প্রিয়মানুষের সঠিক কদর করতে জানে না।’

চলবে…?

[একটা কথা বলি,আরিফুর রেহমান আর তুলিই অল্প সল্প এই খুনসুটিগুলো লিখতে আমি বহুত আরাম পাই।মন চায় নৌমি-তূর্যকে সাইডে রেখে ওদের দিয়ে গল্পটা কভার করতে। তোমাদের ভালো লাগে আরিফুর রেহমান আর তুলিকে?আচ্ছা ভালো লিখছি তো?আমার মনে হচ্ছে ভালো লিখছি না আমি,সত্যিই কি তাই পাখি?,হ্যাপি রিডিং]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here