#প্রিয়_নীলপদ্ম —১১.
#মুশরাফা_মিরা
[কোনো ধরনের কপি করা নিষিদ্ধ]
‘বাচ্চারা শেখো শেখো আমার কাছ থেকে কিভাবে যত্ন করতে হয় প্রিয়মানুষের।অনেকে তো আছে যারা প্রিয়মানুষের সঠিক কদর করতে জানে না।’
শেষ কথাটা যে তূর্যকেই ইঙ্গিত করা তা বেশ ভালোই বুঝেছে তূর্য।নিজের বাবা হওয়া সত্ত্বেও ওর হয়ে কথা বলে না,এই দুঃখ কই রাখবে ও?সামিদ বরাবরই মামার নেওটা।তাই দাঁত কেলিয়ে মামার সঙ্গে জোট বেঁধে বলে,
‘কারেক্ট মামু।তোমাকে কি সাধে আমার গুরু বলি বলো?সব তো তোমার কাছ থেকেই শিখছি। প্রিয়মানুষকে আগলে রাখাটাও শিখে নিবো তোমার কাছ থেকে।’
‘এই না হলে আমার শিষ্য।দোয়া করি অনেক দূরে এগিয়ে যা-ও’
আরিফুর রেহমান বেজায় খুশি সামিদের কথায়।নিজেকে নিয়ে তার খুব গর্ব হচ্ছে তিনি আদর্শ শিক্ষক হতে পেরেছে ইয়াং জেনারেশনের কাছে এর থেকে বেশি কি চাই তার?
‘আহা এসব নিয়ে পরে আলোচনা করিও তোমরা গেইম খেলাটা বন্ধ করলে কেন মাঝে?’
তুলি বিরক্তি নিয়ে বলে।স্বামীর কাজে তার বিরক্তি লাগছে এই ছোটছোট বাচ্চাদের কি শিখাচ্ছেন উনি।অযথা লজ্জায় ফেলছে তাকে।বাকিরা তুলির কথায় সহমত পোষণ করে শুরু হয় আবারও গানের রাউন্ড। এবার গান গাওয়ার পালা আসে রুখসানার।নিয়ম মত তাকেও ছাড় দেওয়া হয় না। দু’লাইন গেয়ে লজ্জায় মুখ ঢেকে ফেললেন। বুড়ো বয়সে এতোগুলা মানুষের সামনে বেসুরো গলায় গান গাওয়া কি কম লজ্জার?এরপর একে একে তাসফি,মেহেরবা,সামিদ গায়।বাকি থাকে তুলি,নৌমি আর তূর্য।তুলি আগে থেকেই আত্নসমর্পণ করেছে সে এসব গান-টানে নেই।সকলে মেনে নিলেও তাকে শাস্তিসরূপ গুঁজে দেওয়া হয় বিরিয়ানির ভার।আগামীকাল সকলের জন্য বিরিয়ানি রান্না করতে হবে।তিনি তা হাসি মুখেই মেনে নিলো।বোতল ঘুরে এবার আসে তূর্যের পালা। সবাই উৎসুক দৃষ্টিতে চায় তূর্যের পানে।গাইবে গান তূর্য?বিশেষ করে নৌমির কৌতূহল বেশি হচ্ছে তূর্যকে ঘিরে।সামিদ ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করে,
‘ তান’দা কি গাইবে না গান?না গাইলে কিন্তু ছাড়ছি না। শুভ্র ভাইয়ের ফোনে তোমার গান গাওয়ার ভিডিও দেখেছি আমি,হু।তাই নো ছাড়াছাড়ি’
তূর্য ফেঁসে গেলো যাঁতাকলে।বাবা-মা,ফুপুর সামনে গান গাওয়াটা ওর কাছে ইতস্তত লাগছে।গান পারে না বলে কাটিয়ে নেওয়া যতো তবে তা-কি সামিদ থাকতে হয়?রাগ হলো ওর বন্ধু শুভ্রের উপর। কেন ভিডিও করতে হবে ওকে?করেছিস করেছিস তা আবার সামিদ নামক বাঁদরটাকে দেখাতে হবে কেন?নিজের উপরও কিঞ্চিৎ রাগ হলো কেন যে এখানে আসতে গেলো।নৌমিকে তো পরেও দেখা যেতো,ধূর।
‘কি রে তান’দা, বোবা হয়ে গেলি কেন?লজ্জা পাচ্ছিস তুই? আরে নো চাপ আমরা আমরাই তো। বেশি লজ্জা পেলে ওড়না এনে দেই মুখ ডেকে গা।তবে..তবে তোকে গান তো গাইতেই হবে’
নাছোড়বান্দা সামিদের কন্ঠে দুষ্টুমির রেশ।চোখমুখের ভাব এমন যে —যত যাই করো বাচ্চু গান না গেয়ে নিস্তার নেই তোমার। তাসফি মেহেরবা ওরাও জোর করলো গান গাওয়ার জন্য।ভাইবোনকে জোড়াজুড়িতে নিরবে গান গাইতে রাজি হলো।একপলক চাইলো নৌমির দিকে, যে আপাতত তূর্যের দিকেই চেয়ে ছিলো গালে হাত ঠেকিয়ে গান শোনার আগ্রহ নিয়ে। নৌমিকে নিজের দিকে চাইতে দেখে তূর্য মনেমনে খুশি হলো।তবে তখনকার নৌমির কথাটার জন্য তা আর প্রকাশ করলো না।গম্ভীর হয়ে চোখ সরিয়ে নিলো।
‘তোর হাতের গিটারটা দে।’
সামিদের হাতে থাকা গিটারটা চাইলো তূর্য।ঝটপট তা এগিয়ে দিলো ও।আরিফুর রেহমানও নড়েচড়ে বসলেন। ছেলের কন্ঠে গান শুনেছিলেন বহু আগে।তিনিও বেশ উৎসুক এখন। তূর্য গলা খাঁকারি দিয়ে গিটারে টুংটাং সুর তুললো। এবার চাইলো নৌমির দিকে এরপর চোখ বন্ধ করে গাইলো কয়েক লাইন,
সন্ধ্যে হলে, বন্ধ ঘরে
মনে পড়ে তোরই কথা
এমনই হয়
কেন যে তোকে পাহারা
পাহারা দিল মন
কেন যে…
ফোন বেজে উঠতেই তূর্য থেমে যায়।ফোনের রিংটোনে সকলের মাঝে বিরক্তি ছড়িয়ে পরে।ইশ!এখনই বাজতে হলো?আরেকটু পরে বাজলে কি হতো?তূর্য তারাতাড়ি করে চোখ খুললো।পকেট হতে ফোনটা বের করে দেখে ‘মেজর স্যার’ ফোন দিয়েছে। ফোঁস করে নিশ্বাস ছাড়লো।এই ডিউটি ওর পিছু আর ছাড়লো না!ফ্যামেলি টাইমিং-য়েও কল আসতে হলো।তূর্য সকলের দিকে চাইতেই হাতে তালি দিয়ে উঠলো তাসফি পরপর সবাই।তূর্য হেসে উঠে দাড়ায়। এখানে থাকা যাবে না নিশ্চয়ই জরুরী কোনো বিষয়ে কথা।এতো হইচইয়ের মাঝে তো আর কাজ হয় না।কিছু না বলেই যেতে নিলে তাসফি পিছন থেকে ডাক দেয়,
‘তান’দা কই যা-ও?আরেকটা গান গাও না প্লিজ!’
বোনের আবদারের ঠোঁট মেলে হেঁসে পিছনে ফিরে বলে,
‘দায়িত্বের কাছে তোমার তান’দা নিরুপায় তাসফি।মেজর স্যারের কল এসেছে এখন এখানে থাকা উচিত হবে না আমার। তোমরা এনজয় করো।’
দাঁড়ালো না আর চলে গেলো ছাদ থেকে ফোন কানে চেপে।হূট করেই সবাই কেমন চুপসে গেলো।কারনটা কি তূর্যের চলে যাওয়া?হতে পারে,এভাবে আনন্দের মাঝ থেকে একজন চলে যাওয়াতে সবার খারাপ লাগাটা অস্বাভাবিক কিছুই না।নৌমি তুলির দিকে এগিয়ে গিয়ে বলে,
‘আম্মু বাকিগুলো আমি শেষ করি।মাত্র কয়েকটা আছে আপনি সবার সাথে গিয়ে বসুন’
তুলি সামান্য হেসে গিয়ে বসলো আরিফুর রেহমানের পাশে।সামিদ সবার মনোযোগ পেতে বলে,
‘আরে সবাই এমন কালো মুখ করে বসে আছো কেন বলো দেখি?এভাবে থাকলে কি আর মজা হয় বলো?বউ মনি আপনার কিন্তু গান গাওয়া বাকি।এবার আপনি বলুন’
‘ভাইয়া আমায় ছেড়ে দিন।আমি গান-টান পারি না, স্যরি।’
নৌমি অস্বীকার করলো সামিদের প্রস্তাব।ও সবার সামনে গান গাইতে পারবে না জীবনেও।জোড়াজুড়ি করেও লাভ হলো না কোনো আর।তাই হার মেনে সবার অন্যান্য বিষয়ে মজা করতে লাগলো।এরই মাঝে বারবিকিউ তৈরি হয়ে গেলো।সবার খাওয়া দাওয়া শেষ করতে করতে প্রায় ‘একটার’ কাছাকাছি বেজে গেলো।আশেপাশের কোথাও শব্দ নেই শুধু কালকন্ঠ বাড়িটায় ছাড়া।সবাই ঘুমে ঢুলছে প্রায়।তুলি একটা প্লেটে খাবার বেরে নৌমির হাতে দিয়ে বলে,
‘মা-রে কষ্ট করে এটা তূর্যর রুমে দিয়ে আয়।আমরা বাকিটা গুছিয়ে নিচে যাই।’
নৌমি অবাক দৃষ্টিতে তুলির দিকে তাকায়।এ রাতে ও যাবে এখন তূর্যের রুমে?যদিও ও তূর্যের স্ত্রী তবে তেমন সম্পর্ক তো নেই।রাত তো ভালোই হয়েছে তূর্য নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে গেছে। তুলি যেনো বুঝলো নৌমির চাহনির মানে। নৌমির একগালে হাত রেখে বলে,
‘তূর্য তারাতাড়ি ঘুমায় না।রাতজাগা ওর স্বভাব। আমরা খেলাম আর ছেলেটা খাবে না তা-কি হয় তুই বল?’
নৌমি মাথা নাড়ালো।তুলি গাল ভরে হেঁসে ফের বলে,
‘তাহলে?আর তুই তো তূর্যের স্ত্রী তাই-না? তাহলে ওর রুমে যেতে সমস্যা কোথায়?যা মা’
নৌমি কিছু বলতে পারলো না।কি বলবে?এভাবে আদুরে ভাবে বললে মানা করা যায়?তাছাড়া খাবারটা দিয়েই তো চলে আসবে তাইনা।তাহলে আর সমস্যা কোথায়?নানান কথা ভেবে খাবার হাতে নিচে নেমে গেলো।নৌমি যেতেই আরিফুর রেহমান এগিয়ে এলো তুলির দিকে কাঁধ জড়িয়ে বলে,
‘কি ব্যাপার গিন্নী খাবার হাতে নৌমি আম্মুকে কোথায় পাঠালে?’
‘তোমার ছেলের ঘরে।’
আরিফুর রেহমান ভ্রু কুচকে স্ত্রীর দিকে চাইলেন। এতো রাতে খাবার নিয়ে পাঠানোর মানে বুঝলো না তিনি। স্বামীর চাহনির ধাঁচ বুঝে তুলি বললো,
‘বোঝোনি না?’
আরিফুর রেহমান বাধ্য ছেলের মতো দু’দিকে মাথা নাড়ালো।তুলি ওনার পেটে চিমটি কেটে বলে,
‘বুঝবে কিভাবে সারাদিন তো মাথায় ঘোরে কিভাবে ছেলেটাকে অপদস্ত করবে।তোমায় পুলিশ কে করলো আমি বুঝি না বাপু।সত্যি করে বলো তো ঘুস-টুস দিয়ে চাকরি পেয়েছো না-কি?’
স্ত্রীর কথায় হা হয়ে গেলেন তিনি। এ বলে এই নারী, ঘুসের চাকরি!আরিফুর রেহমানের মতো এমন সৎ পুলিশ টর্চ লাইট দিয়ে খুঁজলেও পাওয়া যাবে না সেখানে তার-ই স্ত্রী তার চাকরির উপর মিথ্যা ট্যাগ লাগাচ্ছে। কিভাবে মানবেন তিনি?কোনোমতে নিজেকে সামলিয়ে বলে,
‘কি বললে তুমি? ঘুস দিয়ে চাকরি পেয়েছি আমি,এই আমি?তুমি জানো আমার মেধা সম্পর্কে?’
‘আগের কথা জানি না তবে এখন মেধার যে ধার দেখছি তাতে তোমার জ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন তোলা স্বাভাবিক।’
আরিফুর রেহমান বুঝলেন না ঠিক কি কারণে তাকে এভাবে বলা হচ্ছে। না জেনে তিনি ছাড়বেন না।তাই রুষ্ট কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,
‘কি এমন কারণ যার কারনে এতো বড় অপবাদ?’
‘যদি বুদ্ধিমান হতে তাহলে নৌমি-তূর্যের ডিভোর্সের কথা না ভেবে ওদের মিল করানোর কথা ভাবতে।’
আরিফুর রেহমান পুলকিত, শিহরিত, হতভম্ব। সামান্য এই একটা জিনিসকে ঘিরে তাকে এতো বড় অপবাদ দেওয়া হলো।সে-তো এতোকিছু করছে সব ঠিকঠাক করার জন্য আর তুলি ভাবছে অন্য জিনিস!কি কপাল তার।
_________
নৌমি বেশ কিছুক্ষন সময় ধরে দাঁড়িয়ে আছে তূর্যের রুমের সামনে। দরজা ভিতর থেকে আটকানো। ডাক দিতে দ্বিধা হচ্ছে ওর যদি তূর্য ঘুমে থাকে তাহলে? ওর জন্য ঘুম ভেঙে যাবে না?তাছাড়া সন্ধ্যার দিকে ওমন একটা কথা বলে নিজেরই লজ্জা লাগছে।কিভাবে বললো ‘লুইচ্চা মানিক’ কথাটা বলে নিজেই এখন আহাম্মক বনে গেছে।কেমন জানি লাগছে নিজের কাছেই ওর।না জানি তূর্য কি ভেবেছে ওকে, ধূর! এবার নিজের উপর রাগ হলো।কেন ভাই এতো তোর মুখ চলতে হবে?এমন কথা কেনোই বা বলবি যার কারনে লজ্জা পেতে হবে।নিজেকে বুঝালো যা হওয়ার হয়ে গেছে এভাবে এই মধ্যরাতে সং সেজে দাঁড়িয়ে থাকার তো কোনো মানে হয় না তাই-না?তাই সবকিছু সাইডে রেখে দরজার আওয়াজ করে মিহি কন্ঠে বলে,
‘তূ..তূর্য জেগে আছেন?’
কিছুসময় নিরবতা, এরপর ভারি কন্ঠে ভিতর থেকে উত্তর আসে।
‘না’
চলবে…?
[রেসপন্স না করলে আড়ি তোমার সাথে পাখি,হ্যাপি রিডিং]

