প্রিয়_নীলপদ্ম —১২. #মুশরাফা_মিরা

0
48

#প্রিয়_নীলপদ্ম —১২.
#মুশরাফা_মিরা
[কোনো প্রকার কপি নিষিদ্ধ]

‘তূ..তূর্য জেগে আছেন?’

কিছুসময় নিরবতা, এরপর ভারি কন্ঠে ভিতর
থেকে উত্তর আসে।

‘না’

ঘুমিয়ে থাকলে কিভাবে একটা মানুষ জবাব দেয়?নিশ্চয়ই মজা লুটছে নৌমির থেকে তূর্য।
এই মাঝরাতে তূর্য ত্যাড়ামোতে দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলে,

‘আচ্ছা তাহলে ভুতে উত্তর দিচ্ছে আপনার হয়ে?ফাজলামো বন্ধ করে দরজা খুলুন খাবার নিয়ে এসেছি।’

উত্তর এলো না ওপাশ থেকে তবে মিনিট একের ব্যবধানে দরজা খুলে গেলো।তবে নৌমি ভিতরে ঢুকে কাউকে দেখলো না দেখবেই বা কি করে পুরো ঘর অন্ধকারে তলিয়ে আছে। চোখে কিছু দেখতে না পেয়ে কিছুটা ভয়মিশ্রিত কন্ঠে ডাকে তূর্যকে,

‘তূর্য আপনি কোথায়?ঘর এমন অন্ধকার করে রেখেছেন কেন?লাইট অন করুন।’

তূর্য দরজাটা শব্দ করে লাগিয়ে নৌমির পিছনে এসে দাঁড়ায়।অন্ধকারে কিছু দেখতে না পেলেও কারো অস্তিত্ব নিজের পিছনে টের পায় নৌমি।এটা যে তূর্য তা-ও বেশ ভালোই বোঝে। ঘর অন্ধকার করে রাখার মানে কি ভাই?বিদুৎ বিল বেশি হওয়ার চিন্তা নিশ্চয়ই নাই তূর্যের।চোখে কিচ্ছুটি দেখতে না পেয়ে বিরক্ত হলো নৌমি।অন্ধকারে সং সেজে দাঁড়িয়ে থাকার মানে হয় কোনো?তাই রেগে ডাকে ফের তূর্যকে,

‘তূর্য লাইট অন করুন।এভাবে মাঝরাতে কি ধরনের মশকরা করছেন?’

তূর্য হাসলো শব্দ বিহীন ওর মজা লাগছে নৌমির বিরক্তিতে।ঘরটা একেবারে অন্ধকার এমনটি নয় আবছা আবছা দেখা যায় সব।তাই নৌমিকে দেখছে ও।নৌমির কাছে পুরো ঘরটা অন্ধকারে তলানো হলেও তূর্যের কাছে তেমনটি নয়।এসবে ওর অভ্যেস আছে।এক-পা এগিয়ে এলো পিছন থেকে নৌমির দিকে একটু নিবিড় হয়ে বলে,

‘আলো-আঁধারের খেলায় সঙ্গী হিসেবে আমি আছি তোমার সঙ্গে, ভয় কিসের সখী?’

নিস্তব্ধ রাতে তূর্যের ঠান্ডা স্বর নৌমিকে কাঁপিয়ে তোলে।কথাগুলো..কথাগুলো বারংবার কানে বাজতে থাকে ওর।ইশ,কি সুন্দর কথাগুলো। আচ্ছা এটা কি কল্পনা?সপ্নগুলোকে নেই তো ও?হাতে থাকা খাবারের প্লেট শক্ত করে চেপে ধরে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে,

‘তূ..তূর্য!’

মেয়েটাকে আর ঘাটালো না সুইচবোর্ড টিপে লাইটটা অন করলো।সাথে সাথে আলোকিত হয়ে গেলো পুরো রুমটা।নৌমি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। সামনে থাকা টি-টেবিলের ওপর প্লেটটা রেখে পিছনে ঘোরে দেখে তূর্য দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে ওর দিকে গাড় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।এই মুহূর্তে ওই দৃষ্টি নৌমির কাছে বিপদজনক মনে হলো,সর্বনাশা দৃষ্টি তূর্যের।চাইলেই ধ্বংস!আমতাআমতা করে বলে,

‘দরজা খু..লুন আমি যাবো!’

‘যেতে দিবো না।’

‘কিহ?কেন!’

‘তোমাকে এখানে আটকে রাখবো আজ।’

তূর্যের চোখমুখে দুষ্টুমির ঝলক।তবে নৌমি আতঙ্কিত এতে।তূর্যর ভাব পালা সুবিধাজনক ঠেকছে না ওর নিকট। কেন যে এখানে আসতে গেলো ও।যতই বাহিরে লটরপটর করুন না কেন এখন কেন জানি ভয় লাগছে তূর্যকে।পিটপিট করে তূর্যর দিকে চেয়ে বলে,

‘কিসব আবোলতাবোল বলছেন আপনি মাথা গেছে?সরুন ঘুম পাচ্ছে আমার। রুমে যাবো!’

বেশ উপভোগ করলো তূর্য নৌমির ভয়কে।ভালোই লাগছে তার চুনাপুঁটি বউয়ের ভীতু রূপ।আরেকটু ভয় পাইয়ে দিতে বলে,

‘ তো ঘুমাও! মানা করেছি আমি?এতোবছর তো একা-একা ঘুমিয়েছো নিশ্চয়ই বোরিং লেগেছে।তাই আজকে আমার সাথে ঘুমা-ও না হয়।’

‘কিহ?!’

সহসাই চিৎকার দিয়ে ওঠে নৌমি।তূর্য কি বললো এখানে থাকতে হবে,ঘুমাতে হবে। মামার বাড়ির আবদার না-কি।হাসবেন্ড হোক তবুও তাদের মাঝে তো এমন কোনো সম্পর্ক নেই যে একঘরে ঘুমাবে।নৌমির বিস্মিত,ভয়মিশ্রিত চেহারা দেখতে বেশ ভালো লাগছে তূর্যের।বউটা তার বেশ ভালোই ভোলা ভাল আছে।সহজেই বিশ্বাস করে আতঙ্কিত হয়।তূর্য সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে এগিয়ে আসতে থাকে নৌমির দিকে। নৌমিকে পূর্ণদৃষ্টিতে দেখে বলে,

‘এমন রিয়াকশনের তো কিছু দেখছি না মিসেস।আচ্ছা একটা কথা বলো তুমি আমার কি হও?’

‘নামে মাত্র বউ!’

নৌমির সোজাসাপ্টা উত্তর। তূর্য হাসলো ওর কথায়।ফের বলে,

‘নামে মাত্র বউ হও আর আজীবনের।তবে বউ তো!আর বউরা তো স্বামীর সাথেই থাকে,ঘুমায় তাহলে তোমার সমস্যা কোথায়?’

‘অন্যদের সাথে নিজেকে গুলিয়ে ফেলছেন কেন তূর্য? আপনি তো তাদের মতো আর বউয়ের খোজ রাখেন না,মানেন না। তাহলে একসাথে থাকার বেলাতে এতো উৎকন্ঠা কেন আপনার?’

‘ভালো প্রশ্ন।আগে মানি নি এখন মানছি,ভবিষ্যতে মানবো।তাই উৎকন্ঠা থাকবে এটাই স্বাভাবিক।’

নৌমি কথা পেঁচাতে চাইলো না।এখান থেকে বের হতে পারলে বাঁচে ও। এমন মসিবতে পরবে জানলে আসতোই না এখনে।তাই উত্তর করলো না তূর্যের কথার।দরজার দিকে এগিয়ে যেতে নেয় তবে তা হতে দিলে তো হয়। তূর্য খপ করে হাতটা ধরে ফেলে নৌমির।চলন্ত পা জোড়া থামতে বাধ্য হয় নৌমি।শরীর কাঁপছে ওর,তূর্য ওকে আটকালো কেন?কি উদ্দেশ্য তূর্যের?নৌমি পিছু ফিরে হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে বলে,

‘কি সমস্যা আপনার এভাবে আমায় আটকাচ্ছেন কেন?হাত ছাড়ুন তূর্য।আমার ভালো লাগছে না।’

তূর্য হাত ছাড়লো ঠিকই তবে যেতে দিলো না।একপা একপা করে নৌমির দিকে এগুতে এগুতে বলে,

‘পালাচ্ছো মিসেস?আমার থেকে পালিয়ে যাবে কোথায়?তোমার সবশেষে ঠিকানা তো আমিই!’

আজকে এমন কেন করছে তূর্য?এসব কথা বললে নৌমি কিভাবে সব ঠিক রাখবে?তূর্যকে নিজের দিকে এগুতে দেখে পিছিয়ে যায়।তূর্যর চোখ নৌমিতেই সীমাবদ্ধ। আগেপিছে কিছু তার দেখার ইচ্ছে নেই যেনো।তবে নৌমি মোটেও তাকাচ্ছে না তূর্যের দিকে তাকালেই আঁটকে যাবে ওই গভীর কালো চোখে।না..না তা কি করে হতে দেওয়া যায়,এতো সহজে তো নয়-ই!

‘আপনি কিছু খেয়েছেন না-কি? এভাবে বখাটেপনা করেছেন কেন?এগুলো তো একজন ভালো মানুষের বৈশিষ্ট্য নয়।’

নৌমি সন্দিহান তূর্যের এমন আচরণে।সন্ধ্যায় ছিলো ভদ্রলোক আর এখন দেখো কেমন বখাটেপনা করছে।তূর্য ঠোঁট কামড়ে হেসে ওঠে,

‘আমি তো ভালো মানুষ না মিসেস। তা আস্তে আস্তে জানবে। সে কথা বাদ দাও সন্ধ্যায় আমাকে লুইচ্চা মানিক বলেছিলে না?হু?তখন অযথাই ওমন কথা বলেছিলে। তাই ভাবলাম কিছু না করে খারাপ হওয়ার থেকে কিছু করে খারাপ হওয়া ভালো।’

‘কি..করবেন আপনি?’

‘তোমায় শেষ করবো!’

একদম ধীর কন্ঠ তূর্যের।শেষ করবে মানে?খুন নাকি অন্যকিছু মিন করতে চাইলো তূর্য?দুজন কাছাকাছি অনেকটাই।নৌমি পিছতে পিছতে দেয়ালের সাথে লেগে গেছে প্রায়।তূর্য মহাশয় ছাড়লেন না মোটেই নৌমিকে।নিজেদের মাঝে এক-দুই ইঞ্চি ছাড়া দূরত্ব রাখলেন না।নৌমির নিজেকে খুন করতে ইচ্ছে হচ্ছে তখন ওই কথাটার জন্য। না হলে নিশ্চয়ই এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো না তাই-না?তূর্য যে ওর সাথে ফাজলামো করছে তা বুঝলো নৌমি।নিজের ভুল স্বীকার করে বলে,

‘তখনকার কথাটার জন্য আমি মন থেকে স্যরি তূর্য।আমি বুঝতে পেয়েছি ওই কথাটা বলা আমার একদম উচিত হয়নি।’

‘উঁহু একবার বলা কথা ফিরিয়ে নেওয়া যায় না নৌমি।তখনকার সময় তুমি ফিরিয়ে এনে স্যরি যদি বলতে পারো তাহলে আমি আর কিছু বলবো না তোমায়’

প্যাচ লাগালো তূর্য।ও জানে যে সময় একবার যায় তা আর কখনো ফিরে আসে না।নৌমি অসহায় বোধ করলো।অনেক ভেবে বলে,

‘হয়তো তখনকার সময় ফিরিয়ে আনতে পারবো না তবে সেই স্থানে তো যেতেই পারি। চলুন সিঁড়ির কাছে ওখানে বসে স্যরি বলবো না হয় আপনাকে।’

‘উঁহু তা হবে না।তোমার সেই কথাটা ভিষণ খারাপ লেগেছে আমার এতো সহজে তো ছাড়বো না।হয় সেই সময় ফিরিয়ে আনো না হলে আমি ছাড়বো না’

তূর্যের নিশ্বাস নৌমির মুখে আঁচড়ে পড়ছে।দুজন এতো কাছাকাছি এতে নৌমির শরীর কেমন জানি করে।পায়ের তলা শিরশির করে ওঠে।কথা খুঁজে পায় না কোনো, কি বলবে এ কথার বিপরীতে?মাথা ফাঁকা ফাকা লাগছে ওর।তূর্য নতমস্তকে দাঁড়িয়ে থাকা ওর বুক অবধি উঁচু মেয়েটাকে দেখে পূর্ণদৃষ্টিতে।নীল রঙের জামায় মেয়েটার সৌন্দর্য যেনো আরো ফুটে উঠেছে।এতক্ষন মজা করলেও এভাবে কাছ থেকে নৌমিকে দেখে লোভ জাগলো একটু ছুঁয়ে দেখা’র।মন বলছে —মেয়েটা তোর স্ত্রী, ওর উপর সর্বোচ্চ অধিকার তোর।অথচ মস্তিষ্ক
বলছে— মেয়েটাকে ছোঁয়ার অধিকার তুই রপ্ত করতে পারিসনি এখনও তূর্য।এই মুহূর্তে ছোঁয়ার অধিকার তোর নেই।

তবে অধৈর্য তূর্য শুনলো না মস্তিষ্কের কথা।হেরে গেলো মনের কাছে,অধিকার তো আছে নিয়ম ভাঙলে ক্ষতি কি?করে বসলো অভাবনীয় কাজ।আরো এগিয়ে এলো নৌমির দিকে, ক্ষানিকটা ঝুঁকে ঠোঁট ছোয়ালো নৌমির ফোলা ফোলা গালে।তূর্যের কাজে নৌমি বিস্মিত হয়ে পরে।নত হয়ে থাকা মাথাটা উপর দিকে তুলতেই তূর্য নৌমিকে আরো অবাক করে দিয়ে গাল থেকে ঠোঁট নামালো নৌমির ঠোঁটে।এবার যেনো নৌমি পুরোপুরি পাথরবনে গেলো।পুরো গা শিহরণে কেঁপে উঠল।তূর্যের করা কাজটা কি যখন তা বুঝলো তখনই নড়েচড়ে ওঠে, সরাতে চায় তবে তূর্য সরে না।পরপর শুখনো চুমু খেয়ে বা হাতে নৌমির কোমড় আগলে নেয় আর ডান হাতে নৌমির গাল নরম হাতে ধরে ধীর কন্ঠে বলে,

‘শাস্তিস্বরূপ একখণ্ড তূর্যের কলঙ্ক লাগালাম তোমার গায়ে।’

নৌমি কিছুই বলতে পারলো না, বলার শক্তি শুষে নিয়েছে তূর্য।আলাদা এক অনুভূতি আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে নিলো ওকে।এ কেমন অনুভূতি যা নৌমির দুনিয়া উল্টে দিলো?লজ্জায় মাথা নিচু করে আমতাআমতা করতে করতে বলে,

‘আপনি.. আপনি!’

‘হুম শুনছি বউ বলো?’

‘ছা..ড়ুন আমায়। আপনি ভিষণ খারাপ।’

‘আসলেই ভিষণ’

শব্দ করে হেঁসে ওঠে তূর্য।ছেড়ে দেয় তার লজ্জাবতীকে।এমনিতেই মেয়েটাকে আজ ভিষণ জ্বালিয়েছে। এখন না ছাড়লে বোধহয় জ্ঞান হারাবে। নৌমি যেনো হাপঁ ছেড়ে বাঁচে তূর্যের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে। কোনো দিকে না তাকিয়ে দৌড়ে বের হয়ে যেতে নেয় তূর্যর সামনে থেকে। তবে হায়..বোকা নৌমি দেখলো না বন্ধ দরজাটা। ফলস্বরূপ ধাক্কা খেলো দরজায়। ব্যাথা পেলেও বেশি পেলো লজ্জা! এমনিতেই একটু আগে… তারউপর এই আবারও বোকা কাজ উফ!আর ভাবতে পারলো না নৌমি।

তূর্যর হাসি থামছে না মোটেই।মেয়েটা আজ ভিষণ লজ্জা পেয়েছে। ভালোই হয়েছে এতোদিনের ঝাঝঁ আজকে উঠাতে পেরেছে তূর্য!মেয়েটাকে আর লজ্জায় ফেললো না নিজেই খুলে দিলো দরজা।দরজা খুলতেই নৌমি ভোঁদৌড়। কোনো দিক একবারও তাকালো না সোজা রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করলো, দরজা বন্ধ করার শব্দ তূর্যের রুম অব্দি আসলো।

গালের একপাশে জিভ ঠেকিয়ে সবটা দেখলো তূর্য। আজকের রাতটা ভালোই ছিলো।নিজেও রুমের দরজা বন্ধ করে পিছনে ফিরে চাইলো টি-টেবিলের ওপরের খাবারটার দিকে,যা আপাতত অবহেলায় পড়ে আছে।মনেমনে ধন্যবাদ দিলো খাবারটিকে। এই খাবারটির কারনেই তো ও এমন মিষ্টান্নের স্বাদ পেলো!

চলবে….?

[খুশী এবার পাখি আমার? হ্যাপি রিডিং]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here