বলো_কোন_প্রিয়_নামে_ডাকি:~ #পর্ব_৩

0
71

#বলো_কোন_প্রিয়_নামে_ডাকি:~
#পর্ব_৩
#সমৃদ্ধি_রিধী

দুপুরে খাওয়ার সময় একজন বান্দার চেহারাও দেখা গেল না। নওশাদ খেয়ে রুমে যাওয়ার পর সবাই এসে খেয়েছে। ভাবখানা এমন মামার সাথে ভাগিনা ভাগ্নিদের লুকোচুরি খেলা চলছে। পুনম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এদের কাহিনী দেখেছে শুধু। কি অদ্ভুত! মা, বাবার চেয়েও মামাকে বেশি ভয় পায় কেনো ওরা? অবশ্য যেভাবে ধমকে ধামকে প্রভাব বিস্তার করে রেখেছে ভয় পাবে না তো কি করবে? কি জঘন্য ভঙ্গিতে ধমক দিয়ে উঠে। পুনমের বুকও ধুকধুক করে উঠে। পুনম এটাও লক্ষ্য করেছে এই বাসার যেকোনো ব্যপারে ওর ননাসেরা নওশাদের মতামত নেয়। যেমন বকুল তখন নওশাদের খাওয়ার সময় বলছিলো,

“রাইত্তার লাই আর কিয়া রান্ধমু?” (রাতের জন্য কি রাঁধবো?”

নওশাদ বিরক্ত হয়ে বলে, “আরে জিগাছের কা? আই কিয়া কমু? হেগুনেরে জিগা।” (আমাকে জিজ্ঞাসা করিস কেনো? আমি কি বলবো? ওদেরকে জিজ্ঞাসা কর।)

“হুটকি করমু নি? খাইবি? হেগুনে দুইদিন আগের তুন চিল্লার হুটকি খাইবো। (শুটকি করবো নাকি? খাবি? ওরা দুইদিন আগে থেকে বলছে শুটকি খাবে।)

“কর। ইগ্গা দিলেই হইবো।” (কর। একটা দিলেই হবে।)

নওশাদ খেতে খেতে বলে। ভাই বোনদের মাঝে আরো কথা হয়। পুনম একবার নওশাদের দিকে তাকায় তো আরেকবার ননাসদের দিকে তাকায়। পুনম গতসন্ধ্যা থেকেই খেয়াল করেছে নওশাদ আর ওর বোনেরা নিজেদের মধ্যে আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে। বিশেষ করে হাসনাহেনার সাথেই বেশি আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে। নওশাদদের কথা পুনম যে একেবারে সবটা বুঝে না তা না। আবার ও সবটা বুঝতে পারছে সেটাও না। ওরা টান মেরে দু সেকেন্ডে কথা শেষ করে ফেলে। পুনম কিছু কিছু কিছু ধরতে পারে কেবল। তবে একটা দিক ভালো পুনমের সাথে সবাই ভালো ব্যবহার-ই করেছে। যদিও পুনমের তাল মেলাতে কষ্ট হচ্ছে।

সবার খাওয়া দাওয়া শেষ। হাসনাহেনা পুনমকে রুমে যেতে বলে নিজেও বিশ্রাম নিতে চলে গিয়েছেন। নওশাদের বাসাটা ছোটর মধ্যে সুন্দর একটা বাসা। এখানে কেবল দুটো রুম। ড্রয়িং, ডাইনিং একসাথে। একটা কমন বাথরুম আরেকটা নওশাদের রুমের সাথে এটাস্ট বাথরুম। নওশাদের রুমে তো থাকে কেবল নওশাদ আর পুনম। আরেকটা রুমে হাসনাহেনা, বকুল, বেলী, জবা, জুঁই আর মেয়েরা মেঝেতে পাটি, তোশক পেতে বিছানা করে ঘুমায়। ঘুমায় বললে ভুল হবে, ওরা সারারাত আড্ডা দেয় বেশি।

আর নওশাদের দুলাভাইয়েরা, ভাগ্নেরা সবাই দুই তলায় জবাদের বাসায় থাকে। বলা বাহুল্য এই সাত তলা বিল্ডিং জবার আর ওর স্বামী মোতালবের নামে। সাত তলা বিল্ডিংয়ের চার তলার ছোট্টো ফ্ল্যাটটায় নওশাদ আগে হোসনেআরা-সহ থাকতো। উনি মারা যাওয়ার পর থেকে নওশাদ একাই থাকে দেড় বছরের মতো। হোসনেআরা মারা যাওয়ার পর জবা রান্নাবান্না করে জেরিন বা জাইমাকে দিয়ে পাঠিয়ে দিতো, তাই খেতো। তবে নওশাদ মাঝেমধ্যেই বেশ রাগারাগি করতো। কখনো কখনো ওরা আনলে খেতো, আবার কখনো কখনো ত্যাড়ামো করে ফিরিয়ে দিতো।

বাকি বোনেরা নিজেদের বাসায় ডাকলেও যেতো না। ইসরাত আর রিমির বিয়ের সময় শুধু উপস্থিত ছিল। একা একা থেকে কি শান্তি পেতো কে জানে! কেউ ডাকলে যেতো না, ডানে চলতে বললে বামে যেতো। না বলে টলে বান্দরবান, রাঙামাটি চলে যেতো। ভাইকে নেটওয়ার্কে না পেয়ে বোনেরা টেনশনে মরতো শুধু। নিজের মন মতো কিছু না হলে রাগারাগি করবে শুধু। ভাইয়ের অসহনীয় জেদ দেখেই তো বোনেরা দেখে শুনে, আলাপ আলোচনা করে বিয়ে করালো। বিয়ের পর আর যাই হোক ত্যাড়ামো, রাগারাগি করবে না আগের মতো। এখন সবাই নিশ্চিন্ত।

আগামীকাল পুনম আর নওশাদ পুনমদের বাসায় যাবে। তখন সবাই বেরিয়ে পড়বে, যার যার বাসায় চলে যাবে। ফিরে আসলে পুনম পুরো বাসায় একা হয়ে যাবে ভেবেই পুনম দীর্ঘশ্বাস ফেলে। একা একা ও থাকতে পারে না৷ নিশার সাথে পুনমের ভালোই সম্পর্ক ছিল। প্রতীকের ছেলে অর্কর সাথেও সময় কেটে যেতো। এই বাসায় তো কিছুই নেই৷ টিভিও নেই যে দেখে সময় পার করবে। ধূরর!

কিন্তু এখন মেইন কথা হলো পুনম হুটকি কি জানে না। ভাবতে ভাবতে পুনম রুমের সামনে এলো। তখনই কলিংবেল বেজে উঠে। ড্রয়িংরুমে কেউ নেই। পুনম আবারও গিয়ে দরজা খোলে। আরিফ দাঁড়িয়ে আছে। পুনমকে দেখে আরিফ বলে,

“আম্মু কোথায়?”

“বিশ্রাম নিতে রুমে গেল।”

“আচ্ছা আম্মু যদি ঘুমায় তাহলে ডাকার দরকার নেই। উঠলে বলে দিয়ো আমি একটু বাইরে যাবো। ফিরতে রাত হতে পারে।”

“ঠিক আছে।”

আরিফ চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েও আবার পুনমের দিকে ফিরে। পুনম জিজ্ঞাসা করে,

“কিছু বলবে?”

“মামা কি গতরাতে ফোন চেক করেছিলো?”

পুনম কপাল কুচকে বলে, “বুঝিনি।”

“মানে আমাদের মোবাইল কেড়ে নেওয়ার পর মামা ওগুলো নিয়ে তো রুমে চলে গিয়েছিল। রুমে ঢুকে ফোন চেক করেছিলো কারো?”

পুনম দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বলে, “না তো। এনেই ওয়ারড্রবে রেখে দিয়েছিল। কেনো?”

“না এমনিতেই। আম্মুকে বলে দিয়ো। আমি গেলাম।”

আরিফ ঝড়ের বেগে চলে যায়। পুনম বিড়বিড় করে বলে, “পাগল নাকি!”

দরজা লাগিয়ে রুমের দিয়ে পা বাড়ায়। রুমের সামনে আসতেই শুনতে পেলো নওশাদ কাকে যেন বকাবকি করছে। পুনম উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করলো। জিসান মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। সামনেই খাটে নওশাদ বসা। ওর হাতে মোবাইল। তবে মোবাইলটা নওশাদের নয়। নওশাদ বাজখাঁই ধমক দিয়ে বলে,

“মেয়েদেরকে মেসেজ দেওয়া না? কোথা থেকে শিখেছিস এইসব?”

জিসান মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। নওশাদ মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বলে,

“সারাদিন পড়ে সময় পাই না। তাই তোমাকে মেসেজ দেওয়া হয় না। প্লিজ রাগ করে থেকো না।’ এইসব কি লিখেছিস? তুই ভেড়া?”

জিসান চুপ করে থাকে। নওশাদ ধমকে বলল,

“জবাব দে?”

জিসান মাথা দুদিকে নাড়ায়। নওশাদ আবারও বলে,

“সারাদিন পড়িস না? টেস্টে উচ্চতর গণিতে কত পেয়েছিস?”

জিসান ঠোঁট কামড়ে ধরে। নওশাদ হাত উঠিয়ে বলে,

“কথা বলছিস না কেনো এখন? মেয়েদেরকে ভালোই রসিয়ে রসিয়ে মেসেজ দিতে পারিস। উত্তর দে।”

“সত্তর।”

“প্র্যাক্টিক্যালসহ?”

“হুম।” খুব ক্ষীণ স্বরে বলে।

“সত্তর কেনো পেয়েছিস? সারাদিন পড়ে সময়ই তো পাস না। এতো পড়ার পরও কি করে সত্তর পাস?”

জিসান মাথা উঠায়ই না। পুনম দেখে সবাই কিভাবে তটস্থ হয়ে থাকে এই লোকের ভয়ে। নওশাদ ব্যঙ্গ করে বলে,

“ওহ সময় আপনি আসলেই পান না। তবে ফ্রি ফায়ার খেলে, পড়াশোনা করে নয়। পড়াশোনা করলে তো রেজাল্টের এই হাল হতো না।”

জিসানের চিবুক বুকের সাথে লেগে গিয়েছে একদম। নওশাদ চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,

“এই? ফিজিক্সে কত পেয়েছিস?”

“ষাট।”

“যেখানে পঁচাত্তরে ষাট পেলেও কম, সেখানে সব মিলিয়ে ষাট?”

বলতে বলতে নওশাদের চোখ হঠাৎ পড়ে দরজার দিকে। নওশাদের সাথে চোখাচোখি হতেই পুনম সরে যায়। নওশাদ জিসানের দিকে তাকিয়ে বলে,

“এসএসসির আগ পর্যন্ত মোবাইল পাবি না। এসএসসি পরীক্ষার পর দিবো।

“মামা আমার ক্লাস করতে হয়।” মিনমিনে গলায় বলে।

“স্ক্রিন টাইমে দেখলাম তো। সব সময় ফেসবুক, ইনস্ট্রাগ্রাম, ফ্রি ফায়ার, ক্যান্ডি ক্যাশ, অনস্ট্রিম এগুলোর পিছনে ব্যয় করেছিস। ক্লাস কোথায় করিস তুই? শিখাস আমাকে? আবার মুখে মুখে কথাও বলিস?”

জিসান মাথা নিচু করে ফেলে। নওশাদ বলে,

“এসএসসি দিবি তারপর মোবাইল নিবি। যা এখন। মোবাইল আমার কাছে থাকবে এক্সামের আগ পর্যন্ত।”

জিসান মাথা নিচু করে বেরিয়ে যায়। রুম থেকে বের হতেই পুনমকে দেখে। অসহায় গলায় বলে,

“মামি মামাকে আমার মোবাইল দিয়ে দিতে বলো প্লিজ।”

পুনম কি বলবে? নওশাদকে দেখলেই তো পুনমের সব তালগোল পাকিয়ে যায়। তাও মাথা কাত করে বলে,

“আচ্ছা বলবো।”

“থ্যাংক ইউ।”

পুনম রুমে ঢোকে। নওশাদ চিৎ হয়ে পায়ের উপর পা তুলে শুয়ে ছিল। পুনম টেবিলের উপর থেকে মোবাইল নেয়৷ সাইলেন্ট করে রাখা ছিল। পাপিয়া, নিশা, প্রতীক বেশ কয়েকবার কল করেছিল। পুনম মনে মনে ভেংচি কাটে। পুনম তিনজনের নাম্বারই ব্লক করে দেয়। দরকার নেই এদের সাথে কথা বলার। প্রিতম তো কলই দেয়নি। পুনম জানে প্রিতম কল দিবেও না। ওর গার্লফ্রেন্ডের আঁচল ধরে ঘুরছে নিশ্চিত। নওশাদ আড়চোখে লক্ষ্য করে পুনমকে। গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,

“আপনার বড় ভাই কল করেছিল।”

“দেখেছি।”

“আমাকে কল করেছিল। আপনি দেখেছেন কি করে?”

“ওহ! আমাকে যে কল করেছিলো, আমি ভেবেছি আপনি আমাকে কল করার কথা বলেছেন।”

নওশাদ ভ্রুর কাছটা চুলকে বলে, “কালকে আপনার বাসায় যাবো। পরশু চলে আসবো।”

“আমি যাবো না।”

“আপনি বড় আপার সাথে কথা বলুন।”

“কি ব্যাপারে?”

“আপনি যে যাবেন না সেটা বলবেন।”

“আপাকে কেনো বলবো?”

“আপা না যাওয়ার কারণ জানতে চাইবেন। আমি তো কারো সাথে জেদ করে কিছু করিনি, তাই আমার কৈফিয়ত দেওয়ারও কোনো প্রয়োজন নেই। আপনি জেদ করেছেন, কৈফিয়ত দেওয়ার দায়ভারও অবশ্যই আপনার।”

পুনম চুপ করে যায়। কথায় কথায় জেদ করার বিষয়টা নিয়ে খোঁটা দিচ্ছে। পুনমের পছন্দ হচ্ছে না বিষয়টা। পুনম ধীর গলায় বলে,

“কখন যাবেন?”

“দুপুরের আগে।”

“ঠিক আছে।”

“পড়াশোনা করার ইচ্ছে আছে?”

“জ্বি।”

“তাহলে যাবেন যখন বই খাতা নিয়ে আসবেন। যেহেতু আপনার পড়াশোনা এবং সংসার দুটো করারই ইচ্ছে আছে।”

পুনম চোখ বন্ধ করে বড় করে শ্বাস ফেলে। এই লোকের সাথে ও মেপে মেপে কথা বলবে এখন থেকে। জিজ্ঞাসা করে, “হুটকি কি?”

“শুটকি।”

পুনম নাক মুখ কুচকে ফেলে। ছিহঃ ও শুটকি খায় না। গন্ধ লাগে ওর কাছে৷ নওশাদের পুনমের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। পুনম ইতস্তত বোধ করে। বলে,

“আমার উপর জেদ করে ওদের ছাদে আটকে না রাখলেও পারতেন।”

নওশাদ কঠিন চোখে তাকায়। “আপনি আমার কে যে আপনার উপর জেদ করবো আমি? আবার আপনার উপর জেদ করে আমি আমার বোনের ছেলেদের ছাদে আটকে রাখবো? বেশি ভেবে ফেললেন না?”

পুনম চুপ করে যায়। লোকটা জানে না পুনম কে? তাহলে ওভাবে জিজ্ঞাসা করলো কেনো যে পুনম ওই লোকের কে হয়! পুনমের সাথে নওশাদ সবসময় এতটা কর্কশ ভঙ্গিতে কেনো কথা বলে? পুনম মাথা নুইয়ে ফেলে। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরে। নওশাদ ঠোঁট বাঁকিয়ে কি যেন বলে। পুনম বুঝতে পারে না। শ্বাস ফেলে বলে,

“আপনি আমাকে আপনি করে বলবেন না প্লিজ। আমি সকালেও বলেছি আপনাকে।”

“দেখি।”

নওশাদ শোয়া। তাই পুনম বেডের ধারেকাছেও ঘেষলো না। টেবিলের সামনের চেয়ার টেনে বসে। চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে ফেসবুকে ঢোকে। গতকালই ভাগিনা, ভাগ্নিরা সবাই ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছে। পুনমের দেখা হয়নি। এখন এক্সেপ্ট করে। ইনবক্স চেক করে দেখে রুমঝুম নওশাদের আইডির লিংক পাঠিয়ে রেখেছে। নওশাদ বিন নাসির নামক আইডিতে লক করা নেই। পুনম মিনিটের মাঝে নওশাদের পুরো আইডি ঘাটাঘাটি করে ফেলে।

চোরের মতো নওশাদের আইডি ঘাটাঘাটি করে অন্য অ্যাপে যাবে সেইসময় একদম বেখেয়ালে স্ক্রিনে চাপ লেগে পুনম নওশাদের আইডিতে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দেয়। চোখ বড় বড় করে রিকোয়েস্ট তাড়াতাড়ি ক্যান্সেলও করে ফেলে। জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে, ঢোক গিলে নওশাদের দিকে চোরা চোখে তাকায়। নওশাদও সেই সময় তাকায় পুনমের দিকে। দুজনের চোখাচোখি হয়। পুনম বুঝে রিকোয়েস্ট ক্যান্সেল করে লাভ হয়নি। নওশাদ বিন নাসির দেখে ফেলেছে অদ্বিতীয়া মাহনূর পুনমের আইডি থেকে যাওয়া ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট। পরপরই পুনমের ফোনে একটা নোটিফিকেশন আসে। ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এসেছে একটা।

——————-

সন্ধ্যার দিকে জুঁই, বকুল, বেলী জবার বাসায় গিয়েছে। ইসরাত, রুমঝুম, রিমি, জাইমা, জেরিন, তাহিয়াও নিচে ছিল। নওশাদের বাসায় কেবল পুনম, নওশাদ আর হাসনাহেনা। হাসনাহেনা আর পুনম সোফায় বসে টুকটাক গল্প করছিলো। মূলত হাসনাহেনা পুনমকে সাংসারিক উপদেশ দিচ্ছিলেন। নওশাদের পছন্দ, অপছন্দের ব্যপারেও অবগত করছিলেন।

উনি জানেন ওনাদের একমাত্র ভাই স্বভাবে ভীষণ চাপা, জীবনেও নিজের সুবিধা-অসুবিধার কথা খুলে বলবে না। তাই উনি-ই টুকটাক বলছিলেন। তবে প্রতি কথার শেষে একটাই সতর্কতা দিচ্ছিলেন ওনার ভাইয়ের মাথা একটু গরম। পুনম ঠোঁট বাঁকায়। একটু গরম? একটু? পুনম মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। পুনম কেবল মাথা নাড়ে। মায়ের বয়সী ননাসের সাথে পুনম আর যেঁচে কি কথা বলবে এতো? ওর তো জমে ভালো ভাগ্নিদের সাথে। বিশেষ করে জেরিন, জাইমা, রুমঝুমের সাথে৷

তাহিয়া তখন আসে চারতলায়। হাসনাহেনা তাহিয়াকে দেখে বলে, “কিরে? গল্প শেষ?”

তাহিয়া হাসনাহেনাকে বলে, “বড় খালামণি আমরা ছাদে যাচ্ছি। মামিকেও নিয়ে যাই?”

“যাহ। তোরা অনুমতি নিয়ে কাজ করা শুরু করেছিস কবে থেকে? নওশাদ বাসায় আছে বলে?”

তাহিয়া মাথা চুলকে বলে, “ওই আরকি।”

“যাহ। এক কাজ কর। পেয়ারা কেটে নিয়ে যা। লবণ, মরিচ মাখিয়ে সবাই একসাথে খাস।”

তাহিয়া মাথা নাড়ায়। হাসনাহেনা পুনমের দিকে তাকিয়ে বলে,

“মাথায় কাপড় তো দিয়েই রেখেছো, ছাদে গেলেও দিয়ে রেখো। নতুন বউ মানুষ।”

পুনম মাথা নাড়ে। মাথার কাপড় টেনেটুনে ঠিক করে। ধীর কণ্ঠে বলে,

“রুম থেকে মোবাইল নিয়ে আসি?”

“যাও।”

পুনম মাথার কাপড় টানতে টানতে রুমের দিকে পা বাড়ায়। অন্যমনস্ক থাকায় নওশাদও যে রুম থেকে বের হচ্ছিলো তা খেয়াল করেনি। ফলাফল সরূপ নওশাদের বুকের সাথে বাড়ি খায় জোরেসোরেই। তড়িঘড়ি করে সরতে দরজার সাথেও বাড়ি খায়। নওশাদ চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,

“এত বড় মেয়ে হয়েও এমন তিড়িং বিড়িং স্বভাব কেনো? না কথাবার্তার ঠিকঠিকানা আছে, না চালচলনের, না সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা আছে।”

পুনম কোমরের দিক হাত দিয়ে ঘষতে থাকে। ভালোই ব্যথা পেয়েছে। নওশাদ বলে,

“রুমে আসুন।”

পুনম নওশাদের পিছু পিছু রুমে ঢোকে। নওশাদ ড্রয়ার থেকে মুভ স্প্রে বের করে বলে, “কোমরে ব্যথা পেয়েছেন?”

“হু।”

“স্প্রে করুন ব্যথা জায়গায়।”

পুনম স্প্রে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বড্ড সংকোচ ওর। বাকি সবার মতো নওশাদের সামনেও ও মাথায় কাপড় দিয়ে রাখে। নওশাদের রাগ হয়। ও রুম থেকে বেরিয়ে যায়। পুনম নওশাদের যাওয়ার পানে তাকিয়ে মাথার কাপড় ফেলে। নওশাদ সেকেন্ডের মধ্যে দরজা বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়ার জন্য আসে। পুনম দরজার দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে হাত উল্টো করে কোমরে মাসাজ করছে। পিঠে চুল ছড়িয়ে আছে। পুনম হাত বাড়িয়ে পিঠে থাকা চুলগুলো সামনে নিয়ে আসে। ব্লাউজের গলা মিডিয়াম, কোমরের দিকের কাপড়ও ঢিলে হয়ে আছে। নওশাদ যেভাবে নিঃশব্দে এসেছিল, ওভাবেই নিঃশব্দে চলে যায়। পুনম বুঝতেই পারে না কেউ একজন ওকে গভীর চোখে পরখ করেছে।

—————

তাহিয়া টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে পেয়ারা কাটছে। পুনম শাড়ির আঁচল ঠিকঠাক করে তাহিয়ার পিছন পিছন এসে বলে,

“আমি কেটে দেই, দাও।”

“লাগবে না আমি পারবো। এখন ভাগ্নিদের দিয়ে খাটিয়ে নাও। আমরা চলে গেলে পুরো বাসা তোমাকেই সামলাতে হবে। তখন ইচ্ছা মতো কাজ করবে নাহয়।”

পুনম হাফ ছাড়ে। ও পারে না এইসব রান্নাঘরের কাজ। কেবল সৌজন্যতা দেখিয়ে বলেছিলো। ভাগ্যিস তাহিয়া পেয়ারা কাটতে দিয়ে দেয়নি। এখন নাহয় বেঁচে গেল। কিন্তু ওরা চলে গেলে? বাসা খালি হয়ে যাবে। তখন সব কাজ কিভাবে করবে পুনম!

তাহিয়া একটা পেয়ারা কাটে। পুনম লবণ, মরিচের গুঁড়োর কৌটা নিয়ে আসে। নওশাদ তখন হাসনাহেনার সাথে বসে কথা বলছিলো। হাসনাহেনার সাথে কথা বলার মাঝে নওশাদ আড়চোখে বেশ কয়েকবার পুনমকে দেখে। আরেকটা পেয়ারা অর্ধেক কাটার পর বাকি অর্ধেকটা কাটার সময় তাহিয়ার আঙুল কেটে যায়। রক্ত পড়ছে ভালোই। পুনম আঁতকে উঠল। তাহিয়া কাঁদা আরম্ভ করে দেয়। হাসনাহেনা, নওশাদ দ্রুত ডাইনিং টেবিলের কাছে আসে।

হাসনাহেনা ক্ষত পরখ করে পুনমকে বলে, “পুনম রুই আর হেক্সিসল নিয়ে এসো দ্রুত।”

তাহিয়া আরো জোরে কেঁদে উঠে। হেক্সিসল লাগালে আরো জ্বলবে, ও মাথা নাড়িয়ে নিষেধ করতে থাকে। নওশাদ ভ্রু কুচকে পুনমের দিকে তাকিয়ে বলে,

“নিয়ে আসো যাও। রক্ত পড়ছে দেখতে পারছো না?”

পুনম তাকিয়ে থাকে। মাথা চুলকায়। রক্তপাত বন্ধ করতে রুই লাগে? হয়তো লাগে, ঘরোয়া টোটকা থাকতেই পারে। পুনম কি বুঝলো কে জানে! ও দ্রুত রান্নাঘরে যায়। ফ্রিজ খুলে মাছের পলিথিন বের করে নিয়ে আসে। নওশাদ, হাসনাহেনা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে পুনমের হাতে থাকা মাছের পলিথিনের দিকে। তাহিয়ার কান্নাও থেমে যায়। ও পিটপিট করে তাকিয়ে থাকে। নওশাদ বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করে,

“এটা কি এনেছো? মাছের পলিথিন কেনো?”

“আপা রুই আনতে বললো না?” হাবাগোবা মুখ বানিয়ে বলে।

হাসনাহেনা নওশাদের দিকে তাকায়। নওশাদ বড় আপার চাহনি বুঝে তপ্ত শ্বাস ফেলে বলে,

“তুমি আমার ড্রেসিংটেবিলের ড্রয়ার থেকে তুলো নিয়ে এসো। রুই মানে তুলো। যাও।”

পুনম বেকুবের মতো কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। রুই মানে রুই মাছ নয়? রুই মানে তুলো হলো কবে থেকে? কিসব বলে এরা!

চলমান……..

(মন্তব্য করে যাবেন। ভালো লাগবে। হ্যাপি রিডিং।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here