#বলো_কোন_প্রিয়_নামে_ডাকি:~
#পর্ব_২
#সমৃদ্ধি_রিধী
নওশাদ ছাদের দরজার সামনে বুকে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে। ওর পিছনে ইসরাত, জাইমা, জেরিন, রিমি, রুমঝুম, তাহিয়া সিরিয়াসলি দাঁড়িয়ে আছে।
আরিফ, মাহতাব কোমরে হাত দিয়ে কথা বলছে। ওরা ছোটদেরকে বলে দিচ্ছে কি কি করতে হবে, না করতে হবে। জিসান আর তিহান শাড়ি ধরে আছে। তুহিনের হাতে দুটো টর্চ লাইট। মাহাদী, মুমিন ইউটিউবে গান খুঁজছে। মাহাদী জোরে চেঁচিয়ে বলে,
“আরিফ ভাইয়া জারা জারা দেই এবার?”
“দে।”
তুহিন লাফাতে লাফাতে লাইট এদিক ওদিক মারতে থাকে। মুমিন বিরক্ত হয়ে বলে, “তুহিন লাইট ঠিক করে ধর। নাহলে কিন্তু তোকে নিচে রেখে এসে আমরা এখানে মজা করবো।”
মাহাদী ঘাড়ে হাত ঘষে বলে, “কালকে যে মাইরটা খাবো রে!”
“এখন ইনজয় করো তো! পরেরটা পরে দেখা যাবে। মামা কালকে হুশে থাকলেই হয়।” মুমিন বলে।
আরিফ দুষ্ট হাসি দিয়ে বলে, “এখন হুশে আছে?”
সবাই হেসে উঠে। জাইমা, জেরিন একে-অপরের দিকে তাকায়। নওশাদের চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। তুহিন বোকা বোকা চোখে তাকিয়ে বলে,
“মামার হুশ থাকবে না কেনো?”
আরিফ গলা চুলকায়। তুহিন বলে, “কি হলো বলছো না কেনো?”
মাহতাব বলে, “মামা এখন মামির হাতে মাইর খাবে তাই।”
তুহিন লাফিয়ে উঠে। “ভালো হবে। আমাকে সকালে যে জোরে থাপ্পড় মেরেছে আমার এখনও কানে ব্যথা। মামিও মারুক। মামার কানে ব্যথা করে দিক।”
আরিফ বলে, “ছোটা মিয়া! মামা শুনলে তোকে কি করবে?”
তুহিন অদৃশ্যে ঘুষি মেরে বলে, “এভাবে ঘুষি দিবে।”
মুমিন চেঁচিয়ে বলে, “তুহিনের বাচ্চা লাইট ঠিক করে ধরতে বলেছি না?”
মাহতাব বলে, “আগেই বলেছিলাম ওকে রেখে আসতে। আরেকবার ভ্যানভ্যান করলে ছাদ থেকে ফেলে দিবো তুহিন।”
তুহিন লাইট নড়াতে নড়াতে ছাদের দরজার দিকে মারে। চোখ মুহুর্তেই বড় বড় হয়ে যায়। মাহতাব ‘চ’ সূচক শব্দ করে বলে, “দরজার দিকে ধরেছিস কেনো? তোর ভুতনি বউ দাঁড়িয়ে আছে তো! এদিকে ধর।”
নওশাদ রাগী চোখ তাকিয়ে আছে। তুহিনের ওই তাকানো দেখেই অন্তর আত্মা কেঁপে ওঠে। জিসান তুহিনের মাথায় বারি মেরে বলে, “কি হলো?”
“মামা।”
মাহাদী বলে, “তোর স্বপ্নে এসে মামা তোকে এখন থাপড়াবে।”
“মামা দরজার সামনে। তোমাদেরকেও থাপ্পড় দিবে।”
“হ্যাঁ বাসর ঘর থেকে তোকে থাপড়াতে….” মুমিনের কথা বন্ধ হয়ে গেল। চোখ বড় বড় হয়ে যায়।
আরিফসহ সবাই দরজার দিকে তাকায়। আরিফ মাথার চুলে খামচে ধরে বলে, “শিট।”
জিসান, তিহান তড়িঘড়ি করে শাড়িটা টেনে উপরে তুলে। সাউন্ডবক্স উপরে উঠানোয় এবার জোরে গান বাজছে। মাহাদী ফ্লোর থেকে উঠে দ্রুত গান বন্ধ করে। তুহিন আরিফের পিছনে লুকিয়ে পড়ে। নওশাদ ছাদের ভিতর ঢুকে। শক্ত চোখে সবগুলোকে দেখতে থাকে। ওরা একে অন্যের দিকে তাকায়। নওশাদ কিছু বলছে না। কেবল শক্ত চোখে তাকিয়ে আছে। ওরা মাথা নিচু করে ফেলে। ইসরাতরা দরজার সামনেই দাঁড়ানো। মাহতাব আরিফকে কিছু বলার জন্য খোঁচাতে থাকে। আরিফ ঝাড়া মেরে হাত সরিয়ে দেয়।
নওশাদ কোনো প্রকার শব্দ না করে বেশ অনেকক্ষণ ধরে ওদের দিকে তাকিয়ে থাকে, শক্ত চোখে। নওশাদ কিংবা অন্যান্যরা কেউ কিছুই বলছে না দেখে আরিফ কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে, “এমনিই মজা করছিলাম।”
বলতে দেরী আরিফের গালে থাপ্পড় পড়তে দেরী হলো না। রুমঝুম চকিত দৃষ্টিতে তাকায়। আরিফ গালে হাত রেখে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো। বাকিরা সাথে সাথে গালে হাত দেয়। নওশাদ ওদেরকে রাগি চোখে পরখ করে শাড়ির গিট্টু খুলে বোতলের মতো সাউন্ডবক্সটা দূরে ছুঁড়ে মারে। মাহতাব প্রায় চেঁচিয়ে উঠে।
“আমার সাড়ে চার হাজার টাকার সাউন্ডবক্স।”
সহসাই নওশাদের অগ্নিদৃষ্টির সম্মুখীন হয়ে দমে গেল। দুগালে হাত চেপে দাঁড়িয়ে থাকে। নওশাদ ওদের সামনে এসে বলে, “কার ফোন থেকে গান ছাড়া হচ্ছিলো?”
মাহাদী মুখ কুচকে ফেলে। ওর আইফোন না জানি ফেলে দেয়। নওশাদ এবার চেঁচিয়ে বলে,
“কথা বলছিস না কেনো? কার ফোন থেকে গান ছাড়া হচ্ছিলো?”
জিসান তড়িঘড়ি করে বলে, “মাহাদী ভাইয়ার।”
নওশাদ মাহাদীর দিকে হাত বাড়িয়ে বলে, “মোবাইল দে।”
মাহাদী খিঁচে থাকে। নওশাদ রেগে বলে, “দিতে বলেছি না?”
মাহাদী মিনমিন করে বলে, “মামা আইফোন। প্লিজ ফেলো না।”
নওশাদ চেঁচিয়ে বলে, “আমাকে কথা রিপিট করতে হচ্ছে কেনো? মোবাইল দিতে বলেছি না?”
মাহাদী মোবাইল দেয়। নওশাদ ওটা হাতে নিয়ে বলে,
“সবার মোবাইল দে।”
সবাই গালে হাত চেপে মোবাইল বের দিলেও আরিফ একটু ইতিউতি করে। নওশাদ হাত উঠালে পুনরায় থাপ্পড় খাওয়ার আগেই মোবাইল অফ করে দিয়ে দেয়। নওশাদ মোবাইল অফ করার দৃশ্যটা দেখে। আরিফের দিকে ভ্রু উঁচু করে তাকালে আরিফ বলে,
“মজা করেছি ইট’স ওকে। আম সরি ফর দ্যাট বাট আমার প্রাইভেসি আছে।”
নওশাদ অন্যদের থেকে মোবাইল চায়। কেবল তিহান, তুহিনের মোবাইল ছিল না। জিসানের মোবাইল আছে নওশাদ জানতো না। জিসান লুকিয়েই ব্যবহার করতো যাতে নওশাদের চোখে কখনো না পড়ে। সকলের মোবাইল নিয়ে নওশাদ ছাদ থেকে বেরিয়ে যাবে এমন সময় জিসানের মোবাইলে কল আসে। উচ্চশব্দে বেজে উঠে। জবা কল করেছে। নওশাদ অবাক হয়ে তাকায়। জিসান পকেট থেকে মোবাইল বের করে তাড়াহুড়ো করে কল কাটে। জিসানের এই চালাকি করার জন্য নওশাদ চোখ রাঙিয়ে তাকায় জিসানের দিকে। জিসান মুখ কুচকে রেখেছে। প্রায় ছয়মাস পর আজ ধরা খেয়েই গেলো। জিসানের মোবাইল কেড়ে নিয়ে নওশাদ শক্ত গলায় বলে,
“এসএসসি দেয়নি এখনও, দাঁড়ি গোফ ঠিক করে গজায়নি। এর আগেই ব্যক্তিগত মোবাইল ব্যবহার করা না?”
জিসানের মুখ কাঁদো কাঁদো হয়ে যায়। শেষ ওর মোবাইল শেষ।
“এই তুহিন?” নওশাদ হাক ডাকে।
তুহিন আরিফের পিছনে লুকিয়ে পড়ে। নওশাদ শক্ত গলায় বলে, “টর্চলাইট দুটো দে।”
তুহিন সাথে সাথে দিয়ে দেয়। নওশাদ সবার মোবাইল, দুটো টর্চ লাইট বাজেয়াপ্ত করে ভাগিনাদের ছাদে আটকে ছাদের দরজায় তালা লাগিয়ে চলে যায়। মেয়েদেরকেও বেশ ধমক দিয়ে নিচে পাঠিয়ে দেয়। রুমঝুম করুণ চোখে তাকিয়ে ছিল সবার দিকেই।
পুরো ছাদে ঘুটঘুটে অন্ধকার। তুহিন আরিফের গায়ের সাথে লেগে আছে।
জিসান কাঁদো কাঁদো গলায় বলে, “আমার মোবাইল আর দিবে না মনে হয়।”
তিহান বলে, “তোমার মোবাইলের জন্যই আমাদের আটকে রেখে গেলো। যদি ধরা না খেতে তাহলে মামা ছাদের দরজা বন্ধও করে যেতো না, আমরাও নিচে নেমে যেতে পারতাম।”
মুমিন বলে, “মোবাইল আছে ভালো কথা, সাইলেন্ট করে রাখতে পারিস না?”
মাহাদী ছাদে বসে বলে, “ওর ফাতরা ফোনের কথা রাখ তো! আমার আইফোন নিয়ে নিলো।”
আরিফ মাহতাবের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। কলার ঝাঁকিয়ে বলে, “শালা তোর এই বুদ্ধির জন্য আমাকে ছোট ভাই, বোনদের সামনে থাপ্পড় খেতে হলো।”
তুহিন আবার আরিফকে জাপটে ধরে। “ভাইয়া অন্ধকার, ভয় লাগে তো।”
“যাহ সর।”
মুমিন বলে, “কি করবো এখন?”
তিহান বলে, “লাইট থাকলে খেলা যেতো।”
মাহাদী তিহানের মাথায় গাট্টা মেরে বলে, “আমার আইফোন নিয়ে গেল আর তুই খেলা নিয়ে আছিস!”
“আমার মোবাইল! কত কলাকৌশল করে মোবাইল নিয়েছিলাম। আমাকে আর ফেরত দিবে না। আম্মুকে মামা থাকা অবস্থাতেই কল দিতে হলো! আম্মু কল না দিলে আমি জীবনেও মোবাইল বের করতাম না। ধরাও খেতাম না।” জিসানের কাঁদো কাঁদো গলা।
আরিফ বলে, “তোর ফোনে কি এত আছে যে ভয় পাচ্ছিস?”
জিসানের মুখে আঁধার নেমে আসে। মামা যদি একবার দেখে কি আছে তাহলে আর রক্ষা নাই। জিসান উত্তর দেয় না। মুমিন বলে,
“আরিফ ভাইয়া তুমি ওইভাবে ফোন বন্ধ করলে কেনো?”
“আমি তোদের সবার বড়। আমার প্রাইভেসি বেশি তাই।”
“মামা তোমার থেকে কেবল আড়াই বছরের বড়। তুমি এমন ভয় পাও কেনো? আমাদের ভয় পাওয়া তো লজিক্যাল। তোমারটা তো লজিক্যাল না। তোমরা হতে বন্ধুর মতো। তা না!”
“বড়ই হয়েছি ওভাবে। বন্ধুর মতো তো বড় হইনি।”
মাহতাব বলে, “আম্মুরা যেভাবে মামার মতামতকে গুরুত্ব দেয়! আল্লাহ।”
“মামা অনেক ম্যাচিউর যে তাই।” আরিফ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে।
ওরা গোল হয়ে বসে পড়ে। মাহতাব বলে, “লাইট থাকলেও হতো। কিছু একটা কথা যেতো। এখন কি করি! টর্চ দুটোও নিয়ে গিয়েছে।”
“মামা বউয়ের হাতে মাইর খাবে দেখো। আমার আইফোন!” মাহাদী ফুঁসে ওঠে।
মুমিন বলে, “বউয়ের হাতে মামার মাইর খাওয়া নিয়েই কথা হচ্ছিলো। অথচ মামার হাতে আরিফ ভাইয়া মাইর খেয়েছে। তাই এইসব অশুভ কথা আর বলো না।”
আরিফ মুমিনের পায়ে সর্বশক্তি দিয়ে একটা লাথি মেরে বসে। মাহতাব বলে, “তোমার মনে হয় না মামা অনেক রেগে ছিল?”
“বিয়ের দিনও কে রেগে থাকে?” মুমিন বলে।
“মামা আসলেই রেগে ছিল। অন্য কারো রাগ আমাদের উপর ঝেড়েছে। নাহলে সামান্য এই মজা নিয়ে এত সিনক্রিয়েট করতো না।” আরিফ হাঁটু ভাঁজ করে বসে বলে।
জিসান বলে, “কি করি এখন?”
“মশা মারি। আর কি করবো!”
ছাদে হাত পা ছড়িয়ে সবাই শুয়ে পড়লো। পূর্ণিমা হলেও তো হতো। আলো থাকতো একটু। পুরো ঘুটঘুটে অন্ধকার সাথে মশার কামড়। আরিফের গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। মোবাইলে লক দেওয়া নেই ওর। কখনোই থাকে না। নওশাদ যদি মোবাইল অন করে তবে! পরক্ষণেই আরিফ মাথা থেকে সেই চিন্তা ঝেড়ে ফেলে দিলো। নওশাদ রাগারাগি করলেও আরিফের প্রাইভেসিতে ইন্টারফেয়ার করবে না, এটা আরিফ জানে।
——————-
এলার্মের শব্দে পুনমের ঘুম ভেঙে যায়। চোখ কচলে উঠে বসে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে থাকে সাতটা বাজে। নওশাদের ফোনের এলার্ম বাজছে। নওশাদ রুমে নেই। ওয়াশরুম থেকে পানি পড়ার শব্দ আসছে। পুনম নওশাদের ফোনের এলার্ম বন্ধ করে দেয়। আড়মোড়া ভেঙে উঠে দাঁড়ায়। গতরাতে নওশাদ রুম থেকে বেরিয়ে প্রায় একঘন্টা পর অনেকগুলো মোবাইল, টর্চ নিয়ে রুমে আসে। ওগুলো ওয়ারড্রবের ড্রয়ারে রেখে শুয়ে পড়েছিলো। পুনমের চোখ রীতিমতো ঘুমে জ্বলছিল। কিন্তু নওশাদের অপেক্ষায় ছিল। নওশাদ রুমে আসার পর ঘুমিয়েছে।
পুনম বিছানা গুছিয়ে ফেলে। লাগেজ থেকে নীল রঙা একটা শাড়ি বের করে। দরজায় ঠকঠক করে শব্দ হয়। পুনম ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দরজার কাছে এগিয়ে যায়। দরজা খোলে। বাইরে রুমঝুম আর জেরিন দাঁড়িয়ে আছে। পুনম কৃত্রিম হাসি দিয়ে বলে,
“গুড মর্নিং।”
“গুড মনিং বাট মামা কোথায়?” জেরিন বলে।
“ওয়াশরুমে।”
“ছাদের চাবি কোথায় জানো?” গলার স্বর নিচু করে রুমঝুম বলে।
“না আমি তো জানি…” পুনম থেমে যায়। কাল নওশাদ ড্রেসিংটেবিলের উপর চাবি রেখেছিল একটা।
“দাঁড়াও। একটা চাবি দিচ্ছি, দেখো তো সেটা কিনা।”
বলেই ও ড্রেসিংটেবিলের উপর থেকে চাবি নিয়ে আসে। রুমঝুমকে দেখিয়ে বলে,
“এটা?”
“হ্যাঁ হ্যাঁ এটাই।”
“কিন্তু এত সকালে ছাদের চাবি দিয়ে কি করবে?”
“আরেহ কালকে রাতে মামা ভাইয়াদেরকে ছাদে আটকে রেখে এসেছে। ওদেরকে খুলে দিতে যাচ্ছি।”
“আটকে রেখেছে?” অবাক হয়ে জানতে চায়।
“তো? ওহ হ্যাঁ ওদের মোবাইল কোথায় জানো?”
“দাঁড়াও দিচ্ছি।”
বলেই পুনম মোবাইলগুলো নিয়ে আসে। জেরিন, রুমঝুমের হাতে দেয়। ওরা মোবাইল, চাবি নিয়ে বেরিয়ে যায়। ওরা যেতেই পুনম দরজা চাপিয়ে ওয়ারড্রবের ড্রয়ার বন্ধ করার সময় নওশাদ ওয়াশরুম থেকে বের হয়। নওশাদ কপাল কুচকে বলে,
“ওয়ারড্রবে কি?”
পুনম আমতাআমতা করে। নওশাদ এখনও ওর জিনিস ধরার অনুমতি পুনমকে দেয়নি। পুনমের ভীষণ হেজিটেড ফিল হচ্ছে। নওশাদ বোঝে। বলে,
“চাবি, মোবাইল নিতে এসেছিল?”
“জ্বি।”
“কে?”
“রুমঝুম আর জেরিন। আরিফদেরকে সারারাত ছাদে আটকে রেখেছিলেন কেনো?”
নওশাদ উত্তর না দিয়ে টেবিলের সামনের পর্দা সরিয়ে দেয়। চেয়ার টেনে টেবিলে বসে। খাতা খুলতে খুলতে বলে,
“ওয়াশরুমে গিজার আছে। প্রয়োজনে গিজার অন করে গোসল করে নিয়েন।”
পুনম বলে, “আমি আপনার চেয়ে বয়সে বড়।”
“কি?” নওশাদ চাপা স্বরে চেঁচিয়ে পুনমের দিকে ঘুরে বলে।
পুনম দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বলে, “আপনি আমার চেয়ে বয়সে বড়। আপনি তোমাকে আমি করে বলতে পারেন।”
“হোয়াট?” গলার স্বর বাড়ে। মুখ কুচকে যায় আরো।
পুনম আবারও মাথা দুদিকে নাড়িয়ে, ঝাঁকিয়ে বলে,
“ধূর ধূর! সরি। আপনি আমার চেয়ে বয়সে বড়। আপনি আমাকে তুমি করে বলতে পারেন।”
নওশাদ কেমন করে যেন তাকায়। বড় করে শ্বাস ফেলে খাতায় কলম চালিয়ে বলে, “আরিফ, মাহতাব, ইসরাত, রিমিও বয়সে আপনার চেয়ে বড়। ওদেরকেও এভাবে তুমি করে বলতে বলবেন?”
“ওরা বয়সে বড় হলেও সম্মানে আমি বড়। কিন্তু আপনি আমার চেয়ে সম্মানে, বয়সে সব দিক থেকে বড়। আপনার মুখে আপনি শুনতে ভালো লাগে না।”
“আমাদের ডিভোর্স হলে আপনাকে তো আপনি করেই ডাকতে হবে। তখন?”
“আমি কি বলেছি ডিভোর্সের কথা? কথাটা তো আপনিই বারবার তুলছেন।”
নওশাদ ঘাড় বাঁকিয়ে পুনমের দিকে তাকায়। পুনম এতক্ষণ নওশাদের পিঠের দিকে তাকিয়ে কথা বলছিলো। নওশাদ তাকাতেই ও মাথা নত করে ফেলে। নওশাদ কিছুক্ষণ মাথা নত করে দাঁড়িয়ে থাকা নববধূকে দেখে, যাকে জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়েছে। নওশাদ ঠোঁট ভিজিয়ে বলে,
“ডিভোর্স হবে না বলছেন?”
“আমি মনকে স্থির করছি, আপনি আমার মনে আবার এইসব ঢোকাচ্ছেন।”
“সংসার করবেন?”
“হুহ।”
“তবে আপনার রিলেশনের কি হবে?”
“রিলেশন কোথা থেকে আসলো?” কপাল কুচকে জিজ্ঞাসা করে।
“রিলেশন নেই?”
“না।”
“তাহলে জোর করে বিয়ে দিলো কেনো?”
পুনম চুপ করে যায়। নওশাদ পুনরায় ঘুরে বসে। খাতায় কলম চালিয়ে বলে, “কি হলো বলুন?”
পুনম মনে মনে বলে, “সেটা আপনাকে বলা যাবে না।”
“বিষয়টা কি একান্ত ব্যক্তিগত?”
“কিছুটা।”
“ফাইন। আপনার ভার্সিটি নেই?”
“আছে।”
“থার্ড ইয়ারে না?”
“জ্বি।”
“তাহলে এই বয়সেও এমন উল্টাপাল্টা কথা বলেন কেনো? তালকে লতা বলেন কেনো এখনও?”
“স্লিপ অফ টাং”
নওশাদ চুপ করে যায়। এত বড় মেয়ের স্লিপ অফ টাং! পুনম বলে, “একটা কথা জিজ্ঞাসা করি।”
“হুহ।”
“আপনি কি ভাবছেন আমার রিলেশন আছে তাই আমাকে বিয়ের জন্য জোর করেছে?”
“অবশ্যই।” সোজাসাপ্টা জবাব।
“এখনও ভাবছেন? আমাকে জিজ্ঞাসা করার পরও?”
“আংশিক।”
“সম্পর্কের শুরুতেই অবিশ্বাস?”
“বিষয়টা একদিকে সেনসিটিভ আবার একই সাথে এই মুহুর্তে আপনি আমার ওয়াইফও। আপনাকে বিশ্বাস করতে আমি বাধ্য৷ তবে আপনাকে পুরোপুরি না আমি চিনি, না আপনি আমাকে পুরোপুরি চেনেন। একটা মানুষকে বিশ্বাস করতে, তার ন্যাচার বুঝতেও তো কিছুটা সময় লাগে।”
পুনম ভ্রু কুচকে বলে, “কোন বিষয়টা সেনসিটিভ?”
“বিয়ের আগের দিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবার আপনার বড় ভাইয়ের কাছে আপনার নাম্বার চেয়েছিলাম। উনি অনেক গাইগুই করছিলেন। আপনি অসুস্থ, মাইগ্রেনের ব্যথা উঠেছে। ঘুমাচ্ছিলেন, ডাকলে সমস্যা হবে। অনেক তালবাহানা করে বিয়ের আগে আপনার সাথে কথা বলতে দেওয়া হয়নি আবার এখন দেখছি আপনিও বিয়ে করতে রাজি নন। কি দাঁড়ায় এইসবের অর্থ?”
“কেনো নাম্বার চেয়েছিলেন?”
“আপনি বিয়েতে রাজি কিনা তা জানতে চাচ্ছিলাম।”
“ওহ।”
নওশাদ কিংবা পুনম কেউ কোনো কথা বলে না আর। আটটা বাজতে আর দু মিনিটের মতো সময় বাকি। পুনম শাড়ি এবং যাবতীয় সকল কিছু নিয়ে ওয়াশরুমের সামনে দাঁড়ায়৷
“প্লিজ আপনি আমাকে আপনি করে বলবেন না।”
নওশাদ পুনমের দিকে তাকাতেই পুনম ওয়াশরুমের দরজা বন্ধ করে দেয়।
————————
রুমঝুম গিয়ে ছাদের দরজা খুলে দেয়। ছাদেই ফ্লোরে একটার গায়ে আরেকটা পড়ে ঘুমোচ্ছে। রুমঝুম আরিফকে আলতো করে ধাক্কা দেয়। আরিফ চোখ খুলে।
“আরিফ ভাইয়া উঠো। রুমে গিয়ে ঘুমোও।”
আরিফ উঠে বসে। রুমঝুম তিহান, তুহিনকেও উঠায়। আরিফ হামি দিয়ে বলে,
“মামা চাবি দিলো?”
“না। মামা ওয়াশরুমে ছিল। মামির কাছ থেকে নিয়ে এসেছি।”
“মোবাইল এনেছো?”
“হুম। সবার মোবাইল এনেছি। আপ্পির কাছে।”
আরিফ মাহতাব, মাহাদী, মুমিনকে উঠায়। জিসান উঠেই মোবাইলের কথা জিজ্ঞাসা করে। রুমঝুম বলে,
“জেরিনের কাছে দিয়েছি তোরটা। নিয়ে নিস।”
জিসান দৌঁড়ে নিচে চলে যায়। মাহতাব আড়মোড়া ভেঙে বলে,
“সারা শরীর ব্যথা করছে।”
“এভাবে শুয়ে থাকলে তো ব্যথা করবেই।” আরিফ টিশার্ট ঝাড়তে ঝাড়তে বলে।
“চা খাবে তোমরা?” রুমঝুম বলে।
“দিস। ভালো হয়।” মাহাদী বলে।
আরিফ হামি দিয়ে রুমঝুমের দিকে তাকিয়ে বলে,
“দুধ চা বানাবি না রং চা?”
“তোমরা যেটা খেতে চাও।”
মাহাদী বলে৷ “রং চা দিস।”
“আমাকেও।” মাহতাব বলে।
আরিফ তুহিন, তিহানের দিকে তাকিয়ে বলে, “তোরা চা খাবি?”
“না।”
“রুমঝুম তুই বাকিদের জন্য রং চা বানিয়ে আমাকে কড়া লিকারের দুধ চা দিস। পরে দিলেও হবে, সমস্যা নেই।” আরিফ বলে।
রুমঝুম মাথা কাত করে বলে, “ঠিক আছে।”
মাহতাব, মাহাদী, মুমিন নিচে নামে। তিহানও তুহিনকে সাথে নিয়ে নেমে যায়। আরিফ চুলে হাত গলিয়ে বলে,
“ধূরর কি বালি! গোসল করতে হবে।”
“গরম পানি দিতে বলবো?”
“গিজার আছে না? আবার কাকে গরম পানি দিতে বলবে?”
রুমঝুম এদিক ওদিক তাকিয়ে বলে, “ওহ হ্যাঁ! খেয়াল ছিল না।”
“তোমার তো কিছুই খেয়াল থাকে না।”
বলে আরিফ বড় বড় পা ফেলে ছাদ থেকে বেরিয়ে যায়। রুমঝুম দম ফেলারও সময় পায় না। আরিফ সাথে সাথেই ফিরে আসে।
“এই রুমঝুমি?”
রুমঝুম আচমকা আরিফের কণ্ঠস্বর শুনে কেঁপে ওঠে। “জ্বি?”
“আমার মোবাইল অফ ছিল নাকি অন?”
“অফ ছিল।”
“বাকিদের?”
“তোমারটা ছাড়া বাকিদেরটা অনই ছিল।”
“তোমার কি মনে হয়? মামা মোবাইল চেক করতে পারে?”
“না, মামা কেনো মোবাইল চেক করবে? মামা এইসব টক্সিক কাজ করবে না।”
আরিফ সেভাবে এসেছিল ওভাবেই চলে যায়। রুমঝুম কাঁধ ঝাঁকায় আরিফের যাওয়ার পানে তাকিয়ে।
চলমান…….
(হ্যাপি রিডিং)

