বলো_কোন_প্রিয়_নামে_ডাকি:~ #পর্ব_৫

0
58

#বলো_কোন_প্রিয়_নামে_ডাকি:~
#পর্ব_৫
#সমৃদ্ধি_রিধী

সবার গোছগাছ শেষ। একটু পরই যে যার মতো চলে যাবে। আরিফ, ইসরাত, হাসনাহেনা আফতাবনগর যাবে। বকুল, রুমঝুম, রিমি ওরাও প্রথমে আফতাবনগর যাবে। পরে আরিফ ওনাদেরকে বড্ডায় পৌঁছে দিবে। জুঁই স্বামী, তিহান, তুহিন, তাহিয়াকে নিয়ে গুলশান যাবে। বেলী তিন ছেলেসহ মোহাম্মদপুর যাবে। নওশাদ আর পুনম শনিআঁখড়ার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়বে।

পুনম আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছে। বিছানায় রুমঝুম, জেরিন, জাইমা, তাহিয়া বসা। তাহিয়ার হাতে পুনমের মোবাইল। তাহিয়া ফেসবুক স্ক্রল করছে। রুমঝুম জেরিনের দিকে তাকিয়ে বলে,

“জিসানের মোবাইল মামা ফেরত দিবে না?”

“মনে হয় না দিবে। কালকে জিসানকে রাতে দেখলাম মুখে বালিশ গুঁজে মেয়েদের মতো কান্না করছে।”

রুমঝুম পুনমের দিকে তাকিয়ে বলে, “মামা জিসানের মোবাইল কোথায় রেখেছো দেখেছো?”

পুনম দুদিকে মাথা নাড়ায়। তাহিয়া বলে উঠে,

“মামার সাথে ফেসবুকে তোমার এড আছে?”

“হুম।” খুব ছোট্ট উত্তর।

“তুমি রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছো নাকি মামা?”

পুনম উত্তর দেওয়ার আগেই রুমঝুম বলে, “মামা রিকোয়েস্ট পাঠাবে তোর মনে হয়? ইগোয়েস্টিক লোকেরা জীবনেও আগ বাড়িয়ে কিছু করে না।”

তাহিয়া মাথা দুলিয়ে বলে, “তাও ঠিক।”

পুনম মুখে আসা কথা গিলে ফেলে। প্রথমে রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছে পুনম। নওশাদ এক্সেপ্ট করার আগেই পুনম রিকোয়েস্ট ক্যান্সেল করে ফেলে। পরবর্তীতে নওশাদ রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছে, তখন নওশাদ রিকোয়েস্ট ক্যান্সেল করার আগেই পুনম রিকোয়েস্ট এক্সেপ্ট করে ফেলেছে। ঘুরেফিরে কি দাঁড়ালো পুনম হিসেব করতে পারছে না।

নওশাদ তখন রুমে আসে। নওশাদ রুমে প্রবেশ করার সাথে সাথেই রুমঝুম, জেরিন, জাইমা, তাহিয়া সুরসুর করে বেরিয়ে গেল। নওশাদ দরজা লাগিয়ে দেয়। আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে ঘামে ভেজা শার্ট খুলে ফেলে। ওটা বিনে রাখে। সেন্টু গেঞ্জি পড়ে আলমারি থেকে নতুন সাদা শার্ট, সেন্টু গেঞ্জি, কালো জিন্স বের করে বিছানায় রাখে। সেন্টু গেঞ্জিও বিনে ফেলে তোয়ালে আর জিন্স প্যান্ট নিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায়। পুনম আড়চোখে দেখে সবটা।

নাকের উপর জমা মৃদু ঘাম মুছে চুলগুলো ক্লিপ দিয়ে বাঁধে। চেয়ারে বসে পায়ের উপর পা তুলে মোবাইল হাতে নেয়। প্রিতম কল করেছিল। দুদিন পর ঢং দেখিয়ে কল করেছে। পুনম তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে। ইনস্ট্রাগ্রাম স্ক্রল করতে থাকে। নওশাদ বের হয় দশ মিনিট পর। কেবল কালো জিন্স পড়া। উদোম গায়েই আয়নার সামনে গিয়ে মাথা মুছে। পুনম আড়চোখে দেখে বেশ কয়েকবার। আয়নার দিকে তাকায়। গোসল করার পর স্নিগ্ধ লাগছে নওশাদ বিন নাসিরকে। নওশাদও আয়নায় চোখ রেখে আয়নার মাধ্যমে পুনমের দিকে তাকায়। দুজনের চোখাচোখি হতেই পুনম চোখ সরিয়ে নেয়। নওশাদ চুল ঝাড়তে ঝাড়তে বারান্দায় গিয়ে তোয়ালে মেলে দেয়। সেন্টু গেঞ্জি পড়ে শার্টও পড়ে নেয়।

রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে প বাড়িয়ে বলে,

“দশ মিনিটের মধ্যে বের হবো। তৈরি হয়ে থাকো।”

পুনম মোবাইল পার্সে ঢুকায়। শাড়ির আঁচল ঠিকঠাক করে ব্যাগ নিয়ে রুম থেকে বের হয়। সবাই ড্রয়িংরুমে। পুনম রুমঝুমের সাথে একপাশে দাঁড়িয়ে রইলো। হাসনাহেনা সবার সাথে কোলাকুলি করে নওশাদের মাথায়, গালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। ভাইকে বিভিন্ন বুঝ দিয়ে শেষে বলে,

“মাতা ঠান্ডা রাইচ। হুদাহুদি মাতা গরম কইরবি না। বিয়াসাদি কইচ্ছত, অহন এক্কানা মেজাজ ঠান্ডা রাইখবি।” (মাথা ঠান্ডা রাখিস। অযথা গরম করবি না। বিয়েশাদী করেছিস, এখন একটু মেজাজ ঠান্ডা রাখবি।)

পুনমের হাসি পেলো। সব বোনেরা কিছু বলুক আর না বলুক সব কথার শেষে নওশাদকে মাথা ঠান্ডা রাখতে বললোই৷ সবাই বেরিয়ে পড়ে। সবাই বেরিয়ে যাওয়ার আধাঘন্টা পর নওশাদ, পুনম বাসা থেকে বের হয়।

পুনম আর নওশাদ একটা রিকশা নিয়ে ভাটারা নতুনবাজার এসেছে। নওশাদ একহাতে ব্যাগ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অন্যহাত প্যান্টের পকেটে। পুনম নওশাদের পিছনে দাঁড়িয়ে আছে, ওর মুখ কুচকে রাখা। ওরা রোডের একপাশে দাঁড়িয়ে আছে। উদ্দেশ্য বাসে করে পুনমের বাসায় যাবে। পুনমের বাসে উঠলে বমি পায়। ঠিক বমি পায় না, বমি করেই করে। যার কারণে প্রতীক বা প্রিতম পুনমকে নিয়ে বাইরে গেলে জীবনেও বাসে উঠতো না। সবসময় সিএনজি দিয়ে যাতায়াত করতো। পরে মেট্রো তৈরি হওয়ার পর মেট্রোতে করে যাতায়াত করে।

পুনম ভীষণ ভয়ে আছে। এখন যদি নওশাদ ওকে নিয়ে সত্যি সত্যিই বাসে উঠে? তারপর পুনম যদি নওশাদের গায়ে বমি করে দেয়? এমনিতেই গত দুদিনে কিসব কাজ করেছে। এখন নওশাদের গায়ে বমি করে দিলে ব্যাপারটা ভীষণ বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। এমনি বাসেই উঠতে পারে না, এখন দাঁড়িয়ে আছে লোকাল বাসের জন্য। লোকাল বাসে তো ঢুলতে ঢুলতে চলে। পুনম আজ শেষ। লোকটা বুঝি সিএনজি করে নিয়ে যেতে পারে না? অবশ্য পুনম তো নওশাদকে বলছেও না যে বাসে উঠলে ওর সমস্যা হয়। নওশাদকে বললে অবশ্যই নওশাদ কিছু একটা ব্যবস্থা নিতো।

বাস পেতেই নওশাদ পুনমকে নিয়ে উঠে। পুনমকে জানালার সাইডে দিয়ে নিজে পুনমের পাশে বসে। একটুখানি পথ অতিক্রম করার পর পরই পুনম বারবার জানালার বাইরে মাথা বের করছিল। নওশাদ ধমক দিয়ে বলে,

“জানালার বাইরে বারবার মাথা বের করছো কেনো? এটা যে ভীষণ রিস্কি তুমি জানো না?”

পুনমের খারাপ লাগছে। মাথা ভারভার লাগছে। গা গুলচ্ছে। পুনম আস্তে করে নওশাদকে বলে,

“আমার ভালো লাগছে না।”

“কি হয়েছে?” গলার স্বর নিচু করে বলে।

পুনম উত্তরও দিতে পারলো না। জানালার বাইরে মাথা বের করে বমি করতে থাকে। পুনম বমি করা থামাতেই নওশাদ দ্রুত কন্ডাক্টরকে দিয়ে বাস থামায়। এক হাতে ব্যাগ, অন্য হাতে পুনমের হাত ধরে বাস থেকে নামে। পানির বোতল কিনে আনে। পুনমের অবস্থা বেহাল। নওশাদ পুনমের চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে দেয়। মাথার তালুও ভিজিয়ে দেয়। কোমল স্বরে প্রশ্ন করে,

“খারাপ লাগছে এখনও?”

পুনম উপর নিচে মাথা ঝাঁকায়। নওশাদ পুনমের মাথায় পানি ঢালতে থাকে। পুনম একটু পর বলে,

“লাগবে না আর। ঠিক আছি।”

“এমন হলো কেনো?”

“বাসে উঠলে সমস্যা হয়।”

নওশাদ বোতলের ছিপি বন্ধ করতে করতে বলে,

“আমাকে বলেছো তুমি? বললে তোমাকে নিয়ে বাসে উঠতাম?”

“সরি।”

নওশাদ পুনমের হাত ধরে ফুটওভার ব্রিজে উঠে। রাস্তা পার হয়ে সিএনজির জন্য দাঁড়ায়। নওশাদের চোখ পড়ে পুনমের পিঠের দিকে। পুনমের পিছনে দাঁড়িয়ে শাড়ির আঁচল ডান কাঁধে তুলে দেয়। পুনম নওশাদের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে বলে,

“কি হয়েছে?”

“একটু সাবধানে থাকবে না?

“কি করেছি?”

নওশাদ চোখ সরিয়ে নেয়। পুনম পিঠে হাত দিয়েই যা বোঝার বুঝে নেয়। ব্লাউজ টেনে ঠিক করে। ডান কাঁধ থেকে আর আঁচল নামায় না। সিএনজি পেতেই নওশাদ পুনম উঠে বসে। জ্যাম ঠেলে শনিআঁখড়া গিয়ে পৌঁছায় দুপুর একটার সময়।

_________________

নওশাদ, পুনম আসবে বলে প্রতীক আজ ছুটি নিয়েছিল। পুনম আর নওশাদ বাসায় ঢোকার পর প্রতীক, প্রিতম নওশাদের সাথে কুশলাদি করে। নওশাদ কথাবার্তা বলে পুনমের রুমে ফ্রেশ হতে চলে যায়। পুনম অর্ককে কোলে নিয়ে আদর করছিলো৷ নওশাদ যেতেই প্রতীক পুনমকে জিজ্ঞাসা করে,

“কেমন আছিস?”

পুনম কাটকাট গলায় বলে, “ভালো।”

“কি খাবি রাতে? তেহারী নিয়ে আসবো? নাকি গ্রিল পরোটা খাবি?”

“কিছু খাবো না।”

“স্টার কাবাবের কাচ্চি খাবি?” প্রিতম জিজ্ঞাসা করে।

“না।”

দুটোই পুনমের অনেক পছন্দের খাবার। আজ পর্যন্ত পুনম মুখের উপর কখনো নাকচ করেনি। রেগে যে নিষেধ করছে তা কি কেউ জানে না?

নিশা বলে, “একটা নতুন এয়ার ফ্রাইয়ার কিনেছি। বাসায় গ্রিল বানাবো? তুমি তো পছন্দ করো।”

“প্রয়োজন নেই।”

“আম্মু বিরিয়ানি বানাবো?” পাপিয়া বলে।

পুনম কোল থেকে অর্ককে নামিয়ে দেয়। উঠে দাঁড়ায়। বলে,

“অনেক অন্ন ধ্বংস করেছি। আর করার ইচ্ছে নেই।”

প্রতীক প্রিতমের দিকে তাকায়। প্রিতম শক্ত চোখে আছে পুনমের দিকে। প্রতীক বলে,

“বমি করেছিস নাকি?”

“ও বললো তো শুনেছোই। আবার আমাকে জিজ্ঞাসা করছো কেনো?”

“তোর কথা তোকে জিজ্ঞাসা করবো না?” প্রিতম বলে।

পুনম হাসে। তাচ্ছিল্যের হাসি। রুমের দিকে পা বাড়িয়ে বলে,

“যখন শোনার দরকার ছিল তখন শোনেনি। এখন নাটক করছে।”

প্রিতমের গায়ে লাগে কথাটা। পাপিয়ার দিকে রেগে তাকিয়ে বলে,

“বাড়াবাড়ি করছে না?”

নিশা বলে, “থাক। রেগে আছে দুদিন পর ঠিক হয়ে যাবে।”

“নওশাদ কি ভাববে? ওর এমন ব্যবহার দেখলে সন্দেহ করবে না?”

“মাথা গরম করিস না। ভাইদের উপর কয়দিন-ই-বা রেগে থাকবে? ও কেমন জানিস না?” প্রতীক বলে।

প্রিতম দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে থাকে। পুনমের হাবভাবে মনে হচ্ছে- না জেনে শুনে, না খোঁজ খবর নিয়ে বিয়ে দিয়েছে। পুনমের ভালোই তো চায় নাকি? দুটো বাইরের মানুষ ওদের বোনকে নিয়ে আজেবাজে কথা বলবে আর ভাইয়েরা ভালো চাইবে না? অদ্ভুত!

—————–

নওশাদ, প্রতীক, প্রিতম একসাথে খেতে বসে। পাপিয়া বেশ আদর-যত্ন করে জামাইকে খাওয়ায়। নওশাদ এখন প্রিতমের রুমে। ওদের খাওয়া শেষ হওয়ার পর পুনম, পাপিয়া, নিশা খেতে বসে। পুনম শুধু ডাল দিয়ে ভাত খাচ্ছে। পাপিয়া বলে,

“একটু মাংস দেই?”

“লাগবে না।”

নিশা মাছের বাটি এগিয়ে দিয়ে বলে, “মাছ দেই? শুধু ডাল দিয়ে খাচ্ছো কেনো?”

“দরকার নেই।”

পাপিয়া বলে, “তোর কি শরীর খারাপ?”

“না। খুব ভালো আছি।”

নিশা বলে, “এভাবে কথা বলছো কেনো?”

“ভালো থাকলে বলবো না ভালো আছি? আমার সবকিছুতেই এখন ভুল খুঁজে পাও?”

“তা না। কিন্তু এটা তো আমাদের উপর রাগ করে বলছিস।”

“তোমাদের উপরে রাগ করার মতো কিছু করেছো তোমরা?”

“ছেলেটা কি ভালো না?”

“খুব ভালো। এমন ভালো হয়ই না।”

“ওর পরিবারের মানুষজন কি ভালো না?”

রুই এর অর্থ আঞ্চলিক ভাষায় তুলো এটা না জেনে মাছের পলিথিন নিয়ে আসায় সবাই যে পরিমাণ মজা নিয়েছিল পুনমের খুব খারাপ লেগেছে বিষয়টা। খাওয়া পাতেই পুনমের চোখ ছলছল করে উঠে। মন খারাপ হওয়ার কোনো কারণই না হয়তো! তবে পুনমের যে সে খারাপ লাগা নয়, বড্ড বেশি খারাপ লেগেছে। মাথা নুইয়ে মরিচ কামড়িয়ে খেতে থাকে। নিশা আর পাপিয়া একে অপরের দিকে তাকায়। পাপিয়া নীরবতা ভেঙে বলে,

“দেখ ছেলেটা ভালো। তোর ভাইয়ারা খোঁজ খবর নিয়েই এগিয়েছে। তোর ভালো চাই তো আমরা না? আমরা তো যার তার হাতে অবশ্যই তোকে তুলে দিবো না। পরিবারে…”

পুনম প্লেট নিয়ে উঠে চলে গেল। পাপিয়া অসহায় চোখে নিশার দিকে তাকায়। নিশার মুখও থমথমে। পুনম কিচেনে দাঁড়িয়ে বাকি ভাতটুকু খেয়ে প্লেট ধুয়ে জায়গা মতো রেখে অর্ককে রুমে চলে যায়। ফুপি ভাতিজা ভুজুংভাজুং অনেকক্ষণ যাবত কথা বলে। অর্ক ঘুমিয়ে পড়ে। তবে পুনমের চোখে ঘুম নেই। জানালার বাইরে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো।

——————————

নওশাদ পুরো বিকেল প্রতীক, প্রিতমের সাথে গল্প করে কাটালো। রুমে আসে সন্ধ্যা নাগাদ। অর্ক পুনমকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে। পুনম একহাতে মোবাইল টিপছে। নওশাদ খাটের প্রান্তে বসে। পুনম নওশাদের তাকিয়েও চোখ সরিয়ে নেয়।

“ওর নাম কি যেন?”

“অর্ক।”

“আগে পিছে কি?”

“নিভ্রাণ সাকিব অর্ক।”

“তোমাদের সবাই-ই কি তিনটে করে নাম?”

“হুম।”

নিশা রুমে আসে। হাতে ট্রে। তাতে বার্গার, কফি। নওশাদের সামনে ট্রে রেখে বলে,

“প্রিতম নিয়ে এলো। পুনম এই বার্গার ভীষণ পছন্দ করে।”

নওশাদের কি বলতো! সৌজন্যতা দেখিয়ে কেবল হাসে। নিশা ঘুমন্ত অর্ককে কোলে নিয়ে পুনমকে বলে,

“তোমার ছোট ভাইয়া ডাকে।”

পুনম ভাবলো মুখের উপর না করে দিবে। পরক্ষণেই ভাবে নিজেদের ঝামেলা পরের ছেলের সামনে তুলে ধরার মানে হয় না। ও উঠে হেলেদুলে রুম থেকে বেরিয়ে প্রিতমের রুমে যায়৷ প্রিতম, পাপিয়া বসে আছে। পুনম প্রিতমের রুমে ঢুকে কারো দিকেই না তাকিয়ে বলে,

“কেনো ডেকেছো?”

“বোস। বলছি।”

পুনম সোফায় বসে। মেঝের দিকে তাকিয়ে আছে। প্রিতম বলে,

“ওদেরকে কেমন লেগেছে?”

“ভালো।”

“ব্যবহার ভালো না?”

“ভালো।”

“কোনো সমস্যা হয়?”

“না।”

“নওশাদ কালকে নাকি চলে যাবি?”

“হুম।”

“অর্কর বার্থডে পরশু। থেকে যা।”

“ওর কলেজ আছে।”

“তোর তো কিছু নেই। তুই থাক।”

“রাখার ইচ্ছ হলে বের করা হতো না।”

প্রিতম পাপিয়ার দিকে তাকায়। পাপিয়া আশ্বাস দেয়। পাপিয়া বলে,

“অর্ক তোকে খুঁজে। দুদিন থেকে যা।”

“মরে গেলে কোথা থেকে নিয়ে আসতে?”

পুনম নিজেকে খুব শক্ত রাখার ভান করছে। তবে পুনম চোখ তুললে ওনারা দেখতে পেতো ওর চোখ জলে টইটম্বুর হয়ে গিয়েছে। নিশা একটা প্লেটে বার্গার নিয়ে আসে। পুনম সবার অলক্ষ্যে চোখ মুছে নেয়। নিশা পুনমের দিকে প্লেট বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

“নাও।”

“খেতে ইচ্ছে না।”

“দুপুরেও তো ঠিকঠাকভাবে ভাত খাসনি। এখন বার্গার ও খাবি না?”

“খিদে নেই।”

“পুনম জেদ করো না।”

পুনম নেয় না প্লেটটা। নিশা পুনমের পাশে প্লেট রাখে। পুনম ফিরেও তাকায় না। প্রিতম বলে,

“তোর সমস্যাটা ঠিক কোথায় আমাকে বল? আমরা তোর খারাপ চাই? আমরা চাই বাইরের দশটা মানুষ আমাদের বোনকে আজেবাজে কথা বলুক? বিয়েটা মনে হয় তোকে খারাপ কারো সাথে দিয়েছি? খোঁজ খবর নিয়ে তবেই তো এগিয়েছি। পরিবার ভালো, ছেলে ভালো না হলে বোনকে তুলে দিতাম?”

পুনম তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে। হুম ভালো। তবে পুনমই মানতে কারছে না। পুনমকে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার জন্য সময় দেওয়া হয়নি। পুনমকে ওর পরিবার বিশ্বাস করেনি।

প্রিতম পুনমের ভাবভঙ্গি দেখে বিরক্ত হয়ে বলে, “বেশি করছিস না?”

পুনম শক্ত মুখ করে তাকিয়ে থাকে। প্রিতম আঙুল তাক করে বলে,

“যা খেয়ে নে।”

“খাবো না বলেছি না?”

“বেয়াদবি করছিস না?”

“বেয়াদবরা তো বেয়াদবিই করে। আমি বেয়াদব, আমি আদবের কাজ করবো কি করে?”

“পুনম?” পাপিয়া ধমকে উঠে।

“বেশি খাই, তোমাদের মানসম্মান সব ধ্বংস করছি বলে তো বিয়ে দিয়ে দিয়েছো। এখন আলগা পিরিত দেখাতে হবে না।”

“একটা থাপ্পড় দিবো।”

“দাও। অবশ্য সেটাও বাকি রাখোনি।”

“আম্মু ও আসছে পর থেকে বেয়াদবি করছে না?”

“হ্যাঁ করছি তো? কি করবে? বাসা থেকে বের করে দিবে? তা তো দিয়েছোই। এক কাজ করো তেজ্য করে দাও। আমার পরিচয় দিতে হবে না তোমাদের।”

প্রিতম রেগে তাকায় পাপিয়ার দিকে। পাপিয়া প্রিতমের পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,

“যা তো বাইরে যা। ও যে পাগল কিসিমের জানিস না? শুধুশুধু কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। রেগে আছে। বুঝিসই তো।”

প্রিতম তেজ দেখিয়ে চলে যায়। পুনম ওর যাওয়ার পানে তাকিয়ে বলে,

“ছেলেকে দু বেলা মধু ঢেলে চাটো। ওটা বেশি ভালো হবে। পারফেক্ট মনে হবে।”

নিশা বিরক্ত হয়ে বলে, “এভাবে কথা বলো কেনো সবসময়? বড় ভাইয়েরা তোমার খারাপ চেয়েছে?”

“ওমন ভালো চাওয়ার দরকারও ছিল না।”

পাপিয়া বলে, “এভাবে বলিস না। ভাইয়ারা জেনে বুঝেই কাজ করেছো তো নাকি?”

নিশা বলে, “নওশাদ কি খারাপ যে এমন করো? ছেলেটা কত ভালো। কত ভালো ব্যবহার, আদবকায়দা ভালো।”

উঠতে বসতে ধমকায়। উঠতে বসতে সবার সাথে চোটপাট করে। ওকে হেয় করে কথা বলে তাও নাকি ছেলে ভালো। পুনম তাচ্ছিল্যের হাসি দেয়। পাপিয়া বলে,

“রেগে থাকিস না। একদিন তুই-ই বলবি ভাইয়ারা ওভাবে বিয়ে দিয়েছে বলেই তুই এতটা সুখী।”

“যতই সুখী হই না কেনো আমি জীবনেও ভুলবো না তোমাদের জন্য আমাকে ঠিক কি কি ফেইস করতে হচ্ছে। আমাকে না জানিয়ে আমার বিয়ে ঠিক করেছোই, আমাকে আমার বিয়ের কথা বলার প্রয়োজনও বোধ করোনি। সম্পূর্ণ অপরিচিত কিছু মানুষের সাথে পাঠিয়ে দিয়েছো। কাউকে চিনি না, চারদিকে অপরিচিত মুখ। ভয়ে ভয়ে থাকতে হয়, কি না কি করে ফেলি আর ওরা মজা নেয়। মানসিকভাবে প্রস্তুতিরও একটা ব্যপার থাকে আম্মু।

একা একটা ঘরে একটা অপরিচিত মানুষের সাথে থাকতে হচ্ছে। লোকটার ক্যারেক্টার কেমন সেটা জানি না, পছন্দ অপছন্দ কিছুই জানি না। মোদ্দা কথা লোকটা সম্পর্কে কিছুই জানি না। আমাকে তোমরা সুস্থভাবে সম্পর্ক শুরু করতে দাওনি। তোমাদের মতো টক্সিকদের জন্য আমি চাইলেও পারছি না সুস্থভাবে সবটা শুরু করতে। মানসিকভাবে পেরে উঠছি না। সবাই সব পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারে না৷ আমিও পারছি না৷ আমি ব্যর্থ। হয়েছে? সারাদিন একটা ঘোরের মধ্যে থাকি, কি না কি ভুল করে ফেলি আর অপরিচিত কিছু মানুষ আমার মজা নেয়।”

“সবারই এমন সমস্যা হয়। আমার হয়নি? তুমি মেইনলি মন থেকেই মানতে চাচ্ছো না।”

“তোমার হয়েছে?” পুনমের কণ্ঠে তাচ্ছিল্যের ছোঁয়া।

“কি বলতে চাচ্ছো আমি বুঝতে পারছি না তোমার সমস্যা?” নিশা বলে।

পুনম দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “নাটক কম মারাও। ছয় বছরের সম্পর্কের পর বিয়ে করেছো। আমার অবস্থা তুমি বুঝতে পারবে? ভাব দেখাও? দেখিনি আগে লুকিয়ে লুকিয়ে তোমরা কি করতে? আমাদের সবার সামনে খেতে পারতে না, ভাইয়া লুকিয়ে লুকিয়ে খাবার নিয়ে তোমাদের রুমে চলে যেতো। রাতে রাতে তোমার জন্য এটা সেটা বানাতো। ডাক্তার দেখানোর নাম করে বাইরে ঘুরাঘুরি করতে। শপিং করতে ইচ্ছা মতো। দেখিনি আমি? সবাই তোমার কাছে অপরিচিত থাকলেও ভাইয়া একান্ত পরিচিত ছিল।

আমার কি আছে? শুটকি রান্না হয়, কাঁকড়া রান্না হয়। অন্যান্য পদেও ওদের টেস্টের সাথে আমার টেস্ট মিলে না। এগুলো খেতে পারি? পারি না। অল্প ভাত খেয়ে আমি উঠে যাই। মানুষ ভাবে ‘ভালোই তো বউ কম খায়।’ না খেয়ে থাকলেও কেউ আমাকে খাবার এনে দেয় না। ফ্যান ফুল স্প্রিডে না ছেড়ে ঘুমাতে পারি না। অথচ ওই লোক রাতে ফ্যানের পাওয়ার কমিয়ে দেয়। আমি বলতেও পারি না কিছু। তাছাড়াও ভয়ে ভয়ে থাকি সবসময়। মুখে রাঁ নেই, বউ খুব ভালো। তোমাকে এইসব ফেইস করতে হয়নি। আমার সমস্যা তুমি জীবনেও বুঝতে পারবে না। অপরিচিত সব মানুষের সামনে উঠা, বসা, চলা, খাওয়া সবকিছুতে সমস্যা হয়। আমি কমফোর্টেবল ফিল করি না। সবাই পারলেও আমি পারছি না এডজাস্ট করতে। পাগল পাগল লাগছে দুদিনেই।”

শ্বাশুড়ির সামনে এইসব বলায় নিশা রেগে যায়। বলে,

“সবসময় বেশি কথা বলো তুমি। এভাবে মুখ চললে সংসার দুদিনও টিকবে না।”

“না টিকলে নেই। তোমার জামাইয়েরটা খেতে আসবো না।”

“পুনম?” পাপিয়া ধমকে উঠে।

পুনম ঘাড় বাঁকিয়ে ফুঁসতে থাকে। নিশা পাপিয়ার দিকে তাকিয়ে বলে,

“আম্মা পুনম যে এভাবে কথা বলে অন্য কেউ সহ্য করবে? আমাকে তো বলেন চুপচাপ থাকতে। সংসারে নাকি তাহলে শান্তি থাকে। মেয়েকে কিছু বলছেন না কেনো? সংসার টিকবে ওর?”

“কালকে গেলে আমার লাশও আসবে না এই বাসায়।”

পুনম তেজ দেখিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। বড় বড় পা ফেলে নিজের রুমে চলে যায়। নওশাদ বিছানার আধশোয়া হয়ে মোবাইল স্ক্রল করছে। পুনম দরজা লাগায় শব্দ করে। নওশাদ চোখ তুলে তাকায়। সোজা হয়ে বসে বলে,

“কি হয়েছে?”

পুনমের মনে হলো নওশাদ বিন নাসির ছাড়া ওর আর গতি নেই। ঘরের আপন চারটা মানুষের সাথে রাগ করে আছে। প্রতীকের সাথে রেগে কথা বলছে না। প্রিতমের সাথে আজীবন দা কুমড়োর সম্পর্ক হলেও এমন মুখের উপর কখনোই কথা বলিনি পুনম। পাপিয়া আর নিশার সাথেও অনেক বাজে ব্যবহার করেছে।

পুনম নিজেকে সামলাতে পারলো না। অভাবনীয় এক কাজ করে ফেলে। নওশাদের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে। নওশাদ তাল সামলাতে না পেরে পুনমকে নিয়েই ধপাস করে শুয়ে পড়ে। পুনমের পিঠ আঁকড়ে ধরে। পুনমের বুক ভীষণ জোরে ধুকধুক করছে। হাতে ব্যথা পেলেও পাত্তা দিলো না। নওশাদ ভীষণ অবাক হয়ে প্রশ্ন করে,

“কি হয়েছে?”

পুনম হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, “আমি আপনার সাথে ঘর করবো। আমি আপনার সাথেই সংসার করবো। আমি আপনার সাথে থাকতে চাই।”

নওশাদ অবাক হয় একনাগারে বলা কথাগুলো শুনে। পুনমের মুখে এক গোছা চুল পড়ে। নওশাদ সন্তপর্ণে তা কানের পিছনে গুঁজে দিয়ে বলে,

“হুম। তোমাকে আমার সাথেই সংসার করতে হবে। তোমাকে আমার সাথেই থাকতে হবে। তোমাকে আমার সাথেই ঘর বাঁধতে হবে।”

পুনম আগের মতো হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, “আপনি.. আপনার ইচ্ছা হলে নাহয় আরেকটা বিয়ে কইরেন। কিন্তু আমাকে বের করে দিয়েন না। আমি আপনার কাছে ঠাঁই চাই।”

নওশাদের খটকা লাগে। রাশভারি গলায় বলে,

“এইসব কেনো বলছো?”

পুনম ফুঁপিয়ে উঠে। নওশাদ পুনমের দিকে তাকিয়ে থাকে। পুনম এখন অনুভব করলো ওর অদ্ভুত লাগছে নওশাদকে এভাবে জড়িয়ে ধরায়। পুনমের আনকমফর্টেবল ফিল হচ্ছে। পুনম আরো শব্দ করে কেঁদে দেয়। নওশাদ পুনমের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে।

কোমল কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করে, “কি হয়েছে? এভাবে কাঁদছো কেনো?”

“আমাকে অপমান করা হয়েছে। আমার মতো মেয়ে নাকি দুদিনও সংসার করতে পারবে না। আমিও দেখিয়ে দিবো আমি সংসার করে তারপর মরেছি।”

নওশাদ চোয়াল শক্ত করে ধমকে বলে উঠে, “একটা থাপ্পড় দিবো বেয়াদব মেয়ে।”

পুনম চমকে উঠে। কান্না থেমে যায় পুরোপুরি। বড় বড় চোখ করে তাকায় নওশাদের দিকে। নওশাদ চোয়াল শক্ত করে রেখেই বলে,

“জেদ দেখিয়ে সংসার করতে চাও? আমার সাথে থাকাটা তোমার কাছে শুধুই জেদ না?”

পুনম উত্তর দেয় না। নওশাদ বলে, “জেদ করে বিয়ে করবে, জেদ করে সংসার করবে! মজা পেয়েছো তাই না?”

পুনম দুদিকে মাথা নাড়ায়। সঙ্গে সঙ্গে পুনমের পিঠ বিছানায় লেগে যায়। পুনম চোখ বড় বড় করে ফেলে। নওশাদ রাগী চোখে তাকিয়ে বলে,

“উত্তর দিচ্ছো না কেনো? মজা পেয়েছো না? মজা? বিয়েটা ছোটবেলার খেলনাপাতি পেয়েছো না?”

পুনম ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরে। আবার দুদিকে মাথা নাড়ায়। নওশাদ বলে,

“মজাই তো পেয়েছো।”

“সরি।”

“গুলে খাই তোমার সরি? বিয়ে হয়েছে পর থেকে তামাশা লাগিয়ে রেখেছো।”

পুনমের চোখ আবারও ছলছল করে উঠে। কান্না চেপে রাখে। তবে হেঁচকি উঠে যায়। বলে, “কি করেছি আমি?”

“আমার মেজাজ খারাপ করছো, বেশি কিছু না।”

“আমি তো আপনাকে জ্বালাইও না। কিছুই করি না। তাও আপনার মেজাজ খারাপ করি আমি?”

নওশাদ পুনমের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। “যদি বলি আমার সমস্যা এটাই?”

“এ্যাঁ হ্যাঁ?”

নওশাদ কিছু বললো না। পুনম চোখ নামিয়ে ফেলে। লোকটা ওর উপর থেকে সরছেও না। পুনম এখন যদি ধাক্কা মারে তাহলে একটা কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। নওশাদ পুনমের গালে হাত দেয়। পুনমের বুক ধকধক করছে।

“আবারও জিজ্ঞাসা করছি অদ্বিতীয়া মাহনূর পুনম সংসার করবে নাকি করবে না?”

পুনম মুখ খোলার আগেই নওশাদ বলে, “জেদ করে নয়। নিজের মন থেকে, নওশাদ বিন নাসিরের বউ হয়ে। করবে সংসার? তোমার হ্যাঁ না যাই হোক আমি তাই মেনে নিবো। একটুও জোর করবো না।”

পুনম উপর নিচে মাথা ঝাঁকায়। নওশাদ বলে, “মুখে বলো।”

“করবো।”

“কি?”

পুনম চোখ তুলে তাকায়। নওশাদ বলে, “কি করবে বলো?”

“সংসার করবো।”

“কার সাথে?”

লজ্জায় পুনম লাল হয়ে গিয়েছে। নওশাদ ফের বলে,

“বলো?”

“আপনার সাথে।”

নওশাদ তাকিয়ে থাকে পুনমের মুখের দিকে। পুনম চোখ তুলে তাকায়ও না নওশাদের দিকে। নওশাদ আবারও বলে,

“আবারও জিজ্ঞাসা করছি। ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত জানাও। আমি কিছুই মনে করবো না। কিন্তু নওশাদ বিন নাসিরের সাথে একবার জুড়ে গেলে পালানোর পথ খুঁজে পাবে না আর।”

পুনম বড় বড় শ্বাস ফেলে। মাথা ঝাঁকায়।

“বাসায় গিয়ে পুরোদমে সংসার করবে। মন দিয়ে, যত্ন করে, ভালোবাসে। যেভাবে প্রতিটি নারী সংসার করে।”

পুনম মাথা ঝাঁকায়। নওশাদ উঠে বসে। পুনমের হাত টেনে পুনমকেও উঠে বসায়। শার্ট ঝেড়ে বলে,

“তোমরা ডিনার করো কয়টায়?”

“সাড়ে নয়টা দশটার। কেনো?”

নওশাদ ঘড়ির দিকে তাকায়। পৌনে আটটা বাজে। নওশাদ শার্টের হাতা গুটিয়ে বলে,

“যেহেতু সংসার করবে তাহলে একটা বোঝাপড়ায় আসা দরকার।”

“বোঝাপড়া? মানে?”

“বিয়ে করতে জোর করা হয়েছিল কেনো? প্রথমে আমাকে সেটা জানতে হবে।”

পুনম প্রথমে বলতো চায়নি। গাইগুই করছিলো। নওশাদ ফের প্রশ্ন করতেই সব বলে৷ নওশাদ সব শুনে বলে,

“তোমার কি অনেক ছেলে ফ্রেন্ড আছে?”

পুনম তড়িৎ বেগে মাথা নাড়িয়ে বলে, “না না। আমার তেমন ফ্রেন্ডও না। জাস্ট এমনিই।”

“এমনি বলতে?”

“আমার ছেলেদেরকে পছন্দ না। আমি এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি। যারা আমার ক্লাসমেট তাদের সাথে প্রয়োজনে একটু আধটু কথা বলতেই হয়। অনেকেই আছে আমার ফ্রেন্ডদের ফ্রেন্ড, সৌজন্যতার খাতিরে তাদের সাথে একটু বেশি কথা বলা হয়।”

নওশাদ শুনলো মন দিয়ে। মজা নিয়ে বলে, “ছেলেদের পছন্দ নয় তো কি মেয়েদেরকে পছন্দ?”

পুনম নওশাদের মুখের দিকে বোকার মতো তাকিয়ে থাকে। নওশাদ বলে,

“উত্তর দাও।”

“আমি কি মিন করে বললাম আর আপনি কি মিন করলেন?”

“তোমার কথাই তোমাকে ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম।”

“আমি ছেলেদেরকে বিশ্বাস করি না।”

“গুড। আমাকে বিশ্বাস করলেই হবে।”

পুনম নওশাদের মতো চালাকি করতে চাইলো। বললো,

“আপনি কি নিজেকে মেয়ে বলতে চাচ্ছেন? আপনিও তো ছেলেই না?”

তীক্ষ্ণ গলায় নওশাদ বলে, “নো আম ইউর হাসবেন্ড।”

পুনম খেই হারালো। মাথা নামিয়ে ফেললো। দুজনের মাঝে আলাপ-আলোচনা চললো। সময় অনেক লাগলেও কথা ছিল খুব কম। কারণ পুনম এবং নওশাদ দুজনেই একটা কথা বলে চুপ ছিল অনেকক্ষণ। পুনম তো গলা দিয়ে শব্দই বের হয় না। ওকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে কথা বের করতে হয়। আর নওশাদ! ও তো পুনমের হাবভাব দেখে বোঝার চেষ্টা করছিল পুনম আসলেই মন থেকে বলছে নাকি জেদের বশে। পুনম রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় লক্ষ্য করলো নওশাদ কাঁধ হাত ঘষছে। পুনম সংকোচ নিয়ে জিজ্ঞাসা করে,

“তখন ওভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ায় ব্যথা পেয়েছেন?”

“তুলো আর বস্তা গায়ে এসে পড়েছিল তো একটু ব্যথা পেয়েছিই।”

“তুলো আর বস্তা মানে?”

“তুলোর মতো নরম আর মিনি বস্তার মতো ভারি।”

চলমান…….

(হ্যাপি রিডিং)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here