#বলো_কোন_প্রিয়_নামে_ডাকি:~
#পর্ব_৬
#সমৃদ্ধি_রিধী
মুখে রোদ পড়তেই পুনমের ঘুম ভেঙে যায়। নিজেকে অনুভব করে কারো গায়ের সাথে লেগে আছে এমন অবস্থায়। ঘুমের রেশ পুরোপুরি কাটতেই পুনম অনুভব করে নওশাদের পিঠের সাথে কপাল ঠেকিয়ে ঘুমাচ্ছিলো। মাথার নিচে বালিশ নেই। নওশাদ একদম বিছানার একপাশে শুয়ে আছে। পুনম বুঝে উঠে না নওশাদের পিঠের নিচে ও কি করছে! পুনম চটজলদি উঠে বসে। বিছানা থেকে নেমে গায়ের কাঁথা যার ভাগ নওশাদ সারারাতেও পায় না, পুনম সেই কাঁথা নওশাদের গায়ে দিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায়।
ওয়াশরুম থেকে একেবারে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে ওড়না গায়ে দিয়ে রুম থেকে বের হবে এমন সময় নওশাদ ঘুমঘুম কণ্ঠে বলে,
“কোথায় যাচ্ছো?”
“কিচেনে।”
“এক কাপ চা দিও তো প্লিজ।”
পুনম চায়ের ‘চ’ও বানাতে পারে না। বিশ্ব আনাড়ির খেতাব কেউ যদি পায়, তবে তা নিঃসন্দেহে পুনম ছাড়া কেউ হতেই পারে না। তাও মাথা নাড়িয়ে বলে,
“আচ্ছা ঠিক আছে।”
নওশাদ গায়ে কাঁথা টেনে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ে। পুনম মোবাইল নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। রান্নাঘরে গিয়ে দেখে নিশা রুটি বেলছে। পুনমকে দেখে বলে,
“কিছু লাগবে?”
“চা বানাবো।”
“আমি রুটি বেলে বানিয়ে দিচ্ছি।”
“দরকার নেই। আমি বানি….”
নিশা পুনমের কথা শেষ হতে দিলো না। তার আগেই বলে,
“তোমাকে আমি সবসময় নিহার মতোই ভালোবেসেছি পুনম। কথাটা তুমিও জানো। অর্ক হওয়ার আগে যখন চাকরি করতাম তখন আমি নিজের বেতনের টাকায় একই কালার, একই ডিজাইনের দুটো জামা কিনতাম। একটা বোনকে দিতাম, আরেকটা ননদকে দিতাম। তোমাকে নিহার চেয়ে কম কিছু মনে করি না, আগেও করতাম না এখনও মনে করি না। ননদ তো, আবার মন চাইলে হয়তো হুবহুও ভালোবাসতে পারি না। আবার আমি তোমার ভাবি, মনে হতেই পারে তোমার ক্ষতি চাই, ভাইয়ের কাছে প্যাঁচ লাগাই। কিন্তু খারাপ করলে খারাপটা পেতে হয় এটা আমি সবসময় বিশ্বাস করি।”
পুনম তাকিয়ে থাকে নিশার দিকে। নিশার রুটি বেলতে বেলতেই বলে,
“তোমার ভাইয়ার সাথে বিয়ের আগে তোমার ভাইয়া একটাই কথা বলেছিলো কখনো যাতে তোমার সাথে আমার কিছু নিয়ে দ্বন্দ্ব না হয়। আমি কথাটা মাথায় রেখেছিলাম। তোমার বিয়ের এই প্রসঙ্গ ছাড়া আমাদের মধ্যে কখনোই ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর বিষয়েও কথাকাটা হয়নি। এটার জন্য ক্রেডিট তোমারও। তুমিও অমায়িক ব্যবহার করতে। নিঃসন্দেহে তুমি একজন ভালো ননদ। গতকাল আমার ওভাবে রিয়েক্ট করা উচিত হয়নি। সরি।”
পুনম দাঁড়িয়ে থাকে চুপচাপ। নিশা কাজ করতে করতেই বলে, “তোমাকে সত্যিই ওভাবে কথাগুলো বলা উচিত হয়নি। আমার খারাপ লাগছে ভীষণ। তবে একটা কথা জানো পুনম বাবা, মা কখনো সন্তানের খারাপ চায় না। আম্মাও তোমার খারাপ চায় না। ইভেন তোমার ভাইয়ারাও তোমার খারাপ চায় না। প্রিতমের সাথে তোমার দা কুমড়োর সম্পর্ক হলেও তুমি জানো তুমি দুই ভাইয়ের জান। ওরা তোমার খারাপ চাইবে? ওরা তোমাকে তাড়িয়ে কি স্বার্থ হাসিল করবে বলো? তোমার ভাইয়ারা খোঁজ খবর নিয়ে তবেই তাদের আদরের বোনকে বিশস্ত একজনের হাতে তুলে দিয়েছে।
খারাপভাবে নিও না পুনম। তুৃমি বোকাসোকা। কার না কার খপ্পরে পড়ে যেতে তোমার ভাইয়েরা সেই ভয় পেয়েছিল। যার সাথে তোমাকে রেস্টুরেন্টে দেখেছিল, সেই ছেলেও তো ভালো না। ওপেন বিড়ি সিগারেট খায়। তার সাথে তোমাকে একা রেস্টুরেন্টে দেখেছে। একসপ্তাহ আগে তোমার বিয়ের জন্য গুঞ্জন উঠলো এবং তুমি আবার বিয়ে করতে রাজিও নও। কি দাঁড়ায় সব জোড়া লাগালে?
তোমার ভাইয়েরা ভীষণ ভয়ে ছিল তাই। বিশেষ করে তোমার বড় ভাইয়া। মানুষটাকে আমি দেখেছি তো জানি। তোমার বিয়ের কথা তোমার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখে ছটফট করেছে ভীষণ। আমাদের ভুল অবশ্যই ছিল। শতভাগ ছিল। আমাদের জন্য তোমাকে এতটা সমস্যায় পড়তে হয়েছে। আমি পরের মেয়ে, আমি খারাপ চাইতোই পারি কিন্তু তোমার ভাইয়েরা, তোমার আম্মু তোমার খারাপ চাইবে না। তাদের নিয়ত সৎ ছিল। বাকিটা কিসমত।”
নিশা রুটি বেলে বলে, “ছেলেটা ভালো। মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করো। সংসার মানেই এডজাস্টমেন্ট। আমার লাভ ম্যারেজ হওয়ায় তোমার মতো সমস্যা আমার হয়নি হয়তো, তবে আমিও এডজাস্ট কম করিনি। আম্মার সাথে আমার কম ঝগড়া হয় না। হাই প্রোফাইলের চাকরি ছেড়ে দিয়েছি সংসার সামলাতে। মানিয়ে নিয়ে হেলেদুলে জীবন কাটিয়ে দিচ্ছি। তোমার বড় ভাইয়ের কাজকর্ম মাশাল্লাহ, ভালোবাসার বিয়ে বলে সব সহ্য করছি। মাঝেমাঝে অর্ডার দিয়ে দৌঁড় দিতে। সব তো পেতে পরে হাতের সামনে। কখনো খারাপ ব্যবহার করেছি? ক্লান্ত আমি হই না? এগুলো এডজাস্টমেন্ট না? এডজাসট করে চললেই ভালো থাকবে।
তোমার কপালে নওশাদ ছিলই বলে ছলেবলে কৌশলে ওর সাথে তোমার বিয়ে হয়েছে। সুখী হবে তুমি। তোমার আম্মু, ভাইয়ের দোয়া আছে তোমার সাথে।”
পুনম নিশার পিছনে এসে দাঁড়ায়। ধীর কণ্ঠে বলে,
“সরি। আমারও তোমার সাথে ওভাবে কথা বলা উচওত হয়নি।”
“সরি বলতে হবে না। ছোট মানুষ এখনও কিছু বুঝতে পারছো না। তুমি তোমার জায়গায় শতভাগ ঠিক। তোমার কোনো ভুল নেই। আমাদের জন্য তোমাকে দুদিনেই অনেক সমস্যা ফেইস করতে হচ্ছে তখনও বলেছি এখনও বলছি। তবে আমাদের দিকও বিবেচনা করে দেখো? আমরা তো তোমার ভালোই চেয়েছিলাম। প্রিতমকে যেভাবে ওর বন্ধু বলেছে ওর বোনের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় হওয়াটা স্বাভাবিক না? আম্মুর মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় পাওয়াটা স্বাভাবিক না? তোমার চাচাতো বোনই তো এমন করে পালিয়ে গেলো। চাচাদের মানসম্মান কোথায় রইলো আর? তোমার বড় ভাইয়া চাচ্ছিলো না ওমন ভালো ছেলে হাতছাড়া করতে। এটাই।”
পুনম চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে কেবল। ওর মনে কি চলছে তা বোঝা মুশকিল। নিশা চুলোয় চায়ের পানি বসিয়ে বলে, “সবাই সবার জায়গা থেকে ঠিক। নওশাদ কেমন তা তো আমি জানি না। তবে কালকে যতটুকু কথাবার্তা হলো মনে হলো না খারাপ। আবার ওভাবেও বলা যায় না। মানুষ তো কত রকম অভিনয়ই করতে পারে। তবে মাথায় রেখো কেউই পারফেক্ট হয় না। সবার একটা না একটা খুঁত থাকবেই। নাটক, সিনেমায় দেখায় হাসবেন্ডরা বউয়ের জন্য এটা করে ফেলে, ওটা করে ফেলে। ওইসব আজাইরা জিনিস। রান্না করার সময় হাত কাটলে কিচেনে তালা লাগিয়ে দেওয়া, অফিস থেকে ফিরলে শুধু তোমাকে নিয়েই পড়ে থাকবে, প্রতিদিন রাতে তোমার হাতেই খাবে, সারারাত রোমান্স করবে, তোমাকে নিয়ে মধ্যরাতে লং ড্রাইভে যাবে, তোমাকে কেউ উত্যক্ত করলে তাকে ছয়মাসের জন্য বিছানায় শুইয়ে দিবে- এইসব ফ্যান্টাসি।”
নিশা পুনমের দিকে তাকায়। পুনম অভিব্যক্তি বুঝলো না। নিশা হাত মুছে বলে,
“তুমি খেয়াল রাখবে নওশাদ তোমাকে নিয়ে ভাবে কিনা। তুমি খেতে না পারলে নওশাদ তা লক্ষ্য করে কিনা। রান্না করার সময় হাত কাটলে কাটা জায়গায় হেক্সিসল, তুলো দিয়ে মুছে দেয় কিনা। তোমার জ্বর হলে তোমার যত্ন নেয় কিনা। কেউ বাজে কথা বলে তোমাকে মানসিকভাবে ভেঙে দিলে, ও তোমাকে মানসিকভাবে সাপোর্ট দেয় কিনা। চুল না মুছলে নিজ তাগিদে এসে চুল মুছে দেয় না কিনা এইসবই। ছেলেরা এরচেয়ে বেশি কিছু পারে না। দুবেলা ভালোবাসি বলায় কোনো মাহাত্ম্য নেই যদি না সে তোমার যত্ন নেয়।”
পুনম ফিল্টার থেকে এক গ্লাস পানি ভরে নিশার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে, “খাও।”
নিশা পানি নেয়, তবে পান করে না। পুনম বলে,
“তোমরা এত ভালো অভিনয় করতে পারো। চমৎকার। মানে ম্যানুপুলেটিং পাওয়ার ভাই! খাপ্পে খাপ। মনে হচ্ছে আমার সাথে যা করা হয়েছে তা কোনো ভুলই নয়। একদম ঠিক কাজ করা হয়েছে। মাইরি! অভিনেত্রী হলে না কেনো?”
নিশা হাসে। পানি পান করে খালি গ্লাস ধুয়ে বলে,
“চেয়েছিলাম অভিনেত্রী হতে। তোমার ভাই-ই তো দিলো না। খুব ভালো অভিনয় করি না?”
“আবার জিজ্ঞাসা করছো? এইসব কোথা থেকে শিখেছো? ভদ্রভাবেই তো সংসারে প্রবেশ করেছিলে। স্বভাব এমন দেবরের মতো হয়ে যাচ্ছে কেনো?”
ফুটন্ত পানিতে চা পাতা দিয়ে বলে, “স্বভাব দেবর না। স্বামীর মতো হচ্ছে। তোমার বড় ভাইও তো খুব একটা ভালো নয়। অভিনয়ের উপর পিএইচডি পাশ করা। ওর থেকেই একটু আধটু শিখছি।”
“স্ক্রিপ্ট রেডি করেছো কয় ঘণ্টা ধরে?”
“ভোররাত পর্যন্ত রেডি করেছি, ফজরের নামাজ পড়ে কিচেনে আসার আগ পর্যন্ত মুখস্থ করেছি।”
“স্ক্রিপ্ট রেডি করার সময় সাথে কে ছিল? তোমার শ্বাশুড়ি, স্বামী, দেবর?”
“ছেলেও ছিল। ওর আদরের ফুপ্পি এই বাসায় আসবে না আর সেটা মেনে নিতে পারছিলো না। তাই তোমার ভাতিজাও একটু আধটু সাহায্য করেছো স্ক্রিপ্ট তৈরী করতে।”
নিশা চিনির বোয়াম হাতে নিয়ে বলে, “কয় চামচ চিনি দিবো?”
“চিনি খায় না।”
নিশা চিনির বোয়াম রেখে দিলো। চায়ের কাপ পুনমের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে, “বিস্কুট দিবো? বা নিমকি?”
“দুটো বিস্কিট দাও।”
নিশা সল্টেজ বিস্কুট দেয়। পুনম ওগুলো নিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েও পিছু ফিরে। নিশা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
“কি?”
“আমার বার্গার কোথায়?”
নিশা হাসতে গিয়েও হাসলো না। অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। পুনম বলে, “নাকি আমার ভাগের বার্গার খেয়ে ফেলেছো?”
“আছে ফ্রিজে।”
“বের করে ওভেনে দাও। আমি চা দিয়ে এসেই খাবো। কেউ যাতে না জানে। আমি এই বাসার অন্ন স্পর্শ করবো না।”
“এই সকালবেলা খাবে?”
“কোনো সমস্যা?”
“না, আমার কি সমস্যা?”
“বের করে গরম করো। কেউ যাতে না জানে। রিমেম্বার।”
“ঠিক আছে।”
পুনম চলে যেতেই নিশা হাসে। আলু বের করতে করতে বিড়বিড়িয়ে বলে,
“মেয়েটা ছোট থেকে প্রিন্সেস ট্রিটমেন্ট পেয়ে পাগল হয়ে গিয়েছে।”
——————-
পুনম রুমে ঢুকে অবাক হয়। নওশাদ বিছানায় বসে অর্ককে কোলে নিয়ে কথা বলছে। অর্কও নওশাদের কোলে বাবু হয়ে বসে আছে। অর্কর চুল এলোমেলো, মুখ ফোলাফোলা। ঘুম থেকে উঠেই পুনমের খোঁজে এসেছে। পুনম ধীর পায়ে রুমে ঢুকে। অর্ক পুনমকে দেখে হেসে ওর কাছে ছুটে আসে। পুনম চায়ের কাপ বেড সাইড টেবিলের উপর রাখে। অর্ককে কোলে তুলে নেয়। অর্ক পুনমের গলা জড়িয়ে ধরে ওর গালের সাথে গাল লাগিয়ে রাখে। নওশাদ বিছানা থেকে নামে। পুনমকে জিজ্ঞাসা করে,
“আমার ব্রাশ কোথায়?”
“দিচ্ছি।”
পুনম অর্ককে কোলে নিয়েই সাইড ব্যাগ থেকে নওশাদের ব্রাশ বের করে দেয়। নওশাদ বলে,
“আমার তোয়ালে আর পোশাকও বের করে দিও।”
পুনম নওশাদের কথামতো সব করে। নওশাদ ওয়াশরুমে চলে যায়। পুনম অর্ককে বলে,
“কি আব্বা?”
“আংকেত তকলেত দিবে বলচে।”
“আংকেল না আব্বা। ফুপা ডাকবে ঠিক আছে?”
“পুপা?”
“হুম।”
অর্ককে কোল থেকে নামিয়ে দেয়। বিছানা গোছাতে থাকে। অর্ক পুনমের পা জড়িয়ে ধরে। মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,
“ও পুপি?”
“হ্যাঁ আব্বা?”
“বাশ করি নাই।”
“করোনি?”
অর্ক হাত নাড়িয়ে বলে, “বাশ নাই।”
পুনম হাসে। ঝাড়ু দিয়ে বিছানাও ছাড়ে। বিছানা টান টান করে অর্ককে কোলে নিয়ে চায়ের কাপের দিয়ে তাকিয়ে থাকে। গোসল যে করতে গেলো চা টা ঠান্ডা হবে কিনা? তখনই নওশাদ ওয়াশরুম থেকে বের হয়। মাথার চুল মুছে খাটে বসে। চায়ের কাপে চুমুক দিতেই পুনম প্রশ্ন করে,
“ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে না?”
“সমস্যা নেই।”
পুনম কাঁধ ঝাঁকায়। সমস্যা না হলে আর কি? নওশাদ দ্বিতীয়বার চুমুক দিয়ে বলে,
“তুমি তো বানাও নি না?”
“কি করে বুঝলেন?”
“দক্ষ হাতে বানানো চা। বোঝা যায়।”
“ভাবি বানিয়েছে।”
“ওহ।”
পুনম অর্ককে কোলে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। রান্নাঘরে গিয়ে গরম করে রাখা বার্গার খায়। খাওয়া শেষে নিশাকে শাসিয়ে বলে,
“কেউ যাতে না জানে।”
অর্ককে নিয়ে পুনম প্রতীকের রুমে ঢোকে। প্রতীক কাজ করছিলো। পুনম এদিক ওদিক না তাকিয়ে অর্ককে নিয়ে ওয়াশরুমে ঢোকে। প্রতীক তাকিয়ে থাকে। পুনম অর্ককে ব্রাশ করিয়ে দেয়। বের হতেই প্রতীক বলে,
“পুনম?”
“আমি কানে কম শুনি।”
অর্কর পোশাক বের করে ওর জামা বদলে দেয়। অর্ক প্রতীকের সামনে দাঁড়িয়ে বলে,
“পাপা বাশ করচি। নতুন জামা পচচি।”
প্রতীক হাসে। অর্কর কপালে চুমু খায়। কাগজপত্র গোছাতে গোছাতে বলে,
“বেশি রেগে আছিস?”
“আমি তো প্রতিবন্ধী। প্রতিবন্ধীরা কি রাগ করে?”
অর্কও তাল মিলিয়ে বলে, “অক্কও পুতিবুন্দি।”
পুনম মাথা নাড়িয়ে বলে, “এইসব বলে না আব্বা।”
“টুমি বলচো যে?”
পুনম লম্বা শ্বাস ফেলে। প্রতীক বলে, “বোস।”
পুনম “ইচ্ছা নেই” বলে বেরিয়ে গেল। কি মনে করে আবারও নিশার কাছে যায়।
“তোমার শ্বাশুড়ি কোথায়?”
“রাতে প্রেশার উঠেছে।”
“কি উপলক্ষে?”
“এভাবে কথা বলো না পুনম। আব্বা মারা যাওয়ার পর থেকে আম্মা তোমাদের একজন ভাই বোনেরও কড়া কথা শুনতে পারে না। তুমি একটু রুডভাবে কথা বলেছো তাছাড়া আম্মাও অপরাধবোধে ভুগছে তাই শরীর খারাপ করছে।”
“এখানেও আমার দোষ?”
“তা বলিনি। আচ্ছা তোমার যা মনে হয়।”
পুনম অর্ককে প্রতীকের কাছে রেখে এসে পাপিয়ার রুমে যায়। উনি ঘুমাচ্ছে। পুনম বড় করে শ্বাস ফেলে রুমে গেল। নওশাদ মোবাইল টিপছে। পুনম ভেবে পায় না লোকটা সারাদিন ফোনে করে কি! পুনম ওর বই খাতা গোছাতে থাকে। আড়চোখে লুকিয়ে নওশাদের দিকে তাকায় বেশ কয়েকবার। নওশাদ মোবাইল রেখে পুনমের দিকে তাকায়। পুনম তখন আবার লুকিয়ে নওশাদের দিকে তাকাতেই দেখে নওশাদ তাকিয়ে আছে ওর কাছে। পুনম থতমত খায়। আমতাআমতা করে বলে,
“ব্রেকফাস্ট করবেন না?”
নওশাদ সেই উত্তর দেয় না। জিজ্ঞাসা করে,
“কালকে ভার্সিটি আছে?”
“জ্বি।”
“এখান থেকে তুমি তোমার ভার্সিটিতে যাও কি করে? বাসে তো বমি করো।”
“গাড়ি করে। আমার ভার্সিটি এরিয়াতেই বড় ভাইয়ার অফিস না? ভাইয়ার সাথে যাই। নাহলে মতিঝিল পর্যন্ত গিয়ে মেট্রো করে যাই।”
“আসো কি করে?”
“ভাইয়া গাড়ি পাঠিয়ে দেয় নাহলে মেট্রো করে।”
“গাড়িতে যেহেতু বমি করো না, তাহলে বাসে বমি হয় কেনো?”
“বাস তো ঢুলতে ঢালতে চলে। গাড়ি তো স্মুথলি চলে। আর বাস অনেক বাজে, উঠলেও বমি পায়।”
নওশাদ বুঝলো সমস্যা বাসে নয়, মনে। পুনম দ্রুত হাতে ব্যাগে সব বই খাতা ঢুকায়। নওশাদ বেশ সুক্ষ্ম চোখে পর্যবেক্ষণ করে। বোকাসোকা মেয়েটা যদি দেখতে পেতো নওশাদের দৃষ্টি তাহলে নিশ্চিত মূর্ছা যেতো। তবে নওশাদ ভারী চিন্তায় পড়লো। পুনম ওই বাসা থেকে ভার্সিটিতে যাতায়াত করবে কি করে! বাসে উঠতে পারলে একটা কথা ছিল। বাসে করে চলে যেতো। কিন্তু এখন!
নওশাদ কপাল কুচকে ভাবতে থাকে। পুনম বই খাতা সব গুছিয়ে নওশাদের দিকে তাকায়। নওশাদের এহেন কুচকানো মুখ দেখে বলে,
“কিছু কি হয়েছে?”
“আমাদের বাসা থেকে তুমি ভার্সিটিতে যাবে কি করে?”
পুনম ফট করে বলে, “জেরিন, জাইমা তো আমার ভার্সিটিতেই পড়ে। ওদের সাথে চলে গেলেই হয়।”
নওশাদের কপাল শিথিল হয়ে যায়। “ওহ আগে থেকেই আলোচনা করা শেষ?”
পুনম বোকা বোকা চোখে তাকিয়ে বলে, “আপনি বুঝলেন কি করে?”
“তোমাকে না খোঁচালে তো কথা বের হয় না। যেহেতু এখন একবারেই কথা বের হলো তারমানে বুঝতে হয় এই বিষয়ে বিস্তর আলাপ-আলোচনা হয়ে গিয়েছে।”
“না মানে জবা আপাই বলছিলেন..”
পুনমের কথা শেষ হওয়ার আগেই নওশাদ বলে,
“বুঝেছি। আমরা বিকেলে বেরিয়ে পড়বো, ঠিক আছে?”
“আচ্ছা।”
“রান্না যে পারো না এখন বাসার রান্নাবান্নার কি হবে?”
পুনম সংকোচবোধ করে। “আপনি আগে কিভাবে খেতেন?
“আপা দিতো কখনো, আবার কখনো আমি রান্না করতাম।”
পুনমের চোখ চিকচিক করে উঠে। “আপনি রান্না পারেন?”
“প্রয়োজনে শিখতে হয়েছে।”
“আমাকেও শিখিয়ে দিয়েন।”
নওশাদের পুনমের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে অনেকক্ষণ। পুনম বলে, “দিবেন না? আমি চেষ্টা করলেই পারবো। বেশিদিন লাগবে না। ধরুন ভালো মতো একমাস শিখিয়ে দিলেই হবে। পরে আমিই রান্নাবান্না করবে।”
নওশাদ শব্দহীণ হাসে। “দিবো।”
“তাহলে আপনার থেকে কিছু শিখে নিবো, জবা আপার থেকেও কিছু শিখে নিবো।”
“কিন্তু আমি বাসা পাল্টে ফেলবো।”
“কবে? এরমধ্যে?”
“না। বাসা পেলে।”
“এই বাসায় সমস্যা কি?”
“থাকলাম তো অনেকদিন।”
“আপনার বোনের বাসা না?”
“তো?”
“বোনের বাসা ছেড়ে চলে যাবেন?”
“বোনের বাসায় আর কয়দিন থাকবো?’
“বোনের বাসায় থাকতে বুঝি সমস্যা?”
“বোনের বাসা বেড়াতে যাওয়ার জন্যই ভালো। বার্ডেন হয়ে থাকার জন্য ভালো নয়।”
“মানে?”
“এই পুনম, নওশাদ ব্রেকফাস্ট করতে আসো।” প্রতীকের গলার স্বর।
নওশাদ যাওয়ার জন্য পা বাড়ালে পুনম বলে,
“আপনি কেমন যেন! অদ্ভুত।”
“এন্ড তোমাকে আমার সাথেই থাকতে হবে।”
নওশাদ বেরিয়ে গেল। পুনম তাকিয়ে থাকে। নওশাদের কথাবার্তা ওর উপর ভারী ভাবে পড়ে। নিশার বলা কথা মনে পড়ে,
“লাভ ম্যারেজে বিয়ের পর চেনা জানার ব্যপারটা থাকে না। তবে অ্যারেঞ্জ ম্যারেজে চেনা জানার চমৎকার একটা ব্যপার থাকে। প্রতিদিন নতুন ভাবে পরস্পরকে চেনা যায়। স্থির থেকে মুহুর্তগুলোকে এনজয় করো।”
তবে পুনম বুঝতে পারছে নওশাদকে চেনা ওতটা সোজা হবে না।
——————
আরিফ হাতিরঝিল ব্রিজে দাঁড়িয়ে আছে আধাঘন্টারও বেশি হবে। এখন আসলেও ঠাস করে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিবে। মোবাইল বের করে মেইল চেক করতে থাকে। আরিফ পায়ের শব্দ পেয়ে চোখ তুলে তাকায়। বুকে হাত দিয়ে হাঁপাতে থাকা রুমঝুমের দিকে তাকিয়ে বলে,
“তোর কোন গালে থাপ্পড় দিবো বল? তুই যেটা বলবি সেটাই হবে।”
“আমার কি দোষ? আম্মু বেরই হতে দিচ্ছিলো না।”
“তোমাকে তো কখনোই খালামণি বের হতে দেয় না।”
“আসলেই তো দেয় না। পরে সাদিয়ার বাসায় যাবো বলে বের হয়েছি।”
আরিফ পকেটে মোবাইল ঢুকিয়ে ফেলে। রুমঝুম সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলে, “তুমি কোথায় যাবে এবার?”
“চট্টগ্রাম।”
“কয়দিন থাকবে?”
“ঠিক নেই।”
“সাবধানে থাকবে। মোবাইলে তো পাবো না বোধহয়?”
“হু।”
“তাও সময় পেলে কল দিও। আচ্ছা সময় পেলে বড় খালামণিকে কল দিও অন্তত। খালামণি যে টেনশনে থাকে এখন।”
আরিফ দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “ইসরাতও সকালে কল করে আমাকে সেইম কথা বলেছে। এখন তুইও বলছিস। তোকে আমি বোনের মতো আলাপ করার জন্য এখন ডেকেছি?”
রুমঝুম হাসে। আরিফের পাশে দাঁড়ায় তবে যথেষ্ট দুরুত্ব বজায় রেখে। রেলিংয়ে হেলান দিয়ে বলে,
“ইসরাত আপু চলে গিয়েছে?”
“হুম। কাল রাতে শাওন ভাই এসে নিয়ে গিয়েছে।”
“ওহ।”
“মেজাজ খারাপ করছিস রুমঝুমি। ফ্যামিলির আলাপ জুড়ে দিয়েছিস কেনো?”
রুমঝুম বুকে হাত গুঁজে বলে, “আরিফ?”
“কি?”
“কখনো ধরা খেলে কি হবে?”
“কিছু একটা তো হবেই। হয় ভালো নাহলে খারাপ।”
“কেউ যদি আমাদের সম্পর্ক না মেনে নেয়?”
“খালাতো ভাই-বোন থেকে গার্লফ্রেন্ড-বয়ফ্রেন্ড হয়েছিলাম। আবার গার্লফ্রেন্ড-বয়ফ্রেন্ড থেকে খালাতো ভাই-বোন হয়ে যাবো। সমস্যা কি?”
আরিফের হাতে চাপড় মেরে বলে, “এতটা চিল কিভাবে?”
আরিফ হাসে।
“তুমি হাসছো? আর আমি টেনশনে মরি। কট খেলে কি একটা বাজে পরিস্থিতি হবে!”
“তোমার মুখোশ খুলে যাবে। নম্র ভদ্র মেয়ে, যে আলাভোলা মুখ নিয়ে চলে সে তলে তলে টেম্পু চালায়।”
“মজা লাগছে?”
“অবশ্যই। সবার সামনে এখন ভাইয়া ভাইয়া করো, পরে সাইয়া সাইয়া করবে। দারুণ মজার ব্যপার।”
“নট ফানি।”
“দেখ আমি চাইলেই পারতাম তোর মাথায় বন্দুক ধরে তোকে ব্ল্যাকমেইল করে বিয়ে করতে। থাপ্পড় মেরে কবুল বলাতেই পারতাম। কিন্তু আমি করিনি।”
“কিসব বলছো?”
“মাফিয়া স্টাইল আরকি! তুলে নিয়ে বলবো ‘হয় কুবল বল’ নাহলে ‘মারা খা’ নাহলে ‘আমার তোকে লাগবে না, তোর দেহ হলেই হবে।’ পরে তুই কাঁদতে কাঁদতে বলতি ‘প্লিজ ভাইয়া আমি আপনাকে বিয়ে করবো, বিয়ে করবো।’ তারপর তোকে বিয়ে করতাম। বন্দুক তো আমার আছেই। কিন্তু আমি সেসব করিনি। করলে জাম্পেশ একটা ডার্ক রোমান্সের গল্প লেখা হয়ে যেতো।”
“তুমি এরচেয়েও বাজে কাজ করেছো। তুমি আমাকে ফুসলিয়েছো।”
“আর তুই? তুই কি করেছিলি?”
রুমঝুম অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে চোখ মুখ খিঁচে থাকে। এখন ওর অতীত নিয়ে নাড়াচাড়া দেওয়া হবে। আরিফ বাঁকা হেসে বলে,
“এসএসসির পর পর ফেইক আইডি খুলে আমাকে কে মেসেজ দিতো? অন্য মেয়েদের দিকে তাকালে চোখ উঠিয়ে ফেলবো এইসব কে বলতো? ফেইক আইডি থেকে কে মেসেজ দিতো? কেমন বা*লপাকনা হলে লিখতো আপনি কি আমার কাজিনদেরকে আপন বোনের মতো মনে করেন? আল্লাহর নামে এই মেয়ে বাসায় এলেই আমার সুন্দর সুন্দর টিশার্ট খুঁজে পাওয়া যেতো না। আতর, পারফিউমের কথা আর কি বলবো? গায়েব, মানে পুরো গায়েব। ইঁচড়েপাকা মেয়ে একটা। তোকে ফুসলানো লাগে? এত ধরা খাওয়ার জ্ঞান দিস, তখন মেসেজ দিয়েছিলি কেনো? আমি স্ক্রিন নিয়ে সবাইকে দেখিয়ে কেস খাইয়ে দিলে? আমি শুধু তালে তাল মিলিয়েছি বলেই ফুসলানো হয়ে গেল না?”
“আবেগে করে ফেলেছিলাম। বিবেক কাজ করেনি।”
চলমান……
(হ্যাপি রিডিং)

