বলো_কোন_প্রিয়_নামে_ডাকি:~ #পর্ব_৯

0
59

#বলো_কোন_প্রিয়_নামে_ডাকি:~
#পর্ব_৯
#সমৃদ্ধি_রিধী

আজ পুনম, জেরিন, জাইমা কেউ ভার্সিটিতে যায়নি। জেরিন সকালে নাস্তা নিয়ে এসেছে। পুনম আর জেরিন একসাথে গল্প করতে করতে নাস্তা করে। জাইমা এখনও ঘুমে। পুনম হাত ধুয়ে আসতেই জেরিন হাত ধুতে যায়। তখন জেরিনের মোবাইলে টুং করে মেসেজ আসে। পুনম না চাইতেও দেখে ফেলে।

জেরিনের মোবাইলের স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করা আইডিটা দেখে পুনম চোখ বড় বড় করে তাকায়। ও একটা অনধিকার চর্চা করে ফেলে। হাত বাড়িয়ে ইনবক্সে ঢোকে। এই মুহুর্তে ওর চোখ দুটো পুরো মার্বেল আকৃতির হয়ে গিয়েছে। জেরিন লাভ ইউ লিখেছে। বিপরীতের মানুষটিও রিপ্লাই দিয়েছে লাভ ইউ টু। মোবাইলের স্ক্রিন থেকে চোখ না তুলেই পুনম চোখ বড় বড় করে চাপা স্বরে চেঁচিয়ে উঠে,

“ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্নইলাহি রাজিউন!”

জেরিন আসে। পুনমের এই রিয়াকশন দেখে প্রশ্ন করে,

“কি হয়েছে?”

পুনম চোখ তুলে বলে, “এই মেয়ে এই! তুমি কার সাথে লাভ ইউ আদান প্রদান করো?”

জেরিন মোবাইল নিয়ে নেয়। পুনম বলে, “নিয়ে লাভ নেই কোনো। আমার যা দেখার আমি দেখে ফেলেছি।”

“আমার তো প্রেম করার মতো বয়স হয়েছে নাকি?”

“বয়স হলে ছেলে চিনো না কেনো?”

“তুমি ওকে চিনো?”

“চিনবো না আমি? আস্ত একটা খবিশ।”

“মানে?”

“আরেহ আমার ভাবির ছোট ভাই ও। ভাইয়া-ভাবির বিয়ের সময় আমাকে জ্বালিয়ে ফেলেছিলো পুরো। প্রপোজ করে কিসব কাহিনী করেছিলো। এমন গিদরের গিদর পিছু যে পড়েছিল, ছাড়াতেই পারছিলাম না। কত কষ্টে ছাড়ালাম আর এখন তোমাকে ধরেছে না?”

“ধূররর না জেনে কিসব বলছো? ও এরকম না।”

“কিসব বলছি না, ভালো কথাই বলছি। জেরিন ভালোয় ভালোয় বলছি ওই ছেঁছড়া থেকে দূরে থাকো।”

“সম্ভব নয়। আমি ওকে খুব ভালোবাসি। ওও আমাকে খুব ভালোবাসে। ও তো এখন পড়াশোনা করছে, ওর পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর চাকরি পেলেই আমরা বিয়ে করবো।”

“আল্লাহ! বিয়ে পর্যন্ত চলে গিয়েছো?”

“তো যাবো না? ভালোবাসি না একে অপরকে?”

“এইসব প্রেম, এই যে হারাম সম্পর্কে আল্লাহর বরকত থাকে না।”

“সবাই প্রেম করে। রিমি আপুর প্রেমের বিয়ে। কার সাথে জানো? মামার ফ্রেন্ডের সাথে। ও ভালো আছে না? আমার নীলের সাথে। জাইমারও একটা ছেলেকে পছন্দ হয়েছে। তোমাকে এখন বলা যাবে না তার নাম। তাহিয়াও প্রেম করে। তো? সবাই করছে না?”

হুমকি দিয়ে বলে, “জেরিন আমি কিন্তু তোমার মামাকে বলতে বাধ্য হবো।”

জেরিনের মুখোভঙ্গি বদলে গেল। “মামাকে কেনো বলবে?”

“আমি তো বলবোই। প্রেম করা মোটেই ভালো না। প্রেম করলে সব মধুময় লাগে। সবাই উপরে উপরে ভালো মানুষি দেখায়। একসাথে সংসার করতে গেলে বোঝা যায় কত ধানে কত চাল। তোমার মামাকে জানাবো তো আমি।”

জেরিন কাঁদো কাঁদো গলায় বলে, “আল্লাহ মামি শুধু আমি না! রুমঝুম আপু ছাড়া সবাই প্রেম করে। আমি একা না। তাহিয়াও প্রেম করে। তুমি মামাকে বলো না প্লিজ। মামা কান বরাবর চড় মারবে। প্লিজ।”

“এই কারণে একটা বাটপার ছেলের সাথে ছিহ!”

“ও খুব ভালো। তোমাকে ওর সাথে কথা বলিয়ে দিবো।”

“কথা বলাতে হবে না। আমি জানি ও কেমন।”

“ভুল হচ্ছে কোথাও।”

“কোথাও ভুল হচ্ছে না। ভাইয়ার বিয়ের সময় পিছনে পড়ে ছিল পুরো।”

“ধূর তোমার হয়তো ভুল হচ্ছে। তুমি গুলিয়ে ফেলছো। ও তোমাকে চিনেই না।”

“তুমি কল দাও ওকে। এখুনি কল দাও। দেখো আমাকে চিনে কিনা?”

জেরিন কল দিলো। লাউডে কল দিলো। অপর প্রান্ত থেকে নীল কল রিসিভ করেই বলে,

“কি কলিজা?”

পুনম জেরিনের হাত থেকে মোবাইল কেড়ে নেয়। রেগে বলে,

“এই তোমার কলিজা কয়টা? একবার আমাকে কলিজা ডেকেছিলে এখন আবার জেরিনকে কলিজা ডাকছো?”

নীল প্রথমে ভ্যাবাচেকা খেলেও মুখে হাসি ফুটিয়ে বর করে সালাম দেয়।

“আসসালামু ওয়ালাইকুম মামি শ্বাশুড়ি।”

পুনমের নাকের পাটা ফুলে উঠে। নীল হেসে বলে,

“কি মামি এমন রেগে আছেন কেনো?”

“তুমি না ভাইয়া ভাবির বিয়ের পর আমার পিছনে ঘুরেছিলে? এখন আবার জেরিনকে ভালো লাগে?”

“ওটা তো ছোট ছিলাম বলে। ছোটবেলার কথা না তোলাই ভালো।”

পুনমের মুখ লাল হয়ে গিয়েছে। “হারামি তুই আর কাউকে পাসনি ফাঁসানোর জন্য? বদমাইশ।”

নীল এবার সিরিয়াস হলো। হেয়ালি না করে বলে,

“দেখো পুনম তখন ছোট ছিলাম। তুমি তালতো বোন ছিলে, প্লাস আমরা একই ক্লাসে পড়তাম। তাই একটু মজা টজা করেছিলাম। ওগুলো অতীত। এগুলো বলে এখন প্যাচ লাগাবে না।”

জেরিন পুনমের হাত থেকে ফোন নিয়ে বলে, “তুমি ওকে চিনো?”

“তোমাকে আপুর ননদের কথা বলেছিলাম না? ওইযে ওই?”

নীল সত্যিই বলেছিলো। জেরিনের মনে পড়তেই জেরিন তাল মিলিয়ে বলে, “সেটাই। আমাকে নীল আগে বলেছিলো ওর আপুর ননদকে আগে ভালো লেগেছিল, এখন ওসব কিছু নেই। ও এখন শুধু আমাকেই ভালোবাসে।”

“জেরিন আমার কথা শোনো!”

“প্যাচ কম লাগাও ছেমড়ি। ইন্টারে থাকতে কয়দিন ভালো লেগেছিলো। তুমি পাত্তা দাওনি, আমিও আর পিছনে ঘুরিনি শেষ। ডিসমিস। এখন আমি জেরিনকে নিয়ে সিরিয়াস।”

“তোমার নাম্বার দাও।”

জেরিন ‘কেনো, কেনো’ প্রশ্ন করলেও নীল দিয়ে দেয়। পুনম নাম্বার সেইভ করে বলে,

“জেরিনের মামার সাথে কথা বলার জন্য রেডি থাকো।”

“আমার সমস্যা নেই।”

“কিন্তু আমার সমস্যা আছে। মামা আমাকে কুপিয়ে কেটে কেটে নদীতে ভাসিয়ে দিবে।”

পুনম কেটে দিলো। মোবাইল টেবিলে রেখে বলে,

“তুমি জানো ও ইভটিজিং করেছে আমার সাথে।”

“তখন ছোট ছিল। এখন তো এইসব করে না। ও এখন ভালো হয়ে গিয়েছে।”

“প্রেমে অন্ধ হয়ে গিয়েছো না?”

“ভালোবাসলে বিশ্বাস করতে হয়।”

পুনম মুখ কুচকে তাকিয়ে থাকে। ভীষণ জঘন্যভাবে ক্রিঞ্জ খাচ্ছে ও। জেরিন বলে,

“তোমার জীবনে ভালোবাসা আসেনি তাই তুমি বুঝতে পারছো না। ভালোবাসলে নিজেকে পাগল পাগল লাগে।”

“ভালোবাসলে যদি নিজেকে পাগলই লাগে, তাহলে ওই ভালোবাসার তো কোনো দরকার নেই। তাছাড়া লাভ ম্যারেজে কজন সুখী হতে পারে?”

“অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ ভালো?”

“অবশ্যই।”

“ঠিক এই কারণেই তোমার একটা খারুশ লোকের সাথে বিয়ে হয়েছে। যেমনটার সাথে তেমনটা, একদম পারফেক্ট ম্যাচ। তুমি আর মামা দুটোই নিরামিষ। এত নিরামিষ হয়ে সংসার করবে কি করে? কেউ কাউকে চিনতে পেরেছো এখনও?”

পুনম চুপ করে যায়। জেরিন মুখ কুচকে বলে,

“লাভ ম্যারেজই বেস্ট।”

“তোমার সাথে আমি একমত নই।”

“অ্যারেঞ্জ ম্যারেজে কেউ কাউকে চিনে না, কিছু না। ছিহঃ কি জঘন্য ব্যপার। ধরো তোমার হালকা রং পছন্দ, কিন্তু মামার ক্যাটক্যাটে রং পছন্দ? তখন? তখন কি হতো? কিভাবে যে মানুষ অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ করে? আচ্ছা তোমার কি মামার সাথে শুতে গা ঘিনঘিন করে না?”

পুনম বড় বড় চোখ করে তাকায়। জেরিন নিজেকে সামলে বলে,

“সরি সরি, আই মিন ঘুমাতে কেমন লাগে না? অপরিচিত একটা লোকের সাথে বেড শেয়ার করা, কাঁথা কম্বল শেয়ার করা। উদ্ভট গায়ের গন্ধ আসে না? ছিহঃ! আমি কল্পনায়ও আনতে পারছি না।”

পুনম চুপ করে থাকে। জেরিন গা গুলিয়ে উঠেছে এমন ভাব করে বলে, “আমি নীলকে মোটামুটি চিনি। নীলও আমাকে চিনে। তোমরা কেউ কাউকে চিনো না! ছিহঃ তোমাকে টাচ করলে কেমন কেমন লাগে না?”

পুনম ভাবতে থাকে। ওর ভয় হয়, হাসফাস লাগে, তবে গা ঘিনঘিন করে না। নওশাদ ভীষণ পরিপাটি। গা থেকে উদ্ভট গন্ধ করে না বরং সবসময় আতরের সুন্দর গন্ধ করে। ভোলাভালা পুনমের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা রোমান্টিক স্ত্রী সত্ত্বা স্বামীর বুকে নাক ঘষতে চায়। নওশাদকে জড়িয়ে ধরতে চায়। শুধু নারীসুলভ লজ্জায় বাঁধা পড়ে ও এইসব করতে পারে না। আর নওশাদও ওকে টাচ করেনি। জেরিনের ভাবনার সাথে কেনো জানি পুনম একমত হতে পারলো না। পুনম নওশাদকে কাছ থেকে চিনার, জানার চেষ্টা করছে, লুকিয়ে লুকিয়ে নওশাদের কাজ দেখে, ধরা পড়লে চোখ লুকিয়ে বাঁচে এইসব সুন্দর মুহুর্ত কি লাভ ম্যারেজে সম্ভব হতো? হতো না।

————–

পুনম দুপুরে গতকালের আনা তেহারি দিতে জবার বাসায় গিয়েছিল। জিসান তেহারি খেতে নাকি ভীষণ পছন্দ করে তাই। পুনম যখন এই বাসায় আসে তখন জবা রান্না করছিলো। পুনম সৌজন্যতা দেখিয়ে বলে,

“আপা আপনি আপনাকে সাহায্য করি?”

“করবে? আচ্ছা করো।”

পুনম জবাকে এটা সেটা এগিয়ে দিলো। জবা একপর্যায়ে বলে, “ফ্রিজ থেকে ছই নিয়ে আসো তো।”

পুনম সব বুঝলেও এটা বোঝে না। ছই কি? ছাই তো না। নওশাদও ওকে ছইয়ের কথা বলেনি। জবাকে ‘দিচ্ছি’ বলে ও রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলো। নওশাদকে কল করে। নওশাদ রিসিভ করতেই পুনম বলে,

“আপনি কি বিজি?”

“ক্লাস নিচ্ছি, কেনো?”

“আচ্ছা সরি কিন্তু ছই মানে কি?”

“বুঝি নাই।”

“আপা শুটকি রান্না করছে। আমাকে ছই নিতে বললো। ছই কি?”

“ওহ। সিম।”

“রাখলাম। আল্লাহ হাফেজ।”

পুনম কল কেটে দিয়ে ফ্রিজ থেকে সিম বের করে দেয়। জবা ওকে সিম দিয়ে শুটকি রান্না শিখিয়ে দেয়। পুনমও হুহা করে। কিছু না বুঝলেই নওশাদকে কল করে। নওশাদ শেষমেশ বিরক্ত হয়ে কল রিসিভ করাই বন্ধ করে দিলো।

———————

নওশাদ বাসায় ফিরলো সন্ধ্যা নাগাদ। পুনম দরজা খুলেই জিজ্ঞাসা করে,

“আপনার কলেজ কয়টা থেকে কয়টা?”

নওশাদ বাসায় ঢুকে জুতা, মৌজা খুলতে খুলতে জিজ্ঞাসা করে, “দুটো শিফট।”

“আপনি কোন শিফটের?”

“দুটোরই ক্লাস নেই।”

“কেনো? বেশি টাকা ইনকাম করতে?”

“টাইম পাস করতে।”

“মানে?”

“দু’টো পর্যন্ত ক্লাস নিয়ে তো বাসায় ফিরে আর কিছু করার নেই। কি করতাম বাসায় এসে?”

পুনমের আর প্রশ্ন না শুনে নওশাদ রুমের দিকে পা বাড়ায়। পুনম পিছন পিছন এসে বলে,

“কি খাবেন?”

“পিজ্জা বানাবো।”

“এখন?”

নওশাদ গায়ের শার্ট খুলে ফেলে। তোয়ালে নিয়ে বলে,

“গতকালকে খেতে চেয়েছিলে না?”

“মুরগি তো নেই বলেছিলেন। আর আনেনওনি। তবে?”

“ফ্রিজে নাকি আছে। দেখতে হবে।”

“আমি বের করছি।”

“মুরগিই বের করো, আবার অন্যকিছু বের করো না।”

পুনম তেজ দেখিয়ে বেরিয়ে যায়। ফ্রিজ থেকে দেখেশুনে মুরগিই বের করে। চিজ, সসেজ, ডিম, সস বের করে সিঙ্কে রাখতেই নওশাদ আসে। পুনম আড়চোখে দেখে। গোসল করেছে, পুনমের ইচ্ছে হলো নওশাদের চুলে হাত গলাতে। নওশাদ চায়ের পাত্র হাতে নিয়ে বলে,

“চা খাবে?”

“হুহ।”

নওশাদ চুলা জ্বালিয়ে পানি গরম করতে থাকে। পুনম বলে,

“আমি করি?”

নওশাদ সরে দাঁড়িয়ে বলে, “শিওর।”

পুনম চাপাতার কৌটা হাতে নিয়ে বলে, “দিবো এখন?”

“একটু পর।”

“বুঝেন কিভাবে?”

“পানি ফুটুক আগে?”

“আচ্ছা।”

বুকে হাত গুঁজে বলে, “পড়াশোনার কি খবর?”

“ভালো।”

“আদৌও পড়াশোনা করো?”

“পরীক্ষার আগের রাতে পড়লেই হয়।”

“ভালো সিজিপিএ না আসলে আউট।”

পুনম নওশাদের দিকে তাকায়। নওশাদ হাত গুঁজে ঠোঁটের কাছে আঙুল ঠেকিয়ে টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে বলে,

“আই মিন্ট ইট।”

“সে দেখা যাবে।”

নওশাদ পুনমের হাত থেকে চাপাতার কৌটা নিয়ে চাপাতা ঢালে। দুধের গুড়োর বয়াম এনে দুকাপে গুড়ো দুধ নিয়ে সেল্ফে চাপাতার কৌটা এবং বয়াম রাখে। চা ছাঁকনি এনে চা ছেঁকে গ্যাস নিভিয়ে দেয়। পুনম তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলো কেবল।

“আপনি এত তাড়াতাড়ি সব করেন কি করে?”

“তুমি কাজ পারো না তাই দেরী হয়। পারলে তুমিও চটপট কাজ করে ফেলতে পারবে।”

“আপনি এত কাজ পারেন কি করে?”

“আম্মা অসুস্থ ছিল বেশ কিছু বছর। তখন আমিই আম্মা আর নিজের জন্য রান্না করতাম। ওভাবে করতে করতেই শিখে গিয়েছি।”

“আপা দিতো না?”

“আম্মা মারা যাওয়ার দুমাস আগে এই বাসায় উঠেছিলাম।”

“ওহ।”

নওশাদ চায়ের কাপে চুমুক দেয়। পুনমের ইচ্ছে করছে কথা বলতে। আর দশটা স্বামী স্ত্রীরা যেমন গল্প করে কাটায়, পুনমের ইচ্ছে হলো ওভাবেই গল্প করে কাটাতে। কিন্তু কথা বলার মতো কিছু পেল না। অনেক ভেবেচিন্তে বলে,

“আপনি কি সব বানাতে পারেন?”

“মোটামুটি।”

চায়ের কাপ বেসিনে রেখে বলে, “লেবু আছে না ফ্রিজে?”

“জ্বি।”

“কাটতে পারবে?”

“হুম।”

“কাটো।”

পুনম ফ্রিজ থেকে লেবু বের করে। চপিং বোর্ড, ছুরি নিয়ে কাটতে থাকে। নওশাদ মুরগির কেটে রাখা টুকরোগুলোকে আরো ছোট ছোট করে কাটে। পুনম লেবু কেটে বলে,

“কি করবেন লেবু দিয়ে?”

“দেখতেই পাবে।”

“কি করবো আর?”

“চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকো।”

পুনম ওর চা শেষ করে এরমধ্যে। নওশাদ ডো বানাতে শুরু করে।

“পেঁয়াজ, টমেটো নাও তো।”

পেঁয়াজ, টমেটো নিয়ে বলে, “কাটবো?”

“পেঁয়াজ তোমার কাটতে হবে না। কেঁদে কেটে বন্যা বানিয়ে ফেলবে।”

“বললেই হলো?”

“মুখ না চালিয়ে দ্রুত টমেটো কাটো।”

পুনম টমেটো কাটতে গিয়ে বের বিপাকে পড়েছে। কাটতেই পারছে না। পুনম চপিং বোর্ডে থাকা টমেটোগুলোর দিকে অসহায় ভঙ্গিতে বলে,

“এগুলো কাটতে গেলে এমন থেঁতলে যাচ্ছে কেনো? কি বাজে!”

নওশাদের ডো বানানো শেষ। ও ঢাকনা দিয়ে চুলার জ্বালিয়ে চুলার পাশে বাটিটা রেখে হাত ধুয়ে প্রশ্ন করে,

“কি হয়েছে?”

“টমেটোগুলো এমন কেনো? কাটলেই পানি বের হয়! লেবুর মতো না কেনো?”

“এটা তো আর লেবু না যে লেবু হবে।”

“আমি কাটতে পারছি না। দেখুন কি অবস্থা? থেঁতলে যাচ্ছে পুরোপুরি।”

“শিখিয়ে দিবো?”

“দিন। আপনি না দিলে আর কে দিবে?”

“ইন মাই ওয়ে?” অন্যরকম স্বরে বলে। পুনম ধরতে পারে না।

“একটা ওয়েতে শেখালেই হবে।”

নওশাদ পুনমের পিছনে এসে দাঁড়ালো। পুনম প্রশ্ন করার আগেই নওশাদের হাত দুটো পুনমকে চারপাশ থেকে পেঁচিয়ে ধরলো। পুনমের চোখ বড় বড় হয়ে যায়। নওশাদ পুনমের কানের সামনে বলে,

“ছুরিটা হাতে নাও।”

পুনম নিলো। নওশাদ পুনমের হাতের উপর হাত রাখে। পুনমের হাতের কম্পন পুনম তো অনুভব করছেই, সাথে নওশাদও অনুভব করতে পারছে। নওশাদ অন্তত ধীরে টমেটো কাটতে লাগলো। যতটুকু না সময় প্রয়োজন, তার চেয়েও বেশি সময় লাগাচ্ছে।

নওশাদের নাকে পুনমের চুলের ঘ্রাণ আসছে। ও মন ভরে নাক টানে। ও তো পিছন থেকে নিজের পছন্দের কাজ মন ভরে উপভোগ করতে পারছে। তবে পুনম পড়েছে বিপাকে। একে তো নওশাদ এভাবে পেঁচিয়ে ধরেছে উপরন্তু পুনমের নাকেও আতরের সুঘ্রাণ লাগছে। পুনম যদি এখন লাজ-লজ্জার মাথা খেয়ে নওশাদের বুকে নাক ঘষে তাহলে কি নওশাদ বিষয়টা খারাপ ভাবে নিবে?

নওশাদ কাটা টমেটোগুলোকে চপিং বোর্ডের একপাশে রেখে পেঁয়াজ নেয়। নওশাদের গরম শ্বাস পুনমের ঘাড়ে, গলায় এসে পড়ছে। পুনমের শ্বাস আটকে আসছে বারবার। নওশাদ পুনমকে চারপাশ থেকে জড়িয়ে ধরে রেখেই পেঁয়াজ ছিলে। পুনমের হাত ধরে গোল গোল করে কাটতে থাকে। পুনমের চোখ থেকে পানি বের হয়ে একাকার অবস্থা। পেঁয়াজ, টমেটো কাটা শেষ হতেই নওশাদ পুনমের হাত ছেড়ে দেয়। এক পা পিছিয়ে দাঁড়ায়।

নওশাদ কনুইয়ের ভাজে চোখ মুছে। অনুভব করে তুলোর বস্তা ওকে জাপটে ধরেছে। পুনম নওশাদের বুকের দিকের টিশার্ট শক্ত করে মুঠোয় নিয়ে চোখ মুছে। নওশাদ ভীষণ অবাক হয়। পুনম নওশাদের বুকে নাক চেপে দাঁড়িয়ে থাকে। নওশাদ অবাক হয়েই বলে,

“এই সময় লাগবে?”

পুনম চোখ মুখ খিঁচে ফেলে। ভুলেভালে আবেগের বশে নওশাদকে জড়িয়ে ধরে ফেলেছে। কি করে বোঝাবে ও এখন যে আবেগে ও এই কাজ করে ফেলেছে? এখন লজ্জায় মুখও তুলতে পারছে না। নওশাদ ওর তুলোর বস্তার পিঠে আলতো করে হাত রাখে। পিঠে নওশাদের হাতের ছোঁয়া অনুভব করতেই পুনম আরো লজ্জায় পড়ে। খিঁচে দাঁড়িয়ে থাকে। নওশাদের বুকে মুখ যে গুঁজেছে, মুখ উঠানোর নাম নেই। নওশাদ পুনমকে ওভাবেই ধরে বলে,

“ ‘এই সময় লাগবে’ তোমার বেশি সময় লাগবে না তা মেনে নিয়েছি আমি। নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার জন্য তোমার এক সপ্তাহ সময়ই এনাফ সেটাও মেনে নিয়েছি। কিন্তু তোমার চাওয়া সেই এক সপ্তাহ সময় নেওয়া হয়ে যায়নি এখন। সবে মাত্র দুদিন হয়েছে। হাতে আরো পাঁচ দিন সময় আছে। এত তাড়াহুড়ো করার কিছু নেই।”

পুনম নওশাদকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। ভাবখানা এমন যেন ও লুকিয়ে পড়তে চাইছে। নওশাদের দৃষ্টির বাইরে চলে যেতে চাচ্ছে। কিন্তু নওশাদের কাছ থেকে লজ্জা পেয়ে নওশাদের বুকেই লুকানোর কি অর্থ নওশাদ বুঝতে পারছে না। নওশাদ ধীর কণ্ঠে বলে,

“এই সময় লাগবে আমার জীবনে সঙ্গী হিসেবে প্রথম নারী কিন্তু তুমিই। মা বোন, ভাগ্নীদের হিসেব এখানে আসবে না। এখানে আসবে তোমার হিসেব। তুমি যে এভাবে জড়িয়ে ধরে আছো বিষয়টা ভালো হচ্ছে না। আমি পুরুষ মানুষ, তার উপর জীবনে প্রথম নারীর স্পর্শ, প্রথম বউয়ের স্পর্শ। ছাড়ো নাহলে খারাপ কিছু হয়ে যাবে।”

পুনম ছাড়ে না। আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। লজ্জায় মরি মরি অবস্থা ওর।

নওশাদ পুনমকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। পুনমের আর নিজেকে ছাড়ানোর ক্ষমতা নেই। নওশাদ অস্থির হয়ে বলে, “এই সময় লাগবে এই আমি কিন্তু আবারও বলছি ছাড়ো আমাকে। তুমি আমাকে ভদ্রভাবে জড়িয়ে ধরোনি। হাসবেন্ড ওয়াইফরা এভাবেই একে-অপরকে জড়িয়ে ধরে ঠিক আছে। কিন্তু এভাবে জড়িয়ে ধরলেও তারা এইভাবে, মানে তুমি যেভাবে আমার ভিতর ঢুকে পড়তে চাইছো এভাবে একজন আরেকজনকে অন্য সময় জড়িয়ে ধরে। এটাকে নরমাল জড়িয়ে ধরা বলে না। কোন সময় এভাবে ধরে আই থিংক আমার তোমাকে বলার প্রয়োজন নেই। তুমি কি এতটাই অবুঝ নাকি?

গাধা আমি পুরুষ মানুষ। এদিক ওদিক পিছলে পড়লে, কিছুমিছু করে ফেললে পরে দোষ হবে আমার। লোকে ঠাট্টা করে বলবে নওশাদ বিন নাসিরের ধৈর্য নেই। সামান্য জড়িয়ে ধরায় নিজেকে আর সামলাতে পারেনি। বউ এক সপ্তাহ সময় চেয়েছিল তাও দেয়নি। তোমার দোষ কেউ দেখবে না। আজব! মানুষ আমাকে ছ্যাবলা বলবে। গাধা আমি এবার কান বরাবর চড় দিবো একটা।”

চলমান……

(হ্যাপি রিডিং)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here