#আফরিন_আখ্যান
#পর্ব_১১
#সমৃদ্ধি_রিধী
দশ মাস পর…ডিসেম্বরে…
কনকনে শীত। ফারিন দুই হাত ঘষে লাগেজে আহসানের জামাকাপড় ঢুকাতে থাকে। সোয়েটারও ঢুকায়। ড্রেসিংটেবিলের সামনে গিয়ে আহসানের চিরুনি, পারফিউম ঢুকায়। মৌজা, মাফলারও ঢুকায়। আহসান ওয়াশরুম থেকে বের হয় তখন। এগিয়ে গিয়ে ফারিনকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে। ফারিনের গালের সাথে গাল লাগিয়ে রাখে। ফারিন মৃদু হেসে আহসানের ফর্মাল প্যান্ট লাগেজে ঢুকায়। আহসান ফারিনকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলে,
“মিস করবে নাকি আমাকে?”
“মিস করার মতো কিছু?”
“দুই মাসের জন্য সিঙ্গাপুর যাচ্ছি। মিস তো করাই উচিত।”
“তোমাকে মিস করার কি আছে? তুমি কে হও আমার?”
“তোমার বাচ্চার বাপ।”
“আগে বাচ্চা আসুক তারপর বাপ হইও।”
ফারিনকে আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলে,
“তুমি মিস না করলেও আমি করবো।”
“তোমার কি মনে হয় আমি মিস করবো না?”
“করবে। অনেক বেশি করবে।”
“তাহলে জিজ্ঞাসা করছো কেনো?”
“জাস্ট ফর কিউরিওসিটি।”
“কিউরিওসিটি গিলে খাও।”
“আচ্ছা।”
ফারিন লাগেজের চেইন আটকে দেয়। আহসান লাগেজ রুমের একপাশে রেখে ফারিনকে পেঁচিয়ে জড়িয়ে ধরে বলে,
“মাথা ঠান্ডা আছে?”
“মাথা ঠান্ডাই থাকে আমার।”
“হাস্যকর।”
“মাথা ঠান্ডার খবর জিজ্ঞাসা করলে কেনো?”
“রাগ করবে না তো?”
“রাগ করার মতো কিছু বলবে?”
“তুমি রাগতেই পারো। বলা যায় না।”
“আচ্ছা বলো।”
“সিঙ্গাপুরে যদি দুইমাসই থাকতে হয় তাহলে মেবি আমরা আমাদের ম্যারেজ ডে সেলিব্রেট করতে পারবো না।”
“হুহ। আগে আসার চেষ্টা করো, তাহলেই পারবো।”
“চেষ্টা তো করবোই। যদি না পারি?”
“না পারলে তোমার ভাগ্য খারাপ।”
“শোনো না?”
“বলো না?”
“সিঙ্গাপুর থেকে ফিরে আমরা বাচ্চার জন্য ট্রাই করবো।”
“ওওহ বাবা শখ কত!”
“বাচ্চা আমার অনেক ভালো লাগে।”
ফারিন আঙুলে চুল ঘোরাতে ঘোরাতে বলে, “ছেলে হলে ফাইয়াজ আর মেয়ে হলে ফিজা নাম যদি রাখো, তাহলে ভেবে দেখতে পারি।”
“নাহ, আহিয়ান নাহলে আনহা রাখবো।”
“দ্যান ভাগো।”
“আচ্ছা দুটো মিলিয়েই রাখবো।”
“তাহলে দেশে আসো, তারপর ট্রাই করবো।”
আহসান মোনাজাতের ভঙ্গিমায় হাত তুলে বলে,
“আল্লাহ আমার বউ দেখি ভালো মানুষ হয়ে গিয়েছে।”
“মানে?”
“বিয়ের প্রথম দিকে অনেক জ্বালিয়েছো।”
“লাস্ট ছয়মাস ধরেই তোমার সাথে পারফেক্ট ওয়াইফের মতোই আছি। বেশি করলে আবারও আগের ফরম্যাটে ফিরে যেতে পারি।”
“মাফ চাই।”
“মাফ করা হবে না। ওহো! তোমার ফাইলগুলোই তো দেওয়া হলো না। বিছানায় রেখেছি। ভুলে গিয়েছি লাগেজে ঢোকাতে। কষ্ট করে যেটা যেটা দরকার নিয়ে নাও।”
“পাগল মহিলা! মেইন জিনিসই ঢুকালে না।”
সরি বলে ফারিন ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আহসান লাগেজ টেনে আনে। ফাইলগুলো দেখে দেখে দেখে ব্যাগে ঢোকাতে থাকে। ফারিন একটু পর এক প্লেটে খাবার নিয়ে ঘরে ঢোকে। ভাত মেখে আহসানের মুখের সামনে ধরে। আহসান খেয়ে বলে,
“বাবা কি ভালোবাসা!”
“তোমার কাজে যাতে ডিস্টার্ব না হয় তাই খাওয়াচ্ছি।”
“আমাকে ভালোবাসো না বলছো?”
“ভালোবাসা? আবার তোমাকে?”
“নেক্সট থেকে আমাকে আর জড়িয়ে ধরে ঘুমাবে না।”
“আগামী দুমাস আসলেই তোমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাবো না।”
“তারপরও ঘুমিও না।”
“সে দেখা যাবে।”
ফারিন নিজেও খেতে থাকে, আহসানকেও খাইয়ে দেয়। খালি প্লেট রেখে ঘরে এসে দেখে আহসান জেসমিনের সাথে কথা বলছে। ফারিন বারান্দার দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়ে। আহসানও জেসমিনের সাথে কথা বলতে বলতেই শুয়ে পড়ে। ফারিন ফিসফিস করে বলে,
“লাইট নিভিয়ে শোও।”
আহসান পাত্তা না দিয়ে বালিশ ঠিক করে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে। জেসমিনকে বলে, “না, ও ওর বাবার বাসায় যাবে।”
ফারিন তাকালো আহসানের দিকে। আহসান পায়ের উপর পা তুলে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে বলে,
“সমস্যা নেই তো, আসলে গাড়ি নিয়ে ধানমন্ডি চলে আসবে। আঙ্কেল অনেকবার কল দিয়ে বলছিলো পাঠাতে। আমিও থাকবো না যখন যাক।”
ফারিন বুঝলো ওকে নিয়ে কথা হচ্ছে। ফারিন এবার গিয়ে ওর দাদার দেওয়া সম্পত্তিগুলো লিখে দিবে রশিদ আলমের নামে। তারপর আর জীবনেও ওই বাড়িমুখো হবে না। সুখে আছে এখন, আর পিছুটান রাখবে না।
আহসান কল কেটে ফারিনকে জড়িয়ে ধরে। ফারিন বলে, “কি চাও?”
“তোমাকে, শুধু তোমাকে।”
“এতই যখন আমাকে চাও তাহলে, দুইমাসের জন্য চলে যাচ্ছো কেনো?”
“কাজ পড়ে গিয়েছে কি করবো?”
“তুমি লাস্ট ছয়মাস যাবত আমাকে একটুও সময় দাওনি আহসান।”
“সব তো এই সিঙ্গাপুরের প্রোজেক্টের জন্যই। কাজটা ভালোয় ভালোয় হলে আমি অনেকদিন যাবত ফ্রি থাকবো।”
“তখন ফ্রি থেকে লাভ নেই। ছয়মাস যে কাজের ব্যস্ততায় আমাকে দাম দাওনি, আমি সব সুধে আসলে উশুল করবো।”
“জো মার্জি মেরে জাহাপানা।”
“আগে আগে আসার চেষ্টা করবে।” আহসানের চুলে হাত গলিয়ে বলে।
“ম্যারেজ ডের আগে?”
“হুম।”
“ফারিন আমি কিন্তু সিরিয়াস।”
“কি ব্যাপারে?”
“বেবির নেওয়ার ট্রাই করবো। আমার বাচ্চা অনেক ভালো লাগে। নিজের বাচ্চা হলে ওটাকে আদর করবো তখন।”
“আমাকে দাম দিবে না বেবি হলে?”
“তোমাকে দাম না দিয়ে থাকবো নাকি?”
“বলা যায় না। দূরছাইও করতে পারো।”
“তোমার স্বপ্নে।”
“আচ্ছা সহিসালামতে ফিরে এসো। পরেরটা পরে দেখা যাবে।”
আহসান ফারিনের উপর চড়াও হলো। ফারিন ভ্রু নাচিয়ে বলে, “মতলব কি?”
“ভালোবাসা বাসি।”
ফারিন আহসানের চুলে হাত গলায়। “তোমার তো একটা স্বভাব আছে।”
“কি?”
“দুই মিনিট পর পর চুলে হাত গলায়। সুন্দর লাগে তখন তোমাকে। ওখানে গিয়ে এইসব করবে না।”
“করলে কি হবে?”
“মেরে ফেলবো মেরে।”
“আমি তো তোমার হাতে মরতেই চাই জাহাঁপনা।”
“নাটক। তারপর শোনো কেউ আগ বাড়িয়ে কথা বলতে এলে বলবে আমার ওয়াইফ আছে।”
আহসান হাসলো। “তারপর?”
“হেসো না। জামাই সুন্দর হলে মেয়েদের কত টেনশন জানো?”
“বাব্বাহ! আমাকে সুন্দরও লাগে তোমার?”
“বহুমাস আগে থেকেই লাগে।”
“বাব্বাহ! সফলভাবে প্রেমে ফেললাম তাহলে।”
“তা আবার বলতে।”
আহসান ফারিনের গলায় মুখ গুঁজে। ফারিন বলে,
“গোসল করে চুল ঠিক করে মুছবে। ভেজা চুলে, চশমা ছাড়া ঘুরবে না।”
“কেনো এভাবে প্রেমে পড়েছিলে তুমি?”
“বাদ দাও সে কথা।”
“বলো?”
“যদি বলি হ্যাঁ?”
“ওওহ প্রেমে তখনই পড়েছিলেন?
“বাদ দিতে বললাম না?”
ফারিনের পেটে হাত দিয়ে বলে, “তোমার এই পেটে কত কথা যে আছে! সব আমাকে বলোও না।”
ফারিন আহসানের গলা জড়িয়ে ধরে। “আহসান তোমাকে একটা কথা বলি?”
“বলো?”
“আমরা যে বিয়ের চতুর্থ দিন যে গাজীপুর গিয়েছিলাম, কেনো গিয়েছিলাম?”
“নিজেদেরকে সময় দিতে?”
“উহু! আমি বাবার বাসায় যেতে চাচ্ছিলাম না। তাই তোমাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে গাজীপুর গিয়েছিলাম।”
আহসান সিরিয়াসলি নিলো না। “ভালোই হলো। আমাদের জোস জোস সময় কেটেছে তখন।”
“সত্যিই বলেছি। ইউজ করেছি একপ্রকার।”
“বিশ্বাস করলাম।”
“রাগ উঠছে না?”
“তুমি যে ধান্দা করেছো আগেই বুঝেছি। তবে ভালো সময় কাটিয়েছিলাম প্রচুর ওখানে।”
“তুমি সুস্থ মতো ফিরে এসো, তোমাকে অনেক কথা বলবো।”
“কি কথা?”
“যা আগে বলিনি, কিন্তু তোমার সেসব জানা অনেক জরুরি।”
“এখনই বলো।”
“দেশ ছাড়ার আগে লোড নিতে পারবে না সেসব কথার। ফিরে এসো, তারপর বলবো।”
“বাট কি কথা?”
“এতদিনের জমিয়ে রাখা একান্ত ব্যক্তিগত কথাগুলো বলবো।”
“তাহলে তো তাড়াতাড়ি ফিরতে হয়।”
“মিস করবো। তাড়াতাড়ি ফিরো।”
“আপনি যা বলবেন।”
বলে আহসান ফারিনের গলায় আবারও মুখ গুঁজে। ফারিন আহসানকে জড়িয়ে ধরে। আহসান অস্ফুটস্বরে বলে,
“কালকে চলে যাবো। দুইমাস নিজের মতো ঘুরো, ফিরো। তারপর তোমার স্বাধীনতা শেষ। বাবা মা হওয়ার জার্নিতে লেগে পড়বো হ্যাঁ?”
“আচ্ছা।”
“লাভ ইউ।”
“মি টু।”
_______________
আহসান সিঙ্গাপুরে যাওয়ার পরদিনই ফারিন বাবার বাড়িতে চলে আসে। সম্পত্তি রশিদ আলমের নামে লিখে দেওয়ার সময় কাগজপত্রে অনেক ঝামেলা পায়। ফারিনের নামে ভুল ছিল। মোটা অংক খরচ করে ভোটার আইডি কার্ড ঠিক করিয়ে সম্পত্তি হস্তান্তর করতে করতে একমাসের বেশি সময় লাগে। এতসব ঝামেলার মাঝে ফারিন আর আহসানের কথাই হতো না। আহসানের সময় হলে ফারিনের সময় হতো না, ফারিনের সময় হলে আহসানের সময় হতো না। এই দেড়মাসে মনে হয় ওদের পাঁচ মিনিটও টানা কথা হয়নি।
আজকে লিখিতভাবে সম্পত্তি স্থানান্তর করা হয়েছে। ফারিন অনেক খুশি আজ। ও ব্যাগ গোছাচ্ছে। একটু পরে ধানমন্ডি চলে যাবে। আর এই বাড়িতে জীবনেও আসবে না, রশিদ আলমের গালিগালাজও সহ্য করতে হবে না। নয় দিন আগে ও কিটে টেস্ট করে বুঝেছে প্রেগন্যান্ট। তারপর টেস্ট করে কনফার্ম হয়েছে ওর ফিটাসের বয়স সাত সপ্তাহ।
ফারিন শুধু আহসানের দেশে আসার দিন গুণছে। সবার প্রথম আহসানকে জানাবে। আহসান শুনলে কতই না খুশি হবে! দেশ ছাড়ার আগে সারারাত কি পাগলামোটাই না করেছিলো বাচ্চা লাগবে বলে। ফারিন লজ্জা লজ্জা মুখ করে সাইড ব্যাগ কাঁধে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়। ফারিন মনে মনে আফসোসও করে, ইসস! কালকে ওদের প্রথম বিবাহবার্ষিকী আর আহসান কিনা সমানে নেই! আহসান যদি দেশে থাকতো, তাহলে কালকেই সারপ্রাইজ দেওয়া যেতো।
ফারিন মোবাইল হাতে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামার সময় রশিদ আলমের দ্বিতীয় পক্ষের ছোট মেয়ে রূপা উপরে উঠছিলো। ফারিনের হাতের মোবাইল দেখে বলে,
“আইফোন থার্টিন?”
“হুম।”
“বাবা বিয়ে করে তো তোর কপাল খুলে গিয়েছে।”
ফারিন পাত্তা না দিয়ে নামতে থাকলে রূপার খুব গায়ে লাগে। ফারিনকে পিছন থেকে ধাক্কা দিয়ে বলে,
“আমাকে পাত্তা দিচ্ছিস না তুই? এত ভাব নিয়ে থাকিস কিভাবে?”
ফারিনের হাত থেকে মোবাইল পড়ে যায়। পা পিছলে সিঁড়ির রেলিং ধরতে গিয়েও ধরতে পারে না। ফারিনের চোখ বড় বড় হয়ে যায়। সিঁড়ি থেকে উল্টে, গড়িয়ে নিচে পড়ে। ফারিন তলপেটে অনেক ব্যথা পায়। পেটে হাত চেপে গোঙাতে থাকে। রূপা চমকে উঠে। ফারিনের সাদা পায়জামা লাল রক্তে ভিজে যায়। রূপা চেঁচিয়ে ওর মাকে ডাকতে থাকে। রশিদ আলমের দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী হাফসা রহমান আসে। ফারিনকে ফ্লোরে কাঁটা মুরগির মতো ছটফট করতে দেখে আঁতকে উঠে।
“পড়লো কিভাবে?”
“ধাক্কা দিয়েছিলাম।”
হাফসা রহমান রূপার গায়ে থাপ্পড় মেরে সিঁড়ি বেয়ে নেমে ফারিনকে ধরে। ফারিনের চোখ অর্ধ বোজা। রক্ত দেখে হাফসা রহমান অনেক ভয় পেয়ে যায়। দ্রুত ড্রাইভারকে কল করে। ফারিনকে ড্রাইভারের সহায়তায় ধরে হাসপাতালে নিয়ে যায়। শাওন রেগে রূপাকে বলে,
“তুই জানিস আমাদের কোম্পানিতে ওদের কত বড় ইনভেস্টমেন্ট আছে? ফারিন যদি মরে যায় আর ওর জামাই যদি আমাদের নামে কেস করে?”
“ভাইয়া বাঁচিয়ে দে না?”
“ও তো মনে হয় প্রেগন্যান্ট ছিল।”
“আরেহ যেটাই থাক। আমাকে বাঁচিয়ে দে শুধু। ও মরে গেলে কি আমাকে জেলে দিবে?”
“দাঁড়া আমি দেখি।”
শাওনও বাসা থেকে বেরিয়ে গেল। কাজের মেয়েটি এসে রক্ত পরিষ্কার করে। রূপা ফারিনের মোবাইল নিয়ে নেয়। ফারিনের মোবাইলে লক করা নেই। রূপা দারুণ খুশি হয়। মোবাইল নিয়ে উপরে চলে যায়। সিম বের করে ফেলে। ফারিন মরলে মরুক, আইফোন তো এখন ওর।
_____________________
সন্ধ্যা সাতটা বাজে। সিঙ্গাপুরের ডিলটা কনফার্ম না হলেও খুশি মনে রশিদ আলমের বাড়িতে এলো। একমাস পর দেখা হবে ফারিনের সাথে। ফারিন অবাক হবে নিশ্চয়ই ওকে দেখে? কালকে ফারিনকে এগারো তালা রুফটপে নিয়ে এনিভার্সারির সারপ্রাইজ দিবে। আগামীকাল ওরা দারুণভবে ওদের ম্যারেজ ডে পালন করবে। ডিল কনফার্ম না হওয়ার শোক পরে পালন করবে আহসান। তার আগে প্রথম বিবাহবার্ষিকী উদযাপন করে নিক। এইসব ডিল ফিল অনেক পাবে, কিন্তু ফার্স্ট এনিভার্সারি তো আর পাবে না। আহসান খুশি খুশি মনে কলিংবেল বাজালো। গোলাপের তোড়া গাড়িতে রাখা আছে। দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো।
একটু পর হাফসা রহমান দরজা খুললেন। আহসান সালাম দেয়। হাফসা রহমানের পিলে চমকে উঠে। উনি সালামের জবাব দিয়ে বাসায় ঢুকে গেলেন। আহসান পিছু পিছু আসে। সোফায় বসে বলে,
“ফারিন বাসায় আছে?”
হাফসা রহমান হঠাৎ-ই নাকে ওড়না চেপে মেকি কান্না শুরু করে দেন। আহসান কপাল কুঁচকে বলে,
“কোনো সমস্যা হয়েছে? আঙ্কেলের শরীর ঠিক আছে?”
শাওন তখন নিচে নামে। হাফসা রহমান ওড়না চেপে কাঁদতে কাঁদতে আহসানের মুখোমুখি সোফায় বসে পড়ে। আহসান শাওনের দিকে তাকিয়ে বলে,
“কি হয়েছে?”
শাওন রুষ্ট গলায় বলে, “আপনার ওয়াইফকেই জিজ্ঞাসা করুন।”
“মানে?”
হাফসা রহমান কাঁদতে কাঁদতে বলে, “বাবা আমি ফারিনকে অনেকবার নিষেধ করেছিলাম। ফারিন শুনলো না আমার কথা।”
আহসান অস্থির হলো ভীষণ। “হয়েছেটা কি?”
“তুমি বিশ্বাস করো আমি অনেকবার নিষেধ করেছিলাম। আমার কথাটাকে একটুও পাত্তা দিলো না। সকালে উঠে চলে গেল হাসপাতালে। আমি তো মা, আমি তো খারাপ চাই না।”
আহসানের অনেক রাগ উঠলো। তাও নিজেকে শান্ত রেখে বলে, “কি হয়েছে? সবটা খুলে বলুন।”
“মেরে ফেললো বাচ্চাটা।” হাফসা রহমান কপাল চাপড়ে কাঁদতে থাকে।
আহসানের পিলে চমকে উঠলো। খাপছাড়া গলায় বলে, “মানে?”
হাফসা রহমান দুদিকে মাথা নেড়ে কাঁদতেই থাকে। যেন অনেক শোকাহত উনি। আহসান অস্থির হয়ে বলে,
“বলছেন না কেনো?”
শাওন খেঁকিয়ে উঠে বলে, “কি বলবে আমার মা? আপনার ওয়াইফ এবোর্শান করতে গিয়েছে। ও প্রেগন্যান্ট ছিল, বাচ্চাটা রাখতে চায়নি। বাচ্চা জন্ম দিলে ফিগার নষ্ট হয়ে যাবে না?”
আহসানের মনে হলো পায়ের তলার মাটি সরে গেল। হাফসা রহমান কাঁদতে কাঁদতেই বলে, “বিয়েতেও রাজি ছিল না। তাও বুঝিয়ে শুনিয়ে বিয়ে দিলাম। এত রাগ যে পরে এই বাড়িতে আসলোও না পরে। কোন ছেলেপেলের সাথে ঘুরে বেড়ায়, নাইট ক্লাবে যায়! বিয়ে হলে তো ওসব হবে না। তাই বিয়ে করতে চায়নি। মানুষ করতে পারিনি মেয়েটাকে!”
শাওনও তাল মিলিয়ে বলে, “বিয়ের পরও তো দেখেছি অফিস টাইমে ছেলে বন্ধুদের সাথ ঘুরতে। আল্লাহ আরো না জানি কি কি করেছে! তোমাকেও তো কতবার জানিয়েছিলাম। বলেও ছিলাম দুলাভাইকে বলো। আমি শিওর ও অফিস টাইমে বাইরে নিজের মতো ফুর্তি করতো, তারপর দুলাভাই আসার আগেই বাসায় চলে যেতো। কতবার জানাতে বলেছি, কিন্তু তুমি তো বললে না। তাহলে উনি একটা অ্যাকশন নিতেই পারতো।”
রূপা আড়াল থেকে শোনে। আহসান যদি বিশ্বাস না করে এইসব কথা? ফারিন যদি সব সত্যিটা বলে দেয়? আহসান যদি ওকে জেলে দেয়? ভয়ে রূপার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল।
“আমি মা হয়ে মেয়ের ক্ষতি চাইবো? মেয়ে উড়নচণ্ডী, সেই খবর কি সবাইকে জানাবো? কত চেষ্টা করলাম বুঝ জ্ঞান ফিরাতে। হলো না! আমি ব্যর্থ।”
আহসান বাকশূন্য হয়ে রইলো। হাফসা রহমান কাঁদতে কাঁদতে বলে, “ও তো তোমাকে ডিভোর্স দেওয়ার জন্য কাগজপত্রও বানাচ্ছিলো। কয়েকদিন অবেক ছুটাছুটি করেছে ডিভোর্সের কাগজপত্র বানাতে। তোমাকে ডিভোর্স দিয়ে নিজের মতো ঘুরতো। এরমধ্যেই গতকাল শুনতে পেলো ও মা হবে। আজকেই গিয়ে মেরে ফেললো। বাবাগো! আমি কতবার নিষেধ করেছিলাম। রূপাও কতবার নিষেধ করলো! রূপাকে চড় থাপ্পড় মেরে বেরিয়ে গিয়েছে। মেরে ফেললো বাচ্চাটাকে। নিজের বাচ্চাই তো ছিল ওর! কিভাবে পারলো মারতে?”
“ফারিন তো আজকের খারাপ না আম্মু। ও অনেক আগে থেকেই খারাপ। কাদের কাদের সাথে মেলামেশা করে, কোথায় কোথায় যায়। আগে ঘন্টার পর ঘন্টা নাইট ক্লাবে পড়ে থাকতো। বিয়ের পর তো হচ্ছে না সেসব। তাই দুলাভাইয়ের বিদেশে যাওয়ার সুযোগে কাগজপত্র বানানো শুরু করে। স্বাধীনতা দরকার ওর। বিয়ের আগেরও কম কাহিনি করেনি, বিয়ের পরও না। এখন নিজের গর্ভের বাচ্চাটাকেও সেইজন্য মেরে ফেললো। বাচ্চা হলে তো বাইরে ঘুরতে পারবে না। দুলাভাইয়ের অফিস টাইমে বাইরে বেরিয়ে ফুর্তি করতে পারবে না। ফিগার নষ্ট হয়ে যাবে। ওর মতো মেয়েটা নিজের স্বার্থ ছাড়া আদৌও কিছু বোঝে? সুন্দর হওয়ার অহংকার কম নাকি ওর মধ্যে?”
হাফসা রহমান বলে, “রূপাকেও কত বাজে বাজে জিনিস শেখাতো! তাও রূপা আজ ওর ভালোর জন্য বলেছিল এবোর্শান না করাতে, তাও করালো। মা হয়েও কি করে পারলো!”
আহসানের গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। ফারিনের বিয়েতে মত ছিল না এবং শুরু থেকেই বলতো আহসানের সন্তান জন্ম দিবে না। একবছর পরও কথাটা বহাল রাখলো? এই বারোমাসে একবারও ফারিনের মনে আহসানের প্রতি মায়া জন্মেনি? একবারও সংসারের প্রতি মায়া জন্মেনি যে ডিভোর্স দেওয়ার জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিল? আহসানের কাছ থেকে মুক্তি পাওয়ার এতই তাড়া ছিল যে আহসানের সন্তানকেও গর্ভে থাকতেই মেরে ফেললো?
হাফসা রহমান, শাওন আরো কত কথা শোনালো। আধাঘন্টারও উপরে আহসান শাওন আর হাফসা রহমানের মিথ্যা, অযৌক্তিক, বানোয়াট কথাগুলো শুনে গেল। আহসান নিতে পারলো না সেসব কথা, বেরিয়ে গেল। আহসান বের হতেই হাফসা রহমান চোখ মুছে। শাওনের দিকে তাকিয়ে বলে,
“বিশ্বাস করবে তো?”
“ভালোই অভিনয় করেছো। বিশ্বাস না করে যাবে কোথায়?”
“রূপার গায়ে আঁচড় আসবে না তো?”
“আশা করি না।”
হাফসা রহমান বড় বড় পা ফেলে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দেয়। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে চুল খামচে ধরে বড় বড় করে শ্বাস ফেলে আহসান নিজেকে ধাতস্থ করে। একপাক্ষিক কথা শোনাটা ঠিক হবে না। ফারিনের কথাও শুনতে হবে। কিন্তু ও কোন হাসপাতালে আছে তা জানা হলো না। আহসান ফিরতি যেতে নিলেই ওদের ড্রাইভার দৌঁড়ে আসে। আহসানকে এসেই বলে,
“স্যার শাওন স্যার কইলো আপনেরে কইতে ফারিন ম্যাডাম সিটি মেডিকেলে আছে।”
“সিটি মেডিকেল?”
“হো আমি সকালে তারে পৌঁছায় দিছি।”
আহসান দুর্বল কণ্ঠে বলে, “ও নিজে গিয়েছে?”
“হো। ফারিন ম্যাডামই তো কইছে নিয়া যাইতে।”
আহসান বোকার মতো তাকিয়ে থাকে। ড্রাইভার বলে, “ম্যাডাম মনে হয় অসুস্থ। একমাস ধইরা কোটে দৌঁড়াদৌড়ি করছে, কত হ্যাপা সামলায়ছে সেইজন্য মনে হয় চেকআপে গেছে।”
আহসান গেট থেকে বেরিয়ে গেল। ঢোক গিলে আদৃতকে কল করে। কণ্ঠ থেকে কথা বের হয় না, তবুও কোনোমতে বলে রশিদ আলমের বাড়ির সামনে আসতে। নিজে দুর্বল পায়ে গিয়ে গাড়িতে বসে। গা কাঁপছে ওর। হাত বাড়িয়ে এসি অন করে। চুল খামছে ধরে স্টিয়ারিংয়ে মাথা ঠেকিয়ে রাখে। এইজন্যই ফারিন একমাস ধরে নানান ব্যস্ততা দেখাচ্ছিলো? ফারিনকে তো আহসানের এমন মনে হয়নি!
_______________
ব্যস্ত রাস্তায় হাজারও মানুষ নিজেদের মতো ছুটে চলেছে। আহসানের মনে হলো ওর পা চলছে না। তাও ও গাড়ি থেকে নেমে পা টেনে টেনে হসপিটালের ভিতর প্রবেশ করে। আদৃত গিয়ে রিসিপশনে কথা বলে। আহসানকে নিয়ে চার তলায় উঠে। ফারিন চারশো ছয় নাম্বার কেবিনে আছে। আহসান যখন চারশো চার নাম্বার কেবিনের সামনে ছিল তখন ওকে পাশ কাটিয়ে দুজন নার্স যায়। আহসান স্পষ্ট শুনতে পেলো একজন নার্স বলছে,
“কেমন মা? স্বামীকে না জানিয়ে এবোর্শান করে ফেললো? স্বামীর কথা বাদ দিলাম। বাচ্চার প্রতি একটুও মায়া মহব্বত নেই?”
“অবৈধ দেখুন গিয়ে।”
“অবৈধ হবে কেনো? বিবাহিত তো। চার সপ্তাহ ফিটাসের বয়স।”
“পরকীয়া থাকতেই পারে। এখনকার যুগ! আরো আগুন সুন্দরী, দেখুন কত লাঙ ভাতার আছে।”
আহসান ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো নার্স দুটোর দিকে। তখন নার্সটা আফসোস করে বলে,
“আরেকটা সাত সপ্তাহের মিসক্যারেজ হলো।”
“হুম মেয়েটা কি কাঁদা কাঁদলো! স্বামীটা আসলোও না। কেমন অমানুষ! এত মায়া লেগেছে আমার। ওর জন্য অনেক খারাপ লাগ..”
আহসান আর শুনতে পেলো না কিছু। নার্স দুটো সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেল। আহসান পাথরের মতো হেঁটে চারশো ছয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। আদৃত আহসানের কাঁধে হাত রেখে বলে,
“ভিতরে যাও।”
আহসান চাপা শ্বাস ফেলে দরজা ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করে। ফারিন শুয়ে ছিল। আহসান অনুভূতি শূন্য হয়ে তাকিয়ে রইলো ফারিনের দিকে। চেয়ারে টান দিতেই ফারিন তাকালো। আহসানকে দেখে গুঙিয়ে উঠলো। ছলছল চোখে হাত বাড়িয়ে বলে,
“আহসান আমাদের সন্তান…”
আহসান ভেবেছিল ফারিনের সাথে কথা বলবে। কিন্তু নার্সগুলোর কথা শুনে ওর মাথায় আর কিছু কাজ করলো না। আহসান অভাবনীয় কাজ করে বসলো। ফারিন বাম গালে ক্যানুলা লাগানো হাত রাখে৷ আহসান চেঁচিয়ে বলে,
“এত খারাপ তুমি? এত খারাপ? মেরে ফেললে আমার সন্তানকে?”
ফারিন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে আহসানের দিকে। আহসান আঙুল তাক করে বলে,
“কাঁদছো কেনো তুমি? অভিনয় ধরা পড়ে যাওয়ায় কাঁদছো? তোমার তো খুশি হওয়ার কথা। খুশি হও। হাসো তুমি। আনন্দের হাসি হাসো। আমার সন্তানকে জন্ম দেওয়ার আগেই মেরে ফেলেছো, তোমার তো অনেক দিনের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে; সেই খুশিতে হাসো।”
ফারিন দুর্বল কণ্ঠে ডাকলো, “আহসান..”
“তুমি এতটা জঘন্য ফারিন? এতটা খারাপ তুমি? তুমি শুরু থেকেই বলতে আমার সন্তান পেটে রাখবে না। আমি তো মনে করতাম মজা করতে। কিন্তু তুমি তো সত্যিই জন্মানোর আগেই ওকে মেরে দিলে!” আহসানের গলা কাঁপছে।
ফারিন দুদিকে মাথা নাড়ে। বলতে চাইলো ‘আমি তো প্রথম একমাস বলেছিলাম, তারপর কি আর বলেছি?’ কিন্তু ফারিনের কথা আটকে এলো। মুখ দিয়ে শব্দ বের হলো না। আহসান চেয়ারে সজোরে লাথি মেরে চেঁচিয়ে উঠে, বলে, “আরেহ ওটা তো তোমারও সন্তান ছিল ফারিন। মারলে কি করে ওকে? একবারও বুক কাঁপলো না? এতটা নিচ তুমি?”
ফারিন অসহায় চোখে আহসানের দিকে তাকিয়ে থাকে। আহসান ফারিনের চোয়াল শক্ত করে ধরে বলে,
“দেশে ফিরলে কি কি যেন বলতে তাই না? আমার সাথে থাকতে চাও না সেটা বলতে? সেই লোড নিতে পারতাম না আমি?”
ফারিন শ্বাস আটকে আসলো যেন। আঁটকে আঁটকে বলে,
“আহসান আমার কথা শোনো?”
আহসান আঙুল তাক করে বলে, “চুপ, একদম চুপ। তোমার কোনো কথা বলা সাজে না। তুমি একটা খুনি।”
আহসান ফারিনকে ছেড়ে ফ্লোরে বসে পড়লো। চুল খামচে ধরে চেঁচিয়ে বলে,
“আই জাস্ট হেট ইউ। আমার লাইফের বিগেস্ট ভুল তোমাকে বিয়ে করা। তুমি আমার লাইফের সবচেয়ে বড় ভুল। তোমাকে দেখে পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। আসলেই রূপ দেখে ভালোবাসা হয় না। তোমার বাহিরটা যতটা সুন্দর, ভিতরটা ততটাই নোংরা। বিয়েতে মত ছিল না তোমার, আমিও পরে গিল্টি ফিল করতাম জোর করায়। কিন্তু বিয়েটা ছাড়া তো আর কিছুতেই জোর করিনি তোমায়। সব করতে দিতাম। যখন ইচ্ছা বাইরে যেতে, যা ইচ্ছা করতে। কখনো বাঁধা দিয়েছি? একটুও ভালোবাসা যেতো না আমাকে? এতটাই বিরক্তকর আমি যে আমার সন্তানকেও মেরে দিলে?
আমি তোমার সাথে থাকবো না। তুমি আমার সন্তানকে খুন করেছো। তুমি জানতে বাচ্চাকাচ্চা আমার কতটা পছন্দের। তাও তুমি আমার বাচ্চাকে মেরে ফেলেছো। শুধু আমার সন্তান বলে মেরে ফেললে ফারিন? এত ঘৃণা তোমার? তোমার মতের বিরুদ্ধে গিয়ে বিয়ে করেছি বলে এভাবে প্রতিশোধ নিলে? এতটা স্বার্থপর তুমি? তোমার মতো মেয়ের সাথে আমি আর থাকবো না। অপাত্রে ভালোবাসা দান করেছি এতদিন আমি। তোমাকে ডিভোর্স দিবো আমি। তোমাকে জেলে দিবো আমি। তুমি একটা খুনি।”
ফারিন আহসানের দিকে তাকিয়ে থাকে। আহসান কিছুক্ষণ পাগলের মতো করে। ফারিন নিজের ভাগ্যের উপর হাসে। আহসান একটু শুনতো ওর কথা? ফারিন তো খুশি ছিল অনেক। সুখ কপালে চিরস্থায়ী হয় না কেনো? ওর কানে ফাতিমা বেগমের বলা কথাটা বাজছে,
“অভাগা যেদিকে যায়, সাগর সেদিকে শুকিয়ে যায়।”
চলমান…..
(হ্যাপি রিডিং….)

