আফরিন_আখ্যান #পর্ব_১২

0
37

#আফরিন_আখ্যান
#পর্ব_১২
#সমৃদ্ধি_রিধী

ফারিনকে দুদিন পর উত্তরার বাসায় আনা হয়। এই দুইদিনে আহসান আর ফারিনের মধ্যে কোনো প্রকার বাক্য বিনিময় হয়নি। ফারিন খাটে বসা ছিল। আহসান ফারিনের ওষুধ ভর্তি বক্স শব্দ করে বেডসাইড টেবিলে রাখে। ফারিন আহসানের দিকে তাকালে আহসান অন্যত্র মুখ ঘুরিয়ে নেয়। শার্ট খুলে ফুল হাতা টিশার্ট, ট্রাউজার নিয়ে অন্যরুমে চলে যায়। ফারিন তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে। এই তাচ্ছিল্য ওর নিজের ভাগ্যের উপর। খুব তো ভালো ছিল। তাও এমন কেনো হলো? ওষুধ খেয়ে গায়ে কম্বল টেনে শুয়ে পড়ে। এন্টিবায়োটিকের প্রভাবে ঘুম এলো। আর চোখ খুলে রাখতে পারে না।

আহসান এই রুমে আসে আরো ঘন্টা দুয়েক পর। ফারিনের দিকে তাকালোও না। ওয়াশরুমে চলে যায়। ফিরে এসে বেডের এক প্রান্তে বসে। মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘাড় বাঁকিয়ে ফারিনের দিকে তাকায়। কিন্তু টানা এক মিনিটও টানা তাকালো না ফারিনের দিকে। চোখ সরিয়ে নিল। মাথার চুল খামচে ধরে বড় বড় করে শ্বাস নেয়। ফের ফারিনের দিকে তাকায়। ফারিনের গায়ে কম্বল ছিল না বিধায় আহসান কম্বল টেনে দিলো।

আহসান উঠে ল্যাপটপ নিয়ে বসে। বাসায় থাকবে না ও। ফারিনকে দেখলেই রাগ উঠবে ওর। সেই রাগ থেকেই জঘন্য পর্যায়ের ঝামেলা হবে ফারিনের সাথে মুখোমুখি হলে। আহসান চায় না কোনোরকম ঝামেলায় জড়াতে। টাইপ করতে করতে আহসান তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে। ম্যারেজ ডে পালন করবে বলে এমন তাড়াহুড়ো করলো যে সিঙ্গাপুরের কাজটাও মিস হলো, জীবনের ছন্দও হারিয়ে গেল। আহসান নিজের কাজের একটা শিডিউল বানায়। সকালে বেরিয়ে যাবে। এক্সট্রা ডিউটি করে বাসায় ফিরবে। এখন আগের মতো বাসায় আসার তাড়া নেই।

আসলেই আহসান সকাল আটটায় বের হতো, রাত দশটা, সাড়ে দশটায় বাসায় ঢুকতো। আহসান বাসায় আসলেও কলিংবেল বাজাতো না। পাসওয়ার্ড দিয়ে দরজা খুলে সাড়াশব্দ বিহীন বাসায় ঢুকে পাশের রুমে চলে যেত। সেদিনের প্রায় সপ্তাহ পার হওয়ার পর আহসান যখন রাত দশটায় ঢোকে তখন ফারিন ওর মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। আহসান ফারিনকে দেখেও এড়িয়ে যেতে চায়। ফারিন ওকে ডাকলো।

“আহসান আমার কথা শোনো।”

আহসান একটুও পাত্তা দিলো না। বেডরুমে ঢুকে গেল। ফারিন আহসানের পিছন পিছন আসে। আহসান টাই খুলছিল।

“আহসান আমার তোমার সাথে কথা আছে।”

আহসান শার্ট খুলে ফেলে। ফারিন আহসানের হাত টানে।

“আহসান আমার তোমার সাথে কথা বলা প্রয়োজন।”

আহসান ঝাড়া মেরে ফারিনের হাত সরিয়ে দিলো।

“গায়ে হাত দিবে না একদম।”

“এখন এত লেটে আসো কেনো? তোমার অফিস টাইম তো আগেই শেষ হয়ে যায়।”

“যাই করি, তোমার মতো বাইরে গিয়ে ফুর্তি করি না।”

ফারিন চুপ করে রইলো। আহসান ওর দিকে তাকিয়ে বলে,

“ডিভোর্স চাও? সেটা বলবে?”

ফারিন আহসানের মুখের দিকে তাকিয়েই রইলো। মুখে রা নেই ওর। আহসান ভ্রু উঠিয়ে রাগী গলায় বলে,

“কি বলবে বলো? ডিভোর্স চাও, আমার সাথে থাকতে চাও না এটাই তো বলবে। জানা আছে আমার। তুমি একটা হাই লেভেলের স্বার্থপর মেয়ে। তোমার পক্ষে কি কি করা সম্ভব বুঝে গিয়েছি আমি। যে আমার সন্তানের খুনি তার কথা শুনতে আমার রুচিতে বাঁধে। তোমার মতো অভিনয় শ্রেষ্ঠ অভিনেতারাও করতে পারবে না। কতটা বোকা ছিলাম আমি! এত কড়া মাপের অভিনয় করো তুমি যে আমি অন্ধের মতো বিশ্বাস করে গিয়েছি। তোমার একটা খুনি। নিজের সন্তানের খুনি তুমি। থু।”

আহসান ওয়াশরুমে চলে গেল। ফারিন খাটে বসে পড়ে। আহসানকে বলতে যাবে না আর কিছু। ফারিন তো চেয়েছিল সব বলতে। নিজের দিক পরিষ্কার করে। কিন্তু যে নিজে নিজেই সব ভেবে নেয় তাকে ফারিন কি করে বোঝাবে সত্যিটা? কেনো কিছু বলতে যাবে? একটু পর আহসান ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে রুম থেকেই বেরিয়ে গেল। ফারিন আর গেল না কথা বলতে। দুজন দুইরুমে ঘুমায় এখন। ফারিন রাতের খাবার না খেয়ে অভ্যাস মতো লাইট নিভিয়ে শুয়ে পড়ে।

চোখের পানিতে বালিশ ভিজে যায়। আহসানকে আর নিজ থেকে কিছু বলতে যাবে না ও। আহসান নিজের ইগো নিয়ে থাকতে পারলে ফারিনও পারবে। এরপর থেকে ফারিনও আহসানের সামনে যেতো না, আহসান তো আরো আগে থেকেই ফারিনের মুখোমুখি হতো না। তবুও এক ছাদের থাকার দরুণ কখনো ড্রয়িংরুমে, কিচেনের সামনে দেখা হলেও দুজন একে অপরকে এড়িয়ে যেতো। পরে পরে আহসান বাসায় আসাই বন্ধ করে দিলো। ফারিন প্রথম দুদিন অনেক দুশ্চিন্তা করেছে। আহসানকে কল, মেসেজ করেছে। কিন্তু আহসান না কল রিসিভ করেছে, না মেসেজের রিপ্লাই দিয়েছে। পরে ফারিন আদৃতের সাথে কথা বলে জেনেছে আহসান আদৃতের বাসায় রাতে থাকে। ফারিনের ধীরে ধীরে নিজের জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা জমে।

এদিকে আহসান প্রতিদিন ভোরের দিকে পাসওয়ার্ড দিয়ে দরজা খুলে বাসায় ঢুকতো, ফারিন না বুঝতে পারে সেই মতো আবার বেরিয়েও যেতো। গাড়ির ড্রাইভারকে গিয়ে বাজার করে পাঠাতো, জয়তুন খালাকে দিয়ে ফারিনের ঔষধপত্রও কিনে পাঠিয়ে দিতো। বিকাশে ফারিনকে টাকা পাঠাতো, তবুও সামনাসামনি হতো না।

____________________

ছয়মাসের মতো সময় পার হয়ে গিয়েছে। আহসান ইজি চেয়ারে হেলান দিয়ে বসা। বাম হাতে পেপারওয়েট ঘুরাচ্ছে। আদৃত ওর মুখোমুখি চেয়ারে বসা। কফি মগে চুমুক দিয়ে বলে,

“এমপ্লয়িদের সাথে বাজে ব্যবহার করো কেনো এখন?”

“লুক হু টকস।”

“আমার মাথা গরম, হুটহাট ধমক দিয়ে ফেলি। কিন্তু তোমার তো তা নয়। আজকাল অনেক খারাপ ব্যবহার করো তুমি সবার সাথে। সাফওয়ান সিদ্দিক এত খারাপ না।”

“খারাপ না বলেই তো চামচিকাও লাথি মারে।”

“বাসায় যাবে না?”

পেপারওয়েটের দিকে তাকিয়েই বলে, “তোর বাসায় যাবো।”

“ভাইয়া আমার কথা শোনো।”

আহসান আদৃতের দিকে তাকালো। আদৃত বলে,

“তুমি দুইমাসের মতো আমার বাসায় থেকেছো। লাস্ট দুইমাসের উপর কাটিয়েছো ধানমন্ডিতে। ধানমন্ডি ব্রাঞ্চে তোমার কোনো দরকারই ছিল না। তাও ওখানে অযথাই পড়ে ছিল। প্লিজ এখন আর ইগো না দেখিয়ে তোমার উচিত ভাবির সাথে কথা বলা। চার, পাঁচ মাস এভাবে কাটিয়ে লাভ কি হচ্ছে? একটা কিছু তো করাই উচিত তাই না?”

“তোর বউ তোকে না জানিয়ে তোর বাচ্চা অ্যাবোরশন করালে তুই কি করতি?”

আদৃত চুপ করে যায়। আহসান বলে, “ও আমাকে ডিভোর্স দেওয়ার জন্য তোড়জোড় করেছিল। তারপর যখন দেখলো ও প্রেগন্যান্ট, তখন মাথায় বাড়ি পড়ে। আমাকে না জানিয়েই অ্যাবোরশন করে ফেললো। ও আসলে কি ভেবেছিলো জানি?”

“কি?”

“আহসান তো আরো মাসখানেক পরে আসবে। ও আসার আগেই সব হাইড করতে হবে। প্রেগন্যান্সি, অ্যাবোরশন এই ব্যাপারগুলো সম্পর্কে তাহলে জানতেই পারবে না। তাই মেরে দিলো। প্ল্যান কিছুটা এমন ছিল- অ্যাবোরশনের বিষয়টা খুব সূক্ষ্মভাবে গোপন রেখে আমাকে ডিভোর্স লেটার ধরিয়ে দিতো, আমিও বেকুব হয়ে যেতাম। ভাগ্যিস সেদিন এসেছিলাম, নাহলে এইসব ছলচাতুরী কি করে দেখতে পেতাম?”

“ভাইয়া ভাবির সাথে একবার সামনাসামনি কথা বলে দেখলে হয় না?”

“তোর ওয়াইফ তোর সাথে এমন করলে তুই কি করতি?”

আদৃত ফোঁস করে শ্বাস ফেলে আবারও কফি মগে চুমুক দেয়। আহসান বলে, “বল কি করতি তোকে না জানিয়ে তোর সন্তানকে মেরে ফেললে?”

“হয়তো ডিভোর্স দিয়ে দিতাম।”

“সেটাই আদৃত সেটাই। এক্সিডেন্টলি মিসক্যারেজ হওয়া আর ইচ্ছাকৃত মেরে ফেলায় অনেক পার্থক্য আছে। ও ইচ্ছাকৃত মেরেছে। নার্সদের কথাও তো শুনেছিলি না?”

আদৃত মুখ খোলার আগেই আহসান হেসে উঠলো।

“ওর বাবা মা ওকে গ্রহণ করবে না বলে দিয়েছে। তাই আমিও ডিভোর্স দিচ্ছি না। কি দয়ালু আমি ভাবা যায়? আমি ছেড়ে দিলে, মা বাবা গ্রহণ না করলে কোথায় যাবে? তাছাড়া আমি ওকে ছেড়ে দিলে তো ওর উদ্দেশ্য সফল হয়ে যাবে। আমি আমার সন্তানের খুনিকে কিছুতেই সুখে থাকতে দিবো না।”

“ভাইয়া তাও?”

“ওর চেহারা দেখতেও আমার রুচিতে বাধে। আমার ওর সাথে কথা বলার মতো ইচ্ছাশক্তি নেই।”

“দুজনে বসে একটু কথা বলে দেখতে?”

আহসান চেয়ার থেকে উঠে গেল। “আল্লাহ তোকে সন্তান হারানোর মতো কষ্ট না দিক। যখন শুনবি মানুষ বলছে তোর সন্তান নষ্ট হয়ে গিয়েছে, তোর সন্তান পৃথিবীর আলো দেখার আগেই বিদায় গিয়েছে, ভ্রূণ অবস্থায় মরে গিয়েছে, মানুষ ওটাকে নষ্ট নষ্ট বলছে, তখন সেই কষ্ট কাউকে বলার মতো থাকে না। না পারবি সহ্য করতে, না পারবি চিৎকার করে কাঁদতে।”

“কিন্তু তাও..”

“আঘাত নিজে না পেলে বোঝা যায় না সেই আঘাতে ঠিক কতটা ব্যথা হয়। বাবা হো, বুঝবি।”

আদৃত চুপ করে বসে থাকে। আহসান জানালার পর্দা সরিয়ে রাস্তার দিকে তাকায়। লাঞ্চ টাইম এখন। ও পকেটে হাত গুঁজে বাইরে তাকিয়েই থাকে। আদৃত কফি শেষ করে উঠে দাঁড়ায়।

“তাও একবার ভেবে দেখো। তুমি সবসময় ঠান্ডা মাথায় কাজ করো। আমাদের মতো হঠকারিতা তোমার সাথে মানায় না।”

আদৃত বেরিয়ে গেল। আহসান বাইরের দিকে তাকিয়ে নিজের জীবন নিয়ে ভাবতে থাকে। ফারিনের প্রথম প্রথম বলা কথাগুলোর সাথে তো ওর মায়ের কথা পুরো মিলে গিয়েছে। তাছাড়া নিজের মা যখন এভাবে বদনাম করলো, অবশ্যই ঘরে অনেক উৎপাত করেছে বলেই অতিষ্ঠ হয়ে ওগুলো বলতে বাধ্য হয়েছে? আহসান কেবিনের দরজা লক করে চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে রাখে। নিজের জীবন নিয়ে ভাবতে ভাবতে সব কথা কানে বাজে,

“তোমার বাচ্চা জন্ম নেওয়ার আগেই মেরে ফেলবো।”

“বাবা ও চায়নি তোমার বাচ্চা জন্ম দিতে। তাই ইচ্ছে করে বাচ্চা মেরে ফেললো। কত নিষেধ করেছি, শুনলো না। তোমার সাথে ওর সংসার করার ইচ্ছে ছিল না, তাই ডিভোর্স দেওয়ার চিন্তাভাবনা করেছে।”

“ম্যাডাম তো কোটে দৌড়াদৌড়ি করছে একমাস।”

“আগুন সুন্দরী, দেখুন গিয়ে স্বামীকে না বলে অ্যাবোরশান করে ফেলেছে।”

আহসান চোখ খুলে টেবিলে হাত ঠেকিয়ে মুখ চেপে ধরে। ফারিন সাতদিন আগে দুই তিনবার কল দিয়েছিল। আহসান রিসিভ করেনি। তারপর থেকে ফারিনও কল দেয়নি আর। আহসানের মাথা ব্যথা উঠে যায়। চুল টেনে ধরে। এই মানসিক অশান্তি নিতে পারছে না ও। ও মুখে হাত চেপে ভাবতে থাকে আসলেই ফারিনের সাথে কথা বলা উচিত। ও পারছে না এই মানসিক অশান্তি সহ্য করছে। দুর্বিষহ লাগছে জীবন। আহসান উঠে দাঁড়ায়।

কেবিন থেকে বের হতেই দেখে আদৃত আসছে। আহসান দাঁড়িয়ে গেল। আদৃত এসে বলে,

“ভাবি আমাকে কল করেছিল।”

“কেনো?”

“তোমাকে যেতে বলেছে বাসায়।”

“দেখি।”

“আমি ভাবিকে বলেছি তুমি আজকে তোমার বাসায় যাবে।”

“দেখি।”

আহসান বড় বড় পা ফেলে বাইরে বেরিয়ে গেল। গাড়ি নিয়ে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ালো। ফারিনের সাথে আজ দেখা হয় না, কথা হয় না চারমাসের মতো। ফারিনকে ও নিজেও করে না, ফারিন প্রথম প্রথম কল করলেও রিসিভ করতো না, আর এখন কলও করে না। আর বাসায়ও যায় না অনেকদিন। ফারিনের সাথে সামনাসামনি কথা বলবে ও। হয় এস্পার নাহলে ওস্পার।

তখন সাতটার মতো বাজে। আহসান বাসায় যাওয়ার পথে নাইটক্লাবের সামনে জ্যামে পড়ে। এসি বন্ধ করে জানালার খুলে বাইরে তাকায়। ওয়েদারটা খুবই বাজে। আহসানের সামনের গাড়ি একটু এগোলে আহসানও গাড়ি এগোয়। ঘাড় বাঁকিয়ে বামপাশে চোখ পড়তেই ওর চোখ আটকে গেল। ভীষণ অবাক হলো। ফারিন নাইটক্লাবের অপজিটে একটা লোকের সাথে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। মনের ভুল মনে করে আহসান ভালো মতো লক্ষ্য করে দেখে আসলেই ফারিন। আহসানের শাওনের বলা কথাগুলো মনে পড়ে,

“আপনার অফিস টাইমে বাইরে গিয়ে ঠিকই ফুর্তি করে। আপনি জানেন না।”

ফারিন লোকটার কথায় হেসে উঠলো। আহসানের কপালের রগ ফুলে উঠলো। আজকে চারমাসের মতো আহসানের সাথে ফারিনের দেখা নেই। একটুও অনুশোচনা আছে ওর? সন্তান হারিয়েছে চেহারা দেখলে কেউ বলবে? আহসান তাকিয়েই রইলো। ফারিন আরো কিছুক্ষণ কথা বলে লোকটাকে বিদায় জানিয়ে হাঁটা দেয় সামনের দিকে।

আহসান সিটে মাথা এলিয়ে দেয়। অনেকক্ষণ ধরে ভাবলো। না পারবে না ও আর ফারিনের সাথে থাকতে। মনকে বোঝালেও ও মানসিক শান্তি পাবে না ফারিনের সাথে থাকলে। ফারিনকে ডিভোর্স দিয়ে দিবে ও। ফারিনের চিন্তা আর করবে না ও। আহসানের মানসিক শান্তির প্রয়োজন। ফারিনের যাওয়ার জায়গার অভাব হবে না। জ্যাম ছাড়লে আহসান গাড়ি ঘুরিয়ে নেয়। ডিভোর্স দিবে ও ফারিনকে। বাসায় যাবে না ও। গেল একটা বারে।

_____________

রাত সাড়ে এগারোটা বাজে। ফারিন ঘরের এপাশ থেকে ওপাশে পায়চারি করছে। আদৃত তো বলেছে আজ আসবে। তাহলে আসছে না? আহসান দেরীতে আসবে ও জানতো। কিন্তু কখনোই এত রাত হয় না আসতে। ও জেসমিনকে কল করেছিল। ধানমন্ডিও যায়নি। ফারিন ফের আহসানকে কল করে। রিং হয়ে কেটে গিয়েছে। ফারিনের খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছে। ও বিছানায় গিয়ে বসে। কপালে মৃদু মৃদু ঘাম জমেছে। ও হাত বাড়িয়ে কপালে ঘাম মুছে আদৃতের নাম্বার খুঁজে। আদৃতকে কল করে জিজ্ঞাসা করতে হবে নিচে আছে কিনা।

ফারিন ড্রয়িংরুমে এসে আদৃতকে কল করে। আদৃতের ফোন সুইচ অফ। ফারিনের এত রাগ লাগছে। ও সোফায় বসা মাত্র কলিংবেল বেজে উঠলো। ফারিন তড়িঘড়ি করে উঠে। দরজা খুলে দেখে আদৃত আহসানকে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ফারিন আহসানকে দেখলো কতদিন পর। কিন্তু আহসানকে দেখামাত্রই বুঝে যায় ও ড্রিংকস করেছে। ফারিন এইসব মাতলামোর সাথে বহুদিন যাবৎ পরিচিত। ও আদৃতকে ঢোকার পথ করে দেয়।

আদৃত জুতা খুলে বাসায় ঢুকলেও আহসানের সেই অবস্থা নেই। আহসানকে জুতা পায়েই ওদের বেডরুমে রেখে আদৃত সোজা বেরিয়ে যায়। ফারিন দরজা লাগিয়ে বেডরুমে আসে। আহসান হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে। ফারিন আহসানের পায়ের জুতা খোলে। আহসানের মাথার কাছে গিয়ে ব্লেজারে হাত রাখলেই আহসান চোখ খুলে তাকায়। ফারিনের সাথে আজ বহুদিন ওর চোখাচোখি হলো। ফারিন ব্লেজারের বোতাম খোলায় মনোযোগ দেয়। ফারিন আহসানকে অনেক কষ্টে উঠে বসাতেই আহসান ফারিনের হাত ধরে। ওর হাত টেনে নিজের কাছে আনে।

“নিজের বাচ্চাকে মেরে ফেলতে একটুও কষ্ট হয়নি?”

ফারিনের বুক হু হু করে ওঠে। আহসান গা দুলিয়ে হেসে উঠে। হাতের ইশারা দিয়ে বলে, “ছোট্ট একটা বাচ্চা হতো। হয়তো কয়েকদিন পর আমার কোলে থাকতো? তোমার জন্য ও বাঁচলো না। তুমি না মা? তোমার না গর্ভে ছিল ও? কিভাবে মারলে? বলো কষ্ট হয়নি?”

ফারিন অনুভূতি শূন্য হয়ে তাকিয়ে থাকে। আহসান হো হো করে হাসে। “তোমার আসলে মা হওয়ারই যোগ্যতা নেই, তাই ও তোমার কোলে আসেনি। আমার মতো বোকামি করেনি। আমি তো অপাত্রে ভালোবাসা দান করে ফেঁসে গিয়েছি।”

“আমার কথা শুনলে কি হতো?”

“তোমার মতো স্বার্থপর মেয়ের কথা শুনবো কেনো আমি? আগে তোমার অনেক কথা শুনেছি, তুমি ছাড়াও বাকি সবার কথা শুনেছি। সব তো মিলে যায়। নার্সদের কথাও মিলে যায়।”

ফারিন অবাক হয়ে বলে, “কোন নার্স?”

“পাঁচ সপ্তাহের ভ্রূণ মেরে ফেললে?”

ফারিন আহসানের কপাল চেপে ধরে। “কিসের কথা বলছো? কিসের পাঁচ সপ্তাহ? এই?”

আহসান হো হো করে হেসে ওঠে। “আমি একটা পাষাণ খুনিকে ভালোবেসেছিলাম।”

ফারিন রাগে ফেটে পড়লো। আহসানের বুকে ধাক্কা দিয়ে বলে, “তুমি আমাকে ভালোই বাসোনি। ভালো বাসলে আমার কথা শোনার প্রয়োজনীয়তাবোধ করতে। ভালোবাসেছো বলে ভালাবাসাকে অপমান করো না আহসান।”

আহসানের চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠলো। ফারিনের দুই কাঁধে হাত রেখে ওকে নিজের কাছে নিয়ে আসে। কিঞ্চিৎ দুরত্ব নেই ওদের মধ্যে। আহসান হিসহিসিয়ে জড়ানো গলায় বলে,

“ভালোবাসার কি বোঝো তুমি? বুঝলে নিজের বাচ্চাকে মেরে ফেলতে? আমার অফিস টাইমের সুযোগ নিয়ে এর ওর সাথে ঘুরে বেড়াতে? ফুর্তি করতে পারতে বাইরে গিয়ে? আমি দেখিনি তোমাকে? আমিও তো দেখেছি।”

ফারিনের সহ্য হলো না এইসব কথা। ও আহসানকে ধাক্কা মেরে চলে যেতে নিলে আহসান ফারিনের হাত টেনে নিজের কাছে এনে বলে,

“কিসের তেজ দেখাচ্ছো? কার তেজ দেখাচ্ছো তুমি? লজ্জা লাগে না তেজ দেখাতে?”

“ছাড়ো আমাকে।”

আহসান ফারিনকে চেপে ধরে। “না ছাড়লে কি করবে তুমি? নতুন মানুষের কাছে যাবে? যেতে দিবো না৷ সুখে থাকতে দিবো না তোমায়।”

“আহসান ছাড়ো আমাকে।” ফারিন চেঁচিয়ে ওঠে।

আহসানের শরীরে দানবীয় শক্তি ভর করেছে যেন। ফারিনকে বিছানায় ফেলে ওর উপর চড়াও হলো। গাল চেপে ধরে বলে,

“কিসের এত অহংকার তোমার? হ্যাঁ কিসের অহংকার? সুন্দর হওয়ার?”

ফারিনের নাকে অনেক গন্ধ লাগে, বমি পায়। ও মুখ ঘুরিয়ে নিজেকে ছাড়াতে চায়। আহসান টললেও ফারিনকে ছাড়ে না। ফারিন আবারও বলে,

“ছাড়ো আমাকে।”

“ছাড়বোও না, আগের মতো ভালোবাসবোও না। গলা কাটা মুরগির মতো তড়পাবে তুমি। পৈশাচিক আনন্দ পাবো আমি তখন।”

ফারিন আহসানে ধাক্কা দেয়। আহসান নড়েচড়ে উঠেলেও ফারিনের হাত বিছানার সাথে চেপে গলায় মুখ গুঁজে। ঘাড়ে দাঁত বসিয়ে রাগ নিবারণ করার চেষ্টা করছে। ফারিন হাজারও চেষ্টা করলে ওকে ছাড়াতে পারে না।

চলমান…..

(হ্যাপি রিডিং..)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here