আফরিন_আখ্যান #পর্ব_১৩

0
42

#আফরিন_আখ্যান
#পর্ব_১৩
#সমৃদ্ধি_রিধী

আজ শনিবার। অফিস থাকলেও আহসান গলা অব্দি কমফোর্টার গায়ে দিয়ে শুয়ে আছে। দুপুর একটা বাজে তাও ওঠার নাম নেই। মেজাজ ভীষণ খারাপ, রাগ সপ্তম আকাশ ছুঁয়েছে যেন। মনে মনে একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফারিন মাত্র বাইরে থেকে বাসায় ফিরলো। রুমে এসে গা থেকে ওড়না খুলে ওয়াশরুমে চলে যায়। চোখে-মুখে পানি ছিটিয়ে বের হতেই দেখে আহসান বসে আছে। আহসান ফারিনের দিকে এক ভ্রু উঁচু করে তাকালেও ফারিন সেদিকে নজর দিলো না। ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ফ্রিজ থেকে তেঁতুল বের করে টেবিলের সামনে চেয়ার টেনে বসে। আমের আচার আগে থেকেই টেবিলে রাখা ছিল। ও পালাক্রমে তেঁতুল, আমের আচার খেতে থাকে। আহসান তখন ড্রয়িংরুমে আসে।

ফারিনের মুখোমুখি চেয়ার টেনে বসে বলে,

“তোমার সাথে আমার গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।”

“আমারও আছে।”

“আমারটা বেশি ইম্পর্টেন্ট।”

“আমারটাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।”

বলে ফারিন ঘরে চলে গেল। আহসানও পাশের রুমে চলে যায়। সেই রাতের প্রায় দুইমাস কেটে গিয়েছে। সেই রাতের আগে ফারিন আহসানের সাথে নিজ থেকে টুকটাক কথা বলতে চাইতো, বাসায় ফিরতে দেরী হলে কল করতো, মেসেজ দিতো। কিন্তু সেই রাতের পর থেকে ফারিন নিজ থেকে আহসানের সাথে প্রয়োজন ছাড়া একটা টু শব্দ অব্দি করে না। ফারিন সাইড ব্যাগ থেকে প্রেগন্যান্সি রিপোর্ট বের করে ড্রয়িংরুমে যায়।

আহসান ডাইনিং টেবিলে ঠোঁটের কাছে আঙুল ঠেকিয়ে বসে আছে। ফারিন ওকে দেখে মনে মনে ভাবছে আহসান যদি নিজের ভুল বুঝতে পেরে ওকে এতদিন এত উল্টাপাল্টা কথা বলার জন্য সরি বলে, এতদিন ধরে ফারিনকে ভুল বোঝার জন্য অনুতপ্ত বোধ করে তাহলেও ফারিন কথা বলবে না। কয়েকদিন নাকানিচুবানি অবশ্যই খাওয়াবে। তারপর সব ঠিক হলে হোক গিয়ে। ফারিন তো আহসানকে ভালোবেসে ফেলেছে, তাই আহসানকে অন্যদের মতো ইগো দেখিয়ে ছাড়তে পারবে না। আহসান মন থেকে সরি বললে অবশ্যই এক্সপেক্ট করবে, কিন্তু আহসানকে তা বুঝতে দেবে না। অনেক কষ্ট পেয়েছে আহসানের ব্যবহারে ও, কত রাত কেঁদেছে, শারীরিক, মানসিক যন্ত্রণায় ভুগেছে তা বলে বোঝানো যাবে না। কিছু না শুনেই খুনি খুনি বলে চেঁচানোর ফল ভুগিয়ে ছাড়বে। কিন্তু বোকা ফারিন জানেই না আহসান ডিভোর্স পেপার অব্দি রেডি করে ওকে সেই কথা জানানোর কথা ভাবছে।

ফারিন আহসানের মুখোমুখি বসে। আহসানের সামনে একটা খাম। ফারিনকে দেখে আহসান বলে,

“আগে তুমি বলবে নাকি আমি?”

“আমি।” বলে ফারিন রিপোর্ট আহসানের দিকে বাড়িয়ে দিলো। আহসান রিপোর্ট খুলে দেখে। পুরোটা পড়তেই চোখের দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল। ফারিনের দিকে চোখ তুলে বলে, “ইজ ইট ট্রু?”

“ফেক রিপোর্ট মনে হচ্ছে?”

“করতেও পারো। তোমাকে আমি বিশ্বাস করি না।”

ফারিন নির্লিপ্ত চোখে আহসানের দিকে তাকায়। আহসান এমনটা বলতে পারলো? ফারিন যেখানে ভেবেছিল আহসান খুশি হবে বা অন্য কোনো রিয়েকশন দিবে। অন্তত বোঝাপড়ার আলাপ করতেই পারতো? তা না করে ও এইভাবে, এই টোনে কথা বললো? ফারিন নিজের হাত খামচে ধরে। নিজের অনুভূতিকে বরাবরের মতো পিষে ফেলে। ভাবলেশহীন কণ্ঠে সুধায়,

“তুমি কি যেন বলতে?”

আহসান চোখ নামালো। উঠে দাঁড়ায়। “কিছু না।”

টেবিলে থাকা খামের দিকে ইশারা দিয়ে বলে,

“কিসের খাম এটা?”

আহসান খাম নিয়ে নেয়। “তেমন কিছু না। অফিসিয়াল কাগজ।”

আহসান ঘরের দিকে পা বাড়ালে ফারিন উঁচু গলায় বলে, “অবিশ্বাস করা যখন শুরু করেছোই তাহলে কি এখন এটাও মনে করছো বাচ্চাটা তোমার না?”

আহসানের পা থেমে গেল। কিন্তু ফারিনের দিকে তাকালোও না। দ্রুত হেঁটে ঘরে চলে যায়। ফারিন মুখ চেপে ধরে। অযথা কাঁদতে চায় না ও। তাও কান্না পাচ্ছে, অনেক কান্না পাচ্ছে। ফারিন তো জানে পুরুষ মানুষের সংসারের প্রতি, বউয়ের প্রতি বেশিদিন মায়া থাকে না। তাও কেনো এতদিন যাওয়ার পরও ফারিন আহসানের এই ব্যবহার মানতে পারছে না? আহসান সেদিন কেমন জোরজবরদস্তি করলো! আহসান তার আগে থেকেই কেমন কুকুর ছাগলের সাথে বিহেভিয়ার করে ওর সাথে! মাথার উপর ছাদ না থাকলে একটা মেয়ের এতটা খারাপ পরিণতি হয়? ফারিন ধাতস্থ হলো অনেকটা সময় পর।

চোখ মুছে উঠে দাঁড়াতেই মাথা চক্কর কেটে উঠলো। দ্রুত বসেও পড়ে। আহসান তখন ফারিনের সামনে আসে। রুক্ষ, কর্কশ গলায় বলে,

“বিকালে রেডি থেকো। আমরা ডাক্তারের কাছে যাবো।”

“প্রয়োজন নেই।”

“আমাকে শিওর হতে হবে।”

“কি বাচ্চাটা তোমার কিনা?”

“না, বাচ্চা আসলেই আছে কিনা।”

“আমি মিথ্যে বলছি?”

“সংসার বাঁচাতে বলতেও পারো।”

“তোমার মতো নিকৃষ্ট লোকের সাথে যেন কোনো মেয়ে কখনো নিজেকে না জড়ায়।”

ফারিন সমস্ত রাগ ঝেড়ে বেডরুমের দিকে পা বাড়ালে আহসান নিজ অবস্থানে দাঁড়িয়ে থেকেই বলে,

“এটলিস্ট আমি নিজের বাচ্চাকে নষ্ট করে ফেলিনি।”

ফারিন দাঁড়ালো না। রুমে গিয়ে শব্দ করে দরজা লাগিয়ে দেয়। কতটা সময় ধরে কাঁদল সেই হিসেব ফারিন দিতে পারবে না। ফারিন সেদিন ডাক্তারের কাছে যায়নি। আহসানও আর জোর করেনি। কিন্তু পরদিনই নিজের গাইনি কাজিনকে বাসায় নিয়ে আসে। দরজার আড়াল থেকে ওদের কথা শুনে শিওর হয় ফারিন সত্যিই প্রেগন্যান্ট। আহসান ডিভোর্স পেপার পুরো হাওয়া করে দিলো। ডিভোর্স দিয়ে অনাগত বাচ্চার ভবিষ্যৎ নষ্ট করতে পারবে না ও। একটা বাচ্চা না মা ছাড়া থাকতে পারবে, না বাবা ছাড়া থাকতে পারবে৷ আহসান এই বিষয়ে কথা তুললোও না।

কিন্তু সম্পর্কে যখন একবার ইগো ঢুকে পড়ে তখন ধীরে ধীরে একটা সুস্থ সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়। ফারিনের সাথে আহসানের সম্পর্ক ক্রমশ ফ্যাকাসে হয়ে পড়ছে। দিন যায়, সপ্তাহ যায়, মাস যায়। মাসকে মাস দুজনের কথা হয় না। ফারিন পুরোপুরি আহসানের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। আহসানও তেমন কথা বলে না। দুরত্বে থাকতে থাকতে এতটাই দুরত্ব সৃষ্টি হয়েছে আহসান চাইলেও ফারিনের সাথে প্রয়োজনীয় দুটো কথার বেশি তিনটা কথা বলতে পারতো না। ফারিনের পেট বড় হতে থাকলেও আহসান সংকোচবোধ করতো ফারিনের পেটে হাত দিয়ে নিজের সন্তানকে স্পর্শ করতে। তাই তো ফারিন ঘুমিয়ে গেলেই লুকিয়ে লুকিয়ে ফারিনের পেটে হাত বোলায়। সন্তানকে অনুভব করতে চায়।

‘শরীর কেমন আছে?’ ‘ভালো।’ এর বেশি দিনে কোনো কথা দুজনের হতো না। আহসান খুঁজে পেতো না কিছু বলার মতো। তবে আহসানের ডেস্কের নিচের ড্রয়ার ছোট ছোট ছেলেমেয়ের পোশাকে ভরে গিয়েছে। আহসান জানে না ওর নবাগত সন্তান ছেলে নাকি মেয়ে। তাই ছেলেমেয়ে দুজনের জন্যই জামা কিনেছে। একটা ওয়াকার পছন্দ করে রেখেছে। ছোট ছোট খেলনা কিনেছে। বাবু হয়ে গেলেই নিশ্চয়ই সব ভালো হবে। আহসান বাবু হলে ফারিনের সাথে আবার আগের মতো কথা বলা শুরু করবে।

______________

রাত আড়াইটার বেশি বাজে। ক্রমাগত আসা খুটুর নাটুর শব্দে আহসানের ঘুম ভেঙে গেল। আহসান কপাল কুচকে উঠে বসে। বালিশের পাশ থেকে চশমা নিয়ে পড়ে নেয়। গায়ের টিশার্ট টেনেটুনে রুম থেকে বেরিয়ে দেখে ড্রয়িংরুমের, কিচেনের লাইট জ্বালানো। আহসান কপাল কুচকে কিচেনে যায়। ফারিন ইউটিউবে ভিডিও চালিয়ে ফুচকার খোল ভাজছে।

আহসান কিচেনের দরজার সামনে দাঁড়িয়েই দেখে পাশেই দুটো বোলের একটার মধ্যে তেঁতুল ভিজানো। আরেকটায় আলু, চটপটির বুট, ডিম সিদ্ধ করে রাখা। ফারিন অনেকগুলো ফুচকা ভেজে চুলা নেভায়। ফ্রিজ থেকে ধনিয়া পাতা বের করে কাটে। আহসান বুকে হাত গুঁজে দেখতে থাকে। ফারিন সময় নিয়ে মশলাপাতি দিয়ে ফুচকার ভিতরের পুর বানালো। আহসান গুনে দেখলো পাঁচটাও বেশি মরিচ দিয়েছে ফারিন। এত মরিচ যে দিলো বোকার মতো! ঝালে খেতে পারবে আদৌ? ফারিন ফুচকা বানিয়ে ডিম গ্রেট করে পিছনে ঘুরতেই আহসানকে দেখে মারাত্মক ভয় পেলো। রীতিমতো বুক কাঁপছে ওর। বুকে হাত চেপে বড় বড় শ্বাস ফেলে ধাতস্থ হতেই আহসান তীক্ষ্ণ গলায় বলে,

“রাত বিরাতে এইসব কি তামাশা?”

ফারিন উত্তর দিলো না। প্লেট নিয়ে ডাইনিং টেবিলে বসে। গ্লাসে পানি ঢালে। আহসান ফারিনের পিছন পিছন আসে। আহসান টেবিলে হাত রেখে বলে,

“ঘুমাও না কেনো রাতে? আর এইসব কি খাচ্ছো? তুমি কি ইচ্ছে করে অসুস্থ হতে চাও? বাচ্চাটা পৃথিবীতে ঠিকঠাকভাবে আসুক চাও না?”

ফারিন সত্যি বলতে আহসানের কথাকে দুই পয়সার দামও দিলো না। ও মনোযোগ দিয়ে ফুচকা খেতে থাকে। ভাবখানা এমন আশেপাশে কেউ নেই।

“কথার উত্তর দিচ্ছো না কেনো?”

ফারিন উত্তর দিলো না। আহসান রাগ উঠলো। এক গ্লাস পানি খেয়ে রুমে চলে যায়। আহসান সামনে থেকে যেতেই ফারিন এবার শান্তি চেয়ারে বসে প্লেট হাতে নিয়ে খেতে থাকে। আহসানকে দেখলেই এখন ওর বিরক্ত লাগে, খুব মেজাজ খারাপ হয়৷ একজন অপরিচিত মানুষের সামনে মেয়েরা যেমন গুটিয়ে থাকে, ফারিনও আহসানের সামনে সেভাবে থাকে।

সন্ধ্যা থেকেই অনেক ফুচকা খেতে ইচ্ছে করছিলো। কিন্তু ওকে এনে দিবে কে? জয়তুন খালার জন্য অপেক্ষা করার মতো ধৈর্য নেই। তাই রাত একটা থেকেই টুকটুক করে বানিয়ে এখন খাচ্ছে। একটুও ভালো হয়নি। মশলা, ধনিয়ার পরিমাণ কম বেশি হওয়ায় একটুও ভালো লাগছে না খেতে। তাও ফারিন সবগুলো খেলো। নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো।

খাওয়া শেষ হতেই ফারিন আস্তেধীরে উঠে দাঁড়ায়। প্লেট বেসিনে রেখে লাইট নিভিয়ে সোফায় এসে বসে। টিভি চালায়। আহসান আবারও ওর সামনে আসে। বেডরুমের দিকে আঙুল তাক করে বলে,

“ফারিন ঘুমাতে যাও। এখুনি।”

ফারিন পাত্তাই দিলো না। পেটে হাত চেপে টিভির চ্যানেল ঘুরাতে থাকে। দেখার মতে কিছু পায় না। আহসান ফারিনের হাত থেকে রিমোট ছিনিয়ে নিলো। টিভি বন্ধ করে দিয়ে বলে,

“ঘুমাতে যাও ফারিন। মাঝরাতে মেজাজ খারাপ করো না।”

ফারিন আহসানের দিকে তাকায়। আহসান রুক্ষ গলায় বলে, “এভাবে তাকাচ্ছো কেনো তুমি? অনিয়ম করে চলে ইচ্ছে করে নিজেদের ক্ষতি করতে চাও তাই না?”

ফারিনের আহসানকে এতটাই বিরক্ত লাগে, ইদানীং ওর ইচ্ছে করে না আহসানের কথা শুনতে বা আহসানের সাথে কথা বলতে। কিছুমাস আগেও যেখানে আহসানের বাসায় ফিরতে দেরী হতো বলে ফারিনের চিন্তা হতো, সেখানে আহসান এখন তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরলে ওর মেজাজ খারাপ হয়। মানুষের দয়া দেখতে ইচ্ছে করে না একটুও। তাইতো আহসান ওকে যে ঢোলা ঢুলা মেক্সি এনে দিয়েছে সপ্তাহ আগে, ওগুলো পুরো ইনটেক জয়তুন খালাকে দিয়ে দিয়েছে। আহসানের একটা সুতা দেখতেও ফারিনের ইচ্ছে করে না।

এইযে প্রেগন্যান্সির আট মাস চলে, শুধু ফারিন দুইবার চেকবার করেছে। যেখানে কিছু জটিলতার জন্য ওর একমাস পর পর চেকআপ করা উচিত ছিল। সেই দুইবারও কলভদ্রে এসেছে। আহসান যখন ধানমন্ডির কাজে ব্যস্ত হয়ে উত্তরা আসতে পারতো না, তখন গিয়ে নিজে দেখিয়েছে। ফাতিমা বেগম ফারিনকে বোঝায় মেয়েদের এত অভিমান করতে নেই। আহসানের সাথে মিলেমিশে থাকার পরামর্শ দেয়। ফারিন কেবল মনে মনে হাসে। অভিমান কার উপর করে মানুষ? আপনজনদের উপরই তো। ফারিনের কি আপন বলতে কেউ আছে পেটেরটা ছাড়া?

ফাতিমা বেগম যাকে আপন বোঝাতে চেয়েছে সে আদৌ আপন? সে বাচ্চাটার কিছু হয় আদোও? আটমাস চলে, একদিনও পেটে হাত রেখেছে? বাচ্চার মুভমেন্ট ফিল করতে চেয়েছে? ফারিনকে এসে কোনোদিন জিজ্ঞাসা করেছে তোমার কি কিছু খেতে ইচ্ছে করে? ফারিনের পায়ে পানি জমে পা ফুলে গিয়েছে। একদিন এসে জিজ্ঞাসা করেছে তোমার কি হাঁটতে কষ্ট হয়? কত রাত ঘুমায় না ফারিন। সে আদৌ জানে ফারিনের যে রাতে ঘুম হয় না? উহু জানে না। এক ঘরে থাকলে না জানতো? খালি জন্ম দিতে পারলেই হয় না? নিজের পুরুষত্ব খাটিয়ে একটা বাচ্চা স্ত্রীর গর্ভে দিলেই বাবা হওয়া হয়ে যায় না?

আহসানকে ফারিন অন্যরকম ভেবেছিল। কিন্তু ফারিন তো শ্রেষ্ঠ বোকা মেয়ে। ও কি করে বিশ্বাস করলো ওকে? সবাই এক। হাতের পাঁচ আঙুল সমান না হলেও ফারিনের আশেপাশের সবাই এক। ফারিন কপালে ভালো কিছু আনেনি। আহসানকে ভালোবেসে ফেলেছিল ও। কিন্তু এখন বাসে না। ফারিন তো ফাতিমা বেগমকে বলতে পারে না আহসানের প্রতি সেই রাতেই মায়া মহব্বত উঠে গিয়েছিল যে রাতে আহসান জোর খাটিয়েছিল ওর উপর। লাইক অ্যা.. এই সন্তান সংসার পরিপূর্ণ করার জন্য আসছে না, ওর বাবার বাচ্চাকাচ্চা পছন্দ বলে আসছে না, আসছে নেশাগ্রস্ত অবস্থার ভুল হিসেবে।

ফারিন আর ভাবলো না। এইসব ভাবনা এখন ওকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়। প্রেগন্যান্সির চারমাসেও যখন পেট দেখে আহসান বুঝতো না ফারিন আদতেই প্রেগন্যান্ট কিনা তখন সন্দেহের বশে খুবই বাজে টোনে প্রশ্ন করেই ফেলেছে ফারিনের গর্ভে সন্তান আছে কিনা? নাহলে বোঝা যায় না কেনো? কথার লেজ ধরে আরো দুটো তিনটা কথাও বলেছে, যা একজন হবু মায়ের সহ্য হওয়ার কথা নয়। ফারিনেরও তাই হয়েছে।

যখন আহসান আজেবাজে কথা বলে নিজের সন্তানের অস্তিত্বের উপর আঙুল তুলেছে, তখন থেকে আহসানের সংসারের উপর থেকেও ফারিনের মায়া চলে গিয়েছে। ফারিনের অবচেতন মন আহসানকে সহ্য করতে না পারলেও চাইতো আহসান ওর সন্তানকে স্পর্শ করুক, ফারিনের পেটে হাত দিয়ে একটু কান পাতুক। কিন্তু সেই দুপুরের পর থেকে সেইসব ইচ্ছে আর অবশিষ্ট নেই। এখন যা অবশিষ্ট আছে তা শুধুই বিতৃষ্ণা। ফারিন এখন মরতে পারলেই বাঁচে।

ফারিন আহসানের উপর এতটাই বিতৃষ্ণা কাজ করে এখন যে ও আহসানের পরিবারের মানুষদের সাথেও যোগাযোগ করা বন্ধ করে দিয়েছে। কল করলেও রিসিভ করে না। নিঃসঙ্গতা ওদের চাইতে ফারিনের বেশি আপন। ফারিনের কাউকে দরকার নেই। ফারিন বোধ হওয়ার পর থেকেই একা। একাই ভালো আছে। ও পিলো ঠিক করে সোফায় সোজা হয়ে শুয়ে পড়ে। আহসানের রাগের স্তর বেড়ে গেল। ও উচ্চ স্বরে বলে,

“ফাজলামো করো আমার সাথে? এখানে শুয়েছো কেনো? ঘুমের ঘোরে গড়িয়ে পড়লে কি হবে?”

ফারিন চোখ বন্ধ করে নির্জীব বস্তুর মতো পড়ে রইলো। ফারিনের সাড়াশব্দ না পেয়ে আহসান কার্পেটে বড় সোফার মাঝামাঝি বসে পড়ে। ওর জন্য অন্তত গড়িয়ে তো পড়বে না। আহসান আরো কয়েকবার বললো। না ফারিন উঠলো, না মা-বাচ্চার কথা ভেবে আহসান ওখান থেকে সরলো। ছোট্ট সোফায় এপাশ ওপাশ করতে করতে ফারিন চারটা নাগাদ রুমে গিয়ে শোয়। আহসানও ফ্লোর থেকে উঠে যায়। কিন্তু ফারিনের পিছন পিছন বেডরুমে আর ঢোকে না। আরো অনেকক্ষণ পর আহসান ওদের বেডরুমে আসে। ফারিনের পায়ের নিচে বালিশ দিয়ে গায়ে কাঁথা টেনে বেরিয়ে যায়। অথচ আড়ালে আবডালের এইসব ছোট ছোট যত্নআত্তির চেয়ে ফারিনের সাথে ওর মুখোমুখি কথা বলা বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

চলমান…..

(হ্যাপি রিডিং….রিচেক দেইনি।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here