#আফরিন_আখ্যান
#পর্ব_১৪
#সমৃদ্ধি_রিধী
আহসান ওর পিএর সাথে কাজের শিডিউল নিয়ে আলোচনা করছিল। মিটিং সংক্রান্ত আলোচনায় মাঝে আহসানের ফোনে কল আসে। আহসান মোবাইল নিয়ে দেখে স্ক্রিনে জয়তুন খালা নামটা জ্বলজ্বল করছে। আহসান রিসিভ করে। কানে ফোন চেপে একটা কাগজে স্বাক্ষর করতে করতে সালাম দেয়। জয়তুন খালা আতঙ্কিত গলায় বলে,
“আব্বা ফারিনের তো শরীর ভালো না। অনেকবার বমি করছে সকাল থেইক্কা। বাথরুমেও যাইতেছে ঘনঘন। আপনে তাড়াতাড়ি বাসায় আসেন। ওরে মনে হয় হাসপাতালে নিতে হইবো।”
আহসানের হাত থেমে গেল। “মানে?”
“অবস্থা ভালা না। তাড়াতাড়ি আসেন।”
“আসছি আমি। আপনি ওর সাথে থাকুন।”
কল কেটে আহসান উঠে দাঁড়ায়। আহসানের পিএ জাহিদ বলে,
“স্যার একঘন্টা পরের মিটিং?”
“সব ডিটেইলস আদৃতকে গিয়ে বোঝাও। ও সামলে নিতে পারবে।”
আহসান জাহিদের আর কোনো কথাই শুনলো না। বড় বড় পা ফেলে চলে গেল। জাহিদ পড়ে বিপাকে। ফাইল পত্র নিয়ে ছুটলো আদৃতের কেবিনে। ভাগ্য অত্যন্ত সুপ্রসন্ন থাকায় আহসান দশমিনিটের মধ্যে বাসায় পৌঁছে যায়। ফারিনের চোখ মুখ বসে গিয়েছে। শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। আহসান দেরী করলো না। ফারিনকে নিয়ে দ্রুতই হাসপাতালে যায়। আহসানের মন-মেজাজ খারাপ। নিশ্চয়ই মাঝরাতে ফুচকা খাওয়ার জন্য এইসব হয়েছে?
ফারিনের পানি শুকিয়ে গিয়েছে। বাচ্চার নড়াচড়াও কমে গিয়েছে। ফারিনকে অতিসত্বর স্যালাইন দেওয়া হয়। আহসানের খালাতো বোন ডঃ সুমাইয়া জান্নাত ফারিনকে পর্যবেক্ষণ করে বলে,
“তোমার তো কমপ্লিকেশনস আছে অনেক। জানতে না?”
ফারিন উপর নিচে মাথা ঝাঁকায়। সুমাইয়া বলে,
“তাহলে রেগুলার ট্রিটমেন্টের আন্ডারে থাকো না কেনো?”
ফারিন জবাব দিলো না। আহসান পাশে বুকে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে। সুমাইয়া রিপোর্ট দেখতে দেখতে বলে,
“তোমাকে ডেট বলেছে কবে?”
“মার্চের মাঝামাঝি।”
সুমাইয়া মাথা নাড়ায়। ক্রমশ ওর মুখমণ্ডল শক্ত হয়ে যাচ্ছে। ফারিনের ফুলো পায়ে হাত দিয়ে বলে, “ব্যথা আছে?”
ফারিন ক্ষীণ স্বরে বলে, “না।”
“বেবির নড়াচড়া ঠিক আছে?”
“আছে।”
সুমাইয়া স্টেথোস্কোপ দিয়ে চেক করলো। সুমাইয়া রিপোর্ট আহসানের হাতে দেয়। ধমকের সুরে বলে, “কি করিস সারাদিন? প্রেগন্যান্ট বউয়ের যত্ন নিতে পারিস না? কাজ, অফিস এইসব নিয়েই পড়ে থাকিস?”
আহসান জবাব দিলো না। সুমাইয়া একই সুরে বলে,
“বাইরে আয়।”
কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। আহসান ফারিনের দিকে একপলক তাকিয়ে সুমাইয়ার পিছন পিছন বাইরে গেল। সুমাইয়া আহসানকে বলে,
“তোর ওয়াইফের কন্ডিশন সম্পর্কে জানিস তুই?”
“কি হয়েছে?”
“ওর হরমোনাল ইমব্যালেন্স, হাই প্রেশার, পানিশূন্যতা সব একসাথে। মেয়েটার যত্নআত্তি করিস বলেও তো মনে হয় না। এইসব কি ধরনের আচরণ?”
“সময় পাই না।”
“এইসব লেইম এক্সকিউজ দিবি না আহসান৷ প্রতি মান্থে চেকআপ করানোর সময়টুকু পাস না? আমাকে শেখাস?”
আহসান জবাব দিলো না। ফারিন যেতেই চায় না ডাক্তারের কাছে। ও কি করবে? সুমাইয়া বলে,
“মেয়েটা খাওয়া দাওয়া করে না। সেটাও খেয়াল করিস না?”
আহসানের মুখে রা নেই। ফারিনের কি খেতে ইচ্ছে হয় তাও বলে না। ও পেটের ভিতর গিয়ে জেনে আসবে?
“ফারিন যে বললো ডেট মার্চে? মার্চ পর্যন্ত নেওয়া যাবেই না। ফেব্রুয়ারির মাঝেই ডেলিভারি করতে হবে। ক্রিটিক্যাল সিচুয়েশন হলে আরো আগে কিন্তু সেটা মোটেও ভালো হবে না।”
আহসান চাপা শ্বাস ফেললো। সুমাইয়া বলে,
“ফারিনের সামনে বলিনি আমি। বেবির মুভমেন্টও কম। ও প্রথমবার মা হচ্ছে, তাই হয়তো বুঝতে পারছে না। বেবির ওয়েটও কম। তোকে বলে দিচ্ছি এমন হলে সরি টু সে মা, বাচ্চা কাউকেই বাঁচানো যাবে না।”
আহসান চমকালো। সুমাইয়া শক্ত গলায় বলে,
“ফারিনের অবস্থা ক্রিটিক্যাল দেখেই বলছি। তোর আক্কল দেখে অবাক হচ্ছি ওকে বাসায় একা রেখেছিস কেনো? খালামণির কাছে রেখে আয়।”
“আচ্ছা।”
“আর পা ফুলে কি অবস্থা হয়েছে। দেখিসনি তুই?”
“দেখেছি।”
“যত্ন করতে পারিস না ওর?”
আহসান চুপচাপ শুনে গেল।
“একটা অয়েলের নাম বলবো। রাতে ঘুমানোর আগে পায়ে মালিশ করে দিবি স্টুপিড একটা।”
সুমাইয়া চলে গেল। আহসান কেবিনের ভিতর আসে। ফারিনের বাম হাতে ক্যানুলা লাগানো। ডান হাত পেটে রাখা। আহসান ফারিনের পাশে এসে বসে। ফারিন আহসানের দিকে তাকিয়েও চোখ সরিয়ে নেয়। আহসান উপরের ঠোঁট কামড়ে ধরে। একরাশ দ্বিধা, সংশয় কাটিয়ে হাত বাড়িয়ে ফারিনের পেটে হাত রাখে। ফারিন নিজের হাত সরিয়ে নেয়। আহসান অনেকক্ষণ ফারিনের পেটে হাত রাখে। অনুভব করতে চায় নিজের সত্তাকে। আহসান অনুভব করে ওর চোখ চিকচিক করছে।
আহসান নিজের অবস্থান শনাক্ত করতে পারলো না। বিয়ের শুরুতেও তো ওর মধ্যে এতটা সংকোচ কাজ করেনি তাহলে এখন কেনো এমন হচ্ছে? নিজের বউ, বাচ্চাকে স্পর্শ করতেও কিসের এত দ্বিধা? এত দূরত্ব কেনো নিজেদের মধ্যে? ইগোর জন্য? মাথা নত করে দুজনের বসে আলাপ না করার জন্য? আহসানের যে ফারিনের উপর অনেক রাগ উঠে, এত ভালোবাসার পরও ওর ভালোবাসাকে ফিকে ভাবার জন্য। আদৃত আহসানকে বুঝিয়েছে একপাক্ষিক কথা না বিশ্বাস করতে। কিন্তু হাফসা রহমানের বলা প্রতিটা কথা যে হুবহুই ফারিন বলতো? কাকতালীয়ভাবে এতটা মিলে?
সিঙ্গাপুর যাওয়ার আগের রাতে সুন্দর কিছু মুহুর্ত কাটানোর পর আহসান যখন মজা করে ফারিনের মাথায় নিজের মাথা দিয়ে বাড়ি মেরে বলেছিল, “দেশে ফিরলে একসাথে দুটো তিনটে ডিম ফুটাবো।”
ফারিন মুখে কৃত্রিম বিরক্তির ছাপ ফুটিয়ে মাথায় হাত ঘষতে ঘষতে বলেছিল, “দেশে ফিরো সুস্থভাবে। তোমাকে ডিভোর্স দিতে পারলে বাঁচি, সে নাকি ডিম ফুটাবে। মানুষের দিবাস্বপ্ন!”
আহসান ফারিনকে ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্ন করেছিল,
“পারবে আমাকে ছাড়া থাকতে?”
উল্টোদিকে ভাব নিয়ে আহসানের দিকে পিঠ দিয়ে ঘুরে গিয়ে গায়ে কমফোর্টার টেনে ফারিনে ব্যঙ্গাত্বক স্বরে বলেছে, “এ্যাঁহেরে আমার নায়কটা এসেছে রে! খুব করে পারবো। দেশে আসো শুধু।”
আহসান তখন মজা হিসেবে নিলেও পরে দেশে এসে বুঝেছে ফারিন তো মজা করেনি। হাফসা রহমানের কথার সাথে খাপে খাপে সব মিলে গিয়েছে। ফারিন নিশ্চয়ই সেটাই জানাতো দেশে ফিরলে যার লোড আহসান নিতে পারতো না। আহসানের শ্বাস প্রশ্বাসের গতি বাড়লো। আহসান ওদের প্রথম সন্তানকে অ্যাবরশান করানোর কথায় যত না কষ্ট পেয়েছে তার চেয়েও বেশি কষ্ট পেয়েছে ফারিনের কাজে। ফারিনকে ও লাইফের টপ প্রায়োরিটি দেওয়ার পরও ফারিনের কাছ থেকে সম আচরণ পায়নি ও। ফারিন ওকে ছেড়ে দিতো, সেইজন্য ডিভোর্স পেপারও রেডি করেছিল। আহসান তো মুখে জীবনেও সে বলতে পারতো না কিন্তু ফারিন তো সব বাস্তবে করেও দেখিয়েছে। নিছক মজা করেনি।
আহসান ফারিনের পেটে হাত বোলায়। প্রায় পনেরো মাসের বেশি আহসান ফারিনের সাথে কথা বলে না, এক ঘরে ঘুমায় না। কেন? আহসান মায়ায় পড়ে পুনরায় অহংকারী মেয়েটার সাথে আর জড়াতে চায় না বলেই তো? ফারিনের গর্ভে থাকা ওর বাচ্চা ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে কিন্তু আহসান অন্যদের মতো বউ, অনাগত বাচ্চাকে নিয়ে আহ্লাদ করতে পারে না। আহসানের কি কষ্ট হয় না? আহসানের ইচ্ছে হয় না সন্তানের বড় হওয়ার প্রতিটা মুহুর্ত এনজয় করতে? কিন্তু ফারিনের প্রতি ওর রাগটাও যে আকাশছোঁয়া! আহসানকে বুড়ো আঙুল দেখানো মানুষটার মুখ দেখবে না বলে প্রতিজ্ঞা করলেও আহসান পারে কোথায় কথা রাখতে? আহসানের নিজেকে ভেড়া মনে হয়। আদৃতের ভাষায় বলা ভেড়া।
বাসায় না এসে আদৃতের বাসায় থাকলেও ভোরে এসে ফারিনকে দেখে চলে যেতো। অন্যরুমে শিফট হলেও মাঝরাতে কমপক্ষে আধাঘন্টা বেডরুমে এসে ফারিনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতো। হয়তো ভাবতো এত ভালোবাসার পরও, এত স্যাক্রিফাইজ করার পরও মেয়েটা কিসের আশায়, কিসের কমতি থাকায় ওকে ছাড়তে চেয়েছিল? ফারিনের গর্ভে বড় হতে থাকা নিজের সন্তানকে আহসানকে সারাদিন পর ভোরের আগে নিয়ম করে স্পর্শ করার সুযোগ পায়। সারাদিন দম্ভ নিয়ে ঘুরে বেড়ালে ক্লান্ত আহসান একা ঘরে গুমরে থাকে, সেটা কি এই অহংকারী মেয়েটা জানে? পারবে শুধু অবজ্ঞা অবহেলা করে নিজেদের ক্ষতি করতে, আহসানের সব স্বপ্নকে মাটি চাপা দিতে। আহসান ফারিনের মুখের দিকে তাকালো। চোখ বন্ধ করে আছে। আহসান চোখ সরিয়ে নিল। পেটের দিকে তাকিয়ে শব্দহীনভাবে ঠোঁট নাড়িয়ে বলে,
“তাড়াতাড়ি আমার কাছে চলে আসো। বাবা তোমার জন্য অপেক্ষা করছি। তোমার জন্য অনেক খেলনা, উপহার কিনে রেখেছি। বাবার বাসায় একা একা লাগে। কথা বলার মতো কাউকে পাই না৷ তুমি আসলে আমরা অনেক গল্প করবো। মায়ের মতো তুমিও আমাকে এত কষ্ট দিও না। এত এত ভালোবাসার পরও আমার ভালোবাসাকে বুড়ো আঙুল দেখিও না। আমি সহ্য করতে পারবো না। একজনেরটা সহ্য করেছি, তোমারটা পারবো না। বাবাকে ছেড়ে যেও না সোনা।”
সুমাইয়ার কথা মনে পড়তেই আহসানের গলা খিঁচে আসলো। ও উঠে চলে গেল। আহসান চলে যেতেই ফারিন চোখ খুলে। চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। হাতে থাকা ক্যানোলার দিকে তাকায়। আহসান একবারের জন্যও জিজ্ঞাসা করলে না। “কেমন লাগছে?” করেনি। দায়িত্ব শুধু হাসপাতালে নিয়ে আসা। তাই নিয়ে এসেছে। ফারিন ডান হাত পেটে রাখে। বিড়বিড়িয়ে অস্ফুটস্বরে আনমনে বলে,
“তোমার বাবা এই প্রথম তোকে স্পর্শ করলো। কতক্ষণ ধরে করেছে জানো? আমার এক থেকে চারশো নব্বশই পর্যন্ত গুনতে যতটুকু সময় লেগেছে ততটুকু সময়ের জন্য। প্রথমবার বাবার স্পর্শ পেয়ে কেমন লাগছে? বেশি ভালো লাগছে? মাকে আর ভালো লাগে না? মা তাহলে অনেক কষ্ট পাবো। সবার মতো তুমিও আমাকে কষ্ট দিও না। মায়ের তো তুমি ছাড়া কেউ নেই।”
ফারিন মুখে হাত চেপে ধরে কেঁদে ওঠে। আহসান এমন কেন? ফারিনের তো এখন মনে হচ্ছে ও মরলেও আহসানের কিছু আসবে, যাবে না।
_____________________
আজ বৃহস্পতিবার। গত পনেরোদিন যাবত ফারিন ধানমন্ডিতে আছে। সেদিন হাসপাতাল থেকে আহসান ফারিনকে নিয়ে সোজা ধানমন্ডি যায়। পথে একটাও কথা হয়নি দুজনের। না তারপরে। আহসান কাজের সূত্রে থাকে উত্তরা আর ফারিন সবার সাথে ধানমন্ডি। জেসমিন ফারিনের অনেক খাতিরযত্ন করে। কিছুক্ষণ পর পর এসে পানি খাওয়ায়।
ফারিন শুয়ে আছে। কিছুক্ষণ যাবত ঘরে হেঁটেছে। আর পারছে না। ফারিন ঘড়ির দিকে তাকায়। সাড়ে নয়টা বাজে। জেসমিন একটু পরই এসে ভাত খাইয়ে দিবে। ফারিন উঠে বসে। তিনটা গল্পের বই এনে রেখেছে আহসান গত সপ্তাহে। ওগুলো ছুঁবে না বললেও ওখান থেকে একটা নিলো। কার্ডবোর্ডে হেলান দিয়ে পড়া শুরু করে৷ ফারিনের অনুমান অনুযায়ী জেসমিন একটু পরই আসে। হাতে খাবারের প্লেট আর পানির গ্লাস। পানি সেন্টার টেবিলে রেখে ফারিনের মুখোমুখি বসে। ফারিন উঠে বসে।
জেসমিন ভাত মাখতে মাখতে বলে, “নড়াচড়া আছে?”
“জ্বি।”
“পানি খাও একটু।”
ফারিন খেলো। জেসমিন ফারিনকে খাইয়ে দিতে থাকে। একপর্যায়ে জেসমিন বলে,
“শরীর কি বেশি খারাপ লাগে?”
“না।”
“আগে তো মোটামুটি ভালোই কথা বলতে। এখন একেবারে চুপ কেনো?”
“কথা বলতে ইচ্ছে করে না।”
জেসমিন খাইয়ে দিতে থাকে। মজার ছলে বলে,
“এখনকার যুগ বলে শাশুড়ী হাতে তুলে খাইয়ে দিচ্ছে। আমাদের যুগ হলে এত ভালো শাশুড়ী পেতে না।”
ফারিন মনে মনে বলে, “খাইয়ে দিতে বলেছে কে? নিজ থেকে এসে খাইয়ে খোঁটা দেওয়ারও কি আছে?”
কিন্তু মুখে কিছু বললো না। আহসানের সাথে জড়িত কাউকে দেখতে ওর ইচ্ছে করে না। অনি এসে প্রতিদিন নিয়ম করে দুইবেলা ‘ভাবি কেমন আছেন’ জিজ্ঞাসা করে। ফারিনের মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় দুটো দিতে। অনি এই প্রশ্ন করেই চলে যায়। আগেই তাকায় না, পিছেও তাকায়। কিন্তু তাও ফারিনের সহ্য হয় না। অসহ্য লাগে। জেসমিন ফারিনকে ঔষধ খাইয়ে রুম থেকে বের হয়। ফারিন ওয়াশরুমে যায়। ওয়াশরুম থেকে ফিরতে দেখে আহসান ঘরে। হাত ঘড়ি খুলছে৷ ফারিন ঘড়ির দিকে তাকায়। বুঝলো জ্যামে পড়েছিল। আহসান ফারিনের দিকে তাকায়। ফারিন চোখ সরিয়ে নেয়। আহসান ড্রেস নিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায়।
ফারিন একটু হাঁটাহাঁটি করে। বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। ওয়াশরুমের দরজা খোলার শব্দ হলো। ফারিন ঘরে আসে। আহসান ফারিনকে জিজ্ঞাসা করে,
“কেমন আছো?”
“মরিনি।”
ফারিন খাটে বসে। আস্তে ধীরে শুয়ে পড়ে। আহসান চশমা পড়ে নেয়। ড্রেসিংটেবিলের সামনে গিয়ে তেল নেয়। ফারিনের পায়ের সামনে গিয়ে বসে। ফারিন পা কোলে উঠিয়ে তেল মালিশ করে টিপে দিতে থাকে। ফারিন পা টেনে সরিয়ে নেয়।
“এগুলো কি ধরনের স্বভাব? পায়ে হাত দিচ্ছো কেনো?”
“পা ফুলে গিয়েছে। সুমাইয়া আপু তেল মালিশ করতে বলেছে।”
“পা হাত দিবে না আমার।”
“কিছু হবে না।”
পা টেনে আবার মাসাজ করতে থাকে। ফারিন আরাম পায়, তবে আহসান ওর পায়ে হাত দিচ্ছে বিষয়টা ওর পছন্দ হচ্ছে না। ফারিন বলে,
“এগুলো করে কি প্রমাণ করতে চাচ্ছো?”
আহসান উত্তর দিলো না। ফারিন বলে,
“এখন মনে হচ্ছে বাচ্চাটা তোমার? সেই জন্য মায়া উতলে পড়ছে?”
“বাচ্চাটা আমার না সেটা আমি কখনো বলিনি।”
“চারমাসের সময় সন্দেহ করোনি?”
“না।”
“বলোনি আমার পেটে বাচ্চা আছে কিনা?”
“ঠিক তাই, বলেছি তোমার পেটে বাচ্চা আছে কিনা। কিন্তু বলিনি তোমার পেটের আমার বাচ্চা আছে কিনা।”
ফারিনের সমস্ত রাগ ঝেড়ে ফেলার ইচ্ছে হলো। সপ্তাহ পর আহসানকে দেখে মাথার আগুন ধপধপ করে জ্বলে উঠলো। কেনো জানি ওর ইচ্ছে হলো আহসানের সাথে মুখোমুখি ঝগড়া করতে। হয় এস্পার নাহয় ওস্পার হবে।
“এত অহংকার কিসের তোমার?”
আহসান পায়ের তালুও মাসাজ করে দিলো। আহসানের নির্লিপ্ত ভাব দেখে ফারিন আহসানকে আঙুল তাক করে বলে,
“তোমার এই অবনতির জন্য কারা দায়ী জানো? কারা দোষী জানো? তোমার পরিবার। তারা তোমাকে মানুষ করতে পারেনি। সোজা বাংলা ভাষায় ওনারা তোমাকে একটা নিবোর্ধ মানুষে পরিণত করেছে। তোমার পরিবার তোমার অতিরঞ্জিত প্রশংসা করতে করতে তোমার এমন মন মানসিকতা তৈরি করে ফেলেছে তোমার এখন মনেই হয় না তোমারও কখনো ভুল হতে পারে। অহংকারী মানুষ বানিয়ে ফেলেছে ওনারা তোমাকে। দুইটো তিনটা মিটিং, কয়েকটা ডিল সামলে তুমি নিজেকে শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমান মনে করো। কিন্তু চরম সত্যি কথাটা তো হলো এটাই লাখ লাখ টাকার হিসেব অনায়াসে করতে পারলেও তুমি নিজের জীবনের হিসেবে খুবই কাঁচা। না পারবে তুমি নিজের জীবনের হিসেব করতে, না পারবে আমার জীবনের হিসেব মেলাতে। ব্যবসায়িক বুদ্ধি ছাড়া সম্পর্কের মারপ্যাঁচ, সম্পর্কের সমীকরণ, সাংসারিক জটিলতা সম্পর্কে তোমার কোনো জ্ঞানই নেই। ইউ আর সাচ অ্যা ডাম্ব শিট।”
আহসান কিছুই বললো না, ও নির্বিকার। ফারিনের রাগ উঠে গেল। “তুমি যতটা ভালো হওয়ার ভান করো, তুমি ততটাই নিকৃষ্ট।”
ফারিনের পায়ের সামনে থেকে উঠে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। ফারিন রেগে লাল হয়ে মটকা মেরে শুয়ে থাকে। রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে থাকে। আহসান ফারিনের কাঁধও মাসাজ করে দেয়। ফারিন রেগে লাল হয়ে থাকলেও একসময় ঘুমিয়েও পড়ে। ফারিন ঘুমিয়ে পড়তেই আহসান ফারিনের পেটে হাত বুলায়। চুমু খায়। পেটের দিকে তাকিয়ে মনে মনে অনেক কথা বলে। সারা সপ্তাহের জমানো সব কথা বলে।
_________________
এমডি সাফওয়ান সিদ্দিক নিজের উদ্যোগে একটা কাউকে না জানিয়ে একটা ডিল ফাইনাল করেছে৷ তাও আবার সিঙ্গাপুরের সেই কোম্পানির সাথে। বাংলাদেশি হিসেবে আজ সকাল নয়টায় এবং সিঙ্গাপুরের সময় অনুযায়ী এগারোটায় আহসান ভার্চুয়াল মিটিং করেছে সিঙ্গাপুরের সেই কোম্পানির সাথেই যেটা ওর গাফিলতিতে না হওয়ার আনোয়ার সিদ্দিক অনেক আফসোস করেছে। প্রায় দেড়ঘন্টার মতো মিটিং চলেছে। আহসানের ঠোঁটের কোণে সূক্ষ্ম হাসি, তৃপ্তির হাসি৷ ও ইজি চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে হিসেব করছে। আনোয়ার সিদ্দিকের কাছে আর আধাঘন্টারই ই-মেল চলে যাবে৷ অনেক সারপ্রাইজড হবে অবশ্যই?
আহসান চশমা খুলে ডেস্কে রাখে। মুখে হাত ঘষে চোখ বন্ধ করে পড়ে রইলো। কিছুক্ষণ পর মেসেঞ্জারে আদৃতের কল এলো। ল্যাপটপের স্ক্রিনে কল এসেছে। আহসান ঠোঁটের কাছে আঙুল ঠেকিয়ে হাত বাড়িয়ে কল রিসিভ করে। আদৃত ব্যস্তগলায় বলে,
“ভাইয়া কোথায় তুমি?”
“আছি।”
“কোথায়?”
“কেনো?”
“তোমার নাম্বার বন্ধ কেনো?”
আহসানের মনে পড়লো ও যে সাতটা, সাড়ে সাতটা নাগাদ অফিসে এসে ফোন বন্ধ করেছে আর ওপেন করা হয়নি। ও হাত বাড়িয়ে মোবাইল নিয়ে পাওয়ার অন করে।
“কি দরকার সেটা বল।”
“ভাবির অবস্থা ভালো না।”
আহসানের হাত থেমে গেল। চট করে সোজা হয়ে বসে। আদৃত বলে,
“ভাবিকে ঘন্টাখানেক আগে ইমার্জেন্সি হসপিটালে আনা হয়েছে। সিজার করতে হবে।”
আহসানের চমকালো। নয়মাসে পড়েছে গতসপ্তাহে। এখনই কেন সিজার? আহসান মুখ খোলার আগেই আদৃত তড়িঘড়ি করে বলে,
“সিজার করতে নেওয়ার আগে চাচিম্মু বন্ড পেপারে সই করেছে। কিন্তু ভাবির অবস্থা ভালো না। একটু আগে নার্স বের হয়ে বলেছে অবস্থা অনেক ক্রিটিক্যাল। মা বা বাচ্চার মধ্যে যেকোনো একজনকে বাঁচানো যাবে। অক্সিজেনের অভাব মা, বাচ্চার দুইজনেরই। তুমি মা, বাচ্চার মধ্যে কাকে বাঁচাতে চাও?”
আহসান থ’ হয়ে যায়। আদৃত বলে, “সময় নেই ভাইয়া তাড়াতাড়ি বলো। ওয়াইফও তোমার, বেবিও তোমার। তাই ডিসিশনও তোমার। কাকে বাঁচাতে চাও?”
আহসান কিছু না ভেবেই বলে, “ফারিনকে বাঁচা।”
“বাচ্চাকে কিন্তু বাঁচানো যাবে না।”
আহসান চেঁচিয়ে উঠে, “তোকে বাচ্চার কথা একবারও বলেছি আমি ইডিয়েট? বলেছি ফারিনকে মেরে আমাকে বাচ্চা দে? হয় মা, বাচ্চা দুজনেই বাঁচবে, নাহলে শুধু ফারিন বাঁচবে। ফারিন বাচ্চাকে বাঁচাতে বললেও যেন ওর লাইফ নিয়ে কোনোপ্রকার রিস্ক না নেওয়া হয়। ফারিন যেন সহিসালামতে ঘরে ফিরে আসে। হসপিটালের ঠিকানা দে।”
আদৃত ঠিকানা বলে কল কেটে দেয়। নিচের দোকান থেকে একটা চুইংগাম কিনে চিবোতে চিবোতে হসপিটালে ঢোকে। আহসান যদি জানতে পারে এতক্ষণ ধরে মিথ্যা বানিয়ে বানিয়ে বলেছে তাহলে আদৃত শেষ। ফারিন সকাল থেকে অস্থির অস্থির করায় জেসমিন আর শিরিনা রিস্ক না নিয়ে ওকে নিয়ে সকাল সাতটার দিকে হাসপাতালে আসে৷ আহসানকে কল করলেও ওর মোবাইল বন্ধ পায়। পরে আদৃতকে কল করে। আদৃত উপরে গিয়ে দেখে আহসান বাসায় নেই। অফিসে খোঁজ নেওয়ার পর জাহিদ জানায় মিটিং আছে। আদৃত তখন আর অফিসে না গিয়ে হাসপাতালে চলে আসে। ঘন্টাখানেক চেষ্টা করার পর আদৃত আহসানকে রিচ করতে পেরেই আগুন লাগিয়ে দিলো।
আদৃত হেলতে দুলতে শিরিনার পিছনে গিয়ে দাঁড়ায়। শিরিনা কপাল কুচকে বলে,
“কোথায় গিয়েছিলি?”
“নিচে।”
“মুখে কি?”
আদৃত দাঁত “ইই” করে দেখিয়ে বলে, “চুইংগাম।”
“চুইংগাম খাচ্ছিস কেনো এখন?”
“এমনিই।”
শিরিনা আদৃতের দুই হাত টেনে শুঁকলো। আদৃত কপাল কুচকে বলে,
“কি হলো এটা?”
শিরিনা মুখ ঘুরিয়ে নিলো। “চেক করছিলাম সিগারেট টিগারেট খেয়ে এসেছিস কিনা।”
“আস্তাগফিরুল্লাহ! সিগারেট খাবো কেনো?”
“চুইংগাম খাচ্ছিস কেনো?”
“এমনিতেই।”
শিরিনা আদৃতের পানে তাকায়।
“শুধু শুধু অবিশ্বাস করো আমাকে।”
“বিশ্বাস ভাঙার মতো কাজ করিস কেনো?”
“এমন ভাবে বলছো যেন কতবার দেখেছো আমাকে সিগারেট খেতে?”
“ইন্টারে পড়াকালীন ধরা খাসনি?”
“একবারই ট্রায়াল দিয়ে বাসায় এনেছিলাম। ওইবারই ধরা খেয়েছি। বারবার খোঁটা দাও কেনো?”
“আপনি যে ভদ্রলোক! ওই বয়সে জুতার বাড়ি না খেলে স্বভাব বানিয়ে ফেলতেন।”
আদৃত মনে মনে হুবহু কথাটা বলে ভেঙায়। শিরিনা আদৃতের মুখের ভঙ্গিমা দেখেছে। চোখ সরিয়ে বলে,
“আহসানের ছেলে হয়েছে।”
“দেখিয়েছে তোমাদেরকে?”
“হ্যাঁ, তুই নিচে ছিলি তখন।”
আদৃতের মাথায় হাত। “বেবি এখন কোথায়?”
“নিয়ে গিয়েছে। তোর জন্য রেখে দিবে নাকি?”
“আমাদের হাতে একেবারে দিবে কখন?”
“কিছুক্ষণ পরই দিবে। আহসানের সাথে যোগাযোগ হয়েছে?”
“হুম, আসছে।”
আদৃত সরে গেল। পুনরায় আহসানকে কল দিয়ে আরো একটু জ্বালালো। আদৃত ঠোঁট বাঁকায়। আহসানের অস্থিরতা দেখে হাসে। এই লোক আবার বলে ওর বউকে ও দেখতে পারে না। ঘৃণা করে। ঢং! আহসানের মতো ভেড়া আদৃত একটাও দেখেনি। কিছুক্ষণ পর ফারিনকে রিকোভারি রুমে নেওয়া হলো। বাচ্চাকেও সাথে দিলো। এবারও আদৃত আরেকটা পোংটামি করলো। আহসানকে বাবুর ছবি তুলে পাঠালো, সাথে লিখলো-
“ভাইয়া ছেলে বাবু হয়েছে।” সাথে কিছু স্যাড ইমোজি।
আহসান তখন জ্যামে আটকে আছে। আদৃতের এই মেসেজ দেখে ওর ঘাম ছুটে গেল। আদৃতকে কল দেয়। আদৃত রিসিভ করে না। আহসানের রীতিমতো প্যানিক অ্যাটাক ওঠার উপক্রম। একেএকে জেসমিন, শিরিনাকে কল দিলেও কেউ রিসিভ করে না। মোবাইলগুলো যে সব আদৃতের কাছেই ছিল, ও কেটে দিচ্ছে। জানুয়ারির শীতের মধ্যেও গা থেকে ব্লেজার খুলে ফেলে। জ্যাম ছাড়া মাত্রই ঝড়ের গতিকে গাড়ি চালিয়ে হসপিটালে আসে। ঘেমেনেয়ে একাকার অবস্থা। আদৃত আহসানকে দেখে সরে গেল। আহসান জেসমিনের সামনে এসে দাঁড়ায়। ফারিনকে কেবিনে দেওয়া হলে শিরিনা তখন ফারিনের সাথে কেবিনে যায়।
জেসমিন রেগে বোম হয়ে যায়। “সারাদিন কোথায় ছিলি? কতবার কল করেছি তোকে?”
আহসান বড় বড় শ্বাস ফেলতে থাকে। আহসান হিসাব মেলাতে পারছে না ওর মা এত শান্ত কি করে? জেসমিন বলে,
“তোর ছেলে হয়েছে। বাচ্চা সুস্থ আছে।”
“ফারিন?”
“ওকে কেবিনে দেওয়া হয়েছে। দেখা করবি?”
“সুস্থ আছে?”
“আলহামদুলিল্লাহ। মা বাচ্চা দুজনেই ঠিক আছে। সুমাইয়া চেকআপ করে বললো আজকেই ডেলিভারি করে ফেলতে। পরে সমস্যা হতে পারতো।”
আহসান ঘাড় ঘুরিয়ে আদৃতের দিকে তাকায়। আদৃত মেকি হাসে। আহসান আদৃতের কাছে আসতে নিলে জেসমিন আহসানকে ডাক দিয়ে বলে,
“কোথায় যাচ্ছিস? ছেলেকে দেখে যাহ?”
আহসান জেসমিনের সাথে গেল। ফারিন বিছানায় শোয়া, পাশেই তোয়ালে মোড়ানো ছোট্ট বাবু। ফারিনের আধো আধো জ্ঞান। ফারিনকে দেখে আহসানের হৃদয় ঠান্ডা হয়। ও কোমল স্বরে জিজ্ঞাসা করে,
“কেমন আছো?”
অত্যন্ত ক্ষীণ স্বরে ফারিন ঠোঁট নাড়ালো। “ভালো।”
বলে ফারিন ঘাড় ঘুরিয়ে বাচ্চার দিকে তাকায়। আহসান ফারিনের বাহুর সাথে লেগে থাকা ছোট্ট বাচ্চার দিকে তাকায়৷ মুহুর্তেই হাত-পায়ে কাঁপন অনুভব করলো। ছুঁয়ে দেখার জন্য হাত বাড়ালেও ছোঁয় না। আহসান তাকাতে পারলো না আর। বড় বড় পা ফেলে কেবিন থেকে বের হয়ে যায়। ফারিন নিষ্প্রাণ চাহনিতে আহসানের যাওয়ার পানে তাকিয়ে থাকে। ফারিনকে নাহয় আর সহ্য হয় না, এইজন্য নিজের বাচ্চাকেও একবার তোলে নিল না? ফারিন চোখ সরিয়ে নেয়। চোখ বন্ধ করতেই গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।
আহসান বাইরে এসে আদৃতের কলার ধরে ওকে টেনে লিফটে ওঠে। আদৃত কলার ঝেড়ে বলে,
“আজব! কলার ধরছো কেনো?”
আহসান আদৃতের মুখ বরাবর ঘুষি মারে। আদৃত মারাত্মক ব্যথা পায়। দাঁতের সাথে লেগে গালের ভিতর ছিলে যায়। গাল চেপে জিভ ঠেকাতেই মিষ্টি তরল পদার্থর স্বাদ পায়। লিফটের দরজা খোলে। ওরা বেরিয়ে আসে। আদৃতের কপাল ঝাঁকিয়ে আহসান বলে,
“ওইসব বলেছিস কেনো?”
“আমি তো তোমাকে রিয়েলাইজ করাতে চেয়েছি এইযে সবসময় হেট হার হেট হার করো সব মুখের কথা।”
“তোকে আমি আমাকে বোঝানোর দায়িত্ব দিয়েছি?”
আদৃত কলার থেকে আহসানের হাত ছাড়িয়ে নেয়৷ “ভুল করছো। একজনের মাথা নত করতেই হয়। ছেলে হয়েছে আর ঝামেলার দরকার নেই। মাথা নত করলে কিছু হয় না।”
আহসান রেগে বলে, “আমাদের মাঝে ইন্টাফেয়ার করবি না একদম। আমার জীবন, আমি বুঝে নিবো।”
“আমি ভালোর জন্যই বলছি।”
“আমার এত ভালো করতে হবে না তোকে। আমি নিজের ভালো বুঝি। তোকে বলেছি আমার ভালো করার জন্য?”
আদৃতের প্রেস্টিজে লাগে। আর জীবনেও আহসানকে কিছু বলবে না। মারা খেলে খাক গিয়ে। ও ইগো দেখিয়ে চলে আসতে নিলে আহসান আটকায়।
“আমার সাথে আয়।”
“কোথায়?”
“মনে মনে ঠিক করেছিলাম বাবু হলে পথশিশুদের খাওয়াবো। চল ব্যবস্থা করতে হবে।”
“আমি যাবো না। তুমি যাও।”
“তোর মতামত জানতে চেয়েছি আমি?”
আদৃত মুখ ঘুরিয়ে নেয়। আহসান তোয়াক্কা করলো না। আদৃতকে জোর করে নিয়ে গেল৷
_____________________
রাত সাড়ে এগারোটা বাজে। জেসমিন ফারিনের সাথে কেবিনে আছে। ফারিন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কেবিনের জায়গায় মৃদুভাবে নক করা হলো। জেসমিন মাথার ওড়না টেনে দরজা খুলে। আহসানকে দেখে রেগে গেলেন। রাগ ঝেড়ে চাপা স্বরে বলে,
“সারাদিন কোথায় ছিলিস? ছেলেকে দেখিসওনি। কেনো?”
“আমি, আব্বু, আদৃত মিষ্টি বিলিয়েছি। আদৃত আর আমি পরে পথশিশুদের খাবার দিয়েছি, কম্বল দিয়েছি। আর ছেলেকে কোলে নেইনি কারণ আমার হাত কাঁপছিল। ভুলবশত ফেলে দিলে কি হতো?”
“আর কেউ তো বাপ হয় না। তোরই শুধু ছেলে হয়েছে।”
আহসান দোলনায় শোয়ানো ছেলের দিকে গেল। আহসানের চোখ জুড়িয়ে গেল মুহুর্তেই। জেসমিনকে বলে,
“একটু কোলে তুলে দাও।”
“তুই নিতে পারিস না?”
“না। কোলে নেওয়ার সময় হাত পা ভেঙে ফেললে?”
“অনির মতো গাধা হয়ে যাচ্ছিস কেনো?”
জেসমিন বাবুকে আহসানের কোলে তুলে দিলো। আহসান সোফায় বসে। বুকের সাথে মিশিয়ে ধরে থাকে। বিড়বিড় করে বলে,
“তাড়াতাড়ি আসতে বলেছিলাম, এইজন্য এত তাড়াতাড়ি আসবে? আরেকটু পরিপক্ব হতে হতো না? বাবার কাছে আসার এত তাড়া?”
বাবু কি কথা বলতে পারে? বেচারা বাচ্চাটা ঘুমে আর আহসান মনে মনে আরো কথা বলেই যাচ্ছে। জেসমিন ওকে যে পজিশনে কোলে দিয়েছে, ওভাবেই নিয়ে রেখেছে। ভয়ে হাতও ধরছে না, চুমুও খাচ্ছে না। জেসমিনকে একটু পর দিয়ে বলে, “ঠিক মতো শুইয়ে দাও।”
জেসমিন ফের দোলনায় রেখে আসে। আহসানের পাশে বসে বলে, “নাম কি রাখবি রে?”
“আহিয়ান।”
“আহিয়ান সিদ্দিক?”
“না, ফাইয়াজ সিদ্দিক আহিয়ান।”
“ভালো নাম পছন্দ করেছিস।”
“ফাইয়াজ ফারিনের পছন্দের, আহিয়ান আমার।”
“দুইটাই সুন্দর। আকিকার অনুষ্ঠান করতে হবে। সবাইকে দাওয়াত দিবো।”
“কবে করবে? সাতদিন পরেই করে ফেলি? ঝামেলা শেষ হয়ে যাবে। দাওয়াত দিতে গেলে দেখবি কম মানুষ হবে না।”
“ফারিনকে বাসায় নেওয়া যাবে কবে?”
“তিন থেকে চারদিন পর। বড়জোর পাঁচদিন পর।”
“ওর সমস্যা হবে না?”
“ওকে দিয়ে কি কাজ করাবো? অনুষ্ঠান শেষ করে ফেললে শেষ আরকি। পরে দেখবি একটার পর ঝামেলা শুরু হলে দেরী হয়ে যাবে।”
“আচ্ছা আব্বু, চাচ্চুর সাথে কথা বলবো।”
আহসান জেসমিনের কোলে মাথা রাখে। জেসমিন বলে, “কি বড় হোসনি? বাবা হয়ে গিয়েছিস।”
আহসান জেসমিনের হাত চুলে রেখে বলে, “মাথা ব্যথা করছে। চুল টেনে দাও।”
আহসানের চুল টেনে দিতে দিতে জেসমিন আফসোস করে বলে, “মেয়েটার অনেক কষ্ট হবে রে।”
“কেনো?”
“জানুয়ারি মাস। পুরো শীতের সময়। এরমধ্যে কাটাছেঁড়া। লেবু, টক খাওয়াতে হবে প্রচুর।”
আহসান জেসমিনের হাত ধরে বলে, “তুমি সামলে নিবে জানি।”
“অনিটা যে কেনো তোর মতো হলো না!”
আহসান চোখ খুলে ফারিনের দিকে তাকায়। মনে মনে বলে,
“কেউ আমার মতো না হোক। সবাই ভালো থাকুক।”
চলমান……
(হ্যাপি রিডিং)

