#আফরিন_আখ্যান
#পর্ব_৪
#সমৃদ্ধি_রিধী
সকালে খাওয়া-দাওয়া শেষে বেসিনে হাত ধোঁয়ার সময় আহসান ফারিনকে হুমকি ধামকি দিয়ে বলেছে সবার সামনে ওকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলার জন্য আজকে ঘরে আসলেই ফারিনের খবর আছে। কিন্তু ফারিন সেইসবের তোয়াক্কা করলো না। নিজের মতো ঘরে সারাদিন ফোন চালিয়ে কাটিয়েছে। কিন্তু নানান কাজে ব্যস্ত হয়ে আহসান নিজেই ঘরে আসতে পারেনি। আটটার দিকে জেসমিন আহসানের ঘরে আসে। হাতে গহনার বাক্স।
ফারিন জেসমিনকে দেখে হাত থেকে মোবাইল রেখে দেয়। জেসমিন ফারিনের মুখোমুখি এসে বসে। বাক্সগুলো বিছানার উপর রেখে বলে,
“দুপুরের পর থেকে ঘর থেকে বের হওনি? শরীর খারাপ?”
ফারিন মাথা নাড়িয়ে ধীর গলায় বলে, “না।”
জেসমিন ফারিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। গহনার বাক্স নিয়ে ফারিনকে দিয়ে বলে,
“দেখো তো পছন্দ হয়েছে কিনা?”
ফারিন দেখে। বলে, “গোল্ডের?”
“আমি আমার বড় ছেলের বউকে সিটি গোল্ড দেবো নাকি?”
“কিন্তু আন্টি আমি গোল্ড পরি না।”
জেসমিন ভ্রু কুচকে ফেলে। রুঢ় গলায় বলে, “আন্টি কি আবার? তোমার শাশুড়ি আমি। আম্মু ডাকবে নাহলে আম্মা ডাকবে? মডার্ন হয়েছো না শাশুড়িকে আন্টি ডাকা?”
ফারিন মুখ কালো করে ফেলে এভাবে কথা বলায়। মাথা নত করে ক্ষীণ গলায় বলে, “সরি।”
জেসমিন হেসে ফেললো। ফারিনের মুখ উঁচু করে বলে,
“রাগ করলে নাকি বকা দেওয়ায়?”
ফারিন দুদিকে মাথা নাড়ে। জেসমিন বলে,
“আমার তো মেয়ে নেই। আমার মেয়ের শখ আমার আগে থেকেই ছিল। আল্লাহ দেয়নি, দুটো ছেলে দিয়েছে। তাতে কি? বড় ছেলে এক মেয়ে এনেছে, পরে ছোট ছেলে আরেক মেয়ে আনবে।”
ফারিন চুপ করে রইলো। জেসমিন ফারিনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে, “তোমার বড় জা মানে আহানের বউকে ভাবি পুরো মেয়ের মতো আদর যত্ন করেছে। তিন্নি ভাবির সাথে অনেক ফ্রি ছিল। শুধু ভাবি কেন সবার সাথেই ফ্রি ছিল। আমার সাথেও মিশতো ভালোই। তবুও আমি চাচি শাশুড়ি, আমার চাইতে শাশুড়ির সাথে ভাব বেশি ছিল। তিন্নিকে ভাবি নিজের হাতে রান্নাবান্না শিখিয়েছে। তিন্নির জন্য শাড়ি, গহনা কিনতো। আমাদের হচ্ছে ছেলে। ছেলেদের জন্য ইদের শপিংও করবো কি? খালি শার্ট প্যান্ট কিনো। মেয়েদের জন্য যে কতকিছু কেনা যায়। মেয়ে আমার অনেক ভালো লাগে।”
ফারিন জেসমিনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। জেসমিন হেসে বলে, “কি? এভাবে তাকিয়ে আছো কেনো? ভাবছো এটা কেমন শাশুড়ি?”
“অনেকে তো মেয়ে পছন্দ করে না। মেয়ে হয়েছে বলে লাথি উষ্ঠা দেয়।”
“অনেকে কি করে জানি না। তবে আমার মেয়ে অনেক ভালো লাগে। আগে এতটা লাগতো না। সত্যি বলতে তিন্নি আর ভাবির ভাব দেখে বেশিই লাগে।”
ফারিন জোরপূর্বক হাসলো। জেসমিন গহনা গুলোর দিকে ইশারা দিয়ে বলে, “পছন্দ হয়েছে কিনা বললে না তো।”
ফারিন জোরপূর্বক হেসে বলে, “পছন্দ হয়েছে।”
জেসমিন বলে, “তোমার কাছেই রাখো।”
“এখন আপনার কাছে রাখুন? আমি পরে নেই?”
“আচ্ছা, উত্তরা গিয়ে আহসানের সাথে সব গুছিয়ে নাও। পরে এসে নিয়ে যেও।”
“জ্বি।”
“শোনো কাল কিন্তু তুমি আর আহসান তোমার বাবার বাড়ি যাবে। ওখান থেকে এসে একদিন থাকবে। তারপর আহসানের সাথে উত্তরা চলে যাবে। ঠিক আছে?”
ফারিনের সারাদিনের খোশমেজাজ নষ্ট হয়ে গেল। জেসমিনকে মনের ভাব বুঝতে না দিয়ে মাথা নাড়ে কেবল।
“শোনো আগেও বলেছি এখনও বলছি। আহসান কিন্তু বাকি তিনজনের মতো না। যে যা বলে তাই করে, সবাইকে খুব সম্মান দেয়। তাই বলে ওর জেদও কম না। শুধু একটু ভাইল দিয়ে চলতে হয় ওর সাথে।”
ফারিন ভ্রু কুচকে জিজ্ঞাসা করে, “ভাইল কি?”
“মানে হলো একটু খাতির দিয়ে চলতে হয় ওর সাথে। ভালো করে বুঝিয়ে বললে ঠিকই শোনো। মোদ্দা কথা খাতির দিয়ে, আদর যত্ন করে বোঝাতে হয়।”
“ওহ।”
“উদাহরণ দিয়ে বলি, ধরো তোমার ওর কোনো কাজ পছন্দ হচ্ছে না, কিন্তু ওই কাজটাই ওর ভীষণ পছন্দের। তখন ওকে কি করে ওই কাজ করা থেকে বিরত রাখবে জানো?”
ফারিনের চোখ চিকচিক করে উঠে। এটাই তো জানা চাই। ও বলে, “কি করে?”
“একটু বুঝিয়ে টুঝিয়ে সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলতে হয়। মুড বুঝে রিয়েকশন দিতে হয়। তাহলেই হয়। আহসান আর সেই কাজ করে না।”
ফারিন মাথা দোলায়। জেসমিন আবারও বলে,
“তুমি প্রতি বৃহস্পতিবারে আসলে তোমাকে আমি রান্না শিখিয়ে দিবো৷ ঠিক আছে?”
ফারিন মাথা নাড়ে। জেসমিন আরো টুকটাক কথা বলে ফারিনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই ফারিন বারান্দায় চলে যায়। চোখ ছলছল করে উঠে। নিজের মা লাথি দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছে। আর আহসানের আম্মু? ফারিন কি পারবে নাকি ফ্রি হতে? ফারিন জানে পারবে না। ওর কষ্ট হয়। ভাবতে ভাবতে শ্বাসকষ্ট অনুভব করে। দ্রুত সাইড ব্যাগ থেকে ইনহেলার বের করে ইনহেল করতে থাকে। ওকে অসুস্থ করে ফেলে এইসব চিন্তাভাবনা।
_________________
রাত এগারোটা। ফারিন ওয়াশরুম থেকে বের হতেই দেখে আহসান ঠিক ওয়াশরুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
“খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে আছো কেনো? সরো।”
আহসান ফারিনকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখে। সকাল থেকে যে শাড়ি পড়েছিল তা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পড়নে এখন সুতির কামিজ। বলে,
“বলো তো সুন্দরী সকালে যা করেছো তার জন্য কি করা উচিত?”
ফারিন মুখ ঘুরিয়ে নিলো। “তুমি যা করেছো তার কর্মফল পেয়েছো।”
আহসান ফারিনের মুখ নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলে,
“আমি শুধু তোমার উরুতে হাত রেখেছি। কিন্তু তুমি? তুমি তো এক্সট্রিম কাজ করেছো।”
“একটা মেয়ের শরীরে হাত দিবে কেনো?”
“মেয়েটা আমার বউ।”
ফারিন আহসানকে ধাক্কা মেরে ঘরে ঢোকে। শাড়িটা লাগেজের উপর রেখে বলে,
“তোমাদের এখানে জামাকাপড় ধোয় কে?”
“নিজেদের জামাকাপড় নিজেরা ধুই।”
“কাজের বুয়া নেই?”
“আছে, তবে ওটা হেল্পিং হ্যান্ড। আম্মুদের রান্নার কাজে আর ঘর গোছানোর কাজে সাহায্য করে।”
“তো এখন এই শাড়ি, ব্লাউজ ধুবে কে?”
“কেনো তুমি?”
“আমি পারি না শাড়ি ধুতে।”
“আচ্ছা আমি ধুয়ে দিবো।”
ফারিন আহসানের দিকে কপাল কুচকে তাকায়। আহসান বলে,
“আমি পারি। আমি নিজের জামাকাপড়ও ধুতে পারি। মাঝেমাঝে অনিরটাও ধুয়ে দেই। সমস্যা নেই।”
“না। তোমাকে আমার জামাকাপড় দেওয়া যাবে না। না জানি কি না কি করে ফেলো আমার জামাকাপড় দিয়ে।”
“হ্যাঁ তোমার শাড়ি ব্লাউজ পড়ে আমি ওয়াশরুমে তাধিনা ধিন নাচ দিবো।”
“তোমার মতো দৈত্য শরীরে আমার ব্লাউজ ঢুকবে না।”
“আমি পারফেক্ট ম্যান। এটা একটা ম্যানলি বডি। নট দৈত্য টাইপ।”
ফারিন ভেঙালো। আয়নার সামনে গিয়ে চুল আঁচড়াতে থাকে। আহসান ফারিনের পিছনে দাঁড়িয়ে বলে,
“ওড়না পড়োনি যে? খারাপ চোখে তাকালে দোষ হবে আমার।”
“সকালে তো লুকিয়ে দেখেছোই। আর কি?”
“লজ্জা নেই?”
“না।”
আহসান ফারিনের সাথে লেগে দাঁড়ালো। ফারিনের ঘাড়ের দিকে তাকিয়ে বলে,
“মাইরি! মানুষের এমন রং হয় কিভাবে? তোমার কি রক্ত কম শরীরে?”
ফারিন আহসানকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে বলে, “এমন গায়ের সাথে লেগে থাকো কেনো?”
“আমার বউ, আমি লাগি আর না লাগি তোমার কি?”
“শরীরটা আমার।”
“শরীর তোমারই থাক। মনটা আমাকে দিলেই হবে।”
“এইসব বলে লাভ নেই।”
“তুমি কি আমার সাথে সুস্থভাবে সংসার করবে না?”
“সুস্থভাবে সংসার করার মতো কিছু করেছো?”
“তোমাকে যদি আমি আমার প্রেমে ফেলতে পারি?”
“পারবে না।”
“কথা দাও তোমাকে আমি আমার প্রেমে ফেলতে পারলে মিসেস টাফ ওয়ান থেকে মিসেস সাফওয়ান হয়ে যাবে। পুরোদমে।”
“আগে প্রেমে ফেলো।”
ফারিন বেণী করে থাকতে। আহসান ফারিনের কোমরে হাত রেখে আয়নার দিকে তাকিয়ে চুল ঠিক করে বলে,
“আসো খোলাখোলি কথা হোক। প্রেমে ফেলতে পারলে কি করবে?”
“প্রেমেই যদি না পড়ি?”
“প্রেমে পড়তে বাধ্য। আমি মানুষটা প্রেমে পড়ার মতো।”
“কয়জনকে এমন ট্র্যাপে ফেলেছো যে এত কনফিডেন্স?”
“এত নেগেটিভিটি কেনো তোমার মধ্যে?”
ফারিন চোখ সরিয়ে নেয়। আহসান বলে, “বলো প্রেমে ফেলতে পারলে কি করবে?”
“তথাকথিত সংসার করবো। যে সংসারের প্রতি কয়দিন পর তোমার বিতৃষ্ণা জন্মাবে।”
“বিতৃষ্ণা জন্মাবে কেনো?”
“কারণ আমার ভাগ্যই বিতৃষ্ণায় ভরা।
ফারিন বিছানায় শুয়ে পড়লো। আহসান লাইট নিভিয়ে ডিম লাইট জ্বালায়। ফারিনের পাশে শুয়ে বলে,
“তোমার ভাগ্য বিতৃষ্ণায় ভরা মানে? দর্শনবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করেছো নাকি?”
ফারিন জবাব দিলো না। আহসান উঠে বসে। “বিয়ে করেছি একটা বেনেফিট উঠানো উচিত না?”
“মানে?”
ফারিন কিছু বুঝে উঠার আগেই আহসান ফারিনের উপর ভর ছেড়ে শুয়ে পড়ে। ফারিনের দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। ও আহসানের পিঠে কিল ঘুষি মেরে বলে,
“সরো তুমি। আল্লাহ! কি ভারী। আমি শ্বাস নিতে পারছি না।”
আহসান ফারিনকে জড়িয়ে ধরে বলে, “এতো সফট কেনো তুমি?”
“আহসান ছাড়ো আমাকে।”
“ছাড়ার জন্য বিয়ে করেছি?”
“তুমি আমাকে স্পর্শ করার আগে আমার অনুমতি নিয়েছো?”
“তোমার অনুমতি নিতে গেলে আর আমাকে বাঁচা লাগতো না। আশি প্লাস বয়স হলেও বউকে স্পর্শ বিহীন মরা লাগতো।”
“তুমি না আমাকে তোমার প্রেমে ফেলতে? তোমার প্রেমে পড়লে তো আমি এমনিতেই অনুমতি দিতাম। নাকি নিজের উপর বিশ্বাস নেই যে আমাকে নিজের প্রেমে ফেলতে পারবে না?”
আহসান ফারিনের দিকে তাকায়।
“তুমি আমার প্রস্তাব এক্সেপ্ট করেছো?”
“নিজের প্রেমে ফেলতে পারবে আমাকে? মনে তো হয় না।”
আহসান ফারিনের গাল ধরে ঠেসে ওকে দুটো চুমু দিয়ে বলে, “প্রেমে ফেলা কোনো ব্যাপার?”
ফারিন ভীষণ রেগে গেল। “যখন তখন গায়ে হাত দেওয়া বন্ধ করো। আর এইসব চুমাচাটিও করবে না। বিরক্ত লাগে। আগে প্রেমে ফেলে দেখাও।”
“আচ্ছা।”
“আমার উপর থেকে নামো এখন।”
আহসান শুনলো। পাশে শুয়ে পড়লো। ফারিন আহসানের দিকে পিঠ দিয়ে শুয়ে রইলো। আহসান ঠোঁট চোকা করে ফারিনের পিঠের দিকে তাকিয়ে থাকে। নীরবতা ভেঙে বলে,
“সারাদিন না শাড়ি পড়েছিলে? শাড়ি বদলে এখন জামা পড়লে কেনো?”
ফারিন আহসানের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলে, “কেনো শাড়ি পড়লে তোমার সুবিধা হতো?”
“হুম। দেখতে সেই সুবিধা হয়।”
“লুইচ্চা।”
“বলে দেখো জাতি বিশ্বাস করবে না। সাফওয়ান সিদ্দিক দ্যা গুড বয়।”
“যদি তোমার পরিবারের বাকিদের তোমার এই লুইচ্চা রূপটা দেখাতে পারতাম!
ফারিন মুখ ঘুরিয়ে নিলো। পাশবালিশ জড়িয়ে ধরে। আহসান পিছন থেকে ফারিনকে জড়িয়ে ধরে।
“আমি থাকতে তোমার কেনো পাশবালিশ লাগে সুন্দরী?”
ফারিন বিরক্ত হলো। ‘চ’ সূচক শব্দ করে বলে,
“গায়ে হাত দিতে নিষেধ করেছি না?”
আহসান ফারিনের কোমরে চিমটি দিয়ে বসে। ফারিন মুখ কুচকে কোমর ডলতে থাকে। রেগে বলে,
“এগুলো কি ধরনের অসভ্যতামো?”
আহসান পেঁচিয়ে জড়িয়ে ধরে বলে, “আয়েশা খাতুনকে বলে দিও তোমার বটগাছ চিমটি দিতে পারে।”
ফারিন অবাক হলো। “তুমি ওনার কথাগুলো শুনেছো?”
“তোমাকে কি বলেছে শুনিনি। তবে উনি আমাকে পার্সোনালি অনেক কিছুই বলেছেন। আমার নাকি সমস্যা আছে। তোমার জন্য আমাকে এটা শুনতে হয়েছে। এটা কত বড় আপমান বোঝো তুমি?”
“উনি একটা ঠোঁটকাটা বাজে মহিলা।”
“তা ঠিক। উনি এটাও বলেছে বউদেরকে নাকি এমন চিমটি, টিমটি দিয়ে বশে রাখতে হয়।”
“যেমন দাদি, তেমন নাতি। আহসান শোনো?”
ফারিনের গলা ভীষণ সিরিয়াস মনে হলো। আহসান বলে, “হুম বলো?”
“তোমাকে আমি শেষবারের মতো বলে দিচ্ছি এইভাবে হাত চালানো আমার পছন্দ না। হাসবেন্ড হয়েছো, রাস্তার ছেলেদের মতো বিহেভিয়ার করো কেনো? আমাকে এডজাস্ট করার ট্রাই অব্দি করোনি।”
আহসান অবাক হয়ে বলে, “রাস্তার ছেলে মানে?”
“পথ চলতে গিয়ে অনেক বাস্টার্ড দেখেছি। মেয়ে দেখলে যারা নিজেদের কন্ট্রোল করতে পারে না। মেয়ে দেখলেই লুইচ্চামি করতে মন চায় তাদের। মেয়ে দেখলেই শিস বাজায়। ট্রেনে, লোকাল বাসে উঠলে মেয়েদের গায়ে হাত দেওয়ার জন্য হাত ইসপিস করে। ঠিক তোমার মতো। তুমি রাস্তার ছেলেদের থেকেও বাজে বিহেভ করছো।”
আহসান সাথে সাথে ফারিনকে ছেড়ে দিলো। ফারিন ওপাশে ফিরে বলে, “এখন গুড বয়ের মতো ঘুমাও। রাস্তার ছেলে ছোকরার মতো বিহেভিয়ার যাতে না দেখি। তোমারই বউ, ভবিষ্যতে কারো দিকে চোখ না গেলে আমাকে আজীবন দেখতে, ছুঁতে পারবে। এখন সম্পর্কের শুরুতেই এইসব করে ইমপ্রেশন খারাপ করো না।”
ফারিন আর কিছু বলে না। গায়েও আহসানের স্পর্শ পায় না। ফারিন আস্তেধীরে মাথা ঘুরায়। আহসান বুকে হাত রেখে সোজা হয়ে শুয়ে আছে। জেসমিনের কথাটা কাজে দিয়েছে। জেসমিনের ভাষার ভাইল দিয়ে আসলেই আহসানকে জব্দ করা গেল। ফারিন বুঝলো এভাবেই তাল দিয়ে দিয়ে কাজ করাতে হবে। ফারিন মনে মনে ‘পাগল পরিবার’ বলে পাশবালিশ জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ে। গতরাতে ঘুম না হওয়ায় নিমিষেই চোখে ঘুম নেমে এলে। শেষরাতে ওয়াশরুম থেকে ফিরে আহসান ফারিনকে জড়িয়ে ধরেছিল। ফারিন টেরই পায়নি।
__________________
আহান, আদৃত ছাদে বসা। আদৃত ভ্যানভ্যান করছে ভীষণ। আহানকে বোঝাচ্ছে যাতে ও শিরিনাকে বোঝায় আদৃত উত্তরা যাবে না। আহান আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে,
“যাহ না কি হবে?”
“আমি একা থাকতে পারবো না। পুরো খালি বাসা। দমবন্ধ লাগবে আমার।”
“আমিও তো কানাডা গিয়ে একা থেকেছি।”
“আলাদা একটা দেশে গিয়ে একা থাকা আর পুরো পরিবারকে ফেলে আলাদা হওয়া অন্য ব্যাপার। আমি খাওয়া দাওয়া করবো কিভাবে?”
“আম্মু তো মাঝেমাঝেই যাবে।”
“তোমরা কেউ আমার দিকটা ভেবে দেখছো না।”
আহান আদৃতের কাঁধে হাত রেখে বলে, “লাইফ অনেক কষ্টের। আমরা ছোট থেকে কখনোই বুঝিনি লাইফে এত স্ট্রাগল আছে। আমি বিদেশে গিয়ে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি কত কষ্ট মানুষের জীবনে। আব্বুর হাতের মুঠোয় আছিস, আব্বু সব তৈরী করেই দিয়েছে, উত্তরা ব্রাঞ্চে যাহ। পজিশন হাই কর, স্ট্যাটাস ডেভেলপ কর। জীবনে টুকটাক স্যাক্রিফাইজ করতে হয়।”
আদৃত চুপ করে থাকে। আর একবার সবাইকে বলবে। তারপরও না শুনলে আর জীবনেও কাউকে কিছু বলবে না। নাকের পাটা ফুলে উঠছে ওর। আহানের মোবাইলে ভিডিও কল আসে। মোবাইল মেঝেতে ছিল। আদৃত দেখে তিন্নির ফোন। আহানকে বলে,
“রিসিভ করলাম? আহনাফ এখন সজাগ থাকে না?”
“হুম। কর।”
আদৃত রিসিভ করে। তিন্নি আদৃতকে দেখেই শুরুতে বলে,
“তোর ভাইকে দে।”
“কেনো? আমার ভাইকে দিয়ে তোর কাজ কি?”
“আদৃত আমার কিন্তু মেজাজ অনেক খারাপ। ভালোয় ভালোয় তোর ভাইকে দে।”
আহান কপাল কুচকে তাকায়। আদৃত বলে,
“আগে আহনাফকে দেখা তারপর দিচ্ছি।”
“আহনাফ ঘুমায়। এখন তোর ভাইকে দে।”
“বিশ্বাস করিনা। প্রমাণ দেখা।”
তিন্নি ব্যাক ক্যামেরা দিয়ে ঘুমন্ত আহনাফকে দেখায়। ঘুমের স্টাইল দেখে আদৃত হেসে উঠে। বলে,
“ও এমন পাছা উপরের দিকে দিয়ে শুয়ে আছে কেনো?”
“বাচ্চারা এভাবেই ঘুমায়। তোর ভাইকে দে।”
“এমন ছ্যাঁছড়া কেনো রে তুই? তোর লজ্জা লাগছে না ‘তোর ভাইকে দে, তোর ভাইকে দে’ বুলি আওড়াতে?”
“তোর লজ্জা লাগছে না ভাইয়ের ফোনে ভাবির কল রিসিভ করতে?”
“তুই আমার ভাইকে কল দিবি কেনো?”
“তুই আমার হাসবেন্ডের মোবাইলে আমার কল রিসিভ করবি কেনো?”
“চাল হাট।”
“আহানকে দে।”
আদৃত দিলো। তিন্নি আহানকে ঝাড়ি দিয়ে বলে,
“তুমি তো ওর পাশেই ছিলে। এতক্ষণ ধরে তোমাকে চাচ্ছিলাম, মোবাইল নিচ্ছিলে না কেনো?”
আহান মিথ্যা বললো। “আরেহ মাত্র বসলাম ওর পাশে। বলো কি বলবে।”
আদৃত কপাল কুচকায়। ও হলে বলতো, ‘তোমার সাথে কথা বলতে মন চাচ্ছিলো না তাই ধরিনি। তোমার কোনো সমস্যা?’ আর ওর ভাই না মিথ্যা বলছে?
তিন্নি বলে, “তুমি অবিবাহিত, না?”
“না তো।”
“তোর বেস্টু এসেছিলো।”
আহান বোকার মতো বলে, “আমার বেস্টু কে?”
“তোমার কলিগ। তোমার সেইই বেস্টু।”
আহান বিরক্ত হলো, “তিন্নি! আবার ওই মহিলাকে টানছো?”
তিন্নি চোখ রাঙিয়ে বলে, “তুমি বিরক্ত হচ্ছো কার উপর? আমার উপর?”
“আচ্ছা সরি।”
আদৃতের মুখ পুরো বিকৃত হয়ে গেল সাথে সাথে। বিরক্ত হওয়ার মতো কথা বললে বিরক্ত হবে না? আবার বিরক্ত হওয়ার পর সরিও বলতে হয়? আদৃত আহানের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। ওর ভাইয়ের এই কি অধঃপতন হলো?
তিন্নি বলে, “তোমার বেস্টু এসেছে বাসায়। শাহরিয়ার কেনো তিনদিন ধরে কাজে যায় না সেই খোঁজ নিতে। ওহ মাই গড। এত ভালোবাসা?”
আহান অসহায় গলায় বলে, “আমি কি বলেছি নাকি আসতে?”
“চুপ আমার কথার মাঝে একদম কথা বলবে না।”
আদৃতের বউ আদৃতকে এভাবে বললো আদৃত মাথায় তুলে একটা আঁছাড় মারতো। আদৃত অবাক হলো আহান যখন বলে,
“আচ্ছা বলো শুনছি।”
“আমাকে দেখে বলে জিজ্ঞাসা করে আমি কে? আমার বাসায় এসে আমাকে জিজ্ঞাসা করে আমি কে? আবার জিজ্ঞাসা করে লিভ ইনে আছি কিনা? আমি আমার হাসবেন্ডের সাথে থাকি। আমাকে বলে লিভ ইনে আছি কিনা?”
আহান চুপচাপ শুনে। তিন্নি ঝাড়ি দিয়ে বলে, “কথা বলছো না কেনো?”
“বলো শুনছি আমি।”
আদৃত মহিলা মানুষের রং দেখে অবাক হয়। একটু আগে বললো চুপ করতে, এখন আবার বলে কথা বলছো না কেনো? মানে কি চায় এরা?
তিন্নি আহানকে ঝাড়ি দিয়ে বলে, “তুমি বিয়ে করেছো চার বছর আগে। তোমার একটা ছেলেও আছে। তাও বাইরে অবিবাহিত সেজে ঘুরে বেড়াও তাই না?”
“বিয়ের কথা এত ঘটা করে বলার কি আছে? জনে জনে গিয়ে বলবো নাকি?”
তিন্নি তেজ দেখিয়ে বলে, “চুপ, একদম চুপ। বাজে ব্যবহার করছো কেনো তুমি আমার সাথে? আমাকে তো বলেছে বলেছেই। যখন বললাম আমরা বিবাহিত, আমাদের ছেলে আছে। তোমার কলিগ তো আমার ছেলেকে দেখে তো অবাক। বলে ও কি এডপ্টেড নাকি তোমাদের আসল বাচ্চা। আমার বাচ্চাকে বলে এডপ্টেড! কত বড় সাহস!”
“আমার দোষ কি এখানে?”
“তুমি বিবাহিত এটা জানলে তো বলতো না।”
আহান চুপ করে রইলো। তিন্নি ফের বলে,
“এই, এই ও আমাদের বাসার ঠিকানা জানলো কি করে?”
“ডকুমেন্টসে থাকে ঠিকানা।”
“এখনও বাইরের মানুষ জানে না তুমি বিবাহিত। মানে অবাক হচ্ছি আমি ছেলে হওয়ার পরও জানে না। আর আমাকে বিয়ে করে বিয়ের পাঁচদিনের মাথায় কানাডা চলে আসার পর না জানি কি কি করেছো! আমি তো বিয়ের আড়াই বছরের মাথায় তোমার কাছে এসেছিলাম। মাঝে কি কি করেছো ফটাফট বলে ফেলো তো।”
আহান পড়ে বিপাকে। এদিকে আহানকে মিউ মিউ করতে দেখে আদৃত মুখ কুচকায়। ব্যঙ্গ বলে, “ইয়ু বউয়ের সামনে এত ওয়েটলেস কিভাবে হয় মানুষ? ছিহ! মাইগ্গাদের মতো মিউ মিউ করছে। ছিহ! কেমন করে! এতবার সরি বলার কি আছে? ও কথা বললে বলবে না বললে নাই। আর আমার ভাই কি করছে! ইসসিরে!”
আহান আদৃতের কথা শুনে দূরে গিয়ে দাঁড়ায়। আদৃত অস্বাভাবিক মুখ করে বড় ভাইকে দেখতে থাকে। একটু পর আদৃত দেখে আহান কান ধরে সরি বলছে। আদৃতের মুখের ছবি যদি এখন কেউ তুলতে পারতো?
একটু পর আহান আসে। মোবাইল পাশে রেখে দুহাত পিছনে দিয়ে শরীর টানটান করে বসে। আদৃত মুখ কুচকে বলে,
“তুমি এমন ক্রিঞ্জ হয়েছো কবে থেকে?”
আহান আদৃতের দিকে তাকায়। আদৃত বলে, “তিন্নি অহেতুক কথা বলছিলো। তুমি আবার সায় দিয়েছো। সরি বলেছো। হোয়ায় ম্যান? একটা ধমক দিলেই পারতে?”
“শখের বেডি বিয়ে করলে অনেক কিছু সহ্য করতে হয়।”
“ক্রিঞ্জ। শখের বেডি আবার কি? আমি জীবনেও এইসব করবো না।”
“এইসব তিন্নির পোস্ট প্রেগন্যান্সি ডিপ্রেশনের সিম্পটমস। এমন হয়। ব্যাপার না। একটু সহ্য করলে কিছু হয় না।”
“বাচ্চার বয়স আটমাস। এখনও পোস্ট প্রেগন্যান্সি ডিপ্রেশন আছে?”
“বাচ্চার মায়েদের মোটামুটি এক বছর পর্যন্ত হরমোন চেঞ্জ হয় আর নানা ধরনের ডিপ্রেশনে ভুগে। তখন বাচ্চার বাবাদের উচিত ওয়াইফকে সাপোর্ট করা। তাছাড়া আট মাসের ছেলেকে নিয়ে বিদেশ বিভূঁইয়ে একা একা আছে। একা রাঁধছে, কাজ করছে, ছেলেকে সামলাচ্ছে। ছোটখাটো বিষয়ে রাগ হওয়া স্বাভাবিক। একটু ঝাড়ি খেলে কিছু হয় না।”
“তুমি পুরুষমানুষ হয়ে বউয়ের ঝাড়ি সহ্য করলে? আমি হলে কি করতাম জানো?”
“কি?”
“এমন ধমক দিতাম যে আর জীবনেও আমার সাথে এমন করার সাহস পেতো না। আমাকে অলওয়েজ সম্মান দিয়ে কথা বলবে। আমার সামনে মিউ মিউ করবে, আমি মিউমিউ করবো না।”
“তুই বলছিস তুই তোর অপছন্দের মানুষটার মতো হবি?”
“মানে?”
“আম্মু কিছু বললে আব্বুও আম্মুকে ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দেয়। তোর বিষয়টা খুব অপছন্দের। এরজন্য তুই আব্বুকে পছন্দ করিস না। কিন্তু ঘুরে ফিরে তুই বলছিস তুই ইন ফিউচার আব্বুর মতোই হবি।”
আদৃত অনেকক্ষণ ধরে ভাবলো। এরপর হাত তুলে সারেন্ডার করার ভঙ্গিতে বলে,
“আমার শখের বেডিও নাই, আমার কোনো তেলানোর ঝামেলাও নাই। তেলাবো তো নাই, পাশাপাশি আমার সাথে বেয়াদবি করলে আমি খবর করে দিবো।”
আহান হেসে বলে, “তুই-ই ভবিষ্যতে সবচেয়ে বড় বউ পাগলা হবি।”
আদৃত উঠে চলে গেল। যাওয়ার আগে বলে যায়,
“মরলেও শাহফায়েত সিদ্দিক কারো সামনে মাথা নোয়াবে না। আব্বুর মতো না হই, ভদ্র ভাষায় ধমক দিয়ে আচ্ছা মতো টাইট দিবো। তাও আমি এমন ক্রিঞ্জ কাজ করবো না। ইয়ু, ছিহ! বউকে মানুষ সরি বলে কি করে?”
চলমান…….
(হ্যাপি রিডিং…)

