#আফরিন_আখ্যান
#পর্ব_৫
#সমৃদ্ধি_রিধী
ফারিন গোসল করে মেরুন রঙের একটা শাড়ি পড়েছে। চুল আঁচড়ে লিপস্টিক দেওয়ার সময় আহসান রুমে ঢোকে। বিছানায় বসে কোণা চোখে ফারিনের দিকে তাকায়। ফারিন লিপস্টিক দিয়ে ঠোঁট চোকা করে দেখে। তারপর আহসানের দিকে তাকায়। আহসান চোখ সরিয়ে নেয়। ফারিন গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। আহসানের দিকে এগিয়ে আসে। আহসান মাথা তুলে ফারিনের দিকে তাকায়। ফারিন আহসানের কাঁধে হাত রেখে বলে,
“কেমন লাগছে আমাকে?”
“গর্জিয়াস।”
“আমি জিজ্ঞাসা করার আগে কমপ্লিমেন্ট দিলে না কেনো?”
“এমনিতেই।”
ফারিনের আহসানের দু কাঁধে হাত রেখে ওর গলা জড়িয়ে ধরে। “তোমাকে আমি একটা সুযোগ দিতে চাই।”
আহসান ফারিনকে আপ টু ডাউন দেখে নেয়। ফারিনের চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, “কিসের সুযোগ?”
“আজকে আমি তোমার শ্বশুরের বাড়ি যাবো না।”
“তো কোথায় যাবে?”
“তোমার সাথে সারাদিন ঘুরতে চাই।”
“উদ্দেশ্য কি ঝেড়ে কাশো। আমার সাথে এত ভাব জমাতে চাচ্ছো কেনো?”
ফারিন মুখ যথাসম্ভব স্বাভাবিক করে বলে, “তোমাকে সুযোগ দিতে চাচ্ছি। তোমার সাথে ঘুরবো, ফিরবো, সময় কাটাবো। বাবার বাড়ি অনেক যাওয়া যাবে। ওখানে যাওয়ার চাইতে তোমার সাথে এডজাস্ট করাটা বেশি জরুরি।”
“মেয়েরা বিয়ের পর পর বাবার বাড়ি যাওয়ার জন্য পাগল হয়ে যায়। আর তুমি ওখানে না গিয়ে যাকে অপছন্দ করো তার সাথে সময় কাটাতে চাচ্ছো?”
ফারিন আহসানের কাঁধে ধাক্কা দিয়ে সরে এলো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রাগি গলায় বলে,
“তোমাকে একটা চান্স দিতে চেয়েছিলাম। বাবার বাড়ি কাছেই। যখন তখন যাওয়া যেতোই। তুমি আমার স্বামী, তোমাকে যতই অপছন্দ করি, একসময় মেনে তো নিতে হবেই। রেডি হওয়ার সময় ভাবছিলাম তোমার সাথে নিজেকে এডজাস্ট করার জার্নিটা আজ থেকেই শুরু হলে কেমন হয়? আর আজকে ওয়েদারটা দেখেছো? ভীষণ ভালো। ভাবলাম তোমার সাথে একটু ঘুরাঘুরি করে কাটাই। থাক আমারই অফার দেওয়াটাই ভুল হয়েছে। বাবার বাড়িই চলো।”
আহসান ফারিনের পিছনে এসে দাঁড়ায়। “তুমি কি সিরিয়াসলি বলছো?”
“মজা করবো কেনো? তোমার সাথে আমার মজার সম্পর্ক?”
“ঘোরাঘুরি করার অফারটা কি শুধু আজকের জন্য? নাকি দুদিনের জন্য?”
“ঘোরাঘুরি করতে আমার ভালো লাগে। এখন তোমার সিদ্ধান্ত তুমি আমাকে কতদিনের জন্য ঘোরাঘুরি করতে নিবে।”
“বাবার বাড়ি যাবেই না?”
“ওখানে অনেক মানুষ। তোমার ভালো লাগবে না, আমাদেরও সময় কাটানো হবে না। মোদ্দা কথা তোমার সাথে আজকে থেকেই নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার জন্য চেষ্টা করতে চাচ্ছিলাম।”
আহসান ভাবলো অনেকক্ষণ। অফিস শুরু হলে আবার ব্যস্ত হয়ে পড়বে। তখন ফারিনের সাথে সময় কাটানো হবে না। অনেক ভেবেচিন্তে বলে, “গাজীপুর যাবে? অনেক সুন্দর একটা রিসোর্ট আছে আমার ফ্রেন্ডের বাবার।”
“যাবো।”
আহসান জানালার কাছে দাঁড়িয়ে ওর বন্ধুকে কল দেয়। ভীষণ বাতাস বইছে। ওর বন্ধুর সাথে কথা বলে কল কেটে দেয়। পকেটে মোবাইল ঢুকিয়ে বলে,
“বৃষ্টি আসবে বোধহয়।”
“হুম। ওয়েদারটা দারুণ।”
“আম্মুকে বলে আসি তোমাদের বাড়িতে যাবো না যে।”
“বলতে হবে না। একটা সাডেন আনপ্ল্যানড ট্যুর দেই চলো।”
আহসান ফারিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। ফারিন বলে,
“আচ্ছা তোমার ইচ্ছে হলে আম্মাকে বলো।”
আহসান ফারিনের দিকে তাকায়। “কেনো যেন মনে হচ্ছে নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য তুমি আমাকে ইউজ করছো।”
ফারিনের নাকের পাটা ফুলে ওঠে। মোবাইল নিয়ে বেডে বসে ফেসবুক স্ক্রল করতে থাকে। আহসান ফারিনের দিকে তাকিয়েই থাকে। ফারিন যে ভীষণ রেগে আছে তা ও বুঝতে পেরেছে। আহসান আরো কিছুক্ষণ লক্ষ্য করে বলে,
“রেগে গেলে নাকি?”
“আমার সাথে কথা বলবে না তুমি।”
“আচ্ছা সরি।”
“তোমার সাথে সময় কাটাতে চেয়েছি আর তুমি বলছো আমি নিজের স্বার্থের জন্য বলছি? আমাকে কোথাও নিতে হবে না তোমার।”
আহসান ফারিনের মুখোমুখি বসে। “আচ্ছা সরি। আমার ফ্রেন্ড সব রেডি করে রাখবে বলেছে। আমরা সময় মতো বেরিয়ে যাবো। তোমার বাবার বাসায় না গিয়ে গাজীপুর যাবো। ঠিক আছে?”
ফারিন চোখ সরিয়ে নেয়। ফেসবুক স্ক্রল করতে থাকে। আহসানের ডাক পড়লে ও উঠে চলে যায়। ফারিন ওর যাওয়ার পানে তাকিয়ে বিড়বিড়ায়। বাংলা ইংরেজিতে বকাবকি করতে থাকে।
__________________
আহসান ড্রাইভ করছে, ফারিন পাশে বসা। দুপুরের পর পরই ওরা বেরিয়ে গিয়োছিল৷ এখন ওরা রিসোর্টের খুব কাছেই। আহসান আহান ছাড়া কাউকে বলেনি ওরা রশিদ আলমের বাড়ি না গিয়ে গাজীপুর যাচ্ছে। মাঝরাস্তায় প্রচন্ড বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আহসান সাউন্ডবক্সে গান চালিয়েছে। এতক্ষণ ধরে বাংলা গান চলছিলো। এখন জারা জারা বেজে ওঠে। ফারিনের জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল৷ এখন আহসানের দিকে তাকিয়ে বলে,
“এইসব শোনো?”
আহসান হাসে। “শুনি তো।”
“এইজন্যই তো মাথায় শুধু ছোঁয়াছুঁয়ির ধান্দা ঘোরে।”
“বাইরের মেয়েদের সাথে তো ছোঁয়াছুঁয়ি করি না। বউয়ের সাথেই তো করি।”
জানালার খোলাই ছিল। ফারিন পুরোটা খুলে দিলো। হুহু করে বাতাস ঢোকে। আহসান বা দিকে টার্ন নিয়ে বলে,
“বৃষ্টি খুব পছন্দ?”
“খুব।”
“আমরা কিন্তু চলেই এসেছি। চুল বেঁধে ফেলো।”
ফারিন চুল বেঁধে ফেলে। আঁচল ঠিকঠাক করে নেয়। ঘড়িতে সময় দেখে রাত সাড়ে আটটা বাজে। আহসান রিসোর্টের ভিতর ঢুকে পার্কিং এড়িয়ায় গাড়ি ঢোকায়। ফারিন দেখে চারদিকে একটা গ্রামীণ আবহা। আহসান গাড়ি থামায়। বৃষ্টি পড়ছে। ফারিন বলে,
“নামবো কি করে? বৃষ্টি পড়ছে তো।”
“কেয়ারটেকার আসবে ছাতা নিয়ে। একটু অপেক্ষা করো।”
মিনিট দুয়েক পর কেয়ারটেকার ছাতা নিয়ে আসে। আহসান ওনার ছাতা নিয়ে গাড়ি থেকে নামে। ফারিনের পাশের গাড়ির দরজা খুলে দেয়। ফারিন আঁচল ডান কাঁধে তুলে নিয়ে নামে। হাতে সাইড ব্যাগ। ফারিন চারদিকে চোখ বুলিয়ে দেখে খুব সুন্দর রিসোর্ট। গাছপালায় ঘেরা এবং অনেক বড় বড় মাঠ। ল্যাম্পে মিটিমিটি আলো জ্বলছে। ফারিনের রিসোর্টটা খুব ভীষণ পছন্দ হলো। বৃষ্টি না হলে এখন ও এই মাঠে ঘাসের উপর ছুটে বেড়াতো। কারো পরোয়া করতো না।
আহসান ফারিনের কাঁধে হাত রেখে বলে, “চলো।”
ফারিন মাথা দুলিয়ে শাড়ি একটু উঁচু করে ধরে। দুজনে এক ছাতার নিচে হেঁটে কটেজে যায়। দোতালা কটেজ, তিন তলায় ছাদ। ফারিন আর আহসান দোতালায় উঠে। একটা রুমে কেয়ারটেকার ব্যাগপত্র রেখে যায়। কেয়ারটেকার যেতেই আহসান দোতালার দরজা লাগিয়ে দেয়। অনেক বড় ড্রয়িংরুমে। সাথে গ্রাইগ্লাস দিয়ে বারান্দা। ফারিন বারান্দায় যায়। পিছন পিছন আহসানও আসে। খোলা বড় বারান্দা। অনেকটা ছাদের মতোই বড়। রেলিংয়ে হেলান দিয়ে কফি হাতে নিয়ে দুজন গল্প করতে পারবে এমন। বারান্দা দেখে আহসান বলে,
“খুব সুন্দর না?”
“মারাত্মক।”
“বৃষ্টি দেখতেও ভালো লাগছে।”
“হুম। খুব সুন্দর আবহাওয়া।” আহসানের দিকে ফিরে বলে, “থ্যাংকস এত সুন্দর জায়গায় নিয়ে আসার জন্য।”
“তোমারই প্ল্যান। আমি শুধু জায়গাটা চুজ করেছি।”
ব্যঙের ডাক শোনা গেল। আহসান বলে,
“রুমে আসো। চেঞ্জ করে নাও।”
“হুম।”
ড্রয়িংরুমের তিন দিকে তিনটা রুম। আহসান, ফারিন একটা রুমে ঢুকে দেখে দুটো বেড। ফারিন বেশ খুশি হয়। নরম বিছানায় হাত পা মেলে শুয়ে পড়ে। “ওয়াও গ্রেট কতদিন পর একা ঘুমাবো।”
“এক্সকিউজ মি?”
“দুটো বেড। একটায় তুমি, আরেকটায় আমি ঘুমাবো।”
“নেভার।”
“কেনো?”
“বিয়ে করেছি কি একা ঘুমাতে?”
“আই নিড স্পেস।”
“তোমাকে তো যথেষ্ট স্প্রেসই দেওয়া হচ্ছে। আর কত?”
“জাস্ট স্টপ। কে কোথায় ঘুমাবে পরে ভাবা যাবে। এখন ফ্রেশ হতে যাও তুমি।”
“গোসল করবো আমি।”
“এখন?’
“জার্নি করার পর গোসল না করলে পাগল পাগল লাগে।”
“সাবান, শ্যাম্পু আছে ওখানে?”
“না থাকলেও নিয়ে এসেছি।”
“সাবান, শ্যাম্পু নিয়ে এসেছো?”
“হ্যাঁ, লাক্স সাবান আর সানসিল্ক প্যাকেট শ্যাম্পু।”
“ফাইন। যাও গোসল করো গিয়ে।”
আহসান মাথা দুলিয়ে ওই রুম থেকে বেরিয়ে পাশের রুমগুলো দেখে। ওদের বাম পাশের রুমেও দুটো বেড আছে, কিন্তু ডান পাশের রুমে একটাই বেড আছে। আহসান রাতটা এই রুমে থাকবে ভাবলো। কিন্তু ফারিন এখানে আসতে চাইবে না তা নিয়ে আহসান শতভাগ নিশ্চিত। থাক অন্য উপায় বের করবে ও পরে। ফারিন যে রুমে আছে ওই রুমে গিয়ে ব্যাগ থেকে সাবান, শ্যাম্পু, থ্রি কোয়ার্টার প্ল্যান্ট, টিশার্ট, তোয়ালে নিয়ে ওয়াশরুম চলে যায়।
গিজার অন করে হট শাওয়ার নিয়ে বের হয় ঘন্টাখানেক পর। ওয়াশরুমের দরজা খোলার শব্দে ফারিন চোখ তুলে তাকায়। আহসান চুল মুছতে মুছতে বের হয়। চোখ বন্ধ করে মাথায় তোয়ালে ঘষছে। ফারিন অস্ফুটস্বরে বলে ওঠে,
“ড্যাম! হাও ম্যানলি!”
আহসান ড্রেসিংটেবিলের সামনে এসে দাঁড়ায়। মাথা মুছে চশমা পড়ে নেয়। ফারিনকে বলে, “তুমি তো গোসল করবে না?”
ফারিন নিজের দৃষ্টি লুকালো। “না, করবো।”
“সাবান, শ্যাম্পু রেখে এসেছি।”
ফারিন ব্যাগ থেকে টিশার্ট, ট্রাউজার বের করে। তোয়ালে খুঁজেও পায় না। মনে পড়ে সকালে বারান্দায় মেলে দিয়েছিল। আর ব্যাগে ঢোকায় নি। তোয়ালে নেওয়ার কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছিল। বড় বড় পা ফেলে আহসানের কাছে এসে আহসানের হাত থেকে তোয়ালে নিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায়।
ওয়াশরুমের দরজা লাগিয়ে আহসানের তোয়ালে নাকে চেপে ধরে। নাক টেনে শ্বাস নেয়। ড্যাম..আবারও নাক টেনে ওয়াশরুমের আয়নার দিকে তাকায়। ফারিন নিজের কাজে নিজেই অবাক হলো। নাক থেকে তোয়ালে সরিয়ে অবাক হয়ে বেশ কিছুক্ষণ আয়নার দিকে তাকিয়ে থাকে।
_______________
আনোয়ার সিদ্দিক আদৃতকে সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছে এক তারিখ আদৃতকে উত্তরা ব্রাঞ্চে যেতে হবে। আদৃত যাতে আর দ্বিমত না করে। উত্তরা ব্রাঞ্চে লোক প্রয়োজন। আদৃতকে যেতেই হবে। আজকে পঁচিশ তারিখ। হাতে আর ছয়দিন। আনোয়ার সিদ্দিক বলেছেন এই ছয়দিনে উত্তরার ফ্ল্যাটের জন্য জিনিসপত্র, আসবাবপত্র কেনার জন্য। আদৃত হন্তদন্ত হয়ে নিচতলায় নামে। শেষবারের মতো শিরিনাকে বোঝাবে। যদি না মানে তাহলে জীবনে আর কিছু বলবে না। শিরিনা, জেসমিন কাজ করছিলো।
আদৃত শিরিনাকে কিচেনে এসেই তেজ দেখিয়ে বলে, “তুমি চাও না আমি এখানে থাকি?”
শিরিনা অবাক হলো। কথা ধরতে না পেরে বলে,
“উত্তরায় যাওয়ার ব্যাপারে বলছিস?”
“জ্বিইইই।”
“যা না বাপ। ওখানের কাজ করতে হবে না? তোর আব্বুর কত কষ্টের ব্যবসা।”
“তুমি না মা? তোমার কষ্ট হবে না? বড় ছেলে বিদেশ, এখন ছোট ছেলেকে বাড়ি থেকে বের করে দিচ্ছো?”
“বাড়ি থেকে বের করছি না। স্বাবলম্বী বানাচ্ছি। এখানে সাধারণ কর্মচারীর মতো আছিস। উত্তরা ব্রাঞ্চে গেলে তোর স্থান বড় হবে। সম্মান বাড়বে। মায়েরা সবসময় ছেলের ভালোই চায়।”
অনি আসে তখন। আদৃত রেগে মেগে বলে,
“আমাকে যে বাসা থেকে বের করছো না? আমি আর আসবো না তো। সময় আছে আব্বুকে বোঝাও। আমি কিছু বলতে গেলে একটা গণ্ডগোল লেগে যাবে।”
জেসমিন এতক্ষণ কথা না বললেও এখন মজা করে বলে, “আচ্ছা এই বাড়িতে না এসে শ্বশুরবাড়ি যাস।”
“ওখানেও যাবো না।”
“যাবি যাবি। বিয়ের পর সব করবি।”
“আমি ছ্যাবলা না যে শ্বশুরবাড়ি গিয়ে পড়ে থাকবো। এইযে এইসব ইচ্ছা করে তোমরা করেছো। আমি যে পরশু চলে যাবো না? এরপর আমাকে এই বাড়িতে কিভাবে আনো আমিও দেখবো।”
শিরিনা বিরক্ত হলো। “তোকে কি সারাজীবনের জন্য বের করে দেওয়া হচ্ছে? সবসময় বেশি করিস।”
“হ্যাঁ হচ্ছে। এটা সারাজীবনের জন্যই বের করা হচ্ছে।”
অনি চুলে হাত গলিয়ে বলে, “আমাকে সবাই ভালোবাসে। তাই আমাকে কোথাও যেতে হবে না। তোমরা বড় তিনজনই আউট, শুধু আমি ইন।”
আদৃত সাপটে অনির গালে একটা চড় মারে। সমস্ত রাগ উশুল করে চড়টা মেরেছে। অনি গালে হাত দিয়ে আম্মু, জেঠিম্মুর দিকে অসহায় চোখে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু তাতেও ওনারা কিছু বলে না। জেসমিন বলে,
“ঠিক হয়েছে। বড় ভাইয়ের কথার মাঝে কথা বলেছিস কেনো?”
আদৃত কিচেন থেকে বেরিয়ে সোফার উপর বসে। অনি পিছন পিছন আসে। আদৃতের পাশে বসে বলে,
“তুমি উত্তরা চলে যাবে তাই তোমার মন খারাপ?”
“তোর জন্য তো ভালো। এই বাড়ির একমাত্র শাহানশা হয়ে যাবি তখন। আকাম, কুকাম করবি, কিন্তু কেউ ধরতে পারবে না।”
অনি মন খারাপ করে বলে, “তোমাকে মিস করবো আমি অনেক।”
“মিস গুলে খেয়ে ফেল।”
আহান উপর থেকে নামে তখন। শিরিনাকে এক কাপ কফি দিতে বলে সোফায় বসে। অনি আহান, আদৃতকে বলে, “জাবিতে ঘুরতে যাবে ভাইয়া?”
আদৃত মুখ কুচকে বলে, “ইউউউ জাবিতে মানুষ যায়? থু।”
“জাবি কত সুন্দর!”
আহান বলে, “চল। ঘুরে আসি। আমি আর বেশিদিন নেই। ভাইরা মিলে একটা ট্যুর দেই।”
আদৃত বলে, “মেজো ভাইয়া তো নেই।”
আহান মজা নিয়ে বলে, “ও বউয়ের সাথে ট্যুর দিচ্ছে তাই দিক। আমরা কালকে জাবিতে যাই। ও আসলে আউটডোরে যাবো।”
অনির চোখ চিকচিক করে উঠে। “কোথায় আউটডোরে যাবে?”
আহান আদৃতকে বলে, “সাজাক গিয়েছিস?”
“এখনও না।”
“আহসান আসুক। সাজেক যাবো চারজন মিলে।”
আদৃত বলে, “ভাইয়া বউ রেখে আমাদের সাথে ট্যুর দিবে?”
আহান বলে, “এখন ফারিন তো আমাদের চারজনের সাথে যাবে না। দেখতেও ভালো দেখায় না। তিন্নি থাকলে আরেকটা ব্যাপার ছিল। আচ্ছা আহসানের সাথে কথা বলে নেই। তখনই বোঝা যাবে।”
“তাহলে কালকেই জাবিতে চলো।”
আহান বলে, “ওকে।”
অনি বড় সোফায় চিৎ হয়ে শুয়ে বলে, “ভাই ঢাবি থেকেও জাবি সুন্দর। আর ওখানের স্টুডেন্টরাও সুন্দর।”
আদৃত বলে, “ওখানের স্টুডেন্টদেরকে ইয়াক। কত খারাপ রেকর্ড আছে জানিস?”
আহান বলে, “সব জায়গায়ই ভালো খারাপ আছে। তোর নর্থ সাউথে ভালো খারাপ নেই?”
শিরিনা আহানের কফি নিয়ে আসে। বলে, “কি নিয়ে কথা হচ্ছে?”
অনি বলে, “সেজো ভাইয়ার পছন্দের জাবি নিয়ে।”
“কিসের জাবি আমার? জাবি আমি পছন্দ করি না।”
শিরিনা বলে, ”এভাবে বলিস না। মানুষ যা নিন্দে তাই পিন্দে।”
আদৃত বিশ্বজয়ের হাসি দিয়ে বলে, “আমার গ্র্যাডুয়েশন শেষ।”
অনি বলে, “তোমার বউয়ের নাও শেষ হতে পারে।”
আদৃত অনির মাথায় ঠুয়া মেরে বলে, “চাল হাট।”
“প্ল্যান ফাইনাল তাহলে? কালকে জাবিতে যাবো। আহসান আসলে সাজেক যাবো। ওকে?”
“ওকে।”
প্রচন্ড জোরে বৃষ্টি নামে। আদৃত বিরক্ত হয়ে মুখ কুঁচকে বলে,
“লাগে কেমন? বৃষ্টি থামলে গরমে টেকা যাবে না এরপর। বৃষ্টি আমার একটুও ভালো লাগে না।”
____________________
ফারিনও গোসল করে বের হলো। সত্যিই রিলাক্সড লাগছে। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে দেখে আহসান রুমে নেই। ও চুল মুছতে মুছতে ড্রয়িংরুমে আসে। দেখে আহসান টেবিলে খাবার বাড়ছে। ফারিন চুল ঝাড়তে ঝাড়তে আহসানের পিছনে এসে দাঁড়ায়। আহসানকে পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। আহসান পিছনে ফিরে ফারিনকে দেখে প্লেটে খাবার বেড়ে বলে,
“খিদা পেয়েছে? খাবে এখন?”
“হুম খাবো।”
“আসো তাহলে।”
চুলে তোয়ালে পেচিয়ে ফারিন হাত ধুয়ে আসে। মোরগ পোলাও আর কাবাব। আহসান বেতের চেয়ার টেনে বসে। ফারিন এক লোকমা খেয়ে বলে,
“অনেক মজা।”
আহসানও খায়। “হুম, মজা।”
দুজনে নিঃশব্দে খাবার খায়। মাঝে দুবার অনেক জোরে জোরে বাজ পড়ে। আহসান ফারিনের দিকে তাকায়।
“এত জোরে জোরে বজ্রপাত হচ্ছে, ভয় পাচ্ছো না?”
“উহু।”
“কেনো? মেয়েরা তো বজ্রপাত ভয় পায়।”
“ন্যাকাবতীরা ভয় পায়। যারা স্বাভাবিক তারা পায় না।”
আহসানের খাওয়া শেষ। ফারিনেরও শেষ। আহসান হাত ধুয়ে প্লেট দুটো টি-টেবিলেই রেখে দেয়। ফারিন হাত ধুয়ে চুলের টাওয়াল খুলে খোলা বারান্দায় যায়। রেলিংয়ে বসে হাত বাড়িয়ে বৃষ্টি ছুঁতে থাকে৷ আহসান আসে।
“এখানে এভাবে বসেছো কেনো? পড়ে যাবে তো।”
“পড়বো না।”
আহসানও রেলিংয়ের উপর বসে। পিলারে হেলান দিয়ে বুকে হাত গুঁজে ফারিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। ফারিন বাইরের দিকে মুখ বাড়িয়ে দেয়। বৃষ্টির পানি ওর মুখ ভিজিয়ে দিচ্ছে। ভেজা চুল আরো ভিজিয়ে দিচ্ছে। ফারিন আহসানের দিকে তাকায়। দুজনের চোখাচোখি হলেও আহসান চোখ সরায় না। ফারিন বৃষ্টির পানি নিয়ে আহসানের মুখে পানি ছিটিয়ে বলে,
“এভাবে তাকিয়ে আছো কেনো?”
“মনোযোগ দিয়ে দেখছি।”
“কি?”
“আমার ওয়াইফকে।”
“নাটক।”
বলে ফারিন রেলিংয়ে বসে আবার হাত বাড়িয়ে দেয়। আহসান মোবাইল নিয়ে আসে। ফুল সাউন্ড দিয়ে ইউটিউবে গান ছাড়ে,
“শীতল বাতাসে, দেখেছি তোমায়
মেঘ মিলনে চেয়ে রাগ করো না
মন চায় তোমায় আজই রাতে
শীতল বাতাসে, দেখেছি তোমায়
মেঘ মিলনে চেয়ে রাগ করো না
মন চায় তোমায় আজই রাতে
রাতে…রাতে”
ফারিন আহসানের দিকে তাকিয়ে থাকে। আহসান ফারিনের হাত টেনে ওকে নিজের কাছে আনে। মুখের উপরের চুল কানের পিছনে গুঁজে দিয়ে ফারিনকে সামনে বসায়। ফারিনের চুল পিঠ থেকে সরিয়ে ডান কাঁধে ফেলে। ফারিনের বাম কাঁধে থুতনি রেখে ওকে পিছন থেকে খুব পলাইটলি জড়িয়ে ধরে। ফারিন অন্যান্য বারের মতো কিছু বলে না।
আহসানের বুকে হেলান দিয়ে আবারও বৃষ্টির মধ্যে বাম হাত বাড়িয়ে দেয়। সাথে সাথেই আহসান ওর হাতের নিচে নিজের বাম হাত রাখে। খুব জোরে বজ্রপাত হলো। ফারিন সচরাচর ভয় না পেলেও এখন এতটাই জোরে বাজ পড়েছে যে ও এবার সামান্য কেঁপে ওঠে। আহসান সাথে সাথে আরেকটু দৃঢ়ভাবে জড়িয়ে ধরে। ফারিনের বাম হাত নিজের বাম হাতের মুঠোয় পুরে নেয়। তীর্যকভাবে আসা দুজনের গায়ে বৃষ্টি আছড়ে পড়ছে। মুহুর্তেই দুজনে ভিজে যায়।
চলমান…..
(হ্যাপি রিডিং…)

