#আফরিন_আখ্যান
#পর্ব_৬
#সমৃদ্ধি_রিধী
সকাল এগারোটা বাজে। আদৃত, অনি পাশাপাশি জাবির ক্যাম্পাসে হাঁটছে। গতরাতে বৃষ্টি হওয়ার পর জাবির চারপাশটা দেখতে খুব সুন্দর লাগছে। আদৃত বিরক্ত হয়ে বলল,
“এই বৃষ্টির মধ্যে বনজঙ্গলে হাঁটতে কেমন লাগে?”
অনি বলে, “আমার তো দারুণ লাগছে। আর এটা বনজঙ্গল না, এটা পাবলিক।”
আদৃত পিছনে ঘুরে আহানের দিকে তাকায়। আহান তিন্নিকে ভিডিও কল দিয়ে চারদিক দেখাচ্ছে। তিন্নির কোলে আহনাফও বসা। আহান মা, ছেলের সাথে কথা বলতে বলতে আসছে বলে অনি আর আদৃতের অনেকটাই পিছনে। আদৃত অনিকে বলে,
“ভাইয়ার হাত থেকে মোবাইলটা নে তো। কখন থেকে বউয়ের সাথে পকরপকর করছে। বিরক্ত লাগছে আমার।”
“বড় ভাইয়া আমাকে মারবে।”
“ভাইয়ার হাত থেকে মোবাইল না নিলে আমি তোকে মারবো।”
অনি গোলগোল চোখ করে তাকায়। আদৃত বলে,
“যা তাড়াতাড়ি।”
তবে অনির যেতে হলো না। আহান পকেটে মোবাইল ঢুকিয়ে ওদের কাছে আসে।
“তোরা দাঁড়িয়ে আছিস কেনো এভাবে?”
“তোমার জন্য।” অনি দাঁত দেখিয়ে হেসে বলে।
ওরা আবার একসাথে হাঁটা শুরু করে। আদৃত কপাল কুচকে বলে, “আচ্ছা জাবি দেখার মতো কিছু?”
অনি বলে, “আমার অনেক ভালো লাগে।”
আহান বলে, “তো এডমিশন টেস্ট দিতি। পড়তি এখানে।”
অনি দায়সারাভাবে বলে, “বাবাগো! এডমিশন টেস্ট? এত কষ্ট কেনো করতে যাবো? ভাল্লাগে, ঘুরতে আসবো শেষ। পড়ে প্যারা বিহীন প্রাইভেটে পড়ে দিন কাটিয়ে দিবো।”
আদৃত হেসে উঠে। “প্রাইভেটে ঢোক একবার। টের পাবি কেমন চিল। চারদিকে খালি চিল আর চিলই থাকবে। বাদুড়, কাক, দোয়েল, ময়না, টিয়া কিছু দেখতে পাবি না।”
“যেটাই হোক। ব্র্যাকেই পড়বো আমি।”
আদৃত বলে, “ধুর! বিরক্ত লাগছে আমার। গাছপালা ছাড়া কিছু নেই।”
আহান বলে, “হাঁটতে তো ভালোই লাগছে। ওয়েদারটা অনেক সুন্দর। পরিবেশটাও জোশ।”
“হুহ সেরা!” আদৃতের ব্যঙ্গাত্বক স্বর।
ওদের পাশ দিয়ে হেঁটে একদল গেল। কেউ একজন বলছিল, “পেয়ারার বাচ্চাটা এখনও আসলো না! এত লেট করলে কিভাবে হবে?”
অনি ওদের কথা শুনে ওদের সবার দিকে তাকিয়ে থাকে। ওরা অতিক্রম করে যেতেই অনি বোকার মতো প্রশ্ন করে,
“পেয়ারা কারো নাম হয়?”
আদৃত চোখে চশমা ঠেলে পকেটে হাত গুঁজে বলে,
“নাম মনে হয় পায়রা বা আয়রা টাইপের কিছু। ফ্রেন্ডরা মজা করে পেয়ারা ডাকে।”
আহান বলে, “হতে পারে। নামটা পায়রা হলে পেয়ারা ডাকাটা খাপে খাপ।”
আদৃত মজা নিয়ে বলে, “পায়রা নাম হলে মজা করে বয়রা ডাকা হলে আরো খাপে খাপ।”
তিন ভাই হাসতে থাকে। অনি হাসতে হাসতে বলে,
“আমরা কাকে নিয়ে মজা নিচ্ছি?”
আদৃত বলে, “মজা নেওয়ার দরকার মজা নিতে থাক। কাকে নিয়ে মজা নিচ্ছি সেটা ফ্যাক্ট না।”
আহান বলে, “জীবনে মজাটাই হলো আসল।”
___________________
সকাল সাড়ে এগারোটা বাজে ফারিনের ঘুম ভাঙে। চোখ খুলেই দেখতে পায় ওর মুখোমুখি সামনের বেডে আহসান কোলে থাকা ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে কফি মগে চুমুক দিচ্ছে। ফারিন গালের নিচে হাত দিয়ে আহসানের দিকে তাকিয়ে থাকে। গতরাতে ওরা সাড়ে তিনটা, চারটা অব্দি বারান্দায় ছিল। এমনটা নয় যে দুজনে খুব গল্প করেছে। কোনো কথাই হয়নি, দুজনে শুধু পাশাপাশি বসে ছিল। রেলিং থেকে নেমে বারান্দার দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে বাইরের বৃষ্টি দেখছিল।
রুমে এসে ফারিন শুধু একবার বলেছিল ও একা ঘুমাবে। আহসান টু টা কিছুই বলেনি। ডান পাশের বেডে কমফোর্টার গায়ে দিয়ে শুয়ে পড়ে। ফারিন বাম পাশে দেওয়ালের সাথে লাগানো বিছানায় শুয়ে গালে হাত দিয়ে আহসানের পিঠের দিকে তাকিয়ে থাকে। একটু পর আহসান ফারিনের দিকে ফিরে। চোখাচোখি হলো তাও ফারিন চোখ সরায় না। দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ফারিন কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে টেরই পায়নি।
আহসান কফি মগে চুমুক দিয়ে ফারিনের দিকে তাকাতেই চমকালো। ফারিন উঠে বসে।
“এভাবেই আমার ঘুমের সুযোগ নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকো তাই না?”
আহসান হাসলো। “গুড মর্নিং।”
“ইউ টু।”
আহসান টাইপ করে। ফারিন বেড থেকে নেমে বলে,
“কাজ করছো?”
“হুহ।”
“ল্যাপটপ কি সাথে করে নিয়ে এসেছিলে?”
“হুহ।”
“কোথায় ছিল? জামাকাপড়ের ব্যাগে তো ছিল না।”
“গাড়িতে ল্যাপটপের ব্যাগে ছিল। গাড়ি থেকে গিয়ে নিয়ে এসেছি।”
ফারিন ওর ব্যাগ থেকে ব্রাশ বের করে বলে, “কফি খাচ্ছো?”
“হুম।”
“আমারও এক কাপ লাগবে।”
আহসান ফারিনের দিকে তাকায়। হাতে তোয়ালে, জামাকাপড় দেখে বলে, “আচ্ছা চাচাকে বলছি দিতে। কিন্তু তুমি কি গোসল করবে?”
“হুম।”
“কালকে এখানে এসে রাতে করেছো। এখন করো না। ঠান্ডা লেগে যাবে। এমনিতেই দেখো বাইরের ওয়েদারটা ঠান্ডা।”
ফারিন রুমের বারান্দায় গেল। মেঘলা আবহাওয়া। আকাশে কালো মেঘ। যেকোনো সময় আবারও বৃষ্টি নামতে পারে। ফারিন জামাকাপড় রেখে তোয়ালে, ব্রাশ নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল। ফ্রেশ হয়ে এসে দেখে আহসান মাত্র ধোঁয়া উঠা কফি মগ নিয়ে রুমে ঢুকছে। ফারিন আহসানের হাত থেকে কফি মগ নেয়।
“থ্যাংক ইউ।”
আহসান খাটে বসে হাসে। মাথা নুইয়ে বলে, “মাই প্লেজার।”
ফারিন হাসলো। এক চুমুক দিয়ে আহসানের দিকে তাকায়। আহসান ল্যাপটপ কোলে নিয়ে আবারও টাইপ করতে থাকে। ফারিন হেঁটে আহসানের পাশে বসে। ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রেখে বলে,
“কি করো?”
“কাজ করি।”
“ঘুরতে এসেও কাজ?”
“আর্জেন্ট একটা ইমেল পাঠানো হবে।”
“ওহ।”
“এমডি হওয়া এত সোজা নয় গো সুন্দরী। শুনতে খুব পশ মনে হলেও আমার জীবন, যৌবন আর জীবন যৌবনের জায়গায় নেই কাজ করতে করতে।”
“জীবন, যৌবন না থাকার পরও এইসব? থাকলে কি হতো?”
আহসান উত্তর দিলো না। ব্যস্ত হাতে টাইপ করতে থাকে। ফারিন এক হাতে ভর দিয়ে ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে দেখতে থাকে আর মগে চুমুক দেয়। একটু পর আহসান ইমেল পাঠিয়ে দিয়ে আড়মোড়া ভাঙে। বলে,
“বিকালের দিকে বাইরে বের হবো হ্যাঁ?”
“কয়টায়?”
“তিনটার পর।”
ফারিন ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলে, “এখন বাজে বারোটা। তিনটার পর মানে কত দেরী!”
“তো এখনই বের হবো নাকি? খাবো, দাবো তারপর বের হবো।”
“আমরা কালকে সকালেই তো চলে যাবো না?”
“হুম। পরশু থেকে অফিসে যেতে হবে।”
“অফিস টাইম কতক্ষণ তোমার?”
“নয়টা টু ছয়টা হলেও বাসা থেকে বের হই সকাল সাড়ো আটটার আগে। আর বাসায় ঢুকি সাতটার পর।”
“এত পরে কেনো?”
“ট্রাফিক। ঢাকা শহরের বিখ্যাত জিনিস। অফিস আওয়ারের জ্যাম।”
“বাসায় একা থাকতে হবে আমাকে?”
“একাই তো থাকবে তো।”
ফারিন উঠে গেল। ব্যাগ খুলে শাড়ি বের করে। আহসান কনুইয়ে ভর দিয়ে আধশোয়া হয়ে বলে,
“তুমি চাইলে কিন্তু বাসায় আরেকজনকে আনতে পারি।”
“কাকে?”
“বাসায় একটা ছোট্ট আহসান নিয়ে আসবো নাকি?”
ফারিন কপাল কুচকে আহসানের দিকে তাকায়। আহসান দুষ্ট হেসে ভ্রু নাচায়। ফারিন ওভাবেই বলে,
“মানুষকে খেতে দিলে শুতে চায়। তোমাকে তো খেতে দেওয়ার আগেই তুমি শুতে চাচ্ছো।”
“আমি একটু বেশিই ফার্স্ট। তাই তুমি বলার আগে আগেই বলে দিচ্ছি।”
“ছোট্ট আহসানকে আনার শখ নেই আমার।”
“তাহলে ছোট্ট ফারিন?”
“সেটাও নেই।”
“কারণ?”
আহসানের দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে বলে,
“তোমার বাচ্চা পেটে ধরার শখ নেই গো বাছাধন।”
“হোয়াট বাছাধন? আমি তোমার ছেলে?”
“আস্তাগফিরুল্লাহ, নাউজুবিল্লাহ।”
“ভেবেচিন্তে কথা বলো না কেনো?”
“চুপ করো। কেয়ারটেকার চাচাকে বলো খাবার দিয়ে যেতে। খেয়ে আমি শাড়ি পড়ে সুন্দর করে রেডি হবো, তারপর আমরা বের হবো।”
আহসান কেয়ারটেকারকে কল দেয়। আধঘন্টা পর খাবার দিতে যেতে বলে।
“ওকে তাহলে খাওয়ার পর তুমি সাজবে আর আমি ঘুমাবো।”
“হোয়াট ঘুমাবে? ঘুমালে আমি ঘুরবো কার সাথে?”
“মেয়েদের রেডি হতে হতে রাত শেষ হয়ে ভোর হয়ে যায়। সেই সময় আমারও একটা ন্যাপ দেওয়া হয়ে যাবে।”
“এত কিছু জানি না। সারা বিকাল, সন্ধ্যা আমি রিসোর্টটা ঘুরে দেখতে চাই। ওকে?”
“ফাইন।”
আহসান পাশবালিশ জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ে। ফারিন আহসানের পিঠে থাবা মেরে বলে,
“উঠো, ঘুমাচ্ছো কেনো?”
আহসান পিঠে হাত ঘষে বলে, “তো কি করবো? তোমার সাথে রোমান্স?”
“থাক, কিছু করা লাগবে না। তুমি ঘুমাও।”
আহসান বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে রইলো। ফারিন শাড়ি, অর্নামেন্টস বাইরে বের করে। ফারিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়ায়। মুখে মশ্চারাইজার মাখে। আহসান বালিশে মাথা রেখে ফারিনের দিকে তাকায়। ফারিনও তখন আহসানের দিকে তাকায়। চোখাচোখি হতেই ফারিন মুখ ঘুরিয়ে নেয়।
আহসান শিস বাজিয়ে বলে, “কি সুন্দরী? কাল রাত থেকেই দেখছি তুমি কিছুক্ষণ পর পর আমার দিকে তাকাচ্ছো। কেনো হ্যাঁ? আমার পছন্দ হয়েছে?”
“চার চোখওয়ালা হনুমান তুমি। তোমাকে পছন্দ হওয়ার কি আছে?”
“স্বামী হই তোমার, পছন্দ হতেই পারে।”
“কচু হয়েছে।”
আহসানের মোবাইলে কল আসে। আহসান উঠে খাবার নিয়ে এলো। ফারিনকে ডেকে খেতে বসে। খিচুড়ি আর কালা ভুনা। খাওয়ার পরে আহসান সত্যি সত্যি ঘুমায়। ফারিন কালো রঙের শাড়ি পড়ে রেডি হয়ে আহসানকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে। ফর্সা শরীরে কালো রঙের শাড়ি পড়ায় ফারিন দেখতে মারাত্মক লাগছিলো। আহসান উঠে ক্রিম কালার জিন্স আর কালো শার্ট পড়ে।
ফারিন আহসানকে দেখে বলে, “উদ্দেশ্য আমার সাথে ম্যাচিং করে ড্রেস পড়া না?”
“হুম। তাই তো কালো পড়েছি।”
“কেমন লাগছে আমাকে?”
“ভালো।”
“এখন থেকে আমি সাজলেই কমপ্লিমেন্ট দিবে। আমাকে যেন আর জিজ্ঞাসা করতে না হয়।”
বলে ফারিন মোবাইল হাতে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। মাথা চুলকে আহসান পিছন পিছন আসে। ফারিন হাঁটতে থাকে। গাছের ফুল ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখে। আহসান একটা সাদা রঙের ফুল ছিঁড়ে। ফুলটার নাম ও জানে না। ফারিনের কাছে ওর কানের পিছনে ফুলটা গুঁজে দেয়। ফারিন মুচকি হাসে। আঁকাবাকা করে মনের সুখে হাঁটতে থাকে।
ঢালুতে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে একটা দীঘির মতো। ব্রিজও আছে। ওরা ওখানে হাঁটাহাটি করে। আহসান নিজের ফোনে ফারিনকে অনেক সুন্দর সুন্দর ছবি তুলে দেয়। ছবিগুলো দেখিয়ে আহসান ফারিনকে বলে,
“একসময় আমাদের ছেলেমেয়েকে এই ছবিগুলো দেখিয়ে বলবো এইসময় তোমাদের মা আমাকে পছন্দ করতো না। এখন আমি বলতে পাগল।”
ফারিন অন্যপাশে তাকিয়ে হাসে। আহসানকে বলে,
“এত শখ নেই তোমার বাচ্চার মা হওয়ার। আর তোমার দেওয়ানাও হচ্ছি না আমি।”
“দেওয়ানা হতে বলিনি। পাগল হতে বলেছি।”
“মাথা খারাপ।”
ওরা উপরে চলে আসে। মাঠে হাঁটতে থাকে। রিসোর্টটা এতটাই বড় যে হাঁটতে হাঁটতে শেষ হয় না। কিছুটা হেঁটে যেতেই সামনে দোলনা দেখতে পেয়ে ফারিন দোলনার কাছে যায়। দোলনায় বসে দুলতে থাকে। আহসান এসে ফারিনের পাশে এসে দাঁড়ায়।
“ভালো লাগছে?”
“হুম।”
“শক্ত করে দোলনার দুই সাইডের রশি ধরো।”
“কেনো?”
আহসান ফারিনের পিছনে এসে দাঁড়ালো। দোলনায় ধাক্কা দিয়ে বলে, “এইজন্য।”
ফারিন শক্ত করে ধরে। আহসান ফারিনের চুলের ক্লিপ খুলে দিয়ে ক্লিপটা পকেটে রাখে। তারপর দোলনায় ধাক্কা দিতে থাকে। ঝড়ো বাতাস বয়। ফারিন চোখ বন্ধ করে দোলনায় দোল খেতে থাকে। একটু পর জোরে বলে,
“আহসান থামো।”
আহসান থামায়। “কেনো? সমস্যা কোনো? বমি পাচ্ছে?”
ফারিন চেপে বসে বলে, “এত কথা বলো কেনো? তুমিও বসো।”
“ধাক্কা দিবে কে?”
“আমরা দুজন পা দিয়ে দিবো। বসো তুমিও।”
আহসান বসে। ফারিন বলে, “আমি আগে এত সুন্দর জায়গায় আসিনি। অনেক সুন্দর, থ্যাংকস।”
“মাই প্লেজার।”
ঝড়ো বাতাস বইতে থাকে। আহসান ফারিনের হাত ধরে। আহসান চারপাশে চোখ বুলিয়ে বলে, “এই চলো? বৃষ্টি আসবে।”
“আজকে ভিজি চলো।”
“ভিজবে? ঠান্ডা লাগবে।”
“দু একদিন ঠান্ডা লাগলে কিছু হয় না।”
ফারিন উঠে দাঁড়ায়। হাঁটতে হাঁটতে আরেকটা ছোট্ট পুকুর পায়। পুকুরের উপরে কাঠের তক্তা আছে একটা। ফারিন ওখানে যায়। আহসানও ওর পিছন পিছন যায়। ফারিন উপরে তাকিয়ে দেখে রঙ্গন ফুলের গাছ। একটা চিকন ডাল ঝুলছে। তাতে অনেক ফুল। ফারিন বলে,
“আহসান আমাকে ফুলটা দাও না?”
আহসান হাত বাড়িয়েও নিতে পারে না। “আমার নাগালে না এটা।”
“অনেক সুন্দর।”
আহসান আবারও চেষ্টা করে। তবে পারে না। ফারিন অনেকক্ষণ ভেবে বলে, “আমাকে সোজা করে ধরে উপরে উঠাও তুমি। তাহলে আমিই নিতে পারবো।”
“হুহ? শিওর?”
“হ্যাঁ।”
“আচ্ছা দাঁড়াও, একটা পলিথিন জোগাড় করে আনি।”
বলে ফারিনের কথা শোনার আগেই চলে গেল। মিনিট ছয়, সাতেক পর আসে একটা সাদা পলিথিন নিয়ে। ফারিন রেগে বলে,
“আর এসেছো কেনো? পলিথিন নিয়েই থাকতে?”
“এখানে যত খুশি ফুল নাও। ইচ্ছা মতো।”
বলে আহসান ফারিনকে উঁচু করে ধরে। ফারিন হাত বাড়িয়ে ফুল ছিঁড়ে। মনের ইচ্ছে মতো ফুল ছিঁড়ে পলিতে ঢুকায়। ফুল ছিঁড়তে ছিঁড়তে কোলে থেকেই আহসানের দিকে তাকায়। আহসানের চুলে হাত গলায়। আহসান ধীরে ধীরে ফারিনকে কোল থেকে নামায়। ফারিন চোখ সরিয়ে নেয়। দ্রুত হেঁটে আহসানের সামনে থেকে সরে যায়। একটু পর ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হলেই আহসান ফারিনের হাত ধরে একটা ছাউনির নিচে আসে। ফারিন বিরক্ত হয়ে বলে,
“তোমাকে না বললাম আমি ভিজবো।”
“ঠান্ডা লাগবে ফারিন।”
“লাগুক।”
“তুমি শিওর ভিজবে?”
“হ্যাঁ।”
আহসান ফারিনের হাত থেকে ফুলের পলিথিন থেকে সব ফুল হাতে নিয়ে নেয়। ফারিন বলে,
“ফুলগুলো নিলে কেনো?”
“কাজ আছে।”
পকেট থেকে মোবাইল, এয়ারপড বের করে। ওগুলো সহ হাত ঘড়ি খুলে সবগুলো ছাউনির নিচে রাখে। ফারিনও নিজের মোবাইল রাখে এখানে। আহসানকে জিজ্ঞাসা করে,
“চুরি হওয়ার চান্স আছে?”
“নো।”
বৃষ্টির বেগ বাড়ে। আহসান ফারিনের হাত ধরে মাঠের মাঝে আসে। ফারিন দুহাত প্রসারিত করে ভিজতে থাকে। আহসান ফারিনের পিছনে দাঁড়িয়ে বলে,
“ফুলের বৃষ্টি ফিল করতে চাও?”
আহসানের দিকে ফিরে বলে, “কিভাবে?”
আহসান ফুল ছিঁড়ে ফারিনের উপর ফেলতে ফেলতে বলে, “এভাবে।”
ফারিন অনেক খুশি হয়। এত যত্ন, এত এফোর্ট কারো কাছে পায়নি ও। আহসানের হাত ধরে বৃষ্টিতে ভিজতে থাকে। বৃষ্টি তো পড়ছেই, সাথে ঝড়ো বাতাসও বইছে। আহসান ফারিনের হাত ধরে দৌড় দেয়। দুজনে বৃষ্টির মধ্যে মাঠের এই প্রান্ত থেকে ওই প্রান্তে ছুটে বেড়ালো অনেকক্ষণ। এত বড় মাঠে ঝড় বাতাসর মধ্যে দৌঁড়াতে কি যে মজা! ফারিন খিলখিল করে হেসেছে শুধু।
ভালো মতো দৌড়ানো শুরু করলেও কিছুক্ষণ পর ওরা একে অপরের গায়ে পানি ছিটায়। আহসান দুষ্টুমি করে ফারিনকে জাপ্টে ধরে কাঁদার মধ্যে ফেলে আর ফারিন আহসানের বুকে কিল ঘুষি মেরে শোধ নেয়। আহসান যেভাবে ওকে আলগায় ও তো আর আলগাতে পারে না। বৃষ্টির বেগ বাড়তেই কাকভোজা হয়ে ওরা কাঁদা মাটিতে বসে পড়ে।
আহসান চশমা খুলে নেয়। শার্টে রেখে বলে,
“ভাগ্যিস গোসল করোনি।”
“চশমা ছাড়া তোমাকে সুন্দর লাগে।”
“মাইনাস থ্রি পয়েন্ট সেভেন ফাইভ। চশমা ছাড়া আমার দুনিয়া এস্থেটিক লাগে।”
“কানা।”
“তোমার স্বামী।”
ফারিন আহসানের কাঁধে মাথা রেখে বলে, “অনেক অনেক থ্যাংকস। অনেক মজা পেয়েছি আমি। এত মজা কখনোই করিনি।”
আহসান ফারিনের আঁচল তুলে ফারিনকে পুরো ঢেকে দেয়। গালে লেপ্টে থাকা চুলগুলো কানের পিছনে গুঁজে দেয়। ফারিন আহসানের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। আহসান ফারিনের গালে হাত বোলায়। ফারিন আহসানের কাঁধ থেকে মাথা উঠায় না। আহসান ফারিনের হাত টেনে নিজের হাতের মুঠোয় নেয়। দুজনে এভাবেই বসে থাকে। কিছুক্ষণ পর খুব জোরে জোরে বজ্রপাত হয়ে থাকে। আহসান বলে,
“কটেজে যাওয়া উচিত।”
“হুম।”
আহসান ফারিনের হাত ধরে দৌড়ে সেই ছাউনির নিচে আসে। দুজনের মোবাইল, ঘড়ি, এয়ারপড খালি পলিথিনের মধ্যে ঢুকিয়ে আবারও এক দৌড় দিয়ে কটেজে আসে। কটেজের সামনে আসতে আসতে দুজনে হাঁপিয়ে যায়। আহসান পকেট থেকে চাবি বের করে কটেজের সামনের গেট খুলে। ফারিন আঁচল দিয়ে নিজেকে আরো পেঁচিয়ে আগে আগে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যায়।
দোতলায় এসেও ফারিন আগে রুমে ঢুকে যায়। আহসান ওর পিছন পিছন রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়। ভেজা চুলে হাত গলিয়ে এক পা দু পা ফেলে ফারিনের দিকে এগিয়ে যায়। ফারিন আহসানের চোখ মুখ দেখে ঘাড় ঘুরিয়ে দুপাশ দেখে। আহসান অনেকটা কাছে চলে আসার পর ফারিন পিছাতে থাকে। আহসান যত এগিয়ে আসে, ফারিন তত পিছিয়ে যায়। একসময় ফারিনের পিঠ দেওয়ালে গিয়ে ঠেকে। ফারিন আর পিছাতে পারে না। আহসান ফারিনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ফারিনের মাথার দুপাশে দেওয়ালে হাত রাখে।
ফারিন আহসানের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। আহসান ফারিনের গালে হাত দেয়। আঙুল স্লাইড করতে থাকে। ফারিন চোখ সরিয়ে নেয়, মাথা নিচু করে ফেলে। আহসান এগিয়ে আসে। ফারিনের হাত নিজের মুঠোয় নিয়ে ফারিনের চোখের দিকে তাকিয়ে হাতের উল্টোপিঠে ঠোঁট ছোঁয়ায়। কপালে চুমু খায়। ফারিন আহসানের শার্টের কলার খামচে ধরে। আহসান ফারিনের হাত কলার থেকে ছাড়িয়ে নেয়। ফারিনের কাঁধের উপর থেকে চুল সরিয়ে ঠোঁটের দিকে এগিয়ে আসে। ফারিন চোখ বন্ধ করে দেয়। একটু পরও যখন আহসানের ছোঁয়া পায় না তখন ফারিন চোখ খুলে তাকায়। আহসান ওর দিকে তাকিয়ে ছিল। ফারিনের সাথে চোখাচোখি হলে আহসান সরে যায়। ব্যাগ থেকে জামাকাপড় বের করতে করতে বলে,
“আমাদের চেঞ্জ করা উচিত। নাহলে ঠান্ডা লেগে যাবে। অনেকক্ষণ ধরে ভেজা জামাকাপড় পড়া অবস্থায় আছি। তুমি পাশের রুমের ওয়াশরুমে যাও।”
বলে ওয়াশরুমে চলে গেল। ফারিন রাগে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ফেলে। ওয়াশরুমের দিকে তাকিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকে। রাগে মাথা ভার হয়ে গিয়েছে যেন। বড় বড় পা ফেলে পলির ভিতর থেকেমোবাইল, জামাকাপড় নিয়ে পাশের রুমে যাওয়ার সময় দেওয়ালের দিকে তাকায়। ফারিন যেখানে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল পুরোটা ভিজা। পাশে আহসানের হাতের ছাপ। ফারিনের আরো রাগ উঠলো।
ও পাশের রুমে চলে যায়। ভেজা শাড়ি বদলে ফ্রেশ হয়ে এসে বিছানায় শুয়ে মোবাইল টিপতে থাকে। ফারিন আজ এই রুম থেকে বেরই হবে না। রাডের খাবারও খাবে না। আহসান যদি ডাকতে আসে তাহলেও না। ও দরজা খুলবে না, না মানে খুলবেই না। আহসান কিছু বলতে আসলেও শুনবে না। কিন্তু ওকে অবাক করে দিয়ে আহসান দরজা ধাক্কালোও না, কিছু বললোও না। শুধু চাবি দিয়ে ওই রুমের লক খুলে, রুমে ঢুকে ফারিনকে কোলে তুলে নিয়ে গতকাল যে রুমে ছিল, ওই রুমে চলে যায়।
চলমান………..
(হ্যাপি রিডিং…)

