#আফরিন_আখ্যান
#পর্ব_৮
#সমৃদ্ধি_রিধী
চোখের পলকে এক মাসের মতো সময় দেখতে দেখতে চলে গিয়েছে। দুপুর একটা বাজে। আহসান ফাইল চেক করছিলো। আজকে তুলনামূলকভাবে কাজের প্রেশার কম। আহসানের কেবিনে নক করা হলো। আহসান মুখ তুলে তাকায়। ফের নক করে ফারিন কেবিনে শুধু মুখ ঢুকিয়ে বলল,
“আসতে পারি?”
ফারিনকে দেখে আহসান অবাক হলো। উঠে দাঁড়ালো। হেসে বলে, “কাম।”
ফারিন কেবিনের ভিতর ঢুকলো। আহসান ফারিনের সামনে আসে। ফারিন শাড়ি পড়ে এসেছে। আহসান ফারিনের দু’হাত ধরে বলে, “পারমিশন নিতে হবে কেনো? পরেরবার আসলে চলে আসবে।”
“ওয়েল।”
“কার সাথে এসেছো?”
“অনির সাথে।”
“ও গিয়েছিল বাসায়?”
“হুহ। আম্মা তোমার জন্য পিঠা, সেমাই বানিয়ে পাঠিয়েছে। সেগুলোই দিতে এসেছে।”
“পরশু আম্মুকে বলেছিলাম দুধে ভেজা সেমাই খেতে ইচ্ছা করছে। সেজন্য বোধহয় পাঠিয়েছে।”
ফারিন হাত ছাড়িয়ে নিল। টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ায়। আহসান কেবিনের দরজা লক করে ফারিনের সামনে আসে। ফারিন পুরো কেবিনে চোখ বুলিয়ে বলে, “এমডির কেবিন তো ভালোই বড়।”
“অফিসের সবচেয়ে বড় কেবিন আমার, তারপর আদৃতেরটা।”
“এই ব্রাঞ্চে আব্বা, চাচ্চুর কেবিন নেই?”
“আছে। আমার পাশের কেবিনটা। একই কেবিনে দুজনের দুটো চেয়ার। তাছাড়া ওনারা আসলে বেশিরভাগ সময়ই আমার কেবিনেই বসে।”
ফারিন জানালার সামনে দাঁড়ায়। পর্দা সরিয়ে বাহিরটা দেখে৷ আহসানের দিকে ফিরে বলে, “বেশি বিজি নাকি আজকে?”
“না, আজকে কাজের প্রেশার নেই বললেই চলে।”
“তাহলে চলো না লং ড্রাইভে যাই?”
“এখন?”
“হুহ! কাজের প্রেশার তো নেই বললে।”
“যাওয়া যায়।”
ফারিন হেঁটে আহসানের চেয়ারের সামনে আসে। চেয়ারে ইশারা দিয়ে বলে, “বসবো?”
“বসো।”
ফারিন আহসানের চেয়ারে বসলো। হেলান দিয়ে বলে,
“এমডি বিয়ে করলে তো সেই সুবিধা। এমডি না হয়েও এমডির চেয়ারে বসার সৌভাগ্য কয়জনের হয়?”
আহসান মাথা নুইয়ে হাসলো। চুলে হাত গলিয়ে চুল ঠিক করে। ফারিনের মুখোমুখি চেয়ারে বসতে অনুমতি চাইলো,
“বসবো নাকি এমডি মেডাম?”
“ইয়াহ ইয়াহ প্লিজ সিট।”
আহসান চেয়ার টেনে বসলো। “তা মেডাম এমডি পদে জয়েন করেছেন কবে?”
“একমাস আগে।”
“ওওওহ প্রেমে পড়ার দিন থেকে?”
ফারিন হেসে বলে, “আপনার প্রেমে পড়িনি স্যার। ভাব কম দেখান।”
“আমার প্রেমে পড়েছেন তা তো একবারও বলিনি।”
“আপনি ওটাই মিন করেছেন।”
“আচ্ছা আচ্ছা প্রেমে না পড়লে ছেড়ে চলে যান।”
ফারিন চুল উড়িয়ে বলে, “ছেড়ে যাওয়ার সময় হলে আপনি বলার আগেই ছেড়ে দিবো। আপনাকে এত ঘটা করে বলতে হবে না।”
“তাহলে তো ভালোই। আরেকটা বিয়ে করতে পারবো।”
“জ্বি আমি জানি তো। পুরুষমানুষ কখনোই এক নারীতে আটকায় না।”
“বিশ্বাস করো আমার বাপে দশটা বিয়ে করেছে। এক নারীতে আটকায়ইনি।”
“করতেও পারে। আমি কি করে বলবো? আমি তো আর দেখিনি।” কণ্ঠে রসিকতার ছোঁয়া।
“পুরুষ মানুষ এক নারীতে না আটকালে তোমার বাবা তো করেছে না দু তিনটা বিয়ে? অদ্ভুত কথাবার্তা।”
ফারিনের হাসি মুখ মলীন হয়ে গেল। ও আহসানের চেয়ার থেকে উঠে রেগে কেবিনের দরজার দিকে হাঁটা দিলে আহসান ফারিনের হাত টেনে বুকে এনে ফেলে। পেঁচিয়ে জড়িয়ে ধরে, ফারিনের গালে হাত দিয়ে বলে,
“সরি সরি তোমার বাবাকে নিয়ে বলা ঠিক হয়নি।”
ফারিন কপাল কুচকে রাখে। আহসান বলে, “চলো আমরা বাইরে খেয়ে লং ড্রাইভে যাই।”
“জন্মের বাইরের খাবার খাওয়াও আমাকে। বিয়ে হয়েছে পর থেকে বাইরেই খাচ্ছি।”
“গেলাম তো দু-তিনবার রান্না করতে। দুজনেরই শিক্ষা হয়েছে।”
ফারিন সিসি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বলে, “এভাবে জড়িয়ে ধরে আছো কেনো? ক্যামেরায় দেখা যাবে না?”
“সমস্যা নেই। আমি ডিলিট করে দিবো।”
“পারবে?”
“হুম।”
“আজকে ঘুরবো না। শুক্রবারে যাবো।”
“আমরা কালকে ধানমন্ডি চলে যাবো। শুক্রবার ধানমন্ডিতে থাকবো।”
“ধানমন্ডি না গেলে কিছু হবে?”
“আগে প্রতি বৃহস্পতিবার যেতাম। বিয়ে হয়েছে পর থেকে একমাস যাই না।”
“যাবে কি করে? শুক্রবার গুলোতে আমরা বাইরে ঘুরেছি।”
“কালকে না গেলে জেসমিন আরা কাঁদবে। বিয়ের পর বড় ছেলে মাকে ভুলে গিয়েছে সেই শোকে মাথা খারাপ হয়ে যাবে।”
“টক্সিক কথাবার্তা।”
“হোয়াটএভার। লং ড্রাইভে যেতে হলে আজকে যাবো।”
“আচ্ছা চলো।”
“অনি কোথায়?”
“আদৃত ভাইয়ের কেবিনে।”
“ফাইন।”
ফারিন আহসান কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। আহসান নিচে অফিসে গিয়ে সিসিটিভি ফুটেজ ডিলিট করলো। দুজনে রেস্টুরেন্ট থেকে খেয়ে গাড়িতে বসে। ফারিন সিটবেল্ট লাগিয়ে গান চালায়। আহসানও সিটবেল্ট লাগিয়ে গাড়ি স্টার্ট দেয়। মিউজিক অফ করে বলে,
“কোথায় যাবে?”
“বহুদূর।”
“বহুদূর যাওয়া যায়?”
“চাইলেই যাওয়া যায়।”
“আমার সাথে বহুদূর যাবে?”
“হুহ।”
“তুমি না আমাকে পছন্দ করো না?”
“অপছন্দ করি সেটা তো বলিনি।”
“তুমি না আমাকে দেখতে পারতে না?”
“এখনও দেখতে পারি না তা তো বলিনি।”
“তারমানে আমাকে এখন পছন্দ করো। দেখতে পারো?”
“সেটাও বলিনি আমি।”
“আমি একটা জিনিস খেয়াল করেছি ফারিন।”
“কি?”
“গাজীপুর যাওয়ার পর থেকে তুমি ভালো হয়ে গিয়েছো।”
“আগে খারাপ ছিলাম?”
“অবশ্যই প্রথম দুদিন অসম্ভব ক্যাটক্যাট করেছিলে।”
ফারিন বাইরে তাকালো। আহসান গাড়ি চালাতে চালাতে বলে,
“গাজীপুরে কি এমন হয়েছিল যে তুমি এত ভালো হয়ে গেলে?”
ফারিনের চোখের সামনে ভেসে উঠলো সেই রাতের দৃশ্য। আহসান গোসল করে বের হয়ে চোখ বন্ধ করে চুল মুছছিলো। এতো ম্যানলি লাগছিলো আহসানকে। ফারিন তো ভাবতেই আবারও ক্রাশ খেলো। ফারিন বাইরের দিকে তাকালো। আহসান বলে,
“আমার বউ মনে হয় পথে এক্সচেঞ্জ হয়ে গিয়েছিলো।”
“তোমার তো খুশি হওয়ার কথা। কারণ তোমার বউ এখন তোমার কথা শুনে, তোমার সাথে ফ্রি হওয়ার চেষ্টা করছে। খুশি না হয়ে এমন তদন্ত শুরু করেছো কেনো?”
“বউয়ের তো তার ছিঁড়া ছিল। ছিঁড়া তার জোড়া লাগায় ডাউট হচ্ছে।”
“বেশি বেশি।”
“এই পথ যদি না শেষ হয় তবে কেমন হতো তুমি বলো তো?”
“বাজে হতো। তুমি অনেক আজাইরা কথা বলো। পথ শেষ না হলে তুমি আজাইরা কথা বলতেই থাকবে। আর তোমার আম্মু বলে তোমার নাকি ওয়েট আছে। তুমি নাকি বাকি ভাইদের মতো না। তুমি ওদের থেকেও বড় মাপের শয়তান। ওদেরটা প্রকাশ পায়, তোমারটা পায় না।”
আহসান হাত বাড়িয়ে ফারিনের গাল টেনে দিলো।
“একদম খাপে খাপ। তোমার মতো আমাকে কেউ বুঝে না।”
“যখন তখন গায়ে হাত দেয়। আজব!”
“আমি গায়ে হাত দিবো না তো কে দিবে?”
“এগুলোই কারো। আর তো কিছু করার ক্ষমতা নেই।”
“আছে আছে। তোমাকে ব্লাশ করানোর ক্ষমতা আছে। করাবো গতরাতের মতো?”
“জঘন্য।”
“তুমি এইসব বলে সত্যিটা ঢাকতে পারবে না। আমি অনেক এডাল্ট কথাও বলি না। জাস্ট নরমাল দুটো, তিনটা রোমান্টিক কথা বলি। তাতেই তুমি লাল হয়ে যাও।”
“হুম। খুব ভালো তুমি। এমন ভালো কেউ হয় না।”
“সেটা সবাই বলে।”
“সবার বলা কথা শুনাতে এসো না। তোমার মতো ভণ্ড কেউ নেই দুনিয়ায়।”
আহসান হাসলো। ফারিনের হাত ধরে। মিউজিক অন করে গাড়ি চালাতে থাকে। অফিস টাইম হওয়ায় রাস্তা খালি। মজাই লাগছে। ফারিন বলে,
“আমাকে ড্রাইভিং শেখাবে?”
“বিনিময়ে কি পাবো?”
“বউকে গাড়ি চালালো শিখাবে, আবার বিনিময় খোঁজো?”
“আমি পাক্কা ব্যবসায়ী। গিভ এন্ড টেক আমার রক্তে মিশে আছে।”
“বাব্বাহ!”
“শেখাবো, তবে কি দিবে?”
“কি চাও?”
“এক বসায় শ’খানেক চুমু।”
“মানুষের দিবা স্বপ্ন দেখলে স্বপ্নে আত্মহত্যা করতে মন চায়।”
“গাড়ি চালালো শিখিয়ে দিবো। শ’খানেক চুমু দিয়ে দিবে। ঝামেলা শেষ।”
“আচ্ছা আগে শেখাও।”
“উহু, পঞ্চাশটা চুমু এডভান্স। ড্রাইভিং শেখার পর যদি চুমু না দাও?”
“দেখা যাবে।”
“তাহলে চুক্তিপত্র রেডি করবো হ্যাঁ? পঞ্চাশটা চুমু শেখানোর আগে, বাকি পঞ্চাশটা শেখানোর পর?”
“কত কারেন্ট।”
“তোমার জন্য আমার কারেন্ট বেশিই থাকে।”
“ঢংয়ের আলাপ।”
“একটা গান ডেডিকেট করি?”
“করো।”
আহসান আফরিন আফরিন গানটা চালায়। গান শেষ হওয়ার আগেই ফারিন গান বন্ধ করে দেয়। আহসান বলে,
“বন্ধ করলে কেনো?”
“আমাকে ভালোবাসো?”
“শুরু থেকেই বলছি। তোমার মতো গোপন করি না।”
“কবে থেকে ভালোবাসো?”
“যেদিন থেকে তোমাকে দেখেছি।”
“তুমি তো বাহ্যিকভাবে ভালোবাসো। আমার মন তো বুঝো না আহসান।”
“বুঝি না?”
“না। আমার মনে অনেক কিছু চলে। তুমি বুঝো না সেগুলো।”
“সবে একমাস। বুঝে যাবো।”
“সৌন্দর্য দেখে ভালোবাসা হয় না।”
“সৌন্দর্য ছাড়াও ভালোবাসা হয় না।”
“সেই ভালোবাসা টিকে না।”
“টিকে। কে বলেছে টিকে না?”
“টিকে না। সামান্য আঘাতেই ভেঙে পড়ে।”
“আমাদের কিছু হবে না। ইনশাল্লাহ।”
ফারিন চোখ সরিয়ে নেয়। আহসান বলে, “তুমি আমার মন বোঝো?”
“জানি না।”
“আমরা কেউই আমাদেরকে এখনও বুঝিনা। তবে বুঝে যাবো সমস্যা নেই। দিন আরো বাকি আছে।”
“যদি নিজেদেরকে বোঝার আগেই ঝামেলা হয়?”
“তাহলে কথা দাও খারাপ সময় আসলেও ছেড়ে যাবে না।”
ফারিন সোজা তাকিয়ে রইলো। আহসান ফারিনের সিটবেল্ট খুলে ওর মাথা টেনে বুকে জড়িয়ে ধরে। মাথায় চুমু খেয়ে বলে,
“বেশি নেগেটিভ কথা বলো তুমি। এত নেগেটিভিটি মনে রাখতে নেই। আল্লাহ আছেন। ভালো কিছুই হবে।”
ফারিন আহসানের বুকে মুখ গুঁজে রইলো। আহসান মজা নিয়ে বলে, “কিরে? তুমি না আমাকে বিয়েই করবে না? এখন আমার সাথেই বৃষ্টিতেও ভিজছো, লং ড্রাইভেও যাচ্ছো, আমাকেই জড়িয়ে ধরে আছো। শুরুতে এত হাঙ্গামা করেছো কেনো?”
“হাঙ্গামা না করলে বুঝতামও না তোমার এত ধৈর্য। সম্পর্ক স্মুথ করার জন্য তোমার এত এফোর্ট।”
আহসান হাসলো। টিটকারি মেরে বলে, “বাবারে! ফৌজিয়া ফারিন আমার একটা প্রশংসা করলো? ভাবা যায়?”
“প্রশংসা করলেও তুমি যে একটা নিম্নমানের লুইচ্চা কথাটা একশো পারসেন্ট ঠিক কথা।”
“তুমি তো উচ্চমানের লুইচ্চা হওয়ার সুযোগ দিচ্ছো না। সুযোগ দাও, মান উন্নত করি?”
“চুপ। একদম চুপ। মনোযোগ দিয়ে গাড়ি চালাও।”
“আমি সব কাজই মনোযোগ দিয়ে করি। তুমি তো জানোই?”
ফারিন আহসানের দিকে তাকাতেই আহসান দুষ্ট হাসলো। ফারিন বিড়বিড় করে ‘বদমাশ’ বলে। ওরা সত্যিই বহুদূর গেলো। আনন্দ করে ঘুরে বেড়ালো। ফারিন সারাটাদিন অনেক মজা করলো। হাত বাড়িয়ে খোলা মাঠে ঘুরে বেড়ালো। আকাশে উড়ে বেড়ানোর মতো আনন্দ হলো ওর।
____________________
পৌনে আটটা বাজে। জ্যাম ঠেলে বাসায় ভিতর ঢুকে আদৃত দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ও দরজা লক করে শার্ট খুলতে খুলতে রুমে যায়। ট্রাউজার নিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায়। ঘামে ভেজা শরীরেই গোসল করে। প্রচন্ড খিদে পেয়েছে। ও মাথা কোনো মতে মুছে ফ্রিজ খুলে। খাওয়ার মতো কিছু পায়নি। খালাও আজ আসেনি। খিদায় মাথা ব্যথা ওঠার উপক্রম। আদৃতের প্রচন্ড খিদে লাগলেও ইচ্ছে হলো না বাইরে গিয়ে কিছু নিয়ে আসতে। সায় দিলো না শরীরে। ও কার্পেটে বসে সোফার কাঠে হেলান দিয়ে বসে রইলো। চশমা সোফায় রেখে কপাল চেপে ধরে।
জোরে জোরে শ্বাস ফেলে উঠে বড় গ্রাইগ্লাসের জানালা খুলে দেয়। জানালার সামনে বসে পড়ে। বর্ষাকাল হওয়ায় হুহু করে বাতাস ঢোকে। আদৃত চোখ বন্ধ করে দুবার শ্বাস ফেলে। মোবাইল নিয়ে দেখে ওর বন্ধু অতনুর মেসেজ। অস্ট্রেলিয়ার সিটিজেনশিপের কার্ড পেয়ে গিয়েছে। আদৃত মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মেসেজে লাভ রিয়েক্ট দিয়ে মোবাইল পাশে রেখে দেয়। আজকে অতনুর সাথে আদৃতও চলে গেলে লাইফ সেট হয়ে যেত। একটা সিকিউর লাইফ পেতো। শিরিনা কান্নাকাটি করে যেতে দিলো না।
আদৃত একা থাকতে পারবে না, খেতে পারবে না কতকি। এই দেশে থেকে কি এখন খাওয়ার কষ্ট করছে না? আরো বেশি করছে৷ খালার রান্না তেমন খেতে পারে না। না খেলেই নয়, তাই কোনোমতে খেয়ে উঠে যায়। এখনও তো না খেয়ে আছে। আদৃতের দুই দিকই গেল। বিদেশে গেলে তো বলা যেত খাওয়ার কষ্ট করলেও, একাকিত্ব অনুভব করলেও একসময় লাইফ সেট। একসময় সব সুন্দর হয়ে যাবে। এখানে আদৃত পাচ্ছেটা কি? না উন্নত জীবন, না নিরাপত্তা, না ভালো খাওয়া দাওয়া।
আদৃত শক্ত হয়ে বসে রইলো। খাপছাড়া জীবন একটা। সব আছে, কিন্তু শান্তি নেই, আনন্দ নেই। টাকাপয়সা থাকলেই হয় না শুধু। মনে শান্তিও থাকতে হয়। দমকা হালকায় আদৃতের চুল নড়ে উঠলো। ও বড় জানালার পাশে ফ্লোরে শুয়ে পড়ে। খালি গা হওয়ায় ফ্লোরের ঠান্ডা পিঠে ভালোভাবে লাগলেও তোয়াক্কা করলো না।
সময় গড়ায়। আদৃত ড্রয়িংরুমের ফ্লোরে হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে। দৃষ্টি সিলিংয়ের দিকে সীমাবদ্ধ। বড় বড় করে শ্বাস ফেলছে। আদৃত এক দৃষ্টিতে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়েই থাকে। চোখ বন্ধ করে ফেলে। কিছুক্ষণ পর আবার চোখ খুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। মরার মতোই মাটিতে পড়ে থাকে। আধঘন্টা পর আদৃতের ফোনে কল আসে। আদৃত আকাশের দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে হাতরে মোবাইল নেয়। শিরিনা কল করেছে। আদৃত রিসিভ করলো না। পরপর আরো তিনবার কল আসলো। আদৃত চাপা শ্বাস ফেলে পঞ্চমবারের কল রিসিভ করে।
শিরিনা ধমকে বলে, “কল ধরিস না কেনো? চিন্তা হয় না?”
আদৃত উত্তর দিলো না। শিরিনা এবার কোমল স্বরে বলে,
“আদি? আব্বা আমার কথা শোন।”
“বলো।”
“কালকে আয় না বাবা।”
“না। কাজ আছে।”
“কালকে বৃহস্পতিবার। কালকে অফিস করে চলে আয়। শুক্রবার, শনিবার থেকে রবিবারে যাস।”
“না।”
“আহসান আর তুই গত একমাস ধরে আসিস না। আহসানেরটা মানা যায়। নতুন বিয়ে করেছে, বউ নিয়ে সময় কাটায়। তুই এমন করছিস কেনো?”
আদৃত জবাব দেয় না। শিরিনা প্রশ্ন করে, “জবাব দিচ্ছিস না কেনো?”
“কথা বলতে ইচ্ছা করছে না।”
“আম্মুর সাথে কথা বলতে ইচ্ছা করে না?”
“তুমি কি বলবে বলো। আমি শুনছি।”
“ধানমন্ডি আসিস না কেনো? উত্তরা গিয়েছিস পর থেকে আসিসনি।”
“আমি স্বাবলম্বী হচ্ছি। তাই আসি না।”
“আব্বা?”
“আব্বু আমার বাসা ভাড়া দিয়েছে কেনো? আমি ইনকাম করি না?”
“দিয়েছে তোর বাপের ইচ্ছে হয়েছে তাই।”
আদৃত কিছু বললো না। শিরিনা বলে,
“কিছু খেয়েছিস?”
আদৃত উত্তর দিলো না।
“কি হলো কথা বল?”
“না।”
“কেনো?”
“খিদে নেই।”
“খালা আসেনি আজকে?”
“না।”
“তোর খিদে পেয়েছে জানি।”
আদৃত জবাব দিলো না।
“বাইরে থেকে কিছু এনে খা না?”
“পারবো না।”
“এত জেদ করিস কেনো? অযথা জেদ করলে সত্যি অনেক রাগ উঠে।”
“আর কল দিও না ভালো না লাগলে।”
“তোর আমার প্রতি মায়া মহব্বত কম থাকতে পারে। আমার তোর জন্য মায়া আছে।”
“মায়া থাকলে বের করে দিতে না।”
“এত রাগ কেনো তোর?”
“তোমার জামাইয়ের মতো।”
“আদি? এগুলো কি ধরনের কথা?”
আদৃত কানে ফোন চেপে ধরে শূন্যে তাকিয়ে থাকে। শিরিনা বলে,
“কালকে অফিস করেই চলে আয়।”
“দেখি।”
“কোনো দেখি টেখি না। কথা দে আসবি।”
“ভেবে দেখবো।”
“কোনো ভেবে দেখা। আসবি কালকে। একমাস ধরে দেখি না তোকে।”
“বড় ছেলেকে না দেখে তো বছর কাটিয়ে দাও। আমাকে না দেখেও কাটাতে পারবে।”
“বড় ছেলে বিদেশে থাকে। তুই তো বিদেশে থাকিস না। চলে আয়।”
“তোমাদের জন্য আমি বিদেশেও যেতো পারিনি। এই থার্ডক্লাস বস্তি পঁচা, সেফটি বিহীন, জ্যাম ওয়ালা দেশে থাকতে হচ্ছে। তোমরা আদও আমার কোনো কথার দাম দাও?”
“সবাই চলে গেলে আম্মু থাকবো কি করে?”
“এখন যেভাবে থাকছো, সেভাবে।”
“এখন তো ছেলে প্রতি বৃহস্পতিবার আসবে সেই আশায় থাকি।”
“আশায়ই থাকো।”
“তোর কি মাথা ব্যথা করছে?”
“তাতে তোমার কি?”
“এমন করিস কেনো?”
আদৃত উঠে বসে। খেঁকিয়ে উঠে বলে, “কি এমন করি? হ্যাঁ কি করি? তোমরা কি করেছো? তুমি না মা? ছেলেকে এভাবে পাঠিয়ে দিয়েছো কেনো? তখন ভাবোনি ছেলে কি খাবে? ছেলের খিদে পেটে থাকলে মাথা ব্যথা করে?”
“কালকে চলে আয়।”
“ধরো আজকে আমি মরে গেলাম। কালকে আসতে পারবো? কালকের আশায় বসে চিড়া খাও।”
“এইসব কথা বলিস কেনো? আজেবাজে কথা বলতে নিষেধ করেছি না?”
“কাটো তো কাটো। কল কাটো। এত পিরিতের আলাপ সহ্য হয় না।”
“তুই কাট।”
“আমি কল করেছি যে এখন কল কাটবো?”
“দাঁড়া তোর জন্য মেয়ে খোঁজা শুরু করি। একা থাকতে কষ্ট হয় তোর।”
“থাক অনেক করেছেন আমার জন্য। আর আমার জন্য কষ্ট করতে হবে না আপনাদেরকে। আমি এখন বিয়ে করবো না।”
“এখন করতে হবে কেনো? মেয়ে দেখতে থাকি। পছন্দ হলে করবি।”
“আমি বলেছি এখন বিয়ে করবো? আমার লাইফ আমাকে আমার মতো করে চালাতে দাও। তোমাকে এত ভাবতে বলেছে কে?”
“আমি মা না? আমার ভাবতে হবে না?”
“মা হয়েছো এখন বসে থাকো। এত ভাবতে থাকে না।”
“বাবা হলে বুঝবি ছেলেমেয়ের জন্য কত চিন্তা হয়।”
“ভালো।”
“তোর সন্তান যেন পুরো তোর মতো হয়। তাহলে বুঝবি আমার কষ্ট।”
“ভালো।”
“মা হয়ে চিন্তা করি আর এই অসভ্য বলে ভাবতে হবে না। পুরো বাপের মতো কথাবার্তা বলে।”
“ভাবলে বাড়ি থেকে বের করতে না।”
“তুই কালকে ধানমন্ডি আয়।”
“কেনো? কালকে কি? এত পাগল হয়ে গিয়েছো কেনো আমাকে ধানমন্ডি আনতে?”
“কালকে এলে তোর পছন্দের পাবদা রাঁধবো। সর্ষে পাবদা।”
“এমন পাবদা হোটেলে অনেক খাওয়া যায়।”
“মায়ের হাতের স্বাদ পাবি হোটেলের পাবদা মাছে?”
“জানি না।”
“এত মাথা গরম করিস কেনো? মা বলে এইসব সহ্য করি। পরের মেয়ে করবে না।”
“না করলে নাই। ইচ্ছে হলে থাকবে নাহলে আউট। আমি একা থাকতে পারি।”
“আমি আসবো তোর কাছে কয়েকদিনের জন্য?”
“লাগবে না আমার কাউকে।”
“ধানমন্ডি আসবি না?”
“না।”
“একমাস ধরে আসিস না। আহান চলে গেল। তখনও আসলি না। কোন এয়ারপোর্টে গিয়ে দেখা করেছিস। এমন করিস কেনো?”
“মন চায় তাই।”
“ধানমন্ডি কবে আসবি?”
“যেদিন মন চাইবে, সেদিন আসবো।”
“তুই না এই বাড়িতে থাকার জন্য পাগল?”
“জানোই তো পাগল। তারপরও বের করেছো কেনো?”
“আহারে! আবারও একই পেঁচাল। তুই বল সুন্দর একটা মেয়ে দেখে বিয়ে করিয়ে দেই। ফারিনের মতো সুন্দর মেয়ে খুঁজবো।”
“লাগবে না আমার বউ ফউ।”
“অনি কি যেন বলে ওটাকে? ওইযে সুন্দরদেরকে প্রশংসা করে বলে যে?”
“বিউটি উইথ ব্রেন?”
“হ্যাঁ হ্যাঁ। তোর জন্য একটা বিউটি উইথ ব্রেন মেয়ে খুঁজবো।”
“আমার বিউটি উইথ ব্রেন না, ক্যারেক্টার উইথ ব্রেন লাগবে।”
“আচ্ছা তোর মন মতোই বউ আনবো।”
আদৃত কিছু বললো না। শিরিনা বলে,
“ভিডিও কল দেই। আমি শিখিয়ে দেই তুই রান্না কর কিছু একটা।”
“পারবো না রান্না করতে।”
“কফি বানা তাহলে?”
“পারি না।”
“ভিডিও কল দেই, শিখে নে। কবে থেকে বলছি ভিডিও কল দেই, ভিডিও কল দেই। তুই ভিডিও কল দিলেও রিসিভ করিস না। আহান যাওয়ার সময় লাস্ট দেখা হয়েছিল। আজকে অনি অফিসে গিয়ে কল দিয়ে না দেখলে বুঝতামও না এভাবে শুকিয়ে গিয়েছিস।”
“ভালো হয়েছে।”
“ভিডিও কল দিচ্ছি। রিসিভ কর।”
আদৃত মাথা ব্যথায় টিকতে পারছে না। চশমা পড়ে উঠে কিচেনে চলে গেল। শিরিনা ভিডিও কল দিয়ে যেভাবে শিখিয়ে দিলো ওভাবে কফি বানায়। কফিতে চুমুক দিতেই শিরিনা বলে,
“ভালো হয়েছে?”
“আমার মাথা হয়েছে।”
“কালকে আয়, আমি বানিয়ে খাওয়াবো। শিখিয়েও দিবো।”
“আসবো না।”
শিরিনা রেগে গেল। “আমি মরলে আসিস বজ্জাতের বাচ্চা।”
তাতেই কাজ দিলো। আদৃত শিরিনাকে জ্বালিয়ে কল কেটে দিয়েছে। রুমে গিয়ে বিন থেকে জামা কাপড় উঠিয়ে ব্যাগে ঢুকায়। এগুলো শিরিনাকে দিতে হবে, ধোঁয়ার জন্য। বেডশিট, বালিশের কাভারও ঠেসে ঠেসে ব্যাগে ঢুকায়। গন্ধ অনেক, ঘুমাতে গেলে আদৃতের বমি আসে। ও কালকে অফিসে যাবে না। সকালে ঘুম থেকে উঠেই ধানমন্ডি চলে যাবে। ছাতার মাথার ডিপার্টমেন্ট হেড। আদৃতের বিরক্ত লেগে উঠেছে কাজের প্রেশারে। চার, পাঁচদিনের জন্য না বলে চলে যাবে রাঙামাটি বা বান্দরবান। নেটওয়ার্কের বাইরে চলে গেলেই শান্তি। তখন বুঝবে সবাই, ওকে বাড়ি থেকে বের করে কত বড় ভুল করেছে।
চলমান…..
(হ্যাপি রিডিং…)

