#আফরিন_আখ্যান
#পর্ব_৯
#সমৃদ্ধি_রিধী
আহসান আর ফারিন বাসায় ঢুকে নয়টা নাগাদ। আহসান শার্ট খুলতে খুলতে সোফায় বসে বলে,
“কি খাবে এখন? আজকে তো খালা আসেনি।”
“তোমার আম্মু বিরিয়ানি রান্না করেও পাঠিয়েছে। আমি তখন বলতে ভুলে গিয়েছিলাম।”
আহসান উঠে দাঁড়িয়ে বলে, “আসলে? কোথায়?”
“ফ্রিজে রেখেছি।”
আহসান কিচেনে গিয়ে ফ্রিজ থেকে বক্স নামালো। ফারিন কিচেনের দরজায় হেলান দিয়ে বলে,
“এত খুশি কেনো?”
“আম্মু রান্না কতদিন পর খাবো।”
“মায়ের হাতের রান্না এত পছন্দ?”
“ভীষণ।”
“আমার জন্য তাহলে একমাসের চারটা শুক্রবার মিস করলে মায়ের হাতের রান্না।”
“চারটা বৃহস্পতিবারও আছে।”
“আমি যেতে চাইনি তো কি? তুমি যেতে পারতে?”
“ব্যাপার না।”
আহসান ওভেনে গরম করতে দিয়ে দিলো। ফারিনের দিকে ফিরে বলে,
“তুমি ফ্রেশ হয়ে কাপড় বদলে ফেলো।”
“যাবো।”
“বউয়েরা নাকি মাইন্ড করে হাসবেন্ড বিয়ের পরও মায়ের রান্না পছন্দ বললে। তুমিও করলে নাকি?”
“না। আমি তো রান্না করতেই পারি না। আমার কোন রান্না তোমার পছন্দ হবে! মাইন্ড করার প্রশ্নই আসে না।”
“তাও ঠিক। তবে এখন থেকে ট্রাই করতে পারো। ভালো হোক বা খারাপ আমি খাবো। সমস্যা নেই।”
“সে দেখা যাবে। তুমি গরম করো, আমি ফ্রেশ হয়ে আসি।”
ফারিন চলে যেতে নিলে আহসান পিছু ডাকে। ফারিন আহসানের দিকে ফিরে বলে,
“কি?”
“এই শাড়ি বদলে বাসার নরমাল একটা শাড়ি পড়ো এখন।”
“কেনো?”
“শাড়ি পড়লে তোমাকে সুন্দর লাগে।”
“পারবো না।”
“আমার জন্য পড়ো।”
“আমার কোনো ঠেকা নেই যে আমি তোমার জন্য শাড়ি পড়বো।”
বলে বড় বড় পা ফেলে চলে গেল। আহসান চুলে হাত গলায়। দুই বক্স বিরিয়ানি গরম করে দুজনের জন্য প্লেটে বাড়ে। প্লেট দুটো টেবিলে রেখে ঢাকনা দিয়ে রুমের চাপানো দরজা শব্দহীনভাবে খুলতেই দেখে ফারিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কুচি ঠিক করছে। আঁচল মাটিতে গড়াগড়ি করছে। আহসান বুকে হাত গুঁজে দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়ালো। ঠোঁট চোকা করে দুষ্টু হেসে বলে,
“কি মিসেস টাফ ওয়ান? কার জন্য শাড়ি পড়ছেন?”
ফারিন চমকে উঠে কুচি ফেলে আঁচল বুকে টেনে নেয়। আহসান বিড়াল পায়ে রুমে ঢোকে। ফারিনের সামনে টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে ফারিনকে উপর থেকে নিচে একবার দেখে নিল। শিস বাজিয়ে বলে,
“ঢেকে লাভ কি হলো? দেখিনি নাকি?”
আঙুল তাক করে বলে, “লাগামছাড়া কথা বলবে না।”
আহসান ফারিনের আঙুল ধরে কামড়ে দেয়। ফারিন হাত ছাড়িয়ে ঝাড়তে থাকে। বিরক্ত হয়ে বলে, “এমন কামড়াকামড়ির স্বভাব কেনো? হুম?”
“নিম্ন মানের লুইচ্চারা কামড়াকামড়ি করে। উচ্চমানের লুইচ্চারা কিসমিস করে। উচ্চমানের লুইচ্চা হওয়ার সুযোগ দাও, দেখবে কি কি করি।”
“যাও তো যাও। ফ্রেশ হয়ে আসো।”
আহসান হাত বাড়িয়ে বলে, “তোমাকে শাড়ি পড়তে হেল্প করি।”
ফারিন দু’কদম পিছিয়ে গিয়ে বলে, “তোমার হেল্পের প্রয়োজন নেই আমার।”
“প্লিজ করি?”
“তোমাকে আমি অনুমতি দিয়েছি আমাকে ছোঁয়ার?”
আহসান হা করে বলে, “ওমাহ! রাতে রাতে ওগুলো কি হয়?”
“কয় রাতে কি হয়েছে?”
“দুই, তিন রাতে তো হয়েছেই না ভালোবাসা বাসি?”
“চুপ করো। একদম চুপ।” ফারিন ধমকে ওঠে।
“আজকি রাত মাজা…” আহসান গান গেয়ে শেষ করার আগেই ফারিন আহসানের বুকে ঘুষি মেরে বসে।
“যাও ফ্রেশ হয়ে আসো।”
আহসান ফারিনকে চারদিক থেকে পেঁচিয়ে জড়িয়ে ধরে। “সুন্দরী তোমাকে রাগলে আরো সুন্দর লাগে। টমেটো আমার অনেক পছন্দ।”
“আহসান ছাড়ো। আমি কিন্তু রেগে যাচ্ছি।”
“তোমাকে তো রাগাতেই চাচ্ছি আমি।”
“আহসান?”
“ইয়েস মিসেস আহসান?”
“ছাড়ো। আমি এখন খামচে দিবো।”
“আমিও দিবো।”
ফারিন আহসানের গলা সত্যি সত্যি খামচে দিলো। আহসান ফারিনের দু হাত নিজের এক হাতে ধরে ঘাড়ের পিছনে হাত দিয়ে গলায় মুখ গুঁজে। গলায় দাঁত বসিয়ে দেয়। মুহুর্তেই সরে আসে। ফারিনের হাত ছাড়তেই ফারিন আহসানের বুকে ধুমধাম ঘুষি মেরে বসে। আহসান ফারিনের গলার দিকে তাকায়। দাগ হয়নি বলে হাফ ছাড়লো। ফারিনের নাকের পাটা ফুলে ওঠে।
“নিলজ্জ একটা।”
“হেহে।” আহসান হাসে।
“তোমাকে যে এত কিল ঘুষি মারি তোমার ব্যথা লাগে না?”
“লাগে তো।”
“তাও সরো না কেনো?”
“সকল ঘাত, প্রতিঘাত সহ্য করেই জীবনে টিকে থাকতে হয় সুন্দরী।”
“তোমার এই সুন্দরী ডাকটা শুনলেই আমার এত মেজাজ খারাপ হয়!”
“আচ্ছা আর ডাকবো না।”
ফারিন চোখ বন্ধ করে জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে বলে,
“ছাড়ো, অনেক খিদা লেগেছে আমার। সিরিয়াসলি বলছি, মজা করার মুডে নেই।”
আহসানেরও খিদে লেগেছে। ও ফারিনকে ছেড়ে দিল। ট্রাউজার আর টাওয়াল নিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায়। ফারিন আবারও কুচি ধরে। শাড়ি পড়ে রুম থেকে বের হয়ে যায়। টেবিলে বসে আহসানের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। আহসান আসে একটু পর। চেয়ার টেনে বসে।
“আমার জন্য অপেক্ষা করছিলে?”
ফারিন এক লোকমা খেয়ে বলে, “তুমি কোন এমন বিশেষ ব্যক্তি যে তোমার জন্য অপেক্ষা করবো?”
আহসান হাসলো। খাওয়া শুরু করে। ফারিন একটু পর বলে, “আহসান তোমাকে একটা প্রশ্ন করি? সত্যি করে উত্তর দাও তো।”
“বলো।”
“তোমার সত্যিই বিয়ের আগে রিলেশন ছিল না?”
“উহু।”
“মিথ্যে কথা। বড়লোক বাপের ছেলে আর প্রেমিকা থাকবে না?”
“সত্যিই ছিল না। তোমার আগে কাউকে এতটা ভালো লাগেনি।”
“বিশ্বাস করলাম না।”
“সেটা তোমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমি আমার জায়গা থেকে ক্লিয়ার।”
“ড্রিংকসও করো না?”
“না।”
“বিশ্বাসযোগ্য না। টাকা থাকলে শয়তানে কুটকুটায়।”
“এগেইন সেটা তোমার ব্যক্তিগত ব্যাপার।”
“ট্রাইও করোনি?”
“করেছি। আমার বন্ধু বান্ধব সব হাই ক্লাসের। গুলশান, বনানীর সাইডের ছেলেপেলে। ক্লাস মেইনটেইনের জন্য ওদের সাথে দুই একবার ট্রাই করেছিলাম। কিন্তু আমি সামলাতে পারি না খেয়ে।”
“মানে মাতাল হয়ে যাও?”
আহসান হেসে উঠলো। “হ্যাঁ। হুশ জ্ঞান থাকে না।”
“অফিসিয়াল পার্টিতেও খাও না? মিথ্যা বলোনা।”
“হাতে ওয়াইন রাখি, তবে খাই না। ওইযে হুশ হারিয়ে ফেলি তাই। সবই ক্লাস মেইনটেইন করতে করা লাগে।”
ফারিন আর কিছু বললো না। খেতে লাগলো। আহসান ফারিনের খাওয়া দেখে বলে,
“শুধু রাইস খাচ্ছো কেনো? মাংস নেই?”
বলে নিজের প্লেটের মাংস ফারিনের প্লেটে তুলে দিলো। ফারিন আহসানের দিকে তাকিয়ে বলে,
“তোমার মাংস তুমি নিয়ে যাও। আমার প্লেটে মাংস আছে।”
বলে প্লেটের একপাশে থাকা মুরগির মাংস আহসানকে দেখায়। আহসান জমিয়ে রাখা মাংস দেখে বলে,
“এভাবে মাংস জমিয়ে রেখে শুধু শুধু রাইস খাচ্ছো কেনো?”
“এভাবে খেতে ভালো লাগে তাই।”
“শুধু শুধু রাইস খেতে ভালো লাগে?”
“খেয়ে দেখো।”
আহসান দুই লোকমা এভাবে খেয়ে বলে, “ধূরর! প্রতিবার রাইসের সাথে মাংস না পড়লে ভালো লাগে?”
“তুমি খাও তাহলে তোমার মতো। আমি খাই আমার মতো। খাওয়া দাওয়া ব্যক্তিগত ব্যাপার।”
আহসানের খাওয়া শেষ। এবার ও ফারিনের প্লেটের মাংসে হাত বাড়ালো। মুখে নিয়ে চিবোতে থাকে। ফারিন বলে, “ওইযে আরো মাংস আছে। আমার মাংসে হাত দিবে না আর।”
“তোমার মাংস অনেক মজা।”
ফারিন চোখ পাকিয়ে তাকায়। আহসান আরো দুইবার ফারিনের প্লেট থেকে মাংস নিয়ে নেয়। ফারিন প্লেট নিয়ে উঠে চলে যায়। আহসান আর জ্বালালো না। রুমে চলে আসে। সারাদিন ঘুরাঘুরি করে ক্লান্ত লাগছে। বিয়ের ছবি দেখতে থাকে। ফারিন আসে আরো মিনিট দশেক পর। ওয়াশরুম থেকে ফিরে লাইট অফ করে শুয়ে পড়ে।
আহসান ফারিনের দিকে ফিরে শোয়। কোমল কণ্ঠে ডাক দেয়,
“ফারিন?”
“কি?”
“জোর করে আমার থাকছো, তাই না?”
“তা আবার জিজ্ঞাসা করতে হয়?”
“মুক্তি চাও?”
“চেয়েছি?”
“মন থেকে তো সংসার করছো না।”
ফারিন উত্তর দিল না। আহসান ফের জিজ্ঞাসা করে,
“জোর করে সংসার করতে হবে না। অনিহা তোমার অনেক।”
“জোর করে বিয়ে করার আগে মনে হয়নি অনিহা থাকবে?”
“ভেবেছি মানিয়ে নিতে পারবে।”
“এইসব ভাবছো কেনো এখন?”
“তোমাকে যখন আমি টাচ করি, তুমি তখন বিরক্ত হয়। বিষয়টা আমার গায়ে লাগে। আমি তোমার হাসবেন্ড, আমার টাচে তুমি বিরক্তবোধ করবে কেনো?”
“সেরকম কিছু না।”
“মুখ কুচকে ফেলো। মুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট।”
“তুমি আচমকা হাত টান দাও, ঠান্ডা হাত গায়ে লাগিয়ে দাও, বিরক্তবোধ করবো না?”
আহসান চাপা শ্বাস ফেলে। ফারিন বলে, “এইসব কথা উঠলো কেনো এখন?”
“না, এমনিই মনে হলো তুমি জোর করে আমার সাথে থাকছো।”
“সেরকম কিছু না।”
“তুমি বিয়েটাও মন থেকে করোনি। জোর করে পরিস্থিতির চাপে পড়ে কবুল বলেছো।”
“একমাস তো চলে গিয়েছে। এইসব উঠছে কেনো এখন? তুমি ফিরিয়ে দিতে পারবে সব?”
“না।”
আহসান পাশ ফিরে শুয়ে রইলো। ফারিন অবাক হলো। প্রতিদিন না রাত হলে হাত টানে, গাল টানে, দুষ্টুমি করে? একটু আগেও না ঠিক ছিল? ফারিন আহসানের পিঠে হাত রাখে। ধীমে গলায় জিজ্ঞাসা করে,
“তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে?”
“না।”
“ঘুম এসেছে?”
“না।”
“শাড়ি পড়লাম, তুমি এডমায়ার করলে না কেনো?”
“আমার জন্য তো পড়োনি।”
“তুমি ছাড়া কে আছে এই বাসায়? পড়েছি যখন, তোমার জন্যই তো পড়েছি।”
“সুন্দর লাগছিলো।”
“না তাকিয়েও বলছো সুন্দর লাগছিলো?”
“তাকিয়েছি আমার মতো করে। তাছাড়া এখন অন্ধকার, তাকালেও দেখতাম না।”
“বিরক্তিকর।”
আহসানকে কিছু বলতে না দেখে ফারিন বলে, “কথা বলছো না কেনো?”
“রিগ্রেট হচ্ছে কেনো জোর করে তোমাকে বিয়ে করলাম।”
“এখন রিগ্রেট করে লাভ কি?”
“সেটাই।”
“কিন্তু উঠছে কেনো এইসব কথা? সত্যি করে বলো তো?”
“এমনিতেই।”
“কোনো এমনিতেই না। কিছু একটা তো হয়েছেই।”
আহসান ফারিনের দিকে ফিরলো। “বিয়ের সময় একটু হাসলে কি হতো ফারিন?”
“মানে?”
“কিছু না।”
“বলো?”
আহসান মোবাইল নিয়ে ফারিনকে ওদের বিয়ের ছবি দেখালো। ফারিনের মুখ গোমড়া করা। ফারিন দেখে বললো,
“কি হয়েছে?”
“একটু হাসলে কি হতো?”
“তখন মন চায়নি।”
“এখন মনে হয় খুব মন চায়?”
ফারিন ছবিগুলো দেখতে লাগলো। আহসানের ছবি জুম করে দেখছে। না, আহসান আসলেই খুব সুন্দর। ম্যানলি ভাইব আছে আহসানের মধ্যে। আহসানের মোবাইল রেখে ফারিন আহসানকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে।
“নাটকটা কেনো করছো বলো তো?”
“সিরিয়াসলি বলছি।”
“ওওওহ আচ্ছাআআ।”
আহসান ফোঁস করে শ্বাস ফেলে। ফারিন আহসানের বুকে হাত দিয়ে বলে,
“তোমার জন্য আর কখনোই শাড়ি পড়বো না আমি। তুমি একটা বাজে ছেলে।”
আহসান ফারিনের দিকে ফিরলো। “মিসেস টাফ ওয়ান থেকে মিসেস সাফওয়ান হয়েছো?”
“হচ্ছি…কাজ চলছে।”
আহসান ফারিনের উন্মুক্ত কোমর টেনে ওকে নিজের সাথে জড়িয়ে ধরে। “মন থেকে মেনে নিয়েছো?”
“নিচ্ছি, মেনে নেওয়ার প্রসেসিং চলছে।”
আহসান ফারিনের গলায় মুখ গুঁজলো। “আগের মতো আমাকে দেখলে রাগ উঠে না?”
“না, রাগের মাত্রা কমাচ্ছি।”
“আমাকে লুইচ্চা লুইচ্চা লাগে?”
“ক্ষেত্রবিশেষ।”
“কিন্তু তুমি বিয়েটা মন থেকে করোনি।”
“আবার বিয়ে করো।”
“কিভাবে?”
“কাজি অফিসে গিয়ে… লুকিয়ে।”
“বিয়ে করা বউকে আবার বিয়ে করবো?”
“করতেই পারো।”
“তুমি মন থেকে বিয়ে করবে তখন?”
“করা যেতেই পারে।”
“ধূরর! কিসব বাচ্চামো!”
ফারিন হাসলো। আহসান ফারিনকে চেপে ধরে বলে,
“মোহাম্মদ এনামুল সিদ্দিকের বড় পুত্র সাফওয়ান সিদ্দিককে সহস্র চুমু দেনমোহর ধার্য করিয়া বিবাহ করিতে আপনি কি রাজি? রাজি থাকলে বলুন কবুল।”
ফারিন শব্দ করে হেসে উঠে। “আল্লাহ, ওটা বাচ্চামো হলে এটা কি?”
“এটা তো তুমি ছাড়া কেউ দেখবে না।”
ফারিন হাসতেই থাকে। আহসান বলে, “রাজি থাকলে কবুল বলেন?”
“দেনমোহর পছন্দ হয়নি।”
“তাহলে সহস্রকোটি চুমু।”
“দেনমোহর পরিশোধ করে বউকে টাচ করতে হয় কিন্তু।”
“সেটা আমি জানি।”
“কবুল বলবো কিনা ভাবছি।”
“ফাস্ট, ফাস্ট।”
“তিনবার বলতে হবে?”
“অবশ্যই।”
ফারিন বলে, “কাঁদবো নাকি?”
“কি উপলক্ষে?”
“কবুল বলার সময় কাঁদতে হয়।”
“কাঁদা লাগবে না। দ্রুত কবুল বলো।”
ফারিন রয়েসয়ে কবুল বলে। আহসান আলহামদুলিল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ বলে ফারিনকে জড়িয়ে ধরে। ফারিন হাসতে হাসতে বলে,
“তোমার কবুল কে বলবে?”
“আমার তো অলওয়েজই কবুল। বিয়ের লেহেঙ্গাটা পড়ো তো একদিন। প্লিজ।”
“আচ্ছা।”
ফারিনের উপর চড়াও হলো। ফারিনের হাসি থেমে যায়। আহসান দীর্ঘ এক চুমু খেয়ে সরে আসে। ফারিনের মাথার চুল ঠিক করে দেয়।
“অনেক জ্বালাও আমাকে।”
ফারিন মৃদু হাসে। আহসান ফারিনের গালে চুমু দিয়ে বলে, “সেদিন আমার কার্ড পুরো খালি করে দিয়েছো।”
“স্বামী হয়েছো, তোমার কার্ড আমি খালি করবো না তো কে করবে?”
আহসান আবারও ফারিনের গালে চুমু খেলো। ফারিন আহসানকে জড়িয়ে ধরে। আহসান ফারিনের কানে ফিসফিস করে বলে,
“লাভ ইউ।”
ফারিন আহসানের গালে চুমু খায়। আহসান অবাক হলো। তবে নিজের বিস্ময় প্রকাশ করলো না। ফারিনের গলায় মুখ গুঁজে। ফারিন আহসানের পিঠ হাত রেখে বলে,
“দাগ বসালে তোমার খবর আছে।”
“তোমার স্কিন অনেক সেনসিটিভ। আমার দোষ নেই।”
ফারিন আর কিছু বললো না। তবে একটু পর আহসান সরে আসতে নিলে ফারিন বাঁধা দেয়। অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে,
“কি?”
“সরি।”
“কেনো?”
“তুমি আমাকে তোমাকে ছোঁয়ার অনুমতি দাওনি৷ তোমাকে টাচ করা উচিত হয়নি।”
ফারিন আহসানের চুল টেনে ধরে। “নাটক করো হ্যাঁ?”
“সত্যিই তো দাওনি।”
“তুমি একটা ধড়িবাজ ছেলে।”
“অনুমতি দাও তাহলে।”
“মুখে বলতে হয়?”
“মুখে তো অনুমতি দাওনি বলে ফেনা তুলে ফেলো। এখন অনুমতি দিয়েছো বললে কি হয়?”
“তুমি কি মজা বোঝো না?”
“না।”
“আমার মাথা গরম করছো তুমি।”
“অনুমতি দিয়ে দাও।”
“আহসান?”
“ছোট্ট একটা ওয়ার্ড।”
“দিলাম যাও।”
“কি?”
“অনুমতি।”
“শিওর তো? পরে বলো না আবার অনুমতি দাওনি।”
“বলবো না।”
“প্রমিস?”
“পাক্কা।”
“লাভ ইউ।”
ফারিন লাজুক হাসলো। তবে অন্ধকারে সেই হাসি আহসান দেখলো না।
____________________
রাত সাড়ে তিনটা বাজে। পুরো বাসা অন্ধকার। শুধু কিচেনের আলো জ্বলছে। ফারিন অনেকক্ষণ সময় লাগিয়ে হোয়াইট সস পাস্তা রান্না করলো। গ্যাস নিভিয়ে চুল থেকে টাওয়াল খুলে পিছনে ঘুরতেই আহসানকে দেখে চমকে ওঠে। আহসান থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট পড়ে উদোম গায়ে কিচেনের দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ফারিন খেই হারিয়ে বলে,
“তুমি এখানে কি করছো? তুমি না ঘুমাচ্ছিলে?”
আহসান ধীর পায়ে উঠে ফারিনের মুখোমুখি এলো। ফ্রাইংপেনে থাকা হোয়াইট সস পাস্তার দিকে তাকিয়ে বলে,
“তুমি যখন উঠেছো, তখনই উঠে গিয়েছিলাম।”
“গোসল করেছো?”
“হুহ।”
“ওহ।” ফারিন দৃষ্টি সরিয়ে নিল। আহসান শেল্ফ থেকে একটা বাটি নিয়ে বলে, “দাও।”
“তোমার খিদে লেগেছে?”
“না লাগলেও এটা দেখে খেতে ইচ্ছে করছে।”
“ভালো হয়নি।”
“টেস্ট করেছো?”
“না।”
“তাহলে বুঝলে কি করে ভালো হয়নি?”
“আমার রান্না কখনোই স্বাদ হয় না। সেভাবে জানি।”
“আজকে ভালো হয়নি দেখে কালকেও ভালো হবে না– এমনটা ভাবা তো বোকামি।”
ফারিন চোখ সরিয়ে নিল। আহসান তাড়া দিয়ে বলে,
“জলদি দাও।”
ফারিন দিলো। এক চামচ মুখে দিতেই আহসানের চোখের দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল। রয়েসয়ে মুখের ভিতর থেকে চামচ বের করে। ফারিন আহসানের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। আহসানকে আস্তে আস্তে চিবোতে দেখে বলে,
“অনেক বাজে হয়েছে তাই না?”
আহসান গিলে বলে, “না।”
“তোমার রিয়েকশনই বলে দিচ্ছে।”
আহসান হাসলো। পরপর দুই, তিন চামচ খেয়ে নিল। ফারিন হাত বাড়িয়ে বলে,
“দাও, তোমাকে খেতে হবে না।”
আহসান দিলো না৷ পুরো বাটি খালি করার পরই খালি বাটি ফারিনকে দিল। বেসিনে মুখ ধুয়ে এসে বলে,
“খারাপ হয়নি।”
“জোর করে কেনো খেলে?”
“তুমি তো আমার ওয়াইফ। তোমার সাথে একটা সিক্রেট শেয়ার করি।”
“কি?”
“আমার ফ্যামিলির সবাই মনে করে আমাকে তারা যাই বলে আমি তাই শুনি। এটা একটা ভুয়া কথা। সাফওয়ান সিদ্দিক নিজের মনের বিরুদ্ধে গিয়ে একটা কাজও করে না। নট এ সিঙ্গেল শিট।”
“আমাকে বলছো কেনো এটা? তুমি যে ধড়িবাজ তা আমি প্রথম থেকেই জানি।”
আহসান হাসলো। “এইযে বললে জোর করে খাচ্ছি? আমার ইচ্ছা না থাকলে তুমি কেনো তোমার বাপও আমাকে খাওয়াতে পারতো না।”
“অনেক বাজে হয়েছে আমি জানি।”
“মোটেই না।”
ফারিনের বিশ্বাস হলো না। ও আঙুল দিয়ে ফ্রাইংপেন থেকেই একটু চেটে দেখলো। মুখ খিঁচে বলে,
“কোরিয়ান নায়ক হতে চাও না? সি ড্রামার নায়ক মনে করো নিজেকে? এত লবণ আর ঝাল পাস্তা খেয়েছো কি করে?”
“নিজের জীবনের নায়ক তো মনে করিই নিজেকে। তবে সি ড্রামা বা কে ড্রামার নায়ক হওয়ার ইচ্ছা নেই।”
ফারিন পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে আহসানের মাথার চুল খামচে ধরে বলে,
“এত পলাইট কেনো? আমাকে প্রতি পদে পদে ফিল করাও কেনো আমি একটা অযোগ্য মেয়ে? আমাকে ফিল করাও কেনো তুমি একটা পারফেক্ট ম্যান যার অনেক ধৈর্য, যে সব পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারে, যে অখাদ্য খেয়েও অভিযোগ করে না। ফিল করাও আমাকে তুমি আরো মেয়ে ডিজার্ভ করো? তুমি সবগুণে গুণান্বিত মেয়ে লাইফ পার্টনার হিসেবে পাওয়ার যোগ্য?”
আহসান চুলের উপর থেকে ফারিনের হাত ছাড়িয়ে নিল। স্বভাবসুলভ শান্ত গলায় বলে, “কিছুই ফিল করাই না ফারিন। আমি এমনই। সবার সাথেই এমন। কাউকে আঘাত দিয়ে কথা বললেই বড় হওয়া যায় না। এই পাস্তা আজকে ভালো হয়নি, তাতে কি? আগামীতে ভালো হবে। ভালো রান্না করার জন্যও যে কষ্ট, খারাপ রান্না করতেও সেই একই কষ্ট। দুইটাই চুলার সামনে গরমে দাঁড়িয়ে করতে হয়।”
ফারিন আহসানকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিলো। “তুমি এইসব ইচ্ছে করে করো। আমি যে বলেছিলাম সংসার করবো না তোমার সাথে, তোমার প্রেমে পড়বো না তাই তুমি ভালো মানুষ হওয়ার নাটক করো।”
“আদতে আমি একটা খারাপ মানুষ তাই তো?”
“হ্যাঁ।”
“তা আমার কি কি খারাপ দিক দেখেছো তুমি?”
ফারিন মুখ ঘুরিয়ে নিল। আহসান ফারিনকে নিজের দিকে ফিরায়। গালে হাত রেখে বলে, “কি হয়েছে?”
ফারিনের চোখ ছলছল করে ওঠে। আহসান ফারিনের গালে হাত রেখেই বলে, “কি সমস্যা বলো?”
“তুমি এত ভালো কেনো?”
“হাসবেন্ড ভালো এইজন্য কাঁদছো? হাসবেন্ড খারাপ হলে ভালো হতো নাকি?”
“তুমি জানো তুমি আমাকে কি ফিল করাও?”
“কি? স্পেশাল ফিল করাই?”
“নো। নেভার। অযোগ্য ফিল করাও তুমি আমাকে।”
“আল্লাহ! আমি তো স্পেশাল ফিল করাতে চেয়েছি।”
“নিজে পারফেক্ট ম্যান সেজে আমাকে ফিল করাও আমি একটা অপদার্থ। আমার কিছু করার জো নেই। আমার কথাবার্তাও ঠিক নেই, কাজবাজ করারও মুরোদ নেই।”
আহসান ফারিনকে বুকে চেপে ধরে। ধীমে গলায় বলে, “পাগল হয়ে গিয়েছো।”
“আমার সব কথা রাখো কেনো?”
“আগে কেউ সব কথা রাখেনি?”
“না।”
“কেনো?”
“তোমাকে বলা যাবে না।”
“একান্ত ব্যক্তিগত হলে বলতে হবে না। সবার-ই পার্সোনাল জিনিসপত্র থাকে।”
ফারিন ওভাবে থেকেই বলে, “বিয়ের শুরু থেকে যে এত এত আজেবাজে কথা বলেছি, লাস্ট একমাস যাবতও যে তোমাকে এত ঘুরিয়েছি, খোঁচা মেরেছি ফিরতি কিছু বলোনি কেনো আমাকে?”
“কি বলতাম? তুমি তো তোমার দিক থেকে ক্লিয়ারই ছিলে। বিয়েতে রাজি ছিলে না, আগেই জানিয়েছো। বিয়ের পর তামাশা করবে সেটাও লজিক্যাল।”
“আমার সব কথা রাখো কেনো?”
“তোমাকে পটাতে সব কথা রাখি। পটে যাও, আর কোনো কথা রাখবো না।”
ফারিন ফুঁপিয়ে উঠলো। আহসান বিড়বিড় করে বলে,
“এ কোন পাগলের পাল্লায় পড়লাম!”
চলমান……
(হ্যাপি রিডিং)

