আমার_বোবাফুল(০৮) #তৃপ্তি_এহসান_নাওরা

0
75

#আমার_বোবাফুল(০৮)
#তৃপ্তি_এহসান_নাওরা

মাহির যখন শিকদার পরিবারের সকলকে নিয়ে ফিরে এলো তখন বর্ণ ড্রয়িং রুমে।পায়ে পা তুলে সোফায় বসে আছে আয়েশিভঙ্গিতে।আযাদ শিকদার ক্ষেপে গেলেন অযথাই।রুমে না গিয়ে সোফায় বসলো বর্ণ’র মুখোমুখি।বাকিরাও আর এদিক ওদিক গেলো না। রুবাইয়্যাত,তামিজ শিকদার,আইজা এবং হানিফা বেগম স্থির হলেন সেখানে।আসল সত্যিটা তো জানতে হবে?সুখ ড্রয়িং রুম ভিড়িয়ে হেঁটে গেলো সামনে। অভ্র সোফার হাতল লাফিয়ে হানিফা বেগমের গাঁ ঘেঁষে বসতেই বৃদ্ধা মুখ কুঁচকে নিলেন।এতো বড় হয়েও গাঁ ঘেঁষাঘেঁষি গেলো না নাতিটার।

“ কী চলছে এসব?”
আযাদ শিকদার হাস্য হীন মুখে গম্ভীর গলায় প্রশ্নঃ করলেন।ছেলের কাজে প্রচুর রেগে আছেন ভদ্রলোক।বর্ণ গা ছাড়া ভাব নিয়ে বললো,

“ কোথায় কী চলছে?”

“ অসভ্য ছেলে হেঁয়ালি করবে না একদম!কী ঘটছে এগুলো? জবাব চাই এখনি।বড় হয়েছো বলে মনমর্জি করবে সব জায়গায়?আজকে যা ঘটিয়েছো ভবিষ্যতে মেয়েটার ক্যারিয়ারে প্রভাব পড়তে পারে ”

“ এটাই ওর প্রাপ্য ছিল!পেয়েছেও তাই!”

“ বর্ণ!যা জানতে চাইছি উত্তর দাও!
নিজেকে সামলে খুব ঠান্ডা স্বরে বললেন আযাদ।তামিজ শিকদার একপল ভাইয়ের দিকে চেয়ে পরপর বর্ণ’র দিকে চাইলো কোতুহলী মনোভাবে।

“ কতোদিন আগে একটা পার্টি ছিল আমাদের।হাসি আড্ডায় ড্রিংক ওভার নিয়ে ফেলেছিলাম…

“ ওৌ.. ড্রিংক করো?এতোটা অধঃপতন!”

বর্ণ কপাল কুঁচকে ভ্রুক্ষেপ হীন অন্যত্র নজর সরিয়ে নেয়।তামিজ শিকদার জানতে চাইলেন,

“ তারপর?”
“ সেই সুযোগে মিশ্মি আমায় একটা রুমে নিয়ে গেলো।আর জোর জবরদস্তি নিজেকে বিলিয়ে দিতে চাইছিলো আমার কাছে!”

সুখের পদযোগল থেমে যায় সিঁড়ির কাছাকাছি গিয়েই। তড়িৎ পিছু ঘুরলো সে।আইজা চেঁচিয়ে উঠলেন,

“ আর তুমিও..”

“ উফফ্ আম্মু। তোমার ছেলে এতোটাও নিকৃষ্ট মানসিকতা নিয়ে চলে না!সেন্স পুরোপুরি ছিল না মানছি.. কিন্তু একটু আধটু ছিল।ওকে ছুঁড়ে ফেলে তো আমি রুম ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলাম ঠিকই কিন্তু ওই কীট কী করেছে জানো?”

সকলের উৎসুক দৃষ্টি দেখে বর্ণ দাঁতে দাঁত নিষ্পেষিত করে বললো,

“ পরবর্তীতে ওই রুমে দু’জনের ধস্তাধস্তির ভিডিও আমার সামনে তুলে ধরে বলছিল ‘যদি আমি তাকে বিয়ে না করি সে ভিডিও মিডিয়ায় লিক করে দেবে। জোর জবরদস্তি তার সম্ভ্রম হানী করার চেষ্টা করেছি এমন কিছুই বলবে।’ আমার প্রেস্টিজ, আমার এতো দিনের নাম, অ্যাচিভমেন্ট ডেস্ট্রয় করে দেবে এক নিমেষেই। কতো বড় কলিজা!ওই সস্তা ট্রিক্স ফলো করে বর্ণকে ব্ল্যাকমেইল করে?তার এই সামান্য শাস্তিটা পাওয়াই উচিৎ!”

“ তাই বলে একটা ভিক্ষুকের সাথে বিয়ে দেবে?”
“ দাদুভাই বেঁচে থাকলে তার কথা ভেবে দেখতাম!”

বর্ণর তড়িৎ জবাবে হানিফা বেগম থমথমে মুখে চুপসে গেলেও অভ্র গদগদ কন্ঠে বললো,

“ হ্যাঁ, তখন সতিনের সাথে একসাথে মিলেমিশে সংসার সামলাতে পারতে।মিশ্মিকে তো তোমার ভীষণ পছন্দ!”

হানিফা বেগম চোখ রাঙিয়ে কঠোর দৃষ্টিতে চাইলেন। ধমকে উঠলেন যথা সম্ভব,
“ চুপপ!কতো ভালো ভেবেছিলাম মেয়েটাকে। অথচ শেষে কী বের হলো!!আমার আদরের নাতির সাথে পাঙ্গা নিয়েছিলো?”

আযাদ শিকদার হাতে কপাল ঠেকালেন।ছেলের সামনে কী প্রতিক্রিয়া দেখানো উচিত খুঁজে পাচ্ছেন না।আইজা হতভম্ব চোখে চুপচাপ নির্বিকার ভঙ্গিতে বসে থাকা ছেলেকে দেখে যাচ্ছেন।কার মতো হয়েছে এটা? নির্ঘাত শাশুড়ি মায়ের মতো -এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই!গলা খাঁকারি দিয়ে তামিজ শিকদার একঝলক রুবাইয়্যাতকে দেখে উঠে দাঁড়ালেন।সব তো জানা হয়েই গেছে!

চারপাশ হতে একে একে সকলেই প্রস্থান করলো। অথচ নিজ স্থানে জড় পদার্থের ন্যায় থম মেরে বসে রইলো মিশ্মি।হাত দুটো মুঠো বদ্ধ।মুখের মেক-আপ ভাসা ভাসা হয়ে গিয়েছে। ঠোঁটের লিপস্টিক এলোমেলো। রাগের তোপে, পরাজয়ের দুঃখের ভারে মুখে হাত ঘষতে ঘষতে এই অবস্থা করেছে নিজের। মস্তিষ্কে বিষ্ফোরণ চলছে তার। দাঁতে দাঁত খিচে আসছে।এতো সহজেই ভেস্তে গেলো সবকিছু? ভিডিওর নাগাল কীভাবে পেলো বর্ণ?সেতো আগলে আগলে রেখেছিল সবকিছু।

আকাশ আঁধারে ঢেকে পড়ছে ধীরে ধীরে। এখনি রাত্রি নামবে। সামিয়া গম্ভীর মুখে এগিয়ে এলো মেয়ের দিকে।মিশ্মির কাছাকাছি এসে বললো থমথমে গলায়,

“ সন্ধ্যে হয়ে আসছে!ফিরতে হবে আমাদের!”

তীর্যক চোখে মুখ তুলে তাকালো মিশ্মি।নিরবে মাথা ঝাঁকিয়ে নিঃশব্দে উঠে দাঁড়ায়। কয়েক ধাপ এগুতেই পেছন থেকে ভেসে আসে পুরুষালী লাজুক স্বরে,

“ ওয়াইফি.. আমায় একা রেখে এভাবে চলে যাবে?”

শব্দ কটা কর্ণ কৌটরে পৌঁছাতেই মাথায় রক্ত উঠে গেলো মিশ্মির।ঝড়ের গতিতে ফিরলো পিছু। খানিক দূরেই দাঁড়িয়ে আছে সদ্য বিবাহিত বর সবুজ মিয়া।মুখে টিস্যু চেপে লাজুক মুখে তার দিকে চেয়ে আছে।মিশ্মি এদিক ওদিক দেখার প্রয়োজনবোধে মনে করলো না। ছুটে গেলো হাত কিড়মিড়িয়ে,

“ নিয়ে যাচ্ছি তোকেও!”

বলার ফাঁকে নিষ্ঠুর গতিতে লোকটার চুলে হাত চালালো সে। সর্বস্ব দিয়ে টান মারতেই চুলগুলো সব হাতে চলে এলো তার।মিশ্মি আশ্চর্য নেত্রে নিজের হাতের দিকে চেয়ে পরপরই সবুজের মাথার দিকে চাইলো।লোকটার কুচকুচে কালো চুল মাথাতেই আছে তবে এগুলো কী?নকল চুল!

“ এটা তো নকল!”
হতবাক কন্ঠে বলে উঠলো রিশিকা।মিশ্মির ফ্রেন্ড হয়। মেয়েটা চোখ পাকিয়ে সামনে তাকায়। প্রচারিত নামানুসারে সবুজ মিয়া নিজের মুখের নকল গোঁফ, দাঁত, মেক-আপ তুলে শীতল চোখে মুচকি হেসে মিশ্মির দিকে চাইলো। রমণী তখন বিস্ফোরিত চোখে হা করে দাঁড়িয়ে।একটু আগে যাকে মধ্যবয়স্ক, ঘৃ!ণা ধরে আসা বাজে দেখাচ্ছিল এখন তাকে সুদর্শন বললেও ভুল হবে না। খোঁচা খোঁচা দাড়ি,মাথা ভর্তি কালো চুল, ঠোঁট বাঁকানো হাসি।সবই তো সুন্দর।

“ আপনি…
আনমনে সামনে আঙ্গুল তাক করে অদ্ভুত স্বরে প্রশ্ন করে মিশ্মি।মাথা ঘুরে আসছে তার।এটা আবার কোন নতুন খেলা?
লোকটা হাসলো কিঞ্চিৎ।বললো,

“ নকল!”
“ তাহলে বিয়ে..

“ এই বিয়ে,কাজি সবটাই নকল ছিল!”
“ সত্যিই?”
মিশ্মির ঠোঁটে বিষ্ময় মিশ্রিত হাসি ফুটলো আচমকাই।জানে পানি পেলো যেমন।লোকটা ফের হেসে বললো কান চুলকে,

“ বর্ণ কিন্তু সত্যি সত্যিই ভিক্ষুকের তালাশ করেছিল। সত্যিই বিয়ে পড়িয়ে দেওয়ার নিয়তে।আমিই বুঝিয়ে শুনিয়ে প্ল্যান চেঞ্জ করালাম।যতো খারাপই হোক এমন একটা সুইট মেয়ের পাশে বুড়ো ভিক্ষুক মানাতো না ”

খুশিতে, বিষ্ময়ে মিশ্মির শরীর কাঁপছে।জিভে ঠোঁট ভিজিয়ে আচমকা জাপ্টে ধরলো সামনে দণ্ডায়মান লোকটাকে,

“ থ্যাঙ্কিউ.. থ্যাঙ্কিউ সো মাচ ”

পরপরই সরে আসে। অত্যাধিক বিস্ময়ে মাথায়, মুখে হাত চেপে ক্ষণকাল থম মেরে দাঁড়িয়ে থেকে ছুটে গেলো সামিয়ার কাছে,

“ মাম্মি.. শুনেছো তুমি?কোন ভিক্ষুকের সাথে আমার বিয়ে হয়নি”

সামিয়াকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে সে পরপর মুশফিক হায়দারের কাছে গেলো উম্মাদের মতো,

“ ড্যাড তুমি শুনেছো?বিয়ে হয়নি আমার!”

মিশ্মি হুট করেই পাশের চেয়ারে বসে পড়লো। চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে তার,
“ হে পৃথিবী দেখো দেখো.. আমার বিয়ে হয়নি কোন ছোটলোকের সাথে!”

বিয়ে হয়নি এই সুবাদে বর্ণকে না পাওয়ার আফসোস কিছুপলের জন্য ভুলে গেলো মিশ্মি। সত্যি বিয়ে পড়ায়নি বলে মনে মনে বর্ণ’র প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান দিল!একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে সামনে তাকাতেই রিশিকা বললো,

“ কিন্তু মিডিয়া?নেট জগতে আজকের এই বিয়ে নিয়ে তুলপাড় উঠেছে দ্যাখ! শিরোনাম – প্রেম মানে না কোন বাঁধা।ভিক্ষুক হোক বা প্রেসিডেন্ট।সবার মনেই ভালোবাসা লুকায়িত আছে।যা প্রমাণ করে দিলেন সংগীত শিল্পী মিশ্মি এবং ভিক্ষুক সবুজ মিয়া স্মরণীয় জুটি”

মিশ্মির হাসি উধাও হয়ে গেলো নিমিষেই। বর্ণ নিষেধ করেছিল মিডিয়ায় প্রকাশ করতে।সে-ই নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারলো”! নিশ্চয়ই এটাই বর্ণ’র প্ল্যান ছিল।যা সে করে দেখাবে বলে হুমকি দিয়েছিল বর্ণ সেটাই করে দেখিয়েছে! এখন কী হবে তার?এই মুখ কীভাবে দেখাবে জন সাধারণের সামনে?

স্বশব্দে ফোন বাজতেই বর্ণ ভ্রু কুঁচকে স্ক্রিনে নজর আবদ্ধ করে।সিয়াম ওরফে সবুজ মিয়া’র তলব এসেছে।সে কল রিসিভ করে কানে ধরতেই ওপাশ থেকে সিয়াম বললো,

“ দোস্ত.. মিশ্মিকে সব বলে দিয়েছি!”

বর্ণ’র মুখের রঙ পাল্টে এলো। দাঁত চিড়বিড়িয়ে কঠিন ভাষায় দু’টো গালি ছুঁড়ে বললো,

“ আরো কয়েক দিন যেতে দিতে বলেছিলাম তোকে!”

সিয়ামের অপরাধী কন্ঠ,
“ কী করতাম বল?বেচারি অল্প শোকে কাতর অধির শোকে পাথর হয়ে গেছিল।আমি ভাই জনদরদী –চোখের সামনে এমন করুন অবস্থা সহ্য করতে পারছিলাম না। তাছাড়া…

“ কী?”
“ তাছাড়া রমণী আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছিল।চুল খুলে হাতে নিয়ে ফেলেছে।তাই লুকিয়ে রাখতে পারিনি বিষয়টি”

বর্ণ কথার ফাঁকে ড্রয়িং রুম ছেড়ে উঠে এসেছিল। আনমনে হাঁটতে হাঁটতে নজর গেলো সামনে।বোবাফুল! রেলিং ধরে স্থির দাঁড়িয়ে আছে।পড়নে এখনো লেহেঙ্গা। বর্ণ’র ঠোঁট ছিঁড়ে বাঁকা হাসি ফুটে।ফোন ধরে রেখেই এগিয়ে যায়।

সুখ থম মেরে রয়। উল্টো ঘুরে চলে যেতে চায় কিন্তু টাকনোর নিচে লেহেঙ্গা পিষে আছে। এমতাবস্থায় পিছিয়ে গেলে পা বিঁধে পড়ে যেতে পারে।সে নজর সরিয়ে নিলো দ্রুত।বর্ণ হেলেদুলে সামনে এসে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় পিঠ হেলিয়ে ঝুঁকে গেলো তার সামনে। ঠোঁটে সেই চিরচেনা ধূর্ত হাসি।অস্বস্তিতে কুঁকড়ে গেলো সুখ। হাঁসফাঁস করে ঠোঁটে ঠোঁট গুঁজে পাশে ফিরতেই চোখে চোখ পড়ে।বর্ণ আচমকাই……

#চলবে🕊️

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here