#আমার_বোবাফুল(১৬)
#তৃপ্তি_এহসান_নাওরা
“এতোদিন লাগে ফিরতে?”
“কী এমন গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল? ”
“ বাড়ির বাইরে রাত কাটাতে কাটাতে এখন আর ঘরমূখী হতে ইচ্ছে করে না,না?”
আইজা, হানিফা বেগমের পক্ষ থেকে একের পর এক এমন ধরনের সব প্রশ্ন ধেয়ে আসছিল বর্ণ’র দিকে। ড্রয়িং রুমে বসে ক্ষণকাল তাদের আপ্যায়নের সাথে সাথে কথাগুলোও হজম করে নিলো।
ঠোঁটে ঠোঁট চেপে নির্বিকার চোখ মেঝেতে স্থাপিত করে একধ্যানে শুনেছে সব। অতঃপর মাহিরকে কিছু একটা ইশারা করে গটগট পায়ে চলে গেলো সিঁড়ি বেয়ে।মাহির হাসলো চমৎকার।চোখের কোণে সতর্ক মস্তিষ্কে আশেপাশে পরখ করে নিলো একবার।ওইতো খানিক দূরেই স্টাডি রুম থেকে ক্ষণে ক্ষণে তুহফার চোরা দৃষ্টি নজরে আসছে। মাহির মনে মনে হাসলো। নড়েচড়ে বসে হানিফা বেগমের উদ্দেশ্য বললো অমায়িক স্বরে,
“ জ্বী,দাদু যা বলার আমাকে বলুন।বস এখন রেস্ট নিবে।”
“ তোরে আর কী বলবো রে ব্যাটা?যে আসল সেতো বুড়ো আঙুল দেখইয়া চইলা গেলো!”
বৃদ্ধা বিক্ষিপ্ত মেজাজে খ্যাটখ্যাট করে উঠলেন। মাহির ঠোঁট চোকা করে মাথায় পেছনে হাত বুলায়।এক পয়েন্ট ধরে বৃদ্ধার অতিরিক্ত কথায় তারই তো মাঝে মাঝে কানে তালা পড়ে যাওয়ার জো হয়। যেখান বর্ণ নিয়মের চেয়ে দু অক্ষর কথা বললেই নাকের ডগায় রাগ নিয়ে অজগরের ন্যায় ফোঁস ফোঁস করে অতিষ্ঠে। মুখের চেয়ে হাত বেশি চালায়।
চোখের চাহনিতে ভষ্ম করে দিতে চায়।সে ব্যক্তি পুরো দশমিনিট.. মানে ৬০০ সেকেন্ড নিশ্চুপ মনে শুনেছে সকল অভিযোগ। এটাই তো ভাগ্য!
.
সুখের ব্যালকনিতে একটা বিনব্যাগ আছে। বর্ণ’র রুম থেকে অগোচরে নিয়ে এসেছিল বহুদিন আগে। পরবর্তীতে বর্ণ আর তল্লাশি করেনি তাই সেও ফিরিয়ে দেয়নি।এই ব্যাগে বসে থাকতে ভালো লাগে সুখের। যথেষ্ট কোন কারণ নেই। দিনের প্রায় সময় এখানে বসেই কাঁটে তার।আজো ব্যতিক্রম হয়নি। হাঁটু তুলে “দ” আকৃতির বসে পুণরায় দুহাতে হাঁটু জড়িয়ে চুপচাপ বসে আছে ফ্যাকাশে মুখে।মন, মস্তিষ্ক আশেপাশে নেই যেনো। অন্যমনস্ক হয়ে আছে সে।
তদন্তে থাকা পুলিশকে রূপম স্যারের পরিবার জানিয়েছে – চিরতরে শিক্ষকতা হারিয়ে ভেঙে পড়েছিল রূপম।উনার ঘরের স্ত্রীও সন্তানদের নিয়ে বাপের বাড়ি চলে গেছেন। অবশ্য এর সঠিক কারণটা রূপম স্যারের পরিবারের কেউ উল্লেখ করেনি এখনো। এরপর কয়েকদিন চুপচাপ বাড়ির এককোণে পড়ে থাকতেন তিনি। পাঁচদিনের মাথায় হঠাৎ ভোর রাতে বাড়ি থেকে বৃদ্ধা মা,বাবাকে অবগত না করেই বেরিয়ে যান রূপম। সেদিন আর ফিরে আসেননি।তারাও সেসব আমলে নেয়নি কিন্তু তার চারদিন পেরিয়ে যাওয়ার পর উনারা চিন্তিত হলেন।
প্রায় নয় দিন অতিবাহিত হওয়ার পরই বাড়িতে বেল বাজে কিন্তু দরজায় ওপাশে কেউ ছিল না। কেবল ছয় ফুটের বেশি দৈর্ঘ্যের একটা পার্সেল ছিল।আর সেখানেই রূপমের লা”শ।বেশ রহস্যজনক ভাবে খু!ন করা হয়েছে তাকে।পুরো শরীরে আঘাতের চিহ্ন নেই কিন্তু বুকের বাঁ পাশে যেখানে হৃদযন্ত্রের বসবাস,সেথায় রক্তে রঞ্জিত –ফাঁকা। কলিজা ছিঁড়ে খুঁড়ে খুবলে বের করে নিয়েছে কিলার!সুখের ওই বিভৎস দৃশ্য চোখের তারায় ভাসতেই চোখ বুজে হাঁটুর জামা খামচে ধরে। শরীর কেঁপে উঠলো পুণর্বার।
মনে প্রশ্ন উঁকি দেয় –এই নৃ’শংস মৃ!ত্যু কোথাও না কোথাও সে জড়িয়ে নেই তো? পরক্ষণে আবার মনে হয় –শুধু শুধু সে কেনো হবে? হয়তো স্যারের খুব আপন কোন শত্রু মনের খোয়াইশ মিটিয়েছে।যা চরিত্র – মৃ!ত্যু কারণ যদি এই চরিত্রহীনতার জন্য হয়ে থাকে; একদম উচিত হয়েছে।
→
গিটারের টুংটাং আওয়াজে চোখ শীতল হয় সুখের।সজাগ হয় কান দ্বয়।পরপরই কানে হাত চেপে চোখ বুজে নেয় সে।বর্ণ’র ব্যালকনি তার ডান পাশেই। সেখান থেকে ভেসে আসা সুরেলা কণ্ঠ, গিটারের আওয়াজ যেনো চম্বুকের মতো টানছে তাকে।নিজেকে দমিয়ে নেয় সুখ।আগে এই সুর কর্ণকৌঠরে পৌঁছাতেই সব কাজ ছেড়েছুড়ে সে ছুটে যেতো বর্ণ’র কাছে। এখন আর যায়না। প্রথম প্রথম খুব ছটফট করতো ভেতর বাহির।মন চাইতো ছুটে যেতে –কিন্তু…
সুখ আবেশে চোখ বুজে নেয়। বর্ণ’র গানের গলা ভেসে আসছে বাতাসের সাথে।এতো সুন্দর কেনো পুরুষটির কন্ঠস্বর?এমন হৃদয় দোলানো কন্ঠ পৃথিবীতে দুবার শুনেনি সে।
সুখের চারপাশ অন্ধকার নেমে আসছে ধীরে ধীরে।দূরে অথচ খুব নিকট হতে ভেসে আসা বর্ণ’র গান যেনো তার মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছিলো।একসময় গভীর নিদ্রায় তলিয়ে যায়।
→
পরপর টুং টুং মেসেজ এলো ফোনে।হানিফা বেগম চোখ কুঁচকে আশেপাশে তাকায়।অভ্র টি-টেবিলে ফোন রেখে আইজার রুমে গিয়েছে বোধহয়। বাঁদরের মতো মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে আছে।কানের কাছে আবদার রাখছে আদুরে গলায়,
“ আম্মু.. টাকা দাও!”
কল এলো আবার। ভাইব্রেশনে থাকায় কাঁচের টেবিল কম্পিত হচ্ছে। একপলক আইজার কক্ষের দিকে চেয়ে অভ্রকে বের হতে না দেখে সন্তর্পণে হাত বাড়িয়ে ফোন হাতে তুলে নিলেন হানিফা বেগম। ইংলিশ অক্ষরে লেখা নামটি পড়তে অক্ষম হলেও কল রিসিভ করা কানে তুললেন। তুহফা এসে পাশে বসলো বৃদ্ধার।
“ অভ্র’র না ফোনটা? অনুমতি ছাড়া তুমি রিসিভ করেছো কেনো নানু?ও কোথায়?” –কপালে ভাঁজ ফেললো মেয়েটা।
হানিফা বেগম ঠোঁটে আঙুল চেপে তাকে চুপ হতে বলল।তুহফার কুঞ্চিৎ কপাল আরো কুঁচকে আসে।করতে কী চাইছে নানু?
“ অনলাইনে দেখাচ্ছে অথচ আমার মেসেজের রিপ্লাই করার সময় তোমার কাছে নেই অভ্র? ইগনোর করছো আমায়?”
তপ্ত স্বরে চিরচিরে মেয়েলি কন্ঠ শুনে হানিফা বেগমের নজর সরু হয়।এই বেয়াদব মেয়েটা কে?তার নাতির সাথে এভাবে কথা বলছে? কন্ঠ গম্ভীর হয় তার,
“ এই মাই.. মেয়ে!কে তুমি?”
ওপাশে থাকা অল্পবয়সী উমামা’র মস্তিষ্ক তড়াক করে উঠে তৎক্ষণাৎ।ওই সময় কেবল মনে উদয় হলো একটিই কথা –অভ্রর ফোন কোন মেয়ের হাতে।তাই কী মেসেজের রিপ্লাই করছে না?সে এখন অন্য কোন মেয়ের সাথে টাইম স্পেন্ড করছে।তাকে চিট করেছে?”
“ তুমি কে মেয়ে?অভ্র কোথায়?”
হানিফা বেগমের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে।রাগত চোখে তাকালো তুহফার দিকে। মেয়েটা ভড়কায় অল্পস্বল্প। নিকটে এসে বৃদ্ধার গা ঘেঁষে বসে কান পাতলো। তিনি জবাব দিলেন কাটকাট গলায়,
“ অভ্র নেই!তার সাথে তোমার কী কাজ?”
“ আমি ওর গার্লফ্রেন্ড হই!”
চোখ থমকে গেলো বৃদ্ধার। গার্লফ্রেন্ড মানে তিনি বুঝেন। টিভিতে অনেক বার শুনেছে। তড়িৎ বললেন,
“ তাহলে আমি কে? আমাকেও তো গ্ গা.. গ্রালফেন্ড বলে ডাকে ও!”
→
পাখির কিচিরমিচির ডাকে ঘুম ছুটে সুখের।আস্তে ধীরে চোখ মেলে আশেপাশে তাকালো। প্রকৃতিতে কোমলতা হানা দিয়েছে ।রক্তিম সূর্য হেলে পড়ছে পশ্চিমে। পাখিরা আপন নিড়ের অভিমুখি হচ্ছে একে একে।যেনো শহরকে জানান দিচ্ছে –সময় এখন গোধূলি লগ্নের।
ব্যালকনিতে ঘুমিয়েছে ভাবতেই নিজের কাণ্ডে অবাক হলো সুখ।
ওই অবস্থাতেই নিচে এলো সে।মুখ ধুতে ইচ্ছে করছিল না।গায়ে জড়ানো ঢিলেঢালা ব্ল্যাক লেডিস শার্ট এবং স্কার্ট।গলায় ওড়না।এলোমেলো তার চুল। স্নিগ্ধ মুখখানা ফুলকো ফুলকো।
চোখ কচলে প্রথমে রুবাইয়্যাতের দরজার দিকে চাইলো সে। দরজা বন্ধ।আব্বু ফিরেনি বোধহয়। আম্মুকে দেখা যাচ্ছে না। আশেপাশে নজর দিলো না সুখ। সোজা ডাইনিং স্প্যাসে এসে জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢালতে শুরু করে।
“ ফুল কফি নিয়ে আয়!”
কী দারুণ আদেশ।হাত থেমে গেলো এক মূহুর্তের জন্য। তড়িৎ কন্ঠের উৎস খুঁজে ড্রয়িং রুমে চাইলো।বর্ণ বসে আছে ওখানে।সে পরপর চতুর্দিকে নজর বুলায়।বর্ণ কথাটি এতো উচ্চস্বরে বলেছে যে এধার-ওধারে উপস্থিত সকলের কানে পোঁছেছে।
সুখ দাঁতে দাঁত নিষ্পেষিত করে।সবাইকে সাক্ষী রেখে এতো জোরে বলার উদ্দেশ্য সুখ ঢের বুঝেছে।কফি নিয়ে যেতে সুখ যেনো নাকচ করতে না পারে.. কিন্তু সেতো এসব কাজ ছেড়ে দিয়েছে সেদিনই।
আইজা আর হানিফা বেগমের কানেও পৌঁছালো বর্ণর কথা। অগত্যা সুখ কিচেনে গেলো।তবে কফি পাঠালো সাইমা বুয়ার হাতে। স্বেচ্ছায় যাবে না সে বর্ণ’র কাছে। কখনোই না!
মিনিটের মাথায় বুয়া ফিরে এলো।হাতে কফির মগ দেখে সুখ প্রশ্নাতীত চোখে তাকায়।বুয়া বললো মুখ গুঁজ করে,
“ আপনারেই নিয়া যাইতে কইছে আম্মা!”
অন্যত্র নজর নিক্ষেপ করে সুখ। মেজাজ তপ্ত হয়ে আসছে ক্রমশ।কী চাইছে লোকটা?সে দৃঢ় চোখে আইজার দিকে চাইলো।যেনো চোখের ইশারায় বলছে
“ তোমার ছেলের এটা কেমন ব্যবহার?”
ভদ্রমহিলা ফ্যাকাশে মুখে তাকান। সুখকে বললেন বুঝানোর স্বরে,
“ কতোদিন পর ছেলেটা ফিরেছে। তুই-ই নিয়ে যা না মা!আগে তো বলার প্রয়োজনও হতো না।এখন এমন করছিস কেনো?”
সুখ কফির মগ এমন ভাবে ধরলো যেনো গুঁড়িয়ে ফেলতে পারলেই শান্তি। কাছাকাছি পৌঁছাতেই আচমকা উঠে দাঁড়ালো বর্ণ’র।ফোনে নজর ডুবিয়ে সদর দরজা দিকে এগিয়ে গেলো নিজ ধ্যানে।
সুখ থম মেরে রয় অল্পক্ষণ। অতঃপর ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে ধুপধাপ শব্দ করে তার পিছু পিছু গেলো।
বর্ণ হাঁটতে হাঁটতে গার্ডেনে চলে এসেছে। পেছন থেকে তুড়ি বাজিয়ে,কফির মগে টাং টাং আওয়াজ করে বর্ণ’র মনোযোগ পেতে চাইলো সুখ। কিন্তু আফসোস.. পুরুষটি একবারের জন্যও ফিরে তাকায়নি। শান্ত প্রকৃতির সুখ ধীরে ধীরে মেজাজ হারাচ্ছে।বর্ণ নিশ্চয়ই কানে কালা না?তবুও কেনো তার উপস্থিতি উপলব্ধি করতে পারছে না?নাকি টের পেয়েও নির্বিকার?
বর্ণ আচমকা পিছু ঘুরলো। একঝলক সুখের গম্ভীর মুখশ্রী এবং হাতে কফির মগ পরখ করে বোধহয় অগোচরে হাসলো। সুখকে জ্বালাতে ইচ্ছে করেই বললো ভ্রু গুটিয়ে,
“ আমার পিছু নিয়েছিস কেনো?”
রাগের তোড়ে সুখের নিঃশ্বাস ভারী হয়। চোয়াল শক্ত করে কঠোর দৃষ্টি অন্যত্র ফিরিয়ে রাখে।টু শব্দটিও করলো না।বর্ণ ফের বললো ঠোঁট চোকা করে,
“ ওহ্, কফি নিয়ে এসেছিস?আমি কী একবারো বলেছিলাম এমন কিছু?
চোখ কুঁচকে সরু দৃষ্টিতে তার দিকে চাইলো সুখ।বর্ণ তার দৃষ্টি অবলোকন করে বললো,
“ একচ্যুয়েলি মনে পড়ছে না।
পরপরই শ্বাস ছেড়ে বলে,
“ এনেছিস যখন টেস্ট করে দেখাই যায়।দে..
ঠোঁটের কোণে সূক্ষ্ম হাসির রেখা টেনে সুখ কফির মগ উপরে তুলে বাড়িয়ে দেয়ার ফাঁকে হঠাৎ বর্ণ’র ধূসর মণি চোখে নিজের কালো মণি জোড়া স্থির করলো।একপলের জন্য উভয়ের চিত্ত কেঁপে উঠেছিল কী সেসময়?
‘ আর ইউ্যু সিরিয়াস?’
বর্ণ দ্রুত এক কদম পিছিয়ে চোখ পাকিয়ে তাকাল। দৃষ্টিতে বিষ্ময় কী না ঠাহর করা মুশকিল কিন্তু ব্যপারটা তার কল্পনাতীত ছিল।
মগ চোখের সামনে তুলে কফিগুলো সন্তর্পণে নিচে ঢেলে দিচ্ছে সুখ। চোখের দৃষ্টি বিক্ষিপ্ত অথচ শান্ত দীঘির মতো।যার গহীনে লুকায়িত কতো অব্যক্ত কথার ফুলঝুরি।বর্ণ কী কোনদিন তা পড়তে সক্ষম হবে?হয়তো হ্যাঁ, হয়তোবা কক্ষনো না!
নিজ কাজ সম্পাদন করে সুখ বুঝাল চুল উড়িয়ে, ‘ ইয়েস,আম সিরিয়াস!’
#চলবে🤍
[কফি দেয়ার নাম করে বাড়িয়ে দিয়ে সুখপাখি কতো বড় ধোঁকাটাই দিলো বর্ণকে।আরো একবার বেইজ্জতি🫠]

