#বৃষ্টি_ছুঁয়ে_দিক_সন্ধ্যা – [৩৬+৩৭]
|২য় খণ্ড|
#বেলতুলি
লাবিবা ওয়াহিদ
[অন্যত্র কপি সম্পূর্ণ নিষেধ]
গ্রামের লোকেদের একটা প্রবাদবাক্য আছে, “সুন্দরীরা না পায় ঘর, না পায় বর।” আজকাল এই প্রবাদের বেশ চর্চা হচ্ছে বাড়িতে। বাহির থেকে অনেক বিয়ের প্রস্তাব আসছে মৌনোর জন্য। তাও আবার বুড়ো, ডিভোর্সি, বিধবা কিংবা কয়েক বাচ্চা আছে এমন পুরুষের দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে। ভালো প্রস্তাব আসলেও যখন জানতে পারে মৌনোকে এ(১)সি ড নিক্ষেপ করা হয়েছে, তখনই এরা মুখ বিকৃত করে কেটে পড়ে। নিশ্চয়ই ওই ছেলের সাথে মেয়ের ফষ্টিনষ্টি ছিল। নয়তো আজকাল ছেলেরা বেহুদা এ সি ড ছুঁড়বে নাকি? অবৈধ কিছু ছিল বলেই এমন করেছে। সাধে কি আজকাল সুন্দরী মেয়েদের মানুষ অবিশ্বাস করে? এদের তো গোড়াতেই সমস্যা। চরিত্রহীনা।
ইয়ামিন মামা এবং তার স্ত্রী দুজনেই মৌনোর বিয়ের বিপক্ষে। তাদের সঙ্গ দিচ্ছেন ইয়াসীন মামা। তিনি আপাতত ঢাকাতে শুটিং এ ব্যস্ত। কয়েকদিনের মধ্যে ফিরে আসবেন জানিয়েছেন। বড়ো মামাদেরও একই কথা, তারা মৌনোকে আরও পড়াবে। মেয়েটা নিজের পায়ে দাঁড়াবে। কিন্তু দুই মামী মানতে নারাজ। তাদেরও আজকাল মৌনোর চরিত্র নিয়ে বেশ সন্দেহ। তাই তো, মৌনো কিছু না করলে কেউ তাকে এ সি ড ছুঁড়বে কেন? এক হাতে কি তালি বাজে নাকি? মৌনো যে সত্যিই বলছে, তার-ই বা গ্যারান্টি কী?
মৌনো এসব বুঝেও এড়িয়ে চলে। তার ভেতরটা পুড়ে গেলেও সে কিছু বলে না। লোকের কথার ভয়ে ইতিমধ্যেই সে নিজের সবচেয়ে বড়ো বিপদটা ডেকে এনেছে। বরং ওদের কথা শুনলে তার পেছনে খরচ করা সবার ভালোবাসা, আকাঙ্খা সব ডাস্টবিনে চলে যাবে৷ রোকসানা আন্টি ইতিমধ্যেই ওকে অনেকখানি ফিরিয়ে এনেছে সেই ট্রমা থেকে। এখন মৌনো নিজেই আগ্রহ করে ভার্সিটি যায়। নিজেকে এখন কালো বোরকায় জড়িয়ে নিয়েছে, এজন্য এখন আর তার রূপ কেউ দেখেও না। তার হাতের দাগও কেউ দেখতে পায় না। ভার্সিটির থার্ড ইয়ারে এসে ট্রান্সফার হওয়া এত সহজ নয়। তবে ইয়ামিন মামা আর বড়ো মামা অনেক চেষ্টার পর পেরেছে। এই দুঃসময়ে মৌনোর সর্বোচ্চ সিজিপিএ-ও ওকে বেশ সঙ্গ দিয়েছে। এজন্যই হয়তো বলে, আমাদের জীবন থেকে বন্ধু হারায়, তবে শিক্ষা নয়। শিক্ষাই আমাদের প্রকৃত বন্ধু।
বুশরার বিয়ে সন্নিকটে। ইতিমধ্যেই মৌনোর পরিবার চলে এসেছে। এতদিন পর নিজের পরিবারকে পেয়ে মৌনো যেন প্রাণ ফিরে পেল। সবাইকে জড়িয়ে ধরল, কাঁদল। এই কটা মাসে খুব অনুভব করেছে, পরিবারের চাইতে আপন কেউ নেই। সবাই ছুঁড়ে ফেললেও পরিবার কখনো ছুঁড়ে ফেলবে না। কিন্তু তার পরিবারের থেকেও বিয়োগ হওয়া প্রয়োজন ছিল। সে ধীরে ধীরে নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছে, উপলব্ধি করেছে তার একা বাঁচার জন্য নিজের শক্তি নিজের হতে হবে। নয়তো পরিবারের আহ্লাদে সে আরও নিজের শঙ্কাগুলো ছাড়াতে পারত না। উলটো সে এটা ভেবে দুশ্চিন্তায় থাকত, তার জন্য তার পরিবারের এত লোকসান হয়েছে। সবাই নিজেদের কাজের ব্যস্ততা ফেলে শুধু মৌনোর জন্য এখানে পড়ে থাকবে। এটা মৌনো কিছুতেই চায়নি। সময় কারো জন্য থেমে থাকে না, মৌনোও চাইত না তার জন্য তার পরিবার থেমে যাক। এখানে কষ্ট করে থাকাটাই বুদ্ধিমানের কাজ ছিল।
প্রণভ দূরে দাঁড়িয়ে মুচকি হেসে বলল,
–“আর কত কাঁদবে শালিকা? জাবির ধরা পড়েছে। এবার অন্তত হাসো।”
মৌনো চমকে গেল।
–“ধরা পড়েছে?”
রিমঝিম হেসে বলল,
–“হুঁ। ওকে এখন কোনো মন্ত্রীরাই বাঁচাতে পারবে না। জাবিরের মাথার ওপর সামান্য নেতার ছায়া ছিল। আর ও কী করে ভুলে গেছে যে আমাদের বড়ো চাচার মন্ত্রীর সাথে ওঠাবসা আছে। বুদ্ধু একটা, পালিয়েও লাভ হলো না। মশিউর আঙ্কেল বলেছেন তিনি ভাল লইয়্যারের ব্যবস্থা করে দিবেন। কেস ভালো মতো আগাচ্ছে মৌনো।”
মৌনো জানে না কেন, এই মুহূর্তে তার বেশ প্রশান্তি লাগছে। জাবির ধরা পড়েছে, জেলে আছে। মৌনো খুব করে চায়, জাবির তার যেই সর্বনাশটা করেছে, সেটা যেন অন্য কোনো নারীর সাথে না হয়। মৌনো জানে, বেঁচেও ম(১) রে যাওয়ার অনুভূতি।
রাজিয়া শেখ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
–“মাঝখান দিয়ে আমার মেয়ের সর্বনাশ করে দিয়ে গেছে ওই জা(১)নোয়ারটা। সবই আমার দোষ। জুনায়েদ, রিমঝিমকে নিয়ে এত ব্যস্ত ছিলাম যে..”
রাজিয়ার চোখে পানি ছলছল করছে। আবারও মৌনোর মুখ ভার হয়ে গেল। সে তার পোড়া হাত চুলকাতে চুলকাতে বলল,
–“তো-তোমার.. দ..দোষ নেই। আমি..”
রাজিয়া শেখ টের পেলেন তিনি আবারও আবেগী হয়ে পড়ছেন। তিনি ভুলেই বসেছেন ডাক্তার এবং রিমঝিমের কড়া নির্দেশ, মৌনোর সামনে সর্বদা শক্ত হতে হবে। রাজিয়া শেখ সব ঝেড়ে দিয়ে বললেন,
–“তোর জন্য পিঠা এনেছি। আয়, খাবি।”
পেছন থেকে বাচ্চারাও এলো। সাথে এলো সালমা এবং ইয়ামিন মামা। ইয়ামিন মামা আফসোস করে বলল,
–“ভালোই! মেয়েকে পাললাম আমরা, আর আমার আপা আমাকে গুরুত্বই দিচ্ছে না। দেখেছ সালমা! এভাবে মানুষ চিনতে হয়।”
এশা এটা শুনে খুবই ভাবনায় পড়ে গেল। চিন্তা-ভাবনা করে বলল,
–“মানুষ তো মানুষই হয় মামা। এইযে, দুই কান, একটা মাথা, দুই চোখ, হাত-পা।”
সবাই হো হো করে হেসে দিল। এশা কাউকে গুরুত্ব না দিয়ে মৌনোর হাতের দিকে তাকাল। যেই বাচ্চারা মৌনোর হাত দেখে ভয়ে পালাত, দুর্গন্ধ বলে বলে দূরে সরে যেত। সেখানে এশা সেই বোনের হাত ছুঁয়ে ছুঁয়ে বলল,
–“তোমার কি এখনো খুব কষ্ট হয় আপু? বড়ো আপা তো বলল তুমি সেরে গেছ। তাহলে এখনো দাগ আছে কেন? ব্যথা করে দেখেই এখন আর আমাকে বকো না আপা?”
মৌনোর চোখ-জোড়া ভিজে গেল ছোটো অবুঝ বোনটার প্রশ্নে। এশা জানে তার বোনের সাথে দূর্ঘটনা হয়েছে, হাত পুড়ে গেছে। কিন্তু কীভাবে হয়েছে তা জানে না সে। রিমঝিম হেসে বলল,
–“চাঁদের গায়ে দাগ থাকে আমার ময়না পাখি! তাই বলে কি সে অসুন্দর?”
এশা বোনের হাতে চুমু দিয়ে বলল,
–“একদম না। আমার মৌ আপা সিনেমার নায়িকা। কিন্তু কার মতো..”
এশা নায়িকা খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। এশার কাজগুলো অন্যান্য বাচ্চারাও উৎসুক হয়ে দেখল। এই প্রথমবার ওরাও মৌনোর কাছে এগিয়ে এসে মৌনোর ক্ষত দেখল। এবার ওরা সেই সামান্য ক্ষততে ভয় পেল না। তারাও সেই ক্ষততে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দিচ্ছে।
–“উহু, একটুও দুর্গন্ধ নেই।”
এটা দেখে মৌনো ফুঁপিয়ে উঠল, তার এতদিনের অবজ্ঞা, অবহেলা, ঘৃণা সব মনে পড়ে যাচ্ছে। যেই বাচ্চাগুলো তার থেকে দূরে পালাত সেই বাচ্চারা তার হাত ছুঁয়ে দিচ্ছে, দুর্গন্ধ নেই বলছে। এশা রেগে একজনের মাথায় চাটি মেরে বলল,
–“কিসের দুর্গন্ধ? ব্যথা পেলে দুর্গন্ধ আসে নাকি বোকা? দুর্গন্ধ তো ডোবায় পাই। পচা মাছে পাই।”
বাকি বাচ্চারাও সহমত প্রকাশ করল। এই বাচ্চাদের মধ্যে একজন মৌনোর চোখের পানি দেখে অবুঝ সুরে বলল,
–“কাঁদছ কেন আপু? এটা কি খুব ব্যথা করে?”
মৌনো কোনো রকমে নিজেকে সামলে বলল,
–“এইযে, তোমরা ফুলেরা ছুঁয়ে দিচ্ছ। ব্যথা উড়ে গেছে।”
রাজিয়া শেখ, রিয়াজ সাহেব, ইয়ামিন, সালমা.. সবাই প্রাণ ভরে এই দৃশ্য দেখলেন। সালমা জানে এই বাচ্চাগুলোই কীভাবে মৌনোকে দেখে ভয়ে পালাত। সালমা শূন্য চোখে সিলিং এ তাকাল। যেন সে আল্লাহকে স্মরণ করছে। সত্যিই, ধৈর্যের ফল খুব সুন্দর হয়। সে নিজেও আশাবাদী, এই অসহায় মেয়েটাকে আল্লাহ নিজেই সারিয়ে তুলবেন— মানসিকভাবে।
————————————-
বুশরা মৌনোকে জোর করে রূপচর্চা করাচ্ছে আজকাল। এই কয়েক মাসে মৌনো নিজের ঠিক মতো যত্নই নেয়নি। জোর না করলে সামনেও যত্ন নেওয়ার কোনো প্রকার ভাব তার মধ্যে দেখা যাচ্ছিল না। মৌনোর খালারাও এ বাড়িতে এসেছেন। মামাদের শখ আরেক বোনের মেয়ে বুশরাকে তারা এই বাড়ি থেকেই বিদায় দিবেন। এজন্য এই বাড়িটাকেই বিয়ে-বাড়ির মতো সাজানো হবে। বুশরাও খুব খুশি এই সিদ্ধান্তে, তাই বুশরার বাবা-মা না করেননি। বুশরার বাবা দু’হাত ঢেলে এই বাড়িটাকেই সাজাবেন।
রূপচর্চার পর দেখা গেল মৌনোর মুখের গ্লো ধীরে ধীরে ফিরতে শুরু করেছে, এতে বুশরা বেশ খুশি হলো। বুশরা বলল,
–“আমার বিয়ে নিয়ে তোদের এত এত পরিকল্পনা ছিল। খবরদার যদি আমার বিয়েতে মুখ কালো করে রেখেছিস। বরং আমার বোনদের সবচেয়ে সুন্দর দেখানো চাই।”
মৌনো ইতঃস্তত অনুভব করল। তার বেশ অস্বস্তিও হলো। মনে পড়ে গেল ইয়ামিন মামার বিয়ের কথা। কতশত ঝামেলা পোহাতে হয়েছিল সবার। বুশরা তা ধরতে পেরে মৌনোকে চড় লাগিয়ে দিল। রেগেমেগে বলল,
–“আবার উলটো পালটা ভাবছিস? তোকে আমি খতম করে দিব আবার যদি আগের চিন্তা মাথায় আসে। তোর জীবন তোর মৌনো, তুই নিজের মতো করে বাঁচবি, তুই ডিজার্ভ করিস! অন্য কারো কথা ভেবে খবরদার ঘরবন্দী থাকার চেষ্টা করবি না!”
মৌনো হাসার চেষ্টা করল, বুঝল নতুন বউকে রাগিয়ে দেওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। রিমঝিম ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল,
–“এ কি! শুধু মৌনোই কী রূপচর্চা করবে? আমি কী দোষ করেছি? বিয়ে হয়ে গিয়েছে বলে পর করে দিবি?”
বুশরা হো হো করে হেসে দিল। তার রূপচর্চার জিনিসগুলো শেষ হয়েছে দেখতেই মৌনো সাহস করে বলল,
–“আমি গিয়ে নিয়ে আসি উপকরণ?”
বুশরা, রিমঝিম দুজনেই অবাক হলো মৌনোর নিজ থেকে এগিয়ে আসা। এই ঘটনা ঠিক বেশ বিরল তাদের জন্য। অনেকদিন পর মৌনো ধীরে ধীরে নিজ থেকে আগ্রহী হচ্ছে। বুশরা হেসে বলল,
–“যা। আমার মা রান্নাঘরেই আছে। মামীদের কিছু বলা লাগবে না। আম্মাই যা করার করবেন।”
মৌনো মেনে নিল। সে ঘর থেকে বের হতেই বুশরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলল,
–“আপা, এর মানে কি মৌনোর মানসিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে?”
–“হুঁ! অন্তত দুই মাস আগে যা দেখে গেছিলাম তার থেকে তো অনেকটাই ঠিক হয়েছে। দোয়া কর যাতে সেই দূর্ঘটনা ওকে আর হন্ট না করে। আমরা জানি এসব দূর্ঘটনা কখনো জীবন থেকে মুছে ফেলতে পারব না। কিন্তু সেটাকে খারাপ অতীত ভেবে তা ভুলে সামনে তো এগিয়ে যেতেই পারি।”
মৌনো উপকরণ নিয়ে আসার সময় বেশ বিপদে পড়ল। তার পথ আটকে দাঁড়াল বড়ো মামার বড়ো ছেলে শরীফ। লোকটা সৌদি প্রবাসী ছিল, বিয়ে করেনি। কিছুদিন আগেই ফিরে এসেছে। তাও যেনতেন ফেরত নয়। একদম জেল খেটে। ওদেশে জুয়া খেলতে গিয়ে ধরা খেয়ে জেলে ছিল। বড়ো মামা কতকিছু করে অবশেষে ছেলেকে দেশে এনেছেন। ভেবেছিলেন দেশে এলে ছেলে বদলে যাবে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। এখনো সে সি/গারেট, লাল পানিতে আসক্ত। মাঝেমধ্যে এদিক সেদিক জুয়া খেলতেও চলে যায়। এ নিয়ে ভদ্রলোক বেশ চিন্তিত।
মৌনোকে উপরনিচ দেখে শরীফ অন্যসুরে হেসে বলল,
–“ঢাকাইয়া বইন যে বড়ো সড়ো হয়ে গেছে দেখছি। বয়স কত?”
মৌনো আমতা আমতা করে বলল,
–“বিশ।”
মৌনোর গা গুলাচ্ছে, সে ভালো করেই বুঝতে পারছে শরীফের নজর ভালো না। সে ভেতরে ভেতরে বেশ ভয়ও পেয়ে গেল। তবে রোকসানা আন্টি বলেছেন, বিপরীত লিঙ্গের সামনে ভয় প্রকাশ করা যাবে না। যত ভয় প্রকাশ করবে তত এরা লাই পাবে। মৌনো তাই মুখভঙ্গি যথেষ্ট স্বচ্ছ রাখার চেষ্টা করল। নিজেকে বুঝ দিল, কাজিনই তো। শরীফ মৌনোর গা ঘিনঘিন আরও বাড়িয়ে বলল,
–“কচি দেখছি। এতদিন দেখি নাই কেন? ঘরে বন্দী ছিলা নাকি?”
মৌনো বুঝল সে আর দাঁড়াতে পারবে না। কোনো মতে বলল,
–“বুশরা ডাকছে ভাইয়া।”
বলেই দ্রুত সে কেটে পড়ল। ঘরে গিয়ে উপকরণ বুঝিয়ে দিল। তার আবারও পুরানো ঘটনা মাথা নাড়াচাড়া দিয়ে উঠেছে। জাবিরের কথা বারবার মাথায় ঘুরছে। এটা রিমঝিমও লক্ষ্য করল। মৌনো যতটা স্বচ্ছল অবস্থায় গিয়েছিল এখন ঠিক ততটাই চিন্তিত লাগছে। রিমঝিম দ্রুত বোনের পাশে এসে বসল।
–“কী হয়েছে? এমন লাগছে কেন তোকে, গেলি তো ঠিকঠাক। কেউ কিছু বলেছে?”
মৌনো বোনের দিকে তাকাল। এবার সে আগের মতো নিজের মধ্যে কথা চেপে রাখার ভুল করল না। রিমঝিমকে বলে দিল,
–“শরীফ ভাইয়া পথ আটকেছিল। তার নজর ভালো লাগেনি আমার। আমার বয়স জিজ্ঞেস করছিল। এতদিন দেখেনি আমাকে। আজ দেখল।”
বুশরা এ কথা শুনে চিন্তিত হলো। পরবর্তীতে আবারও বলল,
–“ভয় পাস না। হ্যাঁ, শরীফ ভাই একটু লম্পট আছে। তবে আমাদের কারো সাথেই কখনো খারাপ আচরণ করেনি। শুনেছি বড়ো মামী ভাইয়ার জন্য মেয়েও দেখছে ঘরবন্দী করার জন্য।”
কিন্তু দেখা গেল মৌনোর ভয়কেই সত্য প্রমাণিত করলেন বড়ো মামী। সেই সময়ে মৌনোর বাবা-মা ছিলেন বুশরাদের বাড়িতে। ফিরবেন রাতে। বড়ো মামী ইয়ামিনদের সাথে বলাবলি করলেন মৌনোকে শরীফের বউ করবেন। শরীফের নাকি মৌনোকে পছন্দ হয়েছে। তার চাইতেও ভয়াবহ ব্যাপার বড়ো মামাও এই প্রস্তাবে স্ত্রীর সঙ্গ দিচ্ছেন। সালমা এতে অস্ফুট স্বরে বলল,
–“মৌনোর এই সময়ে বিয়ের কী দরকার? ওকে ওর মতো করে ছেড়ে দিন না। ওর মতামত ছাড়া বিয়ের কথা আগানো কী খুব দরকার?”
মৌনোও এই মুহূর্তে সেখানে আসল। শুনল সবার কথা। বড়ো মামী এবার নিজের ক্ষোভ ঝাড়লেন,
–“তুমি একটু অভিনয় কম করে করবে সালমা। আমরা জানি যে তুমিই সেদিন মৌনোকে বাজে কথা বলেছিলে তাই মৌনোরা তাড়াহুড়ো করে বাড়ি ফিরে গিয়েছিল। আলিয়া সব দেখেছে।”
আলিয়া অর্থাৎ মৌনোর মেঝো মামী। মৌনো অবাক হলো মামীর এই ক্ষোভ প্রকাশ। তিনি চাইলেই এটা একান্তে সালমাকে বলতে পারত কিন্তু এই মুহূর্তে ছোটো মামীকে তিনি সবার সামনে ছোটো করলেন। সালমা মামীর চোখ ছলছল করে ওঠে। মৌনো ভয়ে ইয়ামিনের দিকে তাকাল। যা ভেবেছিল তাই, ইয়ামিন মামা রাগী চোখে তার স্ত্রীর দিকে তাকানো। কিন্তু সবার সামনে ইয়ামিন কিছু বলল না। ইতিমধ্যেই বড়ো মামী পরিস্থিতি গড়মিল করে দিয়েছেন। তিনি যে যেকোনো মূল্যে মৌনোকে শরীফের বউ করে ছাড়বেন সেটা বোঝা যাচ্ছে। এই মুহূর্তে ইয়ামিন মুখ খোলা মানে পারিবারিক দ্বন্দ্ব শুরু হবে। এটা সে মোটেও চায় না। বড়ো মামা স্ত্রীর সাথে তাল মিলিয়ে বললেন,
–“মৌনোর ওপর দিয়ে যা ঝড় গেছে, এতে ওর একটা ব্যবস্থা করাই উত্তম। বুড়ো টুড়োর প্রস্তবাএর চেয়ে ভালো নয় কি মৌনো আমাদের ঘরেরই হয়ে থাকল।”
ইয়ামিন এবার মুখ খুলল,
–“ঘরের মেয়ে ঘরেই আছে। তবে সেটা বউ হয়ে থাকুক তা মৌনো নিজেও চায় না ভাইজান। আপারা আসুক আর বুশরার বিয়েটা যাক। এরপর নাহয় এসব নিয়ে আলাপ হবে।”
ইয়ামিন খুব কৌশলে এই ব্যাপারটা ঘুরিয়ে দিল। বড়ো মামী মেনে নিলেন। মৌনো ইয়ামিনের দিকে তাকাতেই ইয়ামিন তাকে ইশারায় চুপ থাকতে বলল। মৌনোরও বুঝতে বাকি রইলো না, ইয়ামিন কখনোই শরীফের মতো লম্পটের হাতে মৌনোকে তুলে দিবে না। সে শুধু আপাতত মন রক্ষা করছে। মৌনো মেনে নিল, তবে আলাদা করে মামাকে ডেকে বলল,
–“মামা, মামীর কোনো দোষ নেই। তুমি এই কয়েক মাসে ভালো করেই দেখেছ ছোটো মামী আমার জন্য কতটা লড়েছে। বড়ো হয়ে ছোটোজনকে কিছু বলতেই পারে। তাই বলে এই না যে তুমি আবার মামীর ওপর চড়াও হবে। তুমি ওই মুহূর্তটায় মামীর জায়গায় নিজেকে দাঁড় করিয়ে চিন্তা করো। কোন মেয়ে নিজের বিয়েতে এতকিছু মেনে নিবে? খবরদার তুমি তোমার ভুয়া রাগ দেখাবে না। আজকে যেভাবে সুন্দর করে পরিস্থিতি হ্যান্ডেল করেছ। সামনেও এভাবেই থাকবে। মামী দোষ করলেও ক্ষমা চেয়ে নিয়েছে। জানো না, ক্ষমা মহৎ গুণ।”
ইয়ামিন কিছু বলতে পারে না মৌনোর কথার বিপরীতে। সে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
–“দেখি।”
[৩৭]
বহুদিন পর মাটির ঘ্রাণ পেল নিবিড়। মিশন থেকে ফিরেছে কয়েকঘণ্টা হয়েছে সবে। নিজের কোয়ার্টারে ফিরে আগে কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়ে নিয়েছে সে। এরপর নিজের মোবাইল অন করেই দেখল তেমন কেউই কল করেনি। কী মনে করে কামরুলকেই সবার আগে কল দিল। এই ছেলেটা আস্ত এক রেডিয়ো। বেলতুলির সব খবরাখবর তার কাছে থাকে। কামরুল তো নিবিড়ের কল পেয়ে সেই খুশি। প্রথমেই এক লম্বা সালাম দিল নিবিড়কে।
–“বড়ো ভাই, সময় মতো কল দিছেন। জানেন, গতকাইল আপনের প্রাক্তন বাগদত্তা কার হাত ধইরা ভাগছে। এহনো খোঁজ-খবর নাই। বুঝলেন ভাই, আল্লায় আপনেরে বাঁচাইছে। পরে বিয়া হইয়া যাওনের আরেকজনের লগে ভাগলে মাইনষে আপনেরেই ছি ছি কইরা কইত বউ ধইরা রাখতে পারেন না।”
–“আমি তোকে ছয় মাস পর কল দিয়েছি কামরুল! মানুষ কেমন আছে, ভালো আছে কিনা জিজ্ঞেস করে।”
কামরুল জিভে কামড় দিয়ে বলল,
–“ভাই, আপনে কেমন আছেন? জাহাজে গিয়া কয়ডা হাঙর মারছেন?”
–“আবার ফাজলামো?”
কামরুল হো হো করে হাসল। কিন্তু কিছুতেই বলল না মৌনোর ব্যাপারে। যা ঘটেছে তা নিবিড় শুনলে এতক্ষণে কি যে করবে। তাই ওখানে জানানোটা ঠিক হবে না। যা জানার তা নাহয় বেলতুলি এসেই শুনবে।
কামরুল তাই একে একে বাড়ির সবার কী খবর তার সব নাট-বল্টু খুলে খুলে বলল। এতে নিবিড়ের মাথা ধরে গেল। সে কপালে আঙুলের বিচরণ চালিয়ে বলল,
–“আমার ভুল হয়েছে তোকে কল দিয়ে। এবার কলটা কেটে উদ্ধার কর।”
–“জো হুকুম বড়ো ভাই।”
কামরুল কাটার আগেই নিবিড় তার মুখের ওপর কল কেটে দিল। নিবিড় মৌনোর নাম্বারটা দেখল। কি অদ্ভুত, এই কয়েক মাসে একটা মেসেজও আসেনি এই নাম্বার থেকে? অবশ্য মেসেজ না করাটাই স্বাভাবিক। সবাই তো জানতই নিবিড় ফিরবে ছয় মাস পর। নিবিড় এবার খুব শান্তি পেল। বহুদিন পর নিজের জন্য সুন্দর করে রান্নাও করল। একজন কেয়ারটেকার তাকে নতুন বাজার দিয়ে গেছে।
বিকালের দিকে যখন আবারও কেনাকাটার জন্য বের হলো তার দেখা হয়ে গেল ইয়ামিনের সাথে। ইয়ামিন তো খুশিমনে নিবিড়কে রাস্তাতেই জড়িয়ে ধরল,
–“আরে নেভিসাব! কবে ফিরলে?”
–“এইতো মামা, আজই। আপনার কী অবস্থা? সব ঠিকঠাক?”
ইয়ামিন কিছু বলতে নিয়েও জিভের শেষ মাথায় এসে তার কথাগুলো আটকে গেল। বড়ো গলায় তার জানাতে ইচ্ছে করল,
–“তোমার অনুপস্থিতিতে অনেক কিছুই ঘটে গেছে নিবিড়।”
কিন্তু মুখে বলল,
–“আরে সবই ফাটাফাটি চলছে। ছুটিতে আছ না এখন?”
–“জি, বেশ অনেকদিনের ছুটিই পেয়েছি।”
–“বাহ! তাহলে তো হয়েই গেল। আজ আমার ভাগনি বুশরার গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান। সন্ধ্যার পর চলে আসবে কেমন? মৌনোরাও আছে। ভালো লাগবে তোমার। এতদিন একঘেয়েমিতে ছিলে। এখন সব ঝেড়ে ফেলবে, বুঝেছ?”
–“জি, আচ্ছা। মৌনোরা কেমন আছে?” মৌনোর কথা জিজ্ঞেস করতে গিয়ে তার জিভ জড়িয়ে এলো। অস্বস্তি হচ্ছে বেশ।
ইয়ামিন সত্যি কথাই বলল,
–“ভালো আছে সবাই। বাকিটা এসে দেখে নিয়ো। এখন যাই, আমার আবার তাড়া আছে।”
—————————————–
বুশরার গায়ে হলুদ উপলক্ষ্যে মৌনো খুব সুন্দর এক লেহেঙ্গা পরেছে। এটা বুশরার বাবা কিনে দিয়েছে ওকে। মৌনো চায়নি এত গর্জিয়াছ কিছু পরতে। বারবার হাতের বাহানা দিচ্ছিল। এজন্য বুশরা কাপড়ে তার হাত বেঁধে দিয়ে বলল,
–“বেশ, এবার তো হাতও দেখা যাচ্ছে না। এবার কাকে বাহানা দিবি তুই?”
অগত্যা, মৌনোর সাজতেই হলো। তার ডান হাতে মেহেদিও দিয়েছে সে। সব মিলিয়ে যখন নিজেকে আয়নায় দেখল, সে নিজেই অবাক হয়ে গেল। চাপা কিছুটা ভেঙেছে, তবে মেকআপের জন্য তার চোখের নিচের কালো গর্ত একদমই বোঝা যাচ্ছে না। সে অবাক হয়ে ভাবল, আসলেই তাকে এত সুন্দর লাগছে নাকি তার ভ্রম?
আজকাল বড়ো মামী আবারও মৌনোকে মাথায় চড়িয়ে রেখেছেন। তিনি এত বেশি প্রশংসা করেন মৌনোকে নিয়ে। মৌনোর যত্ন-আত্তির কোনো প্রকার ত্রুটি হতে দেন না। মৌনোর সব দিক খেয়াল রাখেন। কিন্তু মৌনো আর এসবে ভুলে না। সে ভালো করেই জানে বড়ো মামীর ধান্দা। ধান্দার চেয়েও বড়ো কথা, সে ইতিমধ্যেই মামীর আসল রূপ দেখে নিয়েছে। তাই তাকে ভুলানো এত সোজা নয়। মৌনো এখনো তার সিদ্ধান্তে অটল। বেঁচে থাকতে সে কখনোই শরীফকে বিয়ে করবে না। এতে যদি তার চিরকুমারী থাকতে হয়, সে থাকবে। শরীফ চাইলেও এখন তার ধার ঘেঁষতে পারে না। সত্যি বলতে ঘেঁষতে চায়ও না। সে তো পুরো দমে ধরেই নিয়েছে মৌনো তার বউ হবে। নয়তো কে নিবে এই এ সি ড ছোঁড়া মেয়েকে? সে যে দয়ামায়া করে বউ করতে চাচ্ছে এই ঢের!
রাজিয়া শেখ মৌনোকে নিচে থেকে এশাকে ধরে আনার আদেশ দিলেন। মৌনো কিছুটা ভয় পেল, অস্বস্তি অনুভব করল। সে এই লেহেঙ্গা পড়ে মানুষের সামনে যেতে চাচ্ছে না। ইতিমধ্যেই তার অনেক ব(১)দনাম রটে গিয়েছে। কিন্তু রাজিয়া শেখও নিজ সিদ্ধান্তে অটল। যে করেই হোক মেয়েকে আগের স্বাভাবিক জীবনটা অনুভব করানো জরুরি। অগত্যা, মৌনো তার হাতের কাপড়টা পুণরায় বেঁধে লেহেঙ্গার গের ঠিক করতে করতে সিঁড়ির দিকে এসে নিচে তাকাল। আচমকাই সে অবাক হয়ে গেল। নিচে ইয়ামিন মামা এবং ইয়াসীন মামার সাথে কোলাকুলি করছে নিবিড়। সাদা পাঞ্জাবি পড়েছে মানুষটা। উজ্জ্বল শ্যামলা গায়ের রঙ বদলে কিছুটা চাপা হয়ে এসেছে। সানট্যানের প্রভাব আর কি।
নিবিড়ও এমন সময়ে তাকাল উপরে। মুহূর্তেই দুজনের চোখাচোখি হলো। মৌনোর বুকটা মুঁচড়ে উঠল নিবিড়ের সেই শান্ত চাহনিতে। নিবিড় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল মৌনোর পরিবর্তনগুলো। মেয়েটা কেমন যেন মিইয়ে গেছে। আগের সেই উজ্জ্বলতা খুঁজে পাচ্ছে না সে। দেখে মনে হচ্ছে কতদিনের দুঃখী সে। নিবিড়ের ভ্রু হঠাৎ-ই কুঁচকে গেল। আপনমনে ভাবল,
–“মৌনো, তোকে এমন দেখাচ্ছে কেন? মনে হচ্ছে যেন তুই ঠিক নেই। ঠিক আছিস?”
ইয়ামিন আর ইয়াসীন দুজনেই মৌনোর সাথে নিবিড়ের চোখাচোখি দেখল। সাথে এও দেখল, মৌনো নিবিড়কে দেখে ভয় পেয়ে দ্রুত উলটো দিকে ছুটে পালাল। যেন মৌনো চায় না নিবিড় তাকে দেখুক, তাদের সাক্ষাৎ হোক। এতে নিবিড়ের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল আরও। সরাসরি ইয়ামিনের দিকে তাকিয়ে বলল,
–“কী হয়েছে মৌনোর? ও ঠিক আছে?”
দুই ভাই একে অপরের দিকে চাওয়া-চাওয়ি করলেন। দুজনই ধরতে পারলেন নিবিড়ের চাপা চিন্তা। দুই ভাই নিবিড়ের দুই হাত ধরে নিয়ে যেতে যেতে বললেন,
–“অনেকদিন তোমার সাথে বসে আড্ডা হয় না নিবিড়। চলো পেছন দিয়ে চায়ের আড্ডা দিই।”
নিবিড়ও মেনে নিল, কিন্তু মৌনোর দুশ্চিন্তা তাতেও কাটল না। ওরা বাগান থেকে কিছুটা দূরে চেয়ার পেতে বসল। সর্বপ্রথম প্রশ্নটা ইয়ামিনই করল,
–“নিবিড়, আজকে যা যা জিজ্ঞেস করব তার সত্যি উত্তর দিবে। যদিও আমি জানি তুমি মিথ্যে বলো না। তবুও আমি আবারও ওয়ার্ন করছি। সত্যি বলবে।”
নিবিড় মেনে নিল, যদিও সে বুঝতে পারছে না ইয়ামিনের উদ্দেশ কি।
ইয়াসীন প্রশ্ন করলেন,
–“তুমি কী মৌনোকে ভালোবাসো?”
নিবিড় এই প্রশ্নে চমকে গেল। ইয়ামিন তাকে সময় না দিয়ে বলল,
–“জলদি জলদি উত্তর দাও। আমাদের তাড়া আছে।”
–“কিন্তু এই প্রশ্ন কেন হঠাৎ?”
–“যা প্রশ্ন করেছি তার কুইক উত্তর দাও। বড়োদের অপেক্ষা করাতে নেই।”
নিবিড় থেমে কিছু ভাবল। কপালের কোণ চুলকে বলল,
–“সেভাবে কখনো ভেবে দেখিনি। তবে ওর জন্য একটা সফট কর্ণার আছে আমার। এরকমটা কখনো কোনো মেয়ের প্রতিই আসেনি।”
–“ভেরি গুড! যদি দেখো মৌনোর কোনো বিপদ হলো, ওকে বিয়ে করবে?”
–“বিয়ে?”
নিবিড় চিন্তায় পড়ে গেল। ইতঃস্তত হয়ে বলল,
–“মৌনো আমার থেকেও ভালো কাউকে ডিজার্ভ করে ইয়াসীন মামা। ওর সাথে আমার অতীতের রেকর্ড খারাপ আছে। আমার মনে হয় না আমার সামান্য পছন্দের বোঝাপড়া না করে বিয়ের কথা ভাবা উচিত।”
ইয়াসীন মামা বললেন,
–“প্রেক্টিক্যালি চিন্তা করে দেখো। যদি কখনো সেই পরিস্থিতি হয়?”
–“সরি মামা। আমি সত্যিই এরকম কিছু ভাবতে পারছি না। মৌনো ভালো কাউকে ডিজার্ভ করে, ওর টাইপের। আমি পারি না বিয়ের ব্যাপারটা ওর ওপর চাপিয়ে দিতে।”
–“তোমার কেন মনে হয় মৌনো ভালো কাউকে ডিজার্ভ করে? তুমি কেন নও? নিঃসন্দেহে তুমি ভালো একজন মানুষ।”
–“ওইযে বললাম, পাস্ট রেকর্ড ভালো নয়। আর ওকে বিয়ের কথা বললে ও কী ভাববে?”
ইয়ামিন বুঝল নিবিড় এখনো তার মনের ভাব নিয়ে বেশ চিন্তিত, নার্ভাস এবং কনফিউজড। মানুষ ধাক্কা না খেলে পথে আসে না। তাই এবার ইয়ামিন সেই ধাক্কাটাই দিল নিবিড়কে।
–“নিবিড়, তুমি কী জানো? তোমার অনুপস্থিতিতে মৌনোকে এ সি ড ছোঁড়া হয়েছে। জাবির নামের এক ছেলে এই কাজ করেছে কয়েক মাস আগে। মুখ বাঁচলেও ওর হাত বাঁচেনি।”
দুই ভাই একই সাথে নিবিড়ের দিকে তাকাল। নিবিড়ের গলা দিয়ে শব্দ বেরুলো না। সে শক্ত হয়ে বসা। চোখ-মুখ বিমূঢ়। চোয়াল শক্ত কিন্তু দৃষ্টি শূন্য। ইয়াসীন বাকি সব ধীরে ধীরে নিবিড়কে বলল। ইয়ামিন ততক্ষণে সূক্ষ্ম নজরে নিবিড়ের মুখের পরিবর্তন দেখছে। ধীরে ধীরে ছেলেটার মুখ লাল হয়ে গেছে। নিবিড় হাতের মুঠো শক্ত করে দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
–“শু*য়ের বাচ্চাটা এখন কোথায় আছে?”
–“কেস চলছে। যতদূর দেখলাম কেস অনেকটা আমাদের হাতেই আছে। এত দ্রুত ছাড় দিব না ওটাকে।”
ইয়ামিন নিবিড়ের ধ্বংসাত্মক রাগ অনুভব করতে পারছে। অতিরিক্ত ক্ষেপলে যেমন মানুষ চুপসে যায় নিবিড়েরও একই পরিস্থিতি। সে নিতেই পারছে না তার অনুপস্থিতিতে এতকিছু হয়ে গেছে। নিবিড় টের পেল সূক্ষ্ম এক সুঁইয়ের মতো কিছু একটা তার বুকের বা পাশটায় বিঁধছে। এই অনুভূতি নতুন তার জন্য। বড্ড নতুন। কেমন হাসফাস লাগছে, দম বন্ধ লাগছে। ইচ্ছে করছে নিজের হাতে আইন তুলে নিতে। সব কিছু তছনছ করে দেওয়ার মতো অনুভূতি হচ্ছে তার— প্রথমবারের মতো। নিবিড় ঘাসের দিকে নজর স্থির করে রাখল। চোখে ভেসে উঠল নিবিড়কে দেখে মৌনোর ভয় পাওয়া, তাকে দেখে পালিয়ে যাওয়া। সঙ্গে খেয়াল করেছিল মৌনোর বাম হাতটা কাপড়ের মাঝে লুকিয়ে রাখা।
নিবিড় খুব বড়োসড়ো কিছু একটা উপলব্ধি করল আজ। এই উপলব্ধি না হলে হয়তো বুঝতেই পারত না নিবিড়ের ভেতরের কোথাও কিছু একটা লম্বা সময় ধরে বন্দী হয়ে ছিল।
–“এজন্যই বুঝি তুমি আমাকে দেখে ওভাবে পালিয়েছ, মৌনো?”
নিবিড়ের উপস্থিতি পেয়ে মৌনো আবারও ঘরবন্দী হলো। সে নিজ মনে জপছে, কিছুতেই নিবিড়ের সামনে যাওয়া যাবে না। নিবিড় তাকে দেখলে মুখ ফিরিয়ে নিবে, ছি ছি করবে। নাহ, সে ঘর থেকেই বের হবে না। কিছুতেই না।
এর মাঝে হঠাৎ দরজা খুলে জুনায়েদ এলো।
–“নিবিড় ভাইয়া ডাকছে তোমায় আপা। বলেছে তুমি যদি না আসতে চাও তাহলে যেন আমি তোমার ঘাড় ধরে নিয়ে যাই। এটা নাকি একজন লেফট্যানান্ট কমান্ডারের আদেশ। এখন আমি ভাইয়াকে বোঝাই কেমন করে, তুমি আমার কত বড়ো হও। আমার এই অসম্মান হতে দিয়ো না আপা।”
®লাবিবা ওয়াহিদ
চলবে~~
[যারা গল্পটি পড়বেন তারা সবাই রেসপন্স করবেন যেন বাকিদের ফিডেও এই পর্বটি পৌঁছায়। আজকে দুই পর্ব দিয়েছি, আশা রাখছি আপনারা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলবেন। মন্তব্য না পেলে কিন্তু আড়িইই। ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর নজরে দেখবেন, রিচেক দিতে পারিনি।]

